প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

সুফি সাধক শিতালং শাহ : মোহাম্মদ আবদুর রহিম (জকি)

সুফি সাধক শিতালং শাহ – মোহাম্মদ আবদুর রহিম (জকি)

বৃটিশ শাসনামলে বৃহত্তর সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার অন্তর্গত বদরপুর থানার শ্রীগৌরী এলাকার কিত্তাশিলচার নামক গ্রামে জাঁহাবস আলীর ঔরসে শিতালং শাহের জন্ম হয়। তাঁর মায়ের নাম ছিল সুরুত বিবি। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার প্রথম সন্তান। তাঁর বাল্য নাম ছিল সলিম উল্লাহ। তখনকার দিনে শ্রীগৌরী ছিল চাপঘাট পরগনার অধীন।

কথিত আছে যে, জাঁহাব ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের লোক। নৌপথে বাণিজ্য করতে এ পার্বত্য এলাকায় আসেন। ঘটনাক্রমে নৌকা ডুবিতে সর্বস্ব হারিয়ে তিনি সঙ্গী সাথীদেরকে ঢাকাতে পাঠিয়ে নিজে শ্রীগৌরীর প্রভাবশালী জমিদার মীর মামদের আশ্রয়ে থেকে যান। তাঁর অনিন্দ্য সুন্দর চেহারা ও আচার আচরণে মুগ্ধ হয়ে মীর মামদ নিজ কন্যা সুরুত বিবির সঙ্গে এ যুবকের বিবাহ দিয়ে শিয়ালটেক বাজার থেকে পূর্ব উত্তরে তারিণীপুর গ্রামে কিছু ভূসম্পত্তি খরিদ করে জামাতাকে দান করেন। জাঁহাব এ গ্রামেই বসতি স্থাপন করেন। শিতালং শাহের সর্ব কনিষ্ঠ ভাই এর বংশধরেরা এ যাবত সেখানে বসবাসরত আছেন।

শিক্ষাজীবন : বালক সলিম উল্লাহকে প্রথমে তারিণীপুরে এক মক্তবে ভর্তি করে দেয়া হয়। জিতু মিয়া হাজী সাব নামক এক মৌলভী সাহেবের নিকট তিনি দ্বিনি এলেম ও মক্তবের পাঠ সমাপ্ত করেন। তৎকালে বর্তমান গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি মাদ্রাসা ছিল তখনকার সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ও ইসলামী শিক্ষার প্রাণ কেন্দ্র, কারণ তখনকার যুগের শ্রেষ্ঠ ওলীয়ে কামেল শাহ ইসরাইল আলীর শিষ্যবৃন্দ শাহ আব্দুল ওহাব ও আব্দুল কাহের এ মাদ্রাসায় দ্বিনি শিক্ষা ও ইলমে তাছাউফ শিক্ষা দিতেন। এ মাদ্রাসার সুনামের কারণে ১০/১২ বৎসর বয়সে সলিম উল্লাহকে এ মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেয়া হয়। মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত হলে তিনি অনেক দিন তাঁর মুর্শিদ শাহ আব্দুল ওহাব সাহেবের খেদমতে অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর মুর্শিদ তাঁকে “শিতলং” (পায়ের গোড়ালি) উপাধি দিয়ে নির্জন সাধানার পরামর্শ দেন। পীরের নির্দেশ পেয়েই তিনি ভুবনের পাহাড়ে আত্মগোপন করেন এবং দীর্ঘদিন অজ্ঞাত থাকেন।

শিতালং শাহের কেরামতি সম্বন্ধে অনেক কিংবদন্তী ও কেচ্ছা কাহিনী করিমগঞ্জ অঞ্চলের লোকের মুখে মুখে আজও শোনা যায়। ১৯৬৮ সনে আমি ও আব্দুল মালিক আরিফ নামক আমার এক সম্পর্কিত ছোট ভাই বারঠাকুরী গ্রামে, শিতালং শাহের নাতি মাহমুদ আলী সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছ থেকে শিতালং শাহ সম্বন্ধে অনেক তথ্য সংগ্রহ করি।

একটি কিংবদন্তী আছে যে, ভুবনের পাহাড়ে আত্মগোপন কালে শিতালং শাহের মাতা জীবিত ছিলেন। তিনি চারজন লোককে মৌলানা আব্দুল ওহাব সাহেবের নিকট পাঠিয়ে জানতে চান, তাঁকে না জানিয়ে তাঁর পুতকে জঙ্গলবাসী করা হল কেন?” পীর সাব, জবাব দিলেন, “সাত দিনের ভিতর মা ছেলেকে পাবে।” ছেলে আসবে খবর শুনে মা খুশি হয়ে নানারূপ পিঠা, পুলি, দুধের সর, জমা করে শিকায় ঝুলিয়ে রাখতে লাগলেন। এক রাতে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় এসে, “মাই গো তুমি কই” বলে ডাক দেন। মা বের হয়েই বাঘ দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তখন শিতালং শাহ মাকে বললেন, “ভয় করনা এরা আমার পোষা কুকুর। “শিকায় রাখা পিঠাগুলো নিয়ে আস আর খুশি মনে আল্লাহর রাস্তায় বিদায় দেও, না হলে কিছুই হাসিল হবে না মা,” মা খাবার দিলে সামান্য খেয়ে মাকে খুশি করলেন এবং আল্লাহর ওয়াস্তে বিদায় জানাতে অনুরোধ করেন। তাঁর মা, “আল্লাহর হাওলা” বলার সাথে সাথেই বাঘ তাকে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যায়।

এরপর দীর্ঘদিন আর কেউ তাঁর খোঁজ পায়নি দীর্ঘ এগারো বছর পর লাউড়ের পাহাড়ের পাদদেশে শাহ আরপিনের মাজারের পার্শ্বে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় এক পোনামাছ শিকারী তাঁকে দেখতে পেয়ে তাঁর নিকট গমন করে, কিন্তু কোন কিছু না বলে বাড়ি চলে যায়। পরদিন এক লোঠা গরম দুধ নিয়ে আবার পূর্বস্থানে চলে আসে কিন্তু তিনি চোখ না খুলায় আলাপ করতে সাহস পায় নি বলে দূরে বসে অপেক্ষা করতে থাকে। এক সময় তিনি ধ্যান ভেঙ্গে ওজু করে নামাজ আদায় করতে লাগলেন লোকটি এ সময় কাছে এসে দাঁড়ায়। নামাজ সেরে তিনি তাঁকে চলে যেতে বল্লেন, লোকটি তাঁকে দুধটুকু পান করার অনুরোধ জানালে তিনি তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্যে দুধপান করেন। পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে আবার লোকটি দুধ নিয়ে তাঁর কাছে আসে। সে দিন তিনি তার সঙ্গে কথা বলেন। কথা প্রসঙ্গে লোকটি নাম জানতে চাইলে বল্লেন, “শিতালং”। বাড়ি কোথায়? বল্লেন, “কাছাড়”। এ সংবাদ লোক মুখে প্রচার হলে, আস্তে আস্তে লোকজনের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়।

একদিন লোকজনের আগোচরে তিনি সে স্থান ত্যাগ করে দেশের দিকে রওয়ানা দেন এবং নানা কেরামতি প্রদর্শন করে করে, অনেক দিন পর কাঠিগড়ার জমিদার আব্দুর রহমান চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে উঠেন। তাঁর জমিদারির চৌহদ্দি ছিল পূর্বে কার্তিক আইলের পাহাড় থেকে আরম্ভ করে পশ্চিমে দর্গাটিকুরির পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত। আব্দুর রহমান চৌধুরী নিঃসন্তান নানার সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তাঁদের আসল জমিদারি বুড়িবাইল নামক স্থানে বলে প্রকাশ। আব্দুর রহমান চৌধুরীর কোন সন্তান বাঁচত না ফলে তিনি বড়ই দুঃখ ভারাক্রান্ত থাকতেন। একদিন তিনি তার জনৈক বন্ধুকে কেঁদে কেঁদে তাঁর সন্তানদের মরার খবর দিচ্ছিলেন আর ফকির শিতালং দূরে বসে শুনছিলেন। রাতে ধ্যানমগ্ন হয়ে তিনি জানতে পারেন যে চৌধুরী বাড়ির ঈশান কোনে কিছু ভৌতিক সম্পদ (বিশহরির মাল) লুক্কায়িত থাকার কারণে ঐ স্থানের ছায়া লেগে চৌধুরী বংশের সন্তান বাঁচতেছে না। পরদিন শিতালং শাহ একটি লাঠি দিয়ে বাড়ির ঐ অংশের কিছু স্থান চিহ্নিত করে বললেন, “ঐ স্থান ঘেরা দিয়ে রাখ এখানে কখনও আসবি নে।” চৌধুরী সাব “ঐ স্থান পাকা দেয়াল দিয়ে আটকিয়ে রাখেন এরপর থেকে চৌধুরী বংশের সন্তানাদি বাঁচতে থাকে। অদ্যাবধি চৌধুরীর বংশধরেরা ঐ বাড়িতে আছেন এবং ঘের দেয়া স্থানের চিহ্নও আছে বলে প্রকাশ।

আব্দুর রহমান চৌধুরীর বাড়ির অবস্থান শেষে শিতালং শাহ ছন্নছাড়া অবস্থায় কিছু দিন দেওরাইল, মাখল, বদরপুর প্রভৃতি অঞ্চলে ঘুরাফিরা করেন। এ সময়ে তাঁর মুর্শিদ থেকে সংসার-ধর্মপালন ও ধর্ম প্রচারের নির্দেশ আসে। ফলে তিনি বদরপুরের গড় কাপন মৌজার মাজুম মিয়া সাহেবের বোনকে বিবাহ করে সাংসারিক জীবন আরম্ভ করেন। ধীরে ধীরে শিতালং শাহের জ্ঞান, চরিত্র মাধুর্য্য, কেরামতি দেখে দলে দলে লোক তাঁর কাছে মুরিদ হতে থাকে। তাঁর অনেক মুরিদ তাঁর বাড়িঘর তৈরি করে জায়গা জমি দান করতে উৎসুক থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করতে কিন্তু তিনি অসম্মতি প্রকাশ করেন। অনেক দিন পর সুরমা কুশিয়ারা নদীর উৎপত্তি স্থানের পার্শ্বে অবস্থিত গইবী দীঘির পশ্চিমের গ্রামে তাঁর বিশেষ প্রিয় মুরিদ গনিপুরের নজব মামদ চৌধুরীর অনুরোধে কিত্তে খাশির চকে স্থায়ী বাড়ি তৈরি করে বসবাস আরম্ভ করেন। এ বাড়িতেই তাঁর তিন ছেলে ইদ্রিছ আলী, মন্তাজ আলী ও মুদরিছ আলীর জন্ম হয়। মেয়ে সায়েরা সিতারা ও জাবেরা বিবিদের জন্ম এখানেই হয়। তাঁর ছোট ছেলে মুদরিছ আলীর তিন ছেলে ছিলেন (১) মাহমুদ আলী (২) আমদ আলী (৩) মরহুম মৌলানা তৈয়বুর রহমান।

মাহমুদ আলী ও আমদ আলী সাহেব দ্বয় ১৯৬৮ সনে আমাকে শিতালং শাহের জীবনী লিখতে অনেক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে ছিলেন। তাঁদের কাছে ছিলটি নাগরি অক্ষরে হাতে লেখা দু’খানা শীতালঙ্গি রাগের বই দেখে ছিলাম (১) মস্কিল তরান ও (২) কেয়ামত নামা। মস্কিল তরান বই থেকে রাগ পীর মুর্শিদান নামক রাগটি গেয়ে আমাকে লিখে আনতে সাহায্য করেছিলেন। এ সব রাগ বিকৃত করে ছাপাবে বলে, এ গুলো ছাপাতে পীরের নিষেধ আছে বলে, উনারা বলেছেন। উনাদের ঋণ কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করি। উনার মুরিদগণ শিতালঙ্গি রাগ গুলো সহজ ছিলটি নাগরিতে লিখে লিখে প্রচার করতেন। কোন বাড়িতে অসুখ-বিসুখ হলে শিতালঙ্গি রাগের আসর বসানো হত, এতে অসুস্থ রোগী সুস্থ হয়ে উঠার অনেক নজির আছে বলে জনশ্রুতিতে পাওয়া যায়।

শিতালং শাহ সম্বন্ধে অনেক অলৌকিক কাহিনী করিমগঞ্জ অঞ্চলের লোকমুখে শোনা যায়। কোন এক রাতে তাঁর হুজরার বাইরে বসে হুক্কা টানছেন এমন সময় হুক্কার নইচা ঘুরিয়ে দূর দূর করে কি যেন তাড়াতে লাগলেন মুরিদগণ কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন যে জাব্দার হাওরে (যা বারঠাকুরী গ্রামের উত্তর পূর্বে এবং শিতালং শাহ সাহেবের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক পূর্বে সুরমার পূর্ব পাড়ে বর্তমানে হিন্দুস্থানে) মহিষের বাথানে বাঘের আক্রমণে মহিষ গুলো ভীত সম্ভ্রন্ত হয়ে পড়েছে দেখে তিনি বাঘটিকে এখান থেকে ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দিলেন। পরদিন হাওরে খবর নিয়ে বাঘের পায়ের ছাপ এবং মহিষের দৌড়াদৌড়ির পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল।

আরেকবার মোহরমের চান্দের কোন এক অপরাহ্ণে হঠাৎ করে হাতের লাঠি ঘুরাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর “সাবাশ সাবাশ কি সুন্দর মেডেল।” বলে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে লাগলেন। শিষ্যগণ কারণ জানতে চাইলে তার বন্ধুর নাম ধরে বললেন তাকে লাঠি খেলায় সাহায্য করলেন, ফলে সে খুব সুন্দর একটা সোনার মেডেল পেয়েছে।” শিষ্যগণ পরে খবর নিয়ে জানলেন যে তার ঐ নামের বন্ধুটি লাঠি লেখায় ওস্তাদ ছিলেন। সেদিন কলিকাতায় মোহরমের লাঠি লেখা উৎসবে আসামবাসীর পক্ষ থেকে উঠে লাঠি খেলা দেখিয়ে একটা সোনার মেডেল পেয়েছে।” আরো জনশ্রুতি আছে যে, তিনি প্রায়ই গইবি দীঘির দক্ষিণ পার্শ্বে কুশিয়ারা নদীর কূলে বসে

“রে নাগঢ় রসিয়া নদীয়ার কুলে বসি
ডাকি বন্ধু কাঙ্গালিনী হইয়ারে। রে নাগঢ়”

রাগটি গাইতেন। এর কারণ হিসেবে অনেকে বলেছেন যে, তিনি নাকি ডুব দিয়ে নদী থেকে এক বিধবার নৌকভুবিতে তলিয়ে যাওয়া শিশুকে জীবন্ত উদ্ধার করেছিলেন। এ কারণেই নদীর কূলে বসে আল্লাহর শুকুর আদায় করতেন।

তিনি তাঁর জনৈক বন্ধুর সঙ্গে ওয়াদা করেছিলেন যে তাঁরা এক সাথে হজ্জ্বব্রত পালন করবেন। তাঁর মৃত্যুর বছর খানেক পূর্বে ঐ লোকটি হাঁটা পথে হজ্জ্ব ব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যান। ঐ বৎসরই শাহ সাহেবের ওফাত হয়। পর বৎসর তাঁর বন্ধু হজ্জ্ব করতে গিয়ে আরাফাতের ময়দানে শিতালং শাহের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং উভয়ে একসাথে কাবা ঘর তওয়াফ ও হজ্জ্বব্রত পালন করেন। ফেরার পথে শাহ সাহেব বন্ধুকে হাতের লাঠিটি দিয়ে উহা তাঁর নাতি মৌলানা তৈয়বুর রহমান সাহেবের হাতে দিতে বলে ছিলেন। বন্ধু ঐ লাঠি নিয়ে তাঁর বাড়িতে এসে শুনতে পান যে, তিনি তো বছর খানেক পূর্বে জান্নাতবাসী হয়েছেন। ঐ লাঠিটি দীর্ঘ দিন যাবৎ মৌলানার হেফাজতে ছিল বলে শোনা যায়। মৌলানা তৈয়বুর রহমান সাহেব শিতালং শাহের বাড়ির সম্মুখে শিতালঙ্গি মাদ্রাসা নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন। ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১৭ই (১৮৯৯ খ্রি:) অগ্রহায়ণ সোমবার এ মহা মানব নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে স্রষ্টার সান্নিধ্যে পৌঁছে যান। শিতালঙ্গি, মাদ্রাসার পার্শ্বে তার রওজা জেয়ারতে প্রতি বৎসর হাজার হাজার ভক্ত এখানে আসেন এবং মৃত্যু তারিখে ওরস উৎসবের আয়োজন করেন।

সুফি সাধক শিতালং শাহ ছিলেন স্বভাব কবি ও মৌলানা। তিনি ওয়াজ নসিহত, ইসলামি আহকান-আরকান সবই গানের মাধ্যমে বয়ান করতেন। তাঁর গীত গানগুলিকে “শিতালঙ্গি রাগ” বলা হয়ে থাকে। তৎকালে করিমগঞ্জ অঞ্চল ছিল সহজিয়া বৈষ্ণব ধর্ম ও ইসলামি সুফি ধর্মের প্রভাবিত অঞ্চল। সুফি ধর্ম ও সাধনা একান্ত ভাবে মর্মমুখী; সাধকের ব্যক্তিগত উপলব্ধি এই ধর্ম ও সাধনার একটি বিশিষ্ট দিক বলে একে অতীন্দ্রিয়বাদ বা মরমীয়াবাদ নামে অভিহিত করা যায়। সুফি সাধনাতে মানব অতীন্দ্রিয়বাদ বা মরমীয়াবাদ নামে অভিহিত করা যায়। সুফি সাধনাতে মানব দেহকে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে। মানুষই বিশ্ব ভ্রহ্মাণ্ডের সার সংক্ষেপ বা উহার প্রতিরূপ। সুফিগণ বিশ্বাস করেন, অজড়শক্তি হলো (কল্ব, রূহ, সির-আধ্যাত্মিক জ্ঞান, আর খাফি হলো উপলব্ধি শক্তি, আখফ, হলো অনুভূতি শক্তি, জড় হলো (আব, আতস, খাক, বাত, নফস) জগতের প্রতিরূপ এ মানুষের মধ্যেই স্রষ্টা আবির্ভুত হতে পারেন। স্রষ্টার সহিত সৃষ্ট জীবের সম্বন্ধ স্থাপন করে মুক্তি লাভ করাই সুফিগণের উদ্দেশ্য। এ সম্বন্ধ স্থাপনের স্তর দু’টো (১) ফানা (আমিত্বের লুপ্তি) (২) বাকা (স্রষ্টার মধ্যে স্থিতি)

মরমী শিতালং শাহ আল্লাহকে অনির্বচনীয় রহস্যময় জেনে সে অদৃশ্য (গয়র) কে সম্মুখে রেখে সাধনা করে সালিক (যাত্রী) হতে তরিকতে পৌঁছেছিলেন।

এ মহামানবের রচিত ও গীত রাগ গুলো ইসলাম সম্মত বিধায় কানাইঘাট দারুল উলুম মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সাবেক এম. এন. এ. সিলেট জেলার প্রখ্যাত আলেম মৌলানা মোশাহিদ মরহুম গভীর মনোযোগের সাথে শুনতেন ও উচ্চ কণ্ঠে এগুলোর তারিফ করতেন।

১৯৭৭ সনে প্রকাশিত সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলি উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিকী ‘সুরমা তরঙ্গে আমি ‘সুফি সাধক শিতালং শাহের সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা করেছিলাম। তারও অনেক পূর্বে মুর্তুজা আলী নামক একজন লেখক শিতালং শাহের ১০/১১টি রাগ সম্বলিত একখানা ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রকাশ করছিলেন। সে গ্রন্থের সূত্র ধরে “মধ্যযুগের কাব্য সংগ্রহ গ্রন্থে” আহমদ শরীফ তাঁকে বাউল কবি রূপে আখ্যায়িত করে তাঁর দু’টো রাগের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। ডঃ গোলাম সাকলায়েন “পূর্ব পাকিস্তানের সূফী সাধক” গ্রন্থে শিতালং শাহের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৩৪২ বাংলার শ্রাবণ সংখ্যা ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে মুহাম্মদ আব্দুল বারী শিতালং শাহ সম্বন্ধে কিছু কিছু আলোচনা করেছেন। ১৯৭৬ সনের জকিগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা “উদয়াচলে” আমি শিতালং শাহের জীবনী বর্ণনা করেছি।

.

সহায়ক গ্রন্থ

১. পূর্ব পাকিস্তানের সূফি সাধক
২. মধ্যযুগের কাব্যসংগ্রহ
৩. মাসিক মোহাম্মদী, শ্রাবণ সংখ্যা, ১৩৪২ বাংলা
৪. মুশকিল তরান

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
মাহমুদ আলী ও আহমদ আলী
শিতালং শাহের নাতি
বার ঠাকুরী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *