হামারটিয়া – ১

কাশির সঙ্গে বেরিয়ে আসা রক্তের রং কালো হল যেদিন, সেটা ছিল শীতকালের এক সন্ধেবেলা। বেসিন থেকে মুখ তুললে জানালা। জানালা দিয়ে জেঁকে বসা কুয়াশার ভেতর ডানা ঝাপটে ত্রস্ত কাকের উড়ে যাওয়া সে দেখল। সে ভয় পায়নি, দুঃখবোধও হয়নি। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের খাটে এসে বসল। সময় নিয়ে একটা চিঠি লিখে খামবন্ধ করল। কাল সকালে প্রথম কাজ হল চেনা একজন ছেলেকে দিয়ে চিঠিটাকে ডাকে ফেলানো। অন্য একটা কাগজে লিখে রাখল জরুরি কয়েকটা তথ্য। কিন্তু, সেদিন অন্য কিছু করতে মন চাইল না। যে বইটা সে বার বার পড়ত, পাতায় পাতায় নোট লিখে জীর্ণ করে ফেলেছিল সেই কলেজ-বেলা থেকে, সেটাকেও হাতে তুলতে মন চাইল না সেদিন। তার ইচ্ছে করছিল, একটা গোটা দিন ধরে চুপচাপ বসে থাকবে। তার ক্লান্ত লাগছিল, মাঝে মাঝে কাশি এলে হাতের পাশে রাখা একটা এনামেলের বাটি তুলে নিচ্ছিল মুখের কাছে। কিন্তু, সে ঘুমোতে চায়নি। সে দেখেছিল ভোর কত চুপিসারে আসে।

পরদিন সকাল বেলা থেকে সে বিশেষ কাজকর্ম করেনি। জানালার ধারে বসে তাকিয়ে থেকেছে পুকুরের ওপারে ঘনিয়ে আসা ব্যস্ততার দিকে, যেখানে মানুষ, কোলাহল, নারকেল পাতাদের সড়সড় আওয়াজ, বাইকের হর্ন। তারপর শীতের বেলা গড়িয়ে গেল তাড়াতাড়ি। সে বুঝল তার ঠান্ডা লাগছে। মরা আলোয় মশাদের দল ইতিউতি উড়ে এল, তাদের তাড়াতে ইচ্ছে করেনি। জানালা বন্ধ করতেও না। ক্রমে পুকুরের জলে লাগল সিসা রং, তারপর চারপাশ অন্ধকার হল। ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলল পুকুরপাড়ে। এরকম সময়ে দূর স্টেশন থেকে ট্রেনের আওয়াজ গম্ভীর লাগে, মনে হয় শবানুগমন করছে বগিদের দল। সে ঘরের আলো জ্বালাল। তখন সে হাঁফাচ্ছিল, কারণ আজকাল শ্বাসকষ্ট প্রবল আকার ধারণ করছে এবং আবার রক্তের গমক আসছে গলা ঠেলে। সে জানে যে, সত্তর বছরের পুরোনো শরীরটার সেই ক্ষমতা নেই যে, নিজের জোরে আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে। শরীর থেকে শরীর বাদ গেলে যে তবু শরীরই পড়ে থাকে, যা করুণ ও অফলা– তাকে পঁচিশ বছর আগে সে চিনেছিল। তাই আর অনর্থক সময় নষ্ট করতে চাইল না। অন্ধকার পুকুরের দিকে তাকালে কুয়াশার ভ্রম হয়, অথবা, চোখ ঝাপসা থাকার কারণে মায়াময় ও আবছা লাগে অনেক কিছু। সে জানালা বন্ধ করল। খাটের নীচে একটা বাক্স থেকে বার করল দড়ি, যা আগে থেকে কেনা ছিল। দড়িটা বেশ মসৃণ, এবং টেনে ধরলে বোঝা যাবে, শক্তপোক্ত। সিলিং ফ্যানের আংটায় বাঁধতে যাবার আনুষঙ্গিক পরিশ্রমসমূহ — চেয়ার আনা, খাটে পেতে তার ওপর ওঠা, দড়ি বার বার বাঁধতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া– করতে গিয়ে তার মনে হল দমবন্ধ হয়ে আসছে। চাপাকাশির সঙ্গে তার মুখ থেকে তখন ছিটে ছিটে রক্ত বেরোচ্ছিল। একবার ভাবল, কাজ থামিয়ে কবরেজি তেলটা বুকে মালিশ করবে। কিন্তু, তারপর বুঝল, থেমে গেলে আর এগোতে পারবে না। তাই দাঁতচাপা প্রতিজ্ঞায় একসময়ে কাজটা শেষ করল। তখন ছাদে উঠলে কেউ চিলেকোঠার ঘর থেকে ভেসে আসা শ্বাসটানার গভীর আওয়াজে ভয় পেতে পারত, কারণ শব্দটা ছিল অভিঘাতময় গর্জনের মতো। সেরকম হাঁফাতে হাঁফাতেই সে চেয়ারের ওপর উঠল। মশারা তাকে ঘিরে ধরেছিল। গলায় ফাঁস পরে চেয়ারে দাঁড়িয়ে তার মনে হল, শীতকালে মশা বাড়ে যেহেতু, জানালা আগে বন্ধ করা উচিত ছিল, কারণ এখন পায়ে মশা কামড়াচ্ছে। এই সূত্রে কী যেন একটা তার মনে ‘পড়বে পড়বে’ করছিল তখন। তবু, লাভ নেই বুঝে মাথা নাড়ল আনমনে। তার বিস্মৃতি স্থায়ী হয়েছে পঁচিশ বছর এবং একটা ভারী পাথরের মতো তার বুকে চেপে বসে তিলে তিলে লাংসকে ক্ষইয়ে দিয়েছে, এই বিস্মৃতি। আজ নতুন আশা করে কী লাভ? চোখ বুজে ঠোঁট কামড়াল সে। তারপর চেয়ারটাকে লাথি মেরে সরিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো স্মৃতিরা ঝলসে উঠল, যারা এতগুলো বছর ঘুমিয়ে থেকেছে। তার মনে পড়েছে সব কিছু। কিন্তু, ততক্ষণে ঘাড়ে চাপ পড়েছে এবং অন্ধকার হয়ে আসছে চরাচর। সে প্রাণপণে ফেলে আসা দৃশ্যগুলোকে মানসচক্ষে দেখতে চাইল। তখন তার চেতনা লুপ্ত হল।

সেটা ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের এক রাত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *