প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

সাধক কবি শিতালং শাহ : সুধীরচন্দ্র পাল

সাধক কবি শিতালং শাহ – সুধীরচন্দ্র পাল

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাহিত্য শুধু তত্রস্থ মার্জিত রুচি সম্পন্ন শিক্ষিত জ্ঞানী, গুণী ব্যক্তিবর্গের লেখনী-নিঃসৃত ভাবধারায় পুষ্ট নহে, সেইসব দেশের পল্লীর অজ্ঞাত অখ্যাত কবি ও সাহিত্যিকবৃন্দ শ্রদ্ধা ও গভীর নিষ্ঠার সহিত সাহিত্যসেবা করিয়া সাহিত্যের পরিপুষ্টি সাধন করিয়াছেন। আমাদের বাংলা সাহিত্যও শুধু হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, বঙ্কিম, মধুসূদন, বিহারীলাল, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল ইসলাম দ্বারা পরিপুষ্ট নহে। সেই সাহিত্য উভয় বঙ্গের পল্লীর অজ্ঞাত অখ্যাত কবিদের সাধনায় বিরাট মহীরূহরূপে সৃষ্ট হইয়াছে।

অসংখ্যপল্লী নিয়া এই বাংলাদেশ গঠিত। পল্লীর আনাচে কানাচে অজস্র সাহিত্যের উপকরণ ছড়াইয়া রহিয়াছে। পল্লীর শান্তসমাহিত পরিবেশের মধ্যে অবস্থান করিয়া প্রকৃতির লীলা নিকেতন এই বাংলাদেশের পল্লী মায়ের কোলে পরিবর্ধিত হইয়া পল্লীর কবিগণ কাব্য রচনা করিয়াছেন। বাংলাদেশের অমূল্যসম্পদ ভাটিয়ালি গান, জারিগান, সারিগান, বাউল ও মারফতি গান আজও বিদগ্ধ সমাজে সমাদৃত। ইহা সর্বজন স্বীকৃত যে বাংলাদেশের লোকসাহিত্য সমৃদ্ধ। সিলেট জেলার লোকসাহিত্যও গৌরব বিমণ্ডিত। এই জেলারই কবি গোলাম হোসেন শাহ, ফকির শিতালং শাহ, ফকির ভেলা শাহ, দইখুরা শাহ, মুন্সী ইরফান আলী, মুন্সী আর্শদ আলী, সাধক রাধারমণ দত্ত, শাহ দীন ভবানন্দ, গোলোকচাঁদ গোসাই প্রভৃতি কাব্য রচনায় প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। তাহাদের রচিত গানগুলি আজও সুদূর গ্রামাঞ্চলে অতিশ্রদ্ধার সহিত গীত হইয়া থাকে। সাহিত্যের আসরে এইসব পদগুলির যথেষ্ট মূল্য রহিয়াছে। বিদগ্ধগণ যদি এইসব কবি ও সাহিত্যিকদের রচনা সম্ভারকে সমালোচনা ও গবেষণা করেন, তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধিকতর সমৃদ্ধ হইবে।

ঊনবিংশ শতাব্দী যখন রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন, বিহারীলাল চক্রবর্তী, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি কবিকূল চূড়ামণিদের প্রতিভাদীপ্ত, তখন এই সুদূর সিলেট জিলায় গ্রামাঞ্চলে অবস্থান করিয়াও সাধক কবি শিতালং শাহ আপন মনের মাধুরী মিশাইয়া অনবদ্য কাব্য রচনা করিয়া গিয়াছেন। ১২০৭ সালে সিলেট জেলার (অধুনা করিমগঞ্জ জেলা) শ্রীগৌরী গ্রামে কবি শিতালং শাহ জন্মগ্রহণ করেন। তাহার প্রকৃত নাম ছিল মুহম্মদ সলিম। জনসাধারণের নিকট তিনি শিতালং শাহ নামে পরিচিত। তাহার পিতার নাম জাহা বখশ আলী।

শিতালং শাহের পিতা শ্রীগৌরী গ্রাম পরিত্যাগ করিয়া কাছাড় জিলায় তারিণীপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সেই গ্রামেই শিতালং শাহ লিখাপড়া আরম্ভ করেন। পরে তিনি সিলেট জেলায় ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করিতে থাকেন। তৎকালে ফুলবাড়ি মাদ্রাসা একটি প্রসিদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ছিল। পণ্ডিতকুল চূড়ামণি শাহ আবদুল ওহয়াব, শাহ আবদুল আলী ও শাহ আবদুল কাহির এই বিদ্যানিকেতনে শিক্ষাদান কার্যে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। শিতালং শাহ তাহাদের শিষ্যত্ব লাভ করিয়া নিজেকে ধন্য ও কৃতার্থ মনে করিতেন। পিতা জাঁহা বখস আলী সাহেব তারিণীপুরের পাট উঠাইয়া বদরপুরের নিকট দেওরাইল গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এই দেওরাইল গ্রামেই শিতালং শাহ সাহেবের শ্বশুরালয় অবস্থিত। ছাত্রাবস্থায় শাহ সাহেব বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষায় গভীর ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।

অধ্যয়ন সমাপ্ত করিয়া শাহ শিতালং শাহ বাণপ্রস্থ অবলম্বন করেন। ছাত্রাবস্থায়ই তাহার সংসারের প্রতি বিরাগভাব পরিলক্ষিত হয়। তিনি দীর্ঘ বার বৎসর লাউড় ও ভুবন পাহাড়ে আল্লাহর আরাধনায় নিরত থাকেন। কত গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ তাহার উপর দিয়া অতিবাহিত হইল, যুগব্যাপী কৃচ্ছ সাধনায় নিমগ্ন থাকার পর তিনি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন।

অতঃপর সংসারাশ্রমে তিনি পুনরায় প্রবেশ করেন। তাঁহার গুণগাঁথা ও অলৌকিক শক্তির কথা শ্রবণ করিয়া দলে দলে লোকেরা তাঁহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে লাগিল। সংসারাশ্রমে প্রবেশ করিয়া তিনি অজস্র আধ্যাত্মিক সংগীত রচনা করেন। আজও সিলেট ও কাছাড় জেলায় পরম নিষ্ঠার সহিত তাঁহার পদগুলি গীত হয়। অধিকাংশ গানই সিলেটি নাগরি অক্ষরে লিখিত। তাঁহার সঙ্গীতাবলী (১) মুকিল তরান, (২) কিয়ামত নামা, (৩) রাগবাউল—এই তিনখণ্ডে বিভক্ত। সাধক শিতালং শাহ বিখ্যাত সুফিসাধক ছিলেন। তাঁহার রচিত মারফতি বা মুর্শিদি গানগুলি গভীর আধ্যাত্মিকতায় পরিপূর্ণ। তাঁহার সুযোগ্য পৌত্র মাহমুদ আলী সাহেব পরম যত্ন সহকারে নাগরি অক্ষরে পুনরায় লিখিয়া রাখিয়াছেন। শিতালং সাহেব ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১৭ই অগ্রহায়ণ তারিখে তিন পুত্র রাখিয়া ইহলোক পরিত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি ভাঙ্গা রেল স্টেশনের উত্তরে নদীর অপর পারে উত্তরভাগ নামক স্থানে বাস করিতেন। জনসাধারণের নিকট ঐ স্থান ‘বারঠাকরি’ নামে পরিচিত।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে কবি বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দ দাস, রায়শেখর, বলরাম দাস প্রভৃতি কবিগণ রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক বিস্তরপদ রচনা করিয়া বাংলা সাহিত্যের মান উন্নীত করিয়াছেন। সেই সব পদসমুদ্রে অবগাহন করিয়া সাধক কবি শিতালং শাহ স্বীয় হৃদয় রসে জারিত করিয়া মধুর পদ রচনা করিয়াছেন। পদগুলি সুমধুর অথচ আধ্যাত্মিক রসে ভরপুর। রাধাকৃষ্ণ যথাক্রমে ভক্ত ও ঈশ্বরের প্রতীক। হিন্দু-মুসলমান সকলের কণ্ঠে আজও শিতালং শাহের মধুর পদগুলি গীত হয়।

সাধককবি শিতালং শাহের মারফতি গান কিংবা দেহতত্ত্ব সম্বন্ধীয় সঙ্গীতগুলি উচ্চাঙ্গের, তাহা ভাব সমৃদ্ধ ও রসসম্পৃক্ত। সহজসরল ভাষায় গীত গানগুলি আমাদের চিত্ত আকর্ষণ করে এক ভাবময় জগতে আমাদের হৃদয় উন্নীত হয়। পদগুলি সত্যই সুমধুর।

শিতালং শাহ সাহেবের প্রার্থনা জাতীয় পদগুলি বিদগ্ধজনের দৃষ্টি স্বতঃই আকর্ষণ করিয়া থাকে। বিদগ্ধ সমালোচকবৃন্দ যদি সেই পদগুলির অনুশীলন ও গবেষণা করেন তবে বঙ্গসাহিত্য অধিকতর সমৃদ্ধ হইবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *