প্রথম পর্ব : প্রবন্ধ
দ্বিতীয় পর্ব : শিতালং-গীতি সংগ্রহ

শিতালং শাহ ও তাঁর গানে লোকায়ত অনুষঙ্গ : জাহান আরা খাতুন

শিতালং শাহ ও তাঁর গানে লোকায়ত অনুষঙ্গ – জাহান আরা খাতুন

নিবিড় নিসর্গের এক অপরূপ প্রতিচ্ছবি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল। লীলা-চঞ্চল সুরমা, মনু, খোয়াই সহ বিভিন্ন নদীর কল গুঞ্জন, আঁকাবাঁকা টিলায় ঢেউ চা বাগানের শ্যামল স্নিগ্ধ প্রভৃতি। কমলালেবুর বাগান জোড়া রঙের আলিম্পন, লীলাবতী ঝর্ণার গীতিময় উচ্ছ্বাস সহ অপরিমেয় প্রাকৃতিক রূপৈশ্বর্যের পাশপাশি বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত অঙ্গনেও এ অঞ্চলের রয়েছে অসামান্য অবদান।

বহু ফকির, সন্ন্যাসী, সাধক ও মরমি কবির জন্ম হয়েছে, সিলেটের মাটিতে। এদের একজন শিতালং শাহ। ভাব গাম্ভীর্য ও শৈল্পিক সুষমায় তাঁর রচনা স্বাতন্ত্র্যে উদ্ভাসিত।

কোনো সাহিত্যই সমাজ বা পারিপার্শ্বিকতা নিরপেক্ষ নয়, আর এ জন্যেই সুফি শিতালং শাহের সংগীত গুচ্ছ ও জীবন ধর্মী চেতনায় বর্ণোজ্জ্বল বিভায় ভাস্বর।

খোদার প্রতি অতলান্ত প্রেমই হলো সুফি সাধনা বা মরমিবাদের মূল ভিত্তি। এ প্রেমের পথ বড়ো বন্ধুর, জগৎ সংসারের হাজারো মোহের মায়াবি হাতছানিতে বারবার সে পথে বাধার সৃষ্টি হয়। পরম সত্তায় নৈকট্য সন্ধানে তৎপর শিতালং শাহ হৃদয়ের গভীরতর প্রদেশে এ সত্য উপলব্ধি করেন। তাঁর ভাবুক হৃদয় হাহাকার করে ওঠে। অভিব্যক্ত হয় স্পষ্ট স্বীকারোক্তি জনিত সরল আক্ষেপ। প্রতিফলিত হয় লোকায়ত জীবন :

‘অজ্ঞান মন খুয়াইলায় মহাজনের ধন
এবে কি লইয়া গমন?
মনারে আনিলায় মানিকের ভরা বেপারের কারণ
ভবের বাজারে আসি খুয়াইলায় ধন।
মনারে, চারি ডাকাইত মিলি করিল লুণ্ঠন
রাজপন্থে বসি এবে জুড়িছ কান্দন।
শিতালং ফকির কান্দে ভাবি নিরঞ্জন
ছিরাত সংকটে পানা কর জানি অবোধ জন।।’

আপন গহন গভীর ভাব তন্ময়তাকে পরিস্ফুটনের জন্য ভাবুক কবি তাঁর পারিপার্শ্বিকতার মাঝে, জন জীবনের বিস্তৃত পরিমণ্ডলের মাঝে মাধ্যম খুঁজে বেড়িয়েছেন। আর তাই বুঝি কবির নিজেরি অজান্তে সুফি সাধনায় গূঢ় রহস্যময়তা ছাড়িয়ে লৌকিক জীবন চিত্র এক অন্যরকম প্রদীপ্তি লাভে সমর্থ হয়েছে :

১.

‘ঝলমল পিন্দন শাড়ি টলমল কাঙ্ক্ষে বারি গো
জল ভরে কদম্ব তলায় কুরঙ্গ নয়ানী
ঘুরঘুর হাটে গুয়া কাটে আনন্দে বসিয়া খাটে গো।
সভাকরি গায় গান ময়ূর নাচে গাটুনী।
জ্বালাইয়া মোমের বাতি পোহাইলাম সারারাতি গো
ফুল বিছানায় আতর ছিটাই ইন্তেজার বেদনী।
হরেক রঙ্গের যন্ত্র বাজে হরেক কোঠায় গোপী সাজে গো
খালি গিদক কোলে লইয়া পোহাইলাম রজনী।
মাছ কাটিতে হাত কাটি, অন্ন খাইতে বর্তন চাটি গো
ননদিনী বিবাদে হইনু গোকুলে কলংকিনী
শাশুড়ীর ক্রুদ্ধ মতি পতিকে করিল বৈরী গো।
শ্যাম পীরিতি ছাড়াইয়া মোরে পায়ে দিল ঝনঝনি।
শিতালং ফকিরের বাণী চন্দ্র হরি নিল প্রাণি গো।
আন্ধায়নি মানিক চিনে কথায় ঘুরে শয়তানি।’

২.

‘জলেনি যাইবায় সখিগো চলো প্রাণেশ্বরী
যমুনার ঘাটে বাজে মোহন মুররী।
সারি সারি হইয়া চলে যুবতী সকল
চলিলা ঘাটের কূলে ভরিবারে জল।
কলসী ভরিলা যদি সকল যুবতী
দেখিয়া চিকণ কালা আকুলিত মতি।
শিতালং ফকিরে কয় ভবেতে আসিয়া
কলসী না হইল ভরা না ভজিলাম প্রিয়া!’

পরম আরাধ্যকে কাছে পাওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় ভক্ত হৃদয়ে যন্ত্রণায় অসহ্য তোলপাড়। বিদীর্ণ হৃদয়ের অঙন জুড়ে হাহাকার করে বিবাগী বাতাস। নৈসর্গের হিম শীতল কুয়াশায় ডুবে যায় আনন্দময় জগত সংসারের মতে বর্ণিল বৈভব, বেজে উঠে বিরহের সকরুণ মূর্ছনা :

‘প্রাণবন্ধের বিচ্ছেদে গো রাই মনান্তরে জ্বলনা
এগো যোগী রূপে বন বিহারি হইয়া করে ভ্ৰমনা।
নিশাযোগে শল্যায়েতে ও রাই মদন চান্দ আইল না
এগো আইলনা আইলনা প্রাণ কুক্ষণের ঘটনা।
প্রাণে নাহি সহেগো মোর ও রাই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা
এগো বন্ধু বিনে দেহা জ্বলে তুষানল আর নিভে না।
শিতালং ফকিরে বলে ও রাই প্রাণ মোর সহে না
এগো বন্ধু বিনে অদর্শনে তুষানল আর নিভে না।।’

জীবন পরিক্রমার প্রতিটি বাঁকে-বাঁকে আছে মায়ার লীলাখেলা। আছে পথচ্যুত হবার হাজারো সম্ভাবনা। কুহক ফাঁদে আটকা পড়ে আপন অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে যাতে বিচ্যুত না হতে হয়, এজন্য সদা সতর্ক ভাবুক হৃদয়। আর তত্ত্ব কথার রহস্যময়তাকে বাঙ্ময় করতে গিয়ে কবির বাস্তব মুখিতার অত্যুজ্জ্বল বিকাশ ঘটে :

‘ঠগের হাট ঠগের বাজার ঠগের পসার
এবার না ধরিলে ঠগ ঠগবে বারেবার।
দিনে ঠগে রাইতে ঠগে আর ঠগে কামে
অচেতন হইলে ঠগে আর ঠগে ঘুমে।
ঠগ ধরা পড়িয়াছে ভাই বন্ধুয়ায় বাজারে
চল যাই দেখে আসি সে ঠগেনি ঠগিয়াছে আমারে।
শিতালং ফকিরে কহে আল্লা নিরঞ্জন—
ধরিতে না পাইলাম ঠগ হইয়া এক মনগো।’

অধ্যাত্ম জীবন সম্পর্কিত গভীর অনুসন্ধিৎসাই মরমি সাহিত্যের মূল সুর। বিশ্ব নিয়ন্তার স্বরূপসন্ধান, চির রহস্যময় দূজ্ঞেয় সে রহস্যের দিগন্ত উন্মোচন সহ জীবনের অমোঘ পরিণতি ইত্যাকার বিষয় সহ জগৎ-জীবন সম্পর্কিত নানাবিধ প্রশ্নরাজির তরঙ্গ বিক্ষেপে ভাবুক হৃদয় সদা সর্বদা উদ্বেল থাকে। এ অভিব্যক্তি বাঙ্ময় হয়ে উঠে অতি সাধারণ উপাত্তের আশ্রয়ে। আর তখন তত্ত্বকথায় আলো আঁধারীর পরও সহজ সাধারণ গার্হস্থ্য জীবনের গীতল অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে;

‘নাইওর বন্ধুয়াও আমি কার বারা বানি
ঝারিয়া না পাইলাম খুদ পচাইয়া পরানি।
ঝারিতে ঝারিতে বারা সাধু ভাই তনু কইলাম সারা
খুদ পাইবার আশে রইলাম না পাইলাম কুড়া।
ঝারিতে ঝারিতে আমার দিনতো গেল গইয়া
পেটে রইল পেটের জ্বালা কেমনে চলি পরাণ লইয়া।
শিতালং ফকিরে কয় বন্ধু দয়াময়
ছিরাত সংকটের ঘাটে যেনো দেখা হয়।’

নদীমাতৃক বাংলাদেশের জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ উপাদান নৌকা। ভাবুক কবি শিতালং শাহের গানে নৌকা এসেছে বিচিত্র ঢঙে, বিচিত্রভাবে ভাব প্রকাশের দ্যোতক হয়ে :

১.

‘ভুলিলাম তোরেরে বন্ধু না কইলাম তোর কাম
ভবনদীর খেওয়া ঘাটে আসি ঠেকিলাম।
শিতালং ফকিরে বলে, বন্ধু দয়াময়,
ছফাত কয়বয়, হাশর ছিরাতে হইও সদয়।’

২.

‘দমদম সুরেতে দুই দম বাজেরে
জীবাই বেপারির নাও সাজে।
কুদরতির কারিগরি করি নিরঞ্জন
চন্দ্রমণি কাষ্ঠে দিল নায়ের পত্তন।
কলেতে সৃজিয়া ডিঙ্গা ঠাকুর দয়াল
শুকনা দরিয়াতে দিল আগেতে পাতাল।
শিতালং ফকিরে কয়, আল্লাকে ভাবিয়া
লইবে ভিক্ষার তত্ত্ব মুর্শিদ ভজিয়া।’

বস্তুত, মরমী শিল্পী শিতালং শাহ তাঁর মরমী সংগীতের পশরা সাজাতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছেন লোকায়ত জীবনের বিস্তৃত পরিমণ্ডলে। তাঁর দরদী মনের শৈল্পিক ছোঁয়ায় তুচ্ছাতিচুতচ্ছ লোকজ উপাদান এক অন্যরকম প্রদীপ্তি লাভে সমর্থ হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *