সুফি সাধক শিতালং শাহ – সৈয়দ মোস্তফা কামাল
হযরত শাহ সুফি শিতালং শাহ্’র প্রকৃত নাম মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ। শিতালং তাঁর ফকিরী নাম। আল্লাহপাকের অপার মেহেরবাণীতে তিনি কঠোর সাধনার মাধ্যমে ইলমে মারেফাতের উচ্চতর মোকামে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ পাকের মাঝে পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবন পথের পরিসমাপ্তি। মন আর মগজ এক সময়ে একই বিন্দুতে এসে বৃত্তপরিভ্রমণের জবনিকা টানলো। আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে শ্রেষ্ঠতম নবীর পূর্ণতম অনুসারী হিসেবে যতটুকু বা যা কিছু হওয়া সম্ভব তিনি তাই হয়ে ছিলেন।
শিতালং শাহ্ ছিলেন পরিপূর্ণভাবে শরিয়তের পাবন্দ। তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত এবং মানব জীবনের উদ্দেশ্য ও পরিণতির ভেদ রহস্য উদ্ঘাটনই তাঁর রচিত গানের মূল বিষয়বস্তু।
মাবুদের দরবারে হৃদয়ের আর্তি জ্ঞাপন এবং উম্মি বা সাধারণ লোকদেরে ইসলামের সুমহান বাণী সহজ সরল ভাষায় প্রচারই ছিল তাঁর কালাম বা সঙ্গীত রচনার প্রতিপাদ্য বিষয়। গানগুলো ‘রাগ শিতালঙ্গি’ হিসেবে এক সময়ে কাছাড় ও সিলেট (অঞ্চলে) বিভাগে মশহুর ছিল।
তিনি স্রেফ খেয়ালের খেলায় গান রচনা করেননি। মানুষকে উন্নত মানব জীবনে নিয়ে যাওয়া এবং আখিরাতে নাযাত লাভই ছিল তাঁর সঙ্গীত রচনা ও জিন্দেগির মিশন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন কামেল ওলি। কোন ধরনের দুনিয়ার লাভ-লোভ মোহ-মায়া তাঁকে কব্জা করতে পারেনি। মানব জীবনকে তিনি স্রেফ মুসাফির খানা হিসেবে গণ্য করেই জিন্দেগি যাপন করেছেন।
মহান আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে কি কি গুণাবলী এনায়েত করেছেন, এ গুলোর সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করাই ইলমে তাসাউফের মূল লক্ষ্য। কারণ পাত্রের বা ভাণ্ডের দাম নির্ণয় হয় পাত্রের ভিতরের দ্রব্য সামগ্রী দ্বারা। যে ভাবে ঘরের মর্যাদা নিরূপণ করা হয় গৃহকর্তার মান মর্যাদা ও প্রজ্ঞা পাণ্ডিত্যের মূল্যায়নের মানদণ্ডে।
রাব্বুল আলামীন আল্লাহপাক মানুষের ‘ক্বলব’কে ইলমে মারেফাতের ঘর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এতে মাটির মানুষের মর্যাদাই বৃদ্ধি পেয়েছে আল্লাহপাকের অপার মেহেরবানিতে। তাই মানুষ আশ্রাফুল মাখলুকাত।
মানুষের প্রত্যাবর্তন আর গন্তব্যস্থান হিসেবে মহান আল্লাহ পাক অন্য একটি ঘরও নির্দিষ্ট রেখেছেন। যার নাম আখিরাত। সে গৃহের পরিচয় মানুষের সীমিত জ্ঞানের বোধ বুধির বাইরে। অথচ দুনিয়া আখিরাতের খেত স্বরূপ। এখানে যে প্রকারের চাষাবাদ করা হবে আখিরাতে সেভাবেই ফসল পাওয়া যাবে। রূপক হিসেবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গানে এ কথার তাৎপর্যময় ইশারা রয়েছে।
‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি এবার মনের মাঠে
ফললে ফসল বেচবো তারে কিয়ামতের হাটে।
পাওনাদার এই যে জমির খাজনা দিয়ে সেই নবীজির
বেহেশতের তালুক কিনে বসবো সোনার খাটে।’
