৯
‘আপনার নাম?’
‘অনিরুদ্ধ সান্যাল।’
‘বয়েস এবং ঠিকানা বলুন।’
‘বয়েস পঁয়তাল্লিশ। ঠিকানা ১৩এ, নিউ আলিপুর রোড, কলকাতা ৫৩।’
‘মালিনী অধিকারীর সঙ্গে আপনার কীরকম সম্পর্ক ছিল?’
‘আমরা একে অপরকে ভালোবাসতাম।’
‘কতদিনের সম্পর্ক?
‘তিন বছর।’
‘কীভাবে আপনাদের আলাপ হয়?’
‘ওর কোম্পানি আমাদের ক্লায়েন্ট ছিল। ১৯৯৫ সালে একটা সাকসেস পার্টিতে ওর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। উই ফেল ফর ইচ আদার।’
‘১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বরের ঘটনার বিবরণ দিন।’
‘আমি ১৮ তারিখ রাত থেকে ওর বাড়িতে ছিলাম। আর কেউ ছিল না।’
‘কখন এবং কীভাবে এসেছিলেন?’
‘রাত ন-টায়, আমার ব্রেবোর্ন রোডের অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলাম। মালিনীর বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করা আছে। আচ্ছা, গাড়িটার কী ব্যবস্থা করা যায়? চাবি তো আমার প্যান্টের পকেটে ছিল। সেটা কি আপনাদের কাছে?’
‘সেদিন কী হয়েছিল, তার বিবরণ দিন।’
‘সেদিন মাঝরাত পর্যন্ত আমরা সিনেমা দেখেছি। মেহেদি হাসানের গজল শুনতে মালিনী ভালোবাসত। আমি ওর জন্য ক্যাসেট এনেছিলাম। কিন্তু, রিল বার বার জড়িয়ে যাচ্ছিল। তারপর মালিনী বিরক্ত হয়ে বলল, ছাড়ো। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ক্যাসেট চালাল। তারপর নতুন একজনের রবীন্দ্রসংগীত। পীযূষকান্তি সরকার। আমি আগে শুনিনি। ভালো লাগছিল। এই করে ভোর হয়ে যায়। আমি সঙ্গে খাবার এনেছিলাম। কিন্তু, মালিনী ড্রিঙ্ক করছিল। বলল, খাবে না। আমি জোর করে চকলেট খাওয়ালাম কয়েকটা, নাহলে খালি পেটে মদ খাওয়া উচিত নয়।’
‘আপনার বাড়ি ফেরার কথা কবে ছিল?’
‘শনিবার রাত করে। তবে, সেদিন মালিনীদের পাশের বাড়ি থেকে রেডিয়োতে ‘শনিবারের বারবেলা’ হচ্ছিল, তার আওয়াজ পেয়ে মনে হয়েছিল, বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। হয়তো দুপুরের মধ্যে ফিরে যেতাম, যদি ওষুধটা না- খেতাম। কিন্তু, শরীর দিচ্ছিল না বলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’
‘বাড়িতে কী বলেছিলেন?’
‘অফিস টুরে যাচ্ছি।’
‘আপনারা কে কতটা মদ খেয়েছিলেন?’
‘মালিনী একটা ৭৫০ টিচার্স শেষ করেছিল। আমি ওকে কিছুটা বিয়ারও খাইয়েছিলাম। কিন্তু, বেশি খেতে পারেনি। আমি বিয়ার খেয়েছি কত, হিসেব নেই। বাড়িতে আটটা ক্যান ছিল। সবক-টাই শেষ হয়ে থাকতে পারে। বিয়ার খাবার আগে তিন পেগ জিন খেয়েছিলাম।’
‘কখন থেকে মদ খাচ্ছেন?’
‘রাত এগারোটা নাগাদ। তার আগে সোবার ছিলাম দু-জনেই। আমি রাতের খাবারও খেয়েছিলাম। মালিনী বলেছিল, পরে খাচ্ছে, তারপর মদ খেতে গিয়ে আর খায়নি।’
‘মদ ছাড়া অন্য কোনো নেশা?’
‘জয়েন্ট রোল করে এনেছিলাম। ভাগাভাগি করে চারটে বা পাঁচটা, আমার খেয়াল নেই।’
‘শারীরিক সম্পর্ক হয়েছিল?’
‘এগুলো ফর রেকর্ড। আপনার জবানবন্দি হিসেবে রেখে দেওয়া হচ্ছে।’
‘হয়েছিল।’
‘কতবার?’
‘আমার মনে নেই।’
‘আপনার এবং ভিকটিমের শরীরে এত আঁচড়-কামড় কীসের কারণে?’
‘পার্ট অফ ফোরপ্লে। কিন্তু, মালিনীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করিনি।’
‘কী কী ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করেছিলেন তার একটা লিস্ট বলুন।’
‘আমি এনেছিলাম হ্যান্ডকাফ। মালিনীর বাড়িতে ছুরি আর দড়ি ছিল। ব্লাইন্ডফোল্ডের কাপড়ও। আর, চকলেট।’
‘চকলেট কেন?’
‘মালিনী ভালোবাসত। শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সময়ে চকলেট ওর কাছে কিক ছিল।’
‘এই যে মার্ডার ওয়েপন, মানে এই ছুরি, এটাও তো আপনারা ব্যবহার করেছিলেন? ছুরিটা কে এনেছিলেন? আপনি?’
‘হ্যাঁ। হ্যাঁ।’
‘এরকম আপনারা এর আগে করেছেন, নাকি, এটাই প্রথম?’
‘ইজন্ট ইট টুউ পার্সোনাল?’
‘যা জিজ্ঞাসা করা হল, তার উত্তর দিন।’
‘করেছি।’
‘কোথায় এবং কতবার?’
‘অসংখ্যবার বিভিন্ন জায়গায়। মালিনীর বন্ধুর ফ্ল্যাটে, মালিনীর বাড়িতে, আমরা ঘুরতে গিয়ে।’
‘আপনার বাড়িতে এসব জানতেন?’
‘না।’
‘আপনি জানাতে চাননি?’
‘আমি— সময় নিচ্ছিলাম।’
‘আপনার পরিবারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিন।’
‘আমি হাওড়ার বাজেশিবপুরের ছেলে। কলকাতায় যেহেতু পড়াশোনা এবং চাকরি, তাই এখানে সেটল করি। আমার বাবা, মা দু-জনেই মারা গেছেন। বাড়িতে আমার স্ত্রী পারমিতা, দুই মেয়ে, সম্পূর্ণা ও সমাপ্তি। সম্পূর্ণা বড়ো, ওর বয়েস বারো। সমাপ্তি ছোটো, আট।’
‘আপনার বাড়ির ব্যাপারে মালিনী দেবীর কী বক্তব্য ছিল?’
‘মালিনী শেষের দিকে চাইত আমি যেন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসি।’
‘আপনি কী বলেছিলেন?’
‘আমি প্রস্তুত ছিলাম না।’
‘এই বিষয়ে আপনাদের ভেতর মনোমালিন্য হয়েছে? হলে, তার বিশদে বিবরণ দিন।’
‘মাস ছয়েক ধরে আমাদের মধ্যে ঝগড়া চলছিল। কিন্তু, শেষের দিকে সব ঠিক হয়ে যায়।’
‘শেষের দিকে মানে কবে?’
‘মালিনীর সঙ্গে একটা বড়ো ঝামেলার পর দিন পনেরো আমাদের যোগাযোগ ছিল না। দু-জনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা এই সম্পর্ক থেকে বেরোব। মালিনী চেষ্টা করছিল। কিন্তু, তারপর আবার আমিই ওকে ফোন করি। তারপর আমরা তাজ বেঙ্গলে চা খেতে যাই। সেদিন আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়। আবার সব ঠিকঠাক হয়। দিনটা ছিল পনেরোই ডিসেম্বর। আমার মনে আছে, কারণ তার আগের দিন আমার ছোটোমেয়ের জন্মদিন ছিল। জন্মদিনের পার্টির শেষে মাঝরাতে আমি ওকে ফোন করেছিলাম।’
‘কেন আবার ফোন করেছিলেন?’
‘আমি জানি না। আমি ওকে ছাড়তে চাইতাম না। ওকে ছাড়া পারব না মনে হয়েছিল।’
‘কেন ছাড়তে চাইতেন না?’
‘আমি বোঝাতে পারব না, অফিসার। মালিনীর আইডিয়া থেকে বেরোনো কঠিন।’
‘কীভাবে আপনাদের মনোমালিন্যের অবসান হয়েছিল?’
‘আমি ওকে বলেছিলাম যে, আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসব। এ-ও বলেছিলাম দু-জনে কলকাতা ছেড়ে চলে যাব। মালিনী খুশি হয়েছিল। ও কলকাতায় থাকতে চাইত না।
‘আপনি কি সত্যিই এটা মিন করেছিলেন?’
‘আমি কনফিউজড ছিলাম। জানি না, সত্যিই বেরোতাম কি না।’
‘মানে, আপনি তখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসেননি। তবু মালিনীকে প্ৰতিশ্ৰুতি দিয়েছিলেন।’
‘হ্যাঁ।’
‘তখন কি খুন করার ভাবনা আপনার মনে এসেছিল?’
‘না। একদম না। আপনারা এসব কী বলছেন?’
‘আপনি কি কখনো মালিনীকে খুনের হুমকি দিয়েছেন?’
‘উত্তর দিন।’
‘রাগের মাথায়। আমি রাগ হলে কী বলি, কী করি নিজের খেয়াল থাকে না।’
‘কতবার এবং কোথায়?’
‘বার দুয়েক বলে মনে পড়ছে। একবার ওর বন্ধুর ফ্ল্যাটে। একবার পার্ক স্ট্রিটে পিটার ক্যাটে বসে। কিন্তু, দু-বারেই আমি রাগের মাথায় এসব বলে বেরিয়ে যাই এবং দু-বারই পরে ক্ষমা চেয়ে নিই।’
‘কেন হুমকি দিয়েছিলেন?’
‘মালিনী বলেছিল, আমার স্ত্রী-কে ও সব খুলে বলবে।’
‘দু-বারই এই কারণ?’
‘হ্যাঁ।’
‘আপনি তাহলে পরিবার নিয়ে প্রোটেকটিভ?’
‘আপনার স্ত্রী যদি জানতে পারেন, তাহলে কী ঘটবে তার ভয় আপনি পেয়েছিলেন?’
‘প্লিজ, আমার ফ্যামিলিকে এসবের থেকে বাদ রাখুন।’
‘আবার ১৯ তারিখ সকালের ঘটনায় ফিরে আসছি। সেদিন কী হয়েছিল বিশদে বলুন।’
‘আমরা ক্লান্ত ছিলাম। মালিনী আরও টানত হয়তো, কিন্তু ওর চোখ জবাফুলের মতো লাল হয়ে গিয়েছিল। তখন সকাল এগারোটা। আমি আর পারছিলাম না। কোমর যন্ত্রণা, মাথা ঝিমঝিম করছিল। আমি বললাম, ঘুমোব। মালিনী নেশার ঘোরে হেসে ফেলেছিল। বলল, আমি নিজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে না-এলে একদিন আমায় খুন করবে, সেই প্ল্যান করেই নাকি কাঠমান্ডু বেড়াতে গিয়ে ছুরিটা ও কিনে এনেছিল। আবোল-তাবোল কথা, আমিও শুনে হাসছিলাম। নেশার ঘোরে একবার এলোমেলো হাত চালাল, মেঝেতে চকলেট, বই আরও কীসব পড়ল। আমি বিরক্ত হয়ে ওকে ধমকালাম, মাতলামি না-করে ঘুমোতে হবে এবার। ওর তখন চোখ লেগে আসছে। ওকে বললাম, কিছু খাও। খেতে চায়নি। ডাইনিং রুমের ফ্রিজ থেকে একটা আপেল বার করে আধখানা খেলাম আমি। মালিনী তখন শেষ জয়েন্টটা খাচ্ছে। আপেলের পর আমি জয়েন্টের শেষটুকু খাই। মালিনী দুটো চকলেট খায়। দু-জনের কেউই তখন নর্মাল ভাবনার জায়গাতে নেই। মালিনী বলে ওর শীত করছে, মনে হচ্ছে হিমেল হাওয়া বইছে ঘরের ভেতর। আমি বললাম, জানালা তো সব বন্ধ, হাওয়া পাচ্ছ কোথা থেকে? অবশ্য, সেদিন খুব শীতও পড়েছিল। ওর কম্বল পায়ের দিকে গোটানো ছিল। আমায় বলল, ওর গায়ে চাপা দিয়ে দিতে। ওকে চাপা দিয়ে নিজেও আরেকটা কম্বল গায়ে দিই। হ্যাঁ, তার আগে দু-জনেই ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম। মালিনী বলল খেতে, কারণ আমার মাথা ধরেছিল। এই অবস্থায় ঘুম না হলে আরও সাংঘাতিক হত। মালিনী একবার জিজ্ঞাসা করল জামা পরব কি না। কিন্তু, তখন আমাদের চোখ বুজে এসেছে। শক্তি ছিল না অন্য কিছু করার। মালিনীর শেষ কথা ছিল, ‘কখন উঠব জানি না। আমায় ডেকো না।’ এর পর আমার কিছু মনে নেই। আমি কিছু করিনি, অফিসার। গোটা সময় আমি মড়ার মতো ঘুমিয়েছি।’
‘মাঝে আপনার ঘুম ভাঙেনি?’
‘না, একেবারে ভাঙল বিকেল বেলা চিৎকার শুনে।’
‘তখন আপনি কী করলেন?’
‘তখনও আমার ঘুমের রেশ কাটেনি। ওষুধ খেলে যা হয়। আমার মাথা ঘুরছিল। কোনোক্রমে চোখ মেলে দেখলাম, মালিনী কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে। মাথা পর্যন্ত ঢাকা। বাইরে হট্টগোল চলছে। দরজায় ধম ধম আওয়াজ। আমি ওকে ডাকার জন্য ওর মুখ থেকে কম্বল সরালাম। তখন ছুরিটা চোখে পড়ে। রক্তে মাখামাখি চাদর, বিছানা, ওর সারামুখ। আমার প্রবল বমি পেল তখন। কী করব, বুঝছিলাম না। আবার ওর মুখ ঢেকে দিলাম। ঘোরের মধ্যে মনে হল, আই অ্যাম নেকেড। কম্বল সরিয়ে উঠতে যাব, দরজা ভেঙে পড়ল। হুড়মুড় করে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল অনেকে। তারপর তো আপনারা জানেন।’
‘আপনাদের ঘুমের সময়ে কী ঘটেছে, আপনি জানেন না?’
‘আমি জানি না।’
‘আপনার কি স্লিপওয়াকিং-এর ইতিহাস আছে?’
‘না।’
‘আপনি কি নেশার ঘোরে মালিনীকে হত্যা করতে পারেন?’
‘আমি বুঝতে পারছি না। আমার কোনো স্মৃতি নেই।’
‘পারেন কি?’
‘দেখুন আমি রাগের মাথায় কী বলেছি—’
‘হ্যাঁ অথবা না-তে উত্তর দিন। পারেন, নাকি, পারেন না?’
‘পারি।’
‘আপনার কি মনে হয়, খুনটা আপনি করেছেন?’
‘আমি মালিনীকে ভালোবাসতাম। তাকে হত্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু, আমার কিছুই মনে নেই।’
‘মানে, হত্যা করলেও আপনার মনে নেই, এটাও হতে পারে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু, এটা কি সম্ভব?’
‘আপনাকেই এই প্রশ্ন করছি। সম্ভব?’
‘সময় নিয়ে বলুন।’
‘সম্ভব।’
