প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

শিতালং-গীতি সংগ্রহ

অজ্ঞান মন, খুয়াইলায় মহাজনের
ধন এবে কি লইয়া গমন?
মনারে, আনিলায় মানিকের ভরা বেপারের
কারণ ভবের বাজারে আসি খুয়াইলায় ধন।
হাউছ, হিরছ, হুভ, লোভ ডাকাইত চারিজন
হুসাই, বুধাই, পারাদারে করিয়া নিধন।
মনারে, চারি ডাকাইত মিলি করিল লুণ্ঠন
রাজপন্থে বসি এবে জুড়িছ কান্দন।
পানা কর মাবুদ আল্লা, ঠেকছি বিপাকে এখন
কলিমার সাথে যেন হয় মোর মরণ।
শিতালং ফকির কান্দে ভাবি নিরঞ্জন
ছিরাত সংকটে পানা কর জানি অবোধ জন।

অন্তর আনলে দহে প্ৰাণে নাহি সহে
হুরলোকের সম নহে নূরী লোকে কহে।
প্রথম আদম ছফি আল্লার দরগায়
আজ্ঞা ভঙ্গ করি তওবা কইলা একিদায়।
গেহু ফল ভক্ষণেতে খলিফা আল্লার।
তওবা করিলা কত হাজার হাজার
আজ্ঞা ভঙ্গ করি গেহু করিলা ভক্ষণ
ছিনিয়া রাখিল আল্লা লেবাছ পইরন।
গন্ধম খাইলা নবী বিধির গঠন
পায়খানা তলব হইল গলিজ কারণ।
নূরপুরী তজল্লিত তরঙ্গের সাজ
বেহেস্তে গলিজ নাই বউল বরাজ!
মাংগিলা আদম হাওয়া বৃক্ষ শবিস্তান
ঢাকিতে পুর্শিদা অঙ্গ দেও পত্ৰ দান।
বৃক্ষতাণে শুনি এছা তাদের বচন
ভাগিয়া চলিল দূরে হইয়া গমন!
মাংগিতে লাগিলা পত্ৰ দেহ বস্ত্রহীন
কেহ নাহি দিলা পত্র দেখিয়া দুর্দিন।
হুকুম করিলা আল্লা ফিরিশতা সকল
বেহেশত হনে আদম হাওয়া কর বেদখল।
আজ্ঞামাত্র ফিরিশতারা মহাবেগে ধায়
হস্তধরি খেচি টানে ফিরিশতা সবায়।
কান্দিয়া কহিলা নবী করিম ছত্তার
বেহেস্ত হনে আমাকে না কর বাহার।
বেহেস্তে গলিজ নাই কহিলা আল্লায়
পায়খানার হাজতে তুমি যাও দুনিয়ায়।
গলিজ বাহির হবে ভক্ষণেতে ফল
বলিলেন ফিরিশতারা নিকল নিকল।
আজ্ঞা হইল নূরিলোকে সইক্ষা নাহি চাও
অবিলম্বে আদমকে খেচি লইয়া যাও।
আদমে কহিলা আল্লা বেহেস্তের স্বাদ
না নিকালো দরগা হনে খেমো অপরাধ।
শিতালং ফকিরে কহে তওবা আস্তাগফার
অপরাধ ক্ষেমা কর জগত কাণ্ডার।


অপূর্ব কাহিনী মদিনা সুবর্ণের কারখানা
সুবর্ণে জড়িত পুরী সুবর্ণের অংগিনা।
 মদিনার নিবাসী লোক পুরুষ কি জননা
স্থানে স্থানে আরম্ভিল ইল্লাল্লাহু জপনা।
 মিথ্যুকে না আছে লোক নিবাসিত মদিনা
কুকর্মেতে মতি নাই সত্যকর্মে ভাবনা।
 তেলাওত করে কেহ শুদ্ধ অক্ষর ভাবনা
পাছান পাছেতে কেহ করিতেছে সাধনা।
 তছবি তামিদ নামে সদায়েতে ভাবনা
তাহলিল তাকরিয়ে হয় প্রেমভাবে দেওয়ানা।
 শিতালং ফকিরে কয় না পুরিল কল্পনা
রওজা মোবারক মোর জিয়ারত হইল না।
 
8
অপূর্ব কাহিনী লীলা তোর,
সয়ালে প্রকাশ তব নূর মনোহর, নিরঞ্জন।
অপূর্ব কাহিনী বাণী, সয়ালেতে হয় ধ্বনি, মারুতের শব্দ হাহাকার।
 লাশরিকত পাকজাত, বিরাজ মারুতের সাথ, জিন্দাপানা কর্মলীলা তোর।
 ভারতে মারুত চলে, ছওয়ার অইয়া খেলে, মারুত ঘোড়ায় চড়ি সাই।
 সয়ালে মারত ধায়, ধরিয়ে না ধরা যায়, নিশানা নমুনা নাই তার।
 বাতাসের দমকলে,খাকের পুতুলা কলে, জিন্দা অইলা ভরিয়া মারুত।
 জীবগণ যতইতি, মারুতে অইলা স্থিতি, হুর পরি জবরুত মলুকত।।
মারুতের মোহিত সাই, বিরাজে সকল ঠাই, ভক্তসবে পায় দরশন।
 ভক্তিসবে ধিহানেতে৬, রংগ হেরে বেরংগেতে, প্রেম খেলা খেলে সুলক্ষণ।।
 মারুতের ছয়ারেতে, স্বর্গভূমি পাতালেতে, আনন্দে বিরাজে পাকজাত।
 ভারতে মোহিত আছে, বিরাজে সবের কাছে, যথা যাও তথায় সাইক্ষাত।।
 অঙ্গেতে মারুত ঝুশো, প্রেম উথালিল রুশে, মদনেতে উঠিল তরঙ্গ।
 প্রেম খেলা যেই খেলে, নিকুঞ্জে বন্ধুয়া মিলে, ছুলতান নাছিরায় দেখে রঙ্গ॥
শিতালং ফকিরে কহে, বন্ধু বিনে প্রাণদহে, না পাইলু করি অন্বেষণ
মারুত সহিতে চলে, আংখির নিকটে খেলে, কর্মদোষে না অইল মিলন।।

অবুঝ মন কালুভুলা, আছে নিরে স্মরণ
ভবেতে আসিয়া তোর অইল বিড়ম্বন।
 আজলের১ কর্মফলে, জন্ম লইলে ভবকুলে
কালাধলা ভুলিলে যে ভুলেরে অবুঝ মন।।
ভবকুলে আসি ভাই, পূর্বকথা মনে নাই
সে দোষেতে বন্ধুয়া না পাইরে অবুঝ মন।।
 সঙ্গেতে মানিক লইয়া, ডিঙ্গা আছিল ভরা দিয়ারে
ফিরে ডিঙ্গা ভাসিয়া সায়রে।
সায়রের নাই পার, ভবসিন্ধু নৈরাকার
নিজ নাম জপয়ে আল্লারে।
জপিলে আল্লার নাম, সিদ্ধ হবে সর্ব কাম
আদ্দি৩ নাম জপয়ে কালাম রে।
সায়রে বিষম জল, ভরাডুবি হইবে তল
নীরে ডিঙ্গা করে টলমলরে।
 প্রেমভরা দিয়ে যেই আমানতঃ পুঞ্জি সেই
সেই সে হইল সাধুভাই।
হায় প্রভু নিরঞ্জন আকুলিত মোর মন
ভবসিন্ধু করয় তরান।
অকূল সাগরে বসি ফিরি আমি কর্মদোষী
সাগর দেখিয়া ভয় বাসি।
বিধি মোর হইল বৈরী হইয়া ফিরি দেশান্তরী
প্রেম ভিক্ষা মাগিয়া সে ফিরি।
চোরে নিল সর্বধন উদাসিনী হইল মন
কেবল ভরসা নিরঞ্জন।
শিতালং ফকিরে বলে হিয়া দহে প্রেমানলে
ভুলিয়া রহিলু মায়া জালে রে অবুঝ মন।

আইল বসন্ত ঋতু কালিয়া বরণ
কালারে প্রাণ রাখ দিয়া দরশন।
 সয়ালের চকিদার কালিয়া বরণ
কালারূপে কর মোর নয়ন রওশন।
 কালারূপে খেলা তোর কিরূপে লীলা
দরশন দেও প্রভু শ্যাম চিকন কালা।
 কালা রঙ্গ দেখে সবে জগত সয়াল
প্রেমভাবে আইস বন্ধু প্রভু কুঞ্জলাল।
 কালারূপে খেলা করে নাছুত মলকুত
প্রেমিকের সঙ্গে মিলে জবরুত লাহুত।
 কালারূপে করে খেলা সমুদয় পাতাল
জগৎ জুড়িয়া কালা ঠাকুর দয়াল।
 কালাকালা ডাকি বন্ধু কালা প্রাণের ধন
প্রেমভাবি হইয়া ডাকি আকুলিত মন।
 শিতালং ফকিরে কহে না হইল মিলন
প্রাণে রক্ষা কর কালা দিয়া দরশন।

আইস বন্ধু কালা চান্দরে ডাকি আমি তোরে
অভাগী নির্লজ্জ হইয়া বসিয়াছে দুয়ারে।
 তুমি ত জগৎ পতি জগৎ মোহিনী
আমি ত অভাগী নারী কলঙ্কী দুঃখিনীরে।
 আসবে বলি প্রাণনাথ দুঃখিনীর প্রায়
নিশাভারে চাইয়া আমি বসিয়াছি তোর দায়।
 রূপেতে ঝলমল করে হৃদয়ে দেখি মোর
তোর প্রেমে হিয়া মোর হইল ঝরঝর।
 আসবা আসবা প্রাণের নাথ, রাত্র যায়
গইয়া রাতের শেষে আইলা নাথ মিতনি দেখিয়া।
 শিতালং ফকিরে কহে বন্ধু রূপ হেরি
কালাচান্দ বিহনে আমি হইলাম দেশান্তরী।।

আইস বন্ধু প্রাণ কালিয়ারে
প্রাণ রক্ষা কর প্রভু দরশন দিয়ারে।
 প্রেম সুরে বায় বাঁশি রসিক বন্ধুয়া
অবলার প্রাণ নেয় সুরেতে হরিয়া।
 মুরলী বাজাও প্রভু কোকিলার স্বরে
সোনাপুরে জপে নাম সুন্দর তুতিয়ায়রে।
 সোনাপুরে যায় যেই করিয়া ভ্রমণ
মিলিবে তুতিয়া সাধু চান্দের বরণ।
 আনন্দে প্রবেশ হইয়া ছিরিকুলার হাটে
দেখিবে রসিক বন্ধু ত্রিপুণ্যির ঘাটে।
 শিতালং ফকিরে কহে না ভজিলু প্রিয়া
মোরে নাহি চায় বন্ধে, কলঙ্কী জানিয়া।

আইস বন্ধু প্রিয়া প্রেম ধন, ডাকি বন্ধু রূপের সাগর রে।
আমার বন্ধু নিরুদ্দেশ, প্রাণধন বন্ধুয়া তুমি রইলায় কোন দেশ।
তোর নাম লইয়া ঘুরি      যুগল নয়নে বারি
বহে মোর ধারা বরিষণ রে।
নিশি গত হইয়া যায়      আইস বন্ধু শ্যামরায়
বইস আমি নয়নেতে মোর।
যদি আইস মোর ঘর      যিনি শশী দিবাকর
অন্ধকার হইবে পসর রে।
যদি প্রেম থাকে মনে      আইস মোর নিকেতনে
আসিয়া দেখাও চান্দ মুখরে।
প্রভাত হইয়া যায়      কুকিলে পঞ্চম গায়
জাগিয়া উঠিবে সকলরে।
শিতালং ফকিরে কহে      কামানলে অঙ্গদহে
প্রেমভাবে আইস মোর ঘর
ডাকি আমি অপরাধী তোর প্রেম হয় যদি
দরশন দেও আসি আমারে রে।

১০

আচ্ছালামু আলাইকুম পাঞ্চতন
মস্তফা, মর্তুজা আলী, ফাতিমা, হাছন হুছন।
মনান্তরে চাও ধিহামে দেহাতে বায়তুল্লা কোনুস্থানে
প্রেমিকদের অঙ্গে নূরি কোনুস্থানে হয় মিলন।
কোনুস্থানে জমজমাতে শীতল জল জারি থাকে
সেইজল ভক্ষণ কইলে দেহার পাপ হয় মোচন।
 বিমূল্যেতে রঙ মহলে কাবাতুল্লা সেই স্থলে গো
মহামতি জগত মাতা সয়ালে আছে রৌশন।
 মহিমার সাগর বিবি শুন সিন্ধু প্রেম ভাবি গো
নিজের দাবি তেয়াগিয়া অপরাধী হয় তারণ
শিতালং ফকিরে বলে এলাহি সংকট কালে গো
সফায়াতের উছিলা মোর নবীর দুই চরণ।

১১

আজ্ঞাভঙ্গ করিয়া হইলো যাইতে দুনিয়ায় রে
গেন্দুম ভক্ষণায়।
স্বর্গপুরী তেয়াগিয়া হিয়া ফাটি যায় রে।
 আদমকে ফুকারিয়া কহিলা আল্লায়।
 সফর করিতে তুমি যাও দুনিয়ায় রে।
 দুনিয়াতে যাও তুমি করিতে সফর।
 কাফন দাফন হইব এই দুনিয়ায়রে।
 দরগাহে কহিলা নবী মাবুদ আল্লা সাঁই
একেলা কিরূপে আমি দুনিয়াতে যাইরে।
 দুনিয়াতে যাও তুমি করিতে দখল।
 দুনিয়া ভরিয়া তোমার আওলাদ সকলরে।
 আওলাদ হইবা কোটি কোটি হাজার হাজারে।
 নবী ওলী হইবা কত আওলাদে তোমার রে
আদম আর হাওয়া বিবি নিয়া ফিরিস্তায়
দুনিয়ায় রাখি দিলা বসতির দায় রে।
 আদমকে নিয়া গেলা সরন্দীপ স্থান।
হাওয়া বিবি প্রবেশিলা নামে সোরাপান রে।
 মহাদোষী অপরাধী জানিয়া সেথায়।
 অতিভক্তি ভাবে নবী বসিলা তওবায় রে।
জমিনে রাখিয়া মাথা করিলা কান্দন।
অপরাধ হইলে মোর ক্ষম নিরঞ্জন রো
আদম আর হাওয়া বিবি এ্যায়ছাo কান্দিয়া আকুল।
নয়ানের জলে হইল দরিয়া নির্ভুলরে।
আদম আর হাওয়ার এ্যায়ছা দেখিয়া কান্দন।
কান্দিতে লাগিলা নূরি ফিরিশতাগণ রে।
শিতালং ফকিরে কহে গুনায়ে কাতর।
 দোষ ক্ষমা কর মোর কৃপার সাগর রে॥

১২

আটক নদীর উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম আবজলাল
মধ্যে বিরাজে কুঞ্জলাল।
মধ্যেতে কাবাতুল্লা আছে নবীর ঘুষা লইয়া কাছে গো
দক্ষিণে বরজক মওলা বামে খেলে রূপ দয়াল।
মরমা কবি শিতালং শাহ
শিতালং-গীতি সংগ্রহ
মসজিদ মদিনা যথা মোকাম মাহমুদা তথা
বয়তুল মোকাদ্দস আছে শূন্যে দাঁড়াইছে সয়াল।
 দমকলেতে কুঞ্জস্থলে ডেরাডাণ্ডা ঘুমেতে চলে
কোন স্থলে ধুম্বা চাপে কোন স্থলে গুলে লাল।
 দু দম নাছুতে ভরে রমিমে দমকল ঘুরে
ডেরাডাণ্ডা চরকী ঘুরে ঘুর ঘুর সুরে দমদম তাল।
 পঞ্চমীর দক্ষিণ অংশে, কুমরি নদী চলে রূশে
তার মধ্যে অগ্নি কুণ্ডে খেলে প্রভু রূপ দয়াল।
 শিতালং ফকিরে কয় সাক্ষাত সংকট কালে
চৈতন্য সিন্ধু উদ্ধারিতে মুস্কিল আসান জুলজালাল।।

১৩

আপন কর পরিচয় পন্থ চিনরে
ও মন পাঁচ আনফাছেতে জপ নাম।
 সংবেদন করিতে মনে ইচ্ছা হয় যার
প্রেমানলে জ্বলি করে প্রেমের বিহার।
 প্রেমভাবে দঢ় হইয়া ভক্তি ভাবে মন
দমে দমে জপ নাম মুর্শিদের বচন।
 দিলালপুর নিরখিয়া করহে ধিয়ান
একে তিনে জপ নাম ঊর্দ্ধে দিয়া টান
সিং দরজায় ভুজঙ্গ দুষ্ট করয় গর্জন
পন্থ না দেয় প্রবেশিতে গৃহেতে কখন।
 সাতে পাঁচে মারো গুল্লি একে তিনে সার
পলাতক হয়ে দুষ্ট খুলিবেক দ্বার।
 খুলবে যখন কুঞ্জিতালা প্রবেশিবে ঘর
বেলওয়ারী ঝাড় দেখবে তরঙ্গ বিস্তর।
 রসিক লোক হইলে করে নিকুঞ্জে বিহার
দেখ লোক গোলাপের চৌদিকে গুলজার।
 মিথ্যুক লম্পট হইলে গৃহে কখন না যায়
সিং দরজায় কালভুজঙ্গে গ্রাস করে তায়।
 শিতালং ফকিরে কয় চিন্তাতে থাকে মন
পরম ভাবনা হইল ভজন সাধন।

১৪

আমার গুলকান্দর গুণী দেখ রং রং রংরং কত ঢঙ্গে গো
সাজিয়া আইলা কামিনী।
ঝলঝল পিন্দন শাড়ি টলমল কাঙ্খে বারি গো
জলভরে কদমতলায় কুরঙ্গ নয়ানী!
ঘুরঘুর হাটে গুয়াত কাটে আনন্দে বসিয়া খাটে গো
সভা করি গায় গান ময়ুর নাচে গাটুনী ॥
জ্বালাইয়া মোমের বাতি পোষাইলাম সারা রাতি গো
ফুল বিছানায় আতর ছিটাই ইন্তেজার বেদনী।।
হরেক রংএর যন্ত্র বাজে হরেক কোঠায় গোপী সাজে গো
খালি গিদক কোলে লইয়া পোষাইলাম রজনী।
 রাতি না পোহাইতে সভা ভাঙ্গি যায় তাতে গো
একাশ্বরী রইনু পন্থে শ্যামের দায়৬ উদাসিনী।
 বুকেতে ধুকধুকি করে রহিতে না পারি ঘরে গো
কেওররঠাইন কইতে নারি শ্যাম কালিয়ার কাহিনী।
 মাছ কাটিতে হাতকাটি, অন্ন খাইতে বর্তন চাটি গো
ননদিনীর বিবাদে হইনু গোকুলে কলঙ্কিনী।
 শাশুড়ীয়ে ক্রুদ্ধমতি পতিকে করিল বৈরী গো।
 শ্যাম পিরিতি ছাড়াইয়া মোরে পায়ে দিল ঝনঝনি
তুমি মোর খবর নেও গুলকন্দে আনিয়া দেও গো
কইও আমার পিরিতের কথা বলিয়াছে দুঃখিনী।
 শিতালং ফকিরের বাণী চন্দ্র হরি নিল প্রাণী গো
আন্ধায়নি মানিক চিনে কথায় ঘুরে শয়তানি।

১৫

আমার দিন যায়রে বেহুশে মজিয়া
কি কাজে আইলাম ভবে না চাইলাম তলাইয়া।
 বনিজ করিতে আইলাম পরার ধন লইয়া
খুয়াইলাম পুঞ্জিপাতা কামানদী ডুবাইয়া।
 কতকত সাধুজ্ঞানী এই নদীতে আইয়া
কত কত পুঞ্জিপাতা গেছেন  খুয়াইয়া।
 কাম নদীতে ছয় ডাকাইত সদায় থাকে বইয়া
বেপারী বেখিয়াল১০ অইলে মাল নেয় লুটিয়া।
 এই নদীতে শতধার কেমনে যাইতায় বাইয়া
ধরোগি মুর্শিদ রতন কামিল আলিম চাইয়া।
 বরাতের জোরে যদি মুর্শিদ যাও পাইয়া
তছবি তহলিলে দিবা বাঁচার পথ বাতাইয়া।
 শিতালং ফকিরে কয় মনারে ভাইয়া
কামনদীর ফাড়ি শিখো মুরশিদবাড়ি যাইয়া।

১৬

আমার বন্ধুয়া কোন স্থান
শুন সজনী প্রেম বদনী, বন্ধু আনি রাখ প্রাণ।
 সখিগো যাও ধনি কমলিনী মথুরার স্থান
আনগিয়া বন্ধু আমার উন্মাদিনী হইল প্রাণ।
 সখিগো বন্ধু বিনে তাদের সনে গেল কুলমান
না পাই দিশা মন ভরসা আসবে নি প্রাণ কুঞ্জস্থান।
সখিগো মনহরা প্রাণচোরা খেলে সর্বস্থান
কুলমান নিল প্রাণ হারাইলাম বুদ্ধিজ্ঞান।
 সখিগো প্রাণহরা না যায় ধরা নাইত তার নিশান
গুম না আয় ঘুরে প্রাণ, কোন স্থানে আর নাই স্থান
সখিগো নয়নবাণে শরবদনে কটাক্ষেতে মাইল বাণ
বনবিহারী ধরতে নারি পাইনা কইলে যোগধ্যান।
 সখিগো শিতালংগে বলে সঙ্গে গেল কুলমান
গেল মান বুদ্ধি জ্ঞান ব্যাকুল হইল প্রাণ।

১৭

আমার রসিয়া বিরস হইলা কিসে
আমি তার অন্বেষণে যাইমু কোন দেশে গো সখি।
আর চায়না নিরক্ষিয়া প্রভু নিরঞ্জন
পরম যতনে ঘর করিল সৃজন।  গো
ঘরের দুয়ারে দশ আচানক কল
যোগাসনে বসিয়াছে দুয়ারি সকল।  গো
প্রেমের বন্ধন ঘর পবনের খুনি
মিরতিংগা বাঁশের রোঁয়া উলুবেতর ছানি। গো
দুইধারে দুই দীপ দুয়ারেতে জ্বলে
কি সন্ধানে চলে ঘর উতালা মেদিনী। গো
ঘরের মধ্যেতে ঘর অতি সুমধুর
আট চল্লিশ আছে তাতে কুঠুরি সুন্দর। গো
শিতালং ফকিরে কহে শ্যামরে কালিয়া
প্রকাশিত কর ঘর দরশন দিয়া। গো সখি।

১৮

আমার শক্তি নাইরে নাই আমার বল
মালিকুলমউতে মোরে কইরাছে ঘায়েল।
 গোসল দেওয়াইতে নেয় মুরদারে যখন
তখন কহিবা রুহে করিয়া কান্দন।
জোরে না ধরিও মোর খাকের কায়ায়
আস্তে আস্তে রাখিও মোরে গোসলের জায়গায়।
 আর এক কথা মোর শুন বিরাদর
জোরে না খুলিও মোর বদনের কাপড়।
 ঠাণ্ডা পানি না ঢালিও দোহাই আল্লাহর
অতি গরম না ঢালিও দোহাই মোস্তফার।
 যে জনে গোসল দেয় শুন দিয়া মন
নরম হাতে মলিও আমার খালি বদন।
 নাকে আর মুখে পানি না ঢালিও আমার
তকলিফ না দিও মোরে হইয়াছি লাচার।
 নাপাকি চাইয়া মোরে গোসল দেলাইও
আছানির সাথে মোরে করট ফিরাইও।
 জাখানদানি হইল যবে আল্লাহর হুকুম
তামাম বদন আমার হইয়াছে খুন।
 বদনে না পাকি যেন না থাকে আমার
নহেত হইবে গুনাহ দরগায়ে আল্লার
সিতাবি করিয়া মুখ না ঢাক আমার
তোমা সবে সঙ্গে আজি আখেরি দিদার।
 তোমা সবে ছাড়ি যাইতে মনে বড় দুখ
ভাল মতে দেখি আজি সকলের মুখ।
 দুনিয়ার সফর আমার আজি হইল শেষ
খালি হাতে চলে যাই হুব্বুল ওতন দেশ।
 স্ত্রী পুত্র যত মোর আর ভাই বিরাদর
জাকাত খয়রাত দিয়া লইও খবর।
 কোরান পড়িয়া দোয়া দরুদ পড়ি আর
আল্লাতে মাগিও পানাই উপরে আমার।
 শিতালং ফকিরে কয় দরগায়ে আল্লার
মউত কালে থাকে যেন ঈমান করার।।

১৯

আমার সঙ্গের সঙ্গিলা কেউ নাইরে পাগল মনা
ও মনা আমার সঙ্গের সঙ্গিলা কেহ নাই।
মন হে, দুই চোখ মজিলে মনা হায়রে মনা দুনিয়াই আন্ধাইর
ওরে কি মতে রহিতাম আমি কবরের ভিত্তইর। রে পাগল
মন হে তোমার লাগিয়া আমি মন ঝুরি দিবানিশিরে
ওরে কি দিয়া রইতাম হায়রে, অউনু। আমার বাসর রে।
মন হে গুরুর বাজারে আইয়া মন, হস্তে চাও নজর করিয়া
ওরে সেই হিসাব করবা আল্লায় হাসরের ময়দান রে।
মন হে শিতালং ফকিরে কইন, হায়রে গাছের তাল দিলাম মন রে
অউনা পাইলাম আমার ছায়েব আল্লারে।।

২০

আমি কই যাইরে কি হইল মোরে
বুদ্ধি নিলো ভবের লোভে ইমান নিল চোরে।
 এই ভবের লোভ লালস শয়তানের ডুরি
আংখির উপর ভেলকিত দিয়া ইমান কৈল চুরি।
 ধন আমার হৈল বাদী কাঞ্চন হইল বৈরী
খন্নাছের দিল মোর কেমনে ভব তরি।
 স্ত্রী পুত্র ধন জন হইল পরাণের পরাণ
ছাড়াইলে না ছাড়ে এই ভবের জঞ্জাল।
 শিতালং ফকিরে কয় বসিয়াছে কান্ধে
ভবের জঞ্জালে আমি ঠেকিয়াছি ফান্দে।।

২১

আমি কি করি উপায়
আইল না আইল না বন্ধু প্রাণ ঝুরে সদায়।
 শুন সখি প্রেয়সিনী বলি যে তোমায়
আন প্রিয়া ফাটে হিয়া অঙ্গ জ্বলি যায়।
 নিগূঢ় ঘরে বসিয়া ডাকি প্রাণবন্ধু কোথায়
প্রেম সায়রে বুঝি বন্ধে ভাসাইল আমায়।
 নিগূঢ় ঘরে সিংহদ্বারে ভুজঙ্গ দাঁড়ায়
একে তিনে সাথি পাছে ত্রিশূল চালায়।
 ভাসি সিন্ধু ডাকি সিন্ধু রাখিও কিনারায়
দরশনের নৌকা দিয়া তরাও আমায়।
 প্রেমসায়রে তরঙ্গেতে দুই দাঁড়ে উজায়
সাক্ষাতে চাঁদের হাট দেখতে শ্রীকুলায়।
 সোনাপুরে শুক পংখী নাম জপে সদায়
জব্বলপুরে চান্দের উদয় গগনে লুটায়।
 শিতালং ফকিরে কয় আপসোস সদায়
দরশন না হইল বুঝি আমার দোষের দায়।।

২২

আমি ঠেকলাম হায় লাঞ্ছনায়, কালনিশি স্বপন দায়
দেখা দিল আসিয়া কালায়।
স্বপনে আসি পরাণ শামা দেখা দিয়ে গেলো তায়
দেহশূন্য করি নিল পরাণ হরি প্রেম দায়।
 দেখা দিল বিদ্যাধরী স্বপনে আসি আমায়
সেই অবধি পরাণ নিল প্রেমেতে কাল নিশায়।
 অপূর্বকাহিনী রূপ দেখা দিল স্বপনে হায়
দেব কি গন্ধর্ব নর দেখতে পরান নিয়া যায়।
 গোলাবের পুষ্প জিনি দেখিয়াছি রং তারে গো
রূপ দেখে মন উচাটন সন্ন্যাসিনী করিল আমায়।
 শিতালং ফকিরে কয় শ্যাম বিনে পরাণ যায়
শ্যামের বিরহে মন দেহ জ্বলে সর্বদায়।।

২৩

আমি তোরে ডাকি বন্ধুরে বন্ধু ডাকি রইয়া
রইয়া কি দোষ পাইয়া বন্ধু গেলায় নু ছাড়িয়া রে।
আমি তোরে ডাকি বন্ধুরে।
আর আনবার কালে আনলায়রে বন্ধু আশা ভরসা দিয়া
অখন তুমি যাইতরায় ছাড়ি কি দোষী বানাইয়ারে।
 আর মাও নাই, বাপও নাই, নাইরে সোদর ভাই
ওরে আমি অভাগী নির্লক্ষ্মীর আর তো লক্ষ্য নাইরে।
 আর অতি না যৈবনের কালে মাইয়ে বাপে আর
ওরে বিয়া যে দিছিলা মোরে সুখের বাসর রো
আর কইও কইও প্রাণের বন্ধুরে কইও ভাইগণ ওরে
আমি অভাগীর যৈবন কার পরার ঘরেরে।
আর শিতালং ফকিরে কইন রে গাছের তলে বইয়া
ওরে পারইতাম পারইতাম করি দিন তো যায় মোর গইয়া রে।

২৪

আমি বন্ধুর দায় হইলাম প্রায়, প্রাণ শ্যামের প্রেমের দায়
প্রেমের ফাসি লাগিয়াছে গলায়।
শ্যামের বিচ্ছেদে মোর প্রেমানলে প্রাণ জ্বলিয়া যায়
প্রেম ভিক্ষা দিয়া প্রাণ রক্ষা কর শ্যাম রায়।
প্রেমানলে সন্ন্যাসিনী হইয়া ফিরি ভ্রমণায়
কোলেতে কুরঙ্গ লইয়া দাঁড়াইয়াছি ভিক্ষার দায়।
শ্যামের বিচ্ছেদের শেল এমনি জ্বলে সর্বগায়
অপ্রসন্নে প্রায় ঝুরে বল কি করি উপায়।
 শিতালং ফকিরে বলে ভিক্ষা দাও প্রাণ শ্যামরায়
প্রেম দায় ভিক্ষার ছলে দাঁড়াইয়াছি দরজায়।

২৫

আরেও পাগেলা মন দেখ স্বরূপ সুস্বামীর ভাবে দিয়া মন।
সত্যবাদী যেই নারী রেকায়ে গমন, জানে রেকার সাধন, হায় হায় হায়।
 নিঘোরে বসিয়া থাকে সুত বিনে নাই আরেন।।
সত্যবাদী নারী যারা চরকারে বসতি, তারা ভাগ্য মহামতি হায় হায় হায়।
পিউনিতে টিপ ধরিয়া নাল ভরে সে অনুক্ষণ
চারি খুঁটি দিয়া রেখা করিয়াছে খাড়া
তাতে ষোল পাতির জোড়া হায় হায় হায়।
 উল্টা টানে কাটে সুতা ঘাম ছুঁইয়া যায় দরবদন।।
 চরকারে ঘিরিয়া আছে দিয়া মালামাল
নারীর চরকা বুকের শাল হায় হায় হায়।
 রমিমেতে ভর করিয়া নাল ভরে সে দম ধারণ
চিন্তামণি নারী যারা, চিনিয়া লয় সুতা তারা
হামেশা চিন্তা হায় হায়।
ধনুকে ধুনিয়া রুই নাল কাটে সে সুলক্ষণ
শিতালং ফকিরে বলে সুতা বড় ধন
সুতে গাঁথা যায় রতন, হায় হায় হায়
কাটিতে না পাইলা সুতা নাল ছিড়িয়া যায় টনাটন।।

২৬

আল্লা জলিল জব্বার, শহীদুল কাহহার
রব্বুল গফুর তুই, করিম সত্তার।
 আরবাএ আনাসিরাএ দিআ নিরঞ্জন পাক
কুন ফুকারিতে হৈলা খলক আফলাক।।
 ফিহাল রব্বানী ভেদ অপূর্ব বচন
ইয়াদামাফিক কইল খলক সিরজন।
 লা শরিক নিরঞ্জন জলিল জব্বার
হুব্ব চিত্তে বাইন্দা হৈল প্রেমের বাহার।।
 প্রেমের ভর জুশে হুব্বে নিরঞ্জন
নিজ নূরে মোহাম্মদ করিলা সৃজন।
 আহাদে৬ ছিলেন নবী বেমিমে ইসিম
হুব্ব চিতে বেমিযেতে মিশাইল মিম।
 মিম হইল আহাম্মদ রঙ্গ
প্রেমসিন্ধু উদ্ধারিতে তরঙ্গের সঙ্গ।।
প্রেম তরঙ্গে হইল প্রেমের বাহার
প্রেমসিন্ধু উথলিল ঢেউর হুঙ্কার।।
নূর মোহাম্মদী চমকে সবার আসল
সে নূরে সৃজিল আল্লা বেহেশত সকল।
 নূর মোহাম্মদী হইতে মলকুল হাকিম
কুরশি সহিত হৈল আরশ আজিম।
 রহুকে সৃজিল যেসা বুরাক মোতির
কলম কুদরতে হইল লিখিতে তকবির।
 অবশিষ্ট নূর হইতে মাবুদ রহমান
স্বর্গভূমি হইল সঙ্গে সহিতে সামান।
 গজব সৃষ্টি বর্গে আল্লাহ নিরক্ষণ
গোশশার কাহারে হইল দুজখ সৃজন।
 প্রেমভাবে কৃপা যোগে হুকুম আল্লার
খলক আফলাক হইল নূরে মুস্তফার।
 কিবা যোগে স্বর্গভূমি করে ঝলমল।
 ইন্দর চন্দর শোভা করে সিতারা সকল।।
 চান্দ সুরুজ তজল্লিতে ছিল বরাবর
দিবানিশি না আছিল একই পসর।।
অনেক মুদ্দত পরে আল্লার ফজল
তজল্লি হেরিয়া কইল শশীকে শীতল।।
 দিবানিশি দুই রঙ্গ দেখিতে সুন্দর
চলাচল করে দিবে মাহিনা বচ্ছর।
 শিতালং ফকিরে কহে নবীকে স্মরিয়া
উম্মতে রাখিও মোরে পদাশ্রয় দিয়া।।

২৭

আল্লা দরদ নাইনি তোর
বানাইয়া ভাঙ্গিবার পার নবীন বাসর।
আর মায়ের কুলের যাদু বা আল্লাহ নিলায়রে কাড়িয়া
অল্প বয়সের জোর নিলায়রে ভাঙ্গিয়া।।
আর কেওররেই বানাওবা আল্লা লাখের সদাগর
মুই অধমরে মানিয়া ফিরাও পরতি ঘরে ঘুরে।
 আর কইননি ফকির শিতালং শা দিলেতে ভাবিয়া
না জানি কি অইব আমার কয়বয়ের ভিত্তর।।

২৮

আল্লা হায় হায়রে কি করি উপায়
নমাজ সংগতি ধন হারাইলাম হেলায়।।
 বেনমাজির উপরে নাই আল্লার রহমত
কবুল না হবে তার কোন এবাদত।।
বেনমাজি হইলে নাহি মুসলমানি বিন
নূরের পরকাল নাই বদন মলিন।।
 লা-উম্মতি বেনমাজি বেদিনেও দাখিল
সর্বঘাটে হবে আটক ঘটিবে মুস্কিল।
সাক্ষাতে ছকরাতo সিন্ধু আতসের ধার
নমাজ পড়িলে হইব গুরুজের ঢাল।।
 ছকরাত সায়র সিন্ধু তুফানের ডর
নমাজ উছিল্লা ভাই তরিতে সায়র।।
 সাক্ষাতে উছিল্লা যদি থাকিত নমাজ
ছকরাতে উছিল্লা দিত আল্লা পাকজাত।।
 কয়বরে মুস্কিল হইব ছয়াল জুয়াব
নমাজ উছিল্লা যদি কি দিবে জুয়াব।
 মারিবা গুরুজ তুমি ঘটিব জঞ্জাল
নমাজ থাকিলে হইত গুরুজের ঢাল।
 শিতালং ফকির মাংগৈন দরগায় আল্লার
নমাজ পড়িলে থাকে ইমান করার।।

২৯

আলিপের দিকে চাইওরে
দম গেলে দম আর পাবে না।
আব১ আতস খাকত বাদ চারিচিজ দিয়া
এমন সুন্দর তনু বানাইল কানাইয়া।।
নাহি দিল সোনা রূপা নাহি দিল শিশা
কেমনে গড়িল তনু মায়ে না পাইলা দিশা।।
শিতালং ফকির কয় মনে বড় ভয়
আখেরে নি করবা শফা৬ নবী পেগাম্বর।

৩০

আসিকে না ভুলিও মাশুক পাইবায় বন্ধের ঠিকানা
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ জপনা।
সারানিশি জাগি রৈলাম বন্ধু মোর আইল না।
 দেখিলে পিয়ারাত মাহবুব যাইব দুঃখের ভাবনা।
 যদি চাও পিয়ারা হইতে সুখের সরবত পিওনা—
দঢ়ভাবে পিরিত কৈলে পাইবে বন্ধের ঠিকানা।
 রুশন বদনে যদি দিল হইয়া যায় আয়না
তবে সে পাইবে মওলা নয়ন খুলি দেক না।
পন্থীর সনে পন্থ লইলে পন্থের মিলে ঠিকানা
মুর্শিদ ভজিয়া তোমার দমের সঙ্গে মিল না।
 শিতালং ফকিরে বলে দেখ বন্ধের কারখানা
যে দেখিয়াছে পাগল হইছে আছে সেই দেওয়ানা।

৩১

ইছরাফিলে শিঙ্গা লইয়া বসি আছৈন ইন্তিজার
বেকরার, সিংগা ফুকিলে অইবো ছারখার।
 শুনরে মুমিন বন্দা।
শুন দিয়া মন, সিংগা ফুকিবা যখন
আকাশ পাতাল স্বর্গ উড়িয়া, হইয়া যাইব রুইত আকার।
 তুই আল্লা দয়াময়, অসারের সার, প্রভু জগত কাণ্ডার
বিষম তরঙ্গ হনে তরাইও রব গফ্ফার।
কোথায় ফেরআউন আর কোথায় নমরুদণ্ড
গুমান করিয়াছে মরদুদ
খোদায়ির দাবি করি জাহান্নাম হইল সার।
কোথা কাল শাহানশাহি, কোথায় জাতের অহংকার
আশরাফি ফখর ভাইরে ফেরেববাজি মিছমার।
আজাজিল ছিল ফিরিছতার প্রধান, গুমান করি হইল শয়তান
গুমানে তামাম হইল; শয়তান পাপী দুরাচার।
 জিকির রব্বানি জপো শুদ্ধ করি সার, নাম জপহে আল্লার
পাছান পাছেতে জপো ধিয়ান রাখি নৈরাকার।
কোরান হাদিছে আছে, ফরমাইলা রব্বানি
কিয়ামতের নিশানি ভবের উপর কেউ আল্লা না বলিবে আর।
শিতালং ফকিরে বলে জ্বলিয়া হইলাম ছাই
প্রভু ডাকি হে তোমায়, বিষম সংকটে মোরে করিও উদ্ধার।

৩২

ইয়া এলাহি মুশকিলে তুই আসান কর, রহম কর মুস্তফার উপর।
 এলাহি আলমিন আল্লাহ কাবাঘর তান সামনে খাড়া গো।
 ইব্রাহিম খলিল উল্লাহ সেই ঘরের কারিগর।
শেখ কামাল, শেখ জামাল গো হজরত আলীর বাড়িঘর।
 আরাফাতের ময়দানের মাঝে আদম হাওয়ার বাড়িঘর।
 মদিনা শহরের মাঝে সঙ্গে-মরমর পাথর আছে গো।
 আর যত পাথর আছে জানেন তাহা নিরঞ্জন।
 রওজা মোবারকঃ যথা নূরেতে গোলজার তথা গো।
 ভ্রমরে মুল্লুক নূরি জিয়ারত বরাবর।
হাসন হুসন আলী ফাতিমা জোহরা বিবি।
 খুনেতে আলুদা আঁকা ধরিয়া দিয়া তান উপর।
 হায় হায় উম্মতি বলি বেতাব হইয়া নবী গো
শির মোবারক জমিনে রাখি গোনা বখশাইন উম্মতের।
 ফাতিমা জোহরা বিবি আরশের পায়া ধরি গো
নবীজীর উম্মতের লাগি ঝুরে আঁখি নিরন্তর।
শিতালং ফকিরে বলে আশার আগে বসিয়া রইলাম গো
নবীজীর চরণ বিনে গতি নাহি দেখি মোর।

৩৩

ইয়াজুজ মাজুজের বংশ আসবে যখন মোমেনগণ ভবে না রহিব কমল কারণ হাট বাজার না রহিবে, রাজ সিংহাসন হবে সব উলটন হায় হায় হায়।
সংসার করিবে আহার রাক্ষসের মন।
দক্ষিণ পর্বতে জান তাহাদের বাস।
তারা সদায় রাখে আশ, হায় হায় হায়।
আমি ত মনুষ্য কুলে পাপিষ্ট উজের দুর্জন
পূর্বে তারা কতদেশ করিয়া ভ্রমণ, খাইল ধরি জীবগণ হায় হায় হায়।
 সিকন্দরে দেওয়াল, দেওয়াল দিয়া করিলা বারণ
শেষে ভাঙ্গিবে দেওয়াল প্রভু নিরঞ্জন, তাহা জানো মোমেনগণ হায় হায় হায়।
 আসবে কত রাক্ষস তায় জানে নিরঞ্জন।
তিব্বতিয়া নদী এক তুর্কস্থান
সে নদীর জল তারা করিবেক পান, হায় হায় হায়।
আসবে তাহার সঙ্গে আবরা কতজন
দেখিবে সাগর তাতে নাহি নীর, তাহাতে হইয়া অস্থির হায় হায় হায়।
দেখিয়া মনুষ্য জাতি ধরিবে তখন
দন্তে কাটি খাইযে কত না যায়ে কওন।
 সজীব জন্তুগণ, হায় হায় হায় বান্ধি ধরি নিয়া যাবে তার কত জন
কয়তুরেতে যাবেন ঈসা নিয়া লোক জন।
 আজ্ঞা দিবেন নিরঞ্জন হায় হায় হায়।
 যাইবে রাক্ষসগণ বধিতে উজের জীবন কামানে খুজিয়া তীরে মারিবে গগনে রক্ততীর দিবা দূতগণে হায় হায় হায়।
আজ্ঞা দিবেন তাতে আল্লায়, আল্লা ও উজে নিরঞ্জন
রক্তমাখা তীর দেখি বলিবে দুর্জন
আর না রইল কোনজন, হায় হায় হায়
করিলাম সারা জগৎ জয়, জগৎভুবন।

৩৪

উঠলে উঠমু শুইলে শুইমু কেওরের কোন ধার ধারি না
বউগো তুই উঠবে কিনা।
বান্ধাইল হুক্কায় তামাকু ভরি বউরে করি যাচনা
খাইলে খাইমু যাইলে যাইমু কেওরর কোন ধার ধারি না।
 দুইপর বেলা সিনান করি বউ গো তুমি পাক করোনা
সিনান করি আইছি আমি মন তো আমার লাগের না।
শিতালং ফকিরে কইন, বউগো পাইছো বাবুয়ানা
সমুখ দুয়ার বন্ধ করিয়া পিছ দুয়ারে বৈঠকখানা।

৩৫

এলাহি হায় হায়রে মাবুদ রহমান
এ দুঃখ সংকটে তুই মুস্কিল আছান।
 ভীষণ সংকট দেখি না দেখি উপায়
ভূমিতে রাখিয়া মাতা কান্দে নছুফায়।
 ভীষণ সংকট আজি ঘটিল আমার
সংকটে পড়িয়া কান্দি ছত্তার ছত্তার।
রব্বুল আলম তুই গফুরুর রাহিম
ঘটিয়াছে আজি মোর মস্কিল আজিম।
বেসমার পাপ মোর অন্তর সায়র
পাপ ক্ষেমা কর মোর কিরপারত সাগর।
পাপেতে ডুবিয়া ডাকি আল্লাহ আহাদ
ছিদ্দিকেতে তওবা কইলু ক্ষেম অপরাধ।
চৌদিকেতে দ্বারী পারাঙ না বাচিবে জান
মস্কিলে আছান দেও মাবুদ রহমান
অনন্ত সাগর পাপ হইল আমার
দোষ ক্ষেমা কর মোর দয়ার সাগর।
জঞ্জালে ঠেকিছি আমি সাক্ষাৎ মরণ
কুল মান রক্ষা কর আল্লা নিরঞ্জন।
আজি যদি কুলমান রাখহ আমার
ভজনায় দাঁড়াইমু হুব্ব জীবমান।
শিতালং ফকিরে মাংগে মাবুদ রহমান
বিপিনে ভ্রমণ করি জপিমু তার নাম।

৩৬

ও কি মন বাউলা ও নিত্যই পরবাসী
আরাইয়া মুর্শিদের ধন অইলাম জঙ্গলবাসী।
আলের দিলা আলের বলদ, দুধোর দিলা গাই
কামাইলে ধন খাউরাও আছেন, সঙ্গে যাউরাও নাই।
 তিরি অইলা পায়ের বেড়ি পুতরুণ অইলা কাল
ছাড়াইলে না ছাড়ে আল্লা এই ভবের জঞ্জাল।
মা বাপ আপনা নয়রে জনমের দাতা
পীর মুর্শিদ আপনা নয়রে কয় না মর্ম কথা।
 ভাই তো আপনা নয় একই ঝারের বাঁশ
ভইন তো আপনা নয়, পরার ঘরো বাস।
 তিরি তো আপনা নায়, মর্দর কামাই খায়
দুই এক কথা কড়া কইলে রাড়ি অইতো চায়।।
 পাড়ো গেলে বড় দুখ আথো ভুতা দা
ঘরো আইলে বড় দুখ ঘরো হাতাই মা।
আব আতস খাক বাদ চারি চিজ দিয়া
এমন সুন্দর তনু বানাইল কানাইয়া।।
নাহি দিলা সোনারূপা নাহি দিলা শিশা
কেমনে গড়িলো তনু মায়ে না পাইলা দিশা।
 শিতালং ফকিরে বলে পরানি কাঁপে ডরে
কি গতি অইবো আমার হাসরের বিচারে।।

৩৭

ওগো প্রাণ প্রাণসই, না আসিল প্রাণনাথ কুঞ্জেতে
প্রেমানল দিয়া গায় বন্ধু মোরে ছাড়িয়া যায়।
 বিরহিনী হইয়া বন্ধু ডাকি যে তোমার
দেখ মণিকুল তোর তির পুনিয়ার ঘাটেতে।
 দেহা মোর জ্বলি যায় প্রাণ ঝুরে তোর প্রেমদায়
দরশন দিয়া মোরে রাখহ কৃপায়
না চিনিলে প্রভু তোরে আসিয়া যে ভবেতে
দমে দমে বাঁশি বাজাও পন্থ নিরখিয়া চাও।
 প্রভু নাম জপিয়া সে পন্থে উজাও
দেখিয়া উদয়চান্দ প্রকাশিত জবরুতে।
 যে জন রসিক হয় সে দেখে বন্ধুর উদয়
লাহুতের কুঞ্জি তালা সেজনে খেলয়।
 নিকুঞ্জে জ্বলিল দীপ্ত প্রকাশিত লাহুতে
শিতালং ফকিরে গায় হিয়া দহে প্রেমদায়
বিনা দরশনে মোর দেহা জ্বলি যায়
বিরহিনী হইয়া ঝুরি চান্দরূপ হেরিতে।

৩৮

ও ধনি রাই, পতিপ্রেম গুণমণি
পতির যে নারী হয় আজ্ঞাকারী, ভক্ত মহামতি সে রমণী গো।।
ধনী রাই যে সখি সুমতি, রসরঙ্গে নিতি, পতিসঙ্গ বিনোদিনী
পতি বিনে আর না জানে শিঙ্গার, সে নারী প্রেমের মোহিনী গো।
 ধনী রাই রসিক যুবতী পতি বিনে গতি মতি নাইরে রমণী।
 পতির চরণ বিনে নাহি মন, ক্ষান্ত পিয়ারি কামিনী গো।
 ধনী রাই যে নারী বসিয়া, প্রেমেতে মোহিয়া প্রিয়া বিনে উদাসিনী।
 যৈবন বশে সবল, হয়তো নিষ্ফল, বন্ধু বিনে দহে প্ৰাণী গো।
 ধনী রাই পুরুষ পিয়ারিণী, প্রেমী যেই নারী সে মতি প্রেমের গুণী
পতি সঙ্গে সতী, ভুঞ্জে কামরতি, পতিভক্ত সে চিন্তনী গো
ধনি রাই পতির বচন না করে লঙ্ঘন, পতি গুণ শিরোমণি
পতির বিরহে প্রেমে প্রাণী দহে, কান্তবিনে সন্ন্যাসিনী গো।
 ধনী রাই প্রেম ভাবি নারী হয় আজ্ঞাকারী, সত্যবতী গুণমণি।
 স্বামীর কারণ দহে যার মন সত্যি সেই পদ্মমণি গো।।
 ধনী পদ্মমণি যারা, হলে তারা পতিহারা উদাসিনী পাগলিনী।
 প্রেমে দহে প্রাণী, কান্দে বিরহিনী, আইস প্রভু চূড়ামণি।।
রাইকান্ত পিয়ারিনী হয়ে যেই ধনি ভাগ্যবতী কমলিনী।
 মন আকুলিনী হয়ে কাঙ্গালিনী কান্তবিনে উদাসিনী
পতিয়ার গতি অন্যে নাহি মতি চিন্তামণি প্রেয়সিনী
স্বামীর দুঃখেতে দুক্ষ যার চিতে পতি ভাবে সে দুঃখিনী।
 শিতালংগে কহে প্রাণেতে না সহে বিরহেতে সন্ন্যাসিনী
পন্থ হারা হইয়া ডাকি প্রিয়া প্রিয়া, আইস গুণমণি।।

৩৯

ও ভাই চিনিয়া ল তোর সর
মিনাল বাতাসে আনে মইয়তের খবর। ভাইও…
কোরান পড় কিতাব পড় তার নি জান ভেদ
বেস্তে কি দোজখে যাইবার তার নি জান খবর।।
৩০ হরফ পড়িয়া ভাই মোল্লা অইছইন ভূত
দুই হরফের ভেদ পাইলে ফকির অইন মজবুত।
 তনে কেনে ছজিদা৬ করে মনে কেনে দৌড়ে
আল্লার দুস্ত মহাম্মদ তারা ছজিদা করে।
 আছমান যেছা ফকির জমিন যেছা খোদা
সেই ফকির মরিয়া গেলে গোর অইব কোথা।।
শিতালং ফকির কয় নদীর কূলে বইয়া
পারইমু পারইমু করি দিত যারা গইয়া।।

৪০

ও ভাই নাম জপরে আল্লা ও রছুল
না জপিলে এই নাম হারাইবার দুকূল।
 পাছান পাছে জপো নাম জানিয়া মকবুল
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মদ রসুল।
 নফি ইছবাত ঠিক রাখিও হইবে মকবুল।
 আইতে আল্লা যাইতে হু না হয় যেন ভুল।
 জিবাই বেপারীর নাও চলিয়াছে অকুল
দিল দুর্বিনে দিশা রাখো, মোহাম্মদ রসুল।
 কামিনীপুর গেলে নাও হইবে নিরমূল
মোহাম্মদপুর দিশা রাখলে অকূলে পাইবায় কূল।।
 দিলালপুর মোহাম্মদপুর মধ্যে লালাগোল
আহাদ আহমদ চিনো মিয়া লইয়া মুর্শিদের ধূল।
 মুর্শিদ বাতাইয়া দিবা আনিবা মিম সমতুল
ভেদ বাতিনের মর্মকথা না বুঝিলে বিষম গোল।
 শিতালং ফকিরে বলে লইয়া মুর্শিদের ধূল
হাসরে সফাতের আশা পাক মোহাম্মদ পাক রসুল।।

৪১

ও ভাই নাম জপরে দমের জিকির
তছবিহ তহমিদ জপো তহলিল তকবিরত।
তছবিহ জপিলে হয় বেশি মোনাছিব
আউয়াল আখেরে হবে বুলন্দ নসিবা।
তছবিহ তহমিদ যেই করিবে জিকির
ইসলামের নূর আসি হইব হাজির।
তছবিহ তহমিদ জপো হইবে কামিল
আচানক৯ বল্লা১০ তার না হইবে নাজিল।
 তছবিহ জপো পাক জানি মাবুদ আল্লা সাই
তাহমিদ ছিপত যত আল্লা বিনে নাই।
 তছবিহ তহমিদ যত জপিল সকল
বেহেস্তে হইব কত মুল্লুক দখল।
 তহলিল জপয়ে জানি দিলে অনুক্ষণ
লা শরিক পাক জাত প্রভু নিরঞ্জন।
 নবীর তরিকে১৩ জপো তহলিল জিকির
দেখিবে গোলাপী রং মস্তফা নবীর।
 তহলিল জপিলে হয় আল্লার রহমত
নূর মনোহর আসি হইবে কোরমবত।
তছবিহ জপহে বড় জানি নিরঞ্জন
আল্লার সমান নাই এ তির ভুবন।
 তকবির জপিলে হবে রূপের কোরবত
খলক সয়ালে তারে করিবে ইজ্জত।
 হরদমেতে করে যেই দমের জিকির
হুজুরি কুরবত হয় রৌশন জমির।
 শিতালং ফকির মাংগে রব্বর বিদিত
প্রেমের সহিতে আমার না খুলিল চিত।

৪২

[অসম্পূর্ণ]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *