হামারটিয়া – ১০

১০

কলকাতার বুকে বৃষ্টি কমছেই না। সারাদিন মেঘলা টিপ টিপ, কখনো মুষলধারায়— শেষ কবে সূর্য উঠেছে ইম্যানুয়েল মনে করতে পারেন না। তাঁর জানালার পাশে বসে দেখেন, জলে ভেজা মুন্সিগঞ্জের রাস্তার খোলা ড্রেন উপচে পড়ছে বাতিল সবজি আর বজকানো পাঁকের কারুকার্যে। নিকাশির মুখে প্লাস্টিক আটকে নোংরা জলে থই থই রাস্তা। একটা ছাইরং বেড়ালের মৃতদেহ ভেসে গেল, কেউ ফিরে দেখল না।

শেষ তিনদিন ইম্যানুয়েল বাইরে বেরোননি, কারণ, শরীরটা জুতের লাগছে না। সর্দি বসে গেছে বুকে। এরকম আবহাওয়ায় একটা ভাইরাস কলকাতার বুকে ঘুরছে যা ভয়ানক কাবু করে দিচ্ছে মানুষজনকে। আদা চা দুধ দিয়ে বানিয়ে সামনে ‘বুক অফ ইনক’ খুলে বসে ছিলেন। শরীর দুর্বল বলে বিশ্রাম চাইছিলেন কয়েক দিন। সারাদিন বই পড়বেন আর দাবা খেলবেন নিজের সঙ্গে, এটাই প্ল্যান। জাভেদ আজ খবর পেয়ে দেখতে এসেছেন। সঙ্গে ডাক্তার দীপক মিত্র যিনি মালিনী অধিকারীর পোস্ট-মর্টেম করেছিলেন। দীপক ইম্যানুয়েলকেও চিনতেন। এই কেসের ব্যাপারে জাভেদের মুখে শুনে উৎসাহ পেয়েছেন। তাই চলে এসেছেন নিজেই। ইম্যানুয়েলের ছোট্ট ঘরে তিনজন গা এলিয়ে ছিলেন। জাভেদ একটা ওল্ড মঙ্ক পাঁইট এনেছেন। দু-জন সেখান থেকে আয়েশ করে খাচ্ছেন। বৃষ্টি ঘন হল। স্যাঁৎসেঁতে চোপসানো বিকেল।

দীপক মিত্রর দড়ি পাকানো লম্বা চেহারা, উজ্জ্বল চোখে উৎসাহের কমতি নেই। বার বার কেসের খুঁটিনাটি জানতে চাইছিলেন। ইম্যানুয়েল তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, যেভাবে স্ট্যাব হয়েছে তাতে মৃত্যু হতে কতক্ষণ লাগে। দীপক তখন পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট ব্যাখ্যা করলেন। মেডিক্যাল কলেজে ততদিনে ডিজিটাইজড পদ্ধতিতে আর্কাইভিং চালু হয়ে গেছে। দীপক তাঁর সোর্স খাটিয়ে পুরোনো রিপোর্ট বার করে এনেছিলেন।

মালিনী অধিকারী। বয়েস ৩৬। উচ্চতা ১৬৫ সেন্টিমিটার। ওজন ৫৪ কেজি। দেহ আবিষ্কারের সময়ে রিগর মর্টিস আসেনি, দেহের বহিরঙ্গে রিগর মর্টিসের চিহ্ন দেখা যায়নি। সার্ভিকাল স্পাইনের লেভেলে, খুলির বেসের ২ সেন্টিমিটার নীচে একটাই ছুরিকাঘাত। ক্ষতর দৈর্ঘ্য আড়াই সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ এক সেন্টিমিটার। ক্ষতর গভীরতা চোদ্দো সেন্টিমিটার। ক্ষতর প্রান্তভাগ ক্লিনকাট, আশপাশের চামড়ায় ঘর্ষণ বা আঘাতের চিহ্ন নেই। ছুরির অ্যাঙ্গল ভিকটিমের পিঠের সঙ্গে মোটামুটি ১২০ ডিগ্রি। C1-C2 ভার্টিব্রার লেভেলে স্পাইনাল কর্ড গভীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কর্টিকোস্পাইনাল, ল্যাটেরাল স্পাইনোথ্যালামিক এবং অ্যান্টিরিয়র স্পাইনোথ্যালামিক ট্র্যাক্টগুলো এই আঘাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। এর ফলে সঙ্গে সঙ্গে ভিকটিমের মোটর এবং সেন্সরি ফাংশন লুপ্ত হয়েছে। ফলত, ভিকটিমের পক্ষে হাত, পা নাড়ানো সম্ভব হয়নি। স্পাইনাল কর্ডের ভেতরেও রক্তক্ষরণ হয়েছে, যার নমুনা আশপাশের টিসুতে পাওয়া গেছে। সেকেন্ডারি ইনজুরি হিসেবে ফ্রেনিক স্নায়ুতন্ত্র বিপর্যস্ত হবার কারণে দেহে তাৎক্ষণিক প্যারালিসিস হয়েছে এবং বিকল হয়েছে শ্বাসপ্রক্রিয়া। হাইপোভেন্টিলেশন, হাইপক্সিয়া এবং ফলস্বরূপ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের কারণে মোটামুটি পাঁচ মিনিটের মধ্যে ভিকটিমের মৃত্যু হয়েছে। ভিকটিমের রক্তে মাদক, মদ এবং ঘুমের ওষুধের নমুনা পাওয়া গিয়েছে। মৃত্যুর তারিখ, ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৯৮। সম্ভাব্য সময়, দুপুর একটা থেকে তিনটের মধ্যে।

দীপক ছবি এঁকে বোঝাচ্ছিলেন। মনোযোগী ছাত্রের ভঙ্গিতে শুনছিলেন ইম্যানুয়েল। ধৈর্য হারিয়ে জাভেদ উঠে ইম্যানুয়েলের দাবার বোর্ড পরখ করলেন। কালো ঘোড়া সাদা মন্ত্রী আর সাদা নৌকাকে ফর্ক করেছে। কাকে খাবে?

‘রক্ত কি ফিনকি দিয়ে বেরিয়েছিল?’

‘না। যেভাবে উদ্ভ হয়েছে তাতে, আমাদের বসিরহাটের পরিভাষায় বলে, ভলকে রক্ত বেরিয়েছিল। গলগল করে, থেমে থেমে। কিন্তু, পুরোটা বেরোতে পারেনি। অনেকটা পরিমাণে ভেতরে কনফাইন্ড হয়ে ছিল। সেটা উন্ড এবং বডি পোজিশন, দুইয়ের কারণেই। তাই ব্লাড যত বেরোবার কথা, এক্ষেত্রে ভেসে যায়, ততটা হয়নি। যদিও ভালোই রক্ত বেরিয়েছে।’

‘তার মানে, ছুরির আঘাতে মালিনী হাত, পা নাড়াবার শক্তি প্রথমে হারালেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেলেন। তাই তো?’

‘হ্যাঁ। ঘুমের মধ্যে ঘটেছে বলে বাধা দিতে পারেননি। ডিপ স্লিপ যাকে বলে।’

‘কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন সেই এস্টিমেট দেওয়া যায়?’

‘না। পোস্ট-মর্টেমে সম্ভব নয়। তবে আমার আন্দাজ, এগারোটার পর আর ঘুম ভাঙেনি। এর সপক্ষে প্রমাণ দিতে পারব না, আমার এত বছরের অভিজ্ঞতা ধরে নিতে পারো। আচ্ছা, একটা কথা মাথায় রেখো। আমি অত্যন্ত লিবারাল এস্টিমেট দিতাম। মৃত্যুর টাইম কখন লিখেছিলাম যেন?’

‘দুপুর একটা থেকে তিনটের মধ্যে।’

দীপক মুচকি হাসলেন। ‘তাহলে দুটো সময় থেকেই অন্ততপক্ষে পনেরো মিনিট ছেঁটে দিয়ে উইন্ডো টাইট করতে পারো। আমি এত সাবধানি হতে গিয়ে কখনো টু দ্য পয়েন্ট হলাম না।

‘দুপুর ১:১৫ থেকে ২:৪৫?’

‘ধরে নেওয়া যায়। ওই সময়ে অন্যদের অ্যালিবাই কী ছিল?’

জাভেদ মাথা নাড়লেন। ‘বন্ধঘরের মধ্যে সাসপেক্টকে রেডহ্যান্ডেড মিলেছে। অন্যরা কে কোথায় ছিল, তা দিয়ে পুলিশ কেন মাথা ঘামাবে! তবু, রুটিনমাফিক জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছিল। সে তো এবারেও ইজি জিজ্ঞাসা করছে সবাইকে।’

‘শতদ্রু ছিলেন নিজের বাড়ি। দেবারতি বারাসাতে। অনুপ রুংতাকে আমরা এখনও জিজ্ঞাসাবাদ করিনি, তবে জাভেদের রিপোর্টে দেখছি তিনি জোকার এক রিসর্টে ছিলেন। আর?’ ইম্যানুয়েল জাভেদকে জিজ্ঞাসা করলেন।

‘পারমিতা সান্যাল নিজের বাড়ি। এদের মধ্যে দেবারতি আর রুংতার বাইরে থাকার সাক্ষী আছে। শতদ্রুর নেই। পারমিতার ক্ষেত্রে মেয়েরা এবং বাড়ির হেল্পিং হ্যান্ড। সেটা কতটা ডিপেন্ডেবল, জানি না। কিন্তু, তখন আমরা তাড়াতাড়ি কেস ক্লোজ করছি এই ভেবেই নিশ্চিন্ত, এসব খুঁটিনাটিকে গুরুত্ব দিইনি।’

‘এবং, সুইসাইডের তত্ত্বকেও আমল দেওয়া হয়নি।’ ইম্যানুয়েল চিন্তিতভাবে বললেন।

‘তুমি নিজেই ভেবে দেখো। কেউ ছুরি বসালে নিজের পেটে বা বুকে বসাবে। ওভাবে গলায় কেন?’

‘আর, স্ট্যাবিং ঠিক ফেমিনাইন মোডাস অপারেন্ডি নয়।’ বিড়বিড় করলেন দীপক। ‘এত বছরের পোস্ট-মর্টেমে হাতে-গোনা কেস দেখেছি যেখানে মেয়েরা ছুরি নিয়ে অ্যাটাক করেছে, বা, সুইসাইড। আত্মরক্ষার্থে ব্যবহারের ব্যাপারগুলো এর মধ্যে ধরছি না।’

‘কিন্তু তাতেও, হাতে-গোনা কিছু কেস হয়েছে তো! আর, ভিকটিম যেভাবে শুয়ে ছিল, তাতে ওই অ্যাঙ্গলে ছুরি ঢুকতে পারে। কারণ, সে ডান হাত চালিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে হাতের মুভমেন্ট হবে হয় শরীরের বাইরে থেকে ভেতরের দিকে, অথবা, শরীরের সঙ্গে নব্বই ডিগ্রি রেখে ওপর থেকে নীচে, যেহেতু ভিকটিম শুয়ে ছিল।’ ইম্যানুয়েল নিজের হাতের মুভমেন্ট দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন। কিন্তু, থেমে গেলেন। কারণ, দেখলেন জাভেদ মুচকি হাসছেন তাঁর দিকে তাকিয়ে।

‘এই ডিফেন্স অনিরুদ্ধর উকিলও সাজিয়েছিল। কিন্তু, তোমরা সবাই একটা ইম্পর্ট্যান্ট জিনিস মিস করে গেছ। কারণ, সেটা আমার রিপোর্টে লেখা ছিল না। ইউ ফুল, তোমার জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, কিন্তু করোনি। শালার দাবা খেলে খেলে তোমার বুদ্ধি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে, ইজি!’

ইম্যানুয়েল আঙুল তুলে থামতে বললেন। কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করলেন। গভীরভাবে ভাবছেন। তারপর চোখ খুলে বড়ো নিশ্বাস ফেললেন, ‘মালিনী বাঁ-হাতি ছিলেন!’

‘ঠিক। এই ইম্পর্ট্যান্ট কথাটা এতদিন পর তোমার মাথায় এল? ওই কারণেই ডিফেন্সও বালির বাঁধ হয়ে গিয়েছিল।’

‘যদিও তাতেও ডান হাতে নিজেকে স্ট্যাব করা অসম্ভব নয়, কিন্তু—’ ইম্যানুয়েল থেমে দীপকের দিকে তাকালেন।

‘ওই ফোর্সে ঢোকা অসম্ভব।’

‘আসলে, সোশ্যাল কনভেনশন।’ জাভেদ আবার হেসে গ্লাসে চুমুক দিলেন। ‘মানুষমাত্রেই আমরা ডান হাতি ভাবি।

‘তুমি এত খেয়ো না। হার্টের অবস্থা ভালো নয় কিন্তু।’

‘এই শালা থামিয়েই দেব এবার। আজকেই লাস্ট। ক-দিনই-বা বাঁচব, ইজি! মেয়েটার ভালো বিয়ে হয়েছে দু-বছর আগে। ওরা দু-জনেই ব্যাঙ্গালোরে। মাইক্রোসফটে আছে। রাবেয়া এখনও জব করছে, সামনের বছর রিটায়ারমেন্ট। তারপর আল আমিনের একটা এনজিও-তে কাজ করবে বলেছে, বর্ধমানের গ্রামের শিশুদের মধ্যে। আমি তো ব্লাডি ঝাড়া হাত-পা এমনিতেও। ইএমআই যা ছিল মিটিয়ে দিয়েছি। একটা ইন্সিয়োরেন্স চলে, ভালো টাকার। আমার কিছু হয়ে গেলে রাবেয়া পাবে। তবে হ্যাঁ, মাইরি বলছি, এটাই লাস্ট পেগ।

‘আমি পরিবার, ই.এম.আই., এসব কিছুই বুঝি না। বুঝলে ভালো হত হয়তো।’ ইম্যানুয়েল হাসলেন। রাস্তার জল ভেঙে একটা কালো মেয়ে ওপাশের অন্ধকার গলিতে ঢুকে গেল। সস্তা জরি বসানো শাড়ি পেটের অনেকটা খোলা রেখে পরা, লাল জ্যালজ্যালে ব্লাউজ আর মেয়েটার চোখে রাজ্যের ঘুম। ইম্যানুয়েলের মনে হল, নিজের ঘরে ঢুকে এই যে খিল দেবে, আর সারাজীবনে উঠবে না। ফিরোজ থেকে বিরিয়ানির গন্ধ আবার ভেসে আসছে। ইম্যানুয়েলের খিদে পাচ্ছিল। গত কয়েক দিন সুপ স্যান্ডউইচ খেয়ে জ্বরের মুখ বিস্বাদ। ইম্যানুয়েল জানালা দিয়ে হাঁক দিলেন। দু-প্লেট কিমা বিরিয়ানি আর মাটন শিককাবাব। দীপক খেতে রাজি হলেন না।

‘আমার মাপা ডায়েট। এমনকী নিমন্ত্রণ বাড়িতেও খাই না। রাস্তার খাবারের তো প্রশ্নই নেই। চেহারাটা কেমন ধরে রেখেছি, দেখেছ?’

‘আমি কেমন ধরে রেখেছি, দেখছ না?’ ইম্যানুয়েল হাসলেন। তাঁর স্ফীত শরীর পাহাড়ের মতো স্থবির। ইজিচেয়ারে যেন পাকাপাকি বাসস্থান বানিয়েছে। জাভেদ তাঁকে উঠতে দেখেননি, বিশেষ নড়াচড়াও না

‘সারাদিন বাড়ি বসে কুঁড়েমি করলে এমন হবেই। আমায় দেখো, সকাল, বিকেল নিয়ম করে হাঁটি।’ বললেন জাভেদ।

‘কুঁড়েমি কেন! বই পড়া যথেষ্ট শ্রমসাধ্য কাজ। ‘বুক অফ ইনক’ পড়ছিলাম।’ ছেঁড়া কভারের বইটা তুলে দেখালেন ইম্যানুয়েল। ‘আমার মাতামহর বালিশের কাছে এই কপিটা রাখা থাকত। তিনি মৃত্যুর সময়ে মা-কে দিয়ে গিয়েছিলেন। এতদিন পর রিভিজিট করতে মন্দ লাগল না।’

‘তাহলে আত্মহত্যার তত্ত্ব বাতিল?’ কয়েক মিনিট পর ইম্যানুয়েল আবার বললেন নিজের মনে। ‘হলে ভালো হত, জাভেদ। নাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।’

‘সেই প্রশ্নগুলোর লিস্ট বানাই এবার। এক এক করে ধরি।’

‘এখন না। আগে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হোক। দেখি, আর কিছু ইন্টারেস্টিং তথ্য আসে কি না।’

‘আমার একটা জিনিসে কেমন জানি ‘কিন্তু, কিন্তু’ লাগছে। বলব?’ দীপক বললেন।

‘নিশ্চয়। আমি তো চাইব হাতে সময় থাকলে তুমি আমাদের সঙ্গে থাকো।’ ইম্যানুয়েল বললেন।

‘কতটা সময় মিলবে জানি না। এখনও ক্রিক রো-তে প্র্যাকটিস করি। তবে, সন্ধের পর থেকে সপ্তাহে চারদিন ফ্রি। কিন্তু, রাত করতে পারব না। ছেলের কড়া নিয়ম আছে। ও তো অ্যাপোলোতে জুনিয়ার ডাক্তার এখন।’ দীপক তৃপ্তমুখে বলছিলেন।

‘তুমি বলো। তোমার ভিউজ গুরুত্বপূর্ণ।’

‘আমার যেটা মনে হচ্ছে, ইজি, জাভেদ, তোমরা এগুলোর ভেতর আছ বলে হয়তো ভেতর থেকে দেখছ, তাই বুঝছ না। আমি বাইরে থেকে আজ দেখছি বলে কথাটা বললাম— দেখো, অনিরুদ্ধর পক্ষে সব ভুলে যাওয়া আমার কষ্টকল্পনা লাগছে।’

‘কারণ, একটা খুন করার পর মানুষ ওভাবে ভোলে না, তাই তো?’

‘না, একদমই সেটা কারণ নয়। সারারাত ঘুমোননি, অত নেশা করেছেন, অতবার শারীরিক সম্পর্কের কারণে ক্লান্তি, স্ট্রেস, এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে শর্ট টার্ম মেমারি লস হয় মানুষের। হ্যাঁ, এখানে তো স্ট্রেসও ছিল, কারণ মালিনীর সঙ্গে দীর্ঘ অশান্তি চলছিল যাতে অনিরুদ্ধর বিয়েটা ভেঙে যেতে পারত, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ টেনশনে থাকে। তাই, শুধু সেটুকু হলে আমি বলতাম না যে, মেমারি লস বানানো। আমি বলছি এই কারণে, যে, মালিনীর সারাশরীর কম্বলে ঢাকা ছিল। মুখও।’

‘তাতে কী?’ ইম্যানুয়েল ভুরু কোঁচকালেন কারণ, দীপকের যুক্তিবিন্যাস ধরতে পারছিলেন না।

‘অনিরুদ্ধ কীভাবে খুন করলেন? মোটা কম্বলের ওপর দিয়ে নিশ্চয় নয়। তাঁকে কম্বল সরাতে হয়েছিল, সে মালিনী তখন জেগে থাকুন বা ঘুমিয়ে। কিন্তু, তারপর আবার ঢেকে দিলেন কেন? ঢেকে দেওয়া হয় অপরাধ লুকোতে। কিন্তু, বন্ধঘরে অন্য কার কাছ থেকে তিনি অপরাধ লুকোবেন? তাহলে একটাই ব্যাখ্যা হয়। স্ট্যাবটা করার পর অনুশোচনা অথবা ভয়, কিছু একটা অনিরুদ্ধকে আচ্ছন্ন করেছিল, যেন তিনি দেখতে চান না নিজের কৃতকর্ম। এবার, এই খুন তো প্রিমেডিটেটেড নয়। কেউ বন্ধঘরে ওভাবে খুন করে বসে থাকবে না যাতে তার ওপর দায় চাপে। তাহলে হঠাৎ রাগের মাথায় খুনটা হয়েছে ধরে নিতে হবে। অনিরুদ্ধর সেরকম হিস্ট্রিও মিলেছে শুনলাম, মালিনী যে কারণে সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ করছিলেন। কিন্তু, মালিনীকে যখন কম্বলে মোড়া হল, তখন সেই প্রবল ক্রোধের ফেজ ওভার হয়ে গেছে। তার বদলে অন্য আবেগ, ভয়, দুঃখ, অনুশোচনা, শোক, অনিরুদ্ধর মধ্যে কাজ করছে। এই যে ট্রানজিশন, রাগ থেকে অন্য ইমোশন, এটার মানে হল অনিরুদ্ধ তখন চেতনায় ফিরছেন। আর চেতনায় যদি ফিরে আসেন, তাহলে ব্রেন সাময়িক টারময়েল থেকে রিকভার করেছে বলতে হবে। এই ক্ষেত্রে মেমারি লস হওয়া কঠিন।’

‘কিন্তু, চেতনা যদি ফিরেই আসে, অনিরুদ্ধ সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন না কেন?’ জিজ্ঞাসা করলেন জাভেদ এবং ইম্যানুয়েল সমর্থনসূচক ঘাড় নাড়লেন।

দীপক থমকে গেলেন। তারপর দু-হাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তুললেন, ‘এর উত্তর আমার কাছে নেই। কোনো মনোবিদ এটা বলতে পারবেন। আমার নিজের যা মনে হয়, পুরোপুরি চেতনায় ফেরেননি। হয়তো নেশায় ছিলেন, ব্রেন তাঁকে সিগনাল দিয়েছে যে, কাজটা ঠিক হয়নি। কিন্তু, নিজেকে বাঁচাতে হবে এমন সিগনাল দিতে পারেনি। গোঁজামিল লাগছে, না? আমিও কনভিন্সড নই। কিন্তু, তাহলে আমাকে বলো, মালিনীর শরীর কম্বলে মুড়ে দেবেন কেন?’

‘আরে, মালিনীকে ভালোবাসতেন অনিরুদ্ধ। তাঁকে মৃত দেখতে চাননি।’ উত্তর দিলেন জাভেদ।

‘মানে, সেই আমার রাস্তাতেই ফিরে এলে। মালিনীর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর যন্ত্রণা দেখতে না-চাইবার কমন সেন্স তাঁর মধ্যে ছিল। সেক্ষেত্রে তিনি কি সত্যিই ভুলে যাবেন?’

‘এবং, সেই কমন সেন্স যদি থাকে, তাহলে কি তিনি সেই ঘরে তার পরেও থাকবেন?’ বললেন ইম্যানুয়েল।

‘তাহলে অন্য কেউ খুন করেছে। সেক্ষেত্রে বন্ধঘর থেকে সে বেরোল কী করে?’

‘সেজন্যই জাভেদকে বলেছিলাম, লকড রুম মার্ডারের একটা ভ্যারিয়েশন আমরা দেখছি এখানে। আমার আরেকটা খটকার জায়গা হল জানালা। অনিরুদ্ধ তাঁর বয়ানে বলেছিলেন, জানালা বন্ধ। দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে বন্ধ জানালা দেখা গেছে। তাহলে তিনি ‘শনিবারের বারবেলা’ শুনলেন কোথা থেকে? পুরোনো দিনের মোটা দেওয়াল। ভারী কাঠের জানালা। বন্ধ রাখলে বাইরে থেকে রেডিয়োর ক্ষীণ আওয়াজ আসবে না। তাহলে মাঝে জানালা খোলা হয়েছিল কি? কে খুলবে? আর, খুললে বন্ধ কেন করা হল? কখন? এগুলোর উত্তর আমরা জানি না।’

তিনজন নিজেদের ভাবনায় কিছুটা সময় চুপ করে থাকলেন। বিরিয়ানি এল। উঠে পড়লেন দীপক। ‘আমায় একবার ঠাকুরপুকুর যেতে হবে। পনেরো মিনিটের মামলা। জাভেদ, ওখান থেকে ফেরার পথে তোমায় তুলে নিয়ে যাব।’ দরজার কাছে গিয়ে দীপক ফিরলেন। ‘আমি সমাধান ভাবছি, ইজি। হয়তো পাব না। কারণ, মানুষের মন বিচিত্র নিয়মে চলে, কোনো প্যাটার্নে তাকে পুরোটা বেঁধে ফেলা সম্ভব নয়। অনিরুদ্ধ কী ভেবে ওই কাজ করেছিলেন, হয়তো কিছুই ভেবে করেননি, র‍্যান্ডম অ্যাক্ট, এমনও হতে পারে। তবে, তুমি যদি অন্য সমাধান পাও, আমি শুনতে আগ্রহী।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *