শাহ সুফি শিতালং আমার অনুভবে – আবদুল হামিদ মানিক
‘রে নাগর রসিয়া, নদীয়ার কূলে বসি
ডাকি বন্ধু কলংকিনী হইয়া।
ধনহীন মানহীন কূলহীন আর
কলংকিনী হইয়া ফিরি ভবের মাঝার। রে…’
শৈশবে শোনা এ গানের সুর বহু বছর পেরিয়ে এখনো আমর কানে বাজে। বড়দের অনুকরণে সবার অগোচরে নিজেও ‘রে নাগর রসিয়া’’আমার শক্তি নাইরে, নাইরে আমার বল, মালিকুল মউতে আমায় কইরাছইন ঘায়ইল’ অথবা ‘শিতালং ফকিরে মাঙে’ গানের সুরে গলা সেধেছি। কিন্তু মনে আছে, দরাজ ভরাট কণ্ঠে বাদ্যযন্ত্র ছাড়া খুব দীর্ঘস্বরে টেনে টেনে যেভাবে বড়রা গাইতেন তা গলায় আসতো না। সে দম এবং কণ্ঠের সে তেজ ছিল না। মনে মনে অক্ষমতার দহন অনুভব করতাম। আমাদের শৈশবে মূল্যবোধ ছিল একটু অন্যরকম। বড়দের বা মুরব্বিদের সামনে গান গাওয়া ছিল বেআদবির সমান। তাই একা নির্জনে সুযোগ মত শিতালঙ্গি রাগে টান দিতাম। সমবয়েসীরা বাহবা দিত, গলা মিলাতো। না, গান গাওয়া হয়নি। তবু আজো মনে পড়ে সেই শৈশবে শ্রুত শিতালঙ্গি রাগ বাউলের সুর ও বাণী। আফসোস হয় যখন কোথাও আমার শৈশবের আবেগ মাখা সেই সুর আর শুনি না।
আমার দাদারা সবাই ছিলেন কমবেশি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। করিমগঞ্জ তখন ছিল বিখ্যাত ব্যবসা কেন্দ্র। আসাম ও বাংলার সংযোগ শহর হিসেবে বিভাগ পূর্বকালে বর্তমান ভারতের করিমগঞ্জ জেলা শহরের পৃথক গুরুত্ব ছিল। এ শহরেই আমার দাদা এবং পরে বাবা চাচারা শিক্ষা লাভ করেন। আমার দাদা হাজি তসির উদ্দিনের শিক্ষাগত যোগ্যতা তার ভাইদের মধ্যে ছিল বেশি। গ্রামের সবাই তাকে বলতেন মাস্টার সাব। তিনি শিক্ষকতা করেননি, করেছেন ব্যবসা। তবু ছিলেন মাস্টার সাব। দাদা ‘মাস্টার’ নামে ভূষিত হলেও ছিলেন ধর্মপরায়ণ। ছিলেন আলেম উলেমা আর পীর ফকির অনুরাগী। ১৯৫৯ সালে তিনি ইনতেকাল করেন যখন আমার চপল শৈশব। তাঁর শেষ বয়সেই আমি সঙ্গ পেয়েছি। দেখেছি, তাঁর ধর্মানুরাগ, দেখেছি বাড়িতে ধুমধাম করে বড় বড় মাওলানারা দাওয়াত খেয়েছেন। ধর্মানুরাগ তাঁর একার ছিল না। দাদারা পাঁচজনই ছিলেন হাজি। তাঁদের বাবা মোহাম্মদ সমিও ছিলেন হাজি সাব। বাড়িতেই চুন সুরকির ভারি ওয়ালের পাকা মসজিদ। তাই পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল ধর্মপরায়ণতা। ধর্মানুরাগ গান বাজনার বৈরী হিসেবেই বিবেচিত। কিন্তু বাড়িতে শিতালংগি রাগের বেলায় এর ব্যতিক্রম ছিল। দাদা গাইতেন না। কখনো শুনিনি। দু’একবার একা অলস মুহূর্তে গুন গুন করতে শুনেছি। এর মধ্যে শিতালংগি ছাড়াও আরেকটি গানের কলি আমার খুব মনে পড়ে। সেটি হচ্ছে-শুয়া পাখি উড়িয়া গেলে পিঞ্জিরা রয় খালি রে মোর যতনের পাখি একবার পিঞ্জিরায় আও দেখি।
দাদা এবং তাঁর ভাইরা ছিলেন ব্যবসায়ী। করিমগঞ্জে ছিল ‘গদি’। কুচবিহার, কাছাড়, আসাম, কলকাতাসহ বিভিন্ন শহর ঘুরে তারা বসতেন করিমগঞ্জে। কয়েকটি ঘর ছিল। ১৯৪৭ এর পরে অর্থাৎ আমার জন্মের আগেই করিমগঞ্জ আসতে হয়। তখন ‘গদি’ নেই, ব্যস্ততাও নেই। দাদা তাই বলতে গেলে তখন অবসর। অতএব শৈশবে দাদাকে পাশেই পেয়েছি।
বাহির বাড়ি আর ভেতর বাড়ি অর্থাৎ আন্দর আর বাহিরের ফারাক ছিল। আমি এর সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতাম না। তবে দেখতাম আন্দর বাড়ি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। বাইরের টঙ্গিতেই বৈঠক বসতো। মেহমান মুসাফির থাকতেন। কিন্তু একেবারে ভেতর বাড়িতে পূবের ঘরে মাঝে মাঝে বসতো ঐ শিতালঙ্গি রাগের মজলিস। দেখতাম টঙ্গি থেকে দাদার সাথে সাথে সুঠামদেহী, দাড়িওয়ালা, স্বাস্থ্যবান কেউ রাতে পূবের ঘরে এসে বসতেন। চা পান তামাক চলতো। কাঠের আলমিরাতে সযত্নে রাখা বড় সাইজের পুঁথি এক সময় বের করতেন দাদা। শক্ত চামড়ার বাঁধাই। হাতের লেখা নাগরি পুঁথি। শুরু হতো গান। তবে গায়ক মুখস্থই গাইতেন। সে কী ভরাট কণ্ঠ, চড়া সুর। গায়ক নিজেই হাত দিয়ে নিজের কান চেপে ধরতেন। গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। পরদিন হয়তো গুন গুন করতাম-রে নাগর রসিয়া …….. ।
বাড়ির ভেতরে গান নিষিদ্ধ, বড়দের সামনে গান গাওয়া বেআদবী, বাড়িতেই মসজিদ। এমনি একটি পরিবেশ শিতালঙ্গি রাগের কদর দেখে আমি ধরে নিই যে, গান নাজায়েজ হলেও শিতালঙ্গি রাগ বাউল পাক এবং এর চর্চা পুণ্য কাজ। বড়দের টুকটাক কথাবার্তা থেকে শৈশবেই জেনে গিয়েছিলাম যে, শিতালং ছিলেন বড় এক কামিল পীর। তাঁর ছিল অলৌকিক ক্ষমতা। ভুবনের পাহাড়ে বারো বছর সাধনা করেছেন এবং তিনি বাঘকে ঘোড়া বানিয়ে মাকে দেখতে আসেন।
আমার এলাকা জকিগঞ্জের প্রান্তসীমায় অবস্থিত। বিয়ানীবাজার উপজেলার সীমানায় বারহাল ইউনিয়ন। এলাকায় শুধু আমাদের বাড়িতেই শিতালং চর্চা ছিল না। ঘরে ঘরে তিনি ছিলেন পরিচিত। অলস দুপুরে গাছের ছায়ায় গাছে হেলান দিয়ে বসে অনেককে শিতালংগি গান গাইতে শুনেছি। শৈশবে সড়ক পথ থাকা সত্ত্বেও বর্ষাকালে মা’র সাথে আমরা মামার বাড়ি যেতাম ঘুমটি নৌকায়। সঙ্গে থাকতেন দাদা। বিশাল হাওর। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বাতাসে ছোট ছোট, ঢেউ উঠছে। কলকল শব্দে ঢেউ আছড়ে পড়ছে নৌকার গলুইতে। দাদা হয়তো মাঝিকে গান ধরতে বললেন। মধ্য বয়স্ক শক্ত সামর্থ মাঝি ধরলেন গান—জরু জমি সকল থইয়ারে, ও মনাভাই, করিবায় গমন, কেবল সঙ্গতি কাফন মনা রে।… … অবশ্য পরে বুঝেছি, মাঝি দাদার পছন্দসই গানই ধরতেন।
আমাদের বাড়িতে শিতালঙ্গি রাগ বাউল এবং তার পরিচয় পরিচিতি নিয়ে আলাপ আলোচনা ছিল বেশি। এর কারণ জেনেছি পরে। আমার দাদা করিমগঞ্জের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিতালং শাহের মাজারে প্রথম পাকা দেওয়াল নির্মাণ করেছেন। সুফি শিতালং ইনতেকাল করেন ১৮৮৯ সালে (১২৯৬ বঙ্গাব্দ)। ইনতেকালের পর এলাকার এবং দূর দূরান্তের অনেক ভক্ত মাজার পাকা করে দিতে চান। কিন্তু শাহ সাহেবের পরিবার কাউকে অনুমতি দেননি। ফলে প্রায় চল্লিশ বছর সাদামাটা একটি কবরের মতই ছিল তাঁর শেষ শয্যাস্থল। পারিবারিক সূত্রে জেনেছি, আমার দাদা একটানা তিন রাত স্বপ্ন দেখে মাত্র দেড় পয়সা ভাড়া দিয়ে করিমগঞ্জ থেকে ট্রেনে ‘ভাঙা’ নামক স্টেশনে আসেন। এখান থেকে আসেন শিতালং শাহ’র বাড়িতে। তখনো শাহ সাহেবের কনিষ্ঠ পুত্র মদরিছ আলী বৃদ্ধাবস্থায় বেঁচে আছেন। আমার দাদা মাজারের দেয়াল নির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি খুশি হয়ে অনুমতি দেন। দাদাকে জানান শিতালং শাহ ইনতেকালের আগে বলে গিয়েছিলেন, ইনতেকালের চল্লিশ বছর পূর্ণ হলে যিনি আসবেন, তাকেই যেন অনুমতি দেয়া হয়। শাহ সাহেবের অসিয়ত ছিল যেন তার মাজার জাকজমকপূর্ণ না হয়। সেজন্য সাদামাটা মাজার নির্মাণ করা হলো। সে ছিল ১৯২৯- ১৯৩০ সাল। এ বছরই আমার দাদা হজ্ব করতে যান। প্রথম দেয়ালের গায়ে নির্মাণকারীর নামও ছিল। বাংলাদেশ আমলে দেয়ালে পুননির্মাণের সময় আগের কোনো স্মৃতি রাখা হয়নি।
সম্ভবত পরিচয়ের এই সূত্র ধরেই আমাদের গোষ্ঠীর এক ফুফুর বিয়ে হয় ঐ বাড়িতে শাহ সাহেবের নাতি মবারক আলীর সাথে। এ ফুফু যাকে আমরা ‘নেছা ফুফু’ ডাকি, এখনো বেঁচে আছেন। আমার দাদা হজ্ব থেকে ফিরে শিতালং শাহর রাগ, বাউল নাগরি হরফে লিখিয়ে চামড়ায় বাঁধাই করে নিয়েছিলেন। এর তিনটি খণ্ড শৈশবে দাদার হেফাজতে দেখেছি। ঐ সময় এতে কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। অন্যান্য বইপত্র থেকে এগুলোকে তিনি আলাদা করে আলমিরাতে রাখতেন। আমার বাড়িতে সম্ভবত এ কারণেই সুফি শিতালং শাহর চর্চা ছিল বেশি।
শিতালং শাহের বাড়ির পাশেই আমার মামার বাড়ি। বারঠাকুরী ইউনিয়নের হাসিতলা গ্রাম। এ গ্রামের পূর্ব দিকে কাশির চক স্থানীয় উচ্চারণে ‘কাইরচক’ গ্রাম। মাঝখানে একটি ক্ষেতের মাঠ। শীতকালে মাদ্রাসার বার্ষিক জলসা হলেই সমবয়েসী মামার সাথে যেতাম জলসায়। জলসার সাথে যে বাজার বসে তার আকর্ষণই ছিল বেশি। এদিকে সেদিকে ছুটাছুটি করতে গিয়ে চোখে পড়তো সেই মাজার। দেয়ালটা একটু ব্যতিক্রমী। তাই ছুটে যেতাম পাশে। আমাদের পারিবারিক বিরাট গোরস্থানেরও প্রাচীর আছে। প্রায় তিন ফুট উঁচু। প্রাচীর গাত্রে চীনামাটির বাসনের ভাঙ্গা টুকরোর মত চকচকে টুকরো গাঁথা। কিন্তু শিতালং শাহর কবর এ রকম নয় দেখেই শৈশবে আকৃষ্ট হতাম। বানান করে পড়তাম নাম। আমার দাদার নামের নিচে লেখা ছিল করিমগঞ্জ বাজার। মনে হতো অন্য কেউ। পরে জেনেছি এ নাম- আমারই দাদার। শিতালং শাহর বাড়ির ভেতরে খুব কমই গেছি, যদিও ফুফু ছিলেন।
সেই শৈশবে শিতালঙ্গি রাগ বাউল শুনেছি যখন এর মর্ম বুঝিনি। পরবর্তীকালে ভিন্নজগতে হারিয়ে যাই। লেখাপড়া, কর্মজীবন, সংসার জীবন যাপনের যাতাকলে অন্য সবার মত বন্দী হই। গান বাজনার সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। পীরী মুরিদীতেও যোগ দেইনি। কাব্য, ছড়া, সংবাদ, সম্পাদকীয়, গল্প উপন্যাস, রাজনীতির তপ্ত বাতাস, চিন্তা দুশ্চিন্তা, অভাব অনটন নিয়ে কাটে ব্যস্ত জীবন। এই ডামাডোলের মাঝেও মাঝে মঝে অন্তরে বৈরাগীর লাউ বাজে। বহুদূর থেকে যেন ভেসে আসে সুর-রে নাগর রসিয়া। টের পাই, চেতনায় মিশে আছেন একজন ইনসানে কামিল শাহ সুফি শিতালং।
আমার মতই অসংখ্য চিত্তে এভাবে মিশে আছেন এই সুফি সাধক এবং গীতিকারবৃন্দ। সে যুগে শিক্ষার হার ছিল কম। বইপত্রের প্রকাশনা ছিল কম। তখন এই সুফি সাধকদের রচনা মানুষকে দিয়েছে চিত্তের খোরাক। তাদের জীবনকে, বিশ্বাস ও চেতনাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করেছে। বাংলাদেশে ইসলাম রাজকীয় রূপে আসেনি। প্রচারিত ও প্রসারিত হয়েছে অলি দরবেশ ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে। ইসলাম এখানে সিনায় সিনায় শিকড় বাঁধে। রাষ্ট্রীয় ইসলামের পরিবর্তে সুফি ধারায় স্নাত ইসলামেরই প্রসার এখানে ঘটে বেশি। এ ধারার সুফি সাধকেরা এক পর্যায়ে আধ্যাত্মিক সাধনার অনুষঙ্গ হিসেবে রচনা করেন সংগীত। এসব সংগীত সাধারণ মানুষের মুখে মুখে গীত হয়েছে। তাদের মন মানস গঠনে রেখেছে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা।
আধ্যাত্মিক চেতনায় দীপ্ত সঙ্গীত রচয়িতাদের সবাই আবার সুফি নন। ইসলামের ব্যবহারিক জীবনের বিধান বা শরিয়ত কোনো কোনো সাধক মেনে চলেননি। কেউ কেউ শরিয়ত মেনেই জীবন যাপন করেছেন। এদের মধ্যে আব্দুল ওহাব চৌধুরী, ইব্রাহিম তশা মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ বা শিতালং শাহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। শরিয়তের বিধান, আদেশ নিষেধ অভ্যাসের অন্তর্গত হলেই তাকে বলে মারিফত। এই মারিফত বা সুফি ধারার উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব শিতালং শাহ। শরিয়তের পাবন্দ ছিলেন বলেই সংসারী, পরিচ্ছন্ন রুচির, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ইসলামপ্রিয় লোকজনও ছিলেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। শরিয়ত অনুসারী সুফি সাধকদের প্রায় সবারই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও ছিল। শিতালং শাহও ছিলেন ফুলবাড়ি মাদ্রাসার ছাত্র। তাঁর রচনাতেও পাওয়া যায় এর ছাপ।
সুফি সাধকদের রচনার মূল ভিত্তি প্রেমবাদ বা আশিক মাশুক তত্ত্ব। মারিফতের গূঢ় তত্ত্ব যেমন তাদের রচনায় ব্যক্ত হয়েছে তেমনি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চরম ব্যাকুলতা প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈষ্ণব মতবাদের উপমা ও রূপকল্পের সাথে সুফি তত্ত্বের আশিক মাশুকের ভাবকল্প একাকার হয়ে গেছে। ফলে রচয়িতা সাধক কবিগণ বিশ্বাসে মুসলমান হলেও কেউ কেউ তাদেরকে বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মুসলমান কবি রূপে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হকের মন্তব্য স্মরণ করা যায়। তাঁর মন্তব্য ‘ইহার অর্থ এই নয় যে, হিন্দুরা মুসলমান কিংবা মুসলমানেরা হিন্দু হইয়া যাওয়ার ফলে এমনটি হইয়াছিল। এই দেশে হিন্দু ও মুসলমান যুগ যুগ ধরিয়া পাশাপাশি বাস করার ফলেই এই প্রভাব পড়িয়াছিল, তাহাতেও কোন সন্দেহ নাই। মুসলমানদের সংস্কৃত চর্চা এবং হিন্দুর ফারসি চর্চাও এই প্রভাবের অন্যতম কারণ।’
শিতালং শাহ’র রাগ বা সঙ্গীতের ভাষা একান্ত নিজস্ব বলা যায়। পরিচ্ছন্ন, বহুলাংশে প্রভাবমুক্ত এবং স্বাভাবিকভাবে ইসলামি পরিভাষায় সমৃদ্ধ। তিনি সুফি ছিলেন। আর তাই তাঁর সঙ্গীত শিক্ষামূলক এবং একই সাথে আধ্যাত্মিক চেতনার উজ্জীবনকামী।
শিতালং শাহর ‘মুশকিল তরান’ ‘কিয়ামত নামা’র নাম আমরা শৈশবেও শুনেছি। তার সঙ্গীত শুনে বড়দের আবেগ আপ্লুত এবং ধ্যানমগ্ন হতে দেখেছি। এখন এর চর্চা প্রায় নেই। তবে এসব সঙ্গীত মানুষকে যে অপার্থিব,পবিত্র নির্মল জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে, তার তুলনা হয় না। দশটি প্রবন্ধ লিখে, দশ ঘন্টা ওয়াজ করে মানুষকে যে পবিত্র আবেগে হয়তো উদ্দীপ্ত করা যায় না, একটি মাত্র নির্মল গান দিয়ে তা সম্ভব। তাই শিতালংগি সংগীতের প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে এসব সম্পদ রক্ষা ও প্রচারের। তা না হলে ফেলে আসা শৈশবে কোন গানের কলি এখন আধুনিক রকমারী গানের উচ্চরোলের মধ্যে অন্তরে উঁকি দিত না। একাকী নির্জন মুহূর্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতো না :
‘রে নাগর রসিয়া, ও নদীয়ার কূলে
বসি ডাকি বন্ধ কলংকিনী হইয়া।।’
