হামারটিয়া – ১৩

১৩

লাইকলি ইম্পসিবিলিটি, নাকি, আনকনভিন্সিং পসিবিলিটি? অনিরুদ্ধ সান্যাল কী ভেবে এই কথাটা লিখেছিলেন, ইম্যানুয়েল দু-দিন ধরে চিন্তা করলেন। মালিনীকে তাঁর হত্যা করা কি নিজের কাছেই আনকনভিন্সিং ছিল? কারণ, পুলিশকে তিনি বলেছেন যে, এটা সম্ভব, তবু তাঁর নিজের বিশ্বাস হয়নি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত না, চিঠির বয়ান সত্যি ধরে নিলে। তাহলে যেটা ইম্পসিবল, সেদিকে ভাবতে হয়। ইম্যানুয়েল আরেকটা অদ্ভুত কাজ করলেন, যার ব্যাখ্যা তাঁর নিজের কাছেও ছিল না। বাজেশিবপুর থেকে ফেরার সময় কলেজ স্ট্রিট থেকে ‘পোয়েটিক্স’ এককপি কিনে আনলেন। পেঙ্গুইন ক্লাসিক, ১৯৯৬ সংস্করণ। একরাত্রে বইটা পড়ে ফেলেও অনিরুদ্ধর লেখা উক্তিটা হুবহু খুঁজে পেলেন না, তবে ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা ছিল, ইম্পসিবল প্লজিবিলিটির তুলনায় প্রোব্যাবল ইম্পসিবিলিটি বেশি গ্রহণযোগ্য। কথাটা মোটামুটি অনিরুদ্ধর লেখার সঙ্গে মিলে যায়। অ্যারিস্টটল কথাটা বলেছিলেন এপিক এবং ট্র্যাজেডির আলোচনায়। যদি এপিক অথবা বিয়োগান্তক ঘটনার কার্যকারণ ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে দর্শক ধাক্কা খাবে এমন ব্যাখ্যায় যা আপাতভাবে অসম্ভব হলেও লাইকলি। অন্যদিকে, আপাতভাবে সম্ভাব্য হলেও সেই ব্যাখ্যা যদি আনকনভিন্সিং হয়, দর্শক বিরক্ত হবে। রাজা অয়দিপাউসের পতনের কারণ পিতৃহত্যা এবং মাতৃগমন, যা অসম্ভাব্য, তবু নিয়তিনির্ধারিত হবার কারণে ঘটেছিল। এবং দর্শক স্তম্ভিত বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়েছিল। তার পরিবর্তে যদি পতনের কারণ হিসেবে দেখানো হত অয়দিপাউসের অহংকার অথবা ঈর্ষা, যা তুলনামূলকভাবে বেশি সম্ভাব্য হলেও অয়দিপাউসের চরিত্রের সঙ্গে যায় না, তাহলে দর্শক কনভিন্সড হত না, বরং তার কাছে এই ব্যাখ্যা খাপছাড়া লাগত। সাহিত্যের এই এই ব্যাখ্যাকে কেন রহস্যের সমাধানে প্রয়োগ করা হবে, তার উত্তর ইম্যানুয়েলের কাছে ছিল না। তা সত্বেও তিনি এই যুক্তিক্রমকে নাড়াঘাঁটা করে গেলেন। অনিরুদ্ধ কি নিজের জীবনটাকে ট্র্যাজেডির প্রেক্ষাপটে দেখেছিলেন? নাকি, ঘটনাক্রম খুঁটিয়ে ভাবতে গেলে এই যুক্তিবিন্যাসকে তাঁর প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল? বিকল্প সমাধান হিসেবে যেগুলো অসম্ভব, যেমন জানালার বাইরে থেকে হত্যা বা মালিনীর আত্মহত্যা, সেগুলোকে ইম্যানুয়েল ফোনে জাভেদের সঙ্গে আলোচনা করলেন একটা গোটা সন্ধে ধরে। জাভেদ সবকটাকে বিকল্পকেই নাকচ করলেন, কারণ তারা এমনকী লাইকলিও নয়। ফোন রাখার আগে বললেন, ‘অ্যারিস্টটল নিয়ে কচকচি ছাড়ো, ইজি। ওভাবে সমাধান গল্প, উপন্যাসে হয়। এমন কিছু ভাবো, যেটা সহজ। এটা আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল এক্সারসাইজ নয়। একজন নিহত হয়েছে, আরেকজন আত্মহত্যা করেছে। আর, আমি শালা ভুল করে নিরপরাধকে শাস্তি দিয়েছি, এই আশঙ্কায় বেঁচে আছি। এ তোমার গ্রিক ট্র্যাজেডি নয়, ভেতো বাঙালির ব্যাপার।’

উত্তর দিতে কয়েক মুহূর্ত সময় নিলেন ইম্যানুয়েল। তারপর ধীরস্বরে বললেন, ‘তোমাদের তত্ত্বের প্রতি অনীহা, সবার। এদিকে তোমরা যা বোঝো না, জীবন মানে তার অর্থ আছে, আর অর্থ মানে তার তত্ত্ব আছে। মিনিং ইজ থিয়োরেটিকাল। আমি এমনি এমনি সারাজীবন ধরে ক্লাসিক পড়ি না। ক্লাসিক না-থাকলে আমি কখনো ডিটেকটিভ হতে পারতাম না।’

‘আমি বুঝি না ওসব। বইপত্র পড়ি না। টিভি দেখি, মদ খাই, গান শুনি। নিতান্ত কেজো ইনভেস্টিগেট করেই তো এতগুলো বছর পার করলাম। যাকগে, পারমিতা সান্যালের ব্যাপারটা দেখে নিয়ো। রাখছি এখন।’

সাদার্ন অ্যাভিনিউর এই ক্যাফেটা তাদের কাপকেক এবং ফ্রঁসোর জন্য বিখ্যাত। টাটকা বাটার ফ্রঁসোর প্রতি ইম্যানুয়েলের দুর্বলতা আছে। তাই পারমিতা সান্যাল যখন দক্ষিণ কলকাতায় বসতে চাইলেন, ইম্যানুয়েল তৎক্ষণাৎ এই ক্যাফের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদিও পারমিতা সান্যালকে পেতে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। প্রথমে কথাই বলতে চাইছিলেন না। জাভেদের সঙ্গে ফোনে ঠান্ডা ব্যবহার করেছিলেন, ফোন রেখেও দিয়েছিলেন মুখের ওপর— বলেছিলেন যে, তিনি আর পুরোনো প্রসঙ্গ তুলতে আগ্রহী নন। তারপর অন্য পরিচিতির সূত্র ধরে তাঁকে রাজি করানো গিয়েছে। ছেষট্টি বছর বয়েস তার আঁকিবুকি রেখে দিয়েছে গালে, গলার চামড়ায়, চোখের কোণে। সেগুলোকে লুকোবার চেষ্টাও করেননি পারমিতা। সাদা চুল, চোখে বড়ো ফ্রেমের চশমা! একটা কাঁথা স্টিচের শাড়ি পরে আছেন, কাঁধের একপাশ থেকে চাদর ঝুলছে। পারমিতা অঙ্ক নিয়ে এম.এসসি. করে জিয়োলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে চাকরি করেছেন সারাজীবন। শিলং-এর অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন থাকেন গল্ফগ্রিনে।

‘যোধপুর পার্কে আমার বড়ো হয়ে ওঠা। এখানেই বাবার বাড়ি ছিল, এখন বিক্রি হয়ে গেছে। আপনার নামটা বেশ ইন্টারেস্টিং। এনি রিজন বাহাইন্ড দ্যাট?’ নিখুঁত ব্রিটিশ উচ্চারণে জিজ্ঞাসা করলেন পারমিতা। আজ জাভেদ আসেননি। বাড়িতে অতিথি এসেছে, সেই নিয়ে ব্যস্ত। ইম্যানুয়েল পারমিতাকে নিজের বংশপরিচয় দিলেন। পারমিতার বাঁ-ভুরু দেড় ইঞ্চি ওপরে উঠে গেল। ‘কলকাতার শেষ ইহুদি বলা যায় আপনাকে। নাহুমসও বিক্রি হয়ে যাচ্ছে শুনেছি। আমার সঙ্গে ইয়ান জ্যাকারিয়ার পরিচয় ছিল এককালে। অসাধারণ মানুষ। নিশ্চয় চিনবেন আপনি। আপনাদের সিনাগগেও একবার গেছি। আপনি কোনটায় যান?’

‘কোনোটাতেই না, কারণ সিনাগগে বহুকাল সার্ভিস হয় না। মিনিয়ান, মানে, দশজন পুরুষকে লাগে সার্ভিস করতে। কলকাতায় এই মুহূর্তে দশজন পুরুষ সম্ভবত নেই। ম্যাগেন ডেভিডের কেয়ারটেকার রাবিউল খান-এর পরিবার তিন পুরুষ ধরে সিনাগগের দেখাশোনা করে আসছে বলে এখনও টিকে আছে। আপনি ঠিকই বলেছেন মিস সান্যাল, আমি কলকাতার শেষ জীবিত ইহুদি হিসেবে থেকে যাব।’

‘মুখার্জি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমায় পুলিশ অনিরুদ্ধর পদবি দিয়ে ডিনোট করেছিল। কিন্তু, বিয়ের পরেও আমি কখনো ওর পদবি ব্যবহার করিনি।’

‘আপনাদের আলাপ কীভাবে?’

‘দেখুন, এগুলো বিষয়ে কথা বলা আমার পক্ষে অসুবিধেজনক। সেজন্যেই প্রথমে আমি রাজি হইনি। তারপর বাধ্য হয়ে মত দিয়েছি, কারণ অনিতা লাডিয়া আমার বিশেষ ভালো বন্ধু। শুনলাম, অমিয় বিশ্বাস বলে কেউ একজন

‘উনি পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন এই কেসের।’

‘মেবি। আমার খেয়াল নেই। তো, সেই অমিয়বাবু নাকি অনিতাকে রিকোয়েস্ট করেছেন যেন আপনার সঙ্গে দেখা করি। আমি কেন আবার পুরোনো দুঃখ খুঁড়ে বার করব বলতে পারেন?’

‘বুঝতে পারছি। কিন্তু, আমাদের কাছে অনিরুদ্ধবাবু একটা চিঠি পাঠিয়ে লিখে গেছেন, তিনি নির্দোষ। আপনার কোনোই দায় নেই এ ব্যাপারে। দায় আমাদের, যাঁরা তাঁকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট ফেলেছিল। আমাদের যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে সেবার, অন্তত নিজেদের কাছে ক্লিয়ার থাকতে চাই। আপনিও কি খুশি হবেন না, অনিরুদ্ধবাবু নির্দোষ প্রমাণিত হলে?’

‘আমার কিছু আসে-যায় না আর। অনেকদিন কেটে গেছে। আপনি বুঝবেন না— দ্যাট হিউমিলিয়েশন— ওভাবে দু-জনকে আবিষ্কার করার পর পুলিশের প্রশ্নোত্তর—কাগজে, টিভিতে আমাদের দেখানো— আমার দুই মেয়ের তখন কী অবস্থা হয়েছিল কল্পনা করতে পারেন? পাড়ায়, স্কুলে, বন্ধুদের বার্থডে পার্টিতে ওদের যে হিউমিলিয়েশন সহ্য করতে হয়েছিল? আমাকে? এরপর আমার কেন কোনোরকম দুর্বলতা থাকবে অনির প্রতি? সে যদি নির্দোষও হয়, তাতে আমার কী?’ পারমিতা চাপাগলায় বলছিলেন, মুখেও বিকার নেই, কিন্তু কফির কাপে যন্ত্রের মতো চামচ ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন।

‘তাহলে অনুরোধ করছি, নৈর্ব্যক্তিকভাবে আমাদের সাহায্য করুন।

কয়েক মুহূর্ত অপলকে ইম্যানুয়েলকে দেখে পারমিতা প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি বিয়ে করেননি, না?’

হালকা হেসে ঘাড় নাড়লেন ইম্যানুয়েল।

‘ওইজন্যই। আপনার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, বিশ্বাসঘাতকতার স্বাদ কেমন হয়।’ পারমিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘বলুন, কী জানতে চান।’

‘আপনাদের কবে আলাপ?’

‘তখন আমি ইউনিভার্সিটি ফাইনাল ইয়ার। আমার পিসতুতো দাদার বন্ধু ছিল। আমার থেকে চার ব্যাচ সিনিয়র। একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমাদের বাড়ি এসেছিল। তারপর একদিন আমাদের বাড়িতে ফোন করে দেখা করতে চাইল। তখন আমি একটা স্টেডি প্রেম করছিলাম কিন্তু। কিন্তু, অনি নাছোড়বান্দা।’ পারমিতা মৃদু হেসে আবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। ‘পেছনে পড়ে থেকেছিল। পরে আমিও নরম হই। বলতে পারেন, আই ডিচড মাই বয়ফ্রেন্ড ফর হিম। প্রতীক। বহুকাল হল ইউ.এস.এ.-তে থাকে।’

‘আপনাদের বিয়ে কত সালে?’

‘১৯৮৪। প্রথমে বালিগঞ্জে একটা ভাড়াবাড়িতে থাকতাম। তারপর ১৯৯০ সালে নিউ আলিপুরে ফ্ল্যাট কিনে চলে আসি। আমার ছোটোমেয়ের জন্মও সেই বছরে।’

‘আপনাদের মধ্যে অশান্তি, বা, কোনো প্রবলেম—’  

‘দেখুন, সব বিয়েতেই এসব থাকে। বড়োসড়ো ব্যাপার নয়। প্লাস, অনিরুদ্ধর মহিলাঘটিত দুর্বলতা ছিল কিছু। ডেঞ্জারাস কিছু নয়। হয়তো আমায় লুকিয়ে কফি খেতে গেল একদিন। এসব জেনে আমি প্রথমে কান্নাকাটি, মান-অভিমান করেছি। পরে মনে হয়েছিল, আমি টিপিক্যাল গৃহবধূসুলভ আচরণ কেন করছি। ও যদি এরকম নির্বিষ আলাপে খুশি থাকে, তো, থাকুক না! আমারও নিজের কাজকর্ম নিয়ে প্রবল ব্যস্ততা থাকত। তাই এসব ইগনোর করতে শিখেছিলাম। সেটাই হয়তো ভুল হয়েছিল। তবে এর বাইরে, বাবা এবং স্বামী হিসেবে ওর ভূমিকায় কিন্তু আমার অভিযোগ ছিল না। যথেষ্ট দায়িত্ববান এবং আমার মনে হত দুই মেয়ে ওর প্রাণ। মেয়েদের সঙ্গে খেলছে, পড়াচ্ছে, সময় কাটাচ্ছে। বরং, আমিই সময় কম দিতাম। উইকএন্ডে নিয়ম করে আমরা বেরোতাম, শীতকালে চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া বা জাদুঘর। অন্য সময় হলে আত্মীয়দের বাড়ি, অথবা, কোনো সিনেমা দেখতে গেলাম। বছরে একবার ফ্যামিলি ট্রিপ। অনির ইচ্ছে ছিল আমাদের নিয়ে ইস্তানবুল যাবে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলন আসলে কী, দেখাবে মেয়েদের। কিন্তু, ওর লয়ালটি আসলে যে অন্য কোথাও গচ্ছিত, তখন তো বুঝিনি।

‘আপনি যখন ঘটনাটা শুনলেন, শকিং লেগেছিল তো? সরি, ইনসেন্সিটিভ প্রশ্ন হয়ে গেল হয়তো।’

‘শকিং অতটা নয়, তবে নিজেকে বিট্রেড মনে হয়েছিল। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। দু-দিন ডিনায়ালে ছিলাম। ভেবেছিলাম, অনিরুদ্ধকে কিছু বলব না। যা হয় এসবে—’

‘সরি, আমি বুঝলাম না। দু-দিন ডিনায়ালে কীভাবে ছিলেন? পুলিশ তো সেদিনই যোগাযোগ করেছিল আপনার সঙ্গে।’

ইম্যানুয়েলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন পারমিতা কয়েক সেকেন্ড। ‘আপনি জানেন না? আমি তো আগেই জানতাম। তিনমাস আগে।’

কথাটা হজম করতে ইম্যানুয়েলের কিছুক্ষণ সময় লাগল। মাথা নীচু করে বললেন, ‘এটাই আমাদের প্রশ্ন ছিল, শুরুতে। আমরা ধরে রেখেছিলাম যে, আপনি জানতেন না।’

‘আমি তো পুলিশকে জানিয়েছিলাম।’

‘আপনি তিনমাস আগে— কীভাবে জেনেছিলেন?’

‘মালিনী অধিকারীর মা আমায় যোগাযোগ করেন।

দেবারতি এটা কি পুলিশকে জানিয়েছিলেন? ইম্যানুয়েল ঠিক করলেন জাভেদকে চার্জ করবেন। তিনি শুরুতেই বলেছিলেন, পারমিতা যদি আগে থেকে জেনে থাকেন তাহলে অনিরুদ্ধর খুনের মোটিভ দুর্বল হয়ে যায়। তখন জাভেদ এবং অমিয় বিশ্বাস তাঁকে বললেন যে, পারমিতা জানতেন না। এখন জানা যাচ্ছে উলটো। এত জরুরি তথ্যের ব্যাপারে ভুল থাকলে তদন্ত ঘেঁটে যায়। জাভেদের উচিত ছিল এই ব্যাপারটা ভেরিফাই করা।

‘কীভাবে যোগাযোগ করলেন?’

‘আমার ব্রেবোর্নের এক অধ্যাপিকা ওঁর বোন। সেই পরিচয় দিয়ে অফিসের ঠিকানায় ফোন করলেন একদিন। দেখা করতে চাইলেন। আমি প্রথমে বুঝিনি। ভদ্রতা করে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম। শেষে কিছুটা জোর দিয়েই বললেন যে, প্রয়োজনটা উভয়ত। কিন্তু, ফোনে এর বেশি বলতে চাইলেন না। অক্সফোর্ডে দেখা করেছিলাম। তখন সব খুলে বললেন। ওঁর দায় ছিল মেয়ের সংসার বাঁচানো আর উনি ভেবেছিলেন আমার দায় হয়তো অনিকে ফিরিয়ে আনা। আমি গোটা সময়টা বিশেষ কথা বলিনি। চুপ করে বসে থেকেছিলাম। মনে হয়েছিল, নিজের ইমোশনাল টারময়েল বাইরের মানুষের কাছে দেখাব না। দেবারতি অধিকারী অনুরোধ করেছিলেন, যেন তাঁর কথা না-বলি। তাই অনি-কে বলিনি। তবে, পুলিশকে বলেছিলাম। কিন্তু, পুলিশ দায়সারা স্টেটমেন্ট নিয়েছিল।’

‘তারপর?’

‘দু-দিন পর আমি অনি-কে চার্জ করেছিলাম। ও অস্বীকার করার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। ওদের গোয়া যাবার টিকিটের ছবি আমায় দেখানো হয়েছিল। অনি বাড়িতে বলেছিল অফিসের কাজে বম্বে যাচ্ছে। আই ওয়াজ শ্যাটার্ড। অনি আমায় বলেছিল এটার থেকে বেরিয়ে আসবে। সময় চেয়েছিল। বার বার ক্ষমা চাইছিল। কিন্তু, একবার বিশ্বাস ভেঙেছে। এরপর ফিরে এলেও আমার কী আসত-যেত? আমি কি ওকে গ্রহণ করতে পারতাম? কিন্তু, কুৎসিত ঝগড়াঝাঁটি, এসবে যা হয়, আমার ভয়াবহ অপছন্দ। ইট’স সো পেটি! আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। অনিরুদ্ধর সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

‘কিন্তু, অনিরুদ্ধ কি ডিভোর্স চেয়েছিলেন একবারও?’

মাথা নামিয়ে ঝুম বসে থাকলেন পারমিতা। ইম্যানুয়েল সময় দিচ্ছিলেন। আরেকটা কফি নিলেন। তখন দেখলেন, চ্যাপলিনের পোশাকে ঘনশ্যাম উলটোদিকের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আশ্চর্য, অফিসপাড়ায় না-গিয়ে এখানে কেন? ইম্যানুয়েল মুখ বাড়িয়ে দেখলেন, বিবেকানন্দ পার্কের লাগোয়া ফুটপাথে ঘনশ্যাম বসে পড়ল। গলায় সেই প্ল্যাকার্ড, ‘গিভ মি ফুড।’

‘এই কথাটা পুলিশকে আমি জানাইনি। অবশ্য, ওদেরও ইন্টারেস্ট ছিল না। অনিরুদ্ধকে আমি ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলাম। ও রাজি হয়নি।’

ইম্যানুয়েল চোখ বুজলেন। অনেক হিসেব উলটোপালটা হয়ে যাচ্ছে। ঘনশ্যাম স্থির বসে।

‘আমার সম্মানের পক্ষে এ জিনিস নেওয়া সম্ভব ছিল না। আমি বলেছিলাম, বেরিয়ে যাচ্ছি। ও যাকে ভালোবাসে তার কাছে যাক। কারণ, আমি ততদিনে বুঝতে পারছিলাম, মালিনীকে ও ভালোবাসে। এগুলো লুকিয়ে রাখা যায় না। ও আমায় বিট্রে করেছিল সেটা ঠিকই, কিন্তু নিজের ভালোবাসার প্রতি অন্তত সৎ থাকতে পারত।

‘এটা কবে বলেছিলেন?’

‘ওই ঘটনার দিন দশেক আগে। অনিরুদ্ধ আবার বলেছিল, ও বেরিয়ে আসবে। আমি ওকে বোঝাতে পারিনি যে, ও বেরোক বা না-বেরোক, আমার কিছু এসে যেত না আর। এবং, ও যে বেরোয়নি, শেষদিনেই তো প্রমাণ হল। ঘেন্না খুব কঠিন শব্দ, মিস্টার গুহ। সহজে ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু খবরটা শুনে, যেভাবে ওদের আবিষ্কার করা হয়েছিল, আমার ঘেন্না বাদে কিছু হয়নি। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে, এই কেসের যা ফলাফল হোক, আমি থাকব না। অনি-র সঙ্গে দেখা করিনি। কোর্টে যাইনি। এমনকী পুলিশকেও অনুরোধ করেছিলাম আমায় এবং মেয়েদের যেন ন্যূনতম ইনভলভ করা হয়। আমার কিছু জানার নেই, কোনো বাড়তি তথ্য শুনতে চাই না। আমার অফিস থেকেও অবশ্য প্রোটেকশন দিয়েছিল, পুলিশকে বলেছিল যতটুকু না হলে নয়, তার বাইরে যেন আমাদের জড়ানো না হয়। বিচারপ্রক্রিয়া মেটার পর অফিস থেকে অন লিয়েনে মেয়েদের সঙ্গে জেনেভা চলে গিয়েছিলাম। ওখানে আমার বোন থাকে। ছ-মাস পর ফিরি। আসলে, পালাতে চাইছিলাম। তখনকার সরকার সহানুভূতির সঙ্গে দেখেছিল ব্যাপারটা, তাই ছুটিতে সমস্যা হয়নি। ফিরে আসার পর যোগাযোগ রাখিনি ওর সঙ্গে।’

মালিনী নিহত হবার দশদিন আগে অনিরুদ্ধ তাঁর স্ত্রী-কে বলেছেন, তিনি এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসবেন। আবার মালিনী নিহত হবার সাতদিন আগে মালিনীকে ফোন করে বলেছেন, তিনি বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসবেন। এ কি শুধুই শঠতা, নাকি, কোনো একপক্ষ বেছে নেবার চিরকালীন দ্বিধা? অনিরুদ্ধ অপরিণত ছিলেন না। তিনি জানতেন, একটা দিক ছাড়তেই হবে। তাঁর স্ত্রী- বিচ্ছেদে রাজি ছিলেন। তবু, অনিরুদ্ধ সেই সহজ সমাধান নিলেন না। সব জেনে-শুনে নিয়তিতাড়িত পুরুষের মতো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেলেন, মনে হল ইম্যানুয়েলের। বিয়ে থেকে বেরিয়ে এলে মালিনীর সঙ্গে সম্পর্ক জানাজানি হত। সেক্ষেত্রে লুকিয়ে তাঁর বাড়িতে রাত কাটাতে হত না। মালিনীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলে তো রাত কাটাবার প্রশ্নই ছিল না। আর, সেটা না হলে, অনিরুদ্ধ সান্যালের বারো বছর জেলের ভেতর কাটত না। এরই নাম কি প্রেম? সংসার, জীবনসঙ্গিনী, সন্তানের জন্য নাড়ির টান, আবার একইসঙ্গে মালিনীর প্রতি উথালপাথাল ভালোবাসা। তীব্র ভালোবাসা ধ্বংসাত্মক, অমোঘ আয়ুধের বর্ম সে নিজের শরীরে রাখেনি। এমন অনুভবকে ইম্যানুয়েল বোঝেন না। বিশ্লেষণ করতে পারেন। তাতে কি সম্পূর্ণটা মেলে?

‘একটা কথা বলুন। আপনারা যদি যোগাযোগ না-করেন, তাহলে অনিরুদ্ধবাবু তাঁর উকিল কোথা থেকে জোগাড় করলেন?’

‘ওর কোম্পানির সোর্স খাটিয়ে। সেই ভদ্রলোক, নাম ভুলে গেছি, আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। দেখা করতে চেয়েছিলেন। আমি কথা বলিনি, দেখাও করিনি। বলেছিলাম, এই কেসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। কোনো ডিটেল বা অনি-কে কীভাবে বাঁচানো যাবে, সে নিয়ে আমার আগ্রহ নেই। যেন ভবিষ্যতে যোগাযোগ না-করেন। আর ফোন করেননি। সম্ভবত বুঝেছিলেন, লাভ হবে না।’

‘অনিরুদ্ধবাবু জেল থেকে বেরোবার পরেও আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি?’

‘জেলে দেখা করতে যাইনি কখনো। ও বেরোবার পর জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট, ফ্ল্যাট বিক্রি, ডিভোর্স পেপারে সই এসব সংক্রান্ত কিছু কাজ ছিল। আমার ল-ইয়ারের অফিসে ওর সঙ্গে অফিশিয়াল ভিজিট করেছিলাম। অবশ্য, ছাড়া পেয়েই ও ঠিকানা খুঁজে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। অফিসেও গিয়েছিল একবার। দেখা করিনি। তারপর ফোন করেছিল। আমি বলেছিলাম যেন যোগাযোগ না- রাখে। দ্যাট’স ইট।’

‘ওঁর মারা যাবার খবরটা—’  

‘প্রদীপ বটব্যাল বলে কেউ ফোন নাম্বার জোগাড় করে জানিয়েছিল। আমার মেয়ে সমাপ্তির হাজব্যান্ড অভিষেক গিয়ে যা করার করে। আমার আলাদা করে কোনো অনুভূতি হয়েছিল কি না, জিজ্ঞাসা করবেন নিশ্চয়? হয়নি। অচেনা মানুষের মৃত্যুতে যতটুকু খারাপ লাগে, তার বেশি নয়। কিছু ঘটনার ট্রমা সারাজীবনে কাটে না, মিস্টার গুহ।’

‘আর, মালিনীকে নিয়ে আপনার কিছু মনে হয়নি?’

‘এখন আর কিছু মনে হয় না।’ উদাসীন কাঁধ ঝাঁকালেন পারমিতা। ‘শি ওয়াজ আ হোমব্রেকার। চরিত্র নিয়ে এর বেশি বলার কিছু নেই। আমি কখনো মিট করিনি, প্রবৃত্তি হয়নি। যাই হোক, ওভাবে মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক। জানি না ওদের মধ্যে কীরকম সম্পর্ক ছিল।’

‘কিন্তু, এমনও তো হতে পারত যে, মূলত আপনার চাপেই অনিরুদ্ধ খুনটা করলেন?’

পারমিতা রেগে গেলেন না। মৃদু হাসলেন। ‘আমি তো ডিভোর্স চেয়েছিলাম। চাপ আর কোথায়!’

‘হয়তো অনিরুদ্ধ চাননি। তাই পথের কাঁটা সরিয়ে দিলেন?’

পারমিতা উদাসীন কাঁধ ঝাঁকালেন। ‘সেটা আমার কনসার্ন নয়।’

‘ঘটনার দিন আপনি কোথায় ছিলেন?’

‘মায়ের বাড়ি। তখন থেকে উইকএন্ডে মেয়েদের নিয়ে মায়ের বাড়ি চলে যেতাম। মনে হত, ফ্ল্যাটের ওই বিষাক্ত আবহাওয়া থেকে বেরোতে হবে। দু- জনের মধ্যে কথা নেই, দমচাপা ভাব, সেটা তো মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যেও ভালো নয়।’

‘আচ্ছা, শেষ একটা প্রশ্ন করছি।’ ইম্যানুয়েল ঘড়ি দেখলেন। রাত বাড়ছে। আকাশে মেঘ ঘনিয়েছে আবার। ‘অনিরুদ্ধবাবুর কি অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্টজনিত কোনো সমস্যা ছিল?’

‘ঠিক বলতে পারব না। আমি ওকে রেগে যেতে অনেকবার দেখেছি, নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতেও। শেষের দিকে বেড়ে গিয়েছিল। মদও বেড়েছিল। কিন্তু, আমি ঠিক জানি না, সেটা মানসিক সমস্যা, নাকি, জাস্ট— মানে, এক-একজনের চরিত্রে থাকে না, রেগে যায় দুম করে, সেটা হয়তো ক্লিনিক্যাল কিছু না। কিন্তু আগেইন, আজকাল এগুলো নিয়ে অ্যাওয়্যারনেস বেড়েছে। পঁচিশ বছর আগে তো এমন ছিল না। যদি এটাই জানতে চান যে, রাগের মাথায় মালিনীকে খুন করতে পারে কি না, এর উত্তর আমার কাছে নেই। তিন পেগ জিনের পর আট ক্যান বিয়ার খেলে মানুষের কী অবস্থা হয়, আমি জানি না, মিস্টার গুহ।’

‘কিন্তু, রেগে গিয়ে কতদূর যেতে পারতেন?’

‘ফিজিক্যাল ভায়োলেন্স করেনি কখনো। যদি সেটাই জানতে চান।’

বিল মিটিয়ে ইম্যানুয়েল উঠলেন। ঘনশ্যাম চলে গেছে। জোলো হাওয়া বইছে আর সাদার্ন অ্যাভিনিউর গাছেরা কেঁপে যাচ্ছে বর্ষায়।

‘থ্যাঙ্ক ইউ। আপনি এতটা সময় দেবেন ভাবিনি। তবে, একটা জিনিস জানতে ইচ্ছে করছে। এই কেসের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এমনিই। আপনার কী বিশ্বাস, অনিরুদ্ধ এই খুনটা করেছিলেন?’

‘আমার কিছু যায় আসে কি? করুক-না-করুক, ও তো বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এতদিন পর এসে কোনো মনে হওয়াই আমার স্মৃতিকে উথালপাথাল করে না আর।’

‘তবু, জানতে চাইছি। জাস্ট, আপনার কী মনে হয়?’

‘বন্ধঘরে আর কে থাকতে পারে বলুন?’

‘ধরুন, ঘরটা খোলা ছিল। তাহলে কি অনিরুদ্ধকে আপনার মনে হয়?’

চোখের পলক ফেলার আগে পারমিতা উত্তর দিলেন, ‘না। আমি কখনো বিশ্বাস করিনি অনি খুন করতে পারত। ও বিশ্বাসঘাতক, যা করেছে তার ক্ষমা নেই। কিন্তু, খুনি নয়। কারণ সিম্পল। আপনারা কী ভাবেন, আমি জানি না। অনিরুদ্ধ বেসিক্যালি ভীতু। সেই সাহসই ওর ছিল না।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *