২
২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ডিডি হোমিসাইডের অবসরপ্রাপ্ত ইনস্পেকটর জাভেদ আহমেদের ঠিকানায় একটা হাতে-লেখা চিঠি পৌঁছোলে জাভেদ অবাক হলেন, কারণ ডিজিটাল যুগে এরকম চিঠি আসা প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। তারপর প্রেরকের নাম দেখে তাঁর মনে হল আগে কোথায় যেন শুনেছেন। অবশেষে খাম খুলে চিঠিটা পড়তে গিয়ে নিশ্চিতভাবে মনে পড়ল তাঁর। হাতে চিঠি ধরে চোখ বুজে বসে থাকলেন প্রায় পনেরো মিনিট। তারপর বার বার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পড়লেন। হঠাৎ আপনমনে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘বাস্টার্ড!’ তাঁর স্ত্রী অবাক চোখে তাকালে বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন জাভেদ। কয়েক দিন আগেকার সংবাদপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলেন। আলমারি থেকে পুরোনো ফাইল খুলে দুপুর বেলা বসে থাকলেন ঝুম হয়ে। সেদিন জাভেদ সান্ধ্যভ্রমণে বেরোলেন না। সল্টলেকে নিজের বাড়ির ব্যালকনিতে চিঠি হাতে পায়চারি করলেন অস্থিরভাবে। একসময়ে সিদ্ধান্ত নিলেন চিঠির কথা তিনি ভুলে যাবেন। কিন্তু, পরদিন সকালে স্টাডিতে গিয়ে আবার তাঁর চোখে পড়ল। চিঠিটা সামনে খুলে বসে থাকলেন টানা একঘণ্টা। অবশেষে চোখ বুজে মাথা নাড়লেন নিজের মনে–এ বিষয়ে একটা স্টেপ তাঁকে নিতে হবে। এগোবার আগে কয়েক দিন সময় চাইছিলেন নিজেকে গুছিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু, যত দিন গেল, জাভেদ আহমেদ সিদ্ধান্ত নিতে তত দেরি করছিলেন। কখনো পার্কে হাঁটতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে তাঁর মনে পড়ত, একটা কাজ যেন অসমাপ্ত থেকে গিয়েছে। ডাক্তারের কাছে রুটিন চেক-আপ করতে গিয়ে হৃদযন্ত্র তাঁকে জানান দিত, হাতে সময় বেশি নেই। অবশেষে, জুলাই মাসে জাভেদ তাঁর প্রাক্তন কলিগ ইম্যানুয়েল গুহর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।
সল্টলেকের নির্জন বারের দোতলায় বসে বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যাবেলা ইম্যানুয়েল গুহর হাতে চিঠি তুলে দিলেন জাভেদ। শুনশান বারের ভেতর কালচে মেঘ ঢুকে পড়বার উপক্রম করছিল। সেই ছায়ায় ইম্যানুয়েলের স্থূলকায় শরীরটাকে আরও বেঢপ লাগছিল। ছাই রঙের পাঞ্জাবি আর জিন্স পরে থাকা ইম্যানুয়েলকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে জাভেদ বুঝলেন, বয়েসের আঁকিবুকি কতটা অভিঘাতময় হতে পারে। ইম্যানুয়েলের ভারী মুখ, আলগা চর্বির থাকে থাকে সময়ের শ্যাওলা, যখন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেন মনে হয় আজীবন সেখানেই বসে থাকবেন। কোথাও যাবার তাড়া নেই। মন্থর গতি এবং সময় নিয়ে ধীরে কথা বলার অভ্যেস অবশ্য কম বয়েসেও ছিল। উলটোদিকে ইম্যানুয়েলের মনে হচ্ছিল, জাভেদকে বয়েসের তুলনায় বেশি বুড়োটে এবং শীর্ণকায় লাগছে। মাথার চুল পাতলা, ফুলে উঠেছে কপালের শিরা। ঢোক গিললে অ্যাডাম’স অ্যাপেল লাফিয়ে ওঠে। প্রায় কুড়ি বছর পর তাঁদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটেছে। ইম্যানুয়েল গুহ, ডিডি হোমিসাইডের প্রাক্তন ইনস্পেকটর, কাঁচা-পাকা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে চিঠিটা দু-বার পড়লেন। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে তাঁর চোখ বোঝা যায় না। অজস্র আলোর ঝিকিমিকি। চিঠিটা ভাঁজ করে একপাশে রাখলেন। তারপর বেসিক প্রশ্নটা প্রথম জিজ্ঞাসা করলেন, যেটার জন্য জাভেদ প্রস্তুত ছিলেন। এই হত্যারহস্য জাভেদ সমাধান করে ফেলেছেন পঁচিশ বছর আগে। ঘটনার দিনেই খুনি ধরা পড়েছিল। সেক্ষেত্রে এখন কেন আবার এটাকে নিয়ে নতুন করে তিনি ভাবতে চাইছেন? উত্তরে জাভেদ মাথা পেছনে হেলিয়ে হাঁ করে শ্বাস নিলেন। ‘ওল্ড মঙ্ক’-এ চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আমার বরাবরের খটকা ছিল।’
‘তাহলে তখনই সন্দেহের নিরসন করোনি কেন?’
‘কারণ, আমরা কোনো অলটারনেটিভ পাইনি। ব্লাডি বাস্টার্ড।’ জাভেদ মুখ বিকৃত করে বিড়বিড় করলেন, ‘এই চার্জশিটের চক্করে ইনভেস্টিগেশনের মা বোন হয়ে যায়। যাই হোক, অভিযুক্তর উকিলও কোনো শক্তপোক্ত বিরুদ্ধ প্রমাণ হাজির করতে পারেনি, সম্ভবত চেষ্টাও করেনি। আমার ধারণা, সবাই মনে মনে জানত যে, এত ওয়াটারটাইট কেসে পুলিশকে চেকমেট করা সম্ভব নয়। আমি তোমাকে সত্যিটা বলছি, আমরা অন্য সম্ভাবনা খতিয়েও দেখিনি, আর সেটাই স্বাভাবিক ছিল। রেড-হ্যান্ডেড ধরা পড়েছে খুনি, কেনই-বা বিকল্পর দিকে তাকাব?’
‘তাহলে এখন কেন?’ নিজের মনে প্রশ্ন করলেন ইম্যানুয়েল। তারপর ঘাড় নাড়লেন, ‘অবশ্য, কেনই-বা নয়!’
বারের ব্যালকানতে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে জাভেদ স্মৃতিচারণ শুরু করলেন। টিপটিপে বৃষ্টি, মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া। সল্টলেকের আকাশে ঘন সবুজ গাছেরা গালিচা বিছিয়েছে। ভাঙা রাস্তার জলকাদা ছিটকে উঠছে গাড়ির চাকায়। একটা কুকুর কেঁউ শব্দে প্রতিবাদ জানাল।
১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর শনিবার বিকেল চারটের সময় ভবানীপুরের এক পুরোনো বাড়ির দোতলা থেকে ছত্রিশ বছর বয়েসি মালিনী অধিকারীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়। গলায় ছুরির আঘাতে খুন হয়েছিল। ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে বন্ধ করা দরজা ভেঙে মৃতদেহ আবিষ্কার হয়। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখা গিয়েছিল, খাটে মালিনীর পাশে তাঁর প্রেমিক অনিরুদ্ধ সান্যাল হতবুদ্ধি অবস্থায় বসে আছেন। মার্ডার ওয়েপন, মানে, গলায় গাঁথা ছুরিতে অনিরুদ্ধর হাতের ছাপ মিলেছিল। স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হিসেবে, অনিরুদ্ধই অপরাধী, যদিও অনিরুদ্ধর দাবি ছিল, অত্যধিক নেশা ও ক্লান্তির কারণে গোটা সময়টা তিনি ঘুমিয়ে কাটিয়েছিলেন। এহেন দুর্বল ডিফেন্স আদালতে খারিজ হয়ে যায়। যাবজ্জীবন হয় অনিরুদ্ধ সান্যালের।
‘এরকম ওপেন অ্যান্ড শাট কেস নিয়ে তুমি দ্বিধাগ্রস্ত কেন?’ সিগারেটে টান দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন ইম্যানুয়েল।
‘কারণ, আমার ড্যাম সিক্সথ সেন্স বলছিল, এর ভেতর অন্য গল্প আছে। অনিরুদ্ধকে নিয়ে আমি কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। কিন্তু, আমার কিছু করার ছিল না বলে ক্লোজ করি। তাও, চার্জশিট দিতে দেরি করছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিল, অন্য সমাধান হয়তো থাকতেও পারে। শেষে এসিপি সুকান্ত গোঁসাই ধমক দিল। কী আর করব, ফেলে দিলাম শালার চার্জশিট। ধ্যাত!’ একটা মাছি বসছিল হাতে, জাভেদ বিরক্ত হয়ে হাত ঝাঁকালেন।
ইম্যানুয়েল মন্তব্য করলেন না। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট ভুলে রাস্তার দিকে অন্যমনস্ক তাকিয়ে ছিলেন। উলটোদিকের ফুটপাতে জুতোর বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং। চ্যাপলিনের বেশে রাজ কাপুর, নীচে ক্যাপশন ‘মেরা জুতা হ্যায় জাপানি।’ একা রাজ কাপুর বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছেন। জাভেদ বললেন, ‘শুনলে হাসবে। অনিরুদ্ধ তার সাক্ষ্যে পুরোটাই উলটোপালটা বলেছিল। এক-একবার এক-একরকম কথা। কখনো বলছে, বেলা এগারোটা থেকে বিকেল চারটের মধ্যে গোটা সময়টা সে ঘুমিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই বলছে, পাশের বাড়ি থেকে রেডিয়োতে ‘শনিবারের বারবেলা’ শুনে তার মনে হচ্ছিল, এবার বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। ‘শনিবারের বারবেলা’ দুপুর বেলা হত, ঘুমিয়ে থাকলে শোনা সম্ভব নয়। আমরা চেক করেছিলাম, সেদিন ওদের পাশের বাড়িতে রেডিয়ো চালিয়েছে দুপুর আড়াইটের সময়। ওদের বাচ্চা ছেলেটা ওই সময়ে বারবেলা শুনতে শুনতে ভাত খায়। এদিকে অনিরুদ্ধর দাবি যে, সে এর মধ্যে একবারও জাগেনি। শুধু তাই নয়। একবার বলেছে, ছুরিটা তার ছিল। পরে বয়ান পালটে বলেছে, কাঠমান্ডু ঘুরতে গিয়ে সেখান থেকে মালিনী কিনে এনেছিল। হয় ওর কেমিক্যাল লোচা হয়ে গিয়েছিল, আর নয়তো পাক্কা শয়তানি। এতবার বয়ান বদল করেছে যে, স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ ওর ওপর পড়বে– নিশ্চয় কিছু লুকোচ্ছে।’
রাজ কাপুরকে একদৃষ্টে দেখছিলেন ইম্যানুয়েল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিগারেটে বড়ো টান দিলেন। ‘সেই কারণেই তোমার সন্দেহ হয়েছিল যে, অনিরুদ্ধ নির্দোষ? কারণ, সাধারণত অপরাধীর বয়ান ওয়াটারটাইট হয়। আগে থেকে হিসেব করে রাখে, কী বলতে হবে।
‘উঁহু, ক্রাইম অফ প্যাশনে এই তত্ত্ব খাটে না। অনিরুদ্ধ যদি মুহূর্তের ঝোঁকে খুন করে থাকে, তাহলে নিজেকে বাঁচাবার জন্য অসংলগ্ন কথা সে বলবেই। কিন্তু, যে নিজেকে বাঁচাবার জন্য আবোল-তাবোল বকবে, সে অন্তত নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে। অনিরুদ্ধ সেটাও করেনি। সে বলেছিল যে, তার কিছু মনে নেই। সে কি খুন করেছিল? অনিরুদ্ধ বলেছিল যে, সেটা অসম্ভব নয়। এর আগেও মালিনীকে হত্যা করার কথা তার মনে হয়েছিল। ফলত, নেশার ঝোঁকে করে থাকলে, হয়তো তার মনে নেই, আর আমাদের মনস্তত্ত্ববিদও বলেছিলেন যে, অনেক সময়েই মস্তিষ্ক জোর করে ভুলে যায় কিছু ঘটনা—ফলত, অনিরুদ্ধ হত্যা করেছে এবং ভুলে গেছে, এটা ভাবা অস্বাভাবিক ছিল না। সেটা না হলে, হয়তো অনিরুদ্ধর মনে আছে, কিন্তু ভুলে যাবার ভান করছে। শয়তানি বুদ্ধি আর কি। কিন্তু, যেকোনো কেসেই ওর বাঁচার রাস্তা ছিল না। আর, এটাই আমাকে ভাবিয়েছিল তখন।’
‘তোমাকে ভাবিয়েছিল যে, কেন অনিরুদ্ধ নিজের অপরাধ অস্বীকার করল না, কিন্তু কনফেসও করল না, বরং পরস্পরবিরোধী স্টেটমেন্ট দিল।’ ইম্যানুয়েল আরেকটা সিগারেট ধরালেন। অন্ধকার জেঁকে এসেছে। বৃষ্টির ছাটে ভিজে যাচ্ছে ব্যালকনি। শুনশান বারে টেবিলের মাথায় জ্বলতে থাকা মৃদু লাইটগুলো দপদপ করছে মাঝে মাঝে। ‘জাভেদ, এটা একটা ভ্যারিয়েশন অফ ক্লাসিক লকড রুম মিস্ট্রি। লকড রুমের চ্যালেঞ্জ যেরকম হয়, চারদিক থেকে দরজা- জানালা বন্ধ, এরকম ঘরের ভেতর খুন হলে কীভাবে সেই হত্যা হল তার সমাধান মাথা খাটিয়ে বের করাটাই টাস্ক। আর এখানে, সেই একই বদ্ধঘর। কিন্তু, ভিকটিম এবং আরেক ব্যক্তি দু-জনে উপস্থিত। তাহলে সহজ বুদ্ধিতে জীবিত মানুষটাই হত্যাকারী। এমনকী ওয়েপনে তার হাতের ছাপও মিলেছে, যেখানে ক্লাসিক লকড রুমে বেশিরভাগ সময়েই মার্ডার ওয়েপন অনুপস্থিত থাকে। এখন তুমি চাইছ, এই লোকটাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। তুমি নিশ্চিত যে সত্যিই এটা সম্ভব?’
জাভেদের বসন্তলাঞ্ছিত মুখ যন্ত্রণায় কুঁচকে গেল। ‘ইজি, আমার পঁয়ষট্টি হল। তোমার তিন ব্যাচ জুনিয়ার ছিলাম। হার্টে একটা ব্লক মিলেছে। স্টেন্ট বসাতে হতেও পারে। হয়তো আরও কিছুদিন টেনে দেব। কিন্তু বাস্টার্ড, আমি বলছি তোমাকে, ধারবাকি রেখে মরতে আমি শালা পারব না। একটা রহস্য, যার সমাধান নিয়ে আমি নিজে সন্তুষ্ট ছিলাম না, তার ক্লোজার দেখে যেতে চাই। হয়তো আমিই ঠিক ছিলাম। সেক্ষেত্রে, এমন প্রমাণ তুমি আমায় দাও, যাতে আমার মনে কোনো খচখচানি না-থাকে। তুমি বুঝবে, একটা ক্লোজার না- পাওয়া কেস একজন ডিটেকটিভের আত্মায় ঠিক কী ঘটায়!’
ইম্যানুয়েল চোখ বুজলেন। ধ্যানস্থ মূর্তি। আঙুলের সিগারেট জ্বলে-পুড়ে মাথা কুটছে। জাভেদ মৃদু গলায় বললেন, ‘সরি।’
‘কীসের জন্য?’
‘ক্লোজারের প্রসঙ্গ তোলা আমার উচিত হয়নি।’
মাথা নাড়লেন ইম্যানুয়েল, ‘অনেকদিন কেটে গেছে। কিছু এসে যায় না। আমি অন্য ব্যাপারে ভাবছিলাম। রহস্যের সমাধান কিচ্ছু নয় জাভেদ, ওটা দশ শতাংশ। বাকি নব্বই শতাংশ কৃতকর্ম এবং তার পরিণামের বিশ্লেষণ, যাকে আমরা ভুলে থাকি। তুমি আত্মার কথা বলছিলে। আমাদের ধর্মবিশ্বাসে আত্মার সর্বোচ্চ স্তর হল নেশামাহ, সেরিব্রাল এবং ইন্টেলেকচুয়াল। কিন্তু, তার খোঁজ করতে গিয়ে আত্মার দ্বিতীয় স্তরকে আমরা ভুলে যাই। রুয়াচ। নৈতিকতা।’ মাথা নাড়লেন ইম্যানুয়েল। ‘ক্লাসিক ডিটেকটিভ কাহিনিতে আমার ইন্টারেস্ট বহু আগে কেটে গেছে। আই অ্যাম আ স্কেপটিক।’
‘তাহলে তো তুমি আরও বুঝবে, একটা ভুল সমাধান ডিটেকটিভের নৈতিকতার কতটা ড্যামেজ করে। নেশামাহ ভুলে যাও, জাস্টিসের প্রশ্ন মর্যালিটির সঙ্গেই কি জড়িয়ে থাকে না? উফ, ব্লাডি মর্যালিটি, আমার নেশা হয়ে যাচ্ছে মনে হয়।’ জাভেদ মাথার চুল টানলেন। ‘আর না, এটাই লাস্ট পেগ। সে যাহোক, এই বয়েসে এসে আমি কি এটুকু চাইব না, ইজি?’
‘আর তবু, দীর্ঘ পঁচিশ বছর তুমি এই কেস ভুলে থেকেছিলে।’
‘থেকেও যেতাম, অনিরুদ্ধ সান্যালের থেকে এই চিঠিটা না-পেতাম যদি। কিন্তু, পেয়ে যখন গেছি, আমি কি আবার তাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখব? আমি তা পারি না।’
টেবিলে ফিরে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফিতে চুমুক দিলেন ইম্যানুয়েল। নিমীলিত চোখে ডুবে থাকলেন ভাবনায়। জাভেদ নিজের জন্য আরেকটা ওল্ড মঙ্ক অর্ডার দিলেন। মুখ তুললেন ইম্যানুয়েল, ‘আমি কেন?’
জাভেদ উত্তর না-দিয়ে হাসলেন। যে অল্প কয়েক বছর তাঁরা দু-জন কাজ করেছিলেন, ইম্যানুয়েলের মতো ডিটেকশন ক্ষমতা এবং যুক্তির ক্রম সাজিয়ে অপরাধকে বিশ্লেষণ, তিনি কারোর মধ্যে দেখেননি। ইম্যানুয়েল ছিলেন ডিপার্টমেন্টে একজন লেজেন্ড। কিন্তু, মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়েসে চাকরি ছেড়ে দেন। আর কখনো ফিরে আসেননি। কেন ছেড়েছিলেন, অনেকেই জানে না। জাভেদ জানতেন।
‘আমি রিটায়ার্ড, জাভেদ। বহুদিন আগে তোমাদের পৃথিবী থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছি।’
‘ওয়ান্স আ ড্যাম নাইট, অলওয়েজ আ ড্যাম নাইট। তুমিও কি চাও না–,’ কিন্তু হাত তুললেন ইম্যানুয়েল।
‘না, তুমি এখনকার ডিপার্টমেন্টের কারোর কাছে যেতে পারতে। তাদের রিসোর্স অনেক বেশি। তাদের বাদ দিয়ে আমি কেন?’
‘আরে, তুমি কি বুঝতে চাইছ না? যে কেসের সমাধান হয়ে গেছে পঁচিশ বছর আগে, সেই ফাইল নতুন করে খুলতে কেউ কেন উৎসাহী হবে? হাজার বাহানা দেবে, লাল ফিতের ফাঁস, অজুহাত, তারপর কাটিয়ে দেবে। সরকারি দপ্তরের ব্যাপার তুমি জানো না? আর, তাদেরও তো দোষ নেই। খোঁড়াখুঁড়ি করে লাভ কী হবে তাদের?’
‘তুমি নিজে কেন নও?
‘বন্ধ ঘরের ভেতর বসে দরজার চাবি খোলা সম্ভব নয়, কারণ চাবি বাইরে থেকে লাগানো। ইজি, আমি এই কেস নিয়ে ইনভেস্টেড। সাদা চোখে তাকাতে গেলে আমার মাথা ঘেঁটে পেস্ট্রি হয়ে যাবে।’
ভুরু কুঁচকে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘কেসটা আমার আবছা মনে আছে। কিন্তু, তখন আমি কলকাতায় ছিলাম না। ডেপুটেশনে কুচবিহারে। সিআইডির সঙ্গে, একটা পলিটিকাল মার্ডারের ইনভেস্টিগেশনে।’
‘তুমি কি এটা নেবে?’
‘নিয়ে আমার লাভ?’
‘কিছুই নয়।’ এবার হাসলেন জাভেদ। ‘অথবা হয়তো, নির্বাসন থেকে বেরোবার উপায়।’
‘কে বলল, আমি বেরোতে চাই?’
জাভেদ এবার উত্তর দিলেন না। ইম্যানুয়েলের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড। বড়ো নিশ্বাস ফেলে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘তুমি অনেক বুড়িয়ে গেছ।’
‘আর, তুমি শালা মোটা হয়েছ আরও।’
‘আমি ভালো আছি। এই জীবনটাই আমার। কেন সেটাকে আবার পারটার্ব করব?’
‘ভালো আছ বলেই আমাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখোনি। মনে আছে, তুমি ডিপার্টমেন্ট ছাড়ার পর আমি ফোন করতাম, বলতাম আমাদের বাড়ি এসো, নাহলে সিসিলে চলো। তুমি হেসে কাটিয়ে দিতে। ব্লাডি বাগার!’
ইম্যানুয়েল উত্তর না-দিয়ে মৃদু হাসলেন। চোখ বুজে থাকলেন কয়েক মুহূর্ত তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘কেস সংক্রান্ত ফাইল কোথা থেকে পাব?’
‘আমার কাছে। আমার অভ্যেস ছিল, নিজের কাছে সব কিছুর কপি রাখা। ডায়েরিতেও টুকে রাখতাম খুঁটিনাটি। সেগুলো মিলিয়ে গত একমাস ধরে এই ডকুমেন্টস বানিয়েছি।’ ব্যাগ থেকে একটা পাতলা প্লাস্টিকের ফাইল এগিয়ে দিলেন জাভেদ। ‘তবে, ছবি কিছু নেই। সেগুলো পেতে গেলে আর্কাইভে যেতে হবে।’
‘পিপি কে ছিল?’
‘বিশ্বাস। অমিয় বিশ্বাস। মনে আছে? দেড় ব্যাটারি বিশ্বাস। একটা চোখ ছোটো ছিল। আমরা বলতাম একটা বিচি সেম রেশিয়োতে ছোটো।’
‘মনে আছে। বেঁচে আছে কি?’
‘দিব্যি বেঁচে। রানিকুঠির দিকে থাকে। আমি নম্বর জোগাড় করে নেব।
‘পোস্ট-মর্টেম কে করেছিল?’
‘ডাক্তার দীপক মিত্র। মেডিক্যালের। মনে আছে? অনেকবার একসঙ্গে সিসিলে বসেছি।’
‘বেঁচে?’
‘ছ-মাস আগেও ফোনে কথা হয়েছে। তোমারই বয়েসি হবে মনে হয়, বা, আরেকটু বড়ো।’
রাস্তায় বেরিয়ে উবারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ইম্যানুয়েল আর একটাই কথা জিজ্ঞাসা করলেন। ‘তুমি যদি বিচারপতি হতে, কী রায় দিতে?’
‘আমি জানি না।’ ফিসফিস করে উত্তর দিলেন জাভেদ। তারপর নিজের ওপর বিরক্তিতে ছাতা ঝাঁকালেন। ঝরঝরিয়ে অনেকটা জল রাস্তায় পড়ল। ‘তুমি কি ভাবছ অনিরুদ্ধ সান্যাল আত্মহত্যা করল বলে আমি আচমকা তার প্রতি সিম্প্যাথেটিক হয়ে পড়লাম? এই তোমার জাস্টিসের ধারণা?’
দমকা হাওয়ায় ইম্যানুয়েলের পাঞ্জাবি ফুলে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, তিনি এক স্থূলকায় বাদুড়। ভেজা পিচের ওপর পিছলে যাওয়া ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাজ কাপুরকে ভাঙাচোরা লাগছিল। তাঁকে দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক গলায় ইম্যানুয়েল উত্তর দিলেন, ‘না। আমি সেটা ভাবছি না। কিন্তু, আমার মনে হচ্ছে, ন্যায়ের প্রতি তোমার অন্ধ মোহ কাজ করছে। তার জন্য পুরোনো দুঃখ খুঁচিয়ে তুলতেও দ্বিধা করছ না। ন্যায়ের এই ধারণায় আমার বিশ্বাস নেই। জীবন অনেক বড়ো, জাভেদ।’
