১৫
নির্মলা গড়াই চার বছর আগে মারা গেছেন। খুঁজে পাওয়া গেছে তাঁর ছেলে অর্জুনকে। অর্জুন ল্যান্সডাউন মার্কেটে মাছ বেচেন। বছর চল্লিশের হাট্টাকাট্টা চেহারা। ঠোঁটের মাঝখানে কাটা, বোঝা যায় জন্ম থেকেই। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লোকাল থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্জুনের সন্ধান মিলেছে। পুলিশ শুনে চোখে গেড়ে থাকা স্থায়ী সন্দেহকে কিছুতেই তাড়ানো গেল না। মুখও খুলতে চাইছিলেন না শুরুতে। ভবানীপুর থানার এক কনস্টেবল রামলাল ঝা ইম্যানুয়েলদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মোটর ভেহিকলস অফিসের সামনে। তিনি অর্জুনকে ধমক দিতে যাচ্ছিলেন, ইম্যানুয়েল বারণ করলেন।
‘দেখুন স্যার, এসব বহুতদিন আগের কথা। আমি তখন বাচ্চা ছিলাম। মা-কে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ আটকে রাখে। হেভি কিচাইন। মা কাঁদাকাটা করেছে অনেক। আমরা এসবের কিছু জানি না।’ অর্জুন তেরিয়া হয়ে উঠতে গিয়ে বাবুলালকে দেখে সামলালেন।
জাভেদ নরম গলায় বোঝালেন কেন অর্জুনকে অফিশিয়ালি জিজ্ঞাসাবাদ আর করা হবে না। কারণ, এই কেস অনেকদিন আগে ক্লোজ হয়ে গেছে। তবু, অর্জুনের যদি কিছু মনে থাকে, তাই তাঁরা এসেছেন।
‘মা কাঁদত খুব, অনেক রাত ঘুমোতে পারত না। বলত চোখ বুজলে ওই লাশ চোখে ভাসছে। তার ওপর আপনাদের কাগজওয়ালাদের উৎপাত তো ছিলই। বাড়িতে হুটহাট হানা দিত। তবে, পুলিশ থেকে কড়া বারণ ছিল, যেন মুখ না খোলে। মা লোকজনকে বলেনি। আমিও বড়ো হয়ে জেনেছি। ওসব ব্যাপার স্যার, মানে, গায়ে কাপড় ছিল না তো,—’ অর্জুন গলা খাঁকড়ালেন, ‘এসব বড়োলোকদের নোংরা লাফড়া, স্যার। দূরে থাকাই ভালো। মা তারপর থেকে পাশের একটা নার্সিং হোমে কাজ করত। আয়ার কাজ জানত, অসুবিধে হয়নি। ও অনেক শাস্তির।’
‘সেদিন আপনারা কোথায় ছিলেন, মনে আছে?’
‘বাবা তো গ্যারেজে কাজ করত, সেখানেই ছিল। আমি ছিলাম পাশের বাড়িতে, ওদের টিভি ছিল। সেদিন ‘শোলে’ দেখানো হচ্ছিল। মা ওই হাজরার দিকে একটা বাড়িতে কাজ করত, ওদের বাড়িতে দেখেছিল। মনে আছে, গোটা পাড়া শুনশান হয়ে গেছিল। সবাই ‘শোলে’ দেখছে। চারটের সময় শেষ হয়েছিল।’
‘মা তারপর ওই মালিনীদের বাড়িতে যান, তাই তো? ওখানে কী দেখেছিলেন, আপনাকে জানিয়েছিলেন?’
‘পরে জেনেছি। ‘শোলে’ দেখে বেরোবার পর অন্য একটা বাড়িতে বাসন মাজতে যাবার কথা। সেটা ওই রাস্তাতেই পড়ে। যেতে গিয়ে মাঝপথে ওদের বাড়ি ঢুকেছিল। মায়ের খটকা লেগেছিল, কারণ ওই দিদির ঘরের দরজার নীচের দিকের কাঠের একটা জায়গা ভাঙা ছিল, সেই ফাঁক দিয়ে অনেক মাছি উড়ছিল। বাড়ি খুব পরিষ্কার থাকত। ওই দিদি মশা, মাছি নিয়ে পিটপিটে ছিল খুব। সে-বাড়িতে এত মাছি থিকথিক করবে কেন? মা দরজা ধাক্কায়। কেউ খোলেনি। কয়েক বার দরজা ধাক্কানোর পর ভেবেছিল ঘুমোচ্ছে। কিন্তু, বাইরের দরজা খোলা রেখে কেন কেউ ঘুমোবে, মায়ের ধন্দ হয়েছিল। কী করবে বুঝছিল না, একবার ভাবল মেন দরজা বন্ধ করে চলে যাবে। কিন্তু, তাও মনের ভেতর কেমন কেমন করছিল মাছিগুলো দেখে। তার ওপর বাড়ি এত নিঝুম, কেমন গা-ছমছমে, মা বলেছিল। তো, কিছু না-বুঝতে পেরে শেষে ঠিক করল ফিনাইল দিয়ে একবার ন্যাতা বুলিয়ে দেবে চলে যাবার আগে, যাতে মাছিরা আর না-থাকে। কিন্তু, ঘরের ভেতর থেকে একটা আঁশটে গন্ধ নাকি মায়ের নাকে এসেছিল তখন। মা আয়ার কাজ করত আগেও। জানত, গন্ধটা রক্তের। তখন ভয় পেয়ে যায়। দিদির মা তখন বাইরে। কোথায়, মা জানত না। দিদির বরের বাড়িও চিনত না। কী করবে বুঝতে না-পেরে দৌড়ে নীচে নেমে পাড়ার অন্যদের ডেকে আনে।’
‘তাহলে, আপনার মায়ের কাছে ও বাড়ির চাবি থাকত না? মানে, মেইন দরজার?’
‘না তো! কে আর কাজের মাসিকে চাবি দেবে, বলুন!’
‘মেইন দরজা খোলা কেন ছিল, মা পরে কিছু ভেবেছিলেন?’
‘শুরুতে তো ভেবেছিল বাড়িতে অতিথি এসছে। তারপর যা হল, মায়ের মাথা আউলে গেছিল। পরে কথাই বলতে চাইত না এ নিয়ে।’
ইম্যানুয়েল জাভেদের দিকে তাকালেন। এই জায়গাটায় এসে তিনি বার বার আটকে যাচ্ছেন।
‘দিদির মা তো বাইরে ছিলেন। তিনি কখন ফিরলেন?’
‘সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। কড়া ধাতের মেয়েমানুষ, স্যার। একটুও কাঁদেনি নাকি বন্ধঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর নিজের ঘরে ঢুকে গেল।’
জাভেদ এবার খেই ধরলেন। ‘আচ্ছা, আপনার মা আর কিছু বলেছিলেন? মানে, এমন কিছু যা তিনি দেখেছিলেন?’
‘ওই তো, বলে দিলাম যা বলার।’ অর্জুন অনিচ্ছাতে গা মোচড়াচ্ছেন। এবার উঠতে চান। তাঁরা কথা বলছিলেন একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে। ইম্যানুয়েল আরেক কাপ চা অর্ডার দিলেন। অর্জুন কাচের গ্লাসে কড়া দুধ চা নিলেন। সঙ্গে প্রজাপতি বিস্কুট। জাভেদ অর্জুনকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, এমন কিছু, খুব সামান্য কিছুই হয়তো, যা অদ্ভুত হতে পারে, হতে পারে স্বাভাবিকের থেকে বাইরে, সেরকম কিছু নির্মলা দেখেছিলেন কি না।
‘নাহ্, আর কী! ওই সবই তো। পুলিশ তো যা জানার জেনেই নিয়েছিল তখন।’ অর্জুন আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিলেন। হাতের চাপে কুড়মুড়ে ভাঙছে প্রজাপতি। একটা কুকুর মুখে জামা নিয়ে ছুটে রাস্তা পেরোল আর দুটো খালি গায়ের বাচ্চা হইহই করতে করতে ধাওয়া করল তাকে। কাদা জমে জায়গাটা পিচ্ছিল। পাশের শিবমন্দির থেকে ‘জয় জগদীশ হরে’ ভেসে আসছে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি কোমরে গামছা বেঁধে রোদচশমা পরা কয়েক জন যুবক কাঁধে বাঁক তুলল। দরদর করে ঘামছে। তারকেশ্বর অনেকটা রাস্তা।
‘হ্যাঁ, এখন আপনি বলায় মনে পড়ল বটে। মা পরে জানিয়েছিল। তখন ওই হট্টগোলের মধ্যে মায়ের মাথায় ছিল না, কিন্তু অনেক পরে মনে পড়েছিল। তখন সব চুকেবুকে গেছে।’
‘কী?’
‘লোকজন যখন দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকেছিল, মা দেখেছিল ঘরে গুডনাইট জ্বলছে। ওই দিদির নাকি গুডনাইটের গন্ধে অ্যালার্জি ছিল। জ্বালাতে দিত না। বলত, বন্ধঘরে গুডনাইট জ্বালালে শ্বাসকষ্ট হয়। গুডনাইট জ্বালালেই মুখে চাদর চাপা দিত, ওতে নাকি কষ্ট কম হয়। সেই নিয়ে মা আর বরের সঙ্গে ঝগড়াঝাটিও হত, কারণ এসব অঞ্চলে তো মশার চাষ। মায়ের অবাক লেগেছিল, কারণ অনেকক্ষণ গুডনাইট চলেছিল, ঘরে গন্ধ ম-ম করছিল।’
কিছুক্ষণ পর অর্জুন চলে গেলেন, বাবুলালকেও বিদায় দেওয়া হল। আরেক গ্লাস চা নিয়ে চোখ বুজে বসে থাকলেন ইম্যানুয়েল। জাভেদ নিজের মনে বিড়বিড় করলেন, ‘শীতকালে মশা বাড়ে। তাই কি গুডনাইট?’
‘মনে রেখো, দরজা, জানালা চারপাশ থেকে বন্ধ। ছিটকিনি ওপরে তুলে বেঁকিয়ে আটকানো। তাহলে মশা কোথা থেকে আসবে?’
‘দরজার কাঠের ওই ফাঁক দিয়ে, যেখান দিয়ে মাছি ঢুকেছিল।’
‘তার জন্য যার অ্যালার্জি সে অতক্ষণ গুডনাইট জ্বালাবে?’
‘কিন্তু দেখো, তাহলে তো অনিরুদ্ধই কালপ্রিট? মালিনী খুন হবার পর অনিরুদ্ধ মশা থেকে বাঁচতে গুডনাইট জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। তখন বাধা দেবার কেউ নেই।’
‘সেক্ষেত্রে অনিরুদ্ধ যে ঘোরের মাথায় খুন করেছিলেন এবং সব ভুলে গিয়েছিলেন এই তত্ত্ব খারিজ করে দিতে হয়। এখন গুডনাইট জ্বালানো যে নিরাপদ, সেই বোধ তাঁর ফিরে এসেছিল। তার মানে, দীপকের তত্ত্ব মান্যতা পায়।’
‘তাহলে আবার সেই আগের প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়, অনিরুদ্ধ পালিয়ে গেলেন না কেন। ধুর শালা!’ জাভেদ কপালে আঙুল ঘষলেন। ‘অদ্ভুত লুপে ঘুরছি আমরা। তুমি আজ আবার ওদের বাড়ি গেলে কেন?’
‘জানালা খুললে বাইরের আওয়াজ শোনা যায়। কিন্তু, বন্ধ করলে শোনা যায় না। এটা আরেকবার পরখ করে দেখলাম। সুতরাং, সেদিন জানালা খোলা ছিল। নাহলে, ‘শনিবারের বারবেলা’ শোনা যাবে না। এদিকে অনিরুদ্ধর জবানবন্দি অনুসারে, ঘুমোবার আগে মালিনীকে তিনি কথায় কথায় জানিয়েছিলেন যে, ঘরের সব জানালা বন্ধ।’
‘কিন্তু, তাহলে জানালা খুলে আবার বন্ধ করল কে? খুনি, মানে অনিরুদ্ধ?’
‘মনে রেখো জাভেদ, সুইচবোর্ড অনেকটা উঁচুতে।’
‘তাতে কী এল গেল?’
‘ভাবো। আপাতত, শেষজনের সঙ্গে কথা বলব। মালিনী অধিকারীর বন্ধু।’
