হামারটিয়া – ৬

দোতলার জানালাবন্ধ ঘরের ভেতর ঢুকলে প্রথমেই ওষুধের গন্ধ নাকে লাগে। একপাশের টেবিলে জড়ো করা রাজ্যের মেডিসিন, ট্যাবলেটের খালি স্ট্রিপ। একটা ওয়াকার বিছানার পাশে রাখা। মৃদু ডিমলাইটের আলো-ছায়ায় ঢাকা ঘর। টিভিতে উইম্বলডন ম্যাচ চলছে। বিছানায় আধশোয়া এক দীর্ঘাকৃতি মহিলা, তাঁর কোমরের নীচ থেকে চাদরে ঢাকা। মাথায় ঠাসবুনট সাদা চুল, চৌকো গড়নের মুখে দৃঢ় চিবুক, চোখের দৃষ্টি ধারালো। জাভেদদের দিকে তাকিয়ে টিভির সাউন্ড মিউট করলেন।

‘এই এঁরা— মানে, এঁদের কথা বলেছিলাম তোমায়। ফোন করেছিলেন।’ সাম্য বলল।

‘মাম্পির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন। জানি।’ দেবারতির গলার স্বর কফবসা। ‘ওঁদের মাস্ক দে। কিছু মনে করবেন না, দু-মাস আগে একটা বাজে নিউমোনিয়া থেকে উঠেছি। আপনারা দূরে বসুন।’

‘আমি যাই তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করল সাম্য।

‘কেন যাবি? বোস এখানে।’ পাশের চেয়ারে ইঙ্গিত করলেন দেবারতি। ‘সবসময় পালিয়ে বেড়ালে হবে? বয়েস তো কম হল না!’ সাম্য জড়োসড়ো হয়ে চেয়ারে বসল। দেবারতি আঙুল তুললেন, ‘তোকে কতবার বলেছি, বাথরুমের কলটার মিস্তিরি ডাক। এত কীসের কাজ তোর যে সময় হয় না? না-পারলে তোর বাবাকে বল। যদি সহদেব মিস্ত্রির সময় না হয়, আমার ফোনবুক খুলে দেখ, ফিরোজ বলে একজনের নম্বর আছে। কালকের মধ্যে সারাতে হবে। আমি বালতিতে জল তুলে তুলে কাজ চালাতে আর পারব না।’

‘কাল আসবে বলেছে, সহদেব।’ সাম্য মাথা নীচু করল।

‘কাল মানে কালই। আর একদিনও যেন দেরি না হয়।’ কঠিন গলায় কথাগুলো বলে দেবারতি জাভেদের দিকে ফিরলেন। ‘আপনারা এতদিন পরে আবার এ বিষয়ে নাড়াঘাঁটা করছেন কেন?’

দেবারতিকে আসার উদ্দেশ্য জানালেন ইম্যানুয়েল। দেবারতি মুখ দিয়ে তাচ্ছিল্যের আওয়াজ বের করলেন, ‘মৃত মানুষ নিয়ে আপনাদের এত চিন্তা! ভালো। পুলিশকে মানবিক দেখলে খারাপ লাগে না। তবে, আমার আর কিছু এসে যায় না। অনেকদিন হয়ে গেছে। মাম্পি আমার মেয়ে ছিল, কিন্তু সৰ্বস্ব নয়। তার বাইরেও আমার কাজ, পড়াশোনা ছিল। সেগুলোই আমায় বাঁচিয়েছে। সে চলে যাবার পর আমি আঘাত পেয়েছিলাম ভয়াবহ। স্ট্রোক হয়েছিল একটা, শুনেছেন হয়তো। কিন্তু, সামলে উঠেছি নিজে। তারপর থেকে এই সমস্ত ঘটনাকে বাইরের মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছি। কাজেই, আপনারা সংকোচ না-করে খোলাখুলি যা জিজ্ঞাসা করার করবেন। এবং, দ্রুত করবেন। এই সেটটা ইন্টারেস্টিং হচ্ছে।’ টিভির পর্দায় চোখ রেখে কথাগুলো বললেন দেবারতি। আবার মাথা ঘোরালেন, ‘ইম্যানুয়েল ইহুদি এবং ক্রিশ্চান, দুটো নামই হয়। আমার স্বামীর এক পেশেন্ট ছিলেন, আস্কেনাজি ইহুদি। ১৯৩৭ সালে হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে কলকাতায় পালিয়ে এসেছিলেন। মোজেস ইম্যানুয়েল সাদকা। পরে সম্পর্কটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে চলে আসে। আলু মাকালা বানিয়ে আনতেন আমাদের জন্য। ১৯৯০ সালে ইরাকে এজরা হাসোপফারের সমাধিস্থানে তীর্থ করতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। উপসাগরীয় যুদ্ধের বলি। কিছু মনে করবেন না। পুরোনো কথা হুড়মুড় করে চলে আসে মাথায়, এই বয়েসে প্রিসিশন কমে যায়। আপনি বাঙালি ক্রিশ্চান, না, বাঙালি ইহুদি?’

‘বাবা বাঙালি, মায়ের পূর্বপুরুষ আলেপ্পো থেকে এসেছিলেন।

‘বেশ। আপনাদের দেখলে বোঝা যায়, শহরটায় মাল্টিকালচার একসময়ে ছিল। এখন তো ফুল অফ স্কাম। যাই হোক। বলুন কী বলবেন।’

‘এই যে ঘটনাটা, মানে, আপনার মেয়ের ব্যাপারটা, সেদিন তো আপনি শহরের বাইরে ছিলেন।’ জাভেদ বললেন।

‘বারাসাত কলেজে।

‘সেদিন কী হয়েছিল, যদি সংক্ষেপে বলেন।’

‘কলেজ থেকে কিছুদূরে, তখন জায়গাগুলো গ্রামের মতো ছিল, দুটো বড়ো ফার্মহাউসে গেস্টদের রাখা হয়েছিল। সাড়ে তিনদিনের সিম্পোজিয়াম, রাজ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলাররা এসেছিল। শুক্রবার গোটা দিন আর শনিবারের ফার্স্ট সেশন অ্যাটেন্ড করেছিলাম। বেলা এগারোটায় ফার্মহাউসে ফিরে আসি। কারণ, পরদিন আমার দেড়ঘণ্টার ইনভাইটেড টক ছিল। সেটা বানাচ্ছিলাম নিজের ঘরে বসে। একটা পেপারের ডেডলাইনও ছিল। বিকেল বেলা, ধরুন পাঁচটা নাগাদ, কলেজের প্রিন্সিপালের অফিসে লোকাল থানা থেকে লোক আসে। ওদের ভবানীপুর থানা থেকে ইন্টিমেট করেছিল। ওরা আমার সঙ্গে শতদ্রুর কথা বলায়। তার পনেরো মিনিটের মধ্যে আমি বেরিয়ে পড়ি। আমায় ছাত্ররা একা ছাড়েনি, দু-জন এসেছিল সঙ্গে। রাস্তায় জ্যাম ছিল, সন্ধে সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছিল ফিরতে। তবে, মাম্পিকে আমি শেষ দেখা দেখতে যাইনি। শতদ্রু বলেছিল যেতে, পুলিশও। আমি যাইনি।’

‘কেন?’ দেবারতি উত্তর না-দিয়ে টিভি দেখতে থাকলেন।

‘আপনার সঙ্গে আপনার মেয়ের সম্পর্ক কেমন ছিল?’ কয়েক মুহূর্ত পর জিজ্ঞাসা করলেন ইম্যানুয়েল।

‘আমি চেয়েছিলাম মাম্পি রিসার্চ লাইনে আসুক। সেই মেধা তার ছিল। কিন্তু, ও চেয়েছিল তাড়াতাড়ি টাকা রোজগারের পথে যেতে। ইঞ্জিনিয়ারিংকে আমি বা ওর বাবা সম্মানজনক ফিল্ড বলে মনে করিনি। তবে, ওর ইচ্ছেতে বাধা দিইনি। একটাই ভালো কাজ হয়তো সারাজীবনে করেছিল। শতদ্রুকে বিয়ে করা। চরিত্রবান, বিনয়ী, অনুগত। আমার সেরা ছাত্র ছিল কি? কখনোই নয়। কিন্তু পরিশ্রমী ছিল, সৎ ছিল। নিজের সীমিত ক্ষমতায় যতদূর এগোনো সম্ভব, গিয়েছিল। মাম্পির মেধা ওর থেকে বেশি ছিল ঠিকই, কিন্তু উদ্ধত আর খামখেয়ালি স্বভাবের জন্য ও একটা মোটা মাইনের চাকরির বেশি এগোতে পারবে না জীবনে, আমি জানতাম। আমি কখনো ওর জীবনযাত্রা পছন্দ করিনি। কিন্তু, ছেলেমেয়ে বড়ো হলে একটা পর্যায়ের পর ইন্টারফেয়ার করা যায় না বলে চুপ থেকেছি। আমাদের সম্পর্কও কোল্ড হয়েছে। কেন, আপনারা জানেন সবই। পরে বুঝেছি, আমি ভুল করেছিলাম। বিয়েটা না হলে শতদ্রুর জীবন এভাবে নষ্ট হত না। মাম্পি শতদ্রুকে ডিজার্ভ করত না।’

ইম্যানুয়েল লক্ষ করলেন সাম্য উলটোদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে। কাঠ ভঙ্গি। ওকে ইচ্ছে করে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য দেবারতি কথাগুলো বলছেন কি না, বুঝলেন না।

‘কিন্তু, মালিনীর প্রোমোশন নেওয়া তো আপনিই আটকেছিলেন। মেয়ের ইচ্ছেতে বাধা না-দিলে এটা কেন হল?’

‘আমি আপত্তি করেছিলাম শতদ্রু আর পাপানের মুখ চেয়ে। ওদের কী হত তাহলে? একটা মেয়ে কেন একফোটাও কম্প্রোমাইজ করবে না? কলকাতায় থেকে কি আমাদের কেরিয়ার হয়নি? আমিও তো সারাজীবন কাজই করেছি।’

‘অনিরুদ্ধ সান্যালকে নিয়ে আপনাদের মতবিরোধ হয়েছিল—’

‘হয়েছিল। আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ওর উচিত ছিল সংসারের দিকে তাকানো। ছেলের মুখ চেয়ে বিয়েটা টিকিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর আমি মনে করি, আমি ঠিক ছিলাম। কিন্তু, মাম্পি আমায় মুখের ওপর বলে দিয়েছিল যে, অনিরুদ্ধই ওর ডেস্টিনি। আমি বলেছিলাম, সেটা হলে আমার মৃতদেহের ওপর দিয়ে হবে। মাম্পি তাতে হেসেছিল, উত্তর দেয়নি।’

‘আমি আসি।’ সাম্য মাথা নীচু করে উঠে দাঁড়াল।

‘কোথাও যাবে না তুমি। এখানে বসে থাকবে। তোমারও শোনা উচিত। আমি কখনো মনে করি না বাচ্চাদের আতুপুতু করে বড়ো করতে হবে। তারাও সত্যের মুখোমুখি হোক। আর, তোমারও যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। অ্যানালিটিক্যালি দেখতে শেখো সব কিছু।’ সাম্য আবার বসল, কিন্তু চোখে চোখ রাখতে পারছে না। দুটো আঙুল অস্থিরভাবে মোচড়াচ্ছে। ‘তোমার তো তিরিশ পেরিয়েছে অনেকদিন হয়ে গেল। গ্রো ইয়োর স্পাইন নাউ।’ ইম্যানুয়েল বুঝলেন, সাম্যর নিশ্বাস দ্রুত হল। কপালে ঘামের ফোঁটা। টিভিতে নিঃশব্দে একটা গেম শেষ হল। দু-পক্ষ সমানে লড়ছে।

‘অনিরুদ্ধকে আপনি দেখেছেন কখনো?’

‘একবার। মাম্পি বাড়িতে এনেছিল।’

‘কেমন লেগেছে?’

‘আপনারা যাকে বলেন স্ট্রিট স্মার্ট। চোখা উত্তর দেয়, প্রচুর হাসে, দামি জামাকাপড় পরে। আফটারশেভের গন্ধে ঘর ভরে থাকে। কিন্তু, ভেতরে কিছু নেই। শুনেছি, ওদের হাওড়ার ব্যবসায়ী ফ্যামিলি। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমার হবি কী। বলেছিল, টেনিস খেলা। আমি জাজ করছি না। কিন্তু, আমার সঙ্গে খাপ খেত না। যদিও আমি খাপ খাওয়াবারই-বা কে! তবে, মাম্পি যে এই ছেলের সঙ্গে ভালো থাকবে না, আমি বলেছিলাম ওকে। কোথায় আমাদের পরিবার, আর কোথায়— যাকগে। তবে, ওর স্ত্রী পারমিতা আমার বোনের কলেজের ছাত্র। আমার বোন মারা গেছে, ব্রেবোর্নে অঙ্কের অধ্যাপিকা ছিল। শুনেছি, চমৎকার মেয়ে। যেমন ব্যবহার, তেমন স্বভাবচরিত্র।’

‘কিছু মনে করবেন না, আমার অবাক লাগছে, মালিনী তো আপনার মেয়ে ছিলেন। এতদিন পরেও আপনি এত বিরাগ পুষে রেখেছেন তার সম্বন্ধে?’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকলেন দেবারতি। একটা সেট শেষ হয়ে বিজ্ঞাপন বিরতি। সাম্যকে ইশারায় জলের কথা বললেন। গ্লাস রেখে মুখ মোছার পর কোমল হল তাঁর স্বর। ‘আমার স্ট্রোকটা তো মিথ্যে ছিল না, মিস্টার ডিটেকটিভ! মাম্পি খবর শুনে আমি চোখে অন্ধকার দেখেছিলাম। কিন্তু, আমি কী করতাম? ওই শোকে সাকাম্ব করে যেতাম? তাহলে তো বাঁচতাম না। দিনে দিনে আমায় কঠিন হতে হয়েছে। মাম্পি নামক ধারণার থেকে দূরত্ব বাড়াতে হয়েছে আমাকে, যাতে তার প্রতি আমি নরম না-হই। তাহলেই আমি ভেঙে পড়ব। কাজটা সহজ ছিল না, কিন্তু কঠিনও নয়। যখন আমার মন ভিজে এসেছে, তখনই নিজেকে মনে করিয়েছি, কীভাবে তাকে আবিষ্কার করা হয়েছিল।’

‘প্লিজ।’ সাম্য উঠে দাঁড়াল আবার। তার মুখ যন্ত্রণাদীর্ণ। দেবারতি এবার প্রতিবাদ করলেন না।

ইম্যানুয়েলও উঠে দাঁড়ালেন। ‘আর বিরক্ত করব না। যেটা জানার ছিল, আপনি হয়তো ঘরটা বাইরে থেকে দেখেছেন, কারণ, পুলিশ সিল করে দিয়েছিল।’

‘হ্যাঁ। আমাদের তখন এভিডেন্স কালেকশন কমপ্লিট হয়েছে। ফটোগ্রাফার ছবি তুলে বেরিয়ে গেছেন। আমার ডায়েরি বলছে, রাত সাড়ে সাতটায় ঘর সিল করি।’ উত্তর দিলেন জাভেদ।

‘আমি এসে সিল করা ঘর দেখেছি। তবে, দরজার কবজা ভেঙে ফেলেছিল। ভেতরে আলো নেভাতে ভুলে গিয়েছিল পুলিশ। ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম, মেঝেতে রক্ত।’ চোখ বুজলেন দেবারতি। ‘আর, অনেক মাছি। কয়েক সেকেন্ডের বেশি দাঁড়াইনি। নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েছিলাম। অনেকে দেখা করতে এসেছিল। আমি ঘরের বাইরে বেরোইনি।’

‘শতদ্রুর সঙ্গে সেদিন দেখা হয়নি?’

‘ও থানায় ছিল। পাপান বেলতলার বাড়িতে। শতদ্রু আমায় ফোন করেছিল থানা থেকে, পাপানকে কী করা হবে জিজ্ঞাসা করছিল। আমি বলেছিলাম কয়েক দিনের জন্য শহরের বাইরে পাঠিয়ে দিক।’

‘কিছু কি অস্বাভাবিক চোখে পড়েছিল আপনার?’

‘আমার মেয়ে খুন হয়েছে, এর থেকে বেশি অস্বাভাবিক কিছু কি আছে, মিস্টার ডিটেকটিভ?’ ফ্যাসফ্যাসে গলায় দেবারতি বললেন। মাথা নীচু করলেন ইম্যানুয়েল। জাভেদ উঠে দাঁড়ালেন। ‘আমি বাইরের ঘরে বসছি। বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকলে ব্রিদিং প্রবলেম হয়।’

ঘরে ইম্যানুয়েল আর দেবারতি মুখোমুখি। কিন্তু, দেবারতি ইম্যানুয়েলের দিকে তাকাচ্ছেন না। টিভির পর্দায় চোখ, তবু ইম্যানুয়েলের মনে হল তাঁর দৃষ্টি শূন্য। বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার পর দেবারতি বললেন, ‘মাম্পির ইনসমনিয়া ছিল। রাতে ঘুম আসত না। নীচ থেকে বুঝতাম, রাত জেগে ঘরের ভেতর পায়চারি করছে বা গান শুনছে টেপরেকর্ডারে। সেদিনই ওকে ঘুমিয়ে পড়তে হল?’

‘জেগে থাকলেও তো হতে পারত।’

‘পোস্ট-মর্টেমে বলেছিল, ঘুমের মধ্যে ঘটেছে। কেন সেদিন ঘুমের ওষুধটা খেতে হল ওকে! সাধারণত খেত না, খুব দরকার না-পড়লে। আমার বা ওর বাবারও কখনো দরকার পড়েনি। কখনো হয়তো পর পর কয়েক রাত ঘুমোতে পারছে না, শতদ্রুর সঙ্গে অশান্তির সময়ে বেড়েছিল এটা, তখন ন-মাসে ছ-মাসে একবার হয়তো খেল। যদি সেদিন না-খেত, হয়তো বাধা দিতে পারত।’ কয়েক মুহূর্ত থেমে যোগ করলেন, ‘খুনিকে বাধা দিতে পারত।’

‘মালিনী আর কিছু ওষুধ খেতেন?’

‘মাইগ্রেন ছিল ওর। ব্যথা বাড়লে ওষুধ খেত। আর, ছোটোবেলা থেকে ওর বোন উইক। ক্যালশিয়াম ডেফিশিয়েন্ট। তার জন্য একটা ট্যাবলেট নিয়মিত খেতে হত। শেষের দিকে আরেকটা খেত, মাইন্ড কোলেস্টেরল ধরা পড়েছিল। প্রতিদিন রাতে একটা ট্যাবলেট।’

‘আচ্ছা, বাড়ির মেইন দরজা, মানে, আমি যা দেখলাম, দরজার বাইরে কোলাপসিবল গেট— এই সিস্টেমই তো তখনও ছিল, তাই না? তো, দরজা আর গেট খোলা ছিল কেন? আপনার মনে হয়নি কখনো?’

‘বাড়ির দু-সেট চাবি। একসেট আমার কাছে থাকত, আর একসেট মাম্পির কাছে। আমার চাবিগোছা আমার ব্যাগে ছিল। দরজা খুললে মাম্পি খুলেছে।’ দেবারতি টিভির দিকে তাকিয়ে জবাব দিলেন। ‘কেন, জানি না।’ ইম্যানুয়েল দেখলেন, তাঁর গলার ঝুলঝুলে চামড়ায় একটা মাংসপেশি কাটা ব্যাঙের মতো লাফিয়ে উঠছে।

‘বাইরের দরজা খুলে নিজের ঘরে ছিটকিনি লাগাবেন, এতটা ক্যালাস কি আপনার মেয়ে ছিলেন, মিস অধিকারী?’ ইম্যানুয়েল মৃদু গলায় প্রশ্ন করলেন। চোখ বুজলেন দেবারতি। কয়েকটা মুহূর্ত, নীরব এবং নিশ্ছিদ্র।

দেবারতি যখন চোখ মেললেন, তাঁর দৃষ্টি ক্লান্ত। ‘আমি ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম, ইম্যানুয়েল। আমি তো শুধু চেষ্টাই করতে পারতাম। আমি বুঝতে পারছিলাম, এত রেকলেস যাপন মাম্পির বিপদ ঘনিয়ে আনছে। কিন্তু, ভাবতে পারিনি সেটা এতদূর যাবে। আমার দায় ছিল, সেটা নিজের কাছে অস্বীকার করি না। আপনার কি মনে হয়, আমি পাথর? মাম্পির জন্য আমার কষ্ট হয় না? নিজেকে অপরাধী লাগে না? ব্লাড ইজ থিকার দ্যান ওয়াটার। সেটা এই পৃথিবীর পুরুষেরা কখনো বুঝবে না। আমি ক্লান্ত। আরও কি প্রশ্ন আছে আপনার?’

‘শেষ দুটো অনুরোধ আছে। মালিনীর ঘরটা একবার দেখতে চাই। আর, আপনাদের ছাদটাও।’

দেবারতি মাথা নাড়লেন। ‘পাপান নিয়ে যাবে। যাবার আগে ঘরের দরজা ভেজিয়ে যাবেন।’ টিভিতে সাউন্ড ফিরে এল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *