প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

শিতালং শাহ : জাহান আরা বেগম

শিতালং শাহ – জাহান আরা বেগম

কবি শিতালং শাহ জন্মগ্রহণ করেন সিলেট জেলায়। ইনি একজন বিখ্যাত বাউল গান রচয়িতা। শিতালং শাহ মাদ্রাসায় ইসলামি শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর দীক্ষাগুরু ছিলেন সিলেটের মওলানা আবদুল ওহাব সাহেব। শিতালং শাহ বহু গান রচনা করেছেন। সেগুলি তাঁর শিষ্য হাজী আসগর আলী লিখে রাখতেন। অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন সাহেব তাঁর শতাধিক গান ‘হারামণি’ গ্রন্থে সংকলন করেছেন। ইসলামে সংগীতকে উৎসাহিত করা হয় নাই। অথচ বিস্মিত হতে হয় যখন দেখি শিতালং শাহের মত একজন খাঁটি মুসলমান যিনি মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করেছেন তিনিও গান বাজনার ভক্ত। এমনকি তাঁর রচনায় বৈষ্ণব ভাবের প্রকাশ সুস্পষ্ট। বহু গানে তিনি রাই, রজনী, সখী, শ্যাম, চণ্ডী, ত্রিপুন্নি প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করেছেন।…

ভাবসমৃদ্ধির দিক দিয়া বৈষ্ণব-কবিশ্রেষ্ঠ চণ্ডীদাসের সঙ্গে শিতালং শাহের যথেষ্ট মিল রয়েছে। শিতালং শাহের রচিত নিম্নোক্ত পদটি চণ্ডীদাসের একটি পদের সঙ্গে তুলনীয়।

যেমন—

‘পীরিতির শেল বুকে যার কলঙ্ক তার অলঙ্কার কুলমানের ভয় নাইরে।
পীরিতির নয় মিশানি, সদায় থাকে যন উদাসিনী গো …

অর্থাৎ মদনবাণে যার হৃদয় বিদ্ধ হয়েছে, সে আর লোকলাজের ভয় করেনা। ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে সে সর্বদা প্রেমাস্পদের ধ্যানমগ্ন থাকে। বন্ধুর প্রেমের মালা যে পেয়েছে লোকের নিন্দাধিক্কারকে সে পুষ্পচন্দন মনে করে বরণ করে নিতে পারে। ঠিক চণ্ডীদাসও তাই বলেছেন—

‘কলঙ্কী বলিয়া ডাকে সব লোকে
তাহাতে নাহিক দুখ
বধূঁ তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার
গলায় পরিতে সুখ।
সতী বা অসতী তোমাতে বিদিত
ভালমন্দ নাহি জানি
কহে চণ্ডীদাস পাপপুণ্য মন
তোমার চরণখানি।’

বন্ধুর জন্য কলঙ্কিনী আখ্যা পেলেও কোন দুঃখ নাই। পরমানন্দে কলঙ্কের হারকে অলঙ্কার করে নিবে। ভালবাসা পাপ কি পুণ্য তাতো কেবল বন্ধুই বিচার করতে পারে।

শিতালং ফকিরের রচনায় বৈষ্ণবভাবের স্ফুরণ দেখা গেলেও তিনি যে পরহেজগার মুসলমান ছিলেন তার প্রমাণ রয়েছে তাঁর অন্যান্য গানগুলির মধ্যে। তিনি মুসলমানদের উপদেশ দিয়ে বহু গান রচনা করেছেন। সেগুলি খাঁটি ইসলামি নিয়ম নীতির অনুসারে। যেমন-

‘জিন্দেগি যায় রে কুপন্থে গমন
জিন্দেগি থাকিতে কর বন্দেগি বরণ।
কালেমা, নামাজ, রোজা, করবে সাধন
নবীর তরিকায় কর প্রভুকে ভজন।’…

কবি বারবার বলছেন ধর্মের অবশ্য পালনীয় কর্তব্যগুলি সময় থাকতেই করা উচিত। নূরনবীর দেখানোর পথে থেকে পবিত্র চিত্তে আল্লাকে পাওয়ার সাধনা করতে হবে। যে নবীর প্রদর্শিত আদর্শ পথ অনুসরণ না করে আল্লার করুণা থেকে সে বঞ্চিত হয়। নামাজ, রোজা, কালেমা মুসলমানের পক্ষে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। অথচ মানুষ জাগতিক বিড়ম্বনায় সবকিছু ভুলে থাকে। তাই জীবন থাকতেই তার সচেতন হওয়া উচিত। আল্লার সঙ্গে মানুষের প্রেমের সম্পর্ক। সুতরাং প্রেম আপ্লুত চিত্তে ভক্তিভরে তাঁর স্মরণে ধ্যানমগ্ন হওয়া উচিত। বাউলেরা যোগশাস্ত্রে বিশ্বাসী। তাই বারবার দম বা শ্বাস প্রশ্বাস রোধ করে যোগ সাধনার কথা বলেছেন শিতালং ফকির।… কবি বলেছেন—

‘পাঁচ আনফাছেতে কর দমের সাধন’।

কারণ— ‘দমে দমে আয়ুক্ষয় জিন্দেগি হরণ’।

শ্বাস প্রশ্বাস ধরে রাখার ক্ষমতা যতবেশি অর্জন করা যাবে; মানুষের জীবনীশক্তিও ততই বৃদ্ধি পাবে। শুধু তাই নয়—

‘প্রেমের যোগানে যে করিবে আমল
সুগন্ধির সঙ্গে তার খুলিবে কমল।’

যে প্রেমাপ্লুত চিত্তে দম ধারণের ক্ষমতা অর্জন করবে, তার সমস্ত হৃদয় সাধনার পথে ফুটন্ত কমলের মত বিকশিত হয়ে উঠবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *