প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

শিতালং শাহ : এস এম গোলাম কাদির

শিতালং শাহ – এস এম গোলাম কাদির

শিতালং শাহ ১২০৭ বঙ্গাব্দে (১৮০০খ্রি.) বর্তমান করিমগঞ্জের শ্রীগৌরী মৌজায় মুনশী জাহান বক্সের ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম মুহম্মদ সলীম। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও মেধাবী ছিলেন বলে জানা যায়। আরবি-ফারসিতে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল। বাংলা মধ্যবঙ্গ পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছিলেন এবং নিজে মুনশী খেতাবধারী ছিলেন। কিন্তু রচনায় শিতালং ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। মারেফতপন্থী সাধনায় তাঁর জীবনে সিদ্ধি এসেছিল। তাঁর রচনায় সে কথার আভাস আছে। তিনি ‘মুস্কিল তরান’, ‘কিআমতনামা’ ও ‘রাগ বাউল’ নামে তিনটি পাণ্ডুটিপি তৈরি করেছিলেন বলে প্রকাশ।[১] তাঁর রচিত গানগুলো সিলেটে বহু প্রচলিত এবং সাধক মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিতালং শাহ্ ১২৯৬ বঙ্গাব্দে (১৮৮৯ খ্রি.) পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর অনেকদিন পর ১৯৪৭ সালে সৈয়দ মুর্তাজা আলী বি. এ. বি.টি. ‘শিতালংগি রাগ’ নামে কিছু সংখ্যক গান প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু কবির বংশধররা তাতে বাধা দিলে তিনি আর অগ্রসর হননি।[২] এদিকে সে পুঁথিও বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য। ফলে শিতালং শাহের মূল্যবান গানগুলো মুখে মুখে গীত ও প্রচারিত হতে হতে মূল রচনায় বহু প্রক্ষেপ ঢুকে পড়েছে, নির্ভুল পাঠ উদ্ধার প্রায়ই সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই অজ্ঞ উত্তর পুরুষেরা এমনিভাবে বিজ্ঞ পূর্ব-পুরুষের মনীষা ও সাধনাকেও বিত্তবেশাতের মত উত্তরাধিকার মনে করে তার সর্বনাশ করে থাকেন।

শিতালং শাহ একজন উচ্চাঙ্গের সাধক ছিলেন। তাঁর রচনায় বিভিন্ন স্তরের অনুসরণ ও প্রকাশ দুর্লভ নয়। এটি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তাঁর মানসবিকাশেরই অনুসৃতি। প্রথম নাছুত মোকাম-এর সাধনায় তিনি শরিয়তের সৌন্দর্য ও সত্যের অনুসারী—

নমাজ আজব চিজ নমাজ অমূল্য ধন
শিখরে ভাই নমাজের শাধন।।
কেন আইলাএরে এ ভবের মাঝ
এ ভবে আশিআ না পড়লাএ নমাজ
কলেমা নামাজ রুজা কররে শাধন
নবিজির তরিকে কর আল্লারে শরণ।।

আল্লাকে স্মরণের পথ ত নবী করিম প্রদর্শিত পথই। সে পথই অভীষ্ট সিদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, এই নামাজের ভেতরেই অসাধারণ সত্যের ইঙ্গিত আছে—

জাএ নমাজে মানব লিলা
জাএ নমাজে রুপের খেলা গ
মুখের মাঝে মুখ দিআ
হরির মধু খাওরে মন।
শিখরে ভাই নমাজের শাধন।।

অদৃশ্যকে দৃশ্যে আনার, অরূপকে রূপে উপলব্ধির ক্ষীণ হলেও একটি সূক্ষ্ম অনুভূতি ও ব্যগ্রতা এখানেই জেগে ওঠে—

আলিফ ছুরতে খাড়া পড়িআ কিআম
হে ছুরতে রুকু দিআ জপ বন্দের নাম।
দাল ছুরতে বশি দেখ ছুরত কউদ
জমিনে রাখিআ মাথা মিমেতে ছজুদ।
শিতালং ফকিরে কএ আল্লা নিরনজন
পেরেম রশে নমাজেতে না খুলিল মন।।

অথবা সহজ আবেগধর্মী সেই চির বিশ্বস্ত বর্ণনা—

ইআ এলাহি মশকিলে তুইন আছান কর
রহম কর মতফার উপর।
এলাহি আলামিন আল্লা
কাবাঘর তার সামনে খাড়া গ
ইবরাহিম খলিলুল্লা শে ঘরের কারিগর।।
শিতালং ফকিরে বলে আশার আশে বইশে রইলাম গ
নবিজির চরণে বিনে গতি নাহি দেখি মর।।

এবং দানের মাহাত্ম্য কথা—

হুব্ব চিতে দান করিলে শাখি হএ।
দিনেতে তার মানন হএ অখিলেতে জএ জত্ৰ।।
ছাখাওত জেই হএ ধন্নবাদ লুকে কএ।
ধরম বচন ধরমভাবে হিদএতে জুগান হএ।…
আবিদ জদি বখিল হএ কবরে তার মহা ভএ।
জলবে শে দুজখের আগুনে নিশা চত্ৰ।।
শাদির কালামে কএ আবিদ বখিল দুশট হএ।
শিতালং ফকিরে কএ কিরপাত্র রব্বানি হএ।। ইত্যাদি।

দ্বিতীয় মালাকুত, আত্মশুদ্ধি বা চিত্ত নিবিষ্টতার মোকাম। তৌবা অনুশোচনা, মুক্তি চিন্তায় অধীরতা সাধকের জীবনকে জটিল ও বৃহত্তর ক্ষেত্রের উপযোগী করে তোলে। শিতালং শাহের রচনায় এই স্তরের কথাও ব্যক্ত হয়েছে। তৌবার অনুশোচনায়ই তার শুরু—

এলাহি হাএ হাএরে মাবুদ রহমান,
এ মহা শংকটে তুই মুশকিল আছান।…
আর না করিমু পাপ জাবত জিবন,
ভকতি চিতে তউবা কইনু খেম নিরনজন।
শিতালং ফকিরে কহে পরান ঝুরে ওংগ দহে গ
দিন ত গেল কু আছরএ কি গতি মর পরকাল।

মৃত্যু ও পরকালের চিন্তা এই স্তরে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে পীড়িত করে। এতে কুচিন্তার বিনাশন ও সুচিন্তার উদবোধন—

আমার শকতি নাইরে আল্লা নাইরে আমার বল,
মালেকুল মউতে আমারে করিআছে ঘাএল।…
আফছুছ হাজার হাএরে হাএ জলি উঠে কলিজা,
মউত শমএ কি হইব উপাত্ৰ।।
শিতালং ফকিরে কএ বিরথা আইলাম দুনিআএ,
লাইলাহা জপ মনা তরাইবা আল্লাএ।।

অথবা—

ইছরাফিল শিংগা লইআ বশিআ আছেন ইনতেজার।
শিংগা ফুকিলে হইব ছারখার!

এই অনুশোচনার স্তরেও মাঝে মাঝে আর্তি জাগে অরূপের, সদা-চৈতন্যের। সাধক হয়ে পড়েন উৎকণ্ঠিত, কিন্তু জ্ঞান-বুদ্ধি, পথের ঠিকানা এসবের কিছুই পরিচয় না থাকায় এক অস্পষ্ট ব্যগ্রতায় শুধু ব্যর্থতার হতাশাই জেগে ওঠে মনে—

মন বুদধি হারাএ কইলাম গিআন,
ভবকুলে পরবেশিআ হইলাম অপমান।…
কুল-শিল হিন আমি না মাংগিনু ধন
পেরেমের ভিখারি হইআ মাংগি দরশন।
শিতালং ফকিরে মাংগইন আল্লা আহাদ।
পেরেম ভাবে দরশনে খেম অপবাদ।।

পরবর্তী স্তরই সাধকের জন্য উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আগ্রহ—ব্যগ্রতা ও অস্থির উন্মাদনার মোকাম। নাম তার জবরুত, সাগরের মত যার বিস্তার ও অতলান্তিকতা। এ পথে প্রেমের পথিকেরা বেদনায় কাতর, অন্বেষণের ব্যগ্রতায় চঞ্চল চিত্ত—

জালাই মমের বাতি পুশাইলাম সারা রাতি গ
ফুল বিছানাএ আতর ছিটাই ইনতেজার বেদনি॥
হরেক রংএ জনতর বাজে হরেক কুঠাএ গুপি শাজে গ
খালি গিরদক কুলে লইআ পুশাইলাম রজনি।।

বুকেতে ধুক ধুকি করে রহিতে না পারি ঘরে গ
কেউরে ঠাইন কইতে নারি শাম কালিআর কাহিনী।।
মাছ কাটিতে হাত কাটি ওন্ন খাইতে বরতন চাটি গ
আন্দার মানিক চিনে কথাএ ঘুরে শয়তানি।।

বলাবাহুল্য এই স্তরের ব্যাকুলতা বাংলা কাব্যে বৈষ্ণব কবিরা যেভাবে ব্যক্ত করেছেন, তেমনটি আর কেউ পারেনি। তাই অন্যদের উপরেও তাঁদের নায়িকা শ্রীরাধার চঞ্চল-চিত্তের প্রভাব পড়ে। তাঁদের আবহে, রূপকে এমনকি ভাষায় অন্যদেরও প্রাণের উৎকণ্ঠা রূপ লাভ করে। উপরের গানটিতেও তাই হয়েছে। এই অস্থির কাতরতার কালে সহজ সরল প্রতিষ্ঠিত আঙ্গিক ও ভাষায় চিত্তের ব্যাকুলতা প্রকাশ পায়, আর এটিই ত স্বাভাবিক। তবু রচয়িতার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যটি মাঝে মাঝে রচনায় ধরা পড়ে অলক্ষ্যে—

জলিআছে বিচ্ছেদের অনল হারা হইলাম বুদধি বল,
বল বল বন্দুআর কথা বল।
পরানের বন্দু জারে বলি শেত আমাত্র পরানে মাইল গ
তবু তারে না দেখিলে ঝুরে আংখি টলমল।
কি করিমু কুল লাজে জাব আমি জুগিনি শাজে গ
জেথাএ গেলে বন্দু মিলে তথাএ জাব চলচল।।
কেহ জদি দেখেশুনে বশিআ থাকি ঘরের কুনে গ
ঘরে আছে কাল ননদি মুখে হাশে খলখল।।
শিতালং ফকিরে বলে শাইখাতে শংকট কালে গ
বুকে নাই তর দএআ মাত্রআ মুখে মধু গলগল।

অথবা—

নিকটে আছএ পিআ      চউকেতে আংগুলি দিআ
ফাকি দিআ মরে বাশ ভিন।
অন্তর দগধে মর      দএআ না হইল তর
কলংকেতে গেল মর দিন।।
বিরহে আকুল অতি      বন্দু বিনে নাই গতি
পেরেমের অনলে দহে অংগ।
ডাকি আমি অভাগিনি      দরশন দাও জদি
তুশট থাকিব শিতালংগ।।

এ অস্থিরতা, এ ব্যাকুলতার যেন শেষ নাই। কখনো বিরহের বেদনায়, কখনো হঠাৎ মিলনের আনন্দে, আর প্রায় সর্বদাই হারাবার আংশকায় উৎকণ্ঠিত সাধকের আর্ত চিত্তের চঞ্চলতা ছড়িয়ে আছে এই জবরুতের পথ-প্রান্তরে। এখান থেকে মুক্তি যাঁরা পান তাঁরাই সিদ্ধ, তাঁরাই পৌঁছেন অলৌকিক আনন্দের জগতে। আমাদের সাধক কবি শিতালংএরও সে সৌভাগ্য হয়েছিল, তিনি সেই দুর্লভ আনন্দময় জগতের অভিজ্ঞান আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন—

ঢুরিলে বন্দুরে পাইবা      আছে বন্দু ছিরিপুর।
আগে চিন মহামমদি নুর।।
ছিরিপুর দেশের মাঝে      নানান রংগে বন্দু শাজে গ
শিংহাশন মনিপুরে তার নিচে মহমমদ পুর।।
মহামমদ পুরের কাছে     লাহুতের বাজার আছে গ
দিবানিশি শে বাজারে হু হু শব্দে উঠে শুর।।
অপরুপ শে বাজারে      শুনার মউরে পেখম ধরে গ
হশতি ভাবে করে খেলা শরপ থাকে আদমপুর।।
লাহুতের বাজারের মাঝে      রুপের ঘরে ঘন্টা বাজে গ
ঘুর ঘুর শুরে ডংকা বাজে বাশি বাজে ছুলতানপুর।।
রুপের ঘরে আজব লিলা      চান্দের মাঝে বন্দের খেলা গ
জে দেখিআছে রাজা হইছে মিরতু নাই তার জগতপুর।।
লাহুতের বেপারি জারা       ছবুর পুরে থাকে তারা গ
অমুল্ল বিকি কিনি হিরালাল পরশমনি গ
জাইতে পারে শে বাজারে      জে থাকে আমানত পুর।।
শিতালং ফকিরে বলে শশুরি ননদি জলে গ।।
ডুবাইলা আমার ভরা শাগর কামিনিপুর।।

এই হল লাহুত মোকাম বা সিদ্ধির সর্বোচ্চ স্তর। অতি অল্প সাধকের নিকট হতেই এ জগতের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির খবর মিলে; শিতালং শাহ্ সেই অল্প সৌভাগ্যবানদেরই একজন। এখানে ‘রূপের ঘরে ঘন্টা বাজে’, ‘ঘুর ঘুর শুরে ডংকা বাজে’ সর্বোপরি ‘চান্দের মাঝে বন্দের খেলা’ দৃষ্ট হয় আর এ খেলা যে প্রত্যক্ষ করেছে সে চরম আনন্দিত ‘মিরতু নাই তার জগতপুর’। “সাধক কবি শিতালংও চিরাচরিত ও বিশিষ্ট সাধনার স্তর অতিক্রম করে ‘চান্দের মাঝে বন্দের খেলা’ দেখেছিলেন—পেয়েছিলেন তাঁর চরম ও পরম পুরুষের সন্ধান।”৩ এই সিদ্ধ পুরুষ সকল স্তরে বিচরণ করে সাধনার জগতে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তাঁর রচনায় সেই দুর্লভ মণিমুক্তা ছড়িয়ে গেছেন।

নাছুত, মালাকুত, জবরুত ও লাহুত—এই চার মোকামের সাধন পন্থাকে যথাক্রমে শরিয়ত, তরিকত, হকিকত এবং মারিফত বলা হয়। শিতালং শাহের রচনায় সে পরিচয়েরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা আছে—

ভবের বাজারে আছে দুকান শারি শারি।
জাতে জাতে ধন লইআ বশিছে পশারি।।
বাজারের চারি দুকান শবার পরধান।
এ চারি দুকানে বিকে মাল বদখশান।।
পরথম দুকানে রাজপনথ খুলা।
যে দুকানে লাগি আছে শরিওতের তালা।।
দিতিআ দুকানে জেই করিআছে ছন্দি।
জগত ছএআলে জত শেই দুকানে বন্দি।।
সেই দুকানে হইবে জগত উজালা।
সে দুকানে লাগিআছে তরিকতের তালা।।…
তিরতিআ দুকানে আছে আতশের চুলা।
শে দুকানে লাগিআছে হকিকতের তালা।।…
চতুরথ দুকানে বনধ আমানত পুনজি।
শে দুকানে লাগিআছে মারিফতের কুনজি।।
শিতালং ফকিরে বলে হইআ উদাশ।
খুলা না পাইলাম কুঞ্জ না পুরিল আশ।।

আমার মনে হয়, এই মহান সাধকের সমগ্র রচনাবলী গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে তাঁর মানস বিকাশের ক্রম পর্যায়গুলো অনুসরণ ও তার বিস্তারিত ব্যাখ্যার যথেষ্ট সুযোগ মিলবে এবং সেই অনুসারে তাঁর রচনাবলীও স্তর বিন্যস্ত হয়ে একটি সুমিত শৃঙ্খলায় আবদ্ধ হতে পারবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, শিতালং শাহের অবিকৃত রচনা খুবই দুর্লভ।

শিতালং শাহ্ একজন সাধক গীতিকার হিসাবেই পরিচিত, কিন্তু তার মধ্যে যে একটি সরস, সংবেদনশীল ও সজীব কবিপ্রাণ ছিল একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। তাঁর অধিকাংশ রচনাই কবিতা হিসাবে সুপাঠ্য—সঙ্গীতের ব্যঞ্জনা ও সুর মূর্ছনার সঙ্গে কবিতার চিত্র ও বর্ণনাময় বৈশিষ্ট্য মিশে আছে। ধ্বনি ও শব্দ ব্যবহারের কুশলতা, অর্থের দ্যোতনা, উপমা-রূপকের ব্যবহার এবং বিষয় নির্বাচনে বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা তার রচনাকে অনেক ক্ষেত্রেই কবিতার পর্যায়ে উন্নীত করেছে। সাধক না হয়ে তিনি যদি শুধু একজন কবিই হতেন এবং একটু সচেতন অনুশীলনে তাঁর রচনাকৌশল প্রয়োগ করতেন, তাহলেও পাঠক চিত্তে তিনি সাড়া জাগাতেন গভীরভাবে।

আল্লার বিভিন্ন গুণ ও শক্তির বর্ণনায় কবি শব্দ ব্যবহারের যে কুশলী দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, হামদ-নাত জাতীয় রচনায় তার নিদর্শন বেশি নেই—

ছমিউন বছির আল্লা লতিফুল খবির।
হাইউল কাইউম তুই এলাহি কাদির।।
খালিক নামেতে আল্লা ওপুরব বরন।
কিরপা জুকত হইআ কইলা জগত ছিরজন।।…
জলে থলে দেখে আল্লা তিমির পশর।
জাহির বাতিন দেখে জিবের ওনতর।।
ছামিউন নামেতে শুনে ও পুরব কথন।
ছত্রআল আখলাক জুড়ি শুনে নিরনজন।।…
হাকিম নামেতে আল্লা হাকিম কাদিম।
খলক আখলাক জুড়ি ছুলতানুল আজিম।।
রাজ্জাক নামেতে আল্লা রিজিক জুগাএ ॥
জার জে নিরবন্দে জেত্ৰছা খলক শবাএ ॥…
জে কালে হইবা আল্লা ওহেদুল কাহহার।
রুজ কিআমত আশি হৈব নমুদার।।

অথবা পবিত্র মদিনা নগরীর বর্ণনা—

মদিনা নিবাশি লুক পুরুশ কিবা জনানা।
থানে থানে আরমবিত ইল্লাল্লাহু জপনা।।
তিলাওত করে কেহ শুধা বাকক রব্বানা।
পাছ আনফাছেতে কেহ করিতেছে সাধনা।।
তছবি তাহমিদ নামে শদাএত চিন্তনা।
তাহলিল তকবিরে হএ পেরেমভাবে দেওআনা।।…
রওজা মবারক জথা তরব্ব থান ঠিকানা।
পুরেতে গুলজার আছে মস্তফার আস্তানা।।…
শিতালং ফকিরে কহে না হেরিল কল্পনা।
রওজা মবারক শব জিআরত হইল না।।

শব্দ ও অর্থ-দ্যোতনার পরিচয়-

মতান দেওআনা শদা হালেতে বেহাল।
লাজ ভএ তেআগিআ পেরেমে মাতআল।।
মত বাজার শংশারেতে লইআ রাজগন।
আপন হালেতে শদা মন্তান অনুখন।।
মত হালে পরদিপেতে পতংগ হএ বন্দ।
পুশপেতে বুলবুল পিএ মত মরকন্দ।।
মস্তগির মতমির মত এ শংশার।
জুড়া জুড়া মত হএ আনন্দ বাজার।।…
মত হালে আশুকের চিত বেআকুল
মস্তকেতে মাশুকের জুলফে কাচাচুল।।
মত হাট মত বাজার মত দেশ গেরাম।
মত দিবা মত নিশা মত শুবে শাম।। …
মত উহিম মত ফুহিম মত তনে মন।
মালিকুল মত অংগে হরিতে জিবন।।
মস্ত শরগ মস্ত ভূমি মত এ ভুবন।
অরনেতে মত পশু ভরমএ কানন।।…
মস্ত শিতালং মাংগাইন জগত ছএআল।
দরশনে মত হালে করএ নিহাল।।

অথবা—

বিরখ তুবাএ গান করে পবনের শুরে।
শুরে চং চং বাজে টং টং শুঘুর ঘুর ঘুরে রে॥
বুলবুলিতে গান করে মনানন্দে ফুলে।
বুলবুল গুল গুল শুবুল বুল বুল রে॥…
তবলা বাজে তল তলা তল ঢুলক ধিং ধিং ধিং ঠুং।
ঘণ্টা বাজে টন টনাটন শুদিম দিম মিরদং রে।।
শিতালং কহে বিরখ জপে রব্বানা।
পেরেম ভাবে বিরখ তুবা ইশকেতে দেওআনা।।

শিতালং শাহের রচনায় সমকালীন সমাজের কিছু কিছু চিত্র ধরা পড়েছে। সমাজ- ইতিহাসের দৃষ্টিতেও তার মূল্য কম নয়। সিলেটী নাগরি এবং দোভাষী সাহিত্যে সমাজের কথা একান্তই দুর্লভ, সেদিক থেকেও এসব রচনা অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবীদার-

আখেরি জামানা আইল দরজালি আচার।
মুলুকে পরকাশ হইল কুকিরতি পরচার ।।
বিদদামান লুক হইল পনডিত শকল।
শুন্নেরে বাতাএ পন্ত নিজে বেআকল ॥…
শরম ভরম লিল আখেরি জামানা।
গুচ্ছা তামা তকব্বরি আদাওতি কিনা।।…
বিদ্দা শিখা লেখাপড়া ছআলেতে ধুম।
শত্ত কথা নেক আমল হইতেছে গুম।।…
ফরজন্দান মাঝে গেল উঠিআ শরম।
মাতাপিতারে করে বেহদ্দ ছিতম।।…
শবে জানে নিজে বড় বুদধি আগল।
শাগরিদ না বুলএ কেউ উছতাদ শকল।।….
না ফরমান হইল লুক কিতাবে খবর।
হাকিম জালিম হএ বান্দার উপর।।
শিতালং ফকিরে দেখি ভএ কমপমান।
মিতথা বাজি ধান্দা হনে বাচাও রহমান।।

রচনার এসব বৈচিত্র্য ও গুণাগুণ লক্ষ্য করে মনে হয়, শিতালং শাহ একালে জন্মালে একজন সমাজ সচেতন সার্থক আধূনিক কবির মর্যাদা লাভ করতেন।

তথ্যপঞ্জি

১. চৌধুরী গোলাম আকবর, সিলেটী নাগরি পরিক্রমা
২. ক. মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন—শিলহটের ইতিহাস, আল ইসলাহ, ১৩৬৩
খ. চৌধুরী গোলাম আকবর—সিলেটী নাগরি পরিক্রমা
৩. নূরুল ইসলাম—সাধক শিতালং, ইশারা, ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, সিলেট, ১৩৬৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *