হামারটিয়া – ১৪

১৪

‘তুমি বুঝতে পারছ যে, এই খবরটা একটা গোটা তদন্তের অভিমুখ পালটে দিতে পারে? এবং, আমায় সেটা জানানো হল না!’

‘ব্লাডি বাগার, আমি জানি না, কেন আমরা মিস করে গেছিলাম এটা! পারমিতা সান্যালকে ইন্টারোগেট করেছিল জুনিয়ার কেউ। আমি করিনি। আবার বলছি ইজি, আমরা শুরু থেকেই মার্ডারারকে পেয়ে গেছিলাম বলে অন্য সব অ্যাসপেক্ট অগ্রাহ্য করেছি। এত বোকাপাঁঠা ছিলাম, কী বলব বলো! নাম কা ওয়াস্তে স্টেটমেন্ট নিতে হয় বলে নেওয়া। যদিও ডিভোর্সের কথাটা পারমিতা পুলিশকে জানাননি। ফলে, এক্ষেত্রে কিছু করার নেই।’

‘যদি পারমিতা মুখার্জি আগে থেকে সব জানতেন, তাহলে মালিনীর পারমিতাকে বলে দেবার হুমকির কোনো অর্থ থাকে না। এবং, পারমিতা যদি অনিরুদ্ধকে ডিভোর্স দিতে রাজি থাকেন, তাহলে অনিরুদ্ধর মালিনীকে খুন করারও কারণ থাকে না।’

‘কিন্তু, মালিনী কি জানতেন যে, পারমিতা জানেন? অথবা, ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলেন?’

‘যদি না জানেন, তাহলে অনিরুদ্ধ কেন তাঁকে জানাননি? তাহলে ডিভোর্স নিতে অনাগ্রহী আসলে ছিলেন অনিরুদ্ধ, তাই তো? কিন্তু তাহলেও, মালিনীকে তিনি খুন করবেন কেন? এমন তো নয় যে, মালিনী তাঁর কাছে তখন কোনো থ্রেট। অথবা, মালিনী সরে গেলে পারমিতা ফিরে আসতেন, এমনটাও মনে হয়নি আমার। তিনি ততদিনে মানসিকভাবে দূরে চলে গিয়েছিলেন। তারপরেও, মালিনীকে মৃত দেখে পারমিতার হৃদয় পরিবর্তন হবে এবং ফিরে আসবেন, এই নড়বড়ে আশার ওপর ভিত্তি করে অনিরুদ্ধ এত বড়ো ঝুঁকি নিতে গেলেন?’

‘আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে।’ হতাশায় হাতের তালুতে ঘুসি মারলেন জাভেদ। ‘তখন এই তথ্য আমি জানলে চার্জশিট ফেলার আগে শালা দু-বার ভাবতাম। দেখো, এই কেস আমাদের কাছে আসারই কথা নয়। ভবানীপুর থানার আন্ডারে পড়ে। কিন্তু, মালিনীর অফিসের বস আমাদের জয়েন্ট সিপি কল্যাণ নিয়োগীর স্কুলজীবনের বন্ধু ছিলেন। তিনি মালিনীকে অসম্ভব স্নেহ করতেন বলে শুনেছিলাম। তিনিই নিয়োগীর মাধ্যমে হোমিসাইডে কেসটা আনেন, যাতে প্রপার তদন্ত হয়। এবার, সেক্ষেত্রে এসব ছুটকো জিজ্ঞাসাবাদের কাজ লোকাল থানাই করবে। আর্কাইভ গেলে রেকর্ডে পেয়েও যাব কে করেছিল। কিন্তু, পেয়ে লাভটা কী? সেই মাল কেন এই তথ্য ওভারলুক করে গিয়েছিল, সেটা পঁচিশ বছর পরে তাকে চার্জ করে কী বাঘ মারা হবে? দায়সারা স্টেটমেন্ট নিয়েছে পুলিশ, বোঝেইনি কোন তথ্য কীসে কাজে লাগবে। যেহেতু অপরাধী ততদিনে আমাদের জিম্মায়।’

‘এমনকী অ্যালিবাই অবধি মন দিয়ে দেখোনি তোমরা। যে পাঁচজন সাসপেক্ট, অনিরুদ্ধ সান্যালকে বাদ দিলে বাকি চারজনের কথা ভেবে দেখো। শতদ্রু দত্ত নিজের বাড়িতে ছিলেন। কে সাক্ষী? কেউ না। দেবারতি অধিকারী ছিলেন বারাসাত কলেজে সিম্পোজিয়ামে। সেদিন সেমিনার চলছিল সারাদিন ধরে। দেবারতির টক ছিল পরেরদিন। সেদিন তিনি নিজের ঘরে বসে প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছিলেন। আসলে কোথায় ছিলেন তার কে সাক্ষী আছে? অনুপ রুংতার ব্যাপারে বলেছি আগেই। পারমিতা মুখার্জি সেদিন মায়ের বাড়ি ছিলেন জানিয়েছেন। যোধপুর পার্ক থেকে ভবানীপুর এমন কিছু বিরাট দূরত্ব নয় যে, মাঝে একবার বেরিয়ে ফিরে আসা যাবে না। বাড়ির অন্যেরা তখন হয়তো দিবানিদ্রায়। ফলত, কারোর অ্যালিবাই টাইট নয় এবং পুলিশ এগুলো খতিয়ে দেখেনি।’

‘কিন্তু, মোটিভ কী?’

‘পারমিতা মিথ্যে বলতে পারেন। হয়তো মালিনীকে তিনি পথের কাঁটা মনে করেছেন। শতদ্রুর ক্ষেত্রে ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা। রুংতার ক্ষেত্রে ঈর্ষা। দেবারতির ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মান, কারণ দেবারতি যেরকম মানুষ তাঁর কাছে সোশ্যাল প্রেস্টিজ বড়ো হয়ে দাঁড়াতেই পারে। যে কারণে নিজের মেয়ের বিরুদ্ধে গিয়ে পারমিতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মৃত্যুর এত বছর পরেও মালিনীর প্রতি তিনি নরম নন। হয়তো স্ট্রোকটাও সেই অভিঘাতে। একটা কথা তো ঠিক জাভেদ, এরা প্রত্যেকে মিথ্যে বলেছে। ভেবেছে পুলিশ ধরতে পারবে না। এবং, পারেনি। কিন্তু, মিথ্যে যে বলেছে সেটা জলের মতো পরিষ্কার।’

‘কী মিথ্যে?’

‘তুমি নিজে ভাবলেই বুঝবে, কোথায় মিথ্যে। প্রত্যেকের বক্তব্যে অসংগতি ছিল। যাই হোক, আরও দু-জনের সঙ্গে কথা শেষ করে নিই। সাসপেক্ট তালিকা শেষ। বাকি দু-জন হলেই তারপর আমি ভাবতে বসব।’

জাভেদ এবং ইম্যানুয়েল ভবানীপুরের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন। মালিনীদের পাশের পাড়া, এখান দিয়ে সোজা এগোলে ল্যান্সডাউন পেরিয়ে পেয়ারাবাগান বস্তি যাওয়া যায়। ইম্যানুয়েল থমকে দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস নিলেন। ‘কেন গাড়ি ছেড়ে হাঁটলাম, জানো? এসব পাড়ায় নব্বই-এর দশক এখনও থমকে আছে। এখনও কোনো গলিপথ দিয়ে গেলে তোমার কানে আসবে পাশের বাড়ি থেকে রেডিয়োতে ভেসে আসা কুমার শানু অথবা কিশোরী আমনকরের গান। এখানে অভিজাত বাড়িগুলোরও অনেকের কাছে ডেলিকেসি হল শ্রীহরির কচুরি। আর, এই কলকাতা আমায় আকর্ষণ করে। এখান থেকে জীবনেও অন্য কোথাও নড়তে পারলাম না।’

‘চেয়েছিলে কি? যখন ভলান্টারি নিলে, চাইলেই ইউরোপ চলে যেতে পারতে। তোমার অনেকে তো ওদিকে—’

‘হ্যাঁ, আমার পিতামহের এক ভাই বার্লিন চলে গিয়েছিলেন। তিনি হলোকস্ট সারভাইভর ছিলেন। তাঁর পরিবার এখন তেল আভিভে। আরও কিছু ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছে। যোগাযোগও আছে হালকা, আগে বেশি ছিল। কিন্তু, আমার আগ্রহ হয়নি। আমার কাছে ইজরায়েল যা, বুরুন্ডিও তাই। অচেনা, অন্যের।’ ইম্যানুয়েল হঠাৎ দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস নিলেন। জাভেদের হাত ধরে টানলেন। ‘চলো তো একবার।’

‘কোথায়? ইজরায়েলে?’

