প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

মরমী সাধক শিতালং শাহ : মহবুবুল বারী

মরমী সাধক শিতালং শাহ – মহবুবুল বারী

‘অসংখ্য রতনরাজি বিমল, উজল,
অগাধ সাগর গর্ভে রয়েছে তিমিরে।
বিজনে খুটিয়া কত কুসুমের দল,
বিফলে, সৌরভ ঢালে মরুর সমীরে।’

ইংরেজ কবি গ্রে’র এই কটি কথা তাঁর বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতারই পরিচায়ক। কবির এই কথা সব কালে, সব দেশে ফলে আসছে। অখ্যাত, অজানা তমসাচ্ছন্ন পল্লীর নিভৃত কোনে কত সাধক, আউল, বাউল, ফকির-দরবেশ, কত প্রেমিক, কত মরমী স্বভাব কবি জন্ম নিয়েছেন, নিজেদের চরিত্র সুষমার সেই নিভৃত পল্লীকে আলোকিত করে মহাকালের বুকে একদিন হারিয়ে গিয়েছেন, আমরা তাঁদের ক’জনার খবর রাখি। প্রতিভার এইসব বরপুত্রেরা ‘বিপুলা এ পৃথিবীর’ একান্তে জন্ম নিয়েছেন। সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর সহজ সরল জীবন নিয়ে নিরবে নিভৃতে নিজেদের প্রতিভাকে অকৃপন হাতে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়ার আনন্দে বিভোর থেকে একান্তেই বিলীন হয়ে গিয়েছেন। পৃথিবীর মানুষ সে দান গ্রহণ করলো কি করলো না সেদিকে তাঁদের ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও ছিল না।

লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির পূণ্য তীর্থভূমি এই বরাক-সুরমা-কুশিয়ারার দুতীরের অগণিত পল্লীর বুকে জন্ম নেওয়া এমনি কত সাধক কবি আপনাতে আপনি বিভোর হয়ে বন বিহঙ্গের মত কুজন তুলেছেন।

সে কুজন শুধু রসিকজনের কানেই বাজতো। এ কথা না বললে সত্যের অপলাপ হবে যে—বিশ্ব সাহিত্যের আসরে এইসব সাধক কবিদের প্রতিভার আলো উপেক্ষিত হলেও পল্লীর মেটো ঘরের মাটির পিদিমের মতো এই উপত্যকার হাটে-মাঠে, পথে-প্রান্তরে তাঁদের প্রতিভা আবহমান কাল থেকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে আসছে। যতদিন রাখালিয়ার বাঁশি, চাষীর হাল, মাঝি-মাল্লার বৈঠা, বাউলের একতারা তাঁদের হাতে থাকবে তত দিন তাঁদের কণ্ঠে এইসব পল্লী সংগীতের সুরের মূর্ছনা উঠবেই, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাছাড়-করিমগঞ্জ যদিও আজ বঙ্গ বহির্ভূত কিন্তু ভৌগোলিক দিক থেকে, ব্যবহারিক জীবনে, আচার আচরণে রীতিনীতি সাহিত্য সংস্কৃতিতে এই দুটি জেলা সুদূর অতীত থেকে বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সূতিকাগার থেকে তার সহচরী। কাছাড়-করিমগঞ্জের লোকসাহিত্য বলতে বৃহত্তর বাংলার লোক সাহিত্যকে বুঝায়।

গ্রাম কাছাড়ের (এখানে আমি অবিভক্ত কাছাড়ের কথা বলছি) বুকে লোকসাহিত্যের সৃষ্ট কত যে স্বভাব কবি জন্ম নিয়েছেন, বনফুলের মত নির্জনে তাঁদের সুবাস ছড়িয়ে মহাকালের বুকে একদিন ঝরে পড়েছেন, কে তার হিসাব রাখে। পল্লীর প্রান্তরে কত সাধকের সুর হারিয়ে গিয়েছে কে তা মনে রাখে।

