১১
অনুপ রুংতার ছোট্ট অফিস সেক্টর ফাইভে আরডিবির পাশে। জনা তিরিশেক লোক। দুটো কাচের ঘর। অনুপ রুংতা একটায় বসে। কপালে লাল তিলক। হাতে দামি রিস্টওয়াচ, আইফোন। থলথলে মেদমুখে সাফল্যের আভাস। পেজ থ্রি পার্টিগুলোতে রুংতাকে প্রায়ই দেখা যায়। ঘন ঘন সিগারেট খান, অফিস আইনের বালাই নেই। নিজের ঘরে এসি বন্ধ করে জানালা খুলে সিগারেট খাচ্ছেন। ঘামছেন দরদর করে। কফির কাপে ধোঁয়া জমছে।
‘মনে আছে আপনাকে দিব্যি।’ জাভেদকে ভাঙা বাংলায় বললেন অনুপ ‘সেবার প্রচুর গ্রিল করেছিলেন আমায়। কিঁউ, সারজি? ক্রিমিনাল হাতের কাছে, ফির ভি আমায় কেন?’
‘আপনার সঙ্গে মালিনীর কীরকম সম্পর্ক ছিল?’
‘এতদিন পর আবার এসব— দেখুন, মিথ্যে বলব না। আমার মেয়েমানুষের স্ক্যান্ডাল ছিল জওয়ান বয়েস থেকেই। সবাই জানে এসব, লুকোছাপার কিছু নেই। তো, মালিনীর কেসটাও ওরকম ছিল আর কি। ম্যায়নে সোচা, উই উইল হ্যাভ ফান। উইকএন্ডে একটা ছোটো টুর করে এলাম, বা, কোনো রিসর্টে নিরিবিলি। কিন্তু, মালিনী ওয়াজ টাফ নাট টু ক্র্যাক। পাত্তা দেয়নি। তখন কম বয়েস, রক্ত গরম। ডেসপারেট হয়ে ওর পিছু নিয়েছি, বাড়ি অবধি গেছি। ফোন-টোনও— জানেনই তো সব। এখন বুঝি, কী বোকামিই না করেছিলাম। মানুষকে ছেড়ে দিতে হয়।’
‘রাগ হয়েছিল?’
‘রাগের থেকে বেশি মরিয়া ভাব। আকেলা আউরত, হাজব্যান্ডের সাথে বনিবনা নেই। দেখতে-শুনতে বেশ চটকদার ছিল। সে আমার বিছানায় উঠবে না কেন? আজকাল ভাবলে নিজের ওপর গুসসা হয়। এভাবে হয় কিছু? কিন্তু, তখন আই ওয়াজ ওনলি থার্টি-থ্রি। বাপের প্রচুর টাকা, কাশ্মীরে দুটো বাগিচায় শেয়ার, আসানসোলের খাদানে বিজনেস। দু-হাতে ওড়াচ্ছি, ক্লাবে যাচ্ছি, স্কচ খাচ্ছি রোজ। টিভি, সিনেমা, কিতাব, নাটকের নেশা কোনোকালে ছিল না। মদ, লেট নাইট পার্টি, লেড়কিবাজি। ব্যস। একটা বিএমডব্লিউ কিনেছিলাম, জানেন! সেই নাইনটিজ-এ এসব বিরাট ব্যাপার ছিল। মালিনীর মতো আউরত যে এসব দেখে পটবে না, বোঝার বুদ্ধি আমার হয়নি।’ রুংতা আয়েশ করে সিগারেটে টান দিলেন।
‘আচ্ছা, ঘটনার দিন কোথায় ছিলেন আপনি?’
হাসলেন রুংতা। ‘অ্যালিবাই সার্চ করতে চান? সেবারেই পুলিশকে জানিয়েছিলাম। চেক করা আছে। সকাল বেলা স্যাটারডে ক্লাবে ব্রেকফাস্ট। তারপর এক গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে জোকার একটা রিসর্টে গিয়েছিলাম। উস টাইম বহুত লোডশেডিং হত। তো, রিসর্টে পাওয়ার চলে গেল। বিরক্ত হয়ে গেলাম। মেয়েটা বলল, সিসাইড দেখবে। ওকে নিয়ে বেরিয়ে ডায়মন্ড হারবার ড্রাইভ করে গেলাম। ওখানে আমার ছোটোবেলার এক বন্ধুর রেস্তরাঁ আছে। উধার লাঞ্চ করে রিসর্টে ফিরলাম বিকেল বেলা। কলকাতায় ফিরতে ফিরতে রবিবার বিকেল। ফিরে খবরটা শুনি। তখন তো এত মোবাইল ফোনের ব্যাপার ছিল না। সোমবার আমার অফিসে পুলিশ আসে। তখন অফিস ছিল ফেয়ারলি প্লেসে। ২০১০-এ এখানে শিফট করেছি।’
‘কীসের ব্যাবসা আপনার?’
‘যা হয় আজকের দিনে। সফটওয়্যার। এখন ডেটা মাইনিং-এ শিফট করছি। হায়দ্রাবাদে আরেকটা অফিস আছে। কিছু এমপ্লয়িকে অনসাইটে পাঠিয়েছি। স্যালারি খারাপ দিই না, সারজি! লাস্ট টু ইয়ারস ধরে প্রাইভেট কলেজগুলোতে ক্যাম্পাসিং-ও করছি। আপনাদের চেনাজানা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর লেড়কা থাকলে অ্যাপ্লাই করতে বলবেন।’ অনুপ রুংতা নিজের কার্ড বাড়ালেন।
‘মালিনীর সঙ্গে আপনার শেষ দেখা কোথায় হয়েছিল, আর কবে?’
‘ও মারা যাবার মাস তিনেক আগে। আমিই ফোন করে রিকোয়েস্ট করেছিলাম যেন দেখা করি। দ্যাট টাইম আমি সবে নিজের অফিস স্টার্ট করেছি। দেখা করার মতলব শুধুই পার্সোনাল ছিল না। ওকে বলেছিলাম যদি আমার এখানে জয়েন করে, ওকে পার্টনার করে নেব। করবে না মালুম ছিল, এত ছোটো জায়গায় কেনই-বা আসবে, তার ওপর আমি যেখানে। তবু, আই ট্রায়েড মাই লাক। অলিপাবে বসেছিলাম আমরা। মালিনী বেশিক্ষণ থাকেনি, একটা পেগ শেষ করে বেরিয়ে যায়। আমি জানতাম অনিরুদ্ধ সান্যালের কথা। মুঝকো ফারাক নহি পড়তা। ওকে বলেছিলাম, রিকনসিডার করবে কি একবার? মালিনী হেসেছিল। বেরিয়ে যাবার সময়ে দেখলাম সান্যাল দাঁড়িয়ে ওর গাড়ি নিয়ে। গুসসা হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বাস্টার্ডটাকে ফলো করে গাড়িতে ধাক্কা দিই। নম্বরটা মনেও রেখেছিলাম। রাস্তাঘাটে দেখলেই ঠুকব। বললাম না, ইমম্যাচিয়োর ছিলাম তখন।’
‘মালিনী কি কিছু ইন্ডিকেশন দিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে অনিরুদ্ধর ঝামেলার ব্যাপারে?’
‘নাহ্, আমায় কেনই-বা দেবে! লেকিন আমার কাছে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ করছিল। আমার কাকা ক্যালকাটা হসপিটালের ডাক্তার ছিলেন। আই
জোকড— কেন সান্যালকে সামলাতে পারছ না? তাতে বলল, অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমি খোঁজ লাগাব বলে তালেগোলে ভুলে যাই।’
ইম্যানুয়েল অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। অনিরুদ্ধর যদি সত্যিই মানসিক সমস্যা থাকে যার আঁচ মালিনী পেয়েছিলেন, তাহলে অনিরুদ্ধর বিপক্ষে কেস আরও স্ট্রং হবে।
‘আপনি অনিরুদ্ধকে চিনতেন কি?’ প্রশ্ন করলেন জাভেদ।
‘দেখেছি দুয়েকবার। মালিনীকে পিক করতে আসত। তা ছাড়া, আমাদের ক্লাবও কমন ছিল।’
‘দেখে কি মনে হয়েছিল কোনো মানসিক সমস্যা থাকতে পারে?’
‘অ্যায়সে দেখকে বোঝা যায় নাকি? বিহেভিয়ার তো নর্মালই ছিল। কিন্তু, রেগে গেলে কে কেমন, সেটা প্রাইভেট স্পেস ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।’
ইম্যানুয়েলরা উঠে পড়লেন। আর বিশেষ কিছু জানার নেই। দরজার দিকে যাচ্ছেন, রুংতা ডাকলেন, ‘মিস্টার আহমেদ।’
কয়েক মুহূর্ত মাথা নীচু করে কথা গুছিয়ে নিলেন রুংতা। তারপর বললেন, ‘আজ মালিনী চলে গেছে। ইয়ে সব বাতকো মিনিং নেই। তবু, ও যদি থাকত, আমি আমার বিহেভিয়ারের জন্য ‘সরি’ বলতাম। পরে আমিও নিজেকে শুধরেছি, বিয়ে-থা করেছি, ফ্যামিলিম্যান হয়েছি। জানি, আমি যা করেছিলাম, গলদ থা। কিন্তু, এখন সে-গলদ ঠিক করার সুযোগ নেই। যদি এই কেসে কোনোরকম অন্য দিক পান, আমাকে জানাবেন, প্লিজ? ভেবেছিলাম সলিউশন এতদিনে হয়ে গেছে। কিন্তু, আপনাদের কথা শুনে বুঝছি, হয়নি।
‘কী করে বুঝলেন? অনিরুদ্ধ সান্যাল যে নির্দোষ, এমন কোনো ইঙ্গিতই আমরা দিইনি।’
রুংতা হাসলেন। ‘আমরা মানুষ চরিয়ে খাই, মিস্টার গুহ। আদমিকো আঁখ দেখে বুঝতে পারি তার মনে কী চলছে। এই কেস ক্লোজড হয়ে গেলে এতদিন পরে আপনারা আমার কাছে আসতেন না। কিছু তো একটা গড়বড় বিলকুল আছে। না, আমি জানতে চাইছি না, সেসব আপনাদের কনফিডেনশিয়াল। সান্যাল ক্রিমিনাল হলে আমি স্বস্তিই পাব, এতদিন যেমন পেয়েছিলাম। কিন্তু, যদি না হয়? মালিনীর ওপর আর কার রাগ থাকতে পারে!’
‘আপনার। পারে না?’
‘পারে। বাট, অ্যালিবাই টাইট ছিল। আমার অবাক লেগেছিল অন্য কারণে। আমার আগের অফিস, মানে, মালিনীর অফিস, সান্যালের ফার্মের ক্লায়েন্ট ছিল। উধার সান্যালের সঙ্গে মালিনীর আলাপ। স্যাটারডে ক্লাবে আমরা দু-জনেই মেম্বার, যদিও ওকে বিশেষ দেখিনি। তবে, মালিনীকে নিয়ে সান্যাল আসত টাইম টু টাইম। ক্লাবের অনেকেই ওকে চিনত। তো, মালিনী খুন হবার দিন সাতেক আগে ক্লাবের কার কাছ থেকে জানি শুনেছিলাম, ওদের মধ্যে ব্রেক- আপ হয়েছিল, আবার সব ঠিক হয়ে গেছে। যদি ঠিকই হবে, তাহলে মালিনীকে সান্যাল খুন কেন করবে?’
‘আপনার কী মনে হয়?’
‘দেখিয়ে, আমাদের ভাষায় একটা কথা আছে। মর্দানা ঘমন্ড। মেল ইগো। মালিনী সান্যালকে নাকি বলেছিল ওর ফ্যামিলিতে সব জানিয়ে দেবে। ফ্যামিলি বা অফিসে মেয়েমানুষের কারণে হাসির পাত্র হয়ে উঠলে মর্দের ইগো সাংঘাতিক ঘা খায়। বিশেষত সেই মেয়েমানুষ যখন লোকটার বিরুদ্ধে ঘুরে গেছে। সেই রাগ থেকেই যায়, পরে সব কিছু ঠিক হয়ে গেলেও। ইয়ে লড়কি মেরা ইগো হার্ট কিয়া থা, এখন যতই ভালো সাজুক না কেন, একে আমি দেখে নেব- হতেই পারে এরকম। সান্যাল নেশা করে ছিল। তখন দিমাগ কাজ করে না।’ রুংতা আধখাওয়া সিগারেট অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন।
আরডিবি-র পাশের একটা চায়ের গুমটির সামনে দাঁড়িয়ে ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে জাভেদ বললেন, ‘তাহলে? রুংতাকে সন্দেহের বাইরে রাখা যায়। অ্যালিবাই টাইট ছিল।
‘কে সাক্ষী? বান্ধবী। বাল্যবন্ধু। তারা মিথ্যে বলছে না, জানছ কী করে? ডায়মন্ড হারবার যাবার নাম করে কলকাতায় ফিরে আসেনি, তুমি শিয়োর? বা, অন্য কাউকে দিয়ে খুন করায়নি?’
‘জানি না। তবে, মালটা ভদ্রসভ্য হয়েছে দেখলাম। সেবার যখন গ্রিল করেছিলাম, বড়োলোক বাপের বখে যাওয়া ছেলে লেগেছিল। টাকার জোরে ধরাকে সরা দেখছে। কানের গোড়ায় একটা থাবড়া বসাতে হাত নিশপিশ করছিল, মাইরি। এখন দেখে আমি অবাক। নাকি, অভিনয় করল, কে জানে!’
‘বয়েস। বয়েস মানুষকে অনেক সময়েই পরিণত করে।’
‘যাই হোক, অনিরুদ্ধ সান্যালের মানসিক সমস্যা ছিল, রাগ কন্ট্রোল করতে পারতেন না, এটা তো তাঁর বিরুদ্ধেই যায়, তাই না?’
‘তা যায়। কিন্তু, আমাকে আরেকটু ভাবতে হবে।’
‘আদৌ কি এই ঘটনার অন্য ব্যাখ্যা থাকা সম্ভব? জানি, আমিই তোমার কাছে এসেছিলাম, কিন্তু এখন নিজেরই সন্দেহ হচ্ছে।’
‘আমি এখনও ঠিক-ভুল কিছু ভাবিনি। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, অন্য ব্যাখ্যা থাকলেও সেটা সুখকর হবে না, জাভেদ।’
