ব-ব-ব-বউভাত!
সাধনকাকা, মানে সাধন গুছাইতের মুখে গল্পটা শোনা। সাধনকাকা, অবশ্য এটাকে গল্প বলতে নারাজ। বলত, নিকষ্যি সত্যি, বিনোদ দারোগা এখনও বেঁচে, যাচাই করে নিতে পারিস।
সাধনকাকা পেশাদার চোর। চোর, কিন্তু কতগুলো ব্যাপারে ভয়ংকর নীতিবাগীশ। প্রবল অভাবেও নিজের পাড়ায় কখনও কাজ করেনি কাকা। সব অপারেশনই বেপাড়ায়। পাড়ার লোকের ভারি বিশ্বস্ত ছিল সে। ঘরদোর সব তার জিম্মায় রেখে নিশ্চিন্তে পাড়া ঝেঁটিয়ে যাত্রা দেখতে যেত।
পাড়ার লোকই উদ্যোগ নিয়ে বিয়ে দিয়েছিল কাকার। ফুলশয্যার সন্ধে থেকেই কাকা বেশ নার্ভাস। কী ভাবে সম্বোধন করবে বউকে, বউ-ই বা উত্তরে কী বলবে, সবচেয়ে বড় সমস্যা বউকে নাকি চুমু খেতে হয় ওই রাতে। ঘুমিয়ে থাকলেও না হয় কথা ছিল; কিন্তু জলজ্যান্ত ডাগর এবং জাগন্ত একটা মেয়েকে চুমু খাওয়া কি মুখের কথা! এ সব ভেবেই গলা শুকিয়ে আসছে কাকার। যা-ই হোক, কাকা ঘরে খিল তুলে গিয়ে বসল নতুন বউয়ের পাশে। বুকে ঢিপঢিপ। আরও একটু জড়োসড়ো হয়ে বসল নতুন বউ। কাকা সবেমাত্র কাকির চিবুকটা তুলে হ্যারিকেনের আলোয় দেখছে (তখনও গ্রামগঞ্জে বিদ্যুৎ আসেনি), এমন সময় দরজায় ধাক্কা—সাধন, দরজা খোল। বিনোদ দারোগা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল; একেবারে মোক্ষম সময়ে হাজির। তখন আগে বাঁচা পরে চুমু, নাকি আগে চুমু পরে বাঁচা—মস্ত দোটানায় পড়ল কাকা।
কোথা থেকে কাকা শুনেছিল, ফুলশয্যার রাতে বউকে চুমু না খেলে পরের জন্মে বাদুড় হয়ে জন্মাতে হয়। বাদুড়-জন্ম থেকে নিস্তার পেতে বউকে চুম্বন করে বসল সাধনকাকা। খিল ভেঙে দারোগা যখন ঘরে ঢুকল, কাকা চুমু-টুমু সাঙ্গ করে চালের টালি খুলে পালিয়েছে, কাকিও ফের ঘোমটা টেনে নিয়েছে মাথায়।
কাকা পরে স্বীকার করত বিনোদ দারোগা মস্ত উপকার করেছিল তার—ও ভাবে হুড়ো না দিলে ওই কঠিন কাজটা করতে রাত কাবার হয়ে যেত!
আমাদের জীবনে ফুলশয্যা হল গেটওয়ে অব তুরীয় আনন্দময় জগৎ, লাইসেন্স ফর উদ্দামতা। সোজা বাংলার বৈধ যৌনজীবনের উদ্বোধনী সঙ্গীত। বয়:সন্ধির করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই কল্পরাজ্যে ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে সেই রোমাঞ্চ নিশিযাপনের ছমছমে ছবি। যেন নতুন বাড়িতে দু’জন মানুষ—টাটকা রঙের গন্ধ, ঝকঝকে পালিশ, ধুলো-ময়লাহীন আসবাবপত্র। তখন শুধু আবিষ্কারের পর আবিষ্কার, বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়; সুখ বাড়ে চক্রবৃদ্ধি হারে। নিজের সাদামাটা ছোট বাড়িটাকে মনে হয় বাকিংহাম প্যালেস। গৃহপ্রবেশের দিন বিশ্বাসই হতে চায় না, এই রং বিবর্ণ হবে, পলেস্তারা খসবে দেওয়ালে। কিন্তু এখানেই যত গোলমাল। এত অপেক্ষার রজনী যখন সমাগত, এত রঙিন দিবাস্বপ্নকে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ জ্যান্ত করে দেব-দেব করছে, যে শরীর এত কাল নিষিদ্ধ হাতছানিতে ডেকেছে তার আসমুদ্রহিমাচল পর্যটনের টিকিট যখন হাতের মুঠোয়, তখন শুরু হয় সেই অমোঘ নার্ভাসনেস। পারব তো সব কিছু ঠিকঠাক? এক জোড়া চোখ, যার মালিকানা আমার নয়, তার সামনে আত্ম-উন্মোচন পর্বের সূচনা, ভাবলেই জলপিপাসা বেড়ে যায়। তখন সবারই কমবেশি সাধনকাকার দশা। সে-দিক থেকে কাকা ভাগ্যবান—বিনোদ দারোগার হুড়ো ধনাত্মক অনুঘটকের কাজ করেছিল। কিন্তু ক্যাটালিস্টের ক্রিয়া না থাকলে অনেক বিক্রিয়াই বড় জটিল হয়ে যায়। এমনই এক যুবকের কথা বলি।
সন্ধে থেকে যুবকের যথারীতি গলা শুকিয়ে কাঠ। রাত বাড়ছে, নিমন্ত্রিতরা বিদায় নিচ্ছে একে একে, আর আর বেশি করে পিপাসার্ত (অন্য কিছু নয়, নিছকই জল (H2O) পিপাসার্ত) হয়ে পড়ছে সে। নিয়মমাফিক বন্ধুরা পরামর্শদাতার ভূমিকায়। গরম গরম টিপস দিচ্ছে, পরিবার পরিকল্পনার নানা দাওয়াই বাতলাচ্ছে, কেউ বা সাপ্লাই দিচ্ছে হাতিয়ার, তবুও পর্যাপ্ত চাঙ্গা বোধ করছে না যুবক। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বাড়ি ফাঁকা, বন্ধুরাও সব শুভরাত্রি জানিয়ে টা-টা দিয়েছে, যুবককে ঢুকতেই হল ঘরে। মনে হচ্ছে, ফায়ারিং স্কোয়াডের দিকে যাচ্ছে সে। নব বধূ ফুল বিছানো খাটের (যুবকের মনে হচ্ছে কণ্টকাকীর্ণ) এক কোণে বসে। মেয়েরা মানবচরিত্রের অন্ধিসন্ধি জানে অনেক বেশি। স্বামীর শরীরী ভাষা থেকেই সে বুঝে গেল যে ইনি নেহাত গোবেচারা টাইপ, যা করার তাকেই করতে হবে। কিন্তু তখনও বিশ্বায়ন, মুক্ত অর্থনীতি, হইহই করে এ পোড়া বঙ্গদেশে ঢুকে পড়েনি। বুকভরা মধু বঙ্গের বধূর কোমল অঙ্গে জিনস ওঠেনি, জনসমক্ষে স্বামীর নাম ধরে ডাকার আর চুলের ফাঁকে সিঁদুর লুকিয়ে রাখার রেওয়াজ হয়নি, বৃদ্ধাশ্রমেরও বাড়বাড়ন্ত ছিল না এত।
জবাকুসুম তেল শাঁখা-পলা, সন্তান-সন্ততি, রেডিয়ো-নাটক, ব্রত-উপবাস, সুচিকার্য ইত্যাদি নিয়েই আবর্তিত ছিল বঙ্গরমণীর জগৎ। সে যা-ই হোক, কম্পিত কণ্ঠে দু-চারটে ক্যাবলা মার্কা প্রশ্ন করল যুবক, ঘাড় নেড়ে উত্তর দিল বধূ, তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল দুজনে। যুবক পাশবালিশ আঁকড়ে ঘুমিয়েও পড়ল কিছুক্ষণ পর। একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে ঘুমিয়ে পড়ল বধূও। পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙল যুবকের। প্রাতর্ভ্রমণের অভ্যেস ছিল তার। প্রস্তুত হয়ে বেরোচ্ছে যখন ঘুম ভাঙল বধূর। সেও চলল স্বামীর সঙ্গে। যুবকের মনে কিছু অপরাধ বোধ—অমন মধুযামিনীতে তার যাবতীয় আলিঙ্গন এবং উষ্ণতা সে পাশবালিশকে নিবেদন করেছে। হঠাৎ নজরে পড়ল রাস্তার ধারে বাগানে অপূর্ব এক লাল গোলাপ। যুবক বলল, ওই গোলাপটা নেবে? বধূ বলল, কিন্তু বাগানে বেড়া দেওয়া যে! যুবক বুক ফুলিয়ে বলল, বেড়া টপকে এনে দিচ্ছি। বধূ বলল, থাক, খুব হয়েছে, সারারাত ধরে একটা পাশবালিশ টপকাতে পারলে না; আর বলছ বেড়া টপকাব!
যোগ্যং যোগ্যেন যোজয়েৎ
শুধু সাধনকাকা বা ওই কেবলুস যুবক নয়, লজ্জা নারীরাও পায়। বরং তারাই বেশি পায়। খুব স্বাভাবিক। নতুন পরিবেশ। কেমন, শাশুড়ি কতটা দজ্জাল, ননদটা কি ছিদ্রান্বেষী, বড় জা যেন তার চেয়েও সুন্দরী—এমনতর হাজার ভাবনা আড়ষ্ট রাখে তাদের। সেই অড়ষ্টতা কৌশলে লজ্জাতে কনভার্ট করে দেয়। ফলত, পুরুষ যদি আগুয়ান না হয় তবে বেশির ভাগ রমণীর সকল নিয়ে সর্বনাশের আশায় বসে থাকা ছাড়া কী-ই করার থাকে? এমনই এক রমণী পরে ছেলের কাছে খেদোক্তি করেছিল—তোর বাবা যদি একটু কম লাজ্জুক হত, তবে তোর বয়েস আরও দশ বছর বেশি হত।
আবার দু’জনেই যেখানে জড়তাহীন অকুতভয়, সেখানে ভ্যানতাড়া পছন্দ করে না কেউই। অহেতুক ব্রীড়া দরজার বাইরে রেখেই ফুলশয্যা উদযাপন করে তারা।
এমনই এক বলিষ্ঠ যুবক, যে হামেশাই নিষিদ্ধপল্লিতে রাত্রিযাপন করে, বিয়ে করল এক সময়। ফুলশয্যার পরদিন দেখা গেল খুবই বিমর্ষ সে। বন্ধুরা জানত ফুলশয্যার রাতে তার নতুন কিছু প্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এ যে ভয়ানক বিমর্ষ! কারণ জিগ্যেস করতে বলল, মনভুলন্ত সে নাকি বউকে টাকা দিয়ে ফেলেছে। বন্ধুরা হায় হায় করে ওঠে—এই যা! তোর বউ কি বুঝতে পেরেছে কিছু? যুবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বউ কী বুঝেছে জানি না, কিন্তু আমি যা বোঝার বুঝে গেছি, কারণ বউ সঙ্গে সঙ্গে ভ্যানিটি ব্যাগ বের করে দশ টাকা ফেরত দিল আমায়।
দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর
ফুলশয্যার পরদিন পাত্রপাত্রী বন্ধুসমাজে ভিআইপি। ওই রাত নিয়ে সবার অপার কৌতূহল। কে কী বলল, তারপর কী হল, তারপর…তারপর…তারপর…। সবাই আরও ডিটেলিং চায়, আর প্রলম্বিত বর্ণনা। অপাপবিদ্ধ শিশুরা যেমন ‘রাজারানি সুখে ঘরসংসার করতে লাগল’-তে সন্তুষ্ট নয়, আরও তার পর চায়। কেউ যদি বলে, কী আবার হবে, খুব টায়ার্ড ছিলাম, দু-চারটে কথার পরই ঘুমিয়ে পড়লাম, তবে বন্ধুবিচ্ছেদের প্রবল সম্ভাবনা। অসম্ভব…হতেই পারে না…বাজে কথা বলছিস…। একই খাটে সদ্যপ্রাপ্ত পার্টনার—আর তুমি বাছা ঘুমিয়ে পড়লে। ঘুম আসা সম্ভব! বিছানায় বন্য জন্তু কিংবা বিষধর সাপ নিয়ে ঘুমিয়েছি বললে বিশ্বাস করতে পারি; কিন্তু ফুলশয্যার রাত ঘুমিয়ে কাবার—কদাচ বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এই অতিরিক্ত কৌতূহল থেকেই আড়ি পাতা। ঘরে যেই মাত্র খিল পড়ল, তখনই সারি সারি কান দরজায়। ঘরের প্রত্যেকটা শব্দ ছবি হয়ে ফুটে উঠছে মনশ্চক্ষে, প্রত্যেকটা ফিসফিসানির একাধিক বঙ্গানুবাদ। কান খাড়া, স্নায়ু টানটান। হাঁচি-কাশি চেপে আগত যৌবনা বিগত যৌবনাদের গুপ্তচরবৃত্তির সে এক নিষিদ্ধ উত্তেজনাভোগ।
নৌকা ফানুস পিঁপড়ে মানুষ
কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত অ্যাডভেনচারাস, শুধু আড়িতে মন ওঠে না—আগেভাবে আত্মগোপন করে থাকে খাটের নীচে, কথোপকথন আর ক্রিয়া-প্রক্রিয়া-বিক্রিয়া লাইভ দেখবে। এমনই এক আত্মগোপনকারীর বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এই কাজটি যারা করেছে, তারা জানে কত কঠিন। খাটের ঘুপচি তলা সাধারণত মশাদের মুক্তাঞ্চল। মশারা আবাধে হুল দেবে; কিন্তু মারার উপায় নেই। তা সেই আত্মগোপনকারী দীর্ঘক্ষণ ঘাড় গুঁজে প্রভূত শারীরিক ক্লেশ সহ্য করে খাটের তলায় লুকিয়ে। খিল পড়ল ঘরে। নিশ্বাস চেপে অপেক্ষা করতে লাগল সে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটা ছিল প্রেমজ বিয়ে। আলাপ-পরিচয়ের পর্ব অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছিল, আর সে দিন প্রকৃতই ক্লান্ত ছিল তারা। কেটারার পরিবেশিত খাবারের গুণাগুণ, সে-দিনের টেম্পারেচার, কিছু অভ্যাগতের উগ্র সাজ—ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে দু-একটা ভাসাভাসা চুম্বনের পর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল তারা। আত্মগোপনকারী ভাবল, কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর ক্লান্তি কেটে গেলে হয়তো কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যাবলি দেখতে পাবে। এই আশায় সারারাত খাটের নীচে লুকিয়ে রইল আর টাইটম্বুর হয়ে গেল এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতায়। একাধিক মিলন দৃশ্য দেখল সে। প্রথমে এক জোড়া মশা। ভারি অবাক হয়ে দেখল, শূন্যে উড়তে উড়তে প্রেমালিঙ্গনবদ্ধ হয়েছে মশক এবং মশকী। প্রকৃত অর্থেই আনন্দে ভেসে যাচ্ছে তারা। খাটের নীচে ছিল একটা স্ত্রী-মাকড়সা। সে প্রেমের জালে ফেলল পুং-মাকড়সাকে, তারপর জৈবিক চাহিদাটা মিটিয়েই খেয়ে ফেলল তাকে। একেই বোধ হয় বলে সর্বগ্রাসী প্রেম। এক টিকটিকি আবার টিকটিকিনির ওপর ঝাঁপিয়ে ঘাড় কামড়ে ধরল প্রথমে, তারপর মেতে উঠল মিলনে। টিকটিকি সোসাইটিতে থানা-পুলিশ নেই তাই; নচেৎ নিশ্চিত ভাবেই এটা রেপ কেস। ব্রুটাল রেপ। ছিল একটা ইঁদুর এবং ইঁদুরনী। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইঁদুরনীতে একাধিকবার উপগত হল ইঁদুর। আত্মগোপনকারী বুঝল, এই হল জোশ, এবং মনে মনে ঠিক করল এ বার থেকে ইঁদুরের খাদ্য তালিকার দিকে নজর দেবে সে।
সংকোচের বিহ্বলতা
এ বার গোপালের কথা। গোপাল খুব সুবোধ বালক। মাতৃভক্তও বটে। গোপাল কালক্রমে প্রাপ্তবয়স্ক হল। কিন্তু তার মাতৃভক্তি অটুট। মায়ের অনুমতি ছাড়া কিছু করে না। অফিস হাট-বাজার আত্মীয় বাড়ি এমনকী পাড়ার সেলুনে ক্ষৌরী করাতে গেলেও মাকে বলে যেত—মা আসছি। তার মা বলত, সাবধানে যেয়ো; দুগ্গা দুগ্গা! মা উপযুক্ত সময়ে বিয়ে দিল গোপালের। ফুলশয্যার রাতে গোপাল যথারীতি মাকে প্রণাম করে বলল, মা আসছি। মা-ও বলল, সাবধানে যেয়ো, দুগ্গা দুগ্গা! বউ জিগ্যেস করল, কী বললেন মা? মায়ের সাবধানবাণীর কথা বলল গোপাল। শুনে বউ বলল, মা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু মায়েদের দিনকাল তো আর নেই, আজ শুধু অসাবধান হওয়ার রাত। আমার কথা শুনে দেখো পস্তাবে না। গোপাল জীবনে প্রথমবাব মাতৃআদেশ অমান্য করেছিল এবং বলা বাহুল্য পস্তায়নি। প্রবল মাতৃভক্ত গোপাল রাত পোহাতেই বউ-ন্যাওটা।
খট্টাঙ্গ পুরোনো
প্রেমের জোয়ার আর মোবাইলের দাপটে ফুলশয্যার সেই মাধুর্য, অচেনার ওই আনন্দ অনেক ফিকে। নতুন খাট, কড়কড়ে বেডকভার, ফুলের ঘেরাটোপের মধ্যে দুজন প্রায় অচেনা নরনারী, মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা যাদের ‘হৃদয়ং’ আদান-প্রদান হয়েছে। ফুলশয্যার রাতেই আবিষ্কৃত হল, বধূর গলার কাছে ছোট্ট একটা তিল, কানের লতিটা কাটা, কিংবা স্বামীর ঊর্ধ্ববাহুতে একটা জরুল। স্বামী প্রথম জানল বউ তার কথায় কথায় ‘ভ্যাট’ বলে; স্ত্রী বুঝতে পারল স্বামী যে সব কথার শেষে ‘তবে!’ বলছে ওটা তার মুদ্রাদোষ। প্রেমের বিয়েতে ফুলশয্যার আগেই দেখা হয়ে গেছে সব তিল, আঁচিল, জরুল, জানা হয়ে গেছে পছন্দের গান, অপছন্দের রং, কার কোন খাবারে অ্যালার্জি, কোন ফিল্মস্টার কার প্রিয়, সে সচিন, কে ধোনি।
অ্যারেঞ্জড ম্যারেজেও কেউ কারো কাছে ব্র্যান্ড নিউ নেই। তার আগেই একসঙ্গে নাটক-সিনেমা দেখা হয়েছে, খাওয়াদাওয়া হয়েছে রেস্তোরাঁয়। ফোনাফোনি করেই জানা হয়ে গেছে তাপস বড় জ্যাঠাইমাকে বড়মণি বলে, দেবযানীদের কাজের মাসির একটু হাতটান আছে।
আমার বন্ধু গৌরবের কথা বলি। দীর্ঘ পাঁচ বছরের প্রেম পারমিতার সঙ্গে। দুজনের পরিবার একসঙ্গে দিঘায় পর্যন্ত গেছে। গৌরব-পারমিতা সমুদ্রস্নান করেছে, হাত ধরাধরি করে। পুজোতে নতুন পোশাক আদানপ্রদান হয়, দশমীতে দু’জনেই হবু শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম সারতে যায়। গৌরব পারমিতার ‘ডেট’ জানে, পারমিতা জানে গৌরবের অন্তর্বাসের মাপ। পারষ্পরিক সততা এবং বিশ্বস্ততার জন্যে সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়াল। ফুলশয্যার রাতে যখন খাট সাজাচ্ছি, গৌরব বলল, বৃথা অপচয়।
আমি বললাম, অপচয় কেন; এই রাত তো জীবনে এক বারই আসে।
গৌরব মাথা চুলকে বলল, দেখ ভাই তোরা সবই জানিস, ভণ্ডামি করে লাভ নেই। এই ঘরে এই খাটেই অনেক আগেই আমাদের শয্যা পাতা হয়ে গেছে। যতই সাজাস, এই খাট নতুন কিছু দিতে পারবে না আমাদের। আমি তাই একটা প্ল্যান করেছি।
কী? খুব আগ্রহভরে জানতে চাইলাম আমি।
ঠিক করেছি, আজ খাটের তলায় শোব; কিছুটা অন্তত নতুনত্ব আসবে তাতে। ফুলটুল যদি ছড়াতেই হয়, ওখানে ছড়া।