যে সব সাধক ও স্বভাব কবিদের রাগিণীতে এই উপত্যকার পল্লী প্রান্তর ঝংকৃত হয়েছিল তাঁদের সংখ্যা নগণ্য নয়। বরাক-সুরমা-কুশিয়ারার জলহিল্লোলে আজও যাঁদের সুরের মুর্ছনা কেঁপে কেঁপে ফিরে সে সব স্বভাব কবিদের জীবন তথা তাঁদের সৃষ্টি সম্পর্কে আজকের ডিসকো যুগের প্রজন্ম কতটুকু ওয়াকেবহাল তা বলা মুস্কিল।

বরাক উপত্যকার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বৈচিত্র্যময় তথ্য পূর্ণ সুষমায় ভরপুর করে তুলতে এ অঞ্চলে যুগে যুগে জন্ম নিয়েছেন আউল-বাউল, ফকির-দরবেশ, সহজিয়া সুফি সাধক। এঁদের মধ্যে রয়েছেন গোলাম হোসেন শাহ্, ফকির ভেলুয়া শাহ্, দইখুরা শাহ্, শাহ নূর, মুন্সী ইরফান আলী, সাধক রাধারমণ দত্ত, দীন ভবানন্দ, গোলক চাঁন্দ গোঁসাই, ফকির শিতালং শাহ্ প্রমুখ

শিতালং শাহ্—ভাবের মানুষ ইনি। মানুষের প্রেমকে ঈশ্বরের প্রেমে রূপায়িত করাই ছিল তাঁর জীবন লক্ষ্য। প্রেমের দেবালয়ে পৌছুনোর একটি মাত্র পথ হলো সমর্পণ বা ‘সারেন্ডার’। সব কিছু ঈশ্বরের কাছে সঁপে দেওয়া, সব কিছুকে ঈশ্বরের দান বলে মেনে নেওয়ার মধ্যেই জীবনের আনন্দ তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। ফকির শিতালং শাহ্, ধ্যানে, জ্ঞানে, অন্তরের অন্তঃস্থল দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁর ‘আমিত্ব’ তাঁর নয়। দু’দিনের পান্থশালায় মানব জীবনের দোষ গুণ, ভালমন্দ, পাপ পুণ্য, সাফল্য ব্যর্থতা কিছু ঈশ্বরের কাছে সমর্পণের মহাজীবনের মহানন্দের স্বাদ খুঁজে পেয়েছিলেন শিতালং শাহ্। আর তারই ফলশ্রুতিতে মহাসৃষ্টির বিরাট রহস্যের দ্বারোদ্ঘাটন করতে গিয়ে তিনি রচনা করেছেন অজস্র গীত আর সুর। যে সুরের আনন্দে নিজে হয়েছেন আত্মহারা আর অন্যকে করেছেন পাগলপারা। নাইটেংগলের গান কীট্সকে এক স্বপ্নময় রাজ্যে নিয়ে গিয়েছিল। স্কাইলার্কের গান শেলীকে পৃথিবী থেকে নিয়ে গিয়েছিল সীমাহীন উদার নীলিমায়। ঠিক তেমনি বরাক উপত্যকার সাধক কবি শিতালং শা’র ‘সুয়া পংখী’ খাঁচা ছেড়ে মিশে যেতে চাইছিল মহাসৃষ্টির মহান স্রষ্টার সাথে

‘সুয়া উড়িল রে জীবের জীবন সাধন
সুয়া উড়িল রে।
আর লা মোকামে ছিলায় সুয়া
আনন্দিত মন,
পিঞ্জিরায় থাকিয়া কইলায় প্রেমের সাধন।
এগো ছাড়িয়া যাইতে কিন্তু না লাগে বেদন,
সুয়া উড়িল রে…….’।

সুফি সাধক শিতালং শা’র আসল নাম হলো মুন্সী মুহাম্মদ ছলিমুল্লাহ। পিতা মুহাম্মদ জাহান আলী বক্সও ছিলেন সাধক প্রকৃতির যিনি প্রধানতঃ কামাল শাহ্ নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। ঢাকার অধিবাসী ফকির কামাল শাহ্ ব্যবসা সূত্রে কাছাড়ে এসে বদরপুর থানার শ্রীগৌরী গ্রামের মুহাম্মদ কালা মিয়া সাহেবের ফুফু (পিসি) ছুরত বিবিকে বিয়ে করে এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। শিতালং শা’র সঠিক জন্ম তারিখ জানা না গেলেও আনুমানিক বাংলা ১২০০ থেকে ১২০৭ সনের মধ্যেকার কোন এক সময়ে জন্ম নেন। শিতালং শা’র বাল্যাবস্থায় তাঁর পিতা সপরিবারে শিলচর মহকুমার কাটিগড়া থানার তারিণীপুর গ্রামে এসে বসতি পাতেন।

‘শিতালং নামে মোর গুনা বেশুমার।
কৃপা যদি করে আল্লা করিম গফ্ফার।
মুহাম্মদ ছলিম ওরফে দোষ গুণে মাজুর।
জাহা বখশ্ আলী নাম মোর পিতার মাশুর।।
পরগনা চাপঘাটে মোর পয়দিশ সেথায়।
শ্রীগৌরী মৌজা এক শিলচর খিত্তায়।।
আমার পয়দিশ স্থান আছর মাশুর।
এ যাবত্ নিবাসিত পরগনে মজকুর।।
শিতালং ফকিরে মাংগে দরগায়ে আল্লার।
নবীর উছিলা বিনে গতি নাহি তার।।’

বাল্যাবস্থায় শিতালং শাহ্ তারিণীপুরের নিকটে ফুলবাড়ি গ্রামে হাজী তিতু মিয়া সাহেবের কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ গ্রহণ করে সিলেট জেলার গোপালগঞ্জ থানার অধীন স্বনামখ্যাত ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে তারিণীপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু হৃদয়ে যাঁর ফকিরি বীজ রয়েছে তিনি কি গৃহকোণে বন্দী থাকতে পারেন? একদিন কাউকে না বলে সবার অজান্তে মাঠের হাল ফেলে রেখে পালিয়ে যান। কাছাড়ের পূর্ব সীমান্তে ভুবন পাহাড়ে প্রবেশ করে দীর্ঘদিন জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান তিনি। ভুবন পাহাড় থেকে জৈন্তিয়া পহাড়ের ভেতর দিয়ে সুনাম গঞ্জের লাউয়ের পাহাড় পৌঁছে সেখানে আধ্যাত্মিক সাধনায় রত হন। কিংবদন্তি—লাউয়ের পাহাড়ে সাধানরত অবস্থায় থাকাকালীন একদিন রাতে শিতালং শা’র মা তাঁর পুত্রকে দেখার মনস্কামনা করলে একদিন রাতে শীতালং শাহ্ বাঘের পিঠে চড়ে এসে মাকে দেখা দিয়ে মায়ের অনুমতি নিয়ে আবার পূর্ব স্থানে ফিরে যান। ভুবন পাহাড়ে রয়েছে বিখ্যাত প্রাচীন শিব মন্দির। সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে আজ অবধি প্রতি বছর শিবরাত্রির সময় এখানে শিবের মেলা বসে। স্বাভাবিক কারণেই ভুবন পাহাড়ে রয়েছে বহু সাধুসন্ন্যাসীর আস্তানা। সাধক শিতালং শাহ্ ভুবন পাহাড়ে অবস্থানকালে সেইসব সাধু সন্ন্যাসীর সাথে আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে যেসব তর্ক বিতর্ক করেছেন তাঁর রচনাবলীতে এর কিছুটা আভাস মিলে।

‘অবোধ মন তোমার।
কানু বলা আছেনি স্মরণ
এ ভবেতে প্রবেশিয়া হলে বিড়ম্বন :
আপনার কর্মফলে জন্ম ভবকুলেরে,
কানু বলা ভুলিলে বে ভুলেরে,

কিংবা       দূতি গো! আমার ভক্তি চিতে প্রেম রসে
না হইল শৃঙ্গার
কুঞ্জি তালা না খুলিল না হইল বিহার
বন্ধু বিনে অঙ্গ মোর অসার অসার।’

শিতালং শাহ্ জঙ্গলের একান্ত আধ্যায় সাধনা শেষে তারিণীপুরের বাড়িতে ফিরে এসে বদরপুরের গড়কাফন মৌজার মুহাম্মদ আছিম মোল্লা সাহেবের মেয়েকে বিয়ে করে গড়কাফনেই বসবাস শুরু করেন। গড়কাফনে তাঁর সেই বাড়ি আজ বরাকের গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়াছে। গড়কাফনে তার অবস্থানকালে সেখান থেকে ৪-৫ মাইল পশ্চিমে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ থানার বারঠাকুরী গ্রামের এক ব্রাহ্মণ তাঁর বাড়িতে পাখি ও বানরের উপদ্রবে অতিষ্ট হয়ে এর হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় শিতালং শা’র দ্বারস্থ হন। সাধক শিতালং শাহ্ বারঠাকুরী গিয়ে আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় পাখি ও বানরের উপদ্রব চিরতরে বন্ধ করে দেন। এতে ব্রাহ্মণ খুশি হয়ে ঐ বাড়িটি শিতালং শা’কে দান করেন। সেই থেকে শিতালং শাহ বারঠাকুরীতে বসবাস শুরু করেন। বাংলা ১২৯৬ সনের ১৭ অগ্রহায়ণ এই মরমী সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন।

সাধক কবি শিতালং শাহ্ ছিলেন আধ্যাত্মিক মার্গে বিচরণকারী শরিয়তের অনুরাগী পীর। তার সাধনা ছিল ইছলামের শরিয়ত মোতাবেক। আত্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধি লাভের শেষে শিতালংশা পদবী শিতালং খুব সম্ভবত আরবী শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে পায়ের গোড়ালি। আধ্যাত্মিক সাধনার সময় তাঁর কাব্য প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ইছলাম ধর্মের সাধন-ভজন, রীতিনীতি সম্পর্কিত বাংলা, অসমীয়া, মণিপুরী, আরবি ফার্সি উর্দু ইত্যাদি বিভিন্ন ভাষা মিশ্রিত অসংখ্য রাগের রচয়িতা শিতালং শাহ্ কাছাড়ের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আজও দেদপ্যিমান। সিলেটি নাগরি অক্ষরে হাতের লিখা এসব রাগ ‘মুকিল তরান’ কেয়ামতনামা’, নামে দুইটি পুস্তকের কয়েকটি খণ্ডে লিপিবদ্ধ আছে।

জনশ্রুতি, সাধক শিতালং শাহ্ নাকি তাঁর গান ছাপা করতে নিষেধ করে গিয়েছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, শিতালং শাহ্ নিজেই তাঁর রাগ সমূহের সুর দিতেন। নিজের লেখা রাগ সমূহের ভুল নিজেই সংশোধন করতেন। শিতালংগি রাগের মধ্যে রাগ জশে জলেস্বরী, রাগ বিলাপ, রাগ তুড়ী, রাগ পট মঞ্জরী, রাগ কামেশ্বরী প্রধান গান অধিক প্রচলিত। সাধক কবির নির্দেশ মানতে গিয়ে কেউ এসব রাগ রাগিনী সমৃদ্ধ শিতালং ‘ফকিরের গান’ সংগ্রহ কিংবা লিপিবদ্ধ করার দুঃসাহস দেখান নি। যার ফলে আজ শিতালং ফকিরের গান এতদঞ্চলে লুপ্তপ্রায়। এই প্রতিবেদকের পিতা কাছাড়ের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বিশিষ্ট গবেষক প্রয়াত আব্দুল বারী সাহেবে করিমগঞ্জ হাই স্কুলে শিক্ষকতাকালীন ১৯২৮ সনে গরমের ছুটিতে শিতালংগি গান’ সংগ্রহের উদ্দেশ্য অধুনা বাংলা দেশের ‘হাকালুকি’ হাওরে পাড়ি জমান। বিরাট হাকালুকির মাঝি মাল্লাদের কাছ থেকে মুখে মুখে শুনা শিতালং ফকিরের অজস্র গান বারী সাহেব তাঁর ডায়েরীতে লিখে নেন। দীর্ঘ এক সপ্তাহের সফল প্রচেষ্টার শেষে তিনি ফিরার পথে এক নৌকা দুর্ঘটনার ‘সম্মুখীন হন। নৌকা উল্টে গিয়ে তাঁর অন্যান্য বহু মূল্যবান নথিপত্রের সাথে বহু শ্রমে সংগৃহীত শিতালং ফকিরের গানও হাকালুকির অথৈ জলে হারিয়ে যায়। এরপর তিনি আর কখনও এ ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালান নি।

ঈশ্বর প্রেমে বিভোর সাধক কবি পার্থিব ভোগ লালসার উর্ধে। দেহজ প্রেম নয়, সুতরাং কলংকের ভয় কি

‘পিরীতের ছেল বুকে যার,
কংলক তার অলংকার,
কুল মানের ভয় নাইরে তার।
যার গলে পিরীতের ফাঁসি,
সে হয় সকলের দাসী গো,
এগো, লোকের নিন্দন, পুষ্প চন্দন,
অলংকার পহরাইছি গায় গো।’

প্রাণপ্রিয়কে হৃদয় মন সব উজাড় করে দিয়ে তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়ার মাঝেই ত’ পরিপূর্ণ প্রেমের সার্থকতা।

‘দিয়া প্রাণ কুলমান মন পাইলাম না সজনী।
আমি হইলাম গো সহ কুল কলংকিনী।।
আমি দিলাম রূপ দর্শনে, কর্ণ দিলাম নাম শুনি।
এগো, নাম দিলাম তার অঙ্গের বদল।।
প্রাণ দিলাম তার নিশানী।’

নশ্বর এই দেহের লীলা বুঝাও মুস্কিল। প্রাণশ্বরের চির সান্নিধ্য লাভে যে দেহ ছট্‌পট করছে তাকে খাঁচায় আটকে রাখা যায় কি?

‘দেহার লীলা অসম্ভব,
শুনলে হবে হাল বেহাল,
দেখ মন তোর হৃদয় গুলে লাল।
রূপ সিন্ধু যমুনার মাঝে,
বেরংগের প্রাণ বন্ধু সাজ মোর—
আর নিজ দেশে যাইতে পাখীর
পুরিল মেয়াদ,
এগো পিঞ্জিরা হইল খালি
হইয়া বরবাদ।।’

সাধক কবি লালন শাহ্, হাছন রাজা প্রমুখ সুফি সাধকদের সমমর্যাদারী অধিকারী বরাক উপত্যকার লোক সাহিত্য ও লোক সংস্কৃতির একনিষ্ঠ এই মরমী সাধক কবির জীবনালেখ্য তথ্য তাঁর দুষ্প্রাপ্য রচনাবলীর যথাযথ সংগ্রহণ তথা সংরক্ষণের বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা ত’দূরের কথা সুফি সাধকের নামও আজকের প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত।

আজ আমরা ইংরেজি, ফরাসি, রুশ প্রভৃতি বিদেশী ভাষা তথা সাহিত্য-সাহিত্যিকের জীবনী, রচনা ইত্যাদি সংগ্রহে ব্যস্ত। বিদেশী পপ্ সংগীত, ডিসকো আদি সংগীত নিয়ে মত্ত। ভালো কথা, কিন্তু আমাদের ঘরের অন্ধকার কোনে যে সাধক শ্রেষ্ঠ শিতালং শাহ্ প্রমুখ পল্লী কবিদের গান, যে গুলি নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির অমূল্য রত্ন, সেগুলি আমাদের ঔদাসীন্য,উন্নসিকতায় অবহেলায় ধুলি মলিন হচ্ছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির তাগিদে সেগুলিকে পাদ প্রদীপের আলোয় তুলে ধরা আমাদের কর্তব্য নয় কি? উপসংহারে তাই সাধক কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে

‘হায় হায় রে, মনু রায়রে,
দিনে দিনে দিন যায় রে,
তোর হিসাবে ঘটায়,
মনাধন হায় হায় রে।
মনা রে ও মনাধন,
তুমি বেপারী সুনজরে,
কি ধন তোর সংগে ছিল রে,
না কইলে যতন, মনা দিন যায় রে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *