১৭
কয়েক দিন ইম্যানুয়েল বাড়ি থেকে না বেরিয়ে দাবা খেলে কাটালেন। আর, বার বার পড়লেন ‘পোয়েটিক্স’ এবং ‘বুক অফ ইনক’। অগাস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে এক রবিবার সকাল এগারোটায় তিনি প্রথমে এসপ্ল্যানেডে গিয়ে একটা সাড়ে সাতশো জ্যাক ড্যানিয়েলস কিনলেন। তারপর বাস ধরে শোভাবাজার রওনা দিলেন। বিডন স্ট্রিটের একটা বাইলেন ধরে এসে দাঁড়ালেন এক চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে। জীর্ণ দেওয়ালে অসংখ্য ফাটল। তাদের ওপর দিয়েই ‘এই চিহ্নে ভোট দিন’। বাইরে থেকে টানা বারান্দা চোখে পড়ে। সেখানে কয়েকটা পায়রা বসে বকবক করছে। আগে নীচে প্রশস্ত রোয়াক ছিল, উত্তর কলকাতায় যেমন থাকে— ফ্ল্যাট হলেও রোয়াক বাদ পড়েনি। এখন সেখানে একপাশে একটা সাইবার ক্যাফে হয়েছে। অন্যপাশে সালোঁ ও স্পা সেন্টার। উত্তর-পূর্বের এক তরুণী স্পা সেন্টারের ব্র্যান্ডেড শার্ট পরে বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে নিবিষ্ট। ইম্যানুয়েলের দিকে ফিরে তাকাল না। গলির ভেতর ক্রিকেট খেলছে কয়েকটা ছেলে। ফ্ল্যাটের মেইন দরজা খোলা ছিল। ইম্যানুয়েল ইতস্তত করছিলেন, সার সার কলিং বেলগুলোর ভেতর নির্দিষ্ট বেলটা টিপবেন কি না। তারপর কী ভেবে ভেতরে ঢুকলেন। পেছন থেকে চিৎকার এল ‘হাউজ দ্যাট!’
তিনতলায় উঠে হাঁপাচ্ছিলেন ইম্যানুয়েল। এত পুরোনো ফ্ল্যাটবাড়িতে লিফ্টের প্রশ্ন ওঠে না। এই ফ্লোরে চারটে দরজা। দুটোয় কোলাপসিবল গেটের বাইরে মরচে পড়া তালা। একটা দরজার ভেতর থেকে গাঁক গাঁক করে ‘ওম জয় জগদীশ হরে’ ভেসে আসছে। দরজার ওপর অ্যাংরি হনুমানের পোস্টার। চতুর্থ ফ্ল্যাটের বেল টিপলেন ইম্যানুয়েল। সঙ্গেসঙ্গে ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে এল, ‘হু দ্য হেল!’
মৃদু হেসে আবার বেল টিপলেন। এবার অন্য গলায় চিৎকার, ‘চুপ করবে তুমি? দরজা তো খুলে দেখতে পারো।’
‘ড্যাম!’
চেন খুলে দরজা খুলে দিল সালোয়ার-কামিজ পরা এক তরুণী। মধ্য তিরিশের হাসিখুশি মুখে মেচেতার দাগ। ইম্যানুয়েলকে দেখে অভ্যস্ত হাসল, ‘অনেক বছর পর এলেন।’
‘ভালো আছ?’
‘যেমন থাকি।’ তরুণী মাথা ঘুরিয়ে নির্দেশ করল, ‘একইরকম আছে।’
ড্রয়িং রুমে একটা সিঙ্গল সোফায় স্কার্ট, ব্লাউজ পরে এক বৃদ্ধা বসে আছেন। টেবিলে দাবার বোর্ডে অসমাপ্ত খেলা। ইম্যানুয়েল তাঁর সামনে বসে জেডির বোতল রাখলেন। ‘যদিও এই বয়েসে তোমার খাওয়া উচিত নয় আর।’
‘কেন এসেছ? গেট আউট!’ বৃদ্ধা ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে চোখ কোঁচকালেন। ‘আট বছর তিন মাস আট দিন। তার মধ্যে ফোনও করোনি। এখন ভোলাতে এসেছ? বেরোও।’
‘উফ, মাম্মো!’ তরুণী বলল।
‘তুই থাম। এই ইডিয়টটাকে চলে যেতে বল।’
‘বেশ।’ ইম্যানুয়েল জেডি হাতে উঠে দাঁড়ালেন।
‘বোতলটা রেখে যাও।’
‘নাহ্।
‘নাহ্। তা হয় না। সম্পর্ক শেষ।’
‘হ্যাঁ, শেষ। কিন্তু, ওটা আমার জন্য এনেছ।’
ইম্যানুয়েল বোতল হাতে ঘাড় হেলালেন। ভুরু উঁচু। ভাবটা হল, তিনি কেয়ার করেন না। কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ। তারপর বৃদ্ধা ফিক ফিক করে হাসলেন। ‘ব্লাডি বাগার। একদিন আই উইল কিক ইউ ইন ইয়োর বলস।’
আশ্বথী জোসেফ মালয়ালি ক্রিশ্চান, কলকাতায় আজন্ম আছেন। কলকাতার প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের একজন, যিনি সাতের দশকে কোবল, সি এবং ফোর্টরান নিয়ে কাজ করেছেন। প্রথমে চাকরি করতেন ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে। সেখানে সোভিয়েত সহায়তায় ‘উরাল’ নামের যে কম্পিউটার বসেছিল, সেখানে প্রোগ্রামার ছিলেন আশ্বথী। নয়ের দশকে কম্পিউটার সায়েন্স জনপ্রিয় হলে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ তাঁকে পার্টটাইম অধ্যাপক হিসেবে নিয়ে আসে। চুয়াত্তর বছরের আশ্বথী জোসেফ ছোটোখাটো চেহারার, কৃষ্ণকায় শরীরে একটা চুলও কালো নেই। অনেকগুলো বিয়ে, অনেকগুলো ডিভোর্স। গত তিরিশ বছর ধরে এই ফ্ল্যাটে অনাথ ভাইঝি উষাকে নিয়ে থাকেন। আশ্বথীকে চেনাজানা সবাই ‘মাম্মো’ বলে ডাকত। ইম্যানুয়েলও। আশ্বথী তাঁর গত চল্লিশ বছরের বন্ধু। আশ্বথীর অন্য একটা পরিচয় হল তিনি কলকাতার সত্তর দশকের পরিচিত দাবাড়ু যিনি কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ না-নিলেও চেস ক্লাবগুলো তাঁকে কিংবদন্তি হিসেবে মান্য করত। আশ্বথী তাঁর অ্যাগ্রেসিভ মুভ এবং ইনোভেশনের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এরকম এক চেস ক্লাবে ইম্যানুয়েলের সঙ্গে তাঁর আলাপ। আশ্বথী একমাত্র, যিনি ইম্যানুয়েলকে বলে বলে চেকমেট করতে পারতেন। বন্ধুরা বলত, আশ্বথীর আইকিউ ২০০, আর আশ্বথী মাতাল গলায় হাসতেন, ‘আইকিউ মাই ফুট।’ একসময়ে বহু দিন, রাত ইম্যানুয়েল এই ফ্ল্যাটে কাটিয়েছেন।
ইম্যানুয়েল মাম্মোর সামনে বসলেন আবার, নিবিড়ভাবে তাকালেন বন্ধুর দিকে। ‘তোমার বয়েস কি এক-শো পেরোল, মাম্মো?’
‘এক-শো হোক বা দেড়শো, আবার প্রেম করতে মন চায়, বুঝলে? ওই ফুল স্কারলেট ও’হারার মতো, বোকার মতো, অন্ধের মতো—’ এলোমেলো হাসলেন মাম্মো।
‘আজ তাহলে কি তোমরা সকাল থেকেই চালু করে দেবে নাকি?’ ঊষা ঠোঁট কোঁচকাল।
‘আবার কী! ব্লাডি জ্যু-টা কতদিন পরে এসেছে, দেখছিস না? ও বিফ ফ্রাই খেতে ভালোবাসে। ফ্রিজে আছে না একটু কাঁচা মাংস? দুটো গ্লাস দিয়ে যা।’
ইম্যানুয়েল হাসলেন। কেউ জানে না, তিনি একমাত্র মাম্মোর সঙ্গে বসে মদ খান।
মদের গ্লাস তুলে মাম্মো বললেন, ‘চিয়ার্স।’ তারপর নড়বড়ে পায়ে উঠে গেলেন আলমারির দিকে। লকার খুলে একটা অ্যালবাম বার করলেন। ইম্যানুয়েলের পাশে বসে অ্যালবাম খুলে হাত বোলালেন এক-একটা ছবির গায়ে। তিনি, ইম্যানুয়েল আর তাঁর এক পুরোনো প্রেমিক, ট্রিঙ্কাসের সামনে। একটা গ্রুপ ফটো। মাম্মোর দ্বিতীয় বিয়েতে সবাই নবদম্পতিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। ইম্যানুয়েল একদম কোনায়, তাঁর চোখ অন্যদিকে। অন্য একটা ছবিতে ইম্যানুয়েল নেই। মাম্মো আর তাঁর দুই ভাই, এখন দু-জনেই মৃত। মাম্মো ইম্যানুয়েলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। ‘আই অলওয়েজ লাভড মাই বয়েজ। অল অফ ইউ ওয়্যার সো হ্যান্ডসাম!’
‘কেমন আছে তোমার স্বামীরা?’
‘জানি না। আমি যোগাযোগ রাখি না বহুকাল, ইজি। সবাই স্মৃতিতে ভালো। তুমি কেন এসেছ?’ গ্লাসে চুমুক দিয়ে মাম্মো বললেন, ‘কেউ আসে না। সেটাই ভালো।’
‘তুমি জানো, কেন এসেছি। যেমন বহুবার আসতাম আগে।’
‘স্বার্থপর, তোমরা সব পুরুষেরা।’ মাম্মো বিড়বিড় করলেন। ‘বলো, কী গল্প।’
ইম্যানুয়েল তাঁকে দীর্ঘ সময় ধরে মালিনীর গল্প বললেন। তার মধ্যে মাম্মোর চারটে সিগারেট খাওয়া হয়ে গেল। মদ শেষ করলেন আড়াই পেগ। কাহিনি শেষ হলে মাম্মো বললেন, ‘এতদিন পরে ফিরে এলে! জানতাম তুমি ফিরবে। তুমি হলে, আমাদের প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজে যাকে হাইজেনবার্গ বলে। একটা বাগ, যাকে খুঁজতে গেলে অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার দুম করে উধাও হয়। আট বছর তিন মাস আট দিন। আমি হিসেব রাখি।’
‘জাভেদের অনুরোধে।’
‘উঁহু।’ বিরক্ত হয়ে ঘাড় নাড়লেন মাম্মো। ‘তোমার ইচ্ছে না-থাকলে ফিরতে না। ঘনশ্যাম এখনও আসে?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলেন ইম্যানুয়েল।
২০০৪ সালের শীতকালে মানিকতলায় একটা বড়ো সার্কাস পার্টি এসেছিল। দু-দিনের মাথায় সার্কাসের ক্যাশিয়ার খুন হয়। কেসের কূলকিনারা না-পেয়ে জল গড়াতে গড়াতে লালবাজারের হোমিসাইডে আসে। ইম্যানুয়েল শনাক্ত করেছিলেন ঘনশ্যাম হালদারকে। ঘনশ্যামের বাড়ি ছিল বানতলা। সে শীতকালে সার্কাসে ক্লাউন সাজত। অন্য সময়ে চ্যাপলিন সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানবাড়িতে যেত অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য। খুন হবার আগের দিন মেয়েমানুষ-ঘটিত এক তুচ্ছ কারণে ঘনশ্যামের সঙ্গে ক্যাশিয়ারের মারামারি হয়েছিল। কিন্তু, খুনটা ঘনশ্যাম করেনি। আগের বছর সার্কাসের ম্যানেজারের সঙ্গে পেমেন্ট নিয়ে ঘনশ্যামের ঝামেলা বেধেছিল। তখন সার্কাস পার্টির শ্রমিকদের ভেতর বামপন্থী ইউনিয়ন ছিল। তারা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে এবং কথা কাটাকাটি হয়। উত্তেজনার বশে ম্যানেজারকে চড়চাপড় মেরেছিল কয়েক জন। ব্যাপারটা তারপর মিটে গেলেও ম্যানেজার ভোলেনি। ক্যারম খেলার নিয়ম অনুসারে, কোনো ঘুঁটিকে পকেটে ফেলার উপায় হল, স্ট্রাইকারের মাধ্যমে অন্য নিরীহ ঘুঁটি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুকে টার্গেট করা। ক্যাশিয়ার ছিল সেই নিরীহ ঘুঁটি এবং টার্গেট ঘুঁটি ঘনশ্যাম। ম্যানেজার লোক লাগিয়ে ক্যাশিয়ারকে খুন করিয়েছিল। অ্যালিবাই এবং মোটিভ ঘনশ্যামের বিরুদ্ধে ছিল। সে উপায় না- দেখে বানতলার বাড়িতে চলে যায়। ইম্যানুয়েল লোকাল থানার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন, তার বস্তির ঘরের সামনে মানুষের ভিড়। নীরবে পুলিশকে তারা রাস্তা করে দিল। ঘরের সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে ঘনশ্যামের বউ। পুলিশ দেখে ভাবলেশহীন মুখে ঘরের ভেতর তাকাল। চ্যাপলিনের বেশে ঘনশ্যাম সিলিং থেকে ঝুলছে। তার কয়েক দিনের মাথায় সত্যিটা সামনে আসে। ম্যানেজারই কনফেস করেছিল তার এক সহকর্মীর কাছে। ইম্যানুয়েল চাকরি ছেড়ে দেন।
‘তুমি কি বোঝো, আমার ছাড়ার কারণ এটা নয় যে, আমি ভুল করেছিলাম?’
‘জানি। আগেও বলেছ। তেসুবাহ। কিন্তু ইজি, তখন এটা না হলেও তুমি চাকরি ছাড়তে কারণ, তুমি ফুরিয়ে আসছিলে।’
‘ম্যানেজার নিজেও এক্সপ্লয়েটেড ছিল। টাকাপয়সা পেত না। কিন্তু খেপ আর্টিস্ট, ক্লাউন বা মেয়েগুলোকে ঠকানোয় খামতি ছিল না।’
‘কেন হবে না? হলোকস্ট সারভাইভর পরবর্তীকালে গাজা স্ট্রিপে প্যালেস্তিনীয়দের ওপর বম্বিং-এর টেকনিক্যাল পলিসি তৈরি করেছে, তুমিই অনেক বছর আগে বলেছিলে আমাকে।
‘ঘনশ্যাম মাঝে মাঝেই আসে।’
‘আসুক। দরকার সেটা। আমার কাছে যদি বাবা ফিরে আসত, আমি বলতাম, ভুল করেছি। তুমি জানো, বাবাকে কখনো কোনোদিন মুখ ফুটে বলিনি যে, আমি ভালোবাসি। আর, আজকাল রোজ মনে হয়, যদি একবার বলতাম। যদি জেনে যেত যে, আমি তাকে কতটা ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু, বাবা তো আসে না!’ সামনের অসমাপ্ত দাবার বোর্ডের দিকে দেখালেন মাম্মো। ‘আগে বলো সলিউশন কী, তারপর অন্য কথা। হোয়াইট টু মুভ।’
বোর্ডে কালো রাজার একটা বোড়ে আর একটা হাতি বেঁচে। সাদা রাজার আছে দুটো ঘোড়া আর একটা বোড়ে। বেশ কয়েক মিনিট সময় নিলেন ইম্যানুয়েল। তারপর বললেন, ‘এনবিফাইভপ্লাস, চেক এবং কেবিটু। তারপর এনক্রসএথ্রি। নাইট গিয়ে কালো বোড়ে খাবে। বিক্রসএথ্রি। কালো বিশপ এসে নাইট ক্যাপচার করবে। সবশেষে এনবিফোর। মিউচুয়াল জুগজোয়াং। ব্ল্যাক বিশপের বেরোবার রাস্তা আটকে ট্র্যাপড হবে। ব্ল্যাক হারবে।’
মাম্মো ঠোঁট ওলটালেন। ‘ভালো। কিন্তু, বেটার সমাধান আমার জানা ছিল।’
দুপুরের খাবার তাঁরা সোফায় বসেই খেলেন। উষা জোর করে খাইয়ে দিল অনেকটা। ইম্যানুয়েল ‘না, না’ করছিলেন। মাম্মো ধমক দিলেন। ‘খেয়ে নাও। যা চেহারা বানিয়েছ, আর ইতরবিশেষ হবে না। উষার হাতের রান্না দিন দিন খুলছে। ও লেসবিয়ান, জানো তো? একটা ছুঁড়িকে মাঝে মাঝে আমাদের ফ্ল্যাটে আনে।’
‘মাম্মো, প্লিজ।’ উষার মুখ লাল হয়ে উঠেছে।
‘কেন রে! লজ্জা পাচ্ছিস নাকি! শোনো ইজি, তুমি ব্লাডি জ্যু এসব বুঝবে না। লেসবিয়ানরা দারুণ রান্না করে। তোমার ধর্মে তো আবার এসব ইমপ্রপার।’
মদের গ্লাস তুলে চিয়ার্স করলেন ইম্যানুয়েল। হাসলেন।
‘তোমার মনে পড়ে, একবার আমি, তুমি আর উদয় মিলে সারারাত মদ খেয়েছিলাম এই ফ্ল্যাটে? ওহ্, ভুল হল, অন্যের সামনে তুমি তো মদ খাবে না। কালো কফি খেয়েছিলে কাপের পর কাপ আর আমি চেঁচিয়ে তোমায় গালাগালি দিচ্ছিলাম, লিভারের বারোটা বাজবে। তুমি হামিন বানিয়েছিলে এখানে। ভাত, গাজর দিয়ে ওরকম চিকেন ডিশ আমি কখনো খাইনি। সেদিন তুমি এক ভিখিরি শিশুর খুনের কেস সল্ভ করে সেলিব্রেট করতে এসেছিলে। জানো, উদয়ের দুটো কিডনিই খারাপ। ডায়ালিসিস চলে সপ্তাহে দু-বার। মুখ ফুলে গেছে। কথা বলতে পারে না।’ মাম্মো ফোঁপালেন। ‘কেন এলে তুমি! তোমরা বার বার কেন যে আসো আমার কাছে!’
‘সেই রাত মনে আছে, মাম্মো। এগুলো ভোলার নয়। কিন্তু, তুমি তো আমার গল্পটা নিয়ে কিছু বললে না?’
চোখের জল মুছে ধরাগলায় মাম্মো বললেন, ‘জানি, তুমি সমাধান করেছ। আমিও শুনেই বুঝেছি, অপরাধী কে। কী হবে আর বেদনা বাড়িয়ে, ইজি?’
‘আমার দ্বিধা, তুমি বুঝবে? লেট দ্য স্লিপিং ডগস লাই, নাকি, অন্য কিছু? কোনটা ন্যায়?’
‘স্কেপগোট কখনো দরকার পড়ে, তুমি জানতে না? ন্যায়ের থেকে বড়ো হল জীবন।’
‘প্রথমদিনই সেটা আমি জাভেদকে বলেছিলাম। কিন্তু, জীবনের মূল্য কী, যদি তার রিডেমশন না হয়? এক্ষেত্রে যদি তা না হয়— আমি নিশ্চিত নই হয়েছে কি না- তাহলে ন্যায়কে ফিরে আসতে হবে অন্য রূপে হলেও।’
‘আমি তা মানি না। শোনো ইজি, অপরাধ বড়ো না শাস্তি, এ তর্ক অনেক পুরোনো। তোমার কেসে অপরাধের থেকে শাস্তি যে বড়ো, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু, আমি তোমায় অন্য একটা প্রশ্ন করছি। তুমি আমায় একবার আজাজেলের কাহিনি শুনিয়েছিলে, শাপভ্রষ্ট দেবদূত। পরে ‘বুক অফ লেভিসিটাস’-এ পড়েছিলাম। স্কেপগোটের উৎপত্তির ইতিহাস। অ্যারন নিজের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ দুটো ছাগল নিয়ে লর্ডের সামনে গিয়েছিলেন। লটের মাধ্যমে বাছাই করে একটাকে বলি দেওয়া হয়েছিল, অন্যটাকে আজাজেলের জন্য জীবিত অবস্থায় মরুভূমিতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। মানে, একজন মরল, অপরজন বেঁচে থাকল এবং হারিয়ে গেল মরুভূমির ভেতর। কিন্তু, যদি উলটোটা হত, যার মরার কথা সে বাঁচল এবং মরুভূমিতে হারাল, আর যার বাঁচার কথা সে মরল, তাহলেও কি অ্যারনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হত?’
‘হিব্রু বাইবেল অনুসারে, না। কারণ, কে কোন কাজে লাগবে তা দৈবনিৰ্দিষ্ট ছিল।’
‘আমি, তুমি কেউ দৈব মানি না। তুমি আসল জায়গাটা বুঝছই না। দুটো প্ৰাণীই মরবে। যে মরুভূমিতে রাস্তা হারিয়েছে, তার আয়ু কতটুকু? একজন আগে মরবে আর অন্যজন দু-দিন পর। কাজেই, যদি উলটোটাও ঘটত, তাতেও দু-জন মরতই। এরা সত্যিকারের বলিপ্রদত্ত। এই ট্র্যাজেডিকে কোনোভাবে এড়ানো যেত না, ইজি। এখানে কোনো রাস্তাতেই ন্যায় নেই। একমাত্র ন্যায় হত, মালিনীকে হত্যা করা না হলে। তারপর যা হয়েছে সব ডমিনো এফেক্ট। রিডেমশন, হ্যাঁ দরকার। কিন্তু, সেটা ধরো হল না। তার পরেও, ঈশ্বরের কাছে যে প্রাণীর ইতিমধ্যেই বলি হয়ে গেছে, তাকে তুমি ফেরাবে কী করে?’
অনেকক্ষণ দু-জন নীরব ছিলেন। ইম্যানুয়েল তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘জানো, ‘পোয়েটিক্স’ পড়ছিলাম। ট্র্যাজেডিতে রিভার্সাল কীভাবে আসে, দেখলাম যেন চোখের সামনে। মালিনী সব কিছু ঠিক হবে এই আশায় অনিরুদ্ধকে নিজের বাড়ি ডাকলেন। তার ফলে নিহত হলেন। কিন্তু, তারপর রেকগনিশন হল কি? সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে কে?’
‘সেটার দরকারই-বা কেন? কেউ যদি কিছু না-জানে, তাতে তো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। এই বয়েসে তোমার কী পাওয়ার আছে, ইজি?’
‘তবু আমাকে জানাতেই হবে। জাভেদের কাছে দায়বদ্ধ আমি।’
‘এসব প্রতিজ্ঞা তোমাদের পুরুষদের ব্যাপার, আমি বুঝি না। বহুকাল দাবার পার্টনার পাই না। ঊষা মাথামোটা, খেলতেই জানে না। আজ একটা গেম খেলবে?’
‘আমি মাতাল, মাম্মো।’ সিগারেটে বড়ো টান দিলেন ইম্যানুয়েল। ‘আট বছর পর মদ খাচ্ছি।’
‘আমিও মাতাল। চলো, খেলি।’
এবং, তাঁরা দু-জন দাবার বোর্ডের দু-দিকে ঝুম হয়ে বসে থাকলেন রাত ন-টা পর্যন্ত। মাঝে ঊষা এসে নীরবে একটা ডিমলাইট জ্বালিয়ে দিয়েছিল, কেউ খেয়াল করেননি। পাড়ার হইচই স্তিমিত হল। দূর মাইক থেকে সন্ধ্যা মুখার্জির কণ্ঠে ‘মায়াবতী মেঘে এল’ ভেসে আসছে। জ্যাক ড্যানিয়েলস নিঃশেষিত। দু- জনেরই কথা জড়িয়ে এসেছে। কিন্তু, কেউ কাউকে চেকমেট করতে পারেননি। বোর্ডে সাদা ইম্যানুয়েলের একটা ঘোড়া বেঁচে। কালো মাম্মোর ভাণ্ডারে একটা হাতি। আর, দু-পক্ষের একটা করে বোড়ে। তারপর ইম্যানুয়েল দু-হাত তুললেন, ‘আর পারছি না। ড্র করে দাও।’
হাসলেন মাম্মো, ‘আমি খেতামই। খেতামই খেতাম।’
ইম্যানুয়েল উঠে পড়লেন। মাথা ঝিমঝিম করছে। মাম্মো বললেন, ‘খেয়ে যাও।’ মাথা নাড়লেন ইম্যানুয়েল। মাম্মো বাধা দিলেন না। প্রায়ান্ধকার ঘরে আরেকটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঝুম হয়ে বসে থাকলেন। তারপর পুরোনো অ্যালবাম তুলে নিলেন কোলে।
দরজা খুলে ইম্যানুয়েল বেরোবার সময় মাম্মো পেছন ফিরে তাকালেন না। শুধু বললেন, ‘তোমার যদি মনে হয় এই কেসে ন্যায়ের ওপরে জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছ, তাহলে আবার ফিরে এসো। যদি দ্বিধান্বিত থাকো, তাহলেও এসো। আবার দাবা খেলব। কিন্তু, যদি সেটা না-পারো, এসো না আর। আই কান্ট সি মাই বয়েজ ফেইলড।’ ইম্যানুয়েল উত্তর দিলেন না। নিঃশব্দে দরজা ভেজিয়ে দিলেন।
