হামারটিয়া – ৭

অনেকদিন এই ঘরের দরজা খোলা হয়নি, বোঝা যায়। ক্যাঁচ শব্দে পাল্লা খুলল। ধুলো নিয়ে সাবধান করে দিল সাম্য। পুরোনো দিনের বিশালাকার ঘর। জানালা বন্ধ। টিউবলাইটের আলোতে অন্ধকার পুরোপুরি যাচ্ছিল না। দরজার মুখোমুখি একটা কিংসাইজ খাট, সাবেক কালের। মাথায় নকশার কারুকাজ। তার পেছনে জানালা। একটা টেবিল, দুটো চেয়ার। খাটের পাশের দেওয়াল লাগোয়া অ্যাটাচড বাথরুমের দরজায় তালা দেওয়া। সাম্যর কাছ থেকে জানা গেল, বহুকাল ওই টয়লেট অকেজো। ঘরের আসবাব কি অবিকল আগের মতোই আছে? খাট একই। টেবিল এবং আলমারিও। তবে, চেয়ারগুলো নতুন। আর, দেওয়ালে বছর কুড়ি আগে একবার রঙের পোঁচ পড়েছে। ইম্যানুয়েল চেয়ারে বসে চোখ বুজলেন। দু-মিনিটের নীরবতা। এই ঘর সত্যিটার সাক্ষী এবং যাবতীয় রহস্য কম্বলচাপা দিয়ে রেখেছে। টেবিলে কয়েকটা আজেবাজে খাতা, ছেঁড়া বই ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। ইম্যানুয়েল একটা পেপারব্যাক তুললেন। ‘ফাইভ লিটল পিগস’। পাতা লালচে হয়ে গেছে। মলাটে ধুলোর পুরু আবরণ। প্রথম পাতায় মেয়েলি হস্তাক্ষরে ইংরেজিতে লেখা, মালিনী অধিকারী, ১৯৮৮- র একটা তারিখ। বিছানার চাদর নেই। খোলা তোশক। তার ওপর হাবিজাবি প্লাস্টিক কিছু। কার একটা ভাঙা ছাতা। দেওয়ালে মালিনীর একটা ছবি। হাস্যমুখ শ্যামাঙ্গী। নীল কটনের শাড়ি পরা, ছোটো করে কাটা চুল। ধারালো জ’ লাইন, জোড়া ভুরু, ঈষৎ পুরু ঠোঁট। কলারবোন স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রথাগত অর্থে সুন্দরী কি না, ইম্যানুয়েল বুঝতে পারলেন না। কিন্তু, অদ্ভুত শার্পনেস আছে, যার থেকে চোখ ফেরানো যায় না।

‘দিদা বাড়ি থেকে মায়ের সব ছবি সরিয়ে দিয়েছিল। অ্যালবামগুলো নিজের আলমারির লকারে রেখেছে। শুধু এই ছবিটা জেদ করে রেখে দিয়েছিলাম আমি। মা-কে দেখলে মনে হয়, আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেন কিছু বলতে চায়।’ সাম্য নিজের সঙ্গে কথা বলছে এমন ভঙ্গিতে বলল।

‘আপনার বাবা এবং দিদা তো খুব ইতিবাচক ধারণা এখনও রাখেন না, আপনার মায়ের সম্পর্কে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ইম্যানুয়েল। জাভেদ ঢোকেননি। ধুলোয় অ্যালার্জি আছে। বাইরের ঘরে বসে ছিলেন।

‘সেটা ওদের সমস্যা। আমি মা-কে ওভাবে ভাবতে পারি না। মা শুধু নিজের জীবনটা বাঁচতে চেয়েছিল। কারোর ক্ষতি তো করেনি।’

‘আপনার কষ্ট হয়, যখন ওঁরা আপনার মায়ের সম্পর্কে এভাবে কথা বলেন?’

কয়েক সেকেন্ড মাথা নীচু করে থাকল সাম্য। তারপর মাথা তুলে মৃদু হাসল। ‘আমার মনে হওয়া দিয়ে এ বাড়ির কার কী আসে-যায়, বলুন! আমি এদের বংশধর কম, আশ্রিত বেশি।’

‘তবু, বলুন না!’ নরম স্বরে ইম্যানুয়েল জিজ্ঞাসা করলেন।

‘হয়। আমার মনে হয়, এরা কেউ মা-কে বোঝেইনি। আর আমিও এমন আটকে গেছি, এখানে— মা বেঁচে থাকলে আমি মা-কে নিয়ে পালিয়ে যেতাম। বলতাম, যার সঙ্গে যেখানে খুশি থাকো। শুধু এখানে নয়।’

‘মায়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?’

‘অনেকটা বন্ধুর মতো বলতে পারেন। আমার পড়াশোনার দিকটা দিদা আর বাবা দেখত। মা কখনো মাথা ঘামায়নি। কিন্তু, আমায় নিয়ে শপিং করা, সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়া, রেস্তরাঁতে খেতে নিয়ে যাওয়া, এগুলো মায়ের হাত ধরে। ছোটোবেলা থেকে আমার ভয়ানক টনসিল আর ঠান্ডা লাগার ধাত ছিল। শীত পড়লে মা আমায় নিয়ে ট্রামে চেপে নিউমার্কেট চলে যেত। বেছে বেছে আমরা দু-জন ফ্যান্সি টুপি, মোজা আর মাফলার কিনতাম। তারপর প্যারামাউন্ট বা পিটার ক্যাটে চলে যেতাম। সেসব দিন আমার কাছে উৎসবের মতো ছিল। মা খুব ভালো ছবিও আঁকত, জানেন। আমায় শিখিয়েছিল, প্যাস্টেল কীভাবে হ্যান্ডল করতে হয়।’

‘ঘটনার দিনের কথা আপনার মনে আছে?’

‘এগজ্যাক্ট ডিটেইল খুব একটা না। আমার স্মৃতি আবছা হয়ে আসছে দিনে দিনে। তার একটা কারণও আছে। আপনাদের কাছে লুকোব না।’ সাম্য নিজের হাত বাড়িয়ে ধরল। কনুই থেকে কবজি পর্যন্ত অসংখ্য সুচ ফোটাবার দাগ।

‘কতদিন আগে?’

‘তখন সবে স্কুল ছেড়েছি। স্কুলের অভিজ্ঞতা দুর্বিষহ। সবাই তাকাত আমার দিকে। কেউ মিশত না। আড়ালে হাসাহাসি করত। আমার প্যান্ট খুলে দিয়ে পালিয়ে যেত। সেটা অবশ্য মা বেঁচে থাকার সময়েও ঘটেছে। আমি মারপিট করতে পারতাম না। ভেউ ভেউ করে কাঁদতাম। মা চলে যাবার পর আরও বাড়ল। আমায় ‘খানকির ছেলে’ বলে মুখের সামনে দাঁড়িয়ে হি-হি করে হাসত বন্ধুরা। আমি কিছু না-পেরে আবার কাঁদতাম। স্কুলের স্যারেরাও যে খুব সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন, এমন না। সরাসরি কিছু বলতেন না। কিন্তু ধরুন, পড়া পারলাম না, সঙ্গেসঙ্গে টিপ্পনী কাটলেন, ‘হবে না? কোথা থেকে এসেছে দেখতে হবে তো।’ হয়তো কিছু ভেবেও বলেননি, কিন্তু ততদিনে আমি বিকট অনুভূতিপ্রবণ হয়ে গেছি। সহজ কথাকেই নিতে পারতাম না, তো এগুলো। লুকিয়ে থাকতে চাইতাম সবার থেকে। স্কুল কাটতাম যেন এগুলো শুনতে না হয়। ক্লাসে ফেল করতাম। কেঁদে ককিয়ে উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভরতি হয়েই— এই যে, যা বললাম। রিহ্যাবে থেকেছি তিন দফায়। আট বছর তিন মাস হল ক্লিন। কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তি, লজিক্যাল রিজনিং, এগুলোর বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। কেরিয়ারের কথা তো— দেখতেই পাচ্ছেন।’

সাম্য খাটের একপাশে বসে, তার মুখ নামানো। তাকে দেখতে দেখতে ইম্যানুয়েলের মনে পড়ল, ক্লাস ফাইভে তাঁর সেন্ট পলস স্কুলে ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ পড়ানো হচ্ছিল। শাইলকের চরিত্র বর্ণনার সময়ে ক্লাস টিচার অনুব্রত নন্দী তাঁর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিলেন, তবে অতটা চক্ষুলজ্জার বালাই ক্লাসের অন্য বাচ্চাদের ছিল না। তারা ফিক ফিক করে হাসছিল নিজেদের ভেতর। মাথা নীচু করে কাঠের মতো বসে ছিলেন ইম্যানুয়েল। সেই থেকে স্কুলে ইম্যানুয়েলের নাম হয়ে যায় শাইলক। জীবনে ওই একবারই ইম্যানুয়েলের মনে হয়েছিল, মা-ই আসলে ঠিক, তাঁদের আসল দেশ ইজরায়েল। পরে আর কখনো মনে হয়নি। ম্যাগেন ডেভিডের স্টোররুমে তাঁর মায়ের পরিবারের মৃত পূর্বপুরুষদের সম্মানে ইরাকি লিপিকারের লেখা স্ক্রল এখনও রাখা আছে, চীন থেকে বানানো বাহারি বাক্সে। সেই মানুষদের মৃত্যুতিথির অনুষ্ঠানে স্কুল পাঠ করতেন পরিবারের সকলে মিলে। কয়েক বার মায়ের সঙ্গে সেরকম অনুষ্ঠানে গিয়ে ইম্যানুয়েলের মনে হয়েছে, তিনি কিছুই আইডেন্টিফাই করতে পারছেন না। না ভাষা, না শোক। ইজরায়েল, বাগদাদ, আলেপ্পো, বার্লিন, কোথাও নয়। এসপ্ল্যানেডে সন্ধের হোর্ডিং, স্কটিশ সেমেট্রি, ট্রামের ঝিমুনি, ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ব্র্যাগাঞ্জার গিটারের কালেকশন, চিৎপুর রোড মথিত করে নামাজের তরঙ্গ, এসব তাঁর জীবন। এই শহরটার তলপেটের নীচে বয়ে চলা অপরাধের স্রোতও তাঁরই। কিন্তু, সারাজীবনে ওই একবারই তাঁর মনে হয়েছিল ইজরায়েলের কথা।

‘আপনি এখন কী করেন?’

‘বলতে গেলে কিছুই না। লে-অফের পর দু-একটা ফ্রিল্যান্সিং। আমার এক বন্ধুর পৈতৃক কোম্পানিতে হিসেব-টিসেব দেখে দিই। মাঝে একটা টিউশনি পেয়েছিলাম, কিন্তু টাকা দিত না। কুড়িয়ে-বাড়িয়ে যা পাই, নিজেরই চলে না।’ সাম্য অমলিন হাসল, আর ইম্যানুয়েলের হঠাৎ ভালো লেগে গেল ছেলেটাকে। ‘ভাবুন একবার। আমার বাবা, মা, দাদু, দিদা এত জ্ঞানীগুণী, আর আমি কোথায়।’

‘কিন্তু, আপনার কি সেদিনের কথা কিছুই মনে নেই?’

‘সামান্যই। বাবার সঙ্গে ‘শোলে’ দেখছিলাম। ‘ইয়ে দোস্তি হাম নহি ছোড়েঙ্গে’ গানটা যখন হচ্ছিল, দু-জনে মিলে গাইছিলাম। তারপর আমি আঁকতে বসে গেলাম। বিকেল বেলা দেখি বাবা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই রাত্রেই আমায় রানাঘাটে এক দূরসম্পর্কের পিসির বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মনে হয়, দিন পনেরো ছিলাম। ওখানেই আস্তে আস্তে জানতে পারি, কী ঘটেছিল।’ সাম্য কিন্তু কিন্তু করে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না। আমি কি বাইরে বসতে পারি? বদ্ধঘরে জানালা বন্ধ থাকলে আমার সাফোকেটিং লাগে। বাবা মশা নিয়ে প্যারানয়েড, বিকেল হলেই জানালা বন্ধ করে দেবে। আমি তাই বাবার ঘরেও বেশিক্ষণ বসতে পারি না।’

ইম্যানুয়েল উঠে পড়লেন। ঘর খাঁ-খাঁ করছিল। ফ্যানের হাওয়ায় প্লাস্টিকগুলো নড়ছিল কিচকিচ। ঘটাং ঘট শব্দের পুরোনো পাখা। দরজার কাছে এসে ইম্যানুয়েল ফিরে তাকালেন। জাভেদ ইম্যানুয়েলকে দেখে চেয়ার থেকে উঠে এলেন। ইঙ্গিতে জানতে চাইলেন, কিছু সূত্র পাওয়া গেল কি না। মাথা নাড়লেন ইম্যানুয়েল। দু-জন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, ইম্যানুয়েল শেষবারের মতো ঘরের পুরোটা স্মৃতিতে ইমপ্রিন্ট করে নিচ্ছিলেন।

হঠাৎ জাভেদকে ইম্যানুয়েল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওটা কী?’

‘কোনটা?’

‘ওই যে।’ অঙ্গুলিনির্দেশে দেখা গেল, ঘরের ভেতর খাটের পাশে একখণ্ড কাগজ পড়ে। ‘কিছু লেখা আছে না?’

‘বুঝতে পারছি না। দাঁড়াও।’ ঘরে ঢুকে কাগজটা তুলে আনলেন জাভেদ। ঠোঁট ওলটালেন, ‘মুদিখানার ঢপের বিল। আদ্যিকালের।’ কাগজ হাতে নিয়ে ইম্যানুয়েল দেখলেন, মালিনীর হাতের লেখা

ঘরের আলো, পাখা বন্ধ করে দরজা ভেজাতে গিয়ে সাম্য বাধা পেল। ইম্যানুয়েল তার হাতে হাত রেখেছেন। চোখ সরু। ‘একটা জিনিস বলুন আমায়। আপনিও নিশ্চয় এখানে যখন থাকতেন এই ঘরেই শুতেন? মানে, আপনার মা যখন বেঁচে ছিলেন।’

‘হ্যাঁ, মায়ের সঙ্গে ঘুমোতাম।’

‘তাহলে বলুন তো, আপনারা মাথা করতেন কোন দিকে। দরজার দিকে, নাকি, খাটের যেখানে নকশা করা, মানে, জানালার দিকে?’

‘যেখানে নকশা করা। ওটাই তো মাথার দিক। কেন?’

জাভেদের দিকে ফিরলেন ইম্যানুয়েল। ‘বডি কোন পজিশনে ছিল? অনিরুদ্ধ কোনদিকে ছিলেন?’

‘মাথা, সাম্য যেমন বললেন, ছিল জানালার দিকে আর পা ছিল দরজার দিকে। খাটের ওপাশে, যেদিকে টয়লেট, অনিরুদ্ধ সেদিকে ছিলেন।’

‘উলটোটা নয়, ঠিক?’

‘একদমই নয়। স্পষ্ট মনে আছে আমার। ছবি চাইলে আর্কাইভে পাবে, কিন্তু এই ব্যাপারে আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।’

‘তাহলে একটা হিসেব মিলছে না।’ বিড়বিড় করলেন ইম্যানুয়েল।

‘কী হিসেব?’

‘পরে বলছি। একবার ছাদে যাই।’

ছাদের পাঁচিলে হরেক ডিজাইন, কিন্তু স্থানে-অস্থানে ভেঙে পড়েছে। পায়রাদের পরিত্যক্ত গোলাঘর। অকেজো অ্যান্টেনা। বাগানের গাছ ঝামরে পড়েছে ছাদে। আশপাশের বাড়ি দেখা যায় না। তবে, সামনের রাস্তার দিকে ফাঁকা। ইম্যানুয়েলের চোখে পড়ল, একটা লোক সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে। তখন সন্ধে ঘনিয়েছে। কাছেপিঠে উনুনে গুল চাপিয়েছে কেউ, তার ধোঁয়া বয়ে যাচ্ছে রাস্তা দিয়ে। সেই ধোঁয়ার অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, চার্লি চ্যাপলিনের বেশে একজন। তার বিষণ্ণ চোখ। গলায় প্ল্যাকার্ড ঝোলানো, তাতে লেখা, ‘Give me food’। এই লোকটাকে ইম্যানুয়েল চেনেন। ওর নাম ঘনশ্যাম। ঘনশ্যামের পেশা রাস্তায় রাস্তায় চ্যাপলিন সেজে ভিক্ষাবৃত্তি। কিন্তু, এই নির্জন গলিতে সে কোনো সাহায্য পাবে না। ঘনশ্যামের মুখ ছাদের দিকেই। ইম্যানুয়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলে পিছু ফিরলেন।

‘কার্নিশ কি বরাবরই এরকম ভাঙা?’

‘না। আগে ঠিকই ছিল। কিন্তু, বুঝতেই পারছেন, বাবা আর দিদার পেনশনের টাকায় কতদিন চলে! এত বড়ো বাড়ি মেইনটেইন করা তো মুখের কথা নয়। আমাদের দিন চলে গেছে, মিস্টার গুহ! এই পরিবারের যা কিছু উজ্জ্বল, সবই অতীতে।’

‘আপনার সঙ্গে ওঁদের সম্পর্ক কেমন?’

উদাসীন কাঁধ ঝাঁকাল সাম্য। ‘যেমন দেখলেন। আমি ফাইফরমাশ খাটি। বাড়ির কাজকর্ম করি। কিন্তু, আমরা নিজেদের মধ্যে সারাদিনে চার-পাঁচটা বাক্যের বেশি ব্যয় করি না। দিদা তো ওপরেই থাকে। বাবা আমায় হয়তো ভালোইবাসত। তবে, রিহ্যাব থেকে ফেরার পর উদাসীন হয়ে গেছে। সেটা স্বাভাবিক। ওদেরও তো বয়েস হচ্ছে। তবে হ্যাঁ, আমার ক্ষমতা থাকলে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম। কিন্তু, এই বাজারে সামান্য কমার্স গ্র্যাজুয়েটকে কে কাজ দেবে?’

ছাদের কিনারে গিয়ে নীচে ঝুঁকলেন জাভেদ। ইম্যানুয়েলকে ডেকে দেখালেন। এখান থেকে নেমে কার্নিশে ভর দিয়ে মালিনীর ঘরের জানালার নাগাল পাওয়া যায়। কিন্তু, ইম্যানুয়েল ঘাড় নাড়লেন। সেদিন জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং জানালায় বড়ো বড়ো শিক।

‘তাহলে? আমি ভাবলাম তুমি এই কারণে ছাদে এলে।’

‘নাহ্।

আমি দেখতে চাইছিলাম, ছাদ থেকে পাশের বাড়ির আওয়াজ শোনা যায় কি না।’

‘কেন?’

উত্তর না-দিয়ে সাম্যর দিকে তাকিয়ে ইম্যানুয়েল হাসলেন। ‘অনেক ধন্যবাদ। যা দেখার, দেখা হয়েছে। আবার যদি দরকার পড়ে, ফোন করে আসব।’

‘আপনাদের কি মনে হয়—’ সাম্য ইতস্তত করল।

‘যে এই কেসের অন্য কোনো দিক আছে কি না? এখনই তেমন ভাবনার কারণ ঘটেনি। কেন? হলে আপনার ভালো লাগবে?’

‘জানি না। আমি ওই ভদ্রলোককে দেখিনি কখনো। তিনি ভালো না বাজে, তাও জানি না। তবে, মায়ের ব্যাপারটায় যদি ক্লোজার না-আসে, আমার তো খারাপ লাগারই কথা।’

‘ক্লোজই ধরে নিন। অন্য সম্ভাবনা আপাতত দেখছি না। আর, সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়, আগেই বলেছি। তবে, কোনো নতুন তথ্য পেলে, আপনারা সবাই জানবেন।’ উত্তর দিলেন ইম্যানুয়েল।

দু-জনে বাড়ি থেকে বেরোলেন যখন, সন্ধে ঢলে পড়ছে। কোথাও থেকে ঘ্যাসঘ্যাসে রেডিয়োর আওয়াজ। পাশের বাড়িতে একটা মেয়ে নাচ শিখছে, তার ধপধপ শব্দ পাওয়া যায়। টিভি সিরিয়ালের চেনা গান ভেসে আসছে। এক বৃদ্ধ কণ্ঠ দূর থেকে হাঁক পাড়ল, ‘আর পারি না, ঠাকুর। তুলে নাও।’ ঘনশ্যামকে ইম্যানুয়েল আর দেখতে পেলেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *