সুফিসাধক মো: ছলিম ওরফে শিতালং শাহ (র.) – চৌধুরী গোলাম আকবর
দুনিয়া জাহানের মালিক আল্লাহ। তিনি সবকিছুর স্রষ্টা ও পালক। ইসলামি ‘আকিদা’র মতে আল্লাহ পাক আঠার হাজার জাত মখলুকাত পয়দা করেছেন। তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে অঙ্গ সৌষ্টবে জ্ঞান বুদ্ধিতে আহারে বিহারে—তাহজিব তমদ্দুনে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। ইহকালে মানুষকে আল্লাহ পাক যত সুযোগ সুবিধা দান করেছেন তজ্জন্য পরকালেও হিসাব নিকাশ হবে কড়া ক্রান্তি কাগ তিলে।
আদি মানব দাদা আদম (আঃ)কে মাটি দ্বারা পয়দা করে তাতে রূহানি সংযোগে চেতনা সম্পন্ন ও নানা গুণে গুণান্বিত, নানা বিদ্যায় পারদর্শী করে ভবের ছফরে প্রেরণ করেন। তারপর হতে সৃষ্টিধারা আজ পর্যন্ত অব্যাহত আছে আর কতকাল থাকবে তা অজানার উজানে। তবে এই গতিশীল সৃষ্টিধারা চলছে এক মহাকৌশলের ভিতর দিয়ে। আলোচ্য কবির ভাষায়—
‘আব আতশ খাক বাদ চারি চিজ দিয়া
কেমন সুন্দর তনু বানাইল কানাইয়া।
নাহি দিল সোনারূপা
নাহি দিল শিশা
কেমনে গড়িল তনু মায়ে না পাইলা দিশা।
এভাবেই সৃষ্টিধারা প্রবহমান ছিল, আছে ও থাকবে। আল্লাহপাক বন্দেগির জন্য বন্দা পয়দা করেছেন। আর বন্দেগির কায়দা কানুনের জন্য দিয়েছেন ধর্ম। খাতেমুন্নবী হযরত মোহাম্মদ মস্তফা (দঃ) এর পর হতে নবুয়তে’র পথ রূদ্ধ হওয়ায় ধর্ম ধারাকে সঠিক পথে চালু রাখছেন ‘গওস’ ‘কুতুব’ ‘অলি আউলিয়া’। শয়তান মানুষের চির দুশমন। শয়তানের ‘অছওয়াছে’ মানুষ সিরাতুল মোস্তাকিম হতে ভিন্নপথে পাড়ি জমায় কুচিন্তা কুরুচির স্রোতে আপনাকে ভাসায় তখন অলি দরবেশ সুফি সাধকগণ মানুষকে সঠিক সত্য পথে চলার তাগিদ দেন। সত্যকে জাগরিত করেন। আজকের আলোচ্য কবি শিতালং তেমনি এক সুফি সাধক। শিতালং শাহ যে সময় এ মরজগতে আসেন তৎকালে তাঁর জন্মভূমি শিলহট জেলার বাসিন্দাদের অধিকাংশের চাল-চলন তাঁরই ভাষায় —
‘ভাই সর্বনাশরে বাক্য বিড়ম্বন
প্রকাশিত মিথ্যা হইল লোকের আচরণ।
সত্য ছাড়া মিথ্যা হইল সয়ালে প্রকাশ
ধর্মনাশা কর্ম কতো উঠিল বিন্যাস।
আখেরি জমানা আইল দর্জালি আচার
মুলুকে প্রকাশ হইল কুকৃতি প্রচার।
বিদ্যাবান হইয়া কত পন্ডিত সকল
অন্যকে বাতায় পন্থ নিজে বেআমল।
সরম ভরম নিল আখেরি জমানা
গুচ্ছা তমা তকব্বরি আদাত্ততি কিনা।
বিদ্যাশিক্ষা লেখাপড়া শয়ালেতে ধুম
সত্য কথা নেকামল হইতে আছে গুম।
ফরজন্দান মধ্যে গেল উঠিয়া শরম
মাতা-পিতাকে দিল বেহদ্দ ছিতম।’
এইরূপ ‘ফেরবেতে সুদ খায় বলে বেপার’’উস্তাদ সাগরিদ মধ্যে হয় গন্ডগোল’ ‘হাকিমে করে ইনছাফে জুলুম’ ইত্যাদি ইত্যাদি জনজীবনের এরূপ দুর্যোগময় সময়ে বাংলা ১২০১–৬ সনের মধ্যে কবি জন্ম লাভ করেন। নাম রাখা হল মোহাম্মদ ছলিম। বাল্যশিক্ষা মছলমানি ও হিন্দুয়ানি। তৎকালে বাংলা লেখাপড়াকে ‘ইন্দুয়ানি পড়া’ বলা হত। আর তৎকালে কেন আমাদের ছোট বেলা দাদা-দাদীর মুখে বাংলাকে ‘ইন্দুয়ানি’ বলতে শুনেছি। কলুষ কালিমাযুক্ত জনসমাজে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখার জন্য ধর্ম শিক্ষাকে ভাল মনে করে ধর্মশিক্ষার মনোবাসনা নিয়া ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় এসে পাঠ শুরু করেন ও তৎকালীন মশহুর আলেমান মওলানা শাহ আব্দুল আলী, মওলানা শাহ আব্দুল কাহির, শাহ আব্দুল ওহাব চৌধুরী প্রভৃতি বুজুর্গানে দ্বীনের সাহচর্যে তিনি ইহ ও পারলৌকিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেন।
আল্লাহ পাক ‘আব আতস খাক বাদ’ এ মানব দেহ তৈরি করে তাকে ‘শরীর’ ‘দেল’ ‘রূহ’ তিনভাগে ভাগ করেছেন। ত্রিধা বিভক্ত মানব শরীর আবার ‘স্থূল’ ও ‘সূক্ষ্ম’ শরীর এই দুইভাগে বিভক্ত। স্থূল শরীর লয় প্রাপ্ত হবে, সূক্ষ্ম শরীর অক্ষয়। স্থূল শরীরের নাম মানব দেহ। মানব দেহ পঞ্চ ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা ত্বক), ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) সম্পন্ন। পঞ্চইন্দ্রিয় মানব দেহ রক্ষাকারী ফৌজ, আর ষড়রিপু ধ্বংসকারী দুশমন।
স্থূল শরীরের কেন্দ্রস্থল, ‘দেল’। আর ‘দেল’ রূহ দ্বারা পরিপুষ্ট। আবার ‘রূহ’ (আত্মা) ‘রুহকুদ্দুছ’ পরমাত্মা হতে উদভূত। হদিছ শরিফের বাণী ‘কুল্লুশাইউন ইয়ারজিউ ইলাল আছলিহি’ প্রত্যেক জিনিসের আছলের প্রতি টান থাকে বেশি। তাই ‘রূহ’ ও ‘রূহকুদ্দুছ’র প্রতি টান্ অত্যাধিক। আর সে টান না থেকে পারেনা। আল্লাহতালা দুনিয়া পয়দার আগে ‘রূহ’ পয়দা করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আলাছতুবি রাব্বেকুম (আমি কি তোমাদের প্রভু নই? ) এর জবাবে ‘রূহ’ বলেছিল ক্বালুবালা (হাঁ)। তারপর রুহ এই ভবে এসে ষড়রিপুর তাড়নায় শয়তানের ‘অছওয়াছে’ আল্লাহর সাথের সাবেকি ওয়াদা ভুলে যায়। তাই বলে সকল মানুষই যে ভবনেশায় বিভোর তেমন নয়। একদল লোকের সেই রূহানিয়াতের ওয়াদা কর্ণরন্ধ্রে সদাই ধ্বনিত হয়? তাই তারা আমি কে, কে আমার স্রষ্টা, কিরূপে জন্ম হল, মরণ হবে কিরূপে ইত্যাকার ভাবনায় আকুল। শিতালং শাহও ছিলেন ঐ দলের একজন।
পতঙ্গ তার প্রেমাস্পদ প্রদীপকে লাভ করার জন্য প্রাণপণে তাকে আকড়িয়ে ধরতে যেয়ে পুড়ে গিয়ে প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিশে যায়। খোদা প্রেমিক সাধকও তাঁর প্রেমাস্পদকে লাভ করবার জন্য বিষম ব্যাকুল হয়ে ধন জন মান সম্ভ্রম ও আরাম আয়েশ ত্যাগ করে দেওয়ানা মজনু হন। ধ্যান করেন, পীর ধরেন, নাম জপেন। সাধনায় সিদ্ধি লাভ না হলে আকুল প্রাণে কাঁদেন। কাঁদা সহ হৃদয় ফেটে চোখের পানির সাথে বের হয় যে আক্ষেপ বাণী, তার নাম ‘গান’।
সাধক মাত্রেই কবি। শিতালং শাহও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি আকুল প্রাণে অনেক গান গেয়ে পুঁথি রচনা করে গিয়েছেন। তার রচনা ‘মুশকিল তরান’, ‘কিয়ামত নামা’, ‘রাগবাউল’ এই তিন পর্যায় ভুক্ত। তিনি তাঁর রচনাবলী ছাপার হরফে প্রকাশ করতে বারণ করে গিয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে। তাই তাঁর জীবদ্দশায় ছাপা হয়নি। আলোচনা প্রসঙ্গে নানা পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ও হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তাঁর তিনশতাধিক গান সংগ্রহ করে বাংলা একাডেমীতে দিয়েছি।
সাধনায় সিদ্ধিলাভ করতে হলে মুর্শিদের ইশারায় মুর্শিদগত প্রাণ হয়ে ( ফানাফিশ শায়েখ) শরিয়ত তরিকত হকিকত মারফতের মাধ্যমে ক্রমে ক্রমে ‘নাছুত মলকুত জবরূত লাহুত’ মঞ্জিল পার হয়ে মকসুদ মঞ্জিলে মাশুকের দিদার লাভ করতে হয়। তবে সাধনার তেপান্তরে পাড়ি জমাতে হলে প্রথম আপনাকে চিনা দরকার। আপনাকে না চিনলে খোদাকে পাওয়া যায় না। তাই শিতালং শাহও—
‘ধুড়িলে বন্ধুরে পাইবায় আছেন বন্ধু নিজপুর
আগে চিনো মোহাম্মদী নূর।’
তান ধরে—
‘দম দম দুদমে দম্
হরদমে কালাম রে
পরম যতনে জপো নাম।’
রূপের নাম জপে প্রথমে—
‘কুদরতের কারিগরি করি নিরঞ্জন
চন্দ্রমণি কাষ্ঠে দিল নায়ের পত্তন।
কলেতে সৃজিয়া ডিংগা ঠাকুর দয়াল
শুকনা দরিয়াতে দিলো আগেতে পাতাল।
নায়ের মস্তক পাটে বাজে জয় ঢোল
বাদরূক কাষ্ঠেতে খাড়া করিল মস্তুল।
মারুতে জের ডিংগা দমকলে চলে
নায়ের বজ্জর পাটে জোড়ে দীপ্তি জ্বলে।
নায়ের দক্ষিণে বামে পড়ে দুই দাড়
মস্তক পাটেতে খাড়া কুসুমের ঝাড়।
আবলুছ মৃত্তিকা কাষ্টে গুড়া সারি সারি
শুকনা দরিয়াতে সাজে নিতাই কাণ্ডারী।
প্রেম রংগে বন্ধন ঘর পবনে থুনি
মৃত্তিকা বাঁশের রূয়া উলুএতে ছানি।
পবনেতে ঘুরে কল, শব্দ হয় ধ্বনি
কি সন্ধানে চলে ঘর পুতুলা মেদিনী।
ঘরের মধ্যেতে ঘর অতি মনোহর
আট চল্লিশ তাতে কুঠরী সুন্দর।’
ইত্যাকার রূপে ‘স্থূলদেহ’কে চিনে ‘ঘরের চিকন কালা’র সাথে মিলাবার জন্য—
‘বিরহেতে ডাকিরে বন্ধু নব গুণমণি
কামবাণে মাইলেরে বন্ধু সয়না বিরহিনী।
হুশহারা বুদ্ধিহারা কান্দি বিরহিনী
পন্থ নিরখিয়া ডাকি বন্ধু আইসো নীলমণি।
দাহেতে দাহল দেহা হইয়া তাপিনী বারি
দে বারি দে বলি হইয়া চাতকিনী।
প্রাণে নাহি সহেগো রাই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা
বন্ধু বিনে দেহা জ্বলে শীতল অংগ হইল না।’
বলে আকুল প্রাণে তাঁর ‘শ্যাম কালিয়া’কে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত এবং ষড়রিপু ও পুত্র পরিজনের বাধায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে—
‘আমি কে যাইরে কি হইল মোরে
বুদ্ধি নিলো ভবের লোভে ইমান নিল চোরে।
এই ভবের লোভ লালসা শয়তানের ডুরি
আংখির উপর ভেল্কি দিয়া ইমান কৈল চুরি।
ধন আমার হৈল বাদী কাঞ্চন হইল বৈরী
খন্নাছের দিল মোর কেমনে ভব তরী।’
ইত্যাকার ভাবে আহাজারী করে মুর্শিদের ইশারা মত
‘ভাই নাম জপরে আল্লাহ ও রছুল
না জপিলে এই নাম হারিবায় দুই কূল।’
বলে মনে পাগেলাকে ‘নাম জপায়’ রত করে ‘ইরপানে সাজাইয়া ডিংগা’’প্রেমানলে জ্বাল দিয়া’’পবনে কল চালাইয়া’’শব্দ হাহাকার’ ‘যুক্ত বিষম তরঙ্গ নদী’ যে নদীতে
‘উপরে না উড়ে পংখি সায়র কুল জুম
… … …
বামেতে আবসুরা নদী ছমপুরা তারজল
পঞ্চকেতে নাও রাখিলে চক্করে হয় তল।’
সে নদীতে পন্থীর সনে পন্থ থয়ে ‘লা ইলাহা ইল্লাহা ইল্লাহু জপনা’ কয়া ‘লাছতের কুঞ্জি খুলিয়া’ ‘চুলতান নাছিরা হাটে’ ‘কুঞ্জ লালের খেলা’ ‘ত্রিপুন্নী হাটেতে নুরের গুজবে’ ‘নাছুত হাটেতে বেলওয়ারী ঝাড়’’সোনাপুরে শুভরং তুতিয়া’র ‘দুদিকে দীপ্তি’’বেরংগীয়া ঝাড়’’দরশনে ‘শান্ত’ হয়ে ‘দিলালপুর নিরখিয়া’ ‘উর্দ্ধে টান দিয়া’ ‘দমে বৈঠা বাইয়া’ ‘শ্রীপুর প্রবেশিয়া’ ‘তুতিয়ার সংগে দরশন’ করিয়া ‘ভক্তি চিত্তে নিজ নাম জপিয়া’ ‘রূপের বাজারে গিয়া ‘সুজনের সংগ লইয়া’ ‘হাট করিয়া’ ‘বাছিয়া সরস মানিক রতন কিনিয়া’ ‘চিত্ত কুঠায় প্রেমিকের সংগে মিলিয়া’ ‘পয়লা নায় ছয়ারী হইয়া’’ভক্তি মথনে মস্তফা কাণ্ডারী করে
‘লাহুতে দেখিবে রূপ সুন্দর বরণ
নিকুঞ্জে বসিয়া আছে কিশোরী মোহন।’
শিতালংগের এই ‘কিশোরী মোহন’ ‘রসিয়া’ ‘কালাচান্দ’ ‘শ্যাম চিকন কালা’ ‘অলিরাজ’ই হলেন আশিকের মাশুক পতংগের আগুন। ‘সাধামাটা’ ভাবে বিচার করতে গেলে হিন্দু ভাবধারা পুষ্ট ও রূপকযুক্ত এবং হিন্দু সাধক রচিত আধ্যাত্মিক তত্ত্বপূর্ণ গানকে বাউল গান আর মুসলমানি ভাবধারা পুষ্ট রূপকযুক্ত মুসলমান সাধক রচিত গানকে ‘মারফতি গান’ বলে। কিন্তু অনেক মুসলমান সাধককে হিন্দু রূপকের আবেষ্টনে আধ্যাত্মিক গান রচনা করতে দেখা যায়। এর কারণ সম্পর্কে মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণের আশ্রয় লওয়া ছাড়া গত্যন্তর নাই। ইসলাম আল্লার মনোনীত ধর্ম এবং আদি মানব দাদা আদম (আঃ) দুনিয়ায় ‘ওয়াহদাহু লা শরীকালাহু’ (এক ও অদ্বিতীয়) নীতি প্রচার হয়ে আসতে থাকলেও মধ্যে মধ্যে মানব সমাজ নিজ নিজ কু-প্রবৃত্তির বশে ও শয়তানের ওড়ওয়াছে চালিত হয়ে সত্য ছেড়ে অসত্যের পথে গিয়ে আরব আজমের বহু দেশ বহু খোদা কল্পনা করে জড়পূজায় অভ্যস্ত হয়ে যেতেন। ঐসব অতীত মানব গোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ ‘মূর্তি পূজক’ ছিলেন ও আছেন। ঐ মূর্তিপূজক সম্প্রদায় হতে নিরাকার স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ‘বৌদ্ধ’’জৈন’ ধর্মের উদ্ভব হলেও রক্তের প্রভাবে তারাও পরে ‘বৌদ্ধ’ ‘জৈন’কে স্রষ্টার সমপর্যায়ভুক্ত ও মূর্ত্তিগঠন করে ‘পূজা’ শুরু করেন। ঐসব মূর্ত্তি পূজক ধর্মধারী গোষ্ঠীর উপর ইসলামের অভ্যুদয়। মধ্য এশিয়া, ইরান আরবের বিপুল অংশ ‘ইসলাম’ এর অনুসারী হলেও রক্তের আবেশ ছাড়তে পারেন নাই। মনোবিজ্ঞানীদের মতে রক্তের প্রভাব বড় প্রভাব। এর প্রভাব কাটানো রক্ত মাংসের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য ‘প্রবাদ’ সৃষ্টি হয়েছে
‘যেই কুলে জন্ম যার সেইরূপ স্বরে
খাইয়া বাঘোর দুধ হুক্কা হুয়া করে।’
মধ্য এশিয়ার একদল ‘মূর্তিপূজক’ (হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন) ‘আৰ্য্য’ নামে ‘পাকভারতে’ প্রবেশ করে স্থায়ী বাসিন্দা রূপে পরিগণিত হন। এরপরে মুসলমানগণ এদেশে এসে ‘আর্য্য’দের ওয়ারিশানদের ধর্মীয় মতবাদ রূপ স্রোতবতীর উপর তওহিদের বাঁধ বসানোর ফলে সে বেলাভূমি রচিত হল তাতে ‘ইসলামি মতবাদ’ এর বীজ উপ্ত হয়ে যে ফুল ফলের বাগান সৃষ্টি হল তার গল্পে ও আস্বাদনে ‘যেই কুলে জন্ম যার সেইরূপ’ প্রচ্ছন্নভাবে থাকলই। তারা পরাভূত বৌদ্ধ শক্তির (নাথপন্থী ও সহজিয়া) ধ্বংসাবশেষ। স্বধর্মীয়া ব্রাহ্মণের উৎপীড়নে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছিল। বৃহৎ জনসাধারণ গোড়া হিন্দু সমাজের দ্বারা উপেক্ষিত হয়ে সেই গণ্ডির বাইরে যে সাধনা করছিল ইসলাম গ্রহণ করে তারা তা ছাড়েনি। যারা শত সহস্র বছরের সংস্কৃতি নিয়ে মুসলমান হয়েছেন, তারা পূর্ব পুরুষের অবদান বিস্মৃত হবেন কিরূপে? তাঁদের নিজ ঘরে যে ফুল পল্লব আছে, তা নিয়েই মসজিদে প্রবেশ করেছেন, যা তারা শত সহস্র বছরের সাধনায় লাভ করেছে। সুফিরা মুসলমান হয়েও বৌদ্ধ ধর্মের কোমল অংশ ও দেহতত্ত্ব ছাড়তে পারেননি। যে কোন সংস্কৃতি বা ধর্ম দেশ বিদেশে ছুটে যায় তা সেই দেশের সিক্তভূমি শ্যামল ক্ষেত্র এড়িয়ে যেতে পারেনা। দেশজ উপাদান গুলির যা শ্রেষ্ঠ, তার সুরভি ও রেণু বহন করে সেই প্রবাহ সার্থক হয়।
আর একথাও সত্য যে আধ্যাত্মিক পদাবলী যে ধর্মাবলম্বী সাধক দ্বারা রচিত হোক না কেন তার মর্মকথা মূলত এক। সাধকের কোন জাতি নাই। তাঁরা অসীম আকাশে ভাসমান মেঘ খণ্ডের ন্যায়। সুউচ্চ পর্বতমালার বাধাপ্রাপ্ত হলে মেঘ হতে যেমন বৃষ্টি ঝরে তেমনি জ্ঞানী সাধকের ভাবাবেগ ‘উছলিয়া’ তা তিনি যে ধর্মাবলম্বীই হউন না কেন ‘পরান নাথের দরশন প্রার্থী। যিনি উহার অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকেফহাল, সাধকের মাথা তাঁরই কাছে নত। তিনিই তাঁর ভাবশিষ্য। তাই সাধকের কথায় পথের আভাষ পাওয়া যায়।
সুফিদের গজলিয়াত ও বৈষ্ণবদের পদাবলীর ভাব ও রচনা উভয়দিক হতে এক। সুফি সাহিত্যের ‘মৈয়’ ও ‘শরাব’ বৈষ্ণব পদাবলিতে ‘প্রেম’ ও ‘পিরিতি’ হয় দেখা দিয়েছে। সুফি সাহিত্যের ‘আশিক’ ও ‘মাশুক’ বৈষ্ণব পদাবলীর ‘রাধা’ ও ‘কৃষ্ণ’। সুফি সাহিত্যের ‘হিজয়ান’ ও ‘বিশাল’ বৈষ্ণব পদাবলীর ‘বিরহ’ ও ‘মিলন’।
গৌড়ীয় বৈষ্ণবের ‘রাধা’ ও ‘কৃষ্ণ’ হিন্দুদের পৌরাণিক; রাধাকৃষ্ণ’ নয়। এই ‘রাধা’ ‘জীবাত্মা’ (রূহ)র এবং ‘কৃষ্ণ’ পরমাত্মার (রূহকুদ্দুছ) প্রতীক। কৃষ্ণের বাঁশরী জীবাত্মার প্রতি পরমাত্মার ডাক। মাঝখানে এই দুইয়ের মিলনের অন্তরায় স্বরূপ ঐহিক জীবনের সংসার ধর্ম ‘যমুনা’ রূপে বিরাট ব্যবধানের সৃষ্টি করেছে। আরবের ‘আল্লাহ’ পারশ্যে এসে ‘খোদায় পরিণত হয়েছে। পারশ্যের সুফি কবিদের ‘আশিক মাশুক’ তেমনই বাংলায় এসে ‘রাধাকৃষ্ণ’ রূপ ধারণ করেছে। কৃষ্ণের বাঁশি ধ্বনিকে অবলম্বন করে যে বিরাট পদাবলী সাহিত্য রচিত (মারফতি ও বাউলগান) হয়েছে তার মর্মার্থ এবং মওলানা জলাল উদ্দীন রূমীর ‘মসনবী শরীফের’ ও ‘বাঁশির বেদন’ কবিতার মর্মার্থ অবিকল এক। হিন্দুরা যেমন সুফি সাহিত্যের অনুরূপ পদাবলী রচনা করে মুসলমান হয় নাই, মুসলমানেরাও পদাবলী রচনা করে বৈষ্ণব বনে নাই। সুতরাং তাদেরকে ‘মুসলমান বৈষ্ণব কবি’ বলা যায় না। শিতালং শাহের রচনাও এরূপ আওতার বহির্ভূত নয়।
শিতালং শাহ ‘সহজিয়া সুফি’ বা ‘বৈষ্ণব সাধক’ নন। ইনি ছিলেন ‘মারফতি মাদ্দা’র লোক। কাজেই তাঁর রচনাকে গভীর মনোনিবেশের সহিত অধ্যয়ন না করে তাঁকে ‘আকিদায়’ ‘বাউল’ বলে সহজ মন্তব্য করা ঠিক নয় ও ঠিক হবে না। তিনি বৈষ্ণব রূপকে ‘গান রচনা করলেও আদতে ছিলেন ‘পাক্কা মুমিন মুছলমান’। কোন কোন সাধক ফকির ‘শরিয়তে’র ‘কলিমা’ ‘নামাজ’ রোজা ত্যাগ করে ‘বেশরা’ হয়ে পড়েন। কিন্তু শিতালং শাহ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। তিনি—
‘কলিমা তৌহিদ শরিক নাই লা শরিক নিরঞ্জন
শুদ্ধ চিত্তে সাধিলে হয় দরশন।
কলিমা তৌহিদ দিয়া করিবে জিকির
ইমান হইবে শুদ্ধ কলমায় জপ নাম।’
ইত্যাকার ভাবে ‘কলমায় ইমান শুদ্ধ’ করতঃ ‘ছতুন, ইছলাম’ খাড়া করে—
‘নমাজ আজব চিজ নমাজে হয় দিল রূশন
যেজন নমাজ পড়ে প্রেমভাবে মন
তাহার হৃদয়ে হবে নূর বরিষণ।’
মনে করে অজু গোছলে পাকছাফ ভাবে জায় নমাজে খাড়া হয়ে—
‘কিয়াম রুকুয়ে দেখ ছজুদ জহুররে
স্বরূপ নমাজে দীপ্ত নূর।
আলিফ ছুরতে খাড়া করিবে কিয়াম
‘হে’ হরফে রুকু দিয়া জপ শুদ্ধ নাম।
‘দাল’ হরফে রুকু দিয়া জপ শুদ্ধ নাম।
‘দাল’ রূপে বসি দেখ ছুরতে কউদ
জমিনে রাখিয়া ছির ‘মিম’ এতে ছজুদ।
ছুরত নমাজে হয় মহিমা বেহদ
এই চারি হরফ বিচে ইছমে আহমদ।’
রূপে ‘স্বরূপ নমাজ’ আদায় করে নমাজের ফজিলত সম্পর্কে—
‘আবিদে নমাজ পড়ে কায়া সংগে লইয়া
আরিফে নমাজ পড়ে ইরফানে ডুবিয়া।
আবিদের নমাজেতে বরছয় রমহত
আরিফের নমাজেতে হাছিল হয় কোরবত।’
কথার উপর দৃঢ় বিশ্বাসে নমাজ পড়ে—
‘নমাজ পড়িলে হয় মুমিনের মেরাজ’
এরূপ আত্মতৃপ্তি লাভে কলিমা নমাজ রোজায়, দানে ধ্যানে—
‘হায় হায় মনুরায় দিনে দিনে দিন যায়’
রূপে—
‘উশুল বাকিজায় খাজনা করিতে দাখিল
মিজায় না মিলে যুদি ঘটিব মুশকিল।’
এই ভয় ভাবনা মনে রেখে ‘ইরফানের তেজারতি’ ‘সদায় করিয়া’’প্রেমভাবে’ আল্লার নাম জপতে ‘জিন্দেগানি বছর’ করে ১২৯৬ বাংলার ১৭ই অগ্রহায়ণ শেষ বসতি স্থান ‘বার ঠাক্রী ‘ মৌজায় ইন্তেকাল করে ধূলির ধরা হতে হিজরত করেছেন।