‘মালিনীর বাড়িটা আরেকবার দেখা দরকার।’

আজ দরজা খোলা, তবে গেটে আগের দিনের মতোই তালা। কলিং বেল শুনে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন শতদ্রু দত্ত এবং জাভেদদের দেখে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল। ‘আবার কীসের দরকার?’ ইম্যানুয়েল জানালেন, আরেকবার মালিনীর ঘর দেখতে চান। শতদ্রু ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ঘাড় ঝাঁকালেন। ‘দেখুন মশাই, পুলিশে আমাদেরও জানাশোনা আছে। দেবারতিদি লালবাজারে ফোন করেছিলেন। ওরা তো শুনে আকাশ থেকে পড়ল। আপনাদের কথা কেউ জানেই না। কী উদ্দেশ্য আপনাদের? আগের দিন ক্রেডেনশিয়াল দেখিনি। আজ দেখতে চাইব। এভাবে আমাদের হ্যারাস করার মানে কী?’

ইম্যানুয়েলের অনেকটা সময় লাগল শতদ্রুকে বোঝাতে। তিনি কিছুতেই রাজি হবেন না। আঙুল নাড়িয়ে শাসানির ভঙ্গিতে বলছিলেন যে, তিনি পুলিশে যাবেন। ইম্যানুয়েলরা ফিরেই আসতেন, কিন্তু তখন শতদ্রুর পেছনে এসে দাঁড়াল সাম্য। সে বাবাকে নীচুস্বরে কিছু বলল। শতদ্রু রেগে চিৎকার করলেন, ‘যা বোঝো না, তা নিয়ে নাক গলিয়ো না। চান করে মাথা মোছোনি কেন? নিউমোনিয়া হয়ে পড়ে থাকলে এই বয়েসে তোমায় নিয়ে আমি হাসপাতাল ছুটতে পারব না।’ সাম্য উত্তেজিত হল না। বোঝা যায়, সে এসব সামলে অভ্যস্ত। বাবার হাতে হাত রেখে আবার কিছু বোঝাল। শতদ্রু বিদ্বেষের চোখে ইম্যানুয়েলের দিকে তাকালেন। ‘টিকটিকি এসেছে! অন্যের পাঁক ঘেঁটে আনন্দ পায়। নষ্টামির সীমা থাকা দরকার।’ তারপর মিলিয়ে গেলেন বাড়ির অন্ধকারে। ইম্যানুয়েল একইরকম বিনীত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হল না, এসব কথায় তাঁর কিছু আসছে-যাচ্ছে। সাম্য তাঁদের ভেতরে আসতে বলল। জাভেদের ঠোঁট নড়ছিল, মনে হচ্ছিল ‘ব্লাডি’ জাতীয় কিছু বলতে চান। তারপর চেপে গেলেন।

‘বাবার ব্যবহারে প্লিজ কিছু মনে করবেন না। অনেক বছরের তিক্ততা আর অবসাদ, সে মুখে যতই অস্বীকার করুক, আমি তো জানি! এখন অচেনা কাউকেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।’ মালিনীর ঘরের তালা খুলে বলল সাম্য।

‘আর, আপনার দিদা?’ ইম্যানুয়েল ভেতরে ঢুকে খাটের ওপর বসলেন। জাভেদ বাইরে। এর মধ্যেই দু-বার হেঁচেছেন ধুলোয়।

সাম্যর চোখ নরম হল। ইম্যানুয়েলের মুখোমুখি চেয়ারে বসে বলল, ‘সেদিন যা-ই বলি না কেন, দিদা আমায় অনেক প্রশ্রয় দিয়েছে ছোটোবেলা থেকে, সেটা তো ঠিক। আমায় নিয়মিত টিনটিন কিনে দেওয়া, ‘আনন্দমেলা’ পড়ানো, স্কুলের পড়া ধরা অত ব্যস্ততার ভেতরেও, দিদাই করেছে। মা সময় পেত না, আর যেন ধরেই নিয়েছিল, আমার পড়াশোনার দিকটা দিদা দেখবে। দিদাও আমায় বার বার বলত, মায়ের সময় নেই, কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত, তাই আমি যেন মা-কে বিরক্ত না-করে দিদার কাছে থাকি। পরে বুঝেছি, দিদা চাইত না মায়ের প্রভাব আমার ওপর পড়ুক। আমাকে নিজের মতো করে মানুষ করতে চাইত, যেটা দিদার মনে হত ঠিক। বাবার বাড়ি যখন থাকতাম, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম কখন দিদার বাড়ি আসব। কারণ, বাবা গল্পের বই পড়তে দিত না। বলত, নাটক, নভেল পড়লে স্কুলের পড়াশোনার ক্ষতি হবে। আর, সারাক্ষণ শরীর খারাপের বাতিক— ঠান্ডা লেগে যাবে, পেটখারাপ হবে। দিদার বাড়ি সে-তুলনায় খোলামেলা। পড়াশোনার শাসনের বাইরে অন্য কিছু ছিল না। মা তো ছেড়েই দিলাম, আমার বন্ধু ছিল মা, কিন্তু দিদাও কখনো বলেনি, কেন অঙ্ক ছেড়ে দুপুর বেলা ‘ছুটি ছুটি’ দেখছি। তাই বাবার কাছে বায়না করতাম, ‘আমায় মায়ের বাড়ি রেখে আসো।’ দিদা তখন হয়তো একটা বই পড়ছে, আমি চুপি চুপি ঘরে ঢুকে দিদার পিঠের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম আর দিদা চমকে উঠে বলত, ‘ওরে দুষ্টু, তুমি বাবার থেকে পালিয়ে এসেছ বুঝি? আচ্ছা, এসেছিস যখন, চল একটা চ্যাপলিনের সিনেমা দেখি দু-জন মিলে।’ তখন আমার ওসব বোঝার বয়েস নয়। তবু হাঁ করে গিলতাম, দিদা বুঝিয়ে দিত। আমার মনের জানালা খোলার চেষ্টা চালাত দিদা। তবে, লাভের লাভ যে কিছু হয়নি, দেখতেই পাচ্ছেন।’ সাম্যর হাসিতে তিক্ততা ছিল না, অমলিন বেদনা বরং। ইম্যানুয়েলের মনে হল, এই ছেলেটা তার হাসি দিয়ে ভুবন জয় করে নিতে পারে।

‘আপনি তো চাইলে এখনও শুরু করতে পারেন নতুন করে। বয়েস তো বেশি হয়নি।’

‘আমি চাই। খুব বেশি করেই চাই। আপনাকে বলেছিলাম, সুযোগ থাকলে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম। কিন্তু, আমার চাকরি নেই, মিস্টার গুহ! আর, সেটা বাদে নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য আলাদা কী করব, আমি জানি না। ভয়ও লাগে, একা থাকতে গেলে আবার যদি অ্যাডিকশন ফিরে আসে? অনেকদিন ক্লিন আছি, আমি আর ঝুঁকি নিতে চাই না।’ ইম্যানুয়েল ঘড়ি দেখলেন, এগারোটা তিরিশ। এই সময়ে সাম্যর মতো ছেলেদের কাজকর্মে থাকার কথা। তার বদলে বাড়িতে বসে আছে।

‘আচ্ছা, আপনার দিদা যখন বাইরে যেতেন, ধরুন সেমিনারের সূত্রে, ঘর কি তালাবদ্ধ থাকত? মনে আছে আপনার?’

‘হ্যাঁ। দিদা নিজের কাগজপত্র, বই, কম্পিউটার এসবের ব্যাপারে খুব পজেসিভ। অন্য কেউ হাত দিলে বিরক্ত হত। বরাবর তালা লাগিয়ে যেত।’

‘আমরা এসেছিলাম নির্মলা ঢালির ব্যাপারে খোঁজ করতে। যিনি বাড়ি ঢুকে আপনার মায়ের ঘরের দরজা বন্ধ দেখেছিলেন। নির্মলাদি মারা গেছেন, তাঁর ছেলেকে পেয়েছি। তাঁর কাছে যাচ্ছিলাম, মাঝে মনে হল, আরেকবার এই ঘরটা দেখে যাই। নির্মলাদিকে কি আপনি চিনতেন?’

‘হ্যাঁ। তবে, মা মারা যাবার পর ও এই বাড়িতে কাজ করতে চায়নি। ওদের নানাবিধ কুসংস্কার থাকে। তার ওপর পুলিশ কড়া জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, ওর বর তাতে অশান্তি করে, চাপ দেয় কাজ ছাড়বার জন্য। তার পরেও অবশ্য কয়েক বার এসেছে। পুজোতে দিদাকে প্রণাম করতে আসত ছেলেকে নিয়ে। আমার জন্য একবার তারাপীঠ থেকে প্রসাদ এনেছিল। সেও অনেকদিন হয়ে গেল। নির্মলাদি মারা গেছে সেটাই জানতাম না, এই আপনি বললেন।’

ইম্যানুয়েল খাটের মাথার দিকে সাম্যকে জানালা খুলতে বললেন। খুলতে বেগ পেতে হচ্ছিল। পান্না বসে গেছে। কয়েক বার ধাক্কাধাক্কিতে খুলল। উলটোদিকে কয়েক সার বাড়ি। তাদের পেছনে পুকুর। কয়েক জন মহিলা বাসন ধুচ্ছেন, জামাকাপড় কাচছেন। ১৯৯৮ সালেও কি এই ভিউই ছিল? ‘মোটামুটি একই। এই পাড়া বিশেষ পালটায়নি। তবে, প্লট কিছু ফাঁকা ছিল। ওই ডান দিকের ফ্ল্যাটটা নতুন। ওটা ফাঁকা জায়গা ছিল।’ বলল সাম্য। একটা সুরেলা স্বর আসছে কোথাও থেকে। সা রে গা মা। ইম্যানুয়েল কান পেতে শুনলেন। সাম্যর দিকে তাকালে সে হাসল, ‘সরকারদের বাড়ি। ওদের মেয়েটা রিয়্যালিটি শো-গুলোতে যাবার বায়না ধরেছে বলে বাপ-মা পয়সা দিয়ে মাস্টার রেখেছে। সকাল বেলা ঝাড়া দু-ঘণ্টা রেওয়াজ করে।’

‘আচ্ছা, সুইচবোর্ডের উচ্চতা কত? এনি আইডিয়া?’

আচমকা এমন প্রশ্নে সাম্য হকচকিয়ে গেল। তারপর নিজেকে সামলে বলল, ‘মেপে তো দেখিনি। তবে পুরোনো বাড়ি, সবই উঁচুতে। তা ধরুন,’ চোখের আন্দাজে সাম্য বলল, ‘ছ-ফুট মনে হচ্ছে, না?’

‘হ্যাঁ, আমারও সেরকম মনে হচ্ছে।’ ইম্যানুয়েল উঠে পড়লেন। ‘অনেক ধন্যবাদ, সাম্য। আপনি সাহায্য না-করলে হয়তো ঢুকতে পারতাম না। বাবাকে বলবেন, যেন কিছু মনে না করেন। আজ আর আপনার দিদার সঙ্গে দেখা করলাম না। ওঁর শরীর ঠিক আছে তো এখন?’

‘আছে মোটামুটি। দিদার এখন বই পড়ার সময়। কেউ এলে বিরক্ত হয়।’ নীচে নেমে ইম্যানুয়েল বিদায় নেবেন, সাম্য বলল, ‘একটা কথা, আমি কিন্তু খুশি হয়েছি আপনারা এটা নিয়ে তদন্ত শুরু করায়। মা-কে তো সবাই ভুলেই গিয়েছিল, আর নয়তো মনে রেখেছে খারাপ মেয়ে হিসেবে। যদি মায়ের অন্যদিকগুলো উঠে আসে— আপনাদের বলেছি, মা ছবি আঁকতে ভালোবাসত। সুন্দর আঁকতও। সেসব খাতা চিলেকোঠার ট্রাঙ্কে তোলা আছে। আমার আঁকার স্কুলে ভরতি হওয়া মায়ের উৎসাহেই। আমি বড়ো বয়েস অবধি মায়ের ড্রয়িং খাতাগুলো বারে বারে উলটেপালটে দেখতাম। আমি চাই আপনারা সত্যিটা বার করুন।’

‘সে কি পঁচিশ বছর আগেই বেরোয়নি?’

‘যদি অন্য কিছু হয়েও থাকে, মা সেটা ডিজার্ভ করে। আর, সত্যিটা আগে বেরিয়ে গেলে আপনারা আজ এখানে আসতেন না, তাই না?’

‘সত্যির খোঁজকেই কি ন্যায় বলে আপনার মনে হয়, সাম্য?’ ইম্যানুয়েল যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন। উত্তর শোনার দরকার তাঁর ছিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *