১৯
‘তাহলে এটাই তোমার সেই প্রার্থিত জাস্টিস? তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?’ সল্টলেকের বারে বসে ইম্যানুয়েল জাভেদকে প্রশ্ন করলেন। আকাশ কালো করে আবার মেঘ ঘনিয়েছে। কলকাতার বুকে শ্রাবণ চিরস্থায়ী। জনহীন বারে বরাবরের মতো টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে ওয়েটার। কিচেন থেকে চাপা বেসুরো গলায় ‘মা তুঝে সালাম’ ভেসে আসছে।
‘আমি ব্লাডি নিশ্চিত, কারণ আমার ক্লোজার মিলেছে।’ ওল্ড মঙ্ক গলায় ঢেলে জাভেদ উত্তর দিলেন।
‘কিন্তু, একজন দোষীকে বাঁচাতে একজন নির্দোষকে আমরা অফিশিয়ালি দোষী হিসেবে ডিক্লেয়ার করলাম। এটা নৈতিকভাবে কতটা ঠিক, জাভেদ?’
‘ধ্যার, নৈতিকতা! শোনো ইজি, আজ শতদ্রু দত্ত বা দেবারতি অধিকারী খুনি হলে আমি দু-বার ভাবতাম না কেস ওপেন করাতে। শতদ্রু বা দেবারতি ভয়ংকর মানুষ, ইজি। এরা মালিনীকে অনেকবার খুন করেছে। শতদ্রু সক্রিয়ভাবে, দেবারতি বাধা না-দিয়ে। এদের ব্লাডি কখনো শাস্তি হবে না। কিন্তু, সাম্যর গোটা জীবন সামনে পড়ে। আমরা অনিরুদ্ধ সান্যালকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। কাজেই, আমার কাছে সাম্য অপরাধী হলেও তাতে আমার রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে না।’ গ্লাসের গায়ে আদরের আঙুল বোলালেন জাভেদ। ‘শোনো বাগার, আজ বাড়ি গিয়েও মদ খাব, বুঝলে? আজ আমার আনন্দের দিন।’
‘কিন্তু, অনিরুদ্ধ সান্যাল নির্দোষ ছিল। সাম্যর শাস্তি সে পেল। স্কেপগোট।’
‘হ্যাঁ, লঘু পাপে গুরু দণ্ড। বউকে বা প্রেমিকাকে ঠকানোর শাস্তি চোদ্দো বছরের জেল হতে পারে না। কিন্তু, আজ একজনের নাম ক্লিয়ার করার জন্য আদর্শের খাতিরে সত্যিটাকে বাইরে আনব, আদর্শ মাইরি অত বড়ো না। অত দায়বদ্ধতা তোমার-আমার কারোর নয়, ইজি। তুমি প্রথমদিন বলেছিলে, জীবন অনেক বড়ো। তোমার কি মনে হয়, আমি সেটা বুঝি না? আমি ক্লোজার চেয়েছিলাম নিজের আত্মার জন্য। স্বার্থপরের মতো। আইনের জন্য নয়। অনিরুদ্ধ সান্যাল একটা অপরাধ করেছিল, তার শাস্তি সে পেল না। আরেকটা অপরাধ করেনি, তার শাস্তি পেল। এটায় কার কী হাত আছে?’
‘থাইসিটিস।’ চোখ বুজে উত্তর দিলেন ইম্যানুয়েল।
‘কী?’
‘গ্রিক নাটক। সেনেকার লেখা। থাইসিটিস ছিলেন অলিম্পিয়ার রাজা। তিনি সজ্ঞানে নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করেছিলেন এবং না-জেনে নিজের সন্তানের মাংস খেয়েছিলেন। থাইসিটিসের পতন হয়েছিল, কিন্তু সেটা মেয়েকে ধর্ষণের জন্য নয়, যেটা তিনি জেনে-বুঝে করেছিলেন। হয়েছিল সন্তানের মাংস খাবার জন্য, যেটা তিনি না-জেনে খেয়েছিলেন। অনিরুদ্ধ জেনে-বুঝে এই গোলকধাঁধায় মালিনী আর পারমিতা দু-জনকে টেনে এনেছিলেন, কারণ স্বার্থপরের মতো কাউকে তিনি ছাড়তে চাননি। সেটাই তাঁর পতনের কারণ। কিন্তু, সেটার ম্যানিফেস্টেশন ঘটল এমন কাজের মাধ্যমে যা তিনি করেননি। ট্র্যাজেডি, অথবা, আয়রনি। কোন পাপের কী শাস্তি হবে, জাভেদ, সেটা আমরা কেউ জানি না। একে তুমি নিয়তি বলো বা কৃতকর্মের জটিল গোলকধাঁধা- আমি স্কেপটিক, তাই কিছু নিয়েই নিশ্চিত হতে পারি না।’
দু-জন বার থেকে উঠে পড়লেন। বিকেল নিভে আসছে। টুপটাপ আলো জ্বলবে এবার কলকাতার বুকে। বাইরে বেরিয়ে ইম্যানুয়েল দেখলেন, কালো মেঘ পিঠে নিয়ে ঘনশ্যাম দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ ইম্যানুয়েলের দিকে ফেরানো।
‘আচ্ছা, ছুরির ব্যাপারটা কী হল? অনিরুদ্ধ দু-বার দু-রকম কথা বলেছিলেন কেন?’
‘কী আসে-যায়!’ অন্যমনস্ক গলায় উত্তর দিলেন ইম্যানুয়েল। ‘মালিনী হয়তো ছুরিটা কিনে অনিরুদ্ধকে দিয়েছিলেন। বা, অনিরুদ্ধ ভুলে গেছেন। যা হোক না কেন, ভেবে কী করবে, জাভেদ? কেসের টেকনিক্যালিটিজ নিয়ে ভেবো না আর। বরং ভাবো, আমরা নৈতিকভাবে কতটা ঠিক থাকলাম, সে নিয়ে। তোমার-আমার আত্মার জন্য সেটা বেশি জরুরি। আমি নিশ্চিত নই বলেই তোমায় এগুলো বলছি।’
বারের নীচে একটা মদের দোকান। সেদিকে এগিয়ে গেলেন ইম্যানুয়েল। জাভেদ বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘তুমি মদ কিনছ?’
জাভেদের দিকে না-ফিরে ইম্যানুয়েল উত্তর দিলেন, ‘বাড়ি যাও, জাভেদ। হাওয়াটা ভালো নয়। পূর্বদিক থেকে আসছে।’
শীর্ণ জাভেদ পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কপালে ভ্রূকুটি। জোলো বাতাস দস্যুর মতো হা-হা করে সল্টলেকের বুক চিরে ছুটে আসছিল। জাভেদ দাঁড়িয়ে থাকুক, ডুবে যাক চিন্তায়— মনে হল ইম্যানুয়েলের। ঘনশ্যাম তাঁকে স্থিরদৃষ্টিতে দেখছে। জেডির বোতল হাতে ইম্যানুয়েল ঘনশ্যামকে অতিক্রম করে গেলেন। তাঁকে মাম্মোর কাছে যেতে হবে।
***