আর রামপ্রসাদী গানে আছে :
‘মন তুমি কৃষি কাজ জাননা—
এমন মানব জমিন রইল পতিত
আবাদ করলে ফলতো সোনা।’
মোমেন বান্দাহ্র দুনিয়ার জিন্দেগি সম্পর্কে আল কোরআনে ইর্শাদ হয়েছে :
‘ধরার জীবন করেছি শোভন কাফিরগণের তরে
তাইতো তাহারা মোমিন দিগকে সদা পরিহাস করে।
মোত্তাকিগণ পাইবে কিন্তু আখিরাতে সম্মান
আল্লাহ যারে চান হিসাব ছাড়াই করেন জীবিকা দান।’
[ আল কোরআন : সুরা বাকারাহ : ২১২]
সুফি সাধক শিতালং শাহ-র বৃটিশ ভারতের সাবেক সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার বদরপুর থানার [বর্তমানে ভারতের অংশ] শ্রীগৌরী পরগনার ‘শিলচর’ গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জাঁহাবক্স এবং মাতার নাম সুরত জান বিবি। শিতালং শাহ’র প্রকৃত নাম মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ।
জনশ্রুতি মোতাবেক জাঁহাবক্স ছিলেন ঢাকার নবাব বংশের লোক। বাণিজ্য উপলক্ষে তিনি এ অঞ্চলে আসেন। নৌকা ডুবিতে তাঁর সমস্ত তেজারতের মালামাল পানিতে ডুবে যাওয়ার ফলে তিনি এখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন জমিদার মীর মাহমুদের বাড়িতে। মীর মাহমুদ তাঁর গুণে মুগ্ধ হয়ে তার কন্যা সুরত জানের বিয়ে দিয়ে তারিণীপুর গ্রামে বেশ কিছু ভূসম্পত্তি মেয়ে জামাইকে খরিদ করে দেন। জাঁহাবক্স বসতি স্থাপন করেন তারিণীপুরে। তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের অধঃস্থন পুরুষগণ আজও সেখানে বসবাস করছেন।
শিতালং শাহ’র লেখাপড়া শুরু হয় তারিণীপুর মক্তবে। পরে ফুলবাড়ি (গোলাপগঞ্জ থানা) মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় উস্তাদ ও মুর্শিদ রূপে সাহচর্য লাভ করেন শাহ সুফি আব্দুল ওহয়াব (রঃ) এবং আব্দুল কাহির (রঃ)’র। এখানে তিনি দ্বিনি ইলিম হাসিল করার সাথে সাথে আধ্যাত্মিক শিক্ষার তালিমও গ্রহণ করেন কামেল মুর্শিদের কাছে। এক পর্যায়ে মুর্শিদের নির্দেশ মোতাবেক শিতালং শাহ ভুবন পাহাড়ে নির্জন সাধনায় জীবন যাপনের জন্যে গমন করেন। কেটে যায় অনেক বৎসর।
এদিকে প্রাণপ্রিয় পুত্রের বিরহে মাতা ব্যাকুল হয়ে চার জন লোককে পাঠালেন ফুলবাড়িতে আব্দুল ওহয়াব চৌধুরী (রঃ)’র কাছে। জানতে চাইলেন, মায়ের অনুমতি ব্যতীত কেন তার ছেলেকে নির্জন পাহাড়ে পাঠানো হয়েছে। প্রিয় শিষ্যের মায়ের জিজ্ঞাসার জবাবে মুর্শিদ বললেন, ‘আপনারা চলে যান। শিতালং’র আম্মাকে বলবেন, তার পুত্র আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই তার মায়ের খেদমতে হাজির হবে ইনশাআল্লাহ।
ছেলের আসার খবর শুনে মা খুশি হয়ে নানারূপ পিঠা, পুলি, দুধের সর, জমা করে শিকায় তুলে রাখতে লাগলেন। এক রাতে শিতালং বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় এসে, ‘মাই গো তুমি কই’ বলে ডাক দেন। মা বের হয়েই বাঘ দেখে ভয় পেয়ে যান। তখন শিতালং মাকে বললেন, ‘ভয় করনা মা’ এরা আমার পোষা কুকুরের মতো। ‘শিকায় রাখা পিঠাগুলো নিয়ে আস, আর খুশি মনে আল্লাহর রাস্তায় আমাকে বিদায় দাও, তা না হলে কিছুই হাসিল হবে না মা, মা খাবার দিলে, কিছু খেয়ে শিতালং মাকে খুশি করলেন এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদায় দিতে অনুরোধ করলেন মাকে। তাঁর মা, ‘আল্লাহর হাওলা’ বলার সাথে সাথেই বাঘ তাঁকে নিয়ে জঙ্গলে চলে যায়।
এরপর দীর্ঘদিন আর কেউ তাঁর খোঁজ পায়নি। দীর্ঘ এগারো বছর পর লাউড়ের পাহাড়ের পাদদেশে শাহ আরফিনের মাজারের পার্শ্বে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় এক পোনামাছ শিকারী তাঁকে দেখতে পেয়ে তাঁর নিকট গমন করে। কিন্তু কোন কিছু না বলে বাড়ি চলে যায়। পরদিন এক ঘটি গরম দুধ নিয়ে আবার পূর্বস্থানে চলে আসে কিন্তু তিনি চোখ না খোলায় লোকটি কথা বলতে সাহস পায়নি বলে দূরে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। এক সময় তিনি ধ্যান ভেঙ্গে ওজু করে নামাজ আদায় করতে লাগলেন। লোকটি এ সময় তাঁর কাছে এসে দাঁড়ায়। নামাজ শেষে তিনি তাঁকে চলে যেতে বলেন, লোকটি তাঁকে দুধটুকু পান করার অনুরোধ জানালে, তিনি তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে দুধপান করেন। পরদিন নিদ্দিষ্ট সময়ে আবার লোকটি দুধ নিয়ে তাঁর কাছে হাজির হয়। সে দিন তিনি তার সঙ্গে কথা বলেন। কথা প্রসঙ্গে লোকটি তাঁর নাম জানতে চাইলে জবাব দিলেন, ‘শিতালং’। বাড়ি? কাছাড়। এ সংবাদ লোক মুখে প্রচার হলে, তাঁর কাছে আস্তে আস্তে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়।
একদিন সবার অগোচরে তিনি সে স্থানত্যাগ করে দেশের দিকে রওয়ানা হন। বহুবিধ কারামত প্রদর্শন করে, এক সময় কাঠিগড়ার জমিদার আব্দুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে উঠেন। আব্দুর রহমান চৌধুরী নিঃসন্তান নানার সম্পত্তির মালিক ছিলেন। আব্দুর রহমান চৌধুরীর কোন সন্তান বাঁচত না। এজন্যে তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত ছিলেন। একদিন তার জনৈক বন্ধুকে আক্ষেপ করে সন্তান মরার খবর জানাচ্ছিলেন আর ফকির শিতালং দূরে বসে তা শুনছিলেন। রাতে ধ্যানমগ্ন হয়ে তিনি জানতে পারেন যে, চৌধুরী বাড়ির ঈশান কোনে কিছু গুপ্ত সম্পদ লুক্কায়িত রয়েছে এবং জ্বীনের আছর থাকার কারণে চৌধুরী বংশের সন্তান মরে যায়। পরদিন শিতালং শাহ একটি লাঠি দিয়ে বাড়ির ঐ অংশের কিছু স্থান চিহ্নিত করে বললেন, ‘ঐ স্থান ঘেরা দিয়ে রাখ। এখানে কেউ কখনো আসবে না।’ নির্দেশমত আব্দুর রহমান চৌধুরী ঐ স্থান পাকা দেয়াল দিয়ে বেষ্টনী করে রাখেন। এরপর থেকে চৌধুরী বংশের সন্তানাদি বাঁচতে থাকে। আব্দুর রহমান চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান শেষে শিতালং ছন্নছাড়া অবস্থায় কিছু দিন দেওরাইল, মাখল, বদরপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ঘুরাফিরা করেন। এ সময়ে তাঁর মুর্শিদ থেকে সংসার-ধর্মপালন ও ধর্ম প্রচারের নির্দেশ আসে। ফলে তিনি বদরপুরের গড়কাপন মৌজার মাজু মিয়ার বোনকে বিয়ে করে সাংসারিক জীবন শুরু করেন। ধীরে ধীরে শিতালং শাহ’র জ্ঞান, চরিত্র মাধুর্য্য, কারামত দেখে অনেক লোক তাঁর কাছে মুরিদ হতে থাকে। মুরিদগণ তাঁর বাড়িঘর তৈরি করে জায়গা জমি দান করতে উৎসুক থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করতে তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। পরে সুরমা কুশিয়ারা নদীর সঙ্গম স্থলের পার্শ্বে অবস্থিত গাইবি দীঘির পশ্চিমের গ্রামে তাঁর বিশেষ প্রিয় মুরিদ গনিপুরের নজর মোহাম্মদ চৌধুরীর অনুরোধে খিত্তে তাশীর চকে একটি বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। এ বাড়িতেই তাঁর তিন ছেলে ইদ্রিছ আলী, মন্তাজ আলী ও মদরিছ আলী জন্ম হয়। মেয়ে সায়েরা, সিতারা ও জাবেরা বিবিদের জন্ম এখানেই। তাঁর ছোট ছেলে মদরিছ আলীর তিন ছেলে (১) মরহুম মাহমুদ আলী (২) মরহুম আহমদ আলী ও ৩) মরহুম মৌলানা তৈয়বুর রহমান।
শিতালং শাহ সম্বন্ধে অনেক অলৌকিক কাহিনী এতদঞ্চলের লোকমুখে শোনা যায়। এক রাতে তিনি হুজরার বাইরে বসে হুক্কা টানছেন, এমন সময় হুক্কার নইচা ঘুরিয়ে ‘দুর দুর’ করে কি যেন তাড়াতে লাগলেন। মুরিদগণ কারণ জিজ্ঞেস করলে জানতে পারেন, জাব্দার হাওর (যা বারঠাকুরী গ্রামের উত্তর পূর্বে এবং শিতালং শাহ সাহেবের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক পূর্বে সুরমা গাঙ্গেরপুর পাড়ে, (বর্তমানে হিন্দুস্থানে) মহিষের বাথানে বাঘের আক্রমণে মহিষ গুলো ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে দেখে তিনি বাঘটিকে সেখানে থেকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছেন। পরদিন হাওরে খবর নিয়ে বাঘের পায়ের ছাপ এবং মহিষের দৌড়াদৌড়ির আলামত পাওয়া গিয়েছিল।
মোহরমের চাঁন্দের এক বিকালে হঠাৎ করে তিনি হাতের লাঠি ঘুরাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর, ‘সাবাশ! সাবাশ! কি সুন্দর মেডেল!’ বলে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে লাগলেন। শিষ্যগণ কারণ জানতে চাইলে তাঁর এক বন্ধুর নাম ধরে বললেন তিনি তাকে লাঠি খেলায় সাহায্য করেছেন, ফলে সে খুব সুন্দর একটা সোনার মেডেল পেয়েছে। শিষ্যগণ পরে খবর নিয়ে জানলেন যে, তাঁর ঐ নামের বন্ধুটি লাঠি খেলায় ওস্তাদ ছিলেন। সেদিন কলিকাতায় মোহরমের লাঠি খেলা উৎসবে আসামবাসীর পক্ষে লাঠি খেলা প্রদর্শন করে সোনার মেডেল পেয়েছেন।
তিনি তাঁর জনৈক বন্ধুর সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন, যে, তাঁরা এক সাথে হজ্জ পালন করবেন। তাঁর ইন্তেকালের বছর খানেক আগে ঐ বন্ধুটি পায়ে হেটে হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ রওয়ানা হয়ে যান। ঐ বৎসরই শাহ সাহেবের ওফাত হয়। তাঁর বন্ধু হজ্জ করতে গিয়ে আরাফাতের ময়দানে শিতালং শাহ’র সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং উভয়ে এক সাথে খানা- এ কাবা তাওয়াফ, সাঈ ও হজ্জ পালন করেন। ফেরার পথে শাহ সাহেব বন্ধুকে হাতের লাঠিটি দিয়ে উহা তাঁর নাতি মৌলানা তৈয়বুর রহমানের হাতে দিতে বলেন। বন্ধু ঐ লাঠি নিয়ে তাঁর বাড়িতে এসে শুনতে পান যে, তিনি বছর খানেক আগেই জান্নাতবাসী হয়েছেন। ঐ লাঠিটি দীর্ঘ দিন যাবৎ মৌলানা সাহেবের হেফাজতে ছিল। ১২৯৬ বাংলায় ১৭ই অগ্রহায়ণ (১৮৯৯ খৃঃ) সোমবার তিনি ইন্তেকাল করেন। সাধক শিতালং শাহ ছিলেন স্বভাব কবি ও মৌলানা। তাঁর গান গুলি ‘শিতালঙ্গি রাগ’ বলে মশহুর। শিতালং শাহ’র শিষ্য ও ভাব শিষ্যদের মধ্যে তোয়াক্কুল শাহ, ভেলাশাহ, শাহ ইয়াসীন, বদল শাহ, মুনির উদ্দীন উরফে দৈখুরা, ছাবাল আকবর আলী, সৈয়দ শাহ নূর প্রমুখ মরমী কবি ও সুফি সাধকগণ।
শিতালং শাহ’র মাজার চার দিকে দেয়াল দ্বারা ঘেরা। কোন রূপ কারুকার্যময় শান শওকতের বেড়াজালের আবদ্ধ নয়। মাজারের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ‘বারঠাকুরি শিতালঙ্গিয়া আলিয়া মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা: মরহুম মৌলানা তৈয়বুর রহমান, প্রতিষ্ঠা কাল ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ।
বিগত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৫ সালে এই মহান সুফি সাধকের মাজার প্রথম জিয়ারত করার খোশ নসিব হয়েছিল লেখকের। সঙ্গে ছিলেন সাংবাদিক মুহম্মদ ফয়জুর রহমান খসরু [কেচরী-জকিগঞ্জ] শিতালং শাহ (রঃ)’র অধঃস্তন পুরুষদের সাথে আলাপ করে জানা যায় তাঁদের হেফাজতে এখনো শিতালং শাহ (রঃ)’র ‘সিলটি নাগরি’ হরফে রচিত পাণ্ডুলিপিগুলো সংরক্ষিত আছে।
সুফি সাধক ও মরমী কবি শিতালং শাহ ছিলেন শরিয়তের পাবন্দ। জিন্দেগি যাপনেও ছিলেন সহজ সরল এবং শরিয়তের অনুসারী। ইন্তেকালের পরও যাতে তাঁর মাজার কেন্দ্রিক বেশরা কোন ধরনের পরিবেশ গড়ে না উঠে সে দিকেও ছিলেন সচেতন। তাঁর ইনতেকালের পর দীর্ঘ দিন তাঁর মাজার অরক্ষিত ভাবে নিরাভরন শ্রেফ একটি সাধারণ কবরের মত অরক্ষিত অবস্থায় ছিল। এক পর্যায়ে তাঁর অনুরাগী জকিগঞ্জ থানার বর্তমান বারহাল ইউনিয়ন পরিষদের খিলগ্রাম নিবাসী মরহুম আলহাজ্জ্ব তসির উদ্দিন সাহেব সাধারণ ভাবে একটি দেয়াল তৈরি করে মাজারকে চিহ্নিত করে রাখার ব্যবস্থা করেন। তখন বৃটিশ আমল। নির্মাণকালে দেয়ালের এক পার্শ্বে নির্মাতার নামও লিখিত ছিল। পরবর্তীকালে পুরানো হয়ে যাওয়ার দরুন দেয়ালের সংস্কার হয়েছে। তবুও সুফি শিতালং শাহ (রঃ) ‘র সেই ইচ্ছা লংঘিত হয়নি। মাজারে জাঁক জমকের কোনো প্রদর্শনী নেই। সাদামাটা দেয়ালের মধ্যে দীনহীন পরিবেশে চির শয্যায় শুয়ে আছেন অমর সুফি সাধক। ছায়া বিস্তার করে আছে একটি ফুলের গাছ।
প্রাথমিক দেয়াল নির্মাণ সংক্রান্ত তথ্যের ব্যাপারে আলহাজ্জ তসির উদ্দিন আহমদের নাতি সাংবাদিক-লেখক, দৈনিক জালালাবাদের নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিককে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, তাঁর শৈশবে [ষাট দশক] এই দেয়ালে তাঁর দাদার নাম লিখিত ছিলো বলে তিনি দেখেছেন। উল্লেখ্য আলহাজ্জ তসির উদ্দিন শিতালং শাহ’র রচনা সমগ্র ‘সিলটি নাগরি’ লিপিতে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। কয়েক খণ্ডে শক্ত মজবুত চামড়ার দ্বারা বাধাই করিয়েও রেখেছিলেন। এ জন্যে তখনকার সময়ে তিনি এ কাজে কয়েক হাজার টাকা খরচ করেছিলেন বলে একজন প্রবীণ ব্যক্তি জানিয়েছেন।
