অ্যাডজাস্টেবল রাধাকৃষ্ণ এবং ওয়াটার অব ইন্ডিয়া – উল্লাস মল্লিক

অ্যাডজাস্টেবল রাধাকৃষ্ণ এবং ওয়াটার অব ইন্ডিয়া

তখন আমাদের টিভি-কম্পিউটার-ভিডিয়ো গেমস-মোবাইল ফোন ছিল না। তাগড়াই সিলেবাস বা উত্তুঙ্গ কেরিয়ারের আকাঙ্ক্ষাও নয়। জ্বর-সর্দি-টিটেনাসের আতঙ্ক, ক্যালরি ঘাটতির ভ্রূকুটি, কিচ্ছু নয়। কে যেন আমাদের মাথায় গুঁজে দিয়েছিল পুঞ্জপুঞ্জ মেঘ। পৃথিবীটা কোথাও একটু অন্যরকম ছিল। অন্য রকম মানে, খেলামদড়ির হাঁড়িকুড়ি ছিল, মাটির পুতুল ছিল, প্লাসটিকের বাঘ-ভল্লুক ছিল, পাড়ার জ্যাঠামশাইয়ের শাসন করার রাইট ছিল। মাস্টারমশাইরা মারধর করলে কেস খেতেন না, অতিপ্রাচীন ঠাকুমা, ফোকলা গালে চুমু খেয়ে বলতেন, বেঁচে থাক বাবা, দীর্ঘজীবী হও।

তখন শীতকালে ঠান্ডা পড়ত, বাজারে সস্তায় পাওয়া যেত চুনো মাছ, আর মেয়েরা সাইকেল চালালে লোকজন একটু বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাত।

তুচ্ছ একটা মাটির পুতুল ভেঙে গেলে হাপুস কান্নায় ভাসিয়ে দিতাম সারাদিন।

রাখীর দু-দুটো পুতুলের মাথা ভেঙে গেল সে বার। আর হবি তো হ, এ দুর্ঘটনা ঝুলনের ঠিক আগের দিন। কী হবে এবার, সবার মাথায় হাত! নবদের বারান্দায় যে ঝুলন করতাম, দুদিকে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকত তারা। একটা মেয়ে পুতুল, শাড়ি-গয়না পরা; অন্যটা ধুতি-পাঞ্জাবি আর গলায় উড়ুনি দেওয়া ছেলে। আমাদের ঝুলনের অ্যাসেট। পূর্ণিমা জ্যেঠি, যে কি না সব কিছুতে নাক কোঁচকায়, সে পর্যন্ত বলেছিল, বাহ, কী সুন্দর পুতুল রে রাখী, কেনা নয় নিশ্চয়ই, কে দিয়েছে রে? তা পুতুল ভেঙে যেতে সবার মন খারাপ, বর্ষা তো কেঁদেই ফেলল। বর্ষা অবশ্য সবেতেই কাঁদে, মশা কামড়ালেও—ওয়াটার অব ইন্ডিয়া। ও কাঁদবে জানা কথা, কিন্তু এটা রিয়েল সমস্যা; সবারই তাই কান্না পাচ্ছে। গোপাল আমাদের বিপত্তারণ; সেই বয়েসেই তুখোড় হিন্দি বলে, প্রচুর বুদ্ধি, বড়রা বলে কুবুদ্ধি। সন্তু জ্যাঠা বলে—প্যাঁচ, মাথায় পেরেক ঠুকলে স্ক্রু হয়ে বেরিয়ে আসবে। গোপাল এসে বলল, নো চিন্তা অর্ঘ, তোর যে রেলগাড়ি ছিল একটা? অর্ঘ বলল, কিন্তু একটা চাকা নেই! গোপাল বলল, নো চিন্তা ওতেই হবে!

সে বার প্রথম ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট হল নবদের বারান্দায়। দুই সুবেশ নরনারী চাকাভাঙা খোঁড়া রেলে কাটা পড়ল। একেবারে বাম্পার হিট। রাধাকাকা শুধু বলল, ডেড বডিগুলো অমন হাতজোড় করে আছে কেন রে? গোপাল বলল, মৃত্যুর আগে যিশুর মতো সবাইকে ক্ষমা করে যাচ্ছে ওরা।

রাধাকৃষ্ণ দুলত দোলনায়। চুমকি বসানো, জরির দোলনা। প্রতিবারই একটা দুটো করে আইটেম বাড়ছিল। পাহাড়-বনজঙ্গল-ঝরনা-ফোয়ারা-বাঘ-সিংহ-হাতি-গণ্ডার-মাথা নাড়া বুড়ো। রাধাকৃষ্ণ ভীষণ অ্যাডজাস্টেবল। হাসিমুখে সবাইকে জায়গা করে দিয়ে, সরতে সরতে একেবারে কোণে, সেখানেই দোল খেতে খেতে আড়বাঁশি বাজাত একমনে। ক’দিন সকাল সন্ধে সেই পাহাড়ে-বনে-জঙ্গলে হারিয়ে যেতাম আমরা।

বিশু কোনওদিন পাহাড় দেখেনি। হাওড়া ব্রিজও নয়। ওর বাবা তো শ্রীগুরু ভাণ্ডারে খাতা লেখার কাজ করে। কিন্তু কাপড়ে কাদা মাখিয়ে রং লাগিয়ে কঞ্চি-ঠেকনা দিয়ে বিশু পাহাড় বানাত চমৎকার। ডিটো আসল পাহাড়, গহীন জঙ্গল, ঝিরঝিরে ঝরনা, রহস্যময় গুহা, তার মধ্যে বাঘ-সিংহ-হাতি-গন্ডার-ভল্লুক। ফুটো করা টিনের কৌটোয় জ্যান্ত ঝিঁঝি পোকা। তীব্র ঝিল্লিবর আরও ছমছমে করে তুলত পরিবেশ। রুইদাস সামন্ত রেলের ক্লার্ক, কিন্তু ছেলে আমেরিকায় থাকে। ভাঁজ করা ইংরিজি কাগজ হাতে নিয়ে সর্বত্র ঘোরে আর কথায় কথায় আমেরিকা তোলে। কান ঝালাপালা! আবহাওয়ার কথা উঠলে রুইদাস কাকা বলে, এ বার আমেরিকায় বৃষ্টি হচ্ছে খুব; জিনিস অগ্নিমূল্য হলে বলে, ওখানে কিন্তু এ সব কালোবাজারি ইম্পসিবল! পাড়ার ছেলেরা নাম দিয়েছে আমেরিকান রুই। আমাদের ঝুলন দেখে বলল, এটা কী করলি, বাঘ-সিংহ-হাতি-গণ্ডার এভাবে এক জায়গায় থাকে নাকি! বিশু বলল, আমেরিকায় থাকে কিন্তু। একটু জোরেই বলেছিল, কারণ তারপর কিছু দিনের জন্যে মার্কিন অত্যেচার থেকে রেহাই পেয়েছিল পাড়ার লোক।

সদা হাস্যময় ঘাড়-নাড়া বুড়োর একটা হাত বিপুল ভুঁড়িতে। মুখে ঝুপ্পুস দাঁড়ি-গোঁফ। সান্তাক্লজ টাইপের দেখতে। ঘাড়ের সুতো ক্যামোফ্লেজ করে চলে গিয়েছে আড়ালে। সেখানে বসে টান দিলেই খুব বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ত বুড়ো। একটু রেষারেষি হত সুতো টানা নিয়ে। সূক্ষ্ম টান চাই; সুতোয় জোর পড়লেই বুড়ো চিৎপটাং। প্রত্যেকেই বলতাম, দাঁড়া, দাঁড়া, তুই পারবি না, ঠিক ফেলে দিবি।

এই বৃদ্ধের কল্যাণেই এক দিন জুটে গেল জীবনে প্রথম নিষিদ্ধ ফল। সে-দিন দুপুরে আমি একা। আড়ালে বসে মনের সুখে সুতো টানছি, কোনও কম্পিটিটর নেই; নবর বোন ফুলি এল। বসল আমার পাশে। লাল ফিতে বাঁধা ডবল বিনুনির ফুলিকে সেদিন লাভলি দেখাচ্ছিল। ফুলিকে সুতো টানতে দিলাম। ফুলি জিগ্যেস করল, রাধা কৃষ্ণের কে হয় রে, বাপিদা?

তখন সবে গলা ভাঙছে আমার। উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখতে মন টানে, হিন্দি গানে, ‘পেয়ার’ ‘মহব্বত’ গুরুজনদের সামনে এডিট করে দিই, ‘ববি’র পোস্টারে বিকিনি-সম্বল ডিম্পলকে লুকিয়ে দেখি। শুকনো কুমড়ো ডাঁটার সিগারেট টেনে রিং ছাড়ার চেষ্টা করি। বিকেলে খেলার পর গোল হয়ে আলোচনা করি তাপসদা-চন্দ্রাদিকে নিয়ে। বললুম, রাধা কৃষ্ণের মধ্যে ‘ইন্টুমিন্টু’ আছে। শব্দটা ল্যাংড়া চানুর থেকে আমার ভোকাবুলারিতে সদ্য এসেছে। চানুর এক পায়ে পোলিয়ো; খুঁড়িয়ে হাঁটে, কিন্তু আশ্চর্য গেজেট ও। রাজ্যের যত খবর টাট্টু ঘোড়ার মতো লাফিয়ে চলে আসে চানুর কাছে। ও-ই একদিন বলেছিল তাপসদা আর চন্দ্রাদির মধ্যে ইন্টুমিন্টু কেস আছে। সুযোগ পেয়ে আমিও লাগিয়ে দিলাম শব্দখানা।

কিন্তু ফুলি বড় সরল মেয়ে; ইন্টুমিন্টু কী, জানেই না! বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হল ওকে। ভারি বিস্ময়ের সঙ্গে সব শুনে বলল, তুই আমাকে বিয়ে করবি?

ফুলি সুন্দরী, নব বন্ধু আর ফুলির মা পায়েসটা রাঁধে চমৎকার—সব দিক বিবেচনা করে রাজি হয়ে গেলাম।

ফুলিকে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে নিয়েছিলাম সে-দিন। ঘাম, নারকোল তেল আর ট্যালকম পাউডারের মিশেল দেওয়া অদ্ভুত একটা গন্ধ পেয়েছিলাম।

আমার ইন্টুমিন্টু হয়েছে, ভেবে ভেতরে ভেতরে কিছু দিন বেশ উত্তেজিত ছিলাম। যদিও কেউ বুঝতে পারেনি, শুধু ফুলি একটু বেশি শাসন ফলাত আমার ওপর, আর কথায় কথায় বলত, হেঁড়ে মাথা, বোকারাম।

লাল্টুর বাবা ইঞ্জিনিয়ার; অঙ্কে কখনও সাতানব্বইয়ের কম পায়নি লাল্টু। বিশুর কাজে বিস্তর ত্রুটি বের করতে সে,—পাহাড়ের চূড়াটা ঠিক হয়নি, ঝরনার জল অত সোজা পড়ে না, গুহা আরও অন্ধকার হবে, ইত্যাদি। লাল্টু এক বার বলল, একটা জিনিস বানাব। বেবিফুডের কৌটোর রাংতা জ্যামিতি বকসের চাঁদার মাপে কেটে ঝুলিয়ে দিল ওপর থেকে। ওটা হল চাঁদ। কিন্তু চাঁদ বড় চঞ্চল, একটু হাওয়াতেই দোল খায়, আর ঘুরে যায় বাঁইবাঁই করে। তাই সই, একটা আইটেম তো বাড়ল। ঘুরে ঘুরে সাবাইকে জ্যোৎস্না বিলোতে লাগল সে।

শুভর ছোট মেসোমশাই মিলিটারি। মিলিটারি মানে পুলিশের যম; মানে, ভয়ংকর ব্যাপার, দারুণ চেহারা, সাঙ্ঘাতিক রাগী। অরণ্যদেব, বাঁটুল-দি-গ্রেট, নকশাল আর হেড স্যারের মিলিত যোগফলের চাইতেও বেশি। গায়ে গুলি লাগলে ছিটকে যায়, যুদ্ধ করতে করতে খিদে পেলে সাপ বা বাঘ-সিংহ মেরে খেয়ে নেয়। মেসোমশাইয়ের ভাইকে এক বার পুলিশ ধরতে এসেছিল। মেসোমশাই চুপচাপ ঘরের মধ্যে বসে হাতপাখায় বাতাস খাচ্ছে, দারোগা যে-ই হাতকড়া পরাতে যাবে, অমনি সামনে এসে দাঁড়ল। হাতকড়া-ফড়া ছুড়ে ফেলে দিয়ে দারোগা সোজা মেসোমশাইয়ের পায়ে। পাঁচশো বার ওঠবস করে তবে রেহাই। এই কাহিনি যত বার শুনতাম দম বন্ধ হয়ে আসত। শুভ বলতও চমৎকার, চোখের সামনে দেখা দৃশ্য তো! কেবল ওঠবসটা গুলিয়ে ফেলত। কখনও বলত পাঁচশো, কখনও হাজার, কখনও আবার পাঁচ হাজার।

শুভ এক বার ইন্ডিয়ান আর্মি নামিয়ে দিল নবদের বারান্দায়। পুকুর থেকে পানা তুলে সুবজ ম্যাপ বানাল ভারতের। পূর্ব ভারতের জিগজ্যাগ বর্ডারটা ঠিক জুতের হল না, গুজরাতের খাঁজটাও কেমন গোল মতো হয়ে গেল। তবে প্রচুর সেনা নামিয়ে দিল ভারত জুড়ে। ম্যাপের বাইরে কিছু পুতুল পিছন ফিরে দাঁড়ানো। ওগুলো পাকিস্তানি সেনা। পালাচ্ছে। সে কী উত্তেজনা আমাদের, মনে হচ্ছে এক্ষুনি গিয়ে দুটো গুলি ছুড়ে আসি!

কিন্তু দু’দিনের বেশি স্থায়ী হল না লড়াইটা। তৃতীয় দিনই পানা পচে ভয়ঙ্কর গন্ধ। নবর বাবা টান মেরে ফেলে দিল সব। এতগুলো বীর সৈনিক মিলেও কিছু করতে পারল না।

আমার হেঁড়ে মাথা ঘুরে গেল অন্বেষাকে দেখে। আমি অবশ্য পিউ বলতাম। সৌরভের মেজ মামার মেয়ে, কলকাতায় থাকে। অন্বেষা ইস্কুলের নাম। সাংঘাতিক কঠিন ইস্কুল ওদের; টাই না বেঁধে গেলেই পানিশমেন্ট। বাংলা বললেও। পিউ কী ফরসা, মেমেদের মতো, ছেলেদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল। এত সুন্দর মেয়েকে কী বলে যে পানিশমেন্ট দেয়! পিউ দিদিমণিদের ম্যাম, চান করাকে স্নান আর তরকারির কাইকে গ্রেভি বলে। ঝুলন, ছাগলছানা, আমড়া গাছ, ফড়িং—যা কিছু দেখছে ভারি অবাক হয়ে যাচ্ছে। কেঁচো দেখে ‘ম্যাগো’ বলছে। ঘেন্নাও যে অত সুন্দর হতে পারে, জানা ছিল না। পিউয়ের সঙ্গে ক’দিন সেঁটে গেলাম। হেলে সাপের লেজ ধরে দেখালাম। ভীষণ ভয় পেয়ে গেল ও, অমন বিপজ্জনক কাজ করতে বার বার নিষেধও করল। মাঝখান থেকে গোঁসা খেয়ে গেল ফুলি। প্রথমে করুণ চোখে তাকিয়ে দেখল, তারপর সেই চোখেই আগুন। এক দিন এক্কা দোক্কা খেলা নিয়ে পিউয়ের সঙ্গে লেগে গেল ফুলির। খুব তুচ্ছ ব্যাপার, মধ্যস্থতা করতে গিয়ে বিকট ধাতানি খেলাম ফুলির কাছে। ও বোধ হয় নারীসুলভ ইনটিউশন দিয়ে বুঝেছিল, আমার বিচার পক্ষপাতদুষ্ট হতে বাধ্য। আমি তাড়াতাড়ি সেই গোপন জায়গাটায় লুকিয়ে বুড়োর ঘাড় নাড়তে লাগলাম। প্রত্যাশা মতোই জয় হল ফুলির। শুনতে পেলাম, পিউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ইংরিজিতে কাঁদছে।

সে বছর আমরা-ওরা হয়ে গেল ঝুলন। শুরু হয়েছিল শ্যাম থাপা আর বিদেশ বসু দিয়ে। লাল্টু নব চানু শ্যাম থ্যাপা। শ্যাম থাপা মানে ব্যাকভলি। এমন সাংঘাতিক ক্রেজ যে, তখন সোজা বলও ব্যাকভলি করতে গিয়ে বিস্তর গোল মিস করছে ছেলেপুলেরা। বিশু শুভ বুলটাই বলল, বিদেশ বসু শ্যাম থাপাকে খেলা শেখাবে। তোড়ের মাথায়, শুভ চানুকে ল্যাড়া বলল। চানু ছড়া কাটল, দী-পঙ্কর / লে-পঙ্কর/ আলু ভাতে / তোল ছাদে। শুভর বাবার নাম অতীশ।

ব্যস, ঝুলনও দু-টুকরো! ফুটবলে আমার ইন্টারেস্ট কম, আমার গুরু গাওস্কর (পরে অবশ্য দল বদল করে কপিল হয়ে যাই), কিন্তু ছোট কাকার নাম বিদেশ বলে শুভরা আমায় ডেকেছিল। কিন্তু ফুলির কথাটা ভেবে আমি শ্যাম থ্যাপার দিকে ঝুঁকে পড়লাম।

ওরা ঝুলন করল বুলটাইদের উঠোনে। তারপর সে কী টেনশান। বিট দিতে হবে ওদের। সবচেয়ে বড় সমস্যা বিশু ওই টিমে। ওর মাথা তো নয়; আস্ত একটা শিল্পনগরী, কত কী যে ম্যানুফ্যাকচার হয় সেখানে। নব ওর নতুন ‘ইয়ো-ইয়ো’টার টোপ দিয়ে ভাঙিয়ে আনার চেষ্টা করল বিশুকে; কিন্তু বিশু তার সঙ্গে বাইনোকুলারটাও দাবি করে বসল। দর কষাকষিতে পোষাল না। লাল্টু বলল, বেশি তেল দিস না, ছেড়ে দে। আমার ওপর ভরসা রাখ; বিশু কুলকিনারা পাবে না।

মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ, তার ওপর বিশুকেও পাওয়া গেল না, তাই লাল্টুই দায়িত্ব পেল। চার্জ হাতে পেয়েই অসম্ভব গম্ভীর হয়ে গেল লাল্টু। বলল, বাবার আইডিয়া নিচ্ছি, বাবাকে তো ওরা চেনে না।

ঝুলনের আগের দিন চানুর চরবৃত্তিতে জানতে পারলাম, ওরা ধানখেত করছে। একটু ঘাবড়ে গেলাম। ধানখেত। সে তো হেবি নতুন জিনিস হবে। বুলটাই-এর একটা আতসকাচ অনেক দিন আমার কাছে ছিল; ফেরত দেওয়ার ছুতো করে দুপুরবেলা গেলাম। তাক লেগে গেল আমার। ডিটো ধানখেত। সবুজ মাঠে কাজ করছে চাষি—গাছ পুঁতছে, ধান কাটছে, মাথায় করে ফসল নিয়ে যাচ্ছে। চোখে-মুখে তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে যতটা দেখা সম্ভব দেখলাম। বলতে কী, দল বদলের একটা দুরন্ত ইচ্ছে ফের চাগাড় দিয়ে উঠল। লাল্টুর মুরোদ নেই একে বিট দেওয়ার, বুঝতে পারছিলাম।

লাল্টু আরও গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, ওটা আমার মাথায় ছিল, ওরা আইডিয়াটা চুরি করে নিয়েছে। নব বলল, মুলো-কপি-ঢ্যাঁড়শ, যা-ই হোক কিছু একটা খেত কর; এ ভাবে দাঁড়িয়ে হারব নাকি!

খেত নয়, লাল্টু ব্রিজ বানাল। পাটকাঠি দিয়ে। খুব খারাপ বানায়নি, দুদিকের রেলিং একটু উঁচুনীচু হল, মধ্যিখানটা বেঁকে থাকল; কিন্তু দেখে বোঝা যাচ্ছে—ব্রিজ। তা হলেই হবে। আমরা ফের চাঙ্গা। ধানখেত তো চার দিকে কত। কিন্তু ব্রিজ ক’টা?

নব পিচবোর্ডে—আলতা দিয়ে লিখে দিল—আদি ঝুলন। আমাদের কোনও শাখা নেই।

ওরা পালটা লিখল—আসল ঝুলন। নকল হইতে সাবধান।

আদিত্যদা ডাক্তারি পড়তে কলকাতায় গিয়েছিল। প্রথম যে দিন হস্টেল থেকে এল, একেবারে অন্য মানুষ। কথা ভীষণ কম বলে, চুলে তেল মাখে না। হাতে সব সময় ঘড়ি, জামা ইন করা, আর প্যান্ট এত টাইট যে বড়দের প্রণাম করার সময় চোখ-মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। ভারি অবাক হয়ে দেখলাম, জুতো না খুলেই টপাটপ প্রণাম করছে আদিত্যদা।

গম্ভীর মুখে ঝুলন দেখল আদিত্যদা। তারপর একদম বড়দের মতো বলল, বাহ বেশ।

লাল্টু তড়বড় করে বলে উঠল, তাও তো তেমন সময় পায়নি, না হলে দেখতে…!

কোথাকার ব্রিজ রে এটা?

টেমস নদীর।

হুম। আদিত্যদা ঘাড় নেড়ে বলল, ব্রিজ এত ফাঁকা কেন, একটাও গাড়ি নেই?

আমরা সবাই চুপ। তাই তো, এটা ভেবে দেখা হয়নি। এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি। গোপাল একগাল হেসে বলল, বুঝলে না, বাংলা বনধ হচ্ছে।

সে বারই প্রথম মাউথ অরগ্যান দেখলাম। আদিত্যদা দেখাল। কলকাতায় ও মাউথ অরগ্যান শেখে। বাদ্যযন্ত্র বলতে আমরা বুঝি ঢাক-ঢোল-কাঁসি, হারমোনিয়াম-তবলা-বাঁশি। কিন্তু ওই ছোট্ট স্মার্ট ঝকঝকে সুরযন্ত্র দেখে বংশীবাদনরত কৃষ্ণকে প্রচণ্ড ব্যাকডেটেড মনে হল। মনে মনে কৃষ্ণকে রাধার পাশ থেকে সরিয়ে দিয়ে আদিত্যদাকে বসালাম এবং স্পষ্ট দেখলাম, আরও উজ্জল হয়ে উঠল রাধার মুখ।

সবাই খুব করে আদিত্যদাকে বলছিল বাজাতে। ও কিছুতেই রাজি নয়। শেষে নবর মা বলতে বাজাল।

কেমন বাজিয়েছিল, এত দিন পর আর মনে নেই, তবে খুব দরদ দিয়ে বাজিয়েছিল মনে আছে। চোখ দুটো বোজা ছিল আদিত্যদার আর নবদের কুকুরটা ডাকছিল খুব।

পরের বছরই আদি আর আসল ঝুলন ফের মিলেমিশে গেল। সেবার এত আইটেম যে নবদের বারান্দায় কুলোচ্ছে না। লাল্টু বানাল ব্রিজ আর কারখানা, বিশু ধানখেত। কৃষি আর শিল্পের মেলবন্ধন বহু দিন আগেই ঘটিয়েছিলাম আমরা।

নবদের বারান্দায় এখন আর ঝুলন হয় না। হবে কী করে, বারান্দাটাই তো নেই। নবদের বাড়ি ভেঙে মাথা উঁচু মস্ত ফ্ল্যাট উঠেছে। নবরা পাঁচ তলায় থাকে। ফুলির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। গোপাল মুদির দোকান দিয়েছে। বিশু ইঞ্জিনিয়ার, দিল্লিতে থাকে। লাল্টু কী করে, কোথায় থাকে, ঠিক জানি না। বুলটাই বিয়ে-থা করেনি, মাথায় মস্ত টাক, ইদানীং বাহারি কুকুর নিয়ে মর্নিং ওয়াক করে। দেখা হয় মাঝে-মাঝে।

কখনও গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। চাঁদের আলোয় শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যময় পাহাড় দেখতে পাই। এঁকে-বেঁকে নামছে জ্যোৎস্না-গোলা ঝরনার জল। ঝমঝম করে ব্রিজ পেরোচ্ছে রেলগাড়ি। আবহমান কালের চাষি কৃষিকাজ করছে দিগন্ত ছোঁয়া মাঠে।

ধীরে ধীরে ফের ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাই। একে একে গোপাল নব ফুলি বিশুরা আসে। আমি ফুলির হাত ধরি, নব ধরে আমার হাত, নবর হাত ধরে গোপাল, গোপালের বুলটাই…। এলাডিং বেলাডিং-এর মতো লম্বা হয়ে বাড়তে থাকে লাইনটা। হাত ধরাধরি করে পৌঁছে যাই নবদের খিলান দেওয়া সেই প্রশস্ত বারান্দায়। সাদা গোঁফদাড়ির বুড়ো ওখানে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। মাথা নেড়ে নেড়ে বলে, ঠিক, ঠিক, ঠিক। সব ঠিক আছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *