শিতালং শাহের গান – অমৃত লাল বালা
‘শিতালং শাহের গান’ হিসেবে পরিচিত এক শ্রেণীর আধ্যাত্মিক সঙ্গীত বাংলা লোকসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদা ও শ্রদ্ধার আসন করে নিয়েছে। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত লোকসমাজের জনচিত্ত এ গানের লালন-ভূমি হলেও এর আবেদন সর্বজনীন। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ গান বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং জনতার হৃদয়ে লৌকিক ও আধ্যাত্মিক পিপাসা নিবৃত্ত করছে।
শিতালং শাহ নামক এক বিখ্যাত সুফি-পঙ্খী সাধক এই গানের স্রষ্টা। আল্লার প্রেমে উদ্বুদ্ধ এই সুফি-সাধক মুখে মুখে গান রচনা করে গেয়ে বেড়াতেন। তাঁর শিষ্য-ভক্তদের মাধ্যমে বাংলার লোকসমাজে এ গান ব্যাপক প্রচার লাভ করে। শিতালং শাহের প্রকৃত নাম মুনসি সলিম। তাঁর জন্ম সিলেটের ডঙ্গার গ্রামে। তাঁর সঠিক জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ জানা যায়নি।[১] অধ্যাত্মবাদের এই কবি ছিলেন সংসারত্যাগী পুরুষ। তিনি প্রায় তিনশ’ আধ্যাত্মিক গান রচনা করেন। গানগুলো সিলেট অঞ্চলে বহুল পরিচিত। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও প্রচলিত। একটি সূত্র থেকে জানা যায় এই লোক কবির জন্ম হয় ১২০৭ বাংলা সনে; কিন্তু মৃত্যুর তারিখ অজ্ঞাত।[২] বিখ্যাত এই সুফি-সাধক স্বভাব-কবিও ছিলেন। প্রৌঢ় বয়সে সংসারের মায়া-মোহ ত্যাগ করেন তিনি এবং শেষ বয়সে অধ্যাত্ম সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন। তাঁর রচিত মুর্শিদা গান ও মারফতি গান আধ্যাত্মিক ও তত্ত্বপূর্ণ সঙ্গীত। তিনি সঙ্গীতের মাধ্যমে সংসার আবদ্ধ মানুষকে ঐশী প্রেমে উদ্বুদ্ধ করার জন্য আহ্বান জানান। জীবাত্মা পরমাত্মা সাধনাই তাঁর গানের মূল সুর। এখন থেকে প্রায় দু’শো বছর আগে শিতালং শাহের আবির্ভাব হয় সিলেটে। তখন থেকেই তাঁর বহু আধ্যাত্মিক ও তত্ত্বপূর্ণ গান সিলেট ও সন্নিহিত অঞ্চলে লোকের মুখে মুখে গীত হয়ে এসেছে। আমরা জানতে পেরেছি-’তার রচিত প্রায় তিন শতাধিক গানের এক পাণ্ডুলিপি বর্তমানে শ্রীহট্ট মুসলিম সাহিত্য-সংসদ গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে।”[৩]
শিতালং শাহের গানগুলি বিশ্লেষণ করলে এগুলি থেকে তাঁর লৌকিক আধ্যাত্মিক চেতনা মানব জীবন সম্বন্ধে ইহকাল-পরকাল ভাবনা, সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যেকার সম্বন্ধ, মানব- জীবনের পূর্বাপর অবস্থা, মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের কার্যাবলী নিয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ধ্যান- ধারণার পরিচয় জানা যাবে। সর্বোপরি তাঁর তিন শতাধিক গানের ওপর গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণাত্মক আলোচনার মাধ্যমে কবির অধ্যাত্মভাবনার অভিব্যক্তি বিস্তৃত পরিসরে ব্যঞ্জনাময় হয়ে ওঠে। শিতালং শাহের রচিত অনেক আধ্যাত্মিক, ও তত্ত্বপূর্ণ গান সিলেট অঞ্চলে এখনও শুনতে পাওয়া যায়।[৪]
বার আউলিয়ার দেশ চট্টগ্রামের মত সিলেটও সুপ্রাচীন কাল থেকে ইসলাম প্রচার ও অধ্যাত্ম-সাধনার স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের পীর-দরবেশ-সুফি সাধকদের মধ্যে সিলেটের (শ্রীহট্ট) শাহ্ জালাল মুজরদ ইয়ামনী এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি সিলেটে খানকা প্রতিষ্ঠিত করে ইসলাম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর শিষ্য-ভক্তগণ বাংলাদেশ ও আসামের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে মুর্শিদের নির্দেশে ইসলাম প্রচার করেন। শাহ জালাল নিজেই সর্বদা ধর্মালোচনা, উপাসনায় লিপ্ত থাকতেন। তিনি ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর পূর্ব-নির্দেশ অনুযায়ী উপাসনাগৃহের নিকটেই তাঁর পবিত্র দেহ সমাহিত করা হয়। তাঁর কবরস্থানে যে সুরম্য স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়, তা সর্বসাধারণের পরম শ্রদ্ধার, এই সৌধটি ‘হজরত শাহ্ জালালের দরগাহ’ নামে খ্যাত। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা (১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে আগমন)-এর ভ্রমণ বৃত্তান্তে, জানা যায়- হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ জাতিধর্ম নির্বিশেষে এই পুণ্যাত্মাকে দর্শন করতে আসত। তিনি তাদের ইসলামের প্রেম-মৈত্রী ও সাম্যের বাণী শুনাতেন। বহু অলৌকিক ও কেরামতি দেখাতেন— সর্বোপরি সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি সাধারণকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতেন।[৫] তাঁর শিষ্য- প্রশিষ্যগণ-যারা ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন, তাঁরা সবাই সঙ্গীতের মাধ্যমে জনগণের হৃদয় আকৃষ্ট করেন। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সঙ্গীতই ইসলাম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়। সঙ্গীত ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে’ প্রবেশ ক’রে মন-প্রাণ আকুল করে, চিত্ত উদ্বেলিত করে। এ কারণে শাস্ত্রীয় কঠোর শাসন ও প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও মুসলমান সমাজ সঙ্গীতকে পরিহার করতে পারে নি। সুফি ধর্মের বিভিন্ন মরমিয় সম্প্রদায়ে সামা, হাল্কা ও দারা সাধনার মাধ্যম হিসেবে সঙ্গীত গৃহীত হয়। তাই পাক-ভারত-বাংলায় মুসলিম-সমাজে সঙ্গীত চর্চা যে সুফি প্রভাবের ফল-নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।[৬] ইসলামের সুকেঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আরবে ইসলামের উন্মেষের মাত্র কয়েক বছর পরেই উমাইয়াদের আমল থেকে আরবে সঙ্গীত চর্চা শুরু হয়। সঙ্গীতের সঙ্গে জীবনের সুগভীর যোগের ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। তারপর আরবে সঙ্গীতচর্চার ওপর ইরানীয় প্রভৃতি প্রভাব পড়তে থাকে এবং আব্বাসীয়দের পতন যুগে সঙ্গীতে যুক্ত হ’ল ধর্মীয় আবেগ। ইরানীয় প্রভাববশত এবং সুফিমতের প্রসারের ফলে সঙ্গীত হয়েছিল বোধনগীত, সাধন-সঙ্গীত ও ভজন। কিন্তু তবুও গোঁড়া শরিয়তিরা কোনদিনই সঙ্গীতকে সুনজরে দেখেনি। তা সত্ত্বেও এ সর্বগ্রাসী মায়াবী প্রভাব থেকে দূরে থাকা সম্ভব হয়নি অনেকের পক্ষেই। তাই গোঁড়া মুসলিম সুলতান সিকান্দর লোদী কিংবা নিষ্ঠাবান গোঁড়া-শরিয়তপন্থী সম্রাট আওরঙ্গজীবও প্রথম জীবনে সঙ্গীত বিমুখ হতে পারেননি।[৭] সুফি মতের ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করে বাংলায় প্রচলিত বৈষ্ণব, বাউল, বৌদ্ধ প্রভৃতি আধ্যাত্মিক সাধনামার্গের সঙ্গে আপস করে নিয়েছিল।[৮] বাংলায় প্রচলিত এ সকল ধর্মসম্প্রদায়ের সাধন, ভজন ও বোধন চলে সঙ্গীতের মাধ্যমে। সুফিধর্ম বাংলায় প্রবেশ করে অন্যান্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাধন-ভজন ও লোকাচার গ্রহণ-বর্জন করে। ফলে ইসলামে যে ‘শেরেক’ ও ‘বেদায়াৎ’ প্রবেশ করে একটি লৌকিক রূপ পরিগ্রহ করে, পণ্ডিতেরা তার নাম দিয়েছেন ‘লৌকিক ইসলাম।[৯] এই লোকাচার সম্বলিত ইসলাম অন্যান্যের সঙ্গে আপস-মীমাংসা ও নির্বিচার সমন্বয় সাধন করে। বাংলার লোক-সঙ্গীতে এ-ঐতিহ্যের অনুসরণ লক্ষ্য করা যায়। সঙ্গীতের প্রভাব এমনই সর্বাতিশয়ী- যে, তার কাছে জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ লুপ্ত হয়ে যায় এবং উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হয়।
বাংলাদেশের মানুষ অত্যধিক ভাবপ্রবণ। তাদের মুখে গান এসেছে এই ভাব থেকে। ‘গানের দেশ এই বাংলাদেশ’, ‘বঙ্গভূমি সঙ্গীতের রঙ্গভূমি’; ‘বাঙালির মুখে গান, হাতে কাজ’- এই ঐতিহ্য নিয়ে সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলার লোকসঙ্গীত সগৌরবে আজও বেঁচে আছে। মহাত্মা গান্ধী তাই বলেছেন,
আমি যদি গান শুনতে চাই, তাহলে আমাকে যেতে হবে বাংলায়।… …. এদেশে (বাংলায়) গায়ক আছে, তাদের অতিক্রম করা শক্ত।[১০]
বাংলার লোকসংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মুগ্ধ চিত্তে, মাহাত্মা গান্ধী এ উক্তি করেছিলেন। বাঙালির লোকসংগীত সাধনার মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় চেতনা ও আবেগ, রয়েছে সাহিত্য রসাস্বাদন প্রবণতা; আরো রয়েছে দার্শনিকতাপূর্ণ মরমিবাদের তত্ত্ব-চিন্তার খোরাক। পৃথিবীর সকল জাতির ন্যায় বাঙালির সাহিত্য-সাধনার জয়যাত্রাও শুরু হয় সংগীত রচনার মধ্য দিয়ে। তত্ত্বদর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনা এর প্রাণ প্রবাহিনী শক্তি। এই ঐতিহ্য নিয়ে সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলার লোক সঙ্গীত সগৌরবে বেঁচে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বাংলার লোকসংগীতের সাধারণ আট পৌরে গান থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ গানের রয়েছে এই গৌরবময় ঐতিহ্য ও সুনাম। বাংলার ধুয়া, ভাব, মুর্শিদী-মারফতি, জারি- সারি, বাউল-বৈষ্ণব, ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি, মাইজভাণ্ডারী প্রভৃতি জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক সংগীতের মতো সিলেটের জনপ্রিয় সাধক শিতালং শাহর গানও জনপ্রিয় আধ্যত্মিক সংগীত হিসেবে বিবেচিত। তাঁর রচিত ‘মারফতি’ বা ‘মুর্শিদী’ গানগুলিতে গভীর আধ্যাত্মভাব বিধৃত হয়েছে।[১১] শিতালং শাহের ‘মারফতি’ বা ‘মুর্শিদী’ গানের সুর করুণ। ‘সুফির আর্তির মধ্যেও চিরন্তন কান্নার সুর আছে।’[১২] পবিত্র প্রেমের আশেক-মাশুকের বিরহ-ভাবনা এবং চিরন্তন কান্নার সুর শিতালং শাহের গানকে সকল প্রকার পঙ্কিলতা ও অধঃপতন থেকে রক্ষা করেছে।
সিলেটের লোকসংগীতে যে সকল কবির নাম-ভণিতা পাওয়া যায় তাঁদের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। ড. ওয়াকিল আহমদ সিলেটের লোক-কবিদের লোক সংগীতে আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে প্রায় ষাটজন কবির নামোল্লেখ করেছেন—যাঁরা লোকসঙ্গীতে অধ্যাত্মতত্ত্ব ও ধর্মদর্শন আরোপের মূল রূপকার-তাঁদের মধ্যে শিতালং শাহের নাম অধ্যাত্মবাদের কবি হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।[১৩] ড. আশরাফ সিদ্দিকীও বলেন—
‘সিলেট লোকসংস্কৃতির চারণভূমি এবং লোক-সংস্কৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার বুকে ধারণ করে এ ভূখণ্ড মননশীল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে উজ্জ্বলতর অবদান রেখে চলেছে যুগ-যুগ ধরে।’[১৪]
সিলেটের মাটি ও প্রকৃতি ‘অন্তর্নিহিত জীবনাবেগ প্রকাশের অধিকতর অনুকূল বিধায় সেখানে ফকির দরবেশ, পীর আউলিয়া, সুফী বৈষ্ণব বাউলের বিকাশ ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এঁরা সকলেই মোটামুটি একই পথের পথিক। অনিত্য জীবনবিবাগী কিন্তু নিত্যজীবনের আকাঙ্ক্ষায় অধীর।’[১৫] এই সিলেটে এক সময় বৌদ্ধদের বাস ছিল। পরে হিন্দু-সভ্যতা বিকশিত হয়েছে। হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর আগমনের পর ইসলামি সংস্কৃতি, পারস্যের মরমীবাদ এখানে প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে এখানে যেমন লোকসংস্কৃতির নানাধারা বিকশিত হয়ে এখানকার ফোকলোর ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি এখানে মরমীসঙ্গীত রচিত ও ধ্বনিত হয়েছে।[১৬] প্রায় দু’শো বছর পূর্বে সুফি-ধর্মাবলম্বী সাধক শিতালং শাহ সিলেটের এই পুণ্যভূমিতে আবির্ভূত হন।
প্রৌঢ় বয়সে শিতালং শাহ সংসার ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন বলে জানা যায়। প্রথম জীবনে তিনি সুফি গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তিনি জানতেন, সাধনায় জয়ী হতে গেলে মুর্শিদ বা গুরু আবশ্যক। তাঁর নির্দেশ- উপদেশ অনুযায়ী শিষ্য কঠোর সাধনা বলে সিদ্ধিলাভ করতে পারে।
সুফি ধর্মে এই গুরুবাদী কায়া সাধনা স্বীকৃত। শিতালং শাহ্ তাই গেয়েছেন—
‘শিতালং ফকির কয়
ভাবি নিরঞ্জন,
দুনিয়া আখেরে জান
মুরশিদ বড় ধন।
(লোকসাহিত্য সংকলন, গান সংখ্যা-৬)
শিতালং শাহ আপন গুরুকে ‘পয়লা’ (প্রথম ও প্রধান)’ ফকির হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন—
‘পয়লা ফকির জানো
ছুবহান কাদির
দুছরা ফকিরী আইলো
আদম ছফির।’
গানে উল্লিখিত ‘ছুবহান কাদির’ ছিলেন বাগদাদের হজরত বড় পীর আবদুল কাদির জিলানী। শিতালং শাহ্ তাঁরই শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন এবং ‘কারিয়া তরিকা’র আদর্শ প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। সংসার ত্যাগী এই মুক্ত-স্বাধীন ফকির আধ্যাত্মিক সত্তার সন্ধানে সংসারের সমস্ত মায়া-মোহ পরিত্যাগ করেন। তাঁর গানে আল্লা-প্রেমের তীব্রতা অপরূপ রয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। পরিণত বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হন। জীবনের শেষ দিকে তিনি আধ্যত্মিক ধ্যানে এতই মত্ত হয়ে পড়তেন যে, তিনি কখনও হাসতেন এবং কখনও কাঁদতেন। আবার কখনও তিনি বনে-জঙ্গলে উদাসীনের ন্যায় নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াতেন। মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্ব থেকেই তাঁর প্রকৃতি শান্ত হয়ে আসে বলে জানা যায়। তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন, এবং এই শক্তিবলে অনেক অসাধ্য কার্য সাধন করতে পারতেন। তিনি ‘দুনিয়া আখেরে জান মুরশিদ বড় ধন’-এ গান গেয়ে মুরশিদের চরণতলে ঠাঁই নেবার জন্য সকল মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সংসার বদ্ধ মানুষকে মুরশিদ হিসেবে পিতা-মাতার নির্দেশ-উপদেশ শিরোধার্য করতে বলেছেন-
‘পয়লা মুরশিদ জান
মাই আর বাপ
সকলের উপরেতে তাঁহাদের প্রতাপ।’
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, চৈতন্যদেব প্রমুখ সাধক এভাবে সংসার মায়ায় আবদ্ধ ‘বদ্ধজীবে’র মুক্তির কথা ভেবেছেন। সংসারের ‘বদ্ধজীবে’র প্রতি রামকৃষ্ণের উপদেশ ছিলো এরকম-‘সত্যি বলছি, তোমরা সংসার করছো, এতে দোষ নাই। তবে ঈশ্বরের দিকে মন রাখতে হবে। এক হাতে কর্ম করো, আর এক হাতে ঈশ্বরকে ধ’রে থাকো। কর্ম শেষ হ’লে দুই হাতে ঈশ্বরকে ধ’রবে।[১৭] সংসারের ‘বদ্ধ জীব’ নারীদের কথাও ভেবেছেন শিতালং শাহ্। স্বামীর পায়ের তলেই নারীর বেহেস্ত, স্বামীই সতীর পরম গুরু-গানের মধ্য দিয়ে কবি তা ব্যক্ত করেছেন—
‘দেখ তোর সুয়ামী পদে দিয়া মন।
নারীর সংগতি গতি
চরকা আর সুয়ামী
ও তারা—ভজে দিবাযামী….
দেখ তোর সুয়ামী পদে দিয়া মন।’ (গান সংখ্যা-১)
কবির মতে সতীর পতিভক্তি হতে হবে অটুট ও অকৃত্রিম। একটু শিথিল কিংবা কৃত্রিম হলে আর সিদ্ধি হবে না, চরকা থেকে সূতা তোলার সময় একটু অমনোযোগী হলেই যেমন সূতা কেটে যায়। কবি তাঁর গানে এ কথা উদাহরণ দিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন—
‘শিতালং ফকিরে কয়
সুতা বড় ধন
সুতায় গাঁথা যায় রতন
হায় হয়
ওরে-চরকা হইতে মন ছাড়াইলে
সুতা কাটে টনাটন, নারীগণ
দেখ তোর সুয়ামী পদে দিয়া মন।’
শিতালং শাহের তিন শতাধিক গানের মধ্যে প্রতিনিধিত্বকারী একত্রিশটি গানের সংগ্রহ আমাদের নিকট আছে। একটি গান থেকেই আমরা এই সাধকের জীবন ও সাধনা এবং মানব জাতি সম্পর্কে তাঁর আধ্যাত্মিক অনুভূতির আনুপূর্বিক পরিচয় লাভ করতে পারি। তাঁর
গানগুলির অভ্যন্তরীণ ভাবসম্পদ বিভাজন করলে তিনটি শ্রেণী লক্ষ্য করা যাবে। প্রথম শ্রেণীর বিশুদ্ধ ঐসলামিক ভাব-এ-শ্রেণীর পনেরটি গান জুড়ে আল্লা-রসুলের বন্দনা, মানবদেহ গঠনের তত্ত্বপূর্ণ কথা, এবং আশেক-মাশুকের সাধনা পরিব্যক্ত হয়েেেছ। দ্বিতীয় শ্রেণীর বারটি গানে আছে বিশুদ্ধ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধনা—জীবাত্মা-পরমাত্মার কথা। তৃতীয় শ্রেণীয় চারটি গান জুড়ে কবির সমন্বয়বাদী চিন্তা-চেতনা বিধৃত হয়েছে। এখানে হিন্দু-মুসলিম বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের কথা নেই; বরং আছে সর্বকালের সকল মানুষের প্রেম ও মৈত্রীর বন্ধন-প্রয়াস, আর আছে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যেকার প্রেম-সমৃদ্ধ নির্ণয়ের আকুলতা।
শিতালং শাহের মারফতি গানে দেহতত্ত্ব রূপায়িত হয়েছে। মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের গঠনতত্ত্ব এবং পবিত্র কোরান শরীফ রচনার উৎস আরবি ত্রিশ হরফ’ থেকে-এ তত্ত্বের ব্যাখ্যা তাঁর রচিত একটি মারফতি গানের ধুয়ায় পাওয়া যায়—
‘তিশ হরফে কোরান শরীফ
রচিয়াছে সাঁই,
তিশ হরফে আদমছবি
রাখিয়াছে ‘বানাই।’[১৮]
(গান সংখ্যা-৫)
মানব শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ‘আলিফ’, ‘বে’, ‘তে’, ‘ছে’, ‘জিম’, ‘হে’ ‘খে’, ‘দাল’ প্রভৃতি অক্ষরে ‘পরম’ ‘কারিগর’ আল্লাহ নির্মাণ করেছেন।
কবি গেয়েছেন-
‘আলিফ’ হরফ দিয়া
নাক বানাইয়া
‘বে’ হরফে চক্ষু বানা
সাহেব বিনোদিয়া।
‘তে’ হরফে তালু বানায়
আল্লা নিরঞ্জন,
‘ছে’ হরফে হইল জানো
মুখের গঠন।’…
এ ভাবে কবি মানব দেহের মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে পদতল পর্যন্ত প্রতিটি অঙ্গের গঠন রহস্য বর্ণনা করেছেন। এবং অবশেষে কবি গেয়েছেন
‘ইয়া’ হরফে পায়ের এড়ি
দেখ, কত রং
তিশ হরফে আদমছরত
কয় শিতালং।’
আর একটি গানে কবি মানব দেহ গঠনের উপাদান নির্ণয় করেছেন ইসলাম ধর্ম ও শাস্ত্রানুযায়ী—
‘মায়ের চাইর, বাপের চাইর
আল্লার দশ দিয়া
আদম ছুরত পয়দা কইলো
কুদরতি মিলাইয়া।’ (গান সংখ্যা-৭)
এভাবে মানুষের দেহরূপ নৌকা তৈরি করা হয়েছে, এবং এই দেহ-তরী পার্থিব-জগতের ঘাটে-ঘাটে ঘুরে-ফিরে অবশেষে মূল লক্ষ্যে যাত্রা করে—
‘বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি
আদমের অজুদে[১৯]
কৌশল করিয়া পয়দা
করিছে মাবুদে।….
সুজন মুর্শিদের কাছে আছে
বেপারের[২০] পুঞ্জি
খুলিতে ঘরের তালা
‘হা’’হু’ হয় কুঞ্জি।[২১]
শিতালং ফকির কয়
দুনিয়া মহাস্থান,
মুশকিল তরানী হইলো
মইতে ঈমান।’
কবির অন্তরে লালিত মানবজীবন সম্পর্কে এই প্রগাঢ় অনুভূতি সুফি-মরমিবাদ থেকে উৎসারিত। দেহতত্ত্বের সঙ্গে তিনি মৃত্তিকাতত্ত্বের ব্যাখ্যাও করেছেন ঐ একই তত্ত্ব থেকে। সংসারের মায়াজাল ছিন্ন করে পরমাত্মার নৈকট্য লাভের আকুতি ব্যক্ত হয়েছে তাঁর গানে। তিনি গেয়েছেন—
‘দয়াল বন্ধুরায়—
হাসরে তরাইয়া লইও মোরে
আছানীতে[২২]।
রাখিত মোরে।
কয়বরের[২৩] ভিতরে।’ (গান সংখ্যা-৪)
সুফি-প্রেমে পাগল কবি শিতালাং শাহ অনুভব করেন, যে জীবাত্মা পরমাত্মারই একটি ক্ষুদ্র অংশ-পৃথিবীতে জীবলীলা শেষে তা পরমাত্মার নিকট ফিরে যাবেই। কিন্তু তার জন্য যে বিরহ-বিশুদ্ধ প্রেমের সাধনা প্রয়োজন, তা সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জীবাত্মা বিস্মৃত হয়েছে। কবি গেয়েছেন
‘বন্ধু হে
মাতাপিতা আর তিরি[২৪]
লাড়কা বাচ্চা ভবের ছিরি
আইলা কত জন
হায় হায়,
মায়াজাল বন্দী অইয়া
তুলি গেলাম মূল জন,
নিরঞ্জন।
‘মায়াজালে বন্দী’ মানবরূপী জীবাত্মার দুর্গতিতে কবির হৃদয়ে আফসোস জাগে। তিনি বলেন—
‘বন্ধু-হে-
যৌবন গেল দিন ফুরাইলো
ফিরি যাইবার সময় অইলো
সঙ্গী কেউ নায়,
হায় হায়,
ছকরত মইয়তে সাথী
নাই কেউ তিরভুবন,
নিরঞ্জন।’
তবুও কবি হাসরের দিনে ‘মায়াজালে বন্দী’ মানুষের মুক্তির জন্য প্রভু নিরঞ্জনের নিকট প্রার্থনা করেছেন—
‘বন্ধু হে—
শিতালং ফকির বলে
আফছুছে কলিজা জ্বলে
বৃথা কাজে গেলে কে সময়
হায় হায়
ছিরাত সঙ্কটে বন্ধু
দেখাইও ছিরি আপন,
নিরঞ্জন।’
শিতালং শাহের গানে ‘আশেক-মাশুকে’র প্রেম-চিত্র রূপায়িত হয়েছে অতি চমৎকার- ভাবে। আশেক কর্তৃক মাশুকের সন্ধান লাভের জন্য আশেকের অন্তরে লালিত প্রেম ও বিরহের আর্তি নিবেদিত হয় নাচ-গান-নৃত্যের তালে-তালে।
কবি সে-গান গেয়েছেন-
‘যন্ত্র দরক্ত বাজে
বৃক্ষ তবা হয়
ডালে ডালে তালে তালে
সুরে সুর প্রত্যয়।
বৃক্ষ তবা গান করে
পবনের জংগ সং[২৬]
নূরী লোকে নাচে নাচে[২৭]
নাটেতে প্রাণ থেচে।’ (গান সংখ্যা-১৩)
এ গানে নানা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। যেমন-তানপুরা, ঝাঁজির, বেহালা, সেতার, তবলা, ঢোলক, ঘন্টা, মৃদঙ্গ ইত্যাদি। গানের বিভিন্ন স্তরে চলে ‘হালকা’ ‘জিকির’, ‘সামা ও ‘দারা’। কবি গেয়েছেন—
‘কন্দিলে থাকিয়া নবী
জিকির আল্লার
তছবিহ পড়িলা যাল
সত্তর হাজার।…
কন্দিলের চৌদিকে[২৮] তে
তজল্লি[২৯] বিস্তর
হালকা বন্দী[৩০] সারি সারি
রূহানী[৩১] সকল।’ (গান সংখ্যা-১৪)
সবশেষে প্রেমভাবে ‘আশিক’ দেওয়ানায় পরিণত হয়—
‘শীতালং ফকিরে কয়
বৃক্ষ জপে রব্বানা,
প্রেমভাবে বৃক্ষতবা
আশিক দেওয়ানা।’
(গান সংখ্যা-১৩)
সুফিবাদী সাধনায় মানবাত্মা (আশেক) পরমাত্মা (মাশুক) থেকে উদ্ভুত। জীবিতাবস্থায় মানবাত্মা সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে পরমাত্মায় হতে পারে। পরমাত্মায় মানবাত্মা এভাবে চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়াকে ‘বাকাবিল্লাহ’ বলা হয়। জীবাত্মায় ‘অহংবোধ’ লোপ হলে ‘ফনাফিল্লাহ’, তারপর বাকাবিল্লাহ’ প্রাপ্তি ঘটে। ঈশ্বরের প্রেম-সাধনায় মানুষ যখন তার সাধারণ লৌকিক অংশ (নাছুত’) ধ্বংস করে ঐশ্বরিক অংশে (‘লাছুত’) অবস্থিত হতে পারে, তখন জীবাত্মা পরমাত্মার সঙ্গে এক হয়ে যায়। মানবত্মা জগতের গভীর আনন্দময় উপলব্ধি ও সাধনার উপর নির্ভর করে সৃষ্টির ব্যক্ত রূপ থেকে ঊর্ধ্বগমন করে অব্যক্তরূপে মিশে যেতে পারে। এই উপলব্ধি থেকে তার পূর্ণ মানবত্ব লাভ হয় এবং মানুষ ভগবৎ-সত্তায় রূপান্তরিত হয়। সুফি ধর্মের মূল তত্ত্ব কথা তাই।[৩২] সুফি ধর্মমতে মানবদেহেই ব্রহ্মাণ্ড বর্তমান। সুতরাং সাধনার বলে দেহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব আরোপ করতে পারলে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের পরম-সত্তার সান্নিধ্য লাভ করা যায়। R. A. Nicholson তাই বলেছেন- ‘A man is created in the image of God, so the Universe is created in the image of man who is its spirits and life.’[৩৩]
সুফির সাধনার পথ ও পাথেয় প্রেম ও পবিত্রতা। প্রেম ও পবিত্রতা-যোগে যখন সুফি পার্থিব ও বন্ধন মুক্ত হতে পারেন এবং বিরহের অনলে আত্মনাশ করতে পারেন তখন তাঁর দিব্যাবস্থা প্রাপ্তি ঘটে; এ অবস্থায় তাঁর কাছে সোনা ও মাটি সমান হয়ে দেখা দেয়। সুফি প্রেমের কাঙ্গাল। একমাত্র ঈশ্বরের প্রেমলাভের জন্য তাঁর সাধনা। তাঁর মতে ঈশ্বরই সকল সৃষ্টির একমাত্র উৎস। জীবাত্মা সাধনার বলে তাঁর নিকট ফিরে যাবার আহ্বান শুনতে পায়। স্রষ্টার নিকট ফিরে যাবার জন্যই তাঁর বিরহ-তাঁর সাধনা। সুফির কাছে তখন লৌকিক ও আধ্যাত্মিক প্রেম একাকার হয়ে যায়। শিতালং শাহ গেয়েছেন—
‘প্রেমডুরে বান্ধিয়াছে
দেখবে তখন চন্দ্ৰ গগন
চন্দ্ৰ উদয় হইয়াছে।
শিতালংগে বলে অংগে
তুষানল জ্বলিতেছে
প্রিয়া বিনে না লয় মনে
মন উদাস হইয়াছে।’ (গান সংখ্যা-১১)
তবুও সুফির মনে ভয় জাগে না পাওয়ার বেদনার চেয়ে পেয়ে হারানোর বেদনা তাঁর অন্তরে বড় হয়ে দেখা দেয়। সে কারণে—
‘শিতালং ফকির মাংগে
রব্বের বিদিত,[৩৪]
প্রেমের সহিতে আমার
না খুলিল চিত।’ (গান সংখ্যা-২৫)
আমরা আগেই বলেছি যে, শিতালং শাহের সমস্ত গানের ভাব-সম্পদগত তিনটি ভাগ লক্ষ্য করা যায়। আমাদের বর্তমান আলোচনায় ইতোপূর্বে তার সুফি-ভাবনা প্রসূত গজল জাতীয় গানগুলো বিশ্লেষণ করেছি। তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত পদগুলো যথাক্রমে বৈষ্ণব ভাবানুপ্রাণিত ও সমন্বয়কারী চেতনা-প্রসূত। এবার এ পদগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে যে কবি ছিলেন সুফি-সাধক ইরানিয় সুফিবাদী প্রেম-সাধনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি পরম নিষ্ঠায় আশেক-মাশুকের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যেকার সম্বন্ধ নির্ণয়ে প্রবৃত্ত থেকেছেন; সেই কবি আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণব প্রেমধর্মাশ্রিত রাধা-কৃষ্ণের প্রতীকত্বে জীবাত্মা-পরমাত্মা ও যুগল-মিলনের পদগান রচনা করেছেন। তাঁর রচিত সমন্বয়বাদী চেতনা-প্রসূত গানগুলোতে কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের কথা নেই, বরং সর্বকালের সকল মানুষের শাশ্বত প্রেমের লৌকিক ও আধ্যাত্মবাদী চেতনা বিকাশলাভ করেছে। বাংলা লোকসংগীতে তা এক দুর্লভ সামগ্রী। শিতালং শাহের গানের বিস্তৃত পরিধি জুড়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণবভাবাশ্রিত পদরচনার প্রেরণা এবং জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে মিলিত সাধনায় সাগর সঙ্গমে উপনীত হবার আকুলতা সমকালীন ‘যুগ-পরিবেশের মধ্যেই অনুসন্ধানযোগ্য।
মধ্যযুগে ভারতবর্ষে তথা বাংলায় রাজনৈতিক-সামাজিক-ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাহ্যিক ধর্মাচরণে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ, সংঘর্ষ ও সঙ্কট সৃষ্টি হ’ত তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ‘যে-ধর্ম ব্যক্তিগত সাধন-সাপেক্ষ, প্রেমভক্তি যার পথের দিশারী, এবং যার মূল উদ্দেশ্য ঈশ্বরে প্রেমলাভ-সেখানে হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে গিয়েছে।[৩৫] বাংলাদেশের প্রেমপন্থী মুসলমান সাধকগণ ছিলেন সুফিপন্থী।’ মধ্যযুগে ব্রাহ্মণশাসিত হিন্দুধর্ম ও সংস্কার যেমন সমাজের এক স্তরে উপেক্ষিত হয়, এবং প্রেমমার্গীয় উদার সাধনা প্রচার লাভ করে, তেমনি বিশুদ্ধ আরবি- তমদ্দুনে বিশ্বাসী মুসলমান সমাজেও সুফি সাধনার রন্ধ্রপথ দিয়ে ‘বেশরা’ পন্থী এমন সমস্ত রীতিকৃত্য ও সাধনা প্রবেশ করে, যাতে প্রেমমার্গ ও যোগতন্ত্রাদির ধারা এক সঙ্গে মিলে মিশে গেছে।’[৩৬] এর ফলে হিন্দু-মুসলমান যুক্ত সাধনায় মিলিত হবার সুযোগ হয়। মুসলমান সুফিপন্থী কবি সম্প্রদায়ের সঙ্কীর্ণ বাতায়ন ত্যাগ করে হিন্দু-মুসলিম যুক্তসাধনার সাগরসঙ্গমে এসে উপনীত হতে পেরেছেন। ‘বাংলার যে সুফিধর্ম-শুধু বাংলায় নয়, ভারতবর্ষেরই যে সুফিধর্ম, তা একটি মিশ্রধর্ম, এর ভেতরে পারস্যের প্রেমধর্মের সঙ্গে ভারতবর্ষের প্রেমধর্মের অপূর্ব মিলন ঘটেছে। ফলে ভারতবর্ষের প্রেমধর্মের কাহিনী-উপাখ্যান ও সুফিধর্মের সঙ্গে মিলে মিশে গেছে। সুফি প্রেমধর্ম এবং বাংলার প্রেমধর্ম জনগণের মধ্যে যে একটি জনপ্রিয় সহজ সমন্বয় লাভ করেছে, বাংলাদেশের মুসলমান কবিগণ সেই সমন্বয়জাত প্রেমধর্মের আদর্শের সঙ্গে রাধা-কৃষ্ণকে অনেক স্থলে মিশিয়ে নিয়েছেন। ফলে রাধার যে পূর্বরাগ অনুরাগ বিরহের আর্তি তা কবিগণের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে পরম দায়িত্বের জন্য নিখিল প্রেমসাধকগণের পূর্বরাগ-অনুরাগ বিরহের আর্তিতেই পরিণতি লাভ করেছে এবং সেই আর্তির ক্ষেত্রে কবি নিজেকে শুধু দর্শক বা আস্বাদকরূপে খানিকটা দূরে সরিয়ে নেন নি, নিখিল আর্তির সঙ্গে নিজের চিত্তের আর্তিকেও মিলিয়ে নিয়েছেন।[৩৭] বাংলার অধিকাংশ মুসলমান পূর্বে হিন্দু ছিলেন বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। রবীন্দ্রনাথের উক্তিটিও স্মরণীয়-’এদেশের অধিকাংশ মুসলমানই বংশগত জাতিতে হিন্দু, ধর্মগত জাতিতে মুসলমান।[৩৮] যে সকল হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তাঁরা বাইরে স্ব-ধর্ম ত্যাগ করলেও অন্তরশায়ী হিন্দু-সংস্কার ত্যাগ করতে পারেননি। সুতরাং জাতিতে তাঁরা মুসলমান হলেও আচার-আচরণে সংস্কার বিশ্বাসে হিন্দুর মতই ছিলেন অনেক ক্ষেত্রে। প্রেমপন্থী মুসলমান সাধক কবিগণ অল্পবিস্তর সকলেই ছিলেন সুফিপন্থী। মধ্যযুগের বাংলাদেশে ধর্মাচরণও সাধনার ক্ষেত্রে সুফি ও বৈষ্ণব এ ‘দুটি ধর্ম-দর্শন খুবই কাছাকাছি এসেছিল। প্রেমপন্থী মুসলমান কবিরা ছিলেন উদার অসাম্প্রদায়িক। সুফি ও বৈষ্ণব ধর্মের ভেতর থেকেই তাঁরা তা অর্জন করেছিলেন। অনেক সুফি ধর্মাবলম্বী মুসলমান কবি বাংলায় প্রচলিত অতি সাধারণ রূপকব্যঞ্জনা-রাধা-কৃষ্ণ অবলম্বনে বৈষ্ণব-পদ রচনা করতে ঝুঁকেছিলেন। কেউ কেউ ‘বৈষ্ণব সাধক ও কবির আদর্শ নৈষ্ঠিকভাবে অনুসরণ করে দীন-বৈষ্ণবের অনুরূপ আতিবশতঃই পদ লিখেছিলেন, কেউবা তন্ত্রযোগ অভ্যাস করেছেন, কেউ বা কালী বিষয়ক গান ও চৈতন্য লীলার পদ রচনা করেছেন। অর্জিত সংস্কার যত বড়োই হোক, পৈতৃক সংস্কার সহজে বিস্মৃত হওয়া যায় না। প্রকাশ্যে বা প্রচ্ছন্নভাবে তা ফুটে ওঠে সে কথা মুসলমান কবিদের বৈষ্ণব পদ রচনাতেই বোঝা যায়।[৩৯] অনেক মুসলমান কবি বৈষ্ণবভাবাশ্রয়ী যে পদ রচনা করেছেন, সেখানে তাঁরা ‘রাধা-কৃষ্ণ’ শব্দ রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে, কেউবা সুফি আদর্শেও ‘রাধাকৃষ্ণ’ পদাবলী ব্যবহার করেছেন; আবার কোন কোন পদকার রাধাকৃষ্ণকে জীবাত্মা-পরমাত্মার রূপকরূপেই গ্রহণ করেছেন। এ সকল মুসলমান কবি নিজ নিজ অন্তরের অবধি আবেগ ও প্রেমভক্তিকে একাত্ত আত্মগতভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাঁরা সুফি মতাবলম্বী হলেও হিন্দুরা রাধা-কৃষ্ণকে নিজ নিজ অধ্যাত্ম অনুভূতির রূপক হিসেবে গ্রহণ করতে সঙ্কুচিত হন নি বা পাপবোধ মনে করেন নি। বরং বাঙালির জাতীয় মানস ধারার ক্রমবিকাশের ক্ষেত্রে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন বলে মনে হয়। যখন তাঁরা সাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করেন, তখন ‘কানু ছাড়া গীত নাই’ আর ‘রাধা ছাড়া সাধা নাই।’ এই পরিবেশে ‘এ সকল কবিদের পক্ষে সময়ের প্রভাব অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁরা বৈষ্ণবভাবে খানিকটা অনুপ্রাণিত হয়ে রাধা- কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় পদ রচনা করতে প্রলুব্ধ হয়েছেন।[৪০] কোন কোন সুফি-পন্থী মুসলমান কবি সুফি আদর্শে রূপক হিসেবে রাধা-কৃষ্ণকে গ্রহণ করেছিলেন। সুফি মতে ঈশ্বর হলেন প্রেমিকা অর্থাৎ আশেক, আর ভক্ত হলেন ‘মাশুক’। বাঙালি কবি শাহনূরের কথায় মুসলমান- – কবির রাধা-কৃষ্ণ রূপক গ্রহণের সঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়—
‘সৈয়দ শাহনূরে কয় ভব কুলে আসি
রাধার মলিরে কানু আছিলা পরবাসী।”
‘হকিকত সিতারা’র তত্ত্বরসিক কবি আরকুম বলেন-
‘তুমি আসিক, তুমি মাশুক, তুমি রাজা প্রজা।
তুমি দেবতা, তুমি ফুল, তুমি কর পূজা।’
সুফি প্রেম পন্থী কবি ওসমানও গাইলেন—
‘রাধা কানু এক ধরে কেহ নহে ভিন
রাধার নামে বাদাম দিয়া চালায় রাত্রিদিন।
কানুরাধা এক ঘরে সদায় করে বাস
চলিয়া যাইবা নিঠুর রাধা কানু হইবা নাশ।”
আমরা একটু আগেই উল্লেখ করেছি যে, মধ্যযুগে বাংলায় সুফি ও বৈষ্ণবধর্ম খুব কাছাকাছি এসেছিল। এ-দু’টি ধর্মের সাধন-ভজনে যথেষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। ড. মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন-’বাংলার বৈষ্ণব ধর্ম সুফি মতবাদের প্রভাবে গড়ে উঠেছে। তাঁর মতে সুফিদের ‘গজলিয়াৎ’ আর বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী প্রায় এক ও অভিন্ন। সুফিদের ‘মই’ ও ‘শর্ব, বৈষ্ণবদের ‘প্রেম’ ও ‘প্রীতি’; সুফিদের আশিক বৈষ্ণবদের রাধা, মাশুক-কৃষ্ণ, হিজরণ- বিরহ, বিগল-মিলন। তাঁর সিদ্ধান্ত এই—
“The innermost core of vaishnavism was filled with sufistic sentiment’; ‘Radha and Krishna, Through originally Hindu, had been purified of gross elements and transformed into Ashiq and Masuq in Vaisnava literature; An analysis of the Gaudian form of Vaishnavism proves it to be almost a Bengali version of Muslim. Sufism proves to be almost a Bengali version of Muslim Sufism’[৪১]
ড. হক আরও মনে করেন যে বাংলার বৈষ্ণব ধর্ম সুফি মতবাদের প্রভাবে গড়ে উঠেছে। তাঁর এ মতের পক্ষে আরও যুক্তি হ’ল- সুফিদের আল্লাহ্ আর সচ্চিদানন্দে দৃশ্যত পার্থক্য নেই। ইসলামে পীরবাদ এবং হিন্দুর গুরুবাদ একই। জীবাত্মা সাধনায় উত্তীর্ণ হয়ে যখন পরমাত্মায় মিলিত হয়, তখন সুফিদের ভাষায় বলা হয় ফানাফিল্লা, বৈষ্ণবদের ভাষায় যুগলরূপ। সুফিরা মুসলমান, তাঁরা দ্বৈতবাদী হয়েও অদ্বৈতসত্তায় অভিলাষী। বৈষ্ণবদেরও সাধন চলে দ্বৈতবোধে এবং পরিণামে অদ্বৈত সত্তার প্রয়াসে। ড. হকের এ মত আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ড. আহমদ শরীফ, অধ্যাপক আবদুল হাফিজ সমর্থন করেন। অধ্যাপক আবদুল হাফিজ অনেকদূর এগিয়ে বলেছেন—’এ-দু’টি ধর্মই (সুফি ও বৈষ্ণব) একই বস্তুর এপিঠ ওপিঠ।’[৪২] অবশ্য তিনি এ দু’টি ধর্মে কিছু কিছু পার্থক্যও নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সুফিরা অদ্বৈতবাদী-বৈষ্ণব দ্বৈতবাদী। সুফির প্রেম-সাধনায় মধ্যস্তর অনুপস্থিত-লীলাবিস্তারিকা সখী নেই। সুফিসাধনায় সৃষ্টিকর্তা প্রেমিকাস্বরূপ-সৌন্দর্যের প্রতিভূস্বরূপ। কিন্তু বৈষ্ণবসাধনায় কৃষ্ণই একমাত্র নর-আর সবাই অর্থাৎ জীবমাত্রই নারী আর তা না হলে সমার্থা রতির মানেও হয় না। এই দুই সাধনায় বিস্তর রহস্যময় গোপনস্বভাবা ভক্তিরসের প্রসঙ্গ আছে।’[৪৩] ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় উপরের মন্তব্যসমূহের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘সাদৃশ্যের অর্থ যে সব সময়ে প্রভাব নয় তা লেখক (ড. মুহম্মদ এনামূল হক) বোধ হয় ভুলে গিয়েছেন।৪৪ তাঁর এ সম্পর্কিত মত আগেই উল্লেখ করেছি। এখানে সংক্ষেপে এটুকু বলা যেতে পারে যে,–এই দু’টি ধর্মের (সুফি ও বৈষ্ণব) পথের দিশারী প্রেম ও ভক্তি, মূল উদ্দেশ্য ঈশ্বরের প্রেমলাভ-এক্ষেত্রে তারা এক হয়ে গিয়েছে।[৪৫] এ ক্ষেত্রে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ওপর ইরানীয় সুফি ধর্মের প্রভাব অস্বীকার করেন। তবে উভয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্যের তুলনায় সাদৃশ্য বেশি তা তিনি স্বীকার করেন। যাহোক, বাংলাদেশের প্রেমপন্থী মুসলমান সুফি কবি-সাধকগণ ঐশ্বরিক প্রেম ও সান্নিধ্য লাভের জন্য তাঁদের অন্তরে লালিত প্রবল প্রেমানুরাগে বৈষ্ণবীয় সাধনার সঙ্গে একাকার করে নিয়েছিলেন। যদিও বৈষ্ণবমতে ঈশ্বর হলেন পরম, সুফিমতে ঈশ্বর হলেন প্রেমিকা-নারী, জীব হ’ল প্রেমিক পুরুষ। জীবাত্মা- পরমাত্মা ও আশেক-মাশুকেরই বৈপরীত্যগত কারণ তাঁদের কাছে কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। ব্রজসুন্দর সান্যাল, রমণী মোহন মল্লিক, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আহমদ শরীফ, যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রমুখ পণ্ডিত-গবেষক অনুসন্ধান করে প্রায় শতাধিক ‘মুসলমান কবির প্রায় শ’পাঁচেক বৈষ্ণবীয় পদ আবিষ্কার ও বিশ্লেষণ করেছেন। শিতালং শাহের এ জাতীয় কয়েকটি গান আমাদের আলোচ্য।
শিতালং শাহের এ শ্রেণীর গানে নৈষ্ঠিক বৈষ্ণব কবির মত বৃন্দাবন, মথুরা, যমুনা, কৃষ্ণ, বৃষভানু, ললিতা, ব্রজধাম, কাশী, বৃন্দাবন, মোহন মুরলী গোকুল, কদম্বতলা প্রভৃতি স্থান – ব্যক্তি ও চিত্র আছে, এবং কবি যেভাবে রাধাকৃষ্ণের চরণে আপন অন্তরের আকুতি নিবেদন করেছেন, তাতে তাঁকে ‘বৈষ্ণব কবি’ ভিন্ন অন্য কিছু মনে হয় না। অথচ কবি ছিলেন মুসলমান সুফি-সাধক। তা সত্ত্বেও তাঁর গানে বৈষ্ণব কবিতার আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে। একটি গানে দেখা যায় রাধার অন্তরে কৃষ্ণ-বিরহের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত। বিরহের এ গানটিতে কৃষ্ণ-দর্শনের আকুতি ব্যক্ত হয়েছে অত্যন্ত প্রবলভাবে। কবি লিখেছেন-
‘বিষম তরংগনদী
না জানি সাঁতার,
ডাকি জগত কাণ্ডার
প্রভুকে স্মরণ করি
ভাসিলু কলংকিনী।
দেওয়ের হুংকার নদী
শব্দ হাহাকার
তাতে বানের সঞ্চার,
নাগের গর্জন আর
অন্ধকার যামিনী।
মথুরা নগরে প্রভু
রাজ্য ব্রজপুর
মধ্য হইল সমুদ্দুর
দরশনের নৌকা দিয়া
ভব তরাও নীলমণি।
ব্রজের রমণী
কাশী বিন্ধাবনবাসী
আমি গোকুল নিবাসী,
মথুরায় রহিলে প্রভু
পাই কিসেতে দুঃখিনী।’ (গান সংখ্যা-১৬)
শিতালং শাহের এ পদটি স্পষ্টই রাধাকৃষ্ণ-রূপক এবং আধ্যাত্মিক ভাবপূৰ্ণ। কবি এখানে পার্থিব-জগতের জীবাত্মার প্রতীক ‘কাশী, বিন্দাবনবাসিনী’ রাধা, আধ্যাত্মিক জগতের পরমাত্মার প্রতীক কৃষ্ণ, যিনি ‘ব্রজপুর রাজ্যে’ মথুরা নগরে আছেন, তাঁর সঙ্গে মিলিত হবার জন্য বিরহের আর্তি ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু মধ্যে ভীষণ তরঙ্গবিক্ষুব্ধ ভবনদী, দুর্যোগপূর্ণ ঘোর অন্ধকার রজনীতে কৃষ্ণপ্রেম-বিরহিনী রাধা ‘দরশনের নৌকায় ভেসে এই ভবসিন্ধু পার হতে চান। কবি নিজ অন্তরে ‘রাধাভাব’ অনুভব করে কৃষ্ণ-প্রেম পাওয়ার জন্য পদটির শেষে গেয়েছেন—
‘শিতালং ফকিরে কহে
বিরহের জ্বালা
কোথায় রইলায় চিকন কালা,
দুষ ক্ষেমিয়া সুদৰ্শনে
দান দেও প্রাণ রব্বানী।’
মুসলমান সুফি-কবি হয়েও শিতালং শাহ তাঁর গানে ‘যমুনার ঘাট’, ‘মোহন মুরলী, ‘কাংখেতে কলসী’, ‘গোকুল’, ‘কদম্ব বৃক্ষ’, ‘কালা’ (কৃষ্ণ), ‘ব্রজধারা’, ‘জলকিড়িলা’ ইত্যাদি বিষয়ে বৈষ্ণব কবির আন্তরিকতা গভীরভাবে অনুভব করেন। তাঁর আর একটি পদে কৃষ্ণলীলা কাহিনী আধ্যাত্মিক ও লৌকিক ব্যঞ্জনায় অভিব্যক্তি লাভ করেছে;
‘জলে নি যাইবার সখী গো
চলো প্রাণেশ্বরী
যমুনার ঘাটে
বাজে মোহন মুরলী।’ (গান সংখ্যা-৩০ )
কৃষ্ণের এই বংশি ধ্বনি যমুনার ঘাটে কদম্ব তলা তেকে ভেসে আসে শ্রীমতী রাধা ও গোকুলের সকল যুবতীর কানে। বাঁশির সুরে তাদের মন ‘উচাটন’ হয়,
‘বাঁশি বাজায় চিকন কালা
কোকিলার স্বরে
যুবতী সবের শুনি
দগ্ধে অন্তরে।
কাংখেতে লইয়া কলসী
যত ব্রজধারা
দেখিলা প্রভুর লীলা
খাড়া হইয়া তারা।’
কৃষ্ণ—প্রেমের মালা হাতে গোকুলের সকল যুবতী কৃষ্ণের প্রেমালিঙ্গন কামনা করে। কৃষ্ণ তাদের প্রেমভাবী অইয়া দেয় প্রেম আলিঙ্গন।’ অবশেষে তারা ‘জলকিড়িলা’ সমাপ্ত করে ‘কলসী ভরিয়া চলে।’ এ দৃশ্য ‘দেখিয়া চিকন কালা’র মন ‘আকুলিত’ হয়। কবি এজন্য আফসোস করে গেয়েছেন-
‘শিতালং ফকির কয়
ভবেতে আসিয়া
কলসী না হইলে ভরা
না ভজিলাম প্রিয়া।’
আর একটি গানে রাধা ‘গোপিগণ’ পরিবৃত্তা হয়ে যমুনার ঘাটে যাত্রা করে। এখানেও কদম্বতলায় ‘মুরলী বাজার শ্যামরায়।’ কবির এ দৃশ্য বর্ণনা এমন—
‘আগে পাছে সব ধনি
মধ্যে রাধা চন্দ্রমণি রে
ওরে, ঘাটে গিয়া পুলিনে দাঁড়ায়।’ (গান সংখ্য-২০)
যমুনার ঘাটে গিয়ে রাধা ‘প্রবেশিলে কদম্ব তলায়। তারপর—
‘চন্দ্রমণি বিষ খায়—
শ্রীমতী শ্রীরাধিকায় রে
ওরে, আনন্দিতে বিরাজে খেলায়।
হেরিয়া পরশমণি
প্রাণ নিলো সর ধ্বনি রে-
ওরে মুরলী বাজার শ্যামরায়।’
কবি এ দৃশ্য দেখে তাঁর অন্তরের আকুতি প্রকাশ করে গিয়েছেন—
‘শিতালং ফকির বলে,
বন্ধু বিনে দেহা[৪৬] জ্বলেরে
ওরে, প্রাণ ঝুরে তার প্রেমদায়।’
কবি তাঁর বৈষ্ণবভাবানুপ্রাণিত সবক’টি গান জুড়ে এভাবে ‘কৃষ্ণপ্রেম’ নিজ-অন্তরে অনুভব করেন। কবির হৃদয়ে ‘রাধা-ভাব’ জেগে ওঠে। রাধা জাত-কুল-মান বিসর্জন দিয়ে কৃষ্ণ- দর্শনে ব্যাকুল হয়েছে। কবি আর একটি গানে রাধার অন্তরের এ বিরহ ও বিচ্ছেদের ভাব ব্যক্ত করেন—
‘বিচ্ছেদের অনলে মোর
অংগ দহে নিরন্তর
বিরহেতে চিত্ত বিয়াকুল।
কি করিব হায়রে হায়
কংলকিনী তোর দায়
প্রেমভাবে গেল জাতিকুল।’ (গান সংখ্যা–২২)
কবি নিজেই অন্তরে এ ‘প্রেমভাব’ অনুভব করে বলেন—
‘শিতালং ফকিরে কহে
অন্তরে আনল দহে
জ্বলিয়া হইল ভস্মাকার।
রসিক বন্ধুয়া স্মরি
নীরবে বসিয়া ঝুরি
আইস প্রিয়া মন্দিরে আমার।’
কবি রাধার মতো অন্তরে ‘কৃষ্ণ–প্রেম’ অনুভব করেন। তিনি জীবাত্মার প্রতীকস্বরূপ। নিজ অন্তরে প্রজ্জ্বলিত বিরহের অনলে সকল অহংকারকে নাশ করে জীবাত্মা খাঁটি সোনায় পরিণত হয়। তখন তাঁর কাছে ‘মাটি ও সোনা’ একই বলে মনে হয়। পরম পুরুষ পরমাত্মার সান্নিধ্যলাভ ও তার মধ্যে লীন হয়ে যাবার জন্য জীবাত্মার এই কঠোর সাধনা। সকল বাধা- বিপত্তি লঙ্ঘন করে সেই পরম-সত্তার দরশন পাবার জন্য কবির অন্তরে আকুল আবেদন—
‘শিতালং ফকিরে কয়
শ্যামরে কালিয়া,
প্রকাশিত কর ঘর
দরশন দিয়া।’ (গান সংখ্যা-২৬)
কবি কোন কোন গানে ইরানীয় সুফি ধর্ম ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের ভেদ রেখা মানেন নি। বরং সেখানে ভবযন্ত্রণা থেকে মুক্তিপ্রয়াসী চিরন্তন মানবাত্মার ক্রন্দনধ্বনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। হিন্দু-মুসলমানের এই মিলিত সাধনায় আশেক-মাশুক ও জীবাত্মা-পরমাত্মা একাকার হয়ে যায়। সংসার-মায়ায় আবদ্ধ সকল মানুষকে কবি মুক্তির আহ্বান করেন—
‘তিরি-পুত্র ভাই-বন্ধু
কেউ না যাবে সংগে-
বিপাকে ঠেকিয়া কান্দে
ফকির শিতালংগে।’ (গান সংখ্যা-২৪)
কবির মতে মানবাত্মা পৃথিবীতে এসে বিপথগামী হয়ে নানা রকম কুকর্ম ও অসৎকর্মে লিপ্ত হয় এবং এর প্রভাবে পরমাত্মা বিস্তৃত হয়। কবি তাই বলেন—
‘শিতালং ফকির কহে
প্রবেশিয়া দুনিয়ায়ু
সত্য পথে মতি নাহি
কুকর্মেতে মতি যায়। ‘ (গোন সংখ্যা-২৫)
কবি আরও বলেন-
‘ভবে আইলায় বেপারেতে—
লইয়া পরার ধনু
সব খুয়াইলাম ভবে পেছে
অখন কি লইয়া গমন?
মন রে—
হুশ–বুদ্ধি লাগাইলায়
দুনিয়াদারী কাজে
কি ধন লইয়া বসত কতায়
কয়বরের মাঝে?’ (গান সংখ্যা-২৪)
কিন্তু সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ থেকেও জীবাত্মা নীরবে-নিভৃতে সাধনায় মগ্ন হয়ে অবশেষে পরমাত্মার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে মায়াজাল ছিন্ন করে। কবির মারফতি গানে এ তত্ত্বও ব্যাখাত হয়েছে—
‘মন রে
বেলা গেল সন্ধ্যা হইল
ভুলিয়া রইলায় কারে দেখি
সংগের সংগীলা সবে
দিয়া যায় রে ফাঁকি।’ (ঐ)
কিন্তু দেহরূপ ঘরের মধ্যে পরমারাধ্য ‘চিকন কালার’ বসতি। তাঁর দুয়ারে আবার কাল ‘ভুজংগিনী’। অপরূপ সৌন্দর্য মণ্ডিত মানব দেহে রয়েছে ‘আটশ’ চল্লিশ ‘কুঠরী’। সেখানে ‘চিকন কালা’র ‘অপরূপ লীলা’ চলে নিত্য। কবি বলেছেন-
‘ঘরের মধ্যেতে ঘর
অতি মনোহর
আট শ’ চল্লিশ তাতে
কুঠরী সুন্দর।
অপূর্ব কাহিনী ঘর
অপরূপ লীলা,
ভুজংগিনী দুয়ারেতে
ঘরে চিকন কালা।’ (গান সংখ্যা-২৬)
কবি মনে করেন ‘যোগা সনে’ বসে সেই পরশ পুরুষের ধ্যান করতে পারলে দুয়ার থেকে ‘ভুজংগিনী’ অন্তর্হিত হবে এবং ‘চিকন কালা’র সান্নিধ্য মিলবে। কবির গানে শোনা যায়—
‘যোগা সনে যোগ সাধি
যে করে ধিহান
সর্পের মস্তকে মারে
করিয়া নিশান।
কবি যোগাসনে বসে যে ধ্যান বা তপ-জপের কথা বলেন, তা ইসলামি পরিভাষায় সুফি মতে ‘জিকির।’ আর যিনি পরম পুরুষ-দেহা-ধারে যাঁর অবস্থান, তিনি বৈষ্ণবীয় ভাষায় শ্যামরায় কালিয়া’ (অর্থাৎ কৃষ্ণ)। কবি এ যুগল তত্ত্বের ব্যাখ্যা করে বলেছেন-
‘জিকিরের শব্দ শুনি
ভুজংগ দুর্জন
পথ ছাড়ি পলাইবে
করিয়া গর্জন।
দুয়ারে বসিয়া তপ
করে যেই জন,
সেই সে হইল যোগী
যোগের সাধন।’
কবির বিশ্বাস-জীবাত্মা এভাবে যোগ-সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে পারে। অবশেষে ‘শ্যামরায় কালিয়া’র সান্নিধ্যলাভে সক্ষম হয়
‘ঘরে প্রবেশিয়া রূপ
দেখিবে যখন, নিকুঞ্জে হইবে তার
প্ৰিয়া দৰ্শন।
শিতালং ফকিরে কয়
শ্যামরে কালিয়া,
প্রকাশিত কর ঘর
দরশন দিয়া।’ (ঐ)
কবি সাধনার জগতে জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায়ের কোনও ভেদাভেদ স্বীকার করেন না। কবি ছিলেন উদার-অসাম্প্রদায়িক। সুফি ধর্মের ভেতর থেকেই তিনি তা অর্জন করেছিলেন। একই গানের মধ্যেও কবি হিন্দু-মুসলমান এ দু’টি সম্প্রদায়ের মিলিত সাধনার চিত্র অঙ্কন করেন। তাঁর গানে হিন্দু-মুসলিম সাধনা গঙ্গা-যমুনার পৃথক দু’টি স্রোতধারা কেন একটি যুক্তবেনিতে পরিণত হয়ে সাগর-সঙ্গমে এসে মিলিত হয়।
শিতালং শাহের আধ্যাত্মিক গানের সুর বড়ই করুণ। ঘর ছাড়া মুক্ত পথের এই সন্ন্যাসীর করুণ সুরের গান বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে’ প্রবেশ ক’রে ‘মন-প্রাণ আকুল’ করে, উদাস করে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির নিকট এ গানের মূল্য শাশ্বত কালের। আজও এ গান বাঙালির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। বাঙালির লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যের ভাণ্ডারে এ গান অমূল্য সম্পদ, তাতে সন্দেহ নেই।
.
তথ্যপঞ্জি
১. বাংলা একাডেমী চরিতাভিধান, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৮৫, পৃ. ৩৭৫
২. লোকসাহিত্য সঙ্কলন ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৩৭০ সাল, পৃ.৩ (সম্পাদকীয়)
৩. লোকসাহিত্য সঙ্কলন ১ম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৩৭০ সাল, পৃ. ৩ (সম্পাদকীয়)
৪. ড. গোলাম সাকলায়েন, বাংলাদেশের সূফি সাধক, বাংলাদেশ বুক কর্পোরেশন, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৮৭ সাল, পৃ. ৭৩
৫. তদেব, পৃ. ৬৫
৬. ড. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের রাগ তালনামা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, ১৯৬৭, পৃ. গ (ভূমিকা)
৭. তদেব, পৃ. ছ–জ (ভূমিকা )
৮. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, জাতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্য, কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৪৮ সাল, পৃ. ২৫-২৬।
৯. ড. মুহম্মদ এনামুল হক, বঙ্গে সূফি প্রভাব, মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী।
১০. নীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায়, হিন্দুস্থানী সংগীতে বাঙালীর অবদান, দৈনিক বসুমতী, শারদীয়া সংখ্যা, ১৩৯১ সাল, পৃ. ৩১৫-থেকে উদ্ধৃত।
১১. লোকসাহিত্য সঙ্কলন, প্রথম খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৩৭০, সম্পাদকীয়, পৃ. ৩।
১২. ড. ওয়াকিল আহমদ, বাংলা লোকসংগীত : ভাওয়াইয়া, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৫ সাল, পৃ. ২৩-২৪।
১৩. ড. ওয়াকিল আহমদ, বাংলা লোকসঙ্গীত : ভাটিয়ালী গান, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৭, পৃ. ৩১।
১৪. ড. আশরাফ সিদ্দিকী, শুভেচ্ছাবাণী- জালালাবাদ লোকসাহিত্য পরিষদ স্মারকগ্রন্থ, সিলেট, ১৯৯৬ (ড. মযহারুল ইসলাম সম্পাদিত ফোকলোর পত্রিকা, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, ১৯৯৯-এ নন্দলাল শর্মার প্রবন্ধ—সিলেটে ফোকলোর চর্চা : ব্রিটিশ আমল, পৃ. ১৩৯-তে উদ্ধৃত)
১৫. পূর্বোক্ত প্রবন্ধে উদ্ধৃত (এস.এম. গোলাম কাদিরের প্রবন্ধ ‘সিলেটী নাগরি লিপি’, ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৯, পৃ. ৫)
১৬. প্রফেসর মযহারুল ইসলাম সম্পাদিত ফোকলোর পত্রিকায় নন্দলাল শর্মার পূর্বোক্ত প্রবন্ধ, পৃ. ১৩৯
১৭. শ্ৰীম-কথিত মেহেন্দ্ৰনাথ গুপ্ত) শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত, পূর্ণ প্রকাশন, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৮৬, পৃ. ৩৩।
১৮. বানাই—তৈরি করে
১৯. অজুদ-শরীর
২০. বেপার-লাভ
২১. কুঞ্জি-চাবিকাঠি
২২. আছানীতে-আরামে
২৩. কয়বরের-কবরের
২৪. তিরি-স্ত্রী
২৫. অইলো-হ’ল
২৬. জংগসং-সাথী
২৭. থেকে—মাতোয়ারা হয়
২৮. চাদিকেতে চারদিকে চাদিকেতে-চারদিকে
২৯. তজল্লি-ঔজ্জ্বল্য
৩০, হালকাবন্দী-খাড়া হয়ে
৩১. রহানীআরতি-আমার সঙ্গে সম্পৃক্তি, Spiritual
৩২ R.A. Nicholson, Studies in Islamic Mysticism, Cambridge University, Reprinted in 1967, pp. 49-50
৩৩. Ibid, P. 89
৩৪. বিদিত-সাক্ষাৎ
৩৫. ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, ৩য় খণ্ড, প্রথম পর্ব, মডার্ণ বুক এজেন্সী প্রা. লি. কলিকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৮০, পৃ. ৭৭৮
৩৬. তদেব
৩৭. ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত, ‘বাংলার মুসলমান বৈষ্ণব কবি’ প্রবন্ধ, বিশ্বভারতী, মাঘ-চৈত্র (দ্রষ্টব্য যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, ‘বাঙ্গালার বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি’, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ২য় সংস্করণ ১৯৬২, পৃ. ১৫৯, পরিশিষ্টে সংযোজিত প্ৰবন্ধ।
৩৮. মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের হারামণি নামক বাউলগানের সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা, পৃ. ১
৩৯. ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৮৩
৪০. যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩
৪১. D. Muhammad Enamul Huq, Muslim Bengali Literature, pp. 49 50, বিস্তৃত আলোচনার জন্য বঙ্গে সূফি প্রভাব, পৃ. ১৪০-১৫৫; মুসলিম বাংলা সাহিত্য, পৃ. ২৩০-২৩৭ দ্রষ্টব্য। ড. মনসুর মুসা সম্পাদিত মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (প্রথম খণ্ড), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯১
৪২. আবদুল হাফিজ, ‘বাংলা রোমান্স কাব্য পরিচয়’, মুক্তধারা, প্রথম প্রকাশ, ১৯৭৬, পৃ. ৩৯
৪৩. তদেব
৪৪. ড. অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৮৮ (পাদটীকা)
৪৫. তদেব, পৃ. ৭৭৮
৪৬. দেহা-দেহ—শরীর
