হামারটিয়া – ৫

ভবানীপুরের এই প্রাচীন পাড়ায় চিরস্থায়ী সিপিয়া টোনের গোধূলি। হাইরাইজ কম, বাগানওয়ালা বাড়ির সংখ্যা বেশি। কোনো কোনো বাড়ির বাইরের জানালা দিয়ে চোখ চালানো যায় যদি, দেখা যাবে অন্ধকারের ভেতর সার সার বইয়ের দল মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত উঠে গেছে। তাদের চামড়ায় বাঁধানো স্পাইনে সোনালি ক্যালিগ্রাফি বিগত যুগের সাক্ষ্য দেয় এবং কিছুদিনের মধ্যে এসব বাড়ি ভাঙা পড়বে, বইগুলো চলে যাবে নিউ মার্কেটে টোটি লেনের বুকলাইনে। এখনও অনেক জানালা এখানে সন্ধে সাড়ে সাতটায় শোনায়— ‘নমস্কার, আজকের বিশেষ বিশেষ খবর—’। কিছু বাড়ির ত্বকে অশ্বত্থের শেকড়, জীর্ণ দেওয়ালে বয়েসের আঁকিবুকি। যে বাড়িটার সামনে এসে ইম্যানুয়েল আর জাভেদ থামলেন, তার একদা ঘি রং চটে স্থানে স্থানে দগদগে ঘা। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ঝিমিয়ে আছে পাড়া। বাড়ির বাগানে আগাছা গজিয়েছে। ঝাঁকড়া চুলের মতো ঝোপঝাড়ের মেলা। পিলারের এখানে-ওখানে ভাঙা। কার্নিশ ফুঁড়ে বটচারা। ছাদে অকেজো অ্যান্টেনায় দাঁড়কাক বসে। জাভেদ জানালেন, শতদ্রু দত্ত এবং সাম্য এখন এই বাড়িতেই থাকেন। সাম্যব্রত শ্যামাপ্রসাদ কলেজ থেকে কমার্স গ্র্যাজুয়েট, তারপর পড়াশোনা করেননি। সেক্টর ফাইভের একটা ছোটো কোম্পানিতে ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের কাজ করতেন, বছরখানেক আগে লেইড-অফ হয়েছেন। এখন বাড়িতেই থাকেন, টুকটাক এখানে-ওখানে ফ্রিলান্সিং করেন। শতদ্রু রিটায়ার করেছেন সাত বছর আগে। সবথেকে বড়ো কথা, দেবারতি অধিকারী এখনও বেঁচে। সাতাশি বছর বয়েস, তবে সজাগ বুদ্ধি। গেটের বাইরে নেমপ্লেটে অবশ্য কোনো নাম পড়া যায় না। সময়ের ঘষা খেয়ে অস্পষ্ট। নেমপ্লেটের ওপর বাঁকানো লেজ নিয়ে একটা টিকটিকি স্থির। ইম্যানুয়েল আঙুলে তুড়ি মারলেন। টিকটিকির ভাবান্তর হল না।

জাভেদ অসন্তোষের ভঙ্গিতে বললেন, ‘তোমার পুরোনো স্বভাব গেল না এখনও। শার্টের বোতাম শালা ভুল ঘরে লাগিয়েছ। একদিকের শার্ট ঝুলে আছে, খেয়াল করেছ কি? ডিউটির দিনগুলোতেও একই জিনিস করতে তুমি। এসিপি রুদ্র সাহেব কী রাগারাগি করতেন, মনে আছে? ওইভাবে ক্রাইম স্পটে যাচ্ছে সিনিয়র অফিসার!’ জামার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন ইম্যানুয়েল, খোলা রাস্তায় সব বোতাম খুলে ঠিকভাবে লাগানো সম্ভব নয়। ফেডেড ব্লু জিন্সে টাক-ইন করারও সুযোগ নেই।

বন্ধ দরজার বাইরে কোলাপসিবল গেটে তালা। দরজা খুলল এক তরুণ। ছোটোখাটো, রোগা, শ্যামবর্ণ চেহারা। প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে, মাথার ঘন চুল এই বয়েসে অর্ধেক পেকে গেছে। কিন্তু, চোখ দুটো দীর্ঘকায়, ঘন কালো, এবং গভীর। গালে হালকা গোঁফ, দাড়ি। একটা টি-শার্ট আর বারমুডা পরে আছে। একমুহূর্ত দু-জনকে মেপে মাথা নাড়ল, ‘মিস্টার আহমেদ?’

‘হ্যাঁ। আমি ফোন করেছিলাম।’ উত্তর দিলেন জাভেদ।

‘আসুন। বাবা বাড়িতেই আছে।’ তরুণ তালা খুলল।

ড্রয়িং রুম থেকে পুরোনো দিনের উঠে যাওয়া সিঁড়ি। দেওয়ালে ড্যাম্প। অনেক জিনিসপত্র, বাক্স-প্যাঁটরা এদিক-ওদিক অবহেলায় পড়ে। একটা সুটকেস ডালা খুলে হাঁ ছড়িয়ে আছে। তার ভেতর থেকে উঁকি মারছে ছাতা পড়া জামা। সোফার কভার ফেটে তুলো বেরিয়েছে। মেঝের পাথর ভেঙে চলটা। সাম্য সাবধান করল, চটি পরে যাতায়াত করতে হবে। নাহলে পায়ে খোঁচা লেগে বিপত্তি।

এক টাকমাথা প্রৌঢ় বেরিয়ে এলেন। গলা থেকে তারে বসা চশমা ঝুলছে। কানের দু-পাশে সাদা কিছু চুল খাড়া হয়ে আছে। হাতে ডটপেন আর বেশ কিছু সাদা ছোটো ছোটো খাম। ভুরু কুঁচকে দু-জনকে দেখে ফ্যান এবং গুডনাইট জ্বালালেন। উলটো সোফায় বসে বললেন, ‘সাম্য বলেছে আপনাদের কথা। কিন্তু, আমি বুঝতে পারছি না যেটা, এতদিন পরে আবার কেন? সব তো চুকে গেছে।’ সাম্য ঘরে ঢুকে গেল। ‘আমরাও ভুলে যাবার চেষ্টা করেছি।’ মাথা নীচু করে পেন দিয়ে খামের ওপর লিখতে শুরু করলেন। জাভেদ তাঁকে আসার কারণ বললেন। দু-জনে ঠিক করে রেখেছিলেন যে, সত্যিটা বলবেন, কিছু লুকোবেন না। শতদ্রু মুখ তুললেন না, কিন্তু ইম্যানুয়েল বুঝলেন হালকা বিতৃষ্ণায় তাঁর মুখ বেঁকে গেছে। ‘অনিরুদ্ধবাবু মারা গেছেন, কী আর বলার আছে। আমরা কী করতে পারি, বলুন?’

‘আমরা কি কাজের মধ্যে আপনাকে ডিস্টার্ব করলাম?’

‘কাজ কিছু না। খামগুলোতে সবার আলাদা আলাদা ওষুধ। তাই লিখে রাখছি, কোনটা কার, কখন খেতে হবে। নাহলে গুলিয়ে যাবে। বরাবরের অভ্যেস। আমার শরীর তো বহুকাল ভালো নেই। সুগার, প্রেশার, কোলেস্টেরলে খেয়ে ফেলছে। একমাস অন্তর চেক-আপ করাতে হয়। আমার শাশুড়ির আবার নার্ভের অনেক ওষুধ লাগে। তবু তিনি আমার থেকে বেশি সুস্থ। আমার সেই একুশ বছর আগে সুগার ধরা পড়েছিল—,’ এরপর দশ মিনিট ধরে বিবরণ দিয়ে গেলেন নিজের অসুখের। জাভেদ উশখুশ করছিলেন, কিন্তু ইম্যানুয়েল শুনছিলেন মনোযোগ দিয়ে। কথা থামিয়ে শতদ্রু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, আপনার নামটা এগজ্যাক্টলি কী? মিলন? মলয়? সাম্য ভালো বলতে পারল না।’

‘ইম্যানুয়েল।’

‘বাঙালি? হিন্দু?’ সন্দেহের চোখে তাকালেন শতদ্রু।

‘বাঙালি। অ্যাগনস্টিক।’ ইম্যানুয়েল বিনীতভাবে হাসলেন।

শতদ্রু ঠোঁট ওলটালেন। ‘যাকগে। বলুন কী জানতে চান। কেনই-বা চান সেটাও বুঝছি না, তবে আমার আর কী! একটু তাড়াতাড়ি করুন। কারণ, পেটে একটা কলিকের পেইন হচ্ছে কয়েক দিন। সন্ধেবেলায় ডাক্তারের কাছে যাব।’

‘দেখুন, এই কেস বহুদিন আগে ক্লোজড। কিন্তু, মৃতের শেষ ইচ্ছে মেনে আমরা একবার পুরোটা ওয়াকথ্রু করতে চাই।’

‘শুরুর কথা প্রথমে জেনে নেওয়া ভালো। আপনারা কি পুলিশ থেকে আসছেন? নাকি, কাগজওয়ালা? সাম্য ভালো বুঝতে পারেনি। তাই আমি শুরুতে রাজি হচ্ছিলাম না।’

‘আমরা এক্স কপ। আমায় আপনার মনে আছে কি না জানি না, এই কেসের ইনভেস্টিগেশনে লালবাজার থেকে আমায় পাঠিয়েছিল। আজকের কাজটা নিজেদের গরজে করছি, বলতে পারেন। একজন মৃত মানুষের শেষ ইচ্ছেকে সম্মান দেওয়া। ফ্র্যাঙ্কলি, এর সঙ্গে পুলিশের যোগ নেই। কিছুই পালটাবে না এতে। আর, আপনি যদি না-চান, কোনো প্রশ্নও করব না।’

অসন্তোষের নিশ্বাস ফেললেন শতদ্রু। ‘কেউই বুঝবে না, আমাদের কী গেছে। আজ আবার এতদিন পর— যাই হোক, বলুন, কী জানতে চান।’

ইম্যানুয়েল শুরু করলেন, ‘আপনার সঙ্গে মালিনীর কি শেষ অবধি যোগাযোগ ছিল?’

‘ছিল। পাপান, মানে, সাম্যর সূত্রে। তবে, মুখোমুখি দেখা হয়নি অনেকদিন। ওর বাড়ি গেছিলাম ওই ঘটনার দু-দিন আগে। ওপরে ছিল। নীচে নামল না। দেবারতিদি বললেন, গিয়ে দেখা করে আসতে। আমার ইচ্ছে হয়নি। মৃত্যুর দিন সাতেক আগে অবশ্য ফোনে কথা হয়েছিল।’

‘কী কথা, মনে আছে আপনার?’

‘সেই একই ঝগড়া। মালিনী ডিভোর্স চাইছিল, আমি রাজি হচ্ছিলাম না। মালিনী শেষে হুমকি দেয়, কোর্টে যাবে। আমি বলেছিলাম কনটেস্ট করব।’

‘আপনি রাজি হননি কেন?’

‘কেন হব? দেখুন মিস্টার গুহ, মালিনী আপস্টার্ট আধুনিকা হতে পারে, কিন্তু আমি পুরোনো দিনের মানুষ। আমাদের কিছু ভ্যালুজ আছে। সন্তান যেখানে বড়ো হচ্ছে, আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব যেন তার বাবা, মা একসঙ্গে থাকতে পারে। আমি আশা করতাম, মালিনী একদিন তার ভুল বুঝে ফেরত আসবে।’

‘ভুল তাহলে মালিনীরই ছিল বলে আপনার ধারণা?’

‘ধারণা নয়, বাস্তব। কেন ও বম্বে যেতে চাইবে? কলকাতায় থেকে কি কেরিয়ার হয় না? সংসার, সন্তান এতই মূল্যহীন ওর কাছে? কই, আমি তো কলকাতার কলেজে চাকরি নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। ওকে তো চাকরি-বাকরি করার পারমিশনও দিয়েছিলাম। তারপরেও এত কিছু চাইবে কেন? মালিনী কখনোই নিজের কেরিয়ারের আগে ব্যক্তিগত জীবনকে বসায়নি।’ ভুরু কোঁচকালেন শতদ্রু, ‘এতদিন পরে আবার এসব প্রশ্ন কেন? আমি তো বহুদিন আগে নিজের বয়ান দিয়েছি।’

‘এগুলো রুটিন। আমরা একটা পার্সপেক্টিভ চাইছি। সমস্যার সূত্রপাত কোথা থেকে হল?’

‘সূত্রপাত হল মালিনীর অ্যাম্বিশন থেকে। দেখুন, সে বহুদিন চলে গেছে, তার সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে চাই না। কেন আমাকে দিয়ে এগুলো বলাচ্ছেন? আপনারা বুঝবেন না,’ হতাশায় মাথায় হাত বোলালেন শতদ্রু, ‘আমাদের কী ফেস করতে হয়েছে! আমরা তো মধ্যবিত্ত মানুষ। মালিনীর সম্পর্ক যখন বাইরে এল, আমাদের সম্মান নিয়ে কম টানাটানি হয়েছে? তারপর তাকে যখন ওই অবস্থায় নিজের ঘরে আবিষ্কার করা হল— আপনাদের মনে হয় আমার সেগুলো আবার নতুন করে ভাবতে ভালো লাগছে? ওই নোংরা বিকৃতি — আমি লজ্জায় একমাস কলেজ যেতে পারিনি। পাপান কুঁকড়ে থাকত ভয়ে। আমাদের কথা ও একবারও ভাবেনি, ভেবেছে শুধু নিজের সুখের কথা। পরিবার ওর কাছে কখনো ম্যাটার করেনি। আমার ছেলেটা যে মানুষ হল না, সেটাও ওর কারণেই তো!’ শতদ্রু ঠোঁট কামড়ালেন। ‘কিছু মনে করবেন না। উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। আমিও চাই না এসব নোংরামি নিয়ে আর কাদা ঘাঁটা হোক।’

‘আপনার মনে হয়, মালিনীকে নিয়ে কথা বললে তাহলে কাদাই বেরিয়ে আসবে?’

‘সেটা সে নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করেছে। আমার সম্মানটা কোথায় দাঁড়িয়েছিল বলে আপনাদের মনে হয়? তার পরেও আমি পাপানের মুখ চেয়ে শক্ত থেকেছি। ওকে বড়ো করেছি। পাড়াপ্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, কলিগ সবার মুখ টিপে হাসির দিকে চোখ বন্ধ করেছি। সহজ ছিল না, মিস্টার গুহ।’ হাতের খামগুলো পাশে রেখে তিক্ত হাসলেন। ‘আমি অবশ্য জানতাম। মালিনীকে আমি বলেছিলাম, মিড-লাইফ ক্রাইসিসে ভোগা পুরুষের দল ওকে শুধু ব্যবহারই করে যাবে, কিন্তু ঘর বাঁধবে না। আর, ও সব জেনেও বোকার মতো সেই ট্র্যাপে পা দেবে। কেন জানেন? কারণ, ওকে অন্যরকম হতে হবে। আর পাঁচটা সংসার সস্তান করা ঘরোয়া মেয়ে হওয়া ওর কাছে অপমানজনক ছিল মনে হয়। মদ না – খেলে, রাত করে বাড়ি না-ফিরলে আধুনিক হওয়া যায় না নাকি? ওর মা তো কম আধুনিক ছিলেন না। সেই যুগের ফিজিক্সের ডক্টরেট। তিনি তো সারাজীবন সিঁদুর, শাঁখা-পলা পরে ক্লাস করেছেন, সংসার সামলেছেন। আমি মালিনীকে প্রশ্ন করেছিলাম, সবেতে ওর এত বাড়াবাড়ি কেন? পরে অবশ্য এসব প্রশ্ন করার অধিকারও আমার ছিল না।’

কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ। জাভেদ অস্বস্তি কাটাবার জন্য বইয়ের আলমারির কাছে চলে গেলেন। শতদ্রুর মুখ থেকে বিতৃষ্ণার ভাব যাচ্ছিল না। অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরালেন ইম্যানুয়েল। বদ্ধঘরে ধোঁয়ায় অস্বস্তি হতে পারে ভেবে জানালার কাছে গিয়ে দেখলেন, পর্দার ওপারে সব পাল্লা বন্ধ। একটা খুলতে যাবেন, শতদ্রু বললেন, ‘খুলবেন না। আমাদের ভবানীপুর মশার জন্য বিখ্যাত। পিলপিলিয়ে ঢুকবে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুর চাষ এখানে।’

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছেড়ে প্রশ্ন করলেন ইম্যানুয়েল, ‘আপনার নিজের বাড়ি তো ছিল। এখানে কি অনেকদিন?’

‘মালিনীর ঘটনার দিন দশেক পর দেবারতিদির একটা স্ট্রোক হয়। আমি দিদি বলি, কারণ আমার শিক্ষিকা ছিলেন। ওই আঘাত সামলাতে পারেননি। ততদিনে আমার মা মারা গেছেন। দিদিই বললেন, এখানে চলে আসতে। তখন আমাদের সত্যিই আর কেউ ছিল না। তিনজনে তিনজনকে আঁকড়ে থেকেছিলাম। আমি আর আমাদের শরিকি বাড়িতে ফিরে যাইনি।’ কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর যোগ করলেন, ‘পাপান, মানে আমার ছেলে, যাকে দেখলেন, সে তখন রানাঘাটে। এসবের থেকে বাঁচাতে আমি ওকে আমার এক তুতোবোনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। শুরুতে চাইনি পাপান এখানে আসুক। এই বাড়িতে, ওই ঘরে, ওর কীরকম লাগবে বুঝিনি। রানাঘাট থেকে ওকে ফিরিয়ে এনে আমাদের বাড়িতেই রাখছিলাম, কাজের লোকের কাছে। কিন্তু, তারপর দেখলাম আমার পক্ষে এতদিক সামলানো অসম্ভব হয়ে উঠছে। পাপান, দেবারতিদির শরীর, কোর্ট, পুলিশ, আমার নিজের চাকরি, আর দুটো বাড়ি। তখন বাধ্য হয়ে পাপানকে এখানে নিয়ে আসি। বেশ কিছুদিন ওকে ওই ঘরে ঢুকতে দিইনি আমি। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা হয়। থিতিয়ে যায় সব কিছু।’

‘আচ্ছা, ঘটনা যেদিন ঘটল, সেইসময়ে আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘সেদিন প্রচণ্ড শীত পড়েছিল। আমি সকালে বেরিয়ে কলেজে যাই। কিন্তু, ইউনিয়নের ঝামেলায় কলেজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছিল। দুপুর একটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসি। শরীরটা ভালো ছিল না। জ্বর জ্বর লাগছিল। একটা ক্রোসিন খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। আড়াইটের সময়ে পাপান ওর ড্রয়িং স্কুল থেকে ফিরে আসে। সেদিন দূরদর্শনে ‘শোলে’ দেখাচ্ছিল। পাপানকে পাশে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখছিলাম। আধঘণ্টা পর আবার শুয়ে পড়ি। কারণ, গা-হাত-পা কামড়াচ্ছিল। পাপানকে বলি, ড্রয়িংগুলো যেন প্র্যাকটিস করে। সাড়ে চারটে অথবা পৌনে পাঁচটা নাগাদ পুলিশের ফোন আসে। আমার বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ছিল না। পাশের বাড়িতে ফোন এসেছিল, ওরা আমাকে ডেকে দিয়েছিল। আমি বেরিয়ে যাই ফোন পেয়েই। সেদিন রাত থেকে আমার প্রচণ্ড জ্বর এসেছিল। টানা তিনদিন ১০১-এর নীচে নামেনি।’

‘মালিনী কি আপনাকে কিছু জানিয়েছিলেন? যে, অনিরুদ্ধ তাঁকে হত্যা করতে পারেন বা ওরকম কিছু?’

‘না, পাগল নাকি! আমাকে ওসব কেন বলবে? আমাকে সহ্যই করতে পারত না। অনিরুদ্ধবাবুর প্রেমে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল।’ ঠোঁট বেঁকে গেল শতদ্রুর। ‘স্বাভাবিক। আমি তো ওল্ড স্কুল। ছাপোষা মধ্যবিত্ত। কর্পোরেট লাইফ কাকে বলে শঙ্করের উপন্যাসের বাইরে ধারণাই ছিল না। আমাকে কুকুর, বেড়ালের মতো ট্রিট করত মালিনী। সেই আমার কাছে ও অন্যের ব্যাপারে বলবে?’

‘কিন্তু, আপনার কী মনে হয়? অনিরুদ্ধ খুন করতে পারেন?’

‘মনে হওয়া দিয়ে কী আসে-যায়, বলুন! খুন যে করেছে, সে তো দেখাই গেছে। আমি ওঁকে চিনতাম না। এর বেশি আর কী বলব! তবে, কোনো ভদ্রলোক অন্যের সংসারে নাক গলায় না। অনিরুদ্ধবাবু গলিয়েছিলেন। আমি তাঁকে আর যাই হোক, ভদ্রলোক তো বলতে পারি না। কাজেই আমার কাছ থেকে বিশেষ সহানুভূতি আশা করতে পারেন না।

‘মালিনী কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন, হয়তো সামান্য কোনো কথা, যা একটু হলেও স্বাভাবিকের বাইরে?’ এবার জাভেদ প্রশ্ন করলেন।

মাথা নামিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন শতদ্রু। তারপর বললেন, ‘আগেই বলেছি, মৃত্যুর দিন সাতেক আগে ফোনে কথা হয়েছিল। মালিনীই নিজে করেছিল। কথা কাটাকাটি যা হবার হয়েছে। কিন্তু, ফোন রাখার সময়ে বলেছিল, ও একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজে আছে। আমি কাউকে চিনলে যেন খোঁজ পাঠাই। আমি অবাক হয়েছিলাম। মালিনীর এসব হাবিজাবি সমস্যা কখনো ছিল বলে শুনিনি। দেখুন, এসব মেন্টাল অসুখ-ফসুখ বড়োলোকদের ব্যাপার। হাতে অনেক সময় যাদের, তারা এসব অ্যাফোর্ড করতে পারে। অবশ্য, মালিনীরাও সেই ক্লাসেরই ছিল। কিন্তু, আগে এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় ওর ছিল না। আমি তাও ভদ্রতাবশে বলেছিলাম, কোনো সমস্যা হলে আমায় জানাতে। দোনোমনো করে বলল, পরে জানাবে। আমিও চাপাচাপি করিনি।’

‘কিন্তু, আপনার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মালিনীর অবসাদ এসেছিল বলে ফাইলে পড়েছি।’

‘ওসব দুঃখকষ্ট আমার হয়নি? আমি কার কাছে গেছি? কিন্তু, মালিনী তখনও ডাক্তারের কাছে যায়নি। এতদিন পরে কেন, সেই নিয়ে আমার বিস্ময় জেগেছিল। এটুকুই। এর বাইরে অন্য কিছু জানি না।’

‘আচ্ছা, আপনি তো পিও, মানে, প্লেস অফ অকারেন্সে ঢুকেছিলেন। মানে, যে ঘরে খুন হয়েছিল। আপনার কী মনে আছে, একটু জানাবেন?’

‘বহুদিন আগের কথা। মনে থাকে নাকি?’

‘তবু, একবার দেখুন না চেষ্টা করে।’ বললেন জাভেদ।

‘আমার স্মৃতি ঝাপসা।’ চোখ বুজে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলেন শতদ্রু। ‘ঘরের ভেতর পুলিশ ঢুকতে দেয়নি। দরজায় দাঁড়িয়ে যা দেখার দেখেছি। খাটে মালিনীর দেহ। মেঝেতে সর্বত্র চটচটে রক্ত। কম্বলের রং গাঢ় লাল, তাই রক্তের দাগ বোঝা যাচ্ছিল না। দূর থেকে মনে হল দেখলাম, মালিনীর চোখ খোলা। একপাশে কাত হয়ে শুয়ে ছিল। গলায় ছুরি বিঁধে, তাকানো যায় না সেদিকে। বিছানা, মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খাবারের প্লেট, আধখাওয়া চকলেটের প্যাকেট, স্লিপিং পিলের স্ট্রিপ, বেশ কিছু ক্যাসেট। ফাইভস্টার, ক্যাডবেরি, জেমস, চিউইংগাম, আরও কত কী! অনেক মাছি উড়ছে, এটা মনে আছে। একটা আগাথা ক্রিস্টির পেপারব্যাক বই উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে, সেটার কভারে রক্ত লেগে। মালিনী ক্রিস্টি আর পেরি মেসন পড়তে ভালোবাসত। আমাদের সঞ্জীব চাটুজ্জে, সুনীল গাঙ্গুলিদের ওর ভালো লাগত না। মনে হয়, ওসব ইংরেজি থ্রিলার-ফিলার না-পড়লে জাতে ওঠা যায় না।’ শতদ্রু জানালার কাছে এলেন। খুকখুক করে কাশলেন। অস্বস্তি বোধ করে অ্যাশট্রে-র গায়ে সিগারেট ঘষে দিলেন ইম্যানুয়েল। এবার নিজেই জানালা খুলে হ্যাক শব্দে থুতু ফেললেন শতদ্রু। সোফায় এসে রুমালে মুখ মুছে ঠোঁট কোঁচকালেন, ‘সত্যিই কলিক পেন না ক্যান্সার হল, কে জানে! হলে তো বেঁচে যাই। যাকগে, যা বলছিলাম। অনিরুদ্ধবাবুকে দেখিনি, ততক্ষণে পুলিশের জিম্মায় চলে গেছেন। পুলিশ আমায় মিনিটখানেকের বেশি থাকতে দেয়নি। আর কিছু মনে নেই। তখন আমার মাথাও কাজ করছে না।’

‘চকলেটের ব্যাপারটা কী?’ ইম্যানুয়েল প্রশ্ন করলেন জাভেদকে।

শতদ্রুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জাভেদ উত্তর দিলেন, ‘অনিরুদ্ধরা খেয়েছিলেন। বয়ানে বলেছিলেন, পার্ট অফ ফোরপ্লে।’

‘আর খাবার কী ছিল?’

‘রিপোর্টে আছে। যদ্দুর মনে আছে, চিকেন বিরিয়ানি। ভিকটিমের স্টমাক থেকে অবশ্য চকলেট আর মদ ছাড়া কিছু পাওয়া যায়নি।’

‘তুমি শিয়োর, সলিড ফুড ছিল না?’

‘আরেকবার চেক করব। মনে হচ্ছে, খাবার ছিল না।’

শতদ্রু দাঁড়িয়ে পেটে হাত বোলালেন। ‘আমি জানি না খুঁচিয়ে ঘা করার কী মানে। আপনারা ভালো বুঝবেন। তবে, আমি এখানেই থামব। এই সময়ে একটা ওষুধ খেয়ে পনেরো মিনিট চিত হয়ে শুয়ে থাকতে বলেছে আয়ুর্বেদে। আচ্ছা, নমস্কার।’

‘একবার দেবারতি দেবীর সঙ্গে কথা বলা যাবে?’

‘পাপান!’ শতদ্রু হাঁক পাড়লেন। ‘এঁদের দিদার কাছে নিয়ে যাও।’ তারপর ঘরে ঢুকে গেলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *