৩
মালিনী অধিকারীর পিতামহ বিশিষ্ট ব্যারিস্টার দুর্গাদাস অধিকারী ভবানীপুরের পদ্মপুকুরের কাছে তাঁদের বাসভবন বানিয়েছিলেন। দুর্গাদাসের দুই সন্তান। জ্যেষ্ঠপুত্র নারায়ণদাস বহুদিন প্রবাসে থেকে সেখানেই মারা গেছেন। কনিষ্ঠ পুত্র শিবদাস অধিকারী সরকারি হাসপাতালের ই.এন.টি. সার্জন। শিবদাস বিয়ে করেছিলেন দেবারতি মুখার্জিকে। দেবারতি ছিলেন স্কটিশ চার্চ কলেজের ফিজিক্সের অধ্যাপক। তাঁদের একমাত্র সন্তান মালিনী ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে মালিনীও পড়াশোনায় কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। আলিপুর মাল্টিপারপাস স্কুল, তারপর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে মালিনী চাকরি করছিলেন এক বহুজাতিক কনসালটেন্সি ফার্মের কলকাতা শাখায়। শিবদাস অধিকারী দীর্ঘজীবী হননি। পিজি-তে ক্লাস নেবার সময়ে ম্যাসিভ স্ট্রোক। মাত্র চুয়ান্নতে চলে যান। মালিনী তখন তেইশ, সবে চাকরিতে ঢুকেছেন।
১৯৮৭ সালে মালিনীর বিয়ে হয় শতদ্রু দত্তর সঙ্গে। শতদ্রু ছিলেন দেবারতির ছাত্র। তাঁর বাড়িও কাছেই বেলতলা রোডে। সেইসময়ে শতদ্রু ঝাড়গ্রাম কলেজে ফিজিক্সের লেকচারারের পদে আসীন ছিলেন। বিয়েটা প্রেম করেই বলা যায়, যদিও দুই পরিবারের মধ্যস্থতায় প্রেমটা হয়েছিল। মালিনী যখন সেকেন্ড ইয়ারে, শতদ্রু যাদবপুরে একটা সেমিনারে গিয়েছিলেন, যেখানে দেবারতি ছিলেন প্রেজেন্টার। শতদ্রু তখন সবে পিএইচ.ডি.-তে ঢুকেছেন। তখন থেকে আলাপ-পরিচয়। ছয় বছরের একটা নির্ঝঞ্ঝাট প্রেমের পর নিরুপদ্রব বিয়ে, যেরকম হয় আইডিয়াল গল্পে। মালিনী তখন চাকরি করছেন মন দিয়ে। দেবারতির রিটায়ারমেন্টের ন-বছর বাকি। শতদ্রু ঝাড়গ্রাম থেকে সপ্তাহান্তে আসতেন। মালিনীও যেতেন কখনো। সপ্তাহের বাকি সময়টা ভাগাভাগি করে ভবানীপুর আর বেলতলা রোডের শরিকি বাড়িতে থাকতেন। শতদ্রুরও বাবা ছিলেন না, বাল্যকালেই মারা যান। থাকার মধ্যে মা। সাবেকি আমলের শরিকি বাড়িতে সম্ভবত কিছু গণ্ডগোল ছিল। মালিনীর মতো শিক্ষিত স্বাধীনচেতা মেয়েকে ভবানীপুরের ঘটিবাড়ি গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। শতদ্রু চাইতেন মালিনী মানিয়ে নিন। মালিনীও চেষ্টা করেছিলেন শুরুর দিকে। তারপর তাঁর মন বসেনি। তখন থেকে মায়ের বাড়িতেই থাকতে শুরু করেন। শতদ্রু এলে কখনো কখনো গিয়ে বেলতলার বাড়িতে থাকতেন। শতদ্রু খুশি হননি এই ব্যবস্থায়, কিন্তু প্রাথমিক আপত্তির পর না-মেনে তাঁর উপায় ছিল না। দেবারতি কী ভেবেছিলেন, রিপোর্টে উল্লেখ নেই।
মালিনী আর শতদ্রুর সন্তান সাম্যব্রতর জন্ম হয়েছিল ১৯৯০ সালের জানুয়ারি মাসে। তার একবছরের মাথায় কলকাতার মণীন্দ্র কলেজে শতদ্রু বদলি হয়ে আসেন। কিন্তু, সব রূপকথার শেষটা যেহেতু গল্পের মতো হয় না, এক্ষেত্রেও সেই নিয়ম মেনে মালিনী আর শতদ্রুর দাম্পত্যে অশান্তি ঘনিয়ে এসেছিল। মালিনীকে বম্বে ট্রান্সফার করার কথা হচ্ছিল প্রোমোশন দিয়ে। শতদ্রু সেটায় বাধা দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মালিনীর চাকরি নিয়ে তাঁর আপত্তি নেই, কিন্তু দু-জনে দু-জায়গায় থাকা যাবে না। নাহলে, অতটুকু বাচ্চাকে কে দেখবে? মালিনী চেয়েছিলেন সাম্যকে নিয়ে যেতে। শতদ্রুকেও তিনি বলেন যে, বম্বেতে অধ্যাপনার কাজ তাঁর জুটে যাবে, দরকারে কিছুদিন পর আসুন। কিন্তু, শতদ্রু রাজি হননি। তিনি কলকাতা ছেড়ে, সর্বোপরি নিজের মাকে ছেড়ে, অতদূরে যেতে প্রস্তুত ছিলেন না। এক্ষেত্রে শতদ্রুকে সমর্থন করেন দেবারতিও। মা এবং স্বামীর চাপে মালিনী প্রোমোশনটা নেন না। কিন্তু, এর ফল ভালো হয়নি। শতদ্রুর সঙ্গে তাঁর খিটিমিটি বাড়তেই থাকে এবং একসময়ে চরমে পৌঁছোয়। মালিনীর অভিযোগ ছিল শতদ্রু তাঁর কেরিয়ার নষ্ট করেছেন আর শতদ্রু বলতেন মালিনী নিজের কাজকে ধ্যানজ্ঞান করতে গিয়ে জলাঞ্জলি দিয়েছেন সংসার। একটা সময়ে দু-জনে আলাদা হবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু, ডিভোর্স নেননি সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে। সাম্যকে নিয়ে মালিনী ১৯৯৪ সালে পাকাপাকিভাবে ভবানীপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু, দু-জনের কেউই চাননি এই তিক্ততা সাম্যকে অ্যাফেক্ট করুক। তাই সাম্যকে নিয়মিতভাবে মালিনী তার বাবার বাড়িতে পাঠাতেন। দেবারতি এই বিচ্ছেদ পছন্দ করেননি, এবং দায়ী করেছিলেন তাঁর মেয়েকেই। হয়তো ভেবেছিলেন যে, সময়ের সঙ্গে আবার জোড়া লেগে যাবে। কিন্তু, সেটা হয়নি অনিরুদ্ধ সান্যালের কারণে।
বিচ্ছেদের পর মালিনী কিছুদিনের জন্য ডিপ্রেশনে চলে যান। যদিও ডাক্তার দেখাননি কোনো, কিন্তু তাঁর বন্ধুবান্ধবেরা বলেছিলেন যে, মালিনী সেইসময় থেকেই রাত্রে ঘুমোতেন না। সময়ে-অসময়ে কান্নাকাটি করতেন। তাঁর চোখের নীচে স্থায়ী হয়ে বসছিল রাত্রিজাগরণের কালো দাগ। খাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলেন, পাল্লা দিয়ে বেড়েছিল নেশা করা। অফিসে রাত পর্যন্ত কাজে ডুবে থাকতেন, বাড়ি ফিরতেন মদ খেয়ে। এই অবস্থায়, ১৯৯৫-এর শেষের দিকে তাঁর আলাপ হয় অনিরুদ্ধর সঙ্গে। অনিরুদ্ধ সান্যাল ছিলেন জেভিয়ার্সের ইংরেজির তুখোড় ছাত্র, অধ্যাপক পি লাল-এর প্রিয় শিষ্যদের একজন। কলকাতার এক নামি অ্যাড এজেন্সিতে তখন ক্রিয়েটিভ ডায়রেক্টর। তখন অনিরুদ্ধর বয়েস বিয়াল্লিশের আশপাশে, বিবাহিত এবং দুই সন্তানের পিতা। মালিনী তখন একা, অবসাদগ্রস্ত, সন্তান এবং চাকরি নিয়ে নিজের মতো করে লড়ে যাচ্ছেন। অনিরুদ্ধর