প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

বরাকের সংস্কৃতি চেতনায় শিতালং শাহ : কামালুদ্দীন আহমেদ

বরাকের সংস্কৃতি চেতনায় শিতালং শাহ – কামালুদ্দীন আহমেদ

বরাক উপত্যকার সংস্কৃতির মূল কাঠামো তৈরি করেছে কৃষি নির্ভর সমাজের জীবন চর্যা। বরাকের নিসর্গ কৃষিনির্ভর সমাজ জীবনকে দান করেছে অপরিসীম সমৃদ্ধি। সে সমৃদ্ধি অন্তরের, ভাবের। তার বস্তুগতরূপ আপেক্ষিক দীনতার আবরণে ক্লিষ্ট হলেও, তার অন্তরের বিস্তার বরাকের সংস্কৃতিচেতনার উৎস মূলে উজ্জ্বল, প্রোজ্জ্বল এবং অকম্পিত দীপশিখার মত দেদীপ্যমান। সংস্কৃতি বলতে পরিবেশের মনুষ্য সৃষ্টি অংশকে বুঝালেও মানুষের জীবিকা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা সংস্কৃতি চেতনা সংগঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই সংস্কৃতির পরিধির ব্যাপকতা অপরিমেয়। আর বরাক উপত্যকায় সংস্কৃতি চেতনার উৎস মূলে কৃষিভিত্তিক জীবন ব্যবস্থা এবং ভুবন-বড়াইল পাথারিয়ার নিসর্গ, বরাক নদী ও তার অনেকগুলো উপনদী আর শাখা নদী-সুরমা কুশিয়ারার কলতান সম্পৃক্ত বলে সঙ্কীর্ণ অর্থে বাঙলা সংস্কৃতি এবং ব্যাপক অর্থে ভারতীয় সংস্কৃতির স্থানিকরূপই হচ্ছে বরাকের সংস্কৃতি। ভারতীয় সংস্কৃতির উৎসমূলে কৃষিভিত্তিক জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে আধ্যাত্মিক ভাবনার সংমিশ্রণ সন্দেহাতীতরূপে লক্ষণীয়। আর বাঙলা সংস্কৃতি সেই ভারতীয় সংস্কৃতির এক ভাষাভিত্তিক অভিব্যক্তি। সুতরাং ভারতের যে কোন অঞ্চলের শৈল্পিক উত্তরাধিকারে কৃষিভিত্তিক জীবন ব্যবস্থার সঙ্গে তার সংস্কৃতির শিকড় প্রোথিত। আর সে শিকড়ই হচ্ছে লোকসংস্কৃতি। লোকাচার এবং লোক সঙ্গীতই হচ্ছে লোক সংস্কৃতির প্রধানতম উপজীব্য। তার মধ্যে লোক সঙ্গীত হচ্ছে লোক সংস্কৃতির শৈল্পিক উত্তরাধিকারের প্রধানতম বাহন। এসঙ্গীতগুলোর মধ্যে যুগ চেতনা যেমন বিবৃত থাকে, ঠিক তেমনি জন মানসের আধ্যাত্মিক চেতনাও বিবৃত হয় এক অপূর্বরস মাধুর্যের লহরীর সমন্বয়ে। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় আপ্লুত সঙ্গীতগুলো বেশীরভাগই ভক্ত, সাধক, সুফি আউলিয়াদের রচিত অধ্যাত্ম বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সহজসরল সৌকর্যে ভরা সঙ্গীত। গানগুলো হৃদয়ের আবেগ নিঃসৃত স্বতঃস্ফূর্ত। এজাতীয় সঙ্গীতের একটি ধারা মারফতি নামে বিখ্যাত। সঙ্গীতের এই মারফতি বিভাগটি বিশেষভাবে সূফীভাবাপন্ন মুসলিম কবিদের অবদান। এই মারফতি পদ্ধতির সঙ্গীতের তত্ত্বদর্শী পরিচয় বিবৃত হয়েছে সিলেটের কবি শেখ চান্দের একটি গীতিকবিতায়। কবির নিম্নোক্ত উদ্ধৃতি থেকেই এই তত্ত্বদর্শনের গূঢ় রূপটি প্রতিভাত হয়—

‘মারফত আর কিছু নয় শুন দিয়া মন।
মনমত বুলি যারে মন কোনজন।
পোবনে বোহএ দম আতসে দে উম
মিত্তিকা এ বৈসে মন জলে দে কুম।
আব বাতাস খাক বাদ এহি চারিজন।
চারি চিজে খেলাকরে রসবান মন।
শূন্যে দিয়া উঠে খেলে শূন্যে কার মন
মুখ মৈধ্যে কোন সমে পদকে নয়ন।
নাসাতে মক্কাতে খেনে খেনেক দিলেত।
কোনখানে জাএ মন পাতাল পুরেত’ ইত্যাদি।

বরাক উপত্যকাবাসী জনসাধারণের হৃদয়ে যে সকল মরমী কবির মারফতি গানের আবেদন এক অবর্ণনীয় ভাবাবেশের সৃষ্টি করে, শিতালং শাহ তাঁদের অন্যতম নন, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে এক আশ্চর্য উচ্চকিত অভিধায় অভিষিক্ত। এখানে একটা কথা স্পষ্ট করে বলা আবশ্যক যে, বর্তমান বরাক উপত্যকা প্রাক স্বাধীনতা যুগের সুরমা উপত্যকারই খণ্ডিতাংশ এবং সুরমা উপত্যকা বলতে বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট জিলা এবং বর্তমান আসামের করিমগঞ্জ, কাছাড় ও হাইলাকান্দি জিলাত্রয় ব্যতীত উত্তর কাছাড় পার্বত্য জিলাও বুঝাত। এই বিশাল ভূখণ্ডের ভাষা, সংস্কৃতি এবং সমাজ ব্যবস্থা স্মরণাতীত কাল থেকেই এক এবং অভিন্ন ছিল। আর মজার কথা এই যে, শিতালং শাহ ১৮০৬/৭ খৃষ্টাব্দে (১২০৩/৪ বঙ্গাব্দে) বর্তমান করিমগঞ্জ জিলার শ্রীগৌরী এলাকার ‘কিত্তা শিলচার’ নামক স্থানে মাতামহের গৃহে জন্মলাভ করে বর্তমান কাছাড় জিলার কাঠিগড়া থানার তারিণীপুর গ্রামে লালিত হয়েছিলেন এবং তাঁর তারুণ্য ও যৌবনের একাংশ অতিবাহিত হয়েছিল বৃহত্তর সিলেট জিলার গোলাপগঞ্জ উপজিলার ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় এবং উত্তর জীবনে কাছাড়ের বুড়িবাইল ও জকিগঞ্জ উপজিলার হাসিতলা অঞ্চলে। কাছাড়ের ভুবন পাহাড়ে আত্মগোপন করে দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে গভীর সাধনা ও পরবর্তীকালে পাথারিয়া পাহাড়ে তাঁর আত্মপ্রকাশ সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান বরাক উপত্যকা এবং বৃহত্তর সিলেট জিলা ছিল তার বিচরণ ক্ষেত্র এবং তাই স্মৃতি বিজড়িত। আর তাঁর মারফতি গানএ বিশাল ভূখণ্ডের গ্রামীণ জনসাধারণের মন ও মানসে এক গৌরবময় রাজত্বে বিস্তৃত। ভাবের ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ভাবধারায় আপ্লুত, স্রষ্টার কাছে আবেদনের আকুতিতে পূর্ণ এবং সৃষ্টির তত্ত্ব বিবৃত তাঁর সঙ্গীতগুলো মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র এবং আনন্দের উৎস বলে আদৃত।

শিতালং শাহ ছিলেন সাধক পীর। তাঁর শিষ্য প্রশিষ্যদের কথামতে তিনি প্রায় দু’হাজার গান রচনা করেছিলেন। এগুলোকে তাঁরা শ্রদ্ধার সঙ্গে শিতালংগি রাগ বলে থাকেন। এ রাগগুলোর ভাষা ভাব উপজীব্য এবং রচনাশৈলী নিয়ে একটু আলোচনা করলেই বরাকের সংস্কৃতি চেতনায় তাদের ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি হয়। সঙ্গীতের শাস্ত্রসম্মত স্বর, তাল ও রাগ অথবা আঙ্গিকের অন্তরা, সঞ্চারী এবং আভোগ প্রভৃতির বিস্তার বিচারে শিতালং শাহের গানগুলোর উৎকর্ষাপকর্ষ নির্ণয় করার দায়িত্ব বৈয়াকরণদের। গানগুলোর মূল আকর্ষণ বক্তব্যের সম্পদে এবং ভাষা ও ভাবধারার অনুশীলনে।

বিভাগপূর্ব সুরমা উপত্যকার নৈসর্গিক পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। সবুজ শ্যামল প্রান্তর। মাঝেমাঝে নাতি-উচ্চ শ্যামল পাহাড় শ্রেণী এবং পাহাড়ের পাদদেশে সুদূর বিস্তৃত চা বাগান অপরূপ লীলা ভঙ্গিমা নিয়ে বিরাজমান। প্রকৃতির এ জাতীয় মনোমুগ্ধকর পরিবেশ মানুষের হৃদয়ে এক উদাস ভাবের উদয় করে দেয়। নিসর্গের অন্তরালবর্তী কুশল কারিগরের শক্তি মাহাত্ম্যের চিন্তায় মানুষের হৃদয়ে যে ভাবের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়, তা সঙ্গীতের মূর্ছনায় বাঙময় হয়ে ওঠে শিল্পী কণ্ঠে। এই নৈসর্গিক পরিবেশের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট শহরে আবার সুফি সাধক হজরত শাহজালালের সমাধি। এই সমাধি কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আউল, বাউল, পীর, সাধক ভক্তদের এক পরম্পরা, যার প্রাণশক্তি চলিষ্ণু আছে মারফতি সঙ্গীতের সুর লহরীর মধ্য দিয়ে। শিতালং শাহর জন্মের কয়েক শতাব্দী পূর্ব থেকে চলে আসছে সঙ্গীতের সে প্রবাহ। শীতালং শাহর পৈতৃক নাম ছিল সলিম উল্লাহ। সংসার আশ্রমের এই নাম নিয়েই তিনি ফুলবাড়ি মাদ্রাসা থেকেই ইসলাম ধর্মীয় শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। পরে তিনি সুফি সাধক মওলানা আবদুল ওহাবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন এবং তাঁর গুরু তাঁকে শিতালং নামে অভিহিত করেন। ইসলাম ধর্মে সঙ্গীতকে উৎসাহিত করা হয়নি। তাই শিতালং শাহর সঙ্গীত রচনা এবং সঙ্গীত চর্চা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তাঁর রচিত সঙ্গীতের সংখ্যা সম্পর্কে তাঁর শিষ্য প্রশিষ্যদের বক্তব্যে অতিরঞ্জন থাকার সম্ভাবনা থাকলেও অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন তাঁর ‘হারামণি’ নামক গ্রন্থে শিতালং শাহর শতাধিক গান সঙ্কলন করেছেন। এগুলি শুধু বরাক-সুরমা উপত্যকার নয়, বাংলা ভাষা সাহিত্যের গৌরব বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।

মোহাম্মদ আব্দুর রহিম তাঁর অধুনা প্রকাশিত গ্রন্থ ‘সুফী সাধক শিতালং শাহ’ এ শিতালং শাহ রচিত গানগুলোকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করেছেন। তাঁর এ গ্রন্থে শিতালং শাহর ৯০টি গান তিনি সঙ্কলিত করেছেন এবং এগুলোকে ধর্মপ্রচার মূলক, সূফিতত্ত্বাশ্রয়ী এবং বৈষ্ণব ধর্ম প্রভাবিত—এই তিন শ্রেণীতে বিন্যস্ত করেছেন। অবশ্য এ গ্রন্থে সঙ্কলিত গানগুলোর উপজীব্য বিশ্লেষণে এগুলোকে তিনটি শ্রেণীর লক্ষণাক্রান্ত বলেই মনে হয়। প্রথম শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত গানগুলো ধর্ম প্রচার মূলক বলে শ্রেণীভুক্ত করলে সঠিক হবে বলে মনে হয়না। কেননা, এ শ্রেণীতে যা আছে তা হলো ইসলাম ধর্ম বর্ণিত মানুষ সৃষ্টির তত্ত্ব, রসুলের প্রশংসা, সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা এবং ইসলাম ধর্ম সম্মত আচার আচরণ বিষয়ক। এগুলোর বক্তব্য এবং ভাষা অত্যন্ত সহজ ও সরল। আরবি পার্শি শব্দের বাহুল্য থাকলেও সাধারণ মুসলমানের পক্ষে সহজ বোধ্য। ধর্মের বিধানাবলী প্রচার এবং জনসাধারণ্যে সহজবোধ করার প্রয়াস প্রত্যেকটি সঙ্গীতের কলেবরে। ভাষা অনস্বীকার্যরূপেই বাংলা। ইসলামের নীতিকথা ও দৈনন্দিন জীবনের বিধি নিষেধ বিষয়ক গানগুলো ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসাধারণের উদ্দেশ্যে রচিত বলেই মনে হয়। এই গানগুলির মধ্যে ইসলাম ধর্মাশাস্ত্রে সুপণ্ডিত মৌলানা সলিমুল্লার অধ্যাত্মবাদ সম্পর্কিত ধ্যান ধারণার রূপটি স্পষ্ট।

শিতালং শাহের সঙ্গীত রচনা ও চর্চা যখন চলছিল, তখন বাঙলার সাংস্কৃতিক জীবন এক চরম অভিঘাতের সম্মুখীন। পাশ্চাত্য ভাবধারার সংস্পর্শে তখন বাঙলা সংস্কৃতির উৎস মূলের দ্বৈতধারা কিছুটা আচ্ছন্ন, আবার এই অভিঘাতে হিন্দু মুসলিম উভয় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পুনর্জাগরণের লক্ষণ প্রকটিত। সে পরিস্থিতিতে রক্ষণশীল মুসলমান সমাজের প্রতি শিতালং শাহর দায়বদ্ধতা তাঁকে এসব সঙ্গীত রচনায় প্রণোদিত করেছিল বলে মনে হয়। কিন্তু মুসলমান রক্ষণশীল সমাজে সঙ্গীতের সাধনা অবশ্য পরিত্যাজ্য আচরণ হিসেবে চিহ্নিত থাকা সত্ত্বেও শিতালং শাহর এই দুঃসাহসিক কর্ম তাঁর সংস্কৃতি চেতনারই দ্যোতক।

দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত গানগুলো সুফি তত্ত্বাশ্রয়ী। সুফিবাদের উৎস নিয়ে অনেক মতবাদ প্রচলিত। এ মতবাদ গুলোর পরস্পর বিরোধও বর্তমান। বর্তমান নিবন্ধের প্রতিপাদ্য অবশ্য সুফিবাদের উৎস আলোচনা নয়। তবে সুফিতত্ত্বের মূল কথাটি হলো—জীবাত্মা এবং পরমাত্মার মধ্যে প্রেম সম্পর্ক বর্তমান। সুফি সাধকরা স্রষ্টার সঙ্গে প্রেমিক প্রেমাষ্পদের সম্পর্ক অনুভব করে প্রেমাষ্পদের বিরহ যাতনায় অধীর হয়ে ওঠেন। তখন তাঁদের পার্থিব জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে যায়। এবং ধ্যান জ্ঞানে সেই পরম সুন্দরের সান্নিধ্য লাভে উন্মত্ত প্রায় হয়ে ওঠেন। সুফি সাধনার এই স্তরকে বলে ফানাহ্। এর পরবর্তী স্তরে সুফির অন্তর প্রজ্ঞার আলোকে এমন ভাবে উদ্ভাসিত হয় যে, তিনি উপলব্ধির চরম স্তরে পৌঁছে যান এবং জীবাত্মাও পরমাত্মাকে একাত্মায় বিলীন বলে উপলব্ধি করেন। বিশ্ব বিখ্যাত ইরাকি সুফি মনসুর হাল্লাজ উপলব্ধির সেই চরম স্তরে উন্নীত হয়ে বলতে পেরেছিলেন,

–‘আনাল হক—আমিই সত্য’। এর বহু শতাব্দীর পর তাঁরই এক উত্তরসুরি সিলেটের হাসানরাজা বলেছিলেন—’ভাবনা চিন্তা করইয়া দেখি কানাই যে হাসান’। মধ্যযুগেরই বাঙলাদেশে সুফিবাদের বিস্তার হয়। অবশ্য ভাগবত ধর্মতত্ত্বের কল্যাণে বাঙলাদেশে সুফিবাদ অতি সহজেই তার ক্ষেত্র লাভ করতে সমর্থ হয়। আর সুরমা উপত্যকায় সুফিবাদ প্রচলনের ইতিহাসে হজরত শাহজালালের নাম প্রাতঃ স্মরণীয়। শিতালং শাহ নিজেই ছিলেন এক সুফি সাধক। তাঁর সঙ্গীত রচনা কালের পূর্বেই সুরমা উপত্যকা (বা প্রাক বৃটিশ যুগে মোগলদের বাংলা সুবার সিলেট সরকার এবং ডিমাসা কাছারিদের হেড়ম্ব রাজ্যে বিভক্ত ছিল) বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রেমরস প্রবাহে মরমী সাধনার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল। সখ্য, দাস্য, বাৎসল্য ও মধুর—বৈষ্ণব ধর্ম নির্দেশিত এ চতুষ্ট সাধনা ভিত্তিক সাহিত্য মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এর প্রভাব সুফি সাধক শিতালং শাহর সঙ্গীতের ভাব এবং ভাষায় এক অপূর্ব সুষমার সৃষ্টি করেছে। সুফিবাদের সঙ্গে বৈষ্ণব ভাবধারার সংমিশ্রণে ভারতীয় সংস্কৃতির মূল সূত্রটি প্রস্ফুটিত হয়েছে। এদিক থেকে বিশ্লেষণে শিতালং শাহ’র সঙ্গীতের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণী গুলো মূলতঃ এক শ্রেণীরই অন্তর্গত। এই শ্রেণীর গানগুলি সুফি তত্ত্বাশ্রয়ী এবং রূপকের মধ্যদিয়ে সৃষ্টি, স্থিতি, লয় এবং জীবাত্মা ও পরামাত্মার সম্পর্কের গূঢ় তত্ত্বটি বিবৃত হয়েছে। এই শ্রেণীভুক্ত গানগুলোর পরিশীলিত ভাষা, ভাবের ব্যঞ্জনা এবং বক্তব্যের বিস্তারের জন্য সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বস্তুত পক্ষে এ গানগুলোই বরাকের সংস্কৃতি চেতনার উৎসারণে বিশিষ্ট ভূমিকা পালনে সমর্থ। এ শ্রেণীভুক্ত প্রত্যেকটি সঙ্গীত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বর্তমান। তাঁর একটি গান—

“জরজমি সব থইয়ারে ও মনা ভাই করিবে গমন কেবল সঙ্গতি কাফন মনারে”— দিয়ে আরম্ভ হয়ে মানবজীবনের অবশ্য পরিণতি মৃত্যুর ভয়াবহ রূপকে তুলে ধরেছে। এ গানের প্রভাব মানুষকে পরমার্থ চিন্তায় বিভোর হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু ভয়াবহতার হাত থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য এমন সাধনা করতে হবে যাতে অন্ধকার সমাধি আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সেজন্য প্রয়োজন সেই পরম বন্ধুকে লাভ করা। তাই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে—

‘ধুড়িলে বন্ধুরে পাইবায় আছইন বন্ধু শিরিপুর
আগে চিন মোহাম্মদী নূর।’

এখানেই দেখি ‘সখ্য রসে’র সূচনা। কিন্তু সে প্রেমাষ্পদকে লাভ করতে হলে কলঙ্ক, লোকনিন্দার ভয়ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়তে হবে। তাই ত কবি গেয়েছেন-

‘পীরিতের সেল বুকে যার, কলঙ্ক তার অলঙ্কার
কুলমানের ভয় নাইরে তার।
পীরিতের নয় নিশানি, সদায় থাকে উদাসিনী গো,
সদায় থাকে প্রেমানন্দে, নিরানন্দ নাহি তার ।।
ক্ষুধাতৃষ্ণা নাই তার মনে, নিদ্রা নাই তার দুই নয়নে গো,
স্বরূপে মন মজাইয়া করে সেইরূপ নিহার ।।
হাসিরাশি নাইতার মনে, সদাই থাকে ঘোর নয়নে গো,
তৃতীয় পীরিতির মাঝে রঙ্গ খুশি বেশুমার ।।
যার গলে প্রেমের ফাঁসি, সে হইয়াছে সকলের দাসী গো,
লোকের নিন্দন পুষ্প চন্দন গলাতে পইরাইছে হার ।।
শিতালং ফকির বলে, প্রেমের মালা যাহার গলে গো,
কেওরর কথা নাহি শুনে কেবল তাহার বন্ধুসার॥’

অর্থাৎ মদন বাণে যার হৃদয় বিদ্ধ হয়েছে, সে আর লোকলাজের ভয় করে না। গানটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে যদিও এক পারশ্য দেশীয় সুফি কবির রুবাই

‘আশিকারা ন’নিশানা মুয়তবর
আহু সরদো চেশমে জরদো অশিকে তর,
কম গুপ্তনো কম খুরদোনো খাবে খর,
বেকরারি, ইন্তেজারি দর্দেসর’।

মনে পড়ে যায়, তথাপি চণ্ডীদাসের একটি পদেরও ভাব ব্যঞ্জনার ঝঙ্কার এর মধ্যে স্পষ্ট শ্রুত হয়। চণ্ডীদাসের পদটি এখানে তুলনীয়।

‘কলঙ্কী বলিয়া ডাকে সব লোকে
তাহাতে নাহিক দুখ
বন্ধু তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার
গলায় পরিতে সুখ’ ইত্যাদি।

বৈষ্ণব প্রভাবের বহু নিদর্শন পাওয়া যায় তাঁর সঙ্গীতগুলোর মধ্যে। শিতালং শাহর সঙ্গীতাবলীর একটিতে ‘তোরে লইয়া নিগূঢ় বনে ললিতসুরে গান করি/দেশে চলো নবীন কিশোরী’ শুনলেই মনে পড়ে যায়—”মোমের পুতুলের মত নরম তোমার যে প্রেয়সী, তাকে নিয়ে এমন নির্জনে বস, যা আর কেউ দেখতে না পায়।’—এই রুবাইটি। শিতালং শাহ ছিলেন সাত্ত্বিক মুসলমান। কিন্তু তাঁর সুফিবাদের তত্ত্বাশ্রিত সঙ্গীতের মধ্যে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করতে হয়-

‘দূতিগো আমার
প্রেমরসে ভাবচিত্তে না হইল শৃঙ্গার।’

ইসলামি ভাবধারার তত্ত্বাশ্রিত বিষয়টি এখানে সম্পূর্ণ বৈষ্ণবীয় উচ্চারণে অভিব্যক্ত। এই সাধকের আত্মনিবেদন মূলক একটি গানের ধূয়া হলো-

‘নাগরি রসিয়া’
নদীয়ার কূলে বসিয়া ডাকি বন্ধু কলঙ্কিনী হৈয়া।’

বৈষ্ণব সাহিত্যের মধুর রসের আলাপন সঙ্গীতটির কলেবরে এক অপূর্ব ভাবব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছে। যমুনা পুলিনে বিরহিনী রাধার প্রাণের আকুতি যেন শিতালং শাহ’র সঙ্গীতে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে এক অশ্রুতপূর্ব সঙ্গীতের আবেশে। সাত্ত্বিক মুসলমানের কাছে কিন্তু সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক আ’বদ’ (দাস) আর মা’বুদ (প্রভু) এর। সুফিতত্বে যে প্রেমের কথা বলা হয় তাও আবার শ্রদ্ধা মিশ্রিত সখ্য, সাম্যের সখ্য নয়। কিন্তু শিতালং শাহ’র এ গানটির আবেদন এত ব্যাপক যে, সাধক আউল-বাউল, ধর্ম প্রাণ গৃহী সকলেই এর মধ্যে খুঁজে পান আত্মনিবেদনের ভাষা, ইসলাম বর্ণিত আত্মসমর্পণের এক নোতুন দিগন্ত। কিন্তু এ গানটির সমাপ্তিত একটি প্রার্থনা বিবৃত হয়েছে শেষ বিচারের দিনে হজরত মোহাম্মদের (সা.) সুপারিশ লাভ করে সেই পরম সুন্দরের রূপ দর্শন বাসনায় –

‘শিতালং ফকিরে মাংগে হাসরের কাল
মস্তুফার সঙ্গ লইয়া দেখিতে জলাল।’

রসিক নাগরের স্বরূপ দর্শনে হজরত মোহাম্মদের (সা.) সুপারিশ বাসনা বৈষ্ণবীয় রীতির সাধনার সঙ্গে ইসলামি ভাবধারার এক অপূর্ব মিলন এই সঙ্গীতের মূল উপজীব্য। স্রষ্টার প্রেমের বিস্তার শিতালং শাহ অনুভব করেছেন তাঁর হৃদয়ের সূক্ষ্মতম অনুভূতি দিয়ে। তাই তিনি গান করেছেন

‘বন্ধু রঙ্গিয়া হো ঠাকুর দয়াল
তোমার প্রেমে তুষ্ট আছে জগত সয়াল।’

কবির শিল্পীসত্তা সেই বন্ধুর বিরহে আকুল হয়ে উঠেছে

‘বিরহে আকুল মতি বন্ধু বিনে নাহি গতি
প্রেমানলে জ্বলে মোর অঙ্গ
ডাকি আমি অপরাধী     দরশন দেও যদি
তুষ্ট থাকিবে শিতালঙ্গ।।’

পংক্তিটির ব্যঞ্জনায় কবির আত্ম অনুভব শ্রোতার অনুভবকে স্পর্শ করে। সঙ্গীতের কাব্যগুণ বিচারে শিতালং শাহ তাই এক সার্থক শিল্প স্রষ্টা। এটাই তাঁর সর্বপ্রধান পরিচয়।

শিতালং শাহর সঙ্গীত গুলোর ভাষা এবং উপজীব্যে যে দুটো ব্যাপার অভিব্যক্ত, সেগুলোই আমাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি চেতনার মূল দ্যোতক। প্রথমতঃ শিতালং শাহর তিরোভাব ঘটেছে ১৮৯৯ সালে সুতরাং তাঁর সঙ্গীত রচনার কাল ঊনবিংশ শতাব্দী। সে কালে তাঁর সঙ্গীতাবলীতে সাহিত্যের যে সকল শব্দ তিনি চয়ন করেছেন, তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাষারই ঊনবিংশ শতাব্দীর রূপ বিশিষ্ট। শিতালং শাহ ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষিত, আরবি পার্শি ভাষার বুৎপত্তি সম্পন্ন ধর্মশাস্ত্রবিদ। বাংলা ভাষা সাহিত্য অধ্যয়ন করার কোন ইতিহাস পাওয়া যায়না। কাজেই তাঁর শব্দ চয়নের দক্ষতা দৃশ্যে তৎকালীন সুরমা উপত্যকার মুসলমান সমাজে বাংলাভাষা সাহিত্য চর্চার ব্যাপকত্ব অনুধাবন করা যায়। দ্বিতীয়তঃ ইসলামি ভাবধারা বৈষ্ণবীয় প্রকাশ ভঙ্গিতে বিবৃত করে শিতালং শাহ দেখিয়ে দিয়েছেন কি সহজ ভাবে দুই বিপরীত উৎসমুখী সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। তাই শিতালং শাহ আমাদের সংস্কৃতি চেতনার উৎসারণে এক ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্যে অনুসৃত।

গ্রন্থপঞ্জি

১. আতোয়ার রহমান—লোকসাহিত্যের কথা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৪
২. কামালুদ্দীন আহমেদ – সংস্কৃতির রঙরূপ, দিঘলয় প্রকাশনা, করিমগঞ্জ, ১৯৯০
৩. জাহান আরা বেগম-বাংলাদেশের মরমী সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯০
৪. মোহাম্মদ আবদুর রহিম (জকি) — সুফি সাধক শিতালং শাহ, নিউ এমদাদিয়া লাইব্রেরী, সিলেট, ১৯৯১

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *