শিতালং শাহ – মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন
শিতাংল শাহের জন্ম হয় ১২০৭ বঙ্গাব্দে সিলেট (পূবর্তন) জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার শ্রীগৌরী মৌজায় এবং তাঁহার মৃত্যু হয় ১২৯৬ বঙ্গাব্দে। তাঁহার পিতার নাম মুনশী জাহা বখ্শ মুনশী। শিতালং শাহের প্রকৃত নাম মোহাম্মদ সলিম শাহ। শিতালং শাহের জন্মের পর তাঁহার পিতা শ্রীগৌরীর বাসস্থান ত্যাগ করিয়া কাছাড় জেলার তারিণীপুর গ্রামে বসতিস্থাপন করেন। এইখানেই তাঁহার বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। তিনি পরে সিলেটের ফুলবাড়ি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। তিনি পাঠ্যজীবন শেষ করিয়া ভুবন পাহাড়ে বার বৎসর তপস্যা করেন। তারপর সংসার জীবনে প্রবেশ লাভ করেন। তিনি পরে দেওরাইল মৌজায় শ্বশুরালয়ে বসবাস করিতে আরম্ভ করেন।
সিলেটের ফুলবাড়ির মওলানা আবদুল ওহাব সাহেব তাঁহার মারফতি সাধনার দীক্ষাগুরু ছিলেন। দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি গুরুর নিকট একটি নূতন নাম প্রার্থনা করেন। তিনি তাঁহাকে শিতালং বলিয়া অভিহিত করেন। শিতালং ফারসি শব্দ, বাংলা অর্থ পায়ের গোড়ালির গিরা। তাঁহার গুরুদত্ত নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত হন।
শিতালং শাহ গান বাজনা করিতেন এবং নিজে গান রচনা করিতেন। তাঁহার গানগুলি তাঁহার প্রধান শিষ্য হাজী আসগর আলী লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিতেন।
শেষ বয়সে শিতালং শাহ আসাম রেলের ‘ভাঙ্গা’ স্টেশনের নিকটবর্তী উত্তরভাগ মৌজায় বাসস্থান নির্বাচন করেন। এইখানেই তাঁহার মকবরা রহিয়াছে। তাঁহার শিষ্য সাগরিদরা তাঁহার মৃত্যু তারিখে ওরসে সম্মিলিত হন।
সিলেটের মুনশী আশরাফ হোসেন বলেন : শিতালং-এর গান পল্লী অঞ্চলে প্রতিনিয়ত গীত হইয়া থাকে।
শিতালং শাহ অসংখ্য গান রচনা করেন। তাঁহার গানগুলি এখনও পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় নাই। তাঁহার গানগুলির মধ্যে ইসলামি ভাবধারার একটা প্রবল প্রীতি পরিলক্ষিত হয়। তাঁহার হৃদয়ের আকুলতা গানগুলির মধ্যে সুন্দরভাবে ধরা পড়িয়াছে। একটি আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে গোড়া মাদ্রাসা শিক্ষিত সাধুব্যক্তি বৈষ্ণবের প্রাণ রাধাকৃষ্ণ কাহিনী অবলম্বন করিয়া অজস্র গান রচনা করিয়াছেন। হিন্দু মুসলমানের সম্মিলিত সাধনার ইহা একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ বলা যাইতে পারে। রাধাকৃষ্ণ প্রতীকমাত্র—আল্লাহ রসুল তাঁহার প্রকৃত কাম্য।