সঙ্গে তিনি প্রবলভাবে জড়িয়ে গেলেন। বলা যায়, অনিরুদ্ধকে আঁকড়ে ধরেই অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসছিলেন মালিনী। পরবর্তীতে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদেও মালিনীর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছিলেন যে, অনিরুদ্ধর প্রতি মালিনীর ভালোবাসা এবং আনুগত্যে কখনো টোল খায়নি। একই কথা অনিরুদ্ধর সম্পর্কেও বলা যায় কি না, সে-বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়।
এই সম্পর্ক অনিরুদ্ধর দিকে গোপন থাকলেও মালিনীর দিকে থাকেনি। অনিরুদ্ধ শুরু থেকেই পরিবারের কথা ভেবে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, তাই দু-জনে গোপনে দেখা করতেন। কিন্তু, দেবারতির কাছে মালিনী লুকোতে পারেননি। অশান্তি শুরু হয়। দেবারতি মালিনীকে চাপ দিয়েছিলেন এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। ক্রমে শতদ্রু জানতে পারেন এবং তাঁর সঙ্গে ও মালিনীর মনোমালিন্য আবার নতুন করে শুরু হয়েছিল। মালিনী তখন ডিভোর্স চান। কিন্তু, শতদ্রু কিছুতেই সম্মত হননি। অন্যদিকে, অনিরুদ্ধ প্রবলভাবে চাইছিলেন তাঁর সংসারে যেন এই ঝড় না-আসে। মালিনী শুরুর দিকে সেটা মেনেছিলেন- তাঁর যা ব্যক্তিগত ঝড়ঝাপটা যায় যাক, অনিরুদ্ধকে যেন তা স্পর্শ না-করে। এমনকী, দেবারতি ও শতদ্রুর নাকের ডগা দিয়ে মালিনী অনিরুদ্ধর সঙ্গে কাঠমান্ডু ঘুরতে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু অনিরুদ্ধর পরিবার জানতে পারেনি। কিন্তু, ১৯৯৮ সালের গোড়ায় মালিনী অনিরুদ্ধকে জানান, তাঁর দিকে সবাই যখন জেনেই গেছে, আর লুকোছাপার অর্থ হয় না। তিনি আর নিত্যকার অশান্তি সহ্য করতে পারছেন না। মালিনী বলেন, তিনি অনিরুদ্ধকে বিয়ে করতে চান, নিদেনপক্ষে একসঙ্গে থাকতেও বাধা নেই। দরকার পড়লে নরক থেকে হলেও শতদ্রুর থেকে ডিভোর্স তিনি আদায় করবেন। কিন্তু, অনিরুদ্ধকেও নিজের পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে। অনিরুদ্ধ এতটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি সময় চাইছিলেন। বারে বারে এটা-ওটা ছলছুতোয় নিজের সিদ্ধান্তকে ঝুলিয়ে রাখছিলেন। সেটা নিয়ে মালিনীর সঙ্গে তাঁর তীব্র ঝগড়া শুরু হয়। একটা পর্যায়ে গিয়ে মালিনী আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। তারপর বলেন, এবার তিনি অনিরুদ্ধর স্ত্রী পারমিতা সান্যালের কাছে গিয়ে সবটা খুলে বলবেন। অনিরুদ্ধ রাগের মাথায় মালিনীকে খুন করার হুমকি দিয়েছিলেন। সেটার সাক্ষী মালিনীর স্কুলজীবনের বন্ধু সুচন্দ্রা। সুচন্দ্রার ফ্ল্যাটে তাঁর সামনে এই অশান্তি হয়েছিল। পরে অবশ্য মাথা ঠান্ডা হলে অনিরুদ্ধ ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু, তার পর আরও অন্তত একবার যে তিনি মালিনীকে দেখে নেবার হুমকি দিয়েছিলেন, সেটা সুচন্দ্রাকে জানিয়েছিলেন মালিনী।
১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর একটা ফিজিক্স সিম্পোজিয়ামে যোগ দিতে দেবারতি বারাসাত গিয়েছিলেন। ফেরার কথা ছিল ২১ তারিখ। সাম্য তখন কয়েক দিনের জন্য শতদ্রুর বাড়িতে ছিল। ফাঁকা বাড়িতে মালিনী অনিরুদ্ধকে রাত্রে ডেকে আনেন। প্ল্যান ছিল, শুক্রবার রাত এবং শনিবার সারাদিন কাটিয়ে অনিরুদ্ধ বাড়ি ফিরবেন। অনুপান ছিল চাট, অঢেল মদ এবং গাঁজা। অনিরুদ্ধর বয়ান অনুযায়ী, গভীর রাত পর্যন্ত তাঁরা ভিসিআরে হিচককের সিনেমা দেখেছিলেন কয়েকটা। তারপর উদ্দাম যৌনতা শুরু হয়। মালিনী বিডিএসএম পছন্দ করতেন। হাত বেঁধে ব্লাইন্ডফোল্ড করে দু-জনে বার বার মিলিত হয়েছিলেন। পরদিন সকাল পর্যন্ত এই চলে, সঙ্গে নেশা। বেলা বাড়লে ক্লান্ত হয়ে পড়েন দু-জনে। সামান্য খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। তার আগে দু-জনে ঘুমের ওষুধও খেয়েছিলেন।
মালিনী বাড়ির কাজের লোকেদের ছুটি দিয়েছিলেন। বিকেল চারটের সময়ে ঠিকে মাসি নির্মলা ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মনে পড়েছিল, তিনি সোয়েটার ফেলে গেছিলেন। সেটা আনতে বাড়ির ভেতরে ঢোকেন এবং মালিনীর নাম ধরে ডাকাডাকি করেন। সাড়া না-পেয়ে দোতলায় উঠে দেখেন মালিনীর ঘরের দরজা বন্ধ। কয়েক বার ডাকাডাকির পর দরজা খোলেননি। নির্মলা ফিরে আসবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু তাঁর সন্দেহ হয়েছিল। তিনি আরও কিছু সন্দেহজনক দেখেছিলেন যেটার উল্লেখ জাভেদের ফাইলে নেই। জাভেদ এই জায়গায় পেনসিলে মন্তব্য লিখেছেন, ‘নির্মলা ঢালিকে আমি জিজ্ঞাসাবাদ করিনি। লোকাল থানার যে ইনস্পেকটর করেছিলেন, তিনি দায়সারা রিপোর্ট লিখেছেন।’ এরকম খাপছাড়া রিপোর্ট, যেগুলো রুটিনমাফিক লিখতে হয়, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অনেকেই রিপোর্টে খুঁটিনাটি লেখে না, বিশেষত যে কেসের অপরাধী ধরা পড়েছে আগেই। যাইহোক, ভয় পেয়ে নির্মলা চেঁচিয়ে ওঠেন এবং পাড়ার লোকেদের ডেকে আনেন। সবাই এসে দরজা ধাক্কিয়ে
বোঝে ভেতর থেকে বন্ধ। তখন দরজা ভাঙা হয়। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, সদ্য নিদ্রোত্থিত অনিরুদ্ধ নগ্নদেহে হতভম্বের মতো বসে আছেন, তাঁর পাশে কম্বলচাপা মালিনী। সেই কম্বল রক্তে ভিজে, ঘরের মেঝেতেও চাপ চাপ রক্ত। রক্তে মাখামাখি বিছানা। কম্বল তুলে দেখা যায়, সম্পূর্ণ বিবস্ত্র মালিনী বাঁ-দিকে কাত হয়ে শুয়ে, তাঁর কাঁধ আর গলার সন্ধিস্থলে একটা ছুরি গিঁথে অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেছে। বোঝা যাচ্ছে দেহে প্রাণ ছিল না। ঘরে অন্য দরজা ছিল না, তবে অ্যাটাচড টয়লেট ছিল। সেখানে একটা শিক দেওয়া জানালা।
পুলিশ সেই রাত্রেই অনিরুদ্ধকে গ্রেপ্তার করে। চার্জশিট দিতে দেরি হয়নি। অনিরুদ্ধর পক্ষে কেস সাজাবার বিশেষ জায়গা ছিল না। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত অনিরুদ্ধ সান্যাল ছাড়া পান ২০১২ সালে। ততদিনে তাঁর পরিবার তাঁকে ত্যাগ করেছে। হাওড়াতে নিজের পৈতৃক বাড়িতে ফিরে যান অনিরুদ্ধ। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে জাভেদ আহমেদকে নীচের চিঠিটা তিনি পাঠিয়েছিলেন।
মিস্টার আহমেদ,
আমাকে আপনার মনে থাকবে কি না জানি না। আমি অনিরুদ্ধ সান্যাল, ১৯৯৯ সালে মালিনী অধিকারী হত্যাকাণ্ডে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন কয়েদি। আপনি এই কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলেন। অনেক কষ্টে আপনার ঠিকানা জোগাড় করেছি। আমি কম্পিউটারে সড়োগড়ো নই। যখন থেকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কম্পিউটার আসতে শুরু করল, সেইসময়টায় জেলের ভেতর ছিলাম বলে ট্রেনিং পাইনি। তাই আপনাকে ই-মেল করতে পারলাম না। আশা করি, এই চিঠি আপনার কাছে পৌঁছোবে।
মিস্টার আহমেদ, এই চিঠি ডাকে ফেলে আমি আত্মহত্যা করব। কিন্তু, সেই কারণে আপনাকে লিখছি না। সহানুভূতি পাবার জন্যেও না। আমার ল্যাং ক্যান্সার ধরা পড়েছে, কিন্তু চিকিৎসার অর্থ আমার কাছে নেই। আমি বহুদিন কর্মহীন। সেটা ছাড়াও এরকম ঘূর্ণিত নিঃসঙ্গ জীবনের আলাদা করে মূল্য আমার নিজের কাছেই নেই। এতদিন অভ্যাসে বেঁচেছি। কারোর সঙ্গে মিশতাম না, বা, বলা ভালো, তারা আমার সঙ্গে মিশত না। নিজের বাড়িতে প্রায় বন্দি থেকেছি বলা যায়। মাঝে মাঝে বেরিয়ে দোকান-বাজার করলে লোকে এড়িয়ে যেত, অদ্ভুত চোখে তাকাত। কাজেই, যন্ত্রণা না-বাড়িয়ে চুপচাপ সরে যাওয়া সবথেকে যুক্তিগ্রাহ্য বলে আমার মনে হয়েছে। সত্তর বছর বয়েসে পৌঁছে এখন আমি নতুন করে কোনো সারপ্রাইজ গিফট জীবন থেকে আশা করতে পারি না।
আমি আপনাকে চিঠি লিখছি অন্য কারণে। মালিনীকে হত্যার রাত্রে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম এবং আমার মনে নেই কী ঘটেছিল, বলেছিলাম আমি। সেটা ভুল নয়। সত্যিই আমার মনে ছিল না। কিন্তু, তার পরে এতগুলো বছর ধরে সেই রাত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অনেক ভেবেছি। মনে করার চেষ্টা করেছি। কিছু টুকরো ঘটনা মনে এসেছে, যেগুলো আগে ভুলেছিলাম। কিন্তু, কোনো স্মৃতিতেই মালিনীকে হত্যার দৃশ্য নেই। আজ আমি নিঃসংশয়, আমি অপরাধী ছিলাম না। আমি যদি এত বড়ো কাজটা করতাম, তার স্মৃতি তখন না-এলে আমার মনের ভেতর অন্তত সুপ্ত থাকত, এবং পরে কখনো-না-কখনো জেগে উঠতই। কিন্তু, স্মৃতিতে একদম নেই, এটা হতে পারে না। এখন এই কথাগুলো বলার অর্থ নেই, কারণ আমি সাজা ভোগ করে ফেলেছি। কোনো লাভও হয়তো নেই, নতুন করে তো আগের জীবন ফিরে পাব না! কিন্তু যেটা ঘটেনি, সেটার দায় নিয়ে আমি মরব না। অন্তত, একজনের কাছে স্বীকার করে যেতে চাই যে, আমি অপরাধী ছিলাম না। প্রথমে ভেবেছিলাম, মালিনীর ছেলে সাম্যকে চিঠি লিখে যাব। ও আমার ছোটোমেয়ের বয়েসি। কিন্তু সে কোথায়, আদৌ এখানে থাকে কি না, আমি জানি না। তার ওপর, আমার সম্পর্কে ওদের যা ধারণা, হয়তো নাম দেখেই চিঠি ছিঁড়ে ফেলবে। আপনি ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ছিলেন, তাই আপনার কাছে এ কথা বলে যাই। আবার, এবং আবারও, যে, না, মালিনীকে আমি হত্যা করিনি। আমি ওকে ভালোবাসতাম। আমার নিজের মতো করেই বাসতাম, হাজার সীমাবদ্ধতা নিয়েও। কিন্তু, যাকে ভালোবাসতাম, তাকে খুন করা সহজ কাজ নয়, মিস্টার আহমেদ। প্রায় অসম্ভব।
এই চিঠি পেয়ে আপনার কিছুই করার নেই, আমি জানি। এত পুরোনো কেস নিয়ে খোঁড়াখুড়ি কেউ চালাবে না। আপনি চাইলে এই চিঠি ফেলে দিতে পারেন। মৃত্যুর পর আমার কিছু আসে যায় না। তবে, নিজেকে এখন হালকা লাগছে। মালিনীর সঙ্গে তাড়াতাড়ি আমার দেখা হবে।
নমস্কার নেবেন,
অনিরুদ্ধ সান্যাল।
খিদিরপুরে নিজের দু-কামরার ঘুপচি ফ্ল্যাটে বসে ফাইলটা একাধিকবার পড়লেন ইম্যানুয়েল। বাইরে তখন সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। ইম্যানুয়েল উঠে নিজের জন্য এককাপ কালো কফি বানালেন। ঘরের টেবিল-আলমারি-খাটে স্তূপীকৃত বইদের দিকে তাকিয়ে ইম্যানুয়েলের মনে হল, মালিনী অধিকারীর গল্প তিনি সারাজীবন ধরে বার বার শুনে আসছেন। পড়ার টেবিলের লাগোয়া দেওয়াল জীর্ণ হলুদ, পেন দিয়ে অসংখ্য নাম আর ফোন নাম্বার লেখা। দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি, ধূসর হয়ে এসেছে। সালোয়ার-কামিজ পরা তরুণী এক শিশুকে কোলে তুলে হাসছেন। মার্গারেট এলিয়াস ছিলেন ১৮৮৩ সালে আলেপ্পো থেকে কলকাতায় আগত বেঞ্জামিন নিসিম এলিয়াসের চতুর্থ প্রজন্ম। এলিয়াস পরিবারের রিয়েল এস্টেট ব্যাবসার মূল অফিস ছিল ডালহৌসিতে। পাঁচের দশকে কলকাতার ইহুদিরা একে একে আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং ইজরায়েলে মাইগ্রেট করে গেলেও মার্গারেট যাননি। তাঁর পরিবারের বড়ো ব্যাবসা গুটিয়ে ফেলা সম্ভব ছিল না তখনই, তার ওপর মার্গারেট ততদিনে স্কটিশ চার্চের ইতিহাসের ছাত্র তমোনাশ গুহকে ভালোবেসে ফেলেছেন। বালিগঞ্জে থিতু তাঁর ধনী পরিবারের কিছুটা অমতেই মার্গারেট তমোনাশকে বিয়ে করেন। মার্গারেট পড়াতেন সেন্ট স্টিফেন্স স্কুলে, আর তমোনাশ এশিয়াটিক সোসাইটিতে চাকরি করতেন। ১৯৫৭ সালে তাঁদের একমাত্র সন্তানের জন্ম। তমোনাশ মার্গারেটের ধর্মাচরণ ও নিজস্ব সংস্কৃতিতে বাধা দেননি, সন্তানের নাম ইম্যানুয়েল রাখাতেও না— তিনি ছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাসহীন মানুষ। ছেলেকে বলেছিলেন, তার পরিচয় হিন্দু নাকি ইহুদি, বাঙালি না অন্য কিছু, সেটা সে নিজেই ঠিক করবে বড়ো হয়ে। অপরদিকে, মার্গারেট ছেলেকে তোরা তালমুদের পাঠ দিয়েছেন, ম্যাগেন ডেভিড সিনাগগে নিয়ে গেছেন নিয়মিত। কলকাতায় অষ্টাদশ শতকের প্রথম ভাগে রাব্বাই এলিয়াজার হাকোহেন-এর প্রকাশিত প্রায় পনেরোটা মতো হিব্রু ভাষার বই, ততদিনে তাদের মলাট ছিঁড়ে পাতা হলুদ হয়ে গেছে, বাড়িতে রাখতেন মার্গারেট, ছেলেকে পড়াতেন, ইহুদি স্তোত্র পিজমনও। সাবাথের খাবার, কিদ্দুশ পাঠ, প্রদীপ জ্বালানো— মার্গারেট চেষ্টা করতেন যতটা পারা যায়। কারণ, তিনি অনুভব করতেন, বাঙালি হিন্দুসমাজ তাঁকে মেনে নেয়নি, তমোনাশের পরিবারও না। তমোনাশ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। আনওয়ার শাহ রোডের ভাড়াবাড়িতে বসে মার্গারেটের বার বার মনে হত, নিজের ধর্মবিশ্বাস আঁকড়ে রাখাটাই কি আত্মরক্ষার বর্ম হতে পারে? তমোনাশ ছেলেকে বলে গিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরে যেন শ্রাদ্ধ না হয়। কিন্তু, মার্গারেটের শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল রিচুয়াল মেনে, ৪৫ নম্বর নারকেলডাঙা মেইন রোডে ইহুদি কবরখানায়। সেটা ১৯৯১ সাল। তমোনাশ আরও পাঁচ বছর বেঁচে থাকবেন।
ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন ইম্যানুয়েল। মায়ের মুখ তাঁর স্মৃতিতে আবছা হয়ে এসেছে। দেওয়ালের ছবিতে অথবা পুরোনো অ্যালবামের পাতায় তরুণী মা আর শেষবেলার লিভার সিরোসিস আক্রান্ত প্রৌঢ়ার ভেতর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। ঘরের আলো জ্বালিয়ে জানালার ধারে নিজের প্রিয় চেয়ারে বসে ইম্যানুয়েল দেখলেন, মুন্সিগঞ্জের ব্যস্ত রাস্তায় জনস্রোত নেমেছে। কাছাকাছি কোথাও লাউডস্পিকার থেকে গাঁক গাঁক করে ভেসে আসছে জনসভার আহ্বান। ফ্ল্যাটের নীচে ফিরোজ বিরিয়ানির দোকান থেকে মনমাতানো খুশবু পাক দিচ্ছে আকাশে। বইপত্রে স্তূপাকৃতি টেবিলের কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে ইম্যানুয়েল দাবার বোর্ড পাতলেন। আজ আলেখিন ডিফেন্সের একটা ভ্যারিয়েশন পরীক্ষা করে দেখবেন। কালো বোড়ে এগিয়ে তন্ময় হয়ে বোর্ড দেখলেন ইম্যানুয়েল। চূড়ান্ত অ্যাগ্রেসিভ আক্রমণের বিরুদ্ধে কীভাবে একটা ওয়াটারটাইট রক্ষণ মিডবোর্ডে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে? এবং, রাত জেঁকে বসল।
