হামারটিয়া – ১২

১২

বাজেশিবপুরের এই পাড়া এখনও প্রাচীন অবশেষকে নিজের শরীরে ধরে রেখেছে। পোড়োমন্দির জুড়ে বটের চারা। তার পাশ দিয়ে বেঁকে যাওয়া ছায়াচ্ছন্ন রাস্তার দু-পাশে বড়ো বড়ো গাছ। প্রাচীন বাড়িদের সমাহার। ঝিমোনো চায়ের দোকান। একটা কুকুর অচেনা আগন্তুক দেখে ভৌ শব্দে প্রতিবাদ জানাল।

জাভেদ আর ইম্যানুয়েল ঠিকানা মিলিয়ে যে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন তার গা জুড়ে অজস্র ফাটল। সেখানে হরেকরকম পোস্টার পড়েছে, নির্বাচন থেকে ডি. কে. লোধ। তিনতলা বাড়ির দরজা বন্ধ, পেছন দিয়ে ঘোরানো রাস্তা শেষ হয়েছে একটা পানাপুকুরে। এক স্ত্রীলোক একরাশ বাসন-কোসন গামলায় চাপিয়ে সেখান দিয়ে হেঁটে আসছিলেন। দাঁড়িয়ে পড়লেন ইম্যানুয়েলদের দেখে। প্রদীপ বটব্যালের নাম করাতে দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে গেলেন।

সার সার ঘরে ভাড়াটেদের বাস। অন্ধকার প্যাসেজে দড়িতে টাঙানো জামা, আন্ডারওয়্যার। বাসি মাছ ভাজার গন্ধ ভেসে আসছে একটা ঘর থেকে। শিশুকণ্ঠের কান্না। কোনার ঘরের দরজা খুলে বছর পঞ্চাশেক বয়েসের এক ভদ্রলোক উঁকি মারলেন। গামছা পরা খালি গা। দড়ি পাকানো চেহারা, চোখের কোলে কোলেস্টেরলের ছাপ।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল। এক মিনিট, আসছি।’ দরজা বন্ধ হল। মিনিটখানেক পর খুলল যখন, গামছার বদলে পাজামা এসেছে, ঊর্ধ্বাঙ্গে একটা ছেঁড়াফাটা গেঞ্জি। মাথার অল্প চুলে চিরুনি বোলানোর চেষ্টা নজরে পড়ে। ইম্যানুয়েলদের ছাদে নিয়ে গেলেন। চিলেকোঠার ঘর।

‘শরিকি বাড়ি। বিক্রি করা যাচ্ছে না মিউটেশনের ঝামেলার কারণে। তাই সব শরিক নিজেদের অংশে ভাড়া বসিয়েছে। এখানে একমাত্র থাকত কাকা, মানে, অনিরুদ্ধ সান্যাল। বাকি শরিকরা সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কেউ দেশের বাইরে।’

‘আপনি?’

‘আমি প্রথম যুগের ভাড়াটে। সাতাশ বছর হয়ে গেল। এ বাড়িতে আমার মেয়ে জন্মেছে। শেষদিকে কাকার দেখাশোনা আমিই করেছি।’

প্রদীপবাবু চিলেকোঠার ঘর খুলে আলো জ্বালালেন। অনাড়ম্বর। একটা খাট, একটা টিনের টেবিল, চেয়ার, কেরোসিন কাঠের আলমারি। টেবিলে কিছু বই গুছিয়ে রাখা। খাটের বালিশে তেলচিটে ওয়াড়। দেওয়ালে স্বামী বিবেকানন্দর ছবি। গত বছরের ক্যালেন্ডার একটা। ঘরের একপাশে সিমেন্টের স্ল্যাবে গ্যাসের ওভেন। সিলিন্ডারের জায়গা ফাঁকা। হাতে-গোনা কয়েকটা থালা, বাসন একপাশে রাখা। ছাদের অন্যপ্রান্তে একটা ছোটো ঘরের দরজা বন্ধ। দেখে বোঝা যায়, টয়লেট। ইম্যানুয়েল বইগুলো উলটেপালটে দেখলেন। গ্রিক নাটকের কালেকশন। ‘আনা কারেনিনা’। ‘ডিভাইন লাইফ’ এক কপি। আর, ‘পোয়েটিক্স’। ‘পোয়েটিক্স’-এর হলুদ হয়ে যাওয়া পাতায় পাতায় হাতে লেখা ফুটনোট। কভার ছেঁড়াখোড়া। স্পাইন খুলে আলগা হয়েছে। ১৯৭০ সালের পেঙ্গুইন এডিশন, সম্ভবত অনিরুদ্ধর কলেজ-বেলার টেক্সট বই। শেষপাতায় হাতে-লেখা নোট, ‘ A likely impossibility is preferable to an uncon- vincing possibility’। কথাটা ‘পোয়েটিক্স’-এ ছিল কি? নাকি, অনিরুদ্ধর নিজের? ইম্যানুয়েল মনে করতে পারলেন না।

‘সব মিটে যাবার পর আমি ঘর পরিষ্কার করে তালা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এই ঘরেই কাকা মানে—’

‘বডি কে আবিষ্কার করে?’

‘আমাদের এক ভাড়াটের মা। তিনি ছাদে কাপড় মেলতে গিয়ে দেখেন, ঝুলছে। ফ্যানের ব্লেড বেঁকে গিয়েছিল।’ ইম্যানুয়েল মাথা তুলে দেখলেন, ফ্যানের আংটা খাঁ-খাঁ। ‘কাকা এই ঘর থেকে নীচে বিশেষ নামত না, দরকার না-পড়লে। বিকেলে ছাদে হাঁটত।’

‘ওঁর চলত কী করে?’

‘কাকার অংশে একটা ভাড়াটে ছিল। দুটো ঘর নিয়ে। সেই টাকা ছিল। নিজের জমানো টাকা, সে খুবই সামান্য। মাসে হাজার টাকাও ইন্টারেস্ট হত না। বছর পাঁচেক আগে টিউশনি করবে বলে ভাবছিল। দু-জন ছেলেও জোগাড় হয়। কিন্তু, তারপর তাদের বাপ-মায়েরা শুনল কাকা জেলফেরত আসামি। ছাড়িয়ে নেয়। কাকা আর চেষ্টা করেনি। একটা চেনা এজেন্সি ছিল। ওরা কাকাকে দিয়ে টুকটাক কনটেন্ট লেখাত। তার জন্য অল্পস্বল্প দিত। এই যা!’

ইম্যানুয়েল খাটে বসলেন। ঘামছিলেন, কারণ ফ্যান নেই। জাভেদ ছাদের দিকে চলে গেলেন।

‘কখনো আপনার সঙ্গে অনিরুদ্ধ সান্যালের কেস নিয়ে কথা হয়েছিল?’

‘আমি জানতে চাইনি। কী হবে পুরোনো ঘা খুঁচিয়ে! তবে, কাকা দুয়েকবার বলেছিল, তাকে ফাঁসানো হয়েছে।’

‘জানতে চাননি, কে, কেন ফাঁসাল?’

‘চেয়েছিলাম। কাকা বলেনি। মাথা নাড়ত আর বিড়বিড় করত নিজের মনে। আমিও সাত কাজে ব্যস্ত থাকি বলে আর মাথা ঘামাইনি। বড়োবাজারে একটা গদিতে বসি। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে সাড়ে ন-টা বেজে যায়। এসব ভাবার সময় কই!’

‘আচ্ছা, অনিরুদ্ধবাবু কারোর সঙ্গে মিশতেন না?’

ঘোমটা পরা এক মধ্যবয়সি মহিলা একটা প্লেটে তিনটে কাপ নিয়ে এলেন। সঙ্গে থিন অ্যারারুট। জাভেদ তন্ময় হয়ে প্রকৃতি দেখছেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে প্রদীপবাবু বললেন, ‘কাকাকে পাড়ার মানুষ সহজ চোখে দেখত না। জেলখাটা আসামি বলে শুধু না। মানে, কাকারা তো ঠিক আমাদের মতো মানুষ ছিল না! অত পড়াশোনা করেছে, ওরকম চাকরি করত, অন্য ধরনের জীবনযাত্রা। এখানকার সঙ্গে মেলে না। কাকিমাকে তো আমি চোখেই দেখিনি। শুনেছি তাঁরও খুবই হাইফাই ব্যাপার ছিল। তো, এমন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কাছের হয় না। সেই মানুষ যদি পাকেচক্রে কাদায় পড়ে, অনেকে আনন্দ পাবে, বুঝলেন কিনা? সহানুভূতিও জানাবে। কিন্তু, কাছে ঘেঁষবে না। অবশ্য, কাকাও ঘেঁষতে চাইত না।’

‘কিন্তু, আপনি তো ঘনিষ্ঠ ছিলেন।’

‘তেমন কিছু নয়। তবে, আমায় অল্পবয়েস থেকে দেখে আসছিল তো, কিছু কথা-টথা বলত। এমনিতেই জেল থেকে আসার পর কথা কমে যায়। কলকাতার

ফ্ল্যাট নাকি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল ধারদেনা, লোন এসব মেটাতে। এখানে এসে চুপচাপ থাকত, ঘাড় গুঁজে। দরকারে-অদরকারে আমায় জানাত। সেই থেকে একটা জায়গা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমার বউ, এই দেখলেন, চা দিয়ে গেল, প্রথমে ‘কিন্তু, কিন্তু’ করেছিল বটে। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করি, এমন মানুষের সঙ্গে কে আর সম্পর্ক রাখতে চায়! তবে, পরে সহজ হয়ে গিয়েছিল। নির্বিবাদী মানুষটাকে দেখে বুঝেছিল, ক্ষতিকর নয়। কাকাকে চা পৌঁছে দেওয়া, কখনোও ভালো-মন্দ রান্না হলে দিয়ে আসা, ও-ই করত।’

জাভেদ ফিরে এসেছেন। চায়ের কাপ হাতে তুলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, ওঁকে কখনো রাগতে দেখেছেন? মানে, রেগে গিয়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছেন, এমন?’

‘হ্যাঁ, সে একবার দেখেছি বটে। বছর দশেক আগে ক্লাবের ছেলেরা কালীপুজোর চাঁদা চাইতে এসেছিল। এক-শো টাকা চেয়েছিল, কাকা তিরিশ টাকার বেশি দিতে রাজি হচ্ছিল না। সেই নিয়ে কথা কাটাকাটি। ফস করে একটা ছেলে বলে বসল, ‘এত ফটফট করবেন না, দাদু। সব হিস্ট্রি জানি। ভদ্রলোকের পাড়ায় থাকতে দিয়েছি ভাগ্য, জেনে রাখুন।’ কাকার মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। হাত মুঠো, কপালের শিরা ফুলে উঠেছে। ফর্সা মানুষ তো, নীল শিরা দপদপ করছিল, বোঝা যায়। দাঁত বার করে গরগর করছিল গলার ভেতর, সেই দেখে ছেলেরাই ঘাবড়ে যায়। তারপর হঠাৎ দেখি কাকা একটা রড তুলে নিয়েছে আমি তখন ছাদে। অমন হিংস্র চেহারা আমি আগে দেখিনি। ছেলেগুলো ‘কী হচ্ছে, কী হচ্ছে’ বলে পিছিয়ে আসে। কাকা এগোয়নি। রডটাকে শুধু কাঁধের কাছে তুলছিল। আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে আসি, কিন্তু কাকার চোখ দেখে কাছে এগোতে সাহস হয়নি। খ্যাপাটে চোখ ওরকম হয়। বিপদ বুঝে লোকজন ক্লাবের অন্যদের ফোন করে। বয়স্করা কাছেপিঠেই ছিল। দৌড়ে এসেছিল। চিৎকার, চেঁচামেচি হয়। সেই ছেলেটাকে ধমকধামক দিয়ে পরিস্থিতি সামলায় সবাই। কাকা থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, তবে বুঝছিলাম আস্তে আস্তে রাগ কমছে। ওরা কাকাকেও চমকেছিল— হাতে রড তুলে নিলে অন্যরাও নেবে, মেশিন সবার কাছেই আছে, মাথাগরম ছেলেছোকরাদের ঘাঁটাতে নেই, এসব। তবে অভদ্রতা করেনি, বুঝেছিল এই মানুষকে না-ঘাঁটানো ভালো। ওরা চলে যাবার পর কাকা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরদিন দুপুরের আগে খোলেনি। আমি একটা দরকারে কাকার কাছে এসেছিলাম। দরজায় ধাক্কা দেবার পর ভেতর থেকে রাগী কণ্ঠে আমাকে চলে যেতে বলে। সেই একবারই, আর কখনো অমন মূর্তি দেখিনি।

জাভেদ আর ইম্যানুয়েল পরস্পরের দিকে তাকালেন। মালিনী কি এরকম অনিরুদ্ধকে দেখেছেন?

‘ওঁর ক্যান্সার কতটা ছড়িয়েছিল?’

‘কিছুই জানি না। কাকা কখনো বলেনি আমাদের কিছু। খুব কাশত আর হাঁপাত শেষের দিকে। আমি বুকে মালিশের তেল এনে দিয়েছিলাম আমাদের সত্যেন কবিরাজের কাছ থেকে। কিন্তু, এমন কিছু যে ঘটবে— মানে, কাকার চলে যাওয়া এভাবে হবে, আমি ভাবিইনি। তারপর থেকে অনেকদিন ভাড়াটেরা ভয়ে ছাদে ওঠেনি। বাচ্চারা বলত, খুনিদাদু নিজের ঘরেই এখনও বসে আছে। অভিশপ্ত জীবন!’

‘খুনিদাদু?’

‘পাড়ার বদমাশ বাচ্চারা নাম দিয়েছিল।’

‘মারা যাবার পর ফ্যামিলির কেউ এসেছিলেন?’

‘এক জামাই। কাকা একটা কাগজে লিখে গিয়েছিল, ব্যাঙ্কের লকার, অ্যাকাউন্ট নাম্বার এসব। হয়তো কিছু জমানো থাকতে পারে। এ ছাড়া, ডেথ সার্টিফিকেট বার করা, ইলেকট্রিক বিলের নাম কাটানো, এসব কাজও ছিল। তা, ছেলেটা এসেছিল। বেশ ভদ্র। আমার সঙ্গে টুকটাক কথা বলল। তবে, থাকেনি বেশিক্ষণ। আমি শ্মশানে গেছিলাম। হাতে-গোনা দু-তিনজন ছিল, তার মধ্যে জামাই ছিল। মেয়েও নাকি এসেছিল একবার, কিন্তু আগেই বেরিয়ে যায়। শুনেছি, এই মেয়ে আর জামাই নাকি দিল্লিতে থাকে। খবর পেয়ে মায়ের কাছে এসেছিল।’

জাভেদরা নীচে এলেন। প্রদীপ বটব্যাল রাস্তা পর্যন্ত এলেন তাঁদের এগিয়ে দিতে। টোটো ধরে বাসরাস্তা যেতে হবে। জাভেদ হাত বাড়ালেন, ‘অনেক ধন্যবাদ। আপনি না-থাকলে অনিরুদ্ধবাবুর শেষজীবন সম্পর্কে জানতেই পারতাম না।’

‘কিন্তু, আপনারা এতদিন পরে আবার— মানে, কাকা কি তাহলে খুনটা সত্যিই করেনি? সত্যিই কেউ ফাঁসিয়েছিল?’

‘না, না, তেমন কিছু নয়। আমরা নিজেদের ইন্টারেস্ট থেকে একবার রিভিজিট করছি। কিন্তু, অনিরুদ্ধবাবু নির্দোষ প্রমাণিত হলে আপনি খুশি হবেন?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে মাথা নাড়লেন প্রদীপ বটব্যাল, মুখে দুর্লভ এক হাসি। ‘যে মানুষটার সঙ্গে এতদিন কাটালাম, তাকে খুনি ভাবতে কার ভালো লাগে, বলুন? খুশি হব, সত্যিই হব।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *