১৬
সুচন্দ্রা মাইতি থাকেন এন্টালি। মালিনীর সঙ্গে আলিপুর মাল্টিপারপাস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তারপর ব্রেবোর্নে ইতিহাস। মালিনীর শেষদিন পর্যন্ত দু- জনের বন্ধুত্ব অটুট ছিল। সুচন্দ্রা একটা বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে ইতিহাসের শিক্ষিকা হিসেবে দু-বছর আগে রিটায়ার করেছেন। রোগা, লম্বা, সামনের একটা দাঁত উঁচু। বিয়ে করেননি। বর্ডারলাইন অটিস্টিক ভাইকে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে থাকেন। পুরোনো দিনের মলিন ছোপধরা দেওয়াল। প্যাসেজ অন্ধকার। ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে দেওয়ালে পানের পিক আর একপাশে জমানো আবর্জনা থেকে পচা ডিমের গন্ধ নাকে ধাক্কা মারে। ফ্ল্যাটের ভেতর দিনের বেলা আলো জ্বালাতে হয়। সারাবাড়ি জুড়ে বিভিন্ন ঠাকুর তার ছবি— সিরডি সাঁইবাবা থেকে জগন্নাথদেব। ধূপ জ্বালানো দুটো ঘরেই। সংকীর্ণ ড্রয়িং রুমের সোফায় বসলে ক্যাচ আর্তনাদ ওঠে। মাথার ওপর ভেঙে পড়ছে আলনায় স্তূপাকৃতি জামাকাপড়। ভেতরের ঘর থেকে একটার পর একটা পুরোনো দিনের হিন্দি গান ভেসে আসছে। পিয়াসা, কানুন, বরসাত কি রাত। ডাইনিং টেবিলের ধারে একটা চেয়ারে বসে সুচন্দ্রা স্মৃতিচারণ করছিলেন।
‘ছ-বছর বয়েস থেকে দু-জনের বন্ধুত্ব। আমার বাড়ি ছিল চেতলা। স্কুল থেকে ও আমার বাড়ি চলে আসত যেহেতু আগে পড়ত। আমরা আদিগঙ্গার ধার ঘেঁষে কত হেঁটেছি! তখন না এরকম ছিল না, জানেন! এত নোংরা আবর্জনাও না। হাঁটার কী সুন্দর রাস্তা ছিল! পাশ দিয়ে ফুলের কেয়ারি। ব্রিজটা তখনও হয়নি। আমি আর ও ব্যাডমিন্টন খেলতাম বিকেল বেলা। অনেক রাত ও আমার বাড়িতেই থেকে গেছে। কাকু, কাকিমা আমায় ভালোবাসতেন খুব। আমায় বড়োমেয়ে বলতেন। আমি ওর থেকে তিনমাসের বড়ো ছিলাম তো! আচ্ছা, কাকিমার শরীর এখন কেমন? বহু বছর যোগাযোগ নেই।’ জাভেদের মুখে সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, ‘কতগুলো জীবন নষ্ট হয়ে গেল। আমি ওকে কত বারণ করেছিলাম! কিন্তু, ছোটোবেলা থেকেই মালিনী ভয়ানক জেদি। একবার কিছু ঠিক করলে পিছু হটত না। জানেন, সেবার আমাদের ক্লাস টেস্ট, কিন্তু ওর খুব জ্বর। আমরা ওকে বোঝালাম, স্কুলের দিদিরা কিছু মনে করবেন না। ওর জন্য আলাদা টেস্টের ব্যবস্থা করে দেবেন। তার মধ্যে আমাদের একজন দিদিমণি কাকিমারই ছাত্রী ছিলেন। আরেকজনের হাজব্যান্ড ছিলেন কাকুর পেশেন্ট। কাকিমাও বোঝালেন। কিন্তু, মালিনীর গোঁ চেপে গেল, ও নিজের জন্য স্পেশাল সুবিধে নেবে না। আমাদের সঙ্গেই দেবে। কারোর কথা শুনল না। সারারাত মাথায় জলপটি নিয়ে সকালে বাড়ির গাড়িতে স্কুল চলে এল। কিন্তু, ওই শরীরে কি পরীক্ষা হয়? কিছুই লিখতে পারল না, পাশমার্কটাও মনে হয় ওঠেনি। তারপর বাড়ি ফিরে ধুমজ্বর, ১০৪ উঠে গিয়েছিল। সাতদিন পরে বিছানা ছাড়ে। এই হল মালিনী। ও কি আমার কথা শুনত?’
ঘর থেকে অ্যালবাম এনে ছবি দেখালেন সুচন্দ্রা। ‘স্কুলের অ্যানুয়াল প্রোগ্রাম। মালিনী শ্যামা হয়েছিল, আমি উত্তীয়। এটা ড্রেসিং রুমে, আমায় মালিনী সাজাচ্ছে, পাশে ক্লাসটিচার জয়তীদি। তখন আমরা ক্লাস ইলেভেন। আর এটা, মুর্শিদাবাদে স্কুল এক্সকারশনে গিয়ে, ক্লাস নাইনে। ওই যে, ব্যাডমিন্টন কোর্টের ডান দিকে র্যাকেট তুলে দাঁড়িয়ে। তখন আরও রোগা ছিল, না? এই দেখুন, কোয়েম্বাটোরে ঘুরতে গেছি আমি, মালিনী আর পাপান। ওর হাতে দইবড়ার ডিশ। আর এই ছবিটা, ওর অফিসের ফাংশনে আমায় নিয়ে গেছিল। মারাঠি কায়দায় কেমন কাছা দিয়ে শাড়ি পরেছে দেখেছেন? খুব স্টাইলিশ ছিল ছোটোবেলা থেকেই। অনিরুদ্ধদার সঙ্গেও ছবি ছিল আমাদের দু-জনের।’ কয়েক মুহূর্ত থেমে যোগ করলেন, ‘ও চলে যাবার পর সেই ছবিটা ফেলে দিয়েছি।’
পরের পর ছবিতে উচ্ছল মালিনী। চোখ দুটো ঝকঝকে। হাসলে গালে টোল পড়ে, মনে হয় গোটা ছবি হাসছে। এই প্রথম ইম্যানুয়েল মালিনীর এতগুলো ছবি দেখছেন। একটা সমস্যা, সেটা তাত্ত্বিক হতে পারে, অথবা, ডিটেকটিভ কাহিনির সঙ্গে সংযুক্ত টেকনিক্যাল সমস্যা— ইম্যানুয়েলের কাছে মালিনীর অস্তিত্ব সেই তাত্ত্বিকতার বাইরে কিছু ছিল না। আজ এতগুলো ছবিতে জীবন্ত রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে মালিনী যেন উঠে এলেন, যাকে এতদিন নানাজনের কাছে ব্যক্তিগত গল্প শুনেও ধরা যেত না। মেয়ে, স্ত্রী, প্রেমিকা, মা— এগুলোর বাইরে আরেক মালিনী, একজন মানুষ। একজন বন্ধু।
সুচন্দ্রা শতদ্রুকে চিনতেন। ‘ভালো ছাত্র ছিল। শান্ত, ভদ্র মধ্যবিত্ত। মালিনীর ঠিক উলটো। মালিনী তো যাদবপুরে গিয়ে হইহই করছে সারাক্ষণ। আজ অ্যানুয়াল ফেস্ট, কাল ইউনিয়ন, পরশু বন্ধুদের সঙ্গে চাইবাসা ঘুরতে চলে গেল। মদ, গাঁজাও ওখান থেকে। আমি তখন যোগমায়াতে পড়ছি। ওকে এসব করতে বারণ করতাম। হাসত ও। আমায় জড়িয়ে ধরে বলত ‘ইতু একটা ভীতু’। আমার ডাকনাম ইতু। শতদ্রুদাও পছন্দ করত না। দেখেছেন তো আপনারা। সিগারেট অবধি ছোঁয়নি কোনোদিন মানুষটা। পড়ার বই মুখে পড়ে থাকত, নয়তো ল্যাবে। কী করে যে ওদের প্রেম হল, জানি না। আমার মনে হয় কাকিমাই অনুঘটকের কাজ করে থাকবেন। তবে, একদিক থেকে ভালো, মালিনীর ওরকম ছেলেই দরকার ছিল, যে একটা সুস্থিতি দিতে পারবে। আচ্ছা, পাপান কেমন আছে? বিয়ে-থা করেছে কি? আমি শেষ অবধি যা শুনেছিলাম, ওর মনে হয় কিছু ড্রাগঘটিত সমস্যা হয়েছিল। সে-ও আজ থেকে বারো-তেরো বছর আগে, আমাদের এক কমন বন্ধুর থেকে। ওকে কত যে কোলে নিয়েছি! পাশে নিয়ে ঘুমিয়েছি! ওকে বলতাম, গোপাল ঠাকুর। যখন হামা দিত, গোপালের মতো লাগত তো! শরিকি বাড়ি বিক্রি হবার পর আমার ভাগে একটা ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম। মা আর ভাইকে তখন কয়েক বছরের জন্য আমার দিদি নিয়ে গিয়ে বম্বেতে রেখেছিল চিকিৎসার জন্য। আমি ফ্ল্যাটে একা। মালিনী মাঝে মাঝেই পাপানকে নিয়ে চলে আসত। শতদ্রুদার সঙ্গে যখন অশান্তি বাড়ল, সপ্তাহে এক-দুইদিন তো ওর বাঁধা ছিল এখানে। পাপান একটু বড়ো হলে ওকে কাকিমার কাছে রেখে অফিসফেরত চলে আসত। তখন যে কী মনমরা থাকত সারাদিন— ওই প্রাণবন্ত মেয়ে যেন শুকিয়ে গেছে। নিজের মনে কাঁদত। বলত, এর থেকে প্রোমোশন নিয়ে বন্ধে চলে গেলেই পারত, কারণ এখন তো না- থাকল প্রোমোশন, না-থাকল সংসার। শতদ্রুদারও জেদ কম ছিল না। আমি একবার ওর সঙ্গে কথা বলতে ওর কলেজে গিয়েছিলাম। ভদ্রতাই করল, কিন্তু ঠান্ডা ব্যবহার। ভাবটা এমন, বাড়ির সমস্যা নিয়ে বাইরের লোকের কাছে মুখ খুলবে না। আমায় কথায় কথায় বলেছিল, ‘যার যার সম্মান তার তার কাছে। আমার মোটেও ভালো লাগেনি কথাটা। সম্মান শুধু ওর একার? মালিনীর ছিল না? যাকগে বাদ দিন, অনেকদিন হয়ে গেল। আমাদের সবার বয়েস বেড়েছে। শতদ্রুদার নাম্বারটা দেবেন? একবার কথা বলতাম। কাকিমার সঙ্গেও।’
‘অনিরুদ্ধ সান্যালের সঙ্গে প্রেমটার পর মালিনী আবার তাহলে ট্র্যাকে ফিরে আসেন?’ ইম্যানুয়েল হাসলেন। ‘পুলিশ রিপোর্টে সেটাই বলছে।’
‘অন্তত কিছুদিনের জন্যে তো বটেই। অনিরুদ্ধদা ওর কাছে একটা খোলা জানালা ছিল যেখানে ও প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারে। মালিনী স্লিভলেস ব্লাউজ পরলে শতদ্রুদা অশান্তি করত। চাইত যেন চুল বড়ো করে, কপালে বড়ো লাল টিপ পরে। মা-মা একটা ব্যাপার যেন থাকে। চুড়িদার পছন্দ করত না, শাড়ি পরতে জোর করত। এদিকে মালিনীর স্কুললাইফ থেকে কাঁধছাঁটা চুল। শাড়ি পরতে ভালোবাসত, কিন্তু অফিস যেতে গেলে রোজ শাড়ি সামলাতে ওর সমস্যা হয় বলত। রান্নাবান্না বিশেষ জানে না, এদিকে শতদ্রুদা চাইত ছুটির দিনে অন্তত একটা ডিশ যেন মালিনী ছেলের জন্য রান্না করে, ওতে নাকি মা-ছেলের বন্ডিং বাড়ে। মালিনী হাঁফিয়ে উঠছিল। এমনকী সেপারেশনের পরেও এসব নিয়ে অশান্তি চলেছে— মালিনী আজ কেন স্লিভলেস ব্লাউজ পরে ছেলের স্কুলে গেছে, এসব। উলটোদিকে অনিরুদ্ধদা এসবে ফিরেও তাকাত না। মালিনী কী পরল সে-বিষয়ে এতই উদাসীন যে, মালিনীই মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে আমায় বলত, ‘আমি কার জন্য সাজি?’ আমার ফ্ল্যাটে মালিনী আর অনিরুদ্ধদা অনেকবার এসেছে। রাতও কাটিয়েছে। মালিনী শখ করে কিছু একটা স্টাইলিশ ডিশ রান্না করতে চেয়েছে যেটা কোনো বই থেকে শিখেছিল। অনিরুদ্ধদা তাতে অশান্তি করেছে উলটে। ওর দাবি ছিল, রান্নাবান্নার মতো ভুলভাল কাজ করার দরকার নেই। খাবার কিনে আনা হবে। মালিনী সেইসময়টায় ওর পাশে বসে একটা ভীমসেন যোশী শুনুক, বা, সিনেমা দেখুক কোনো অথবা, মানে, ওদের সবই তো খোলামেলা ছিল।’ সুচন্দ্রা থমকালেন। দোনোমনো করছিলেন কী বলবেন তাই নিয়ে। তারপর নিশ্বাস ফেললেন, হয়তো এই বুঝে যে, তাঁর সামনে দু-জন বৃদ্ধ বসে এবং তাঁর নিজেরও বয়েস পেরিয়েছে। ‘মানে, অনিরুদ্ধদা আর মালিনীর ব্যাপারটায় ওসব জিনিস অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল, আপনারা তো জানেনই। মানে, ওই আর কি— মালিনী পরে আমার কাছে গল্প করত, কী কী এক্সপেরিমেন্ট করত ওরা। শুনে আমার গায়ের ভেতর কেমন করত, জানেন! এই—- সিনেমা, গান, তারপর ওইসব— ও দারুণ পছন্দ করত। সাহসী টাইপের মেয়ে ছিল তো! ওরা ঘুরতে গেছে অনেকবার। উইকএন্ডে লং ড্রাইভে গেছে। অনিরুদ্ধদা বাড়িতে জানাত না, কিন্তু মালিনীর লুকোছাপার ব্যাপার ছিল না। আমি ভয় পেতাম। অনিরুদ্ধদা বিবাহিত মানুষ। মালিনী যদি আবার আঘাত পায়? ওকে এত জড়াতে বারণ করতাম। কিন্তু, মালিনী যাকে ভালোবাসবে, তার জন্য জগৎসংসার উলটে দেবে। ওর লয়ালটি ছিল সাংঘাতিক।’ কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে নিজের মনে হাসলেন সুচন্দ্রা। ‘আমি ভালোবাসার ব্যাপারে কিছুই বুঝলাম না, জানেন! সারাজীবনে বুঝিনি। প্রেম এত সর্বগ্রাসী হয় বুঝি? আমার অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার শূন্য।’
‘আমারও।’ ইম্যানুয়েল হালকা গলায় বললেন। সুচন্দ্রা উত্তর দিলেন না। শূন্যচোখে দেওয়াল দেখছিলেন। অস্বস্তিতে গলা খাঁকড়ালেন জাভেদ। ইম্যানুয়েল প্রশ্ন করলেন, ‘প্রেমের এই লয়ালটি শতদ্রুর ক্ষেত্রে থাকল না কেন?’
‘শতদ্রুদার প্রতি ওর ভালোবাসা ফুরিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, যেদিন বাড়ির চাপে ওর বম্বে যাওয়া হল না, সেদিন থেকে ওর মনের একটা জায়গা মরে যায়। মায়ের সঙ্গেও খিটিমিটি লেগে থাকত। দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। শেষদিকে দু-জনে তেমন কথাই বলত না। কিন্তু, সেখানে তাও রক্তের সম্পর্ক ছিল। ওরা একবাড়িতে থাকত। একটা ক্ষীণ সুতো থেকেই যায়। শতদ্রুদার ক্ষেত্রে তো সেই দায় ছিল না। ওর সারাজীবনের ভালোবাসা এসে জমা হয়েছিল অনিরুদ্ধদার কাছে। বলত, অনিরুদ্ধদার বুকের ভেতর ঢুকে পড়লে একমাত্র তখনই ওর ঘুম আসে। বাকি রাতগুলোয় যতই নেশা করে থাকুক, ঘুম হয় না ওর। শতদ্রুদার সঙ্গে ওইসব ভয়াবহ ঝামেলা ট্রমা হয়ে ওকে তাড়া করত। বাজে স্বপ্ন দেখত। অবশ্য, অনিরুদ্ধদাকে দেখেও তো উলটো কিছু বুঝিনি, বাবা! ভালোবাসত বলেই তো মনে হত। হয়তো মালিনীর মতো অত মাখো- মাখো ছিল না। আমার আগেও মনে হয়েছে, সম্পর্কটা ভাঙলে অনিরুদ্ধদা সামলে নেবে। কিন্তু, মালিনীর মনে লাগবে বেশি। তা বলে অনিরুদ্ধদা যে এমন কাজ করতে পারে—’
‘এঁদের মধ্যেও তো অশান্তি শুরু হয়েছিল?’
‘হ্যাঁ। মালিনীর তো লুকোছাপা কিছু নেই। যা করবে বুক বাজিয়ে সবার চোখের সামনে করবে। আমি বরাবরের ভীতু, একটা প্রেমও করতে পারিনি সারাজীবনে। এসব দেখে ভয় লাগত। বলতাম ওকে, রেখে-ঢেকে করো। অনিরুদ্ধদাও ভয় পেত, কারণ ওর ফ্যামিলি আছে। তারপর জানাজানি তো হলই। মনে আছে, একদিন ওদের বাড়ি গেছি। কাকিমা চেয়ারে বসে চোখে হাত চাপা দিয়ে, কোনো কথা বলছেন না। আর, পাপানকে একহাতে আঁকড়ে কাকিমার সামনে দাঁড়িয়ে শতদ্রুদা চিৎকার করছে। পাপান ভয়ে কাঁদছে। মালিনী কাকিমার পাশে ফ্যাকাশে মুখে বসে। আমি থামাতে পারছি না। মালিনী কয়েক বার বলতে গেল ছেলের সামনে এসব না-করতে। শতদ্রুদা গর্জন করে উঠল, ‘ছেলে জানুক তার মা কেমন।’ মালিনীর চরিত্র নিয়ে খারাপ কথা, ওর চাকরি-বাকরিকে অপমান আর প্রতিটা কথার পর ‘ছি ছি’। ‘আমার মুখ দেখানোর জায়গা থাকল না’। ‘লোকে এবার আমার গায়ে থুতু ছুড়বে।’ কেমন লাগে বলুন এসব শুনতে! আমার তো বন্ধু! আমি শেষে থাকতে না- পেরে পাপানকে হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে নিলাম। শতদ্রুদা কিছু বলতে গিয়ে আমার মুখ দেখে বলার ভরসা পেল না। আমি পাপানকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা দিই। ঘরের ভেতরে ঢুকে পাপান কাঁপছিল। চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়াচ্ছিল ওর। তারপরেই মালিনী সিদ্ধান্ত নিল, দু-নৌকায় পা দিয়ে আর চলবে না। বিয়ে থেকে বেরোবে। অনিরুদ্ধদাকে বলল একসঙ্গে থাকতে চায়। বিয়ে না হলে, ওই যাকে লিভ টুগেদার বলে। অনিরুদ্ধদা রাজি হল না। আবার অশান্তি। একদিকে শতদ্রুদা ডিভোর্স দেবে না কিছুতেই, অন্যদিকে অনিরুদ্ধদা বাড়ি ছেড়ে বেরোতে চায় না। মালিনী দিশেহারা হয়ে যাচ্ছিল। জানেন, দু-বার সুইসাইড অ্যাটেম্পট করেছে। একবার হাতের শিরা কাটতে গেছিল, কিন্তু চামড়ায় ব্লেডের চাপ পড়ার পর অনেকটা রক্ত বেরিয়েছিল, তখন ভয় পেয়ে থেমে যায়। আরেকবার অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ মুঠোয় পুরেছিল, তারপর পাপানের মুখ নাকি মনে আসে ওর। আমায় পরে এসব যখন বলেছিল, আমি কান্নাকাটি করেছিলাম, ওকে বলেছিলাম এগুলো আর ভাবলে আমার মরা মাথা দেখবে। ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে এনে দিব্যি করিয়েছিলাম যেন এগুলো মনেও না-আনে আর। ও কাউকে বলতে বারণ করেছিল। নিজেও কাঁদছিল খুব, বলছিল, ‘আমার সাহস নেই, নাহলে করেই ফেলতাম।’ কিন্তু মালিনী বুঝছিল না, কী করবে। অন্য উপায় না-পেয়ে চাপ দেয়, অনিরুদ্ধদার স্ত্রী-র কাছে এবার যাবে। সেটা আমার ফ্ল্যাটেই ঘটেছিল। ওরা এসেছিল এখানে, রাত্রে থাকার কথা। ডিনারের সময় ঝগড়া শুরু হয়। অনিরুদ্ধদা ভাতের থালা ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মুখ লাল টকটকে। বলেছিল, ‘পারমিতার কাছে গেলে আমি খুন করব তোমায়।’ তারপর বেরিয়ে যায়। সেই রাত্রে ফেরেনি। মালিনীও ঘুমোয়নি, সেই টেবিলেই সারারাত বসে ছিল। আমি ওকে অনেক অনুনয় করলাম, ‘ঘুমোতে আয়।’ মালিনী ফিসফিস করে বলল, ‘ও কি ভাবল আমি সত্যি সত্যি যেতাম? একটুও বুঝল না আমায়?’ পরে অবশ্য আবার মিটমাট হয়ে যায়। কিন্তু, সেই রাগ থেকেই অনিরুদ্ধদা এত বড়ো কাজটা করল। জানেন, আমি রাগে, ঘেন্নায়, লজ্জায় কোর্টে যাইনি। অনিরুদ্ধদার মুখ দেখিনি সারাজীবনে আর। ওকে তো আমি পছন্দই করতাম। কিন্তু, এত বড়ো কাজটা করতে পারল? মনে-প্রাণে চেয়েছিলাম, ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করতাম, ওর যেন ফাসি হয়। মালিনী চলে যাবার পর টানা চারমাস আমার ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছিল, বমি হত খুব আর মাথার যন্ত্রণা। মশলাদার কিছু খেলেই অ্যাসিডে বুক জ্বলে যাচ্ছে। রাত জেগে বসে থাকতাম দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে। তারপর, যা হয়, সময় সব ভুলিয়ে দেয়। আমিও ওই ফ্ল্যাট বেচে এখানে চলে আসি, নাহলে স্কুল থেকে যাতায়াতের অসুবিধে হচ্ছিল। ভাইয়ের কারণে বাড়ি থেকে বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পারতাম না। আজও পারি না।’
‘আচ্ছা, মালিনীর সঙ্গে অনিরুদ্ধর এই যে ঝামেলা, এটা কি দেবারতি অধিকারী জানতেন?’ এবার জাভেদ প্রশ্ন করলেন।
‘বলতে পারব না। মনে হয়, জানতেন না। কারণ, মালিনী যেরকম মেয়ে ছিল, গোটা দুনিয়ার সামনে অনিরুদ্ধদাকে ডিফেন্ড করে যাবে, সে ভুল করলেও। অনিরুদ্ধদা বিয়ে থেকে বেরোতে চাইছে না, এটা জানলে ওর মা বা শতদ্রুদা বলবে ‘আমি বলেছিলাম!’ সেটা নেওয়া ওর ইগোর পক্ষে খুব বেশি।’
‘আমরা জানতে পেরেছি, দেবারতি অধিকারী পারমিতাকে এই সম্পর্কের কথা জানিয়েছিলেন।’
সুচন্দ্রা অবাক হলেন না। ‘অসম্ভব নয়। কাকিমা যে ধাতুতে গড়া, এটা করতে পারতেন। অনিরুদ্ধদার বাড়িতে জানতে পেরেছিল, এটা অবশ্য আমি আজ প্রথম শুনলাম। নাকি, তখনই জানতাম? ভুলে যাই আজকাল। যতদূর মনে হচ্ছে, জানতাম না। না, মালিনী তো জানতই না। জানলে আর হুমকি কেন দেবে?’
‘অনিরুদ্ধ নাকি বলেছিলেন কয়েক দিন সময় চাইছেন, তার মধ্যে বেরিয়ে আসবেন?’
‘কী জানি! এক একসময়ে এক একরকম কথা বলত। একবার বলত বেরোবে, তার কয়েক দিন পর বলত কিছুতেই পারবে না। আমি একটা সলিউশন দিয়েছিলাম। পাপান তখন মালিনীর কাছে। কাকিমাকে কী-একটা কাজে দিল্লি যেতে হয়েছিল। আমি ফোন করে বলেছিলাম, অনিরুদ্ধদাকে একদিন বাড়িতে ডেকে পাপানের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দে। দু-জনে সময় কাটাক। তাতে ওদের মধ্যে সম্পর্ক সহজ হবে। পাপান বুঝবে, বাবা আর দিদা যতই অন্যরকম বলুক, মা কোনো খারাপ কাজ করছে না। অনিরুদ্ধদাও বুঝবে, তুই নিজের ছেলের কাছে সম্পর্কটার ব্যাপারে স্বচ্ছতা রেখেছিস। তুই যেহেতু তোর দিক থেকে ট্রান্সপারেন্ট, ও বুঝবে যে এবার ওর পালা— বাড়িতে লুকোবে, নাকি, সব জানিয়ে দেবে। কিন্তু মালিনী বলেছিল, ‘আমি ওর রাগকে ভয় পাই।’ বলে ফোন নামিয়ে রেখেছিল। আমি আর কিছু বলিনি। অনিরুদ্ধদার রাগ তো নিজেও দেখেছি, বাবা! কী আর বলব! নিজেদের ব্যাপার, নিজেরা বুঝুক।’
‘অনিরুদ্ধ কি এতই রেগে যেতেন?’
‘ওই একবারই দেখেছিলাম। সে ভয়ানক রাগ আর কি! মধ্যবিত্ত বাড়িতে ভাতের থালা উলটে দেওয়া অলক্ষণ। আমার বিরক্ত লেগেছিল। বলেছিলাম, আর ওকে আমার বাড়িতে আনিস না। কড়াভাবেই বলেছিলাম। মালিনী কী মনে করেছিল জানি না। তবে, আর আসেনি ওরা।’
‘ওদের মধ্যে শুনেছি কিছুদিনের জন্য সাময়িক ব্রেক-আপ হয়েছিল।’
এবার সুচন্দ্রা হাসলেন। ‘ওরকম ছেলেমানুষি ওরা মাঝে মাঝেই করত। সে কয়েক দিনের ব্যাপার। মালিনী পাকাপাকি ব্রেক-আপ করার মেয়েই নয়। দরকার পড়লে নিজের সব ইগো বিসর্জন দিয়ে অনিরুদ্ধদার পায়ে ও গড়াগড়ি খাবে, কিন্তু কোথাও যেতে দেবে না।’
‘কিন্তু, শেষের দিকে মালিনী নাকি মুভ অন করতে চাইছিলেন? অনিরুদ্ধ অন্তত তাঁর বয়ানে সেটা বলেছেন।’
‘এতদিন আগের কথা। অনেক কিছু ভুলেও গেছি। যদি ও সম্পর্কটা থেকে বেরোতে চাইত, তাহলে বেরোল না কেন? অনিরুদ্ধদা বাড়ি ছেড়ে না-এলে এভাবে কতদিন টানত ও? হয়তো বেরোলে ওকে বেঘোরে মরতে হত না।’
এক প্রৌঢ় মুখ ঘরের দরজা থেকে উঁকি মারছিল। মাথায় খাপচা খাপচা চুল। ইম্যানুয়েলের সঙ্গে চোখাচোখি হতে ভদ্রলোক হলুদ দাঁতে হাসলেন। তাঁর হাত কাঁপছে। একটা ছেঁড়াফাটা গেঞ্জি আর পাজামা পরা। এই ঘর থেকেই গান ভেসে আসছিল, আপাতত থেমেছে। ইম্যানুয়েল নমস্কার জানালেন সুচন্দ্রার ভাইকে। সুচন্দ্রা গলা বাড়িয়ে বললেন, ‘মালিনীর ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছে। তোর মনে আছে তো, মালিনীকে? আমার বন্ধু ছিল। তোকে খুব ভালোবাসত।’
‘মান্নি দিদি। মন— মনে আছে।’ প্রৌঢ় আবার ফ্যালফ্যালে হাসলেন।
‘মালিনী যেখানেই ঘুরতে যাক, আমার জন্য কিছু না-আনুক, ভাইয়ের জন্য আনবেই। চকলেট, ছাতা, সাবান, রংবেরঙের জামা। আমি বকতাম, এত বাজে খরচ করিস কেন? কিন্তু, মালিনী বরাবরের উড়নচণ্ডী। মাসের শুরুতে মাইনে পেয়েই আমাদের সবার জন্য একগাদা শপিং করে ফেলল। ছেলেকে জুতো, জামা কিনে দিল। মাসের মাঝামাঝি গিয়ে হাত ফাঁকা। তখন আমার কাছে ধার করল।’
ইম্যানুয়েলরা উঠে পড়লেন। ‘যদি আবার কখনো দরকার পড়ে, আপনাকে ফোন করব।’
‘আমার দিক থেকেও বলা রইল, যদি নতুন খবর আসে, আমি জানতে চাই। মালিনীর জন্য চাই।’ সুচন্দ্রা হাসলেন। ‘নাড়ির টান ছিল আমাদের। ও থাকুক- না-থাকুক, এ টান মৃত্যু পর্যন্ত থেকে যাবে।
রাস্তায় বেরিয়ে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘একটা প্রশ্ন তোমাকে জিজ্ঞাসা করব বলে ভুলে যাই রোজ। সিজার লিস্টের উল্লেখ তোমার ফাইলে দেখলাম। সেখানে লেখা আছে, শতদ্রু দত্তর চশমার খাপ মালিনীর মাথার কাছে পাওয়া গিয়েছিল। বেডসাইড টেবিলে। কী করে জানা গেল এটা শতদ্রুর চশমার খাপ? আর, এর ব্যাখ্যা কী?’
‘সেটা ফাইলেই নোট করা ছিল। তুমি মিস করে গেছ মনে হয়। চশমার খাপে স্কেচ পেন দিয়ে ইংরেজিতে শতদ্রু দত্ত নাম লেখা ছিল। ওটা ওই বাড়িতেই ছিল বলে শতদ্রু পুলিশকে জানিয়েছেন। মালিনী নিজে চশমা পরতেন না। তাঁর স্বভাব ছিল চশমার খাপে ওষুধ রাখা। মায়ের চশমার খাপও ব্যবহার করতেন। দেবারতিও সেকথা জানিয়েছেন পুলিশকে। খাপের ভেতর আমরা মালিনীর ওষুধ পেয়েছিলাম।’
‘কী ওষুধ?’
‘যা বলেছিলেন। ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট। মাইগ্রেন। কোলেস্টেরল।’
‘ঘুমের ওষুধ?’
‘ওটা মাটিতে পড়ে ছিল।’
‘মালিনী তাহলে আত্মহত্যার কথা ভাবছিলেন! এটা পুলিশ রিপোর্টেও পেয়েছি, সম্ভবত সুচন্দ্রাই পুলিশকে জানিয়েছিলেন। সেজন্যই আমি বার বার এই দিকটা খুঁটিয়ে দেখতে চাইছিলাম, কারণ রিপোর্ট পড়ার পর থেকে মাথায় ঘুরছে এটা।’
‘শোনো ইজি, মালিনীর প্যাটার্ন সুইসাইডাল নয়, তখনই আমরা সেসব দিক খুঁটিয়ে দেখেছি। রাগের মাথায় বা দুঃখে অনেকে এসব ভাবে, কিন্তু সেটাকে কাজে করার ক্ষমতা সবার থাকে না, বুঝলে? আরে, এসব করতে গেলে মানসিক অবস্থা যেখানে যেতে হয়, মালিনীর তা ছিল না। তাহলে আগের দিন অনিরুদ্ধকে ডেকে ওরকম সময় কাটাতেন না। আর, আত্মহত্যা যে টেকনিক্যালি অসম্ভব, সে নিয়ে তো আগেই কথা হয়েছে। তুমি এই অ্যাঙ্গলটা ছাড়ো তো এবার! বার বার এটায় ফিরে এসে লাভ হবে না।’
‘তুমি আমায় কমপ্লিট সিজার লিস্ট দাও। আর, যা ছবি তোলা হয়েছিল।’
‘পেয়ে যাবে। আছে আমার কাছে কপি।’
নীরবে কয়েক পা হেঁটে গেলেন দু-জন। ব্যস্ত এন্টালির ট্রাফিক আর ধুলো, ধোঁয়ার মধ্যে থেকে চার্চের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ইম্যানুয়েল বললেন, ‘সমাধানের রাস্তায় আমি কিছুটা এগিয়েছি, জাভেদ। কিন্তু, আমি দ্বিধায়। সত্যিই আর কতটা এগোব, এখনও জানি না। আবার এই দ্বিধা যে বোঝাতে পারব তোমায়, এমনটাও না। তবে, আপাতত জিজ্ঞাসাবাদ সব শেষ। আমায় কয়েক দিন সময় দাও। তারপর আমি তোমায় যোগাযোগ করব।’
‘কীসের দ্বিধা তোমার? বুঝতে পারছ না এটাই ঠিক সমাধান কিনা? নাকি, আত্মহত্যা নিয়ে পড়ে আছ?’
‘না। সে-দ্বিধা নয়। সমাধান হতে হলে ওটাই হতে হবে। সে যত ইম্পসিবল হোক না কেন, ওটাই মোস্ট লাইকলি। আমি দ্বিধায়, কারণ এই সমাধান আদৌ কতটা এথিক্যাল, আমি জানি না।’
‘বুঝলাম না।’
‘প্রথমদিন আমি তোমায় বলেছিলাম, ন্যায়ের জন্য তোমার মোহ সত্যের খোঁজের দিকে আমাদের ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু আমি এই নৈর্ব্যক্তিক ন্যায়ের ধারণায় বিশ্বাস রাখি না। আমার কাছে ন্যায় মানে একটা মিন পজিশন, দুই চরম অবস্থানের মধ্যবর্তী বিন্দু। অন্যায় এবং অতিরিক্ত ন্যায়, যার জন্য বাকি সমস্ত কিছুকে বিসর্জন দিতে হয়, এই দুই এক্সট্রিমের মাঝামাঝি বিন্দুতে ন্যায় থাকে। কিন্তু তুমি চাইছ সেই অতিরিক্ত ন্যায়, যার জন্য হয়ত অনেকের জীবন আবার এলোমেলো হবে। তুমি যে জাস্টিসকে খুঁজছ, সেই জাস্টিস সত্যের খাতিরে এমপ্যাথিকে বিসর্জন দিতে বলে। তার পরিণতি কী হবে আমি জানি না। তুমি, আমি, আমরা সেটা মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত?’
দু-জন মৌলালির মোড় পেরিয়ে এস. এন. ব্যানার্জি রোডে উঠলেন। জাভেদ বললেন, ‘মনে আছে, আগে এক-একটা এনকোয়্যারি ভিজিটের পর আমি আর তুমি কলকাতার রাস্তা দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতাম, কেস আলোচনা করতে করতে?’
‘আমার স্বভাব ছিল, হাঁটতে হাঁটতে কথা না-বললে মাথা খুলত না।
‘বাস্টার্ড, চলো তাহলে, আজ পুরোনো অভ্যেস রিভিজিট করা যাক।’ জাভেদ হাসলেন।
সন্ধে গাঢ় হল কলকাতায়। মেঘের দল আকাশের এককোনায় জড়ো হয়েছে। এস. এন. ব্যানার্জি রোডে পসরার সম্ভার, ভিড়, রংবেরঙের আলো। জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির সামনে ছাতুওয়ালা আর এক রিকশাচালকের প্রবল ঝগড়ায় জটলা, কোনোমতে পাশ কাটানো গেল। একটা সিনেমার বিশাল পোস্টার দমকা হাওয়ায় ছিঁড়ে পতপত করতে করতে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে জড়িয়ে গেল। অনাদি কেবিন থেকে মোগলাই পরোটার মনমাতানো সুবাস ভেসে আসছে। এসপ্ল্যানেডের মোড়ে দাঁড়িয়ে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘এতক্ষণ ধরে খুঁটিনাটি আলোচনা করলাম, তবু কিছুই হল না, জাভেদ। একটা কেসকে এভাবে খণ্ডবিখণ্ড করে দেখার পর তার পরিপূর্ণতাকে বাইরে থেকে যাচাই করতে হয়।’
‘হ্যাঁ, আমার কাছে সেটা একটা টেকনিক্যাল প্রবলেম। তোমার ভাষায়, ভ্যারিয়েশন অফ লকড রুম মিস্ট্রি।’
‘আর, আমার কাছে ফিলোজফিক্যাল। একটা অপরাধের জন্য যদি কেউ ভুল শাস্তি পায়, তাহলে সেটাকে কারেক্ট করবার প্রচেষ্টা কতদূর এমপ্যাথেটিক অ্যাপ্রোচ? দুই চরম অবস্থানের মধ্যবিন্দুতে থাকা ন্যায়ের ধারণার সঙ্গে কি সেটা যায়? আবার কিছুই না করে একজন নিরপরাধকে স্যাক্রিফাইস করাটাই কি যথাযথ?’
‘তাহলে অনিরুদ্ধ নিরপরাধ?’
‘না। আমি সেটা বলছি না। কারণ, সমাধান এখনও পুরোপুরি পাইনি। হতেই পারে অনিরুদ্ধ আসলে দোষী। সেক্ষেত্রে এই প্রশ্ন উঠবে না। কিন্তু, যদি ওই লাইকলি ইম্পসিবল বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়, তাহলে এই দ্বন্দ্ব আমার ভেতর থাকবেই।’
মৌলালি থেকে হা-হা বাতাস পিঠে জলীয় গন্ধ নিয়ে ছুটে এসে তাঁদের পিঠে আছড়ে পড়ল, তারপর ছুটে গেল রাসমণি রোডের মাথাপাগল উথালপাথাল গাছেদের ওপর দিয়ে। ইম্যানুয়েল বললেন, ‘বাড়ি যাও জাভেদ, হাওয়াটা খারাপ।’
‘হায় ইজি,’ যাত্রার ভঙ্গিতে ভুরু তুললেন জাভেদ। ‘এই বদলের দুনিয়ায় তুমি শালা একই থেকে গেলে। দেখতে পেলে না, হাওয়াটা পূর্ব দিক থেকে আসছে। ইস্ট উইন্ড।’
ইম্যানুয়েল হাসলেন, ‘হোমস আর ওয়াটসন কি আমাদের মতো এত বুড়ো হয়েছিল?’
