একটি ঘিয়ে ভাজা ম্যানিফেস্টো
আমি একজন অজ্ঞাতকুলশীল নেড়ি। ওরফে ফেতি। ওরফে ঘিয়ে ভাজা। আমরা ভারতের পুরোনো বাসিন্দা। আমরা অতি নগণ্য, কিন্তু সংখ্যায় অগণ্য এবং সঙ্গত কারণেই সর্বত্র বিরাজমান। অলিতে-গলিতে, মাঠে-ময়দানে, শ্মশানে-দেবস্থানে, অস্থানে-কুস্থানে। এবং মহাপ্রস্থানে। আমার এক পুর্বপুরুষ পাণ্ডবদের গাইড হয়েছিল দ্বাপর যুগে। কিন্তু গাইডদের কে আর মনে রাখে! কিছু বকশিস আর শুকনো থ্যাঙ্কস—ব্যস, কর্তব্য শেষ। পাণ্ডবরা সর্বত্র পুজিত, কিন্তু আমি অদ্যাবধি কোনও মন্দির পেলুম না। তেত্রিশ কোটি দেবতা—কেউ বাহনও করল না। বাংলা কবিতায়, যদিও বিদেশি ঠাকুর ফেলে আমার আরাধনার বিধান আছে। তবু! কারণ, বাঙালি দিস্তে দিস্তে কাব্যপঙক্তি প্রসব করে, বাসে-ট্রামে-টয়লেটে-গ্রিটিংস কার্ডে উৎকীর্ণ করে, সুযোগমাফিক স্কুল-কলেজ কালচার কফি হাউসে বমন করে; কদাপি কিন্তু হজম করে না।
আদর-কদর যদি বলো, সে-সব আমার বিলিতি ভাই সকলের একচেটিয়া। অ্যালসেসিয়ান ডোবারম্যান বকসার ল্যাব্রেডর গোল্ডেন রিট্রিভার—ইত্যাদি প্রভৃতি কুলীনদের। যত অ্যাটেনশন এবং আদিখ্যেতা ওদের জন্যে। ওদের নিয়েই বিউটি কনটেস্ট। ওরা র্যাম্পে হেঁটে, নাচন-কোঁদন করে মেডেল জেতে। ফলত, কর্তার লাই, গিন্নির আদর এবং যুবতী কন্যার চুমু পায়। বড় সুখের জীবন তাদের। রোটি কাপড়া অউর মোকান তাদের বার্থ রাইট। সাবান মেখে চান, চিরুনিতে কেশবিন্যাস আর নরম গদিতে শয়ন। মনিবের গাড়ি চেপে হাওয়া খায়, রুপোর চেন গলায় দিয়ে পটি করতে বেরোয়। আর আমরা দূর থেকে দেখি জুলজুল করে।
অথচ, আমাদের খিদে-তেষ্টা, শখ-আহ্লাদ, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, সব তাদের মতো। সুখাদ্য দেখলে আমাদের আহ্লাদ হয়, আহ্লাদ হলে লেজ নড়ে। এমনকী ল্যাম্প পোস্ট দেখলে পশ্চাতের ঠ্যাং তুলে জল সিঞ্চনের ইচ্ছেটাও। তবু কী বিপুল বৈষম্য! মাথার ওপর একটু আচ্ছাদনের জন্যে মাথা কুটে মরতে হয়। বিনু ময়রা খেদিয়ে দিলে পঞ্চার চায়ের দোকানে যাই। সেখানে হুড়ো খেলে গণেশ সামন্তর উঠোন। সামন্তগিন্নি গরম জল ছুড়লে হট্টমন্দির। অভিজাত শ্রেণির পাতে অঢেল প্রাোটিন-ভিটামিন। আর এতটুকু ফ্যানভাতের সংস্থান করতে কালঘাম ছুটে যায় আমাদের। আমাদের কি বি পি এল কার্ড দেওয়া যায় না? মৃগ থেকে শাখামৃগ, বাঘ থেকে আধবাঘা, সাপ-ব্যাঙ, আদুর-বাদুড়, সবার জন্যে সংরক্ষণ, বঞ্চিত কেবল আমরা।
তাদের ডাক ঘেউ ঘেউ; আমাদের কেঁউ কেঁউ। তফাত বলতে এটুকুই। আমাদের কেউ ট্রেনিং দেয়নি; তাই, কোনও ডিপ্লামা-ডিগ্রি, পেডিগ্রি নেই আমাদের। কিন্তু কাজকম্মে কি আমরা কম কিছু? রাতবিরেতে উটকো লোক দেখলে চেঁচাই, মাতালের পেছনে লাগি, হ্যাংলা বেড়ালকে পাড়াছাড়া করি। আমাদের সততা বুদ্ধিমত্তা সংযম (ভাদ্র মাস বাদে) সব অনুকরণীয়। আধপেটা খেয়ে থাকি, কিন্তু কদাচিৎ কারও হেঁশেলে ঢুকি। যদি কেউ কোনও দিন এক টুকরো পোড়া রুটি দেয়, চিরকৃতজ্ঞ থাকি তার কাছে।
আর মার্জার শ্রেণি! আদুরে বিল্লি। ওরা জাত চোর, বজ্জাত এবং বেইমান। যতই খানাপিনা দাও, সুযোগ পেলেই দুধের কড়ায় মুখ দেবে, হাতিয়ে নেবে মাছের টুকরো। বাড়িতে চোর ঢুকলে পাঁচিলে উঠে রঙ্গ দেখবে। অন্নদাতা যদি অসাবধানে লেজে পা দেয় তো সঙ্গে সঙ্গে—ফ্যাস! তিল পরিমাণ কৃতজ্ঞতা নেই।
আমাদের বিরুদ্ধে যুগে যুগে চক্রান্ত। শিশু পাঠ্যপুস্তকে লেখা, আমরা অসৎ এবং লোভী। মাংসের দোকান থেকে মাংসখণ্ড চুরি করি এবং অতিরিক্ত লোভের বসে সেই মাংস হাতছাড়া করি। কিন্তু ঘটনা আদপেই তেমন নয়। যৎসামান্য যুক্তিবোধ প্রয়োগ করলেই গল্পের অসারতা প্রমাণিত হবে। প্রথমত, নেড়িটি যখন সেতু পেরোচ্ছিল, ধরে নেওয়া যেতেই পারে, তখন সে কসাইয়ের নাগালের বাইরে। নতুবা, পশ্চাতে শমন নিয়ে কেউ তৃতীয় কাউকে আক্রমণের ঝুঁকি নেবে না। তা হলে দাঁড়াল কী? না, একটা ক্ষুধার্ত নেড়ি কুকুর—ক্ষুধার্ত, কারণ তাকে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে মাংসখণ্ড হাতানোর জন্যে, তদুপরি দীর্ঘ পথ পড়িমড়ি দৌড়ে খিদেটাও চনচনে, এমতাবস্থায় নদীর ধারে এসেই সে গোগ্রাসে মাংস ভক্ষণ করবে। তারপর নদীর জল পান করে ঠান্ডা হয়ে যেখানে খুশি যাবে। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে মাংস নিয়েই সে সংকীর্ণ সাঁকো (পাঠ্য বইগুলোতে, তেমনই আঁকা থাকে) পেরোচ্ছে, যা নিতান্তই অবাস্তব। বোঝাই যায়, গল্পটি আদ্যন্ত অভিসন্ধিমূলক এবং গল্পকার অতিশয় দুর্বল এবং অপরিণত। সম্ভবত জোরাল ব্যাকিং-এর জোরে গল্পটি মুদ্রিত করেছে।
অবিচার যুগে যুগে। বিশ্বাসভঙ্গ করলে লোকে হন্তারকের নামে কুকুর পোষে। কী অন্যায়! আলাঙ্গুলমস্তক বিশ্বাসী প্রাণী আমরা। প্রভুর কথায় উঠি-বসি, প্রভু লেলিয়ে দিলে ঝাঁপিয়ে পড়ি জীবনমৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে। এ দিকে মানবজাতির লোভের দৃষ্টান্ত দিস্তে দিস্তে। আজ দুনিয়াটার কী দশা! চালে কাঁকর, দুধে জল, জলে বিষ, তেলে ভেজাল। নোটে জাল, ভোটে রিগিং, জোটে খেয়োখেয়ি। ভ্রূণহত্যা, বৃদ্ধাশ্রম, সীমান্তযুদ্ধ। প্রেমে পুলিশি হস্তক্ষেপ, ক্রিকেট ম্যাচ ফিক্সিং। সব বললে খানকতক মহাভারত হয়ে যায়।
জানি, বলবে ছাপোষা মানুষ সব, তাই চাঁদির বাদ্যি মধুর লাগে। তাই পরীক্ষায় নকল করে চাকরি পায়, চাকরি পেয়ে ঘুষ খায়। তারপর সান্ধ্য তাসের আড্ডায় ভারি গলায় নীতিকথা বেটে প্রায়শ্চিত্ত করে।
কিন্তু ধনী লোকসকল! ভূয়োদর্শী কবি দেখিয়েছেন রাজাধিরাজ হাতিয়ে নিচ্ছে গরিবের দু’বিঘে জমি। হায় কবি, নোবেল পেতে পারো, মানবচরিত্রের সমুদ্রতীরে তুমি বালুকণা আহরণকারী মাত্র। অধুনা বাদশাহ দু-বিঘে নয়, দু-ছটাক ভূমিখণ্ড গাপ করার জন্যেও লেলিয়ে দেয় মোসাহেব ভৃত্য।
আমার কোনও কোনও দেশওয়ালি ভাই ভাগ্য করে জন্মায়। কোনও মহান মানবের নজরে পড়ে হিল্লে হয়ে যায় তার। ঠিক রাজার হাল হয়তো নয়, তবে পেটের ভাত, মাথা-গোঁজার ঠাঁই, গায়ে পোকা-টোকা হলে হলুদ জল জুটে যায়। কিন্তু সেসব নেহাতই দৈবাৎ ঘটনা। গরিবের লটারি জেতার মতো।
আমরা, মোটের ওপর অত্যাচারিত দিকে দিকে। রাস্তাঘাটে ঘুরছি, কারও কোনও পাকা ধানে মই দিইনি, তবুও ছেলেছোকরার দল হাতের টিপ পরীক্ষা করতে আমাদের টার্গেট করে। আমাদের কেঁউ কেঁউ রব তাদের মনে পুলুক জাগায়। চালচুলোহীন আমরা, ইন্দ্রিয়ের তাড়নায় বাধ্য হয়ে ওপেন এয়ারে মিলিত হই। বীর মানব তখন অকুস্থলে নুনের ছিটে দিয়ে আমোদ করে। আমাদের দুধের শিশু—তারাও বড় অভাগা। শেয়াল তাদের ভোজে লাগায়, গাড়ি পিষে দেয় চাকার তলায় রাস্তাঘাটে অন্যায় সাঁড়াশি আক্রমণ করা হচ্ছে আমাদের। খেদিয়ে দেওয়া হচ্ছে আমাদের হকের জায়গা থেকে। তবু আমরা বাড়ছি। শত সহস্র লক্ষ কোটি। ছড়িয়ে পড়ছি দিগ্বিদিক। এ ভাবে শেষ করা যাবে না আমাদের। যে কোনও দিন ঘুরে দাঁড়ব আমরা। প্রতিবাদ করব। আমাদের শ্বদন্ত তীক্ষ্ণ। ফালাফালা করে দিতে পারি অত্যাচারীকে।
অতএব, সাধু-অসাধু সবাই সাবধান। অনতিবিলম্বে এই দমনপীড়ন বন্ধ করো। এমত দাবি করছি না, চর্ব-চোষ্য আহার দাও, কুসুমশয্যার ব্যবস্থা করো। কিংবা গাড়ি চাই, গয়না চাই। কিন্তু এ পৃথিবীতে আমাদেরও কিছু অধিকার আছে। সেই ন্যায্য প্রাপ্যটুকু হরণ কোরো না। তা হলে মূল্য চোকাতে হবে তোমাদের একদিন।
