৪
অমিয় বিশ্বাস অবসর নিলেও স্মৃতি প্রখর। সহজেই মালিনী অধিকারীর কেস মনে করতে পারলেন। তারপর অবাক হয়ে তাকালেন— জাভেদের মাথাটা কি গেছে? সলড ফাইল কেন রিওপেন করাতে চাইছেন? জাভেদ এবং ইম্যানুয়েল সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করলেন, ফাইল খোলানোর কোনো ইচ্ছে তাঁদের নেই। তাঁরা শুধুমাত্র এক মৃত মানুষের শেষ ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পুরো কেস রিকনস্ট্রাক্ট করছেন, যাতে সমাধান ওয়াটারটাইট হয়। বিশ্বাস কতটা সন্তুষ্ট হলেন বোঝা গেল না। নিজের মনে হুঁহ্ বললেন। মোবাইলে সময় দেখে জানালেন, সন্ধে সাতটা থেকে ন-টা, এই দু-ঘণ্টা ধরে তিনি দেড় পেগ স্কচ খান। তারপর ডিনার। চুয়াত্তর বছরের শরীরে এখনও রোগব্যাধি বিশেষ ধরেনি মাপা নিয়মের কারণে। অতিথিরা যোগ দেবেন নিশ্চয়?
‘আমি শুধু কালো কফি। চিনি ছাড়া।’ অমায়িক গলায় বললেন ইম্যানুয়েল।
‘আমার চলতে পারে। আপনার মনে থাকবে, ইজি বরাবর টিটোটালার ছিল।’
‘কিন্তু, আপনাকে আমি সিসিলে দেখেছি অনেকবার।
‘কলিগ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গেছি অনেক। কলকাতার এমন কোনো বার নেই যেখানে আমি যাইনি। গিয়ে কফি বা ফ্রেশ লাইম সোডা নিয়ে বসে থেকেছি।’ বিশ্বাসের অনুমতি নিয়ে সিগারেট ধরালেন ইম্যানুয়েল।
পানীয় গুছিয়ে দু-জনের মুখোমুখি বসলেন বিশ্বাস। ‘অনিরুদ্ধ সান্যাল তাহলে ইহজগতে নেই! কী আর বলব! অত সুপুরুষ — গায়ের রং দেখেছেন? ফেটে পড়ছে। লালচে চুল। পেটানো চেহারা। আমাদের ছোটোবেলায় স্কুল পালিয়ে গ্লোবে নিয়ম করে হলিউডের সিনেমা দেখতে যেতাম। বার্ট ল্যাংকাস্টারকে মনে আছে? অনিরুদ্ধকে ওরকম দেখতে ছিল।’
‘পারমিতা আর মালিনী বাদে অন্য কোনো মহিলাঘটিত ব্যাপারে কি জড়িয়েছিলেন?’ ইম্যানুয়েল প্রশ্ন করলেন। কিন্তু, সান্যাল মাথা নাড়লেন, অত কিছু মনে রাখা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, এই কেসের প্রেরোগেটিভের মধ্যে সেসব পড়েও না।
‘আপনার কী মনে হয়? অনিরুদ্ধই খুনটা করেছিলেন?’
বিশ্বাস হাসলেন, ‘গল্প, উপন্যাসের ডিটেকটিভ সাজতে চাইছেন নাকি? লাভ হবে না। জাভেদবাবু জানেন, এমন ওয়াটারটাইট কেস কমই আসে। অনিরুদ্ধর উকিল ছিল সুদেব চন্দ। ভালো ছেলে। বেলগাছিয়াতে বাড়ি ছিল। অকালে মরল, হেপাটাইটিস বি। তো, সুদেবের মুখের অবস্থা আমার স্পষ্ট মনে আছে। ভাবটা হল, কত তাড়াতাড়ি কোর্টরুম থেকে বেরোবে। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি- ও তো মনে হয় গিলটি প্লিড করতে চাইছিল। সান্যাল রাজি হয়নি।’
‘এটা অদ্ভুত লাগেনি আপনার? অনিরুদ্ধ তাঁর বয়ানে বলেছিলেন যে, খুন করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব নাও হতে পারত, কারণ তাঁর মনে নেই কী ঘটেছিল। সেক্ষেত্রে তিনি গিলটি প্লিড করলেন না কেন?’
