সুফি শিতালং – ফজলুর রহমান
পরিচিতি
‘আল্লাজি, ভবের মায়ায় মজি কইলাম রং ঢং
বিপাকে ঠেকিয়া কান্দইন ফকির শিতালং।’
উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের প্রথম পাদে সিলেট ও কাছাড়ের ঘরে ঘরে এই জাতীয় বাউল গানের ছিল ছড়াছড়ি। শিতালং ফকিরের গান ভক্তজনের মরমে পশে প্ৰাণ আকুল করত।
মরমী কবিদের মধ্যে সুফি শিতালং-এর স্থান অতিউচ্চে। তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ সলিম। শিতালং তাঁর তখলুস।
শিক্ষাদীক্ষা
লেখাপড়া করার উদ্দেশ্যে মোহাম্মদ সলিম যান গোলাপগঞ্জের ফুলবাড়ি। সে সময়ে ফুলবাড়ি ছিল দ্বিনিয়াও মারিফতি শিক্ষার অন্যতম কেন্দ্র। মির হাজারা বংশের আল্লামা আজির উদ্দিন স্থাপন করেন ফুলবাড়ি মাদ্রাসা। প্রাথমিক অধ্যয়ন শেষ করে সলিম আজিরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন।
এই মাদ্রাসায় অধ্যয়ন কালে তিনি আধ্যাত্মিক বিদ্যায় পারদর্শী কতিপয় শিক্ষকের সংস্পর্শে আসেন। এঁদের সংস্পর্শে ও ছহবতে সলিম আকৃষ্ট হন ইলমে মারিফতের দিকে।
কবির নিজের ভাষায়
‘শাহ আবদুল আলী মোর পীর দস্তেগীর
হাছিল মুরাদ ছিলা বাতিনে জাহির।
মুরশিদ কামিল শাহ আব্দুল ওহাব
তিনির প্রসাদে হৈল ধেয়ানেতে লাভ।
দ্বিতীয় মুর্শিদ শাহ আব্দুল কাদির
শিশুকালে কেরামতি আছর জাহির।
এই দুই সাহেবে লোরে রাখিয়া কৃপায়
ভেদ মৰ্ম শিক্ষা দিলা তওৰ্জ্জু নির্ঘায়।’
‘…শাহ আব্দুল ওহাব ছিলেন একজন স্বনামধন্য কবি। ‘হাসর তরান’’ভব তরান’, উম্মিত রান’ ও ‘ভেদকায়া’ প্রভৃতি তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ—সিলেটি নাগরি ভাষায়। করিমগঞ্জ ও কাছাড় অঞ্চলে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মিয়া সাহেব নামে’। তিনি শরিয়তের আলিম ও মারিফতের কামিল মবল্লিশ ছিলেন। তাঁর তরিকা ছিল নক্শ বন্দিয়া।
মীর হাজারা বংশের ও নিয়ে কামিল ছিলেন হযরত শাহ আবদুল কাদির। তিনি বিখ্যাত ফার্সি গ্রন্থ ‘বাহরে ছালেকিন’-এর রচয়িতা। সুফি শিতালং এর স্বীকারোক্তি মতেই জানা যায় যে শাহ আব্দুল ওহাব ও শাহ আব্দুল কাদির ছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু। শিতালং আরবি ও ফার্সি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি ভাল বাংলাও জানতেন। তাঁর রচিত সঙ্গীত সমূহ হতেই পাওয়া যায় তাঁর ভাষাজ্ঞানের পরিচয়।
শিতালং-এর সাধনা
শিতালং এর বাল্যকালে তাঁর পিতা জাহান বখশ কোন অজ্ঞাত কারণে শ্রীগৌরী ত্যাগ করে কাছাড় জেলার তারিণীপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে জাহান বখশ বদরপুরের সন্নিহিত দেওরাইল গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করেন। এই দেওরাইল গ্রামেই সুফি শিতালং-এর শ্বশুরালয়।
অধ্যয়ন সমাপনের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সাধক জীবনের সূত্রপাত। তিনি সংসারে প্রবেশ না করে কঠোর সাধনায় মগ্ন হন। তাঁর সংকল্প ছিল—মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন। মাস, বছর গত হল, তিনি তন্ময় চিত্তে খোদার আরাধনায় মগ্ন। এইরূপে লাউড়ের পাহাড়ে ও ভুবনের পাহাড়ে নির্জনে দীর্ঘ বার বছর অতিবাহিত করেন। অবশেষে করুণাময়ের দয়ায় তাঁর সিদ্ধিলাভ হয়। মোহাম্মদ সলিম হলেন সুফি শিতালং শাহ। শিতালং শাহ সম্বন্ধে বহু অলৌকিক কাহিনী সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলে প্রচলিত।
সংসারী শিতালং
সিদ্ধিলাভের পর শিতালং সংসারে প্রবেশ করেন। দেওরাইল গ্রামে এক মহিলার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিতালং। ক্রমে ক্রমে তাঁদের তিন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। এদের বংশধরগণ এখনও দেওরাইল গ্রামে বসবাস করছেন। ভাঙ্গা বাজার রেলওয়ে স্টেশনের নিকটবর্তী বার ঠাকুরী গ্রামে তাঁর মাজার বর্তমান। তিনি তাঁর কবর পাকা করতে নিষেধ করেছিলেন। অনেক ভক্ত এখনও শিতালং শাহের মাজার যিয়ারৎ করে ফয়েজ হাসিল করেন। তাঁর সাধনায় সিদ্ধিলাভের সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। বহুলোক তাঁর মুরিদ হতে ভিড় জমায়। তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে ফকির ভেলাশা ও শাহ মোঃ ইয়াছিন সুপরিচিত। তাঁর মতে আল্লাকে পেতে হলে রসুলকে ধরতে হবে। আর রসুলকে পাওয়ার একমাত্র পথ শরিয়তের আহকাম আরকান মেনে চলা। তিনি নিজে ছিলেন শরিয়তের পা’বন্দ। তাঁর গানের মাধ্যমে তিনি বিশ্ব মুসলিমকে শরিয়ত মেনে চলতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মতে শরিয়ত ছাড়া মারিফত হাছিল হয় না।
সংসারে প্রবেশ করে শিতালং সঙ্গীত রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রায় ১২০০ পৃষ্ঠা ব্যাপী গানের বই তিনি রেখে গেছেন সিলেটি নাগরি হরফে। তাঁর গানসমূহ ‘মুশকিল তরান’, ‘কিয়ামত নামা’ ও ‘রাগ বাউলা’ এই তিনখণ্ডে বিভক্ত। তিনি তাঁর গান ছাপিয়ে প্রকাশ করতে নিষেধ করে গেছেন। তাঁর রচিত অনেক গান সিলেট ও কাছাড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
বেনামাজিগণের বিরুদ্ধে তাঁর গানের ভাষা অত্যন্ত কঠিন ও কঠোর। … আধ্যাত্মিক জগতের অধিবাসী যাঁরা, তাঁরা এই পৃথিবীকে ও পার্থিব সম্পদকে অতি তুচ্ছ জ্ঞান করেন। পার্থিব জীবন মুসাফিরের জীবন, আর এই দুনিয়া মুসাফির খানামাত্র। শিতালং ফকিরও এই সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। মরণের পর শুধু দান খয়রাতের প্রতিফল সঙ্গে যাবে; আর কিছু নয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সংসার অসার। এখানের সম্পদের কোন সত্যিকারের মূল্য নাই, তাই লিখলেন—
‘জর জমিত সব থইয়া করিবায় গমন
কেবল সঙ্গতি কাফন মনারে।’…
প্রেমাস্পদকে পাওয়ার জন্য, অজানাকে জানার জন্য তাঁর কি করুন কাকুতি মিনতি। মারিফতের ধ্যান ধারণা সম্মন্ধে তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় তাঁর গানের মধ্যে বর্তমান। মানুষের অজুদ অর্থাৎ শরীরের গূঢ় রহস্য সম্বন্ধে তিনি বলেন—
‘বাহান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি আদমের অজুদে
কৌশল করিয়া পয়দা করিছে মাবুদে।’…
তাঁর মতে যাঁরা প্রেমের পথিক, তাঁদের চলন বলন আচার ব্যবহার অদ্ভুত ও আচানক। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের মিল নাই।
‘পীরিতের ছেল বুকে যার কলংক তার অলংকার
কুল মানের ভয় নাইরে তার।’
পার্থিব জগতের অসারতা ও পরকালের মূলধন সঞ্চয়ের তাকিদে তিনি অনেক বাউল গান লিখেছেন।