বিশ্বাস ঠোঁট ওলটালেন, ‘কত কী ঘটে মানুষের মনে! হয়তো ভেবেছিল সুদেব ছাড়িয়ে আনবে। কেউ পারে ছাড়াতে? বন্ধঘরের ভেতর দু-জনে বসে আছে—’ জাভেদের দিকে ফিরলেন বিশ্বাস, ‘স্ক্যান্ডালাস কেস কিন্তু, মশায়! ভিকটিম আর মার্ডারার, দু-জনেই কমপ্লিট নেকেড। সারাগায়ে অত আঁচড়- কামড়। আজকের দিন হলে ডিজিটাল মিডিয়া ফেটে পড়ত।’
‘আমরা মিডিয়াকে এসব তথ্য দিইনি। অনিরুদ্ধ সান্যালের কোম্পানির এম.ডি. পুলিশমন্ত্রীকে দিয়ে লালবাজারে অনুরোধ করিয়েছিলেন, তাঁদের সংস্থার সুনামের কথা ভেবে যদি ওই পার্টগুলো বাদ দেওয়া যায় প্রেসের সামনে। এমনকী কে কত নেশা করেছিলেন, সেসবও জানাইনি। ওই কারণে তখন অত হইচই হয়নি।’ বললেন জাভেদ।
‘মার্ডার ওয়েপন নিয়ে একটা বক্তব্য কাগজে বেরিয়েছিল, মনে আছে। সান্যালের বয়ান অনুসারে, সেটা নাকি রাখা হয়েছিল, ওই কী বলে যেন—’
‘বিডিএসএম।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওসবের জন্য। বাবা, নামই শুনিনি এর আগে! বড়োলোকদের ব্যাপার-স্যাপার। মার্ডার ওয়েপনে ওই কারণে সান্যাল এবং ভিকটিম দু-জনেরই হাতের ছাপ মিলেছিল। ডিফেন্সের ওটা একটা পয়েন্ট ছিল। ধোপে টেকেনি।’
‘আঁচড়-কামড়ের ব্যাপারটা কী?’ ইম্যানুয়েল আগ্রহী হলেন।
‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা যাকে ‘লাভ বাইটস’ বলে। ওটাও সুদেবের পয়েন্ট ছিল। সান্যালের বুকে, পেটে অসংখ্য টাটকা চিহ্ন। মালিনীরও তাই। তার মানে, দু-জনের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতিক্রমে যৌনতা হয়েছিল। সুদেব যেটা এস্টাবলিশ করতে চাইছিল তা হল যে, দু-জনে পরস্পরের সম্মতিতে মিলিত হয়েছে একাধিকবার। তার মানে, মালিনীর ওপর কোনো বলপূর্বক অত্যাচার বা ধর্ষণ হয়নি। এই সেট-আপে স্ট্যাবিং বিশ্বাসযোগ্য নয়। মালিনী আত্মহত্যা করেছে, এটা ছিল সুদেবের বক্তব্য। বালির বাঁধের মতো ডিফেন্স, বুঝতেই পারছেন। ডাক্তারি রিপোর্ট স্পষ্টই আত্মহত্যার তত্ত্ব খারিজ তো করেইছিল, জজসাহেবও হেসে ফেলেছিলেন সুদেবের আর্গুমেন্ট শুনে, এখনও মনে আছে।’ গ্লাসে চুমুক দিয়ে ইম্যানুয়েলকে বিশ্বাস বললেন, ‘একটা সিগারেট দিন তো। ডাক্তারের বারণ যদিও, তবে মাঝেমধ্যে এক-আধটা খেলে কিছু হয় না।
সিগারেট দিয়ে ইম্যানুয়েল প্রশ্ন করলেন, ‘অনিরুদ্ধর অপরাধ সম্পর্কে আপনি তাহলে নিঃসংশয় ছিলেন?’
‘দেখুন, টিপিক্যাল অপরাধী তো নয় যে, আটঘাট বেঁধে খুন করতে নামবে। রাগের মাথায় করে ফেলেছে। কিছুদিন ধরে দু-জনের মধ্যে ঝগড়া চলছিল। এসব পরকীয়া কেসে আমি যা দেখেছি, হয়তো গ্রস জেনারালাইজেশন, তবে মেয়েটা সব কিছু ছেড়ে বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত থাকে আর ছেলেটা নিজের দিকের সমস্ত কিছু বাঁচিয়ে তবে প্রেম করতে চায়। হয়তো সব ক্ষেত্রে নয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। অনিরুদ্ধ কলকাতার অ্যাড জগতে বিগ শট ছিল। কেরিয়ার, পরিবার, সব কিছু স্টেকে ছিল তার। মালিনীকে খুনের হুমকি দিয়েছিল, সেটা এমনি এমনি নয়।’
‘সেই স্টেক কি মালিনীর ছিল না?’
‘কীসের স্টেক! তার বিয়ে তো ততদিনে ভেঙেই গেছে। তার ক্ষেত্রে অন্তত নিজের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসার ভয় নতুন করে ছিল না। আপনার অ্যাঙ্গলটা বুঝতে পারছি। কিন্তু, পুলিশ অন্য কাউকে কেন সন্দেহ করবে? অন্য কেউ
করে থাকলে সে বন্ধঘর থেকে বাইরে বেরোল কীভাবে? ছিটকিনি তুলে বাঁকানো ছিল।’ বিশ্বাস কথাগুলো জাভেদের দিকে তাকিয়ে বললেন। হতাশ ভঙ্গিতে দু-হাত তুললেন জাভেদ। এই জায়গাটায় এসে সবাই আটকে যাবেই। বিশ্বাস আবার ইম্যানুয়েলের দিকে ফিরলেন, ‘কিন্তু আপনার হল কী, মশায়? শুনেছিলাম তো আমাদের জগৎকে টাটা, বাইবাই করেছিলেন। আবার এতদিন পরে —।’
হাসলেন ইম্যানুয়েল, ‘এখনও যে এই কেস নিয়ে নাড়াঘাঁটা করবই, এমন নিশ্চয়তা নেই। জাভেদের কথায় একবার দেখা করতে এসেছি বলতে পারেন। আমরা অনেকদিনের জুটি ছিলাম।’
‘মনে আছে। আপনারাই তো বউবাজারের জোড়া মার্ডার সল্ভ করেছিলেন। তারপর বড়ুয়া ফ্যামিলির বধূহত্যা–কিন্তু, আপনি দুম করে রিটায়ার করলেন কেন? আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম।’
ইম্যানুয়েল স্মিতমুখে নীরব থাকলেন। তাড়াতাড়ি উত্তর দিলেন জাভেদ, ‘আরে ইজি-র ইন্টারেস্ট চলে গিয়েছিল। আমারও মাইরি শেষের দিকে আর টানতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু পাপী পেট, বোঝেনই তো।’
‘তা বটে। যাকগে, যা বলছিলাম। বন্ধঘরের ভেতর দু-জনকে পাওয়া গেলে অন্য মার্ডারের কথা কেনই-বা কেউ ভাববে?’
‘বন্ধঘরের প্রসঙ্গ নিয়ে আমি ভাবিনি।’ বললেন ইম্যানুয়েল। ‘অন্তত, এখনই না। আমি আপনাকে যেটা প্রশ্ন করতে চাই, ধরুন বন্ধঘর নয়, খোলাঘর। সেখানে খুনটা হয়েছে। সেক্ষেত্রে কাদের ওপর সন্দেহ পড়তে পারে?’
‘এই প্রশ্ন আমাকে কেন? জাভেদবাবুই তো আছেন উত্তর দেবার জন্য। কী, আপনি বলবেন নাকি কিছু?’
গ্লাস নামিয়ে গলা খাঁকড়ালেন জাভেদ। ‘সম্ভাব্য প্লেয়ার ছিল চারজন। অনিরুদ্ধ নিজে। শতদ্রু দত্ত। দেবারতি অধিকারী। পারমিতা সান্যাল।’
‘কিন্তু, পারমিতা তো জানতেন না। অনিরুদ্ধ এত কিছু করলেন তাঁর ফ্যামিলির গায়ে যেন আঁচ না-পড়ে, সেজন্যেই। তাই না? সেটাই পুলিশের দাবি ছিল।’
‘জানতেন কি না, আমার এখন মনে পড়ছে না। তবে, তর্কের খাতিরে ধরে নিতে হবে যে, খুনের মোটিভ তাঁর ছিল। যদি তিনি জানতেন।’ বললেন বিশ্বাস।
‘অনিরুদ্ধ সান্যালের সঙ্গে কথা বলে আমার তখন মনে হয়েছিল, অনিরুদ্ধ হয়তো একটা সময় অবধি বিয়ে থেকে বেরোনোটা নিজের অপশনে রেখেছিলেন। পরে সেখান থেকে ঘুরে মালিনীর বিরুদ্ধে অল আউটে যান।’ অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন জাভেদ। ‘যদি সত্যিই অল আউটে গিয়ে থাকেন। আমি সিরিয়াসলি জানি না। আমি তখনও নিঃসংশয় ছিলাম না। আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলছিল, অনিরুদ্ধ হত্যাকারী নন। খুব জঘন্য রিজনিং, না?’
‘কিন্তু, পারমিতা যদি সত্যিই আগে থেকে জেনে থাকেন, তাহলে খুনের মোটিভ দুর্বল হয়ে যায় না কি? মালিনী অনিরুদ্ধকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, পারমিতাকে তিনি জানিয়ে দেবেন। এখন দেখা যাচ্ছে, পারমিতা আগেই সব জেনে বসে আছেন। তাহলে নতুন করে কোন ড্যামেজ বাঁচাবার জন্য অনিরুদ্ধ খুনটা করলেন?’
সময় নিয়ে অমিয় বিশ্বাস স্কচের গ্লাসে চুমুক দিলেন। গলায় ঢেলে কিছুটা সময় চোখ বুজে স্থির হয়ে থাকলেন। তারপর তাঁর অপেক্ষাকৃত ছোটো বাঁ-চোখ খুলে গেল। একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এত সব পুরোনো স্মৃতি বেরিয়ে আসছে! পারমিতা সান্যাল আগে থেকে জানতেন কি না, সে-তথ্য পুলিশ ফাইলে থাকার কথা। কিন্তু হ্যাঁ, তিনি না-জানলেও অন্য কারণে অনিরুদ্ধর ভয় থাকতেই পারে। কে বলতে পারে, মালিনী বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাসের মামলা করতেন না? বা, অনিরুদ্ধর অফিসে জানাতেন না? অথবা, পারমিতা জানলে তিনি অনিরুদ্ধর অফিসে জানাতে পারতেন। নব্বইয়ের দশকের কর্পোরেট কালচার এখনকার মতো ছিল না। তাদের কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবনে কোনো অসংগতির অভিযোগ এলে সামাজিক সম্মানের স্বার্থে অনেক কোম্পানিই স্টেপ নিত। তার ওপর অনিরুদ্ধর বড়োমেয়ের বয়েস তখন বারো। সব কিছু বোঝার পক্ষে যথেষ্ট বয়েস। মেয়েদের সামনে বাবার এরকম ইমেজ হোক সেটা কেউই চাইবে না।’
‘এটাই আমাদেরও লজিক ছিল। কিন্তু, তখন মোটিভ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এটা সত্যি, কারণ ওই পরিস্থিতিতে অনিরুদ্ধকে পাওয়া গেলে তিনি বাদে আর কে হত্যাকারী হবেন?’ জাভেদ বললেন।
‘তবে, আপনি আরেকজনকে ভুলে যাচ্ছেন।’ মুচকি হাসলেন বিশ্বাস। ‘আমার মেমারি কিন্তু এই বয়েসেও বেশ ইয়ে… অনুপ রুংতাকে ভুলে গেলেন?’
‘ঠিক। খেয়ালই ছিল না, মাইরি। আমার কাছে যা ফাইলপত্র আছে, সেখান থেকে রুংতার বয়ান কেন জানি না বাদ পড়ে গিয়েছে।’
‘রুংতা কে?’ ইম্যানুয়েল জানতে চাইলেন।
‘মালিনীর অফিসে কাজ করত। প্রেমে পড়েছিল ওর। মালিনী যদিও পাত্তা দেয়নি। আজকের ভাষায় যাকে বলে স্টকার, রুংতা ছিল তাই। মালিনীকে অনেকবার প্রস্তাব দিয়েছিল দু-জনে কোথাও ঘুরে আসার। প্রত্যাখ্যাত হবার পর মালিনীর পিছু ধাওয়া করে ওর বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়েছিল। কয়েক বার ল্যান্ডলাইনে ফোন করেছে, মালিনী ফোন ধরার পর রেখে দিয়েছে। জানত না, মালিনীর বাড়ির ফোনে সিএলআই বসানো ছিল। নাম্বার ট্রেস করে মালিনী অফিসে জানায়। ম্যানেজার ডেকে কড়া ধমক দেন রুংতাকে। তার কিছুদিনের মধ্যে রুংতা চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যাবসা শুরু করে। মালিনীর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করেছিল। ওর বয়ান অনুসারে, মালিনী ঠান্ডা ব্যবহার করেছিল তখনও, যদিও অভদ্রতা করেনি। এরকম প্রোফাইলের কেউ সন্দেহভাজন হবেই। কিন্তু আবারও, মোডাস অপারেন্ডি কী ছিল?’
অমিয় বিশ্বাসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ইম্যানুয়েল অন্যমনস্কভাবে রাস্তা দেখছিলেন। অটোদের লাইন এড়িয়ে ফুটপাথে উঠে জাভেদ বললেন, ‘এরপর?’
‘কত কিছু পালটে গেছে! এই এলাকায় বহু বছর পর এলাম।’
‘তুমি কি এই কেস নিয়ে আগ্রহী?’
‘পাত্রপাত্রীদের কেউ কেউ মৃত, কেউ হয়তো ভুলে গেছে অনেক কিছু। আমি নিজেও রিটায়ার্ড হার্ট, আগেই বলেছি। আমার বয়েস বেড়েছে।’ ল্যাম্পপোস্টের আলো ইম্যানুয়েলের চশমার মোটা কাচে ঠিকরে এসে চিকচিক করছিল। ‘তুমি নিজে পারতে না?’
‘আরে ভাই, আমি পারলে তখনই পেরে যেতাম। কিন্তু, আমি তোমায় জোর করব না। প্রত্যেকটা কেসের মেরিট আলাদা। শুধুমাত্র আমার খাতিরে তোমাকে তদন্ত করতে হবে না। নিজের যদি মনে হয়, তাহলেই এগোও।
‘আমায় একটা কথা বলো। এখন যদি আমরা এই কেসের পাত্রপাত্রীদের কাছে যাই, কী বলে যাব? তারা আমাদের এন্টারটেইন করবে কেন? আমরা তো আর ডিপার্টমেন্টের কেউ না। এত বছর পর নতুন করে অপ্রিয় স্মৃতিকে খুঁচিয়ে বার করতে অনেকেই চাইবে না।’
‘সেটা আমিও ভেবেছি। এক্ষেত্রে সত্যিটাই বলে দেওয়া ভালো। আমরা অনিরুদ্ধ সান্যালের শেষ ইচ্ছেকে সম্মান দিয়ে রিকনস্ট্রাক্ট করতে চাই। তাতে যদি কেউ রাজি না হয়, ওয়েল, ভাড়মে যায়ে।’ জাভেদ কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘তিনি কথা বলবেন না। আমি বড়োজোর অনুরোধই করতে পারি। পুরোনো কনট্যাক্টস কাজে লাগানো যায়, হয়তো এ.সি.পি.-র থেকে একটা নোট জোগাড় করে নিলাম, যাতে লোকাল থানাকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে। কিন্তু, বড়ো দরকার না-পড়লে সেদিকে যেতে চাইছি না, তাতে বেকার জলঘোলা হবে। অন্যভাবে চেষ্টা করব সাক্ষীদের দিয়ে কথা বলানোর। কিন্তু, তার আগে আমায় তো নিশ্চিত হতে হবে যে, এই কেস তুমি নিচ্ছ।’
‘আমার খটকা লাগছে, মূলত একটা বিষয়ে, যা আমায় টানছে।’
‘চিঠি?’
‘না। ডাইং স্টেটমেন্ট হিসেবে ধরলেও তার গুরুত্ব নেই। অনেক কারণেই অনিরুদ্ধ লিখতে পারেন ওকথা। হয়তো সত্যিই তাঁর মনে নেই যে, তিনি খুন করেছেন। অথবা, মৃত্যুর আগে একবার শেষ চেষ্টা হিসেবে সবটা আরেকবার ঘেঁটে দিতে চেয়েছিলেন। হতেই পারে। কাজেই, এই চিঠিকে আমি গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমাকে ভাবাচ্ছে অন্য একটা জিনিস। বাড়ির মেইন দরজা কেন খোলা থাকবে?’
‘এটা আবার কোথায় জানা গেল?’
‘মৃতদেহ আবিষ্কার করেছেন বাড়ির ঠিকেমাসি। তিনি সোয়েটার আনতে বিকেল বেলা বাড়ির ভেতর ঢোকেন। কীভাবে ঢুকলেন? বাড়িতে অন্য কেউ নেই। মালিনী আর অনিরুদ্ধ দোতলার ঘরে। তাহলে, হয় দরজা খোলা থাকবে আর নয়তো সেই মাসির কাছে বাড়ির চাবি থাকবে। এই দ্বিতীয় সম্ভাবনা একদমই বিশ্বাসযোগ্য নয়, কারণ অস্থায়ী কাজের মাসির কাছে সাধারণত কেউ বাড়ির চাবি দিয়ে তখনই যাবে যখন সে নিজে বাড়ি থাকবে না। কিন্তু, এখানে মালিনী নিজে দোতলায় ব্যক্তিগত মুহূর্ত কাটাচ্ছেন। তিনি চাইবেন না হুট করে সেইসময়ে বাড়িতে অন্য কেউ ঢুকে পড়ুক। তাই, বাড়ির দরজা খোলা ছিল ধরে নিতে হবে।
মাথা নাড়লেন জাভেদ, ‘এবার মনে পড়েছে। পুলিশ প্রশ্ন করেছিল। সেই মাসি, নির্মলা ঢালি, তিনি বলেছিলেন যে, মেইন দরজা খোলা ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, বাড়িতে কেউ এসেছে। কিন্তু তারপর, মেইন দরজা কেন খোলা ছিল সে-বিষয়ে আমরা আর কাকেই বা জিজ্ঞাসাবাদ করব! খুললে মালিনীই খুলে রাখবেন। তিনি তখন মৃত।’
‘খুলে রাখলে, কেন খুলে রেখেছিলেন? কারোর আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন কি? কিন্তু, অপেক্ষা করলে নিজের ঘরে নগ্ন হয়ে ঘুমোবেন না। দেখো, দোতলার ঘরের দরজা বন্ধ করে যদি দু-জন মানুষ অন্তরঙ্গ সময় কাটায়, তাহলে তারা এত কেয়ারলেস হবে না যে, বাড়িতে ঢোকার দরজা খুলে রাখবে। বাড়ির নিরাপত্তা একটা বিষয় তো বটেই, এ ছাড়া যে কেউ ওপরে উঠে এসে তাদের ঘরের দরজা ধাক্কাতে পারে। বরং, মেইন দরজা বন্ধ করে ঘরের দরজা খোলা রাখলে সেটার তবু অর্থ হয়। কিন্তু, এখানে হয়েছে উলটো। মালিনী আর অনিরুদ্ধ যদি ঘরের দরজা নিয়ে এত সতর্ক হন, বাড়ির মেইন দরজা নিয়ে কেন হলেন না?’
‘আমি জানি না। সিরিয়াসলি, অত মাথা ঘামাইনি তখন। তোমার কী মনে হয়?’
‘জানি না। কিন্তু, আমাকে এটাই ভাবাচ্ছে। এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেলে আমি বাকি অনুসন্ধান থামিয়ে দেব। কিন্তু, যতক্ষণ না পাচ্ছি, আমায় কিছুটা খোঁজ চালিয়ে যেতে হবে।
জাভেদের মুখ উজ্জ্বল হল। মৃদুস্বরে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘মালিনীর ছেলে এবং স্বামী, তাঁদের সম্পর্কে কিছু জানা গেছে? প্রথমে এদের সঙ্গে কথা বলতে চাই।’
‘বেঁচে আছে কি না, থাকলে কলকাতায় থাকে কি না, জানি না। কিন্তু, হুলিয়া পাতা বার করে নেব। দু-দিন সময় দাও।’
উবারে উঠে সিগারেট ধরিয়ে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘আমি ক্লান্ত। সুগারটা বেড়েছে মনে হচ্ছে। একটু চোখ বুজলাম। খিদিরপুর এলে জাগিয়ে দিয়ো।’
‘তোমার শরীর কেমন যাচ্ছে, ইজি?’
‘ফার্স্ট ক্লাস। আমায় দেখে অসুস্থ লাগছে কি?’
‘তোমার মনে নেই, বহু বছর আগে ডিপার্টমেন্টে যখন আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, তোমার চোখ ছিল হলুদ। সেটা ১৯৮৯। তুমি সবে জন্ডিস থেকে উঠেছ। আমি ডিউটি শেষে মদ খেতে বেরোচ্ছিলাম, বাস্টার্ড তুমিও সঙ্গে এলে। আমি আঁতকে উঠে বলেছিলাম, এই শরীরে মদ খাবেন না। উত্তর না-দিয়ে হেসে ফেলেছিলে। তখন জানতাম না, সিসিলে তোমার জন্য কালো কফির বন্দোবস্ত সবসময় রাখা থাকে।’
‘মনে ছিল না।’ হাসলেন ইম্যানুয়েল। ‘এখন মনে পড়ল। তার কয়েক দিন পর তোমার বিয়ে ছিল। আমরা সবাই মিলে বর্ধমান গেলাম। রাবেয়ার কি আমাকে মনে আছে? বহু বছর হয়ে গেল, তোমার বাড়ি যাইনি।’
‘অনেকগুলো বছর কেটে গেছে,ইজি। ব্লাডি পৃথিবী বুড়ো হয়ে গেছে, বুঝলে?’
