সমাধিকক্ষ অন্ধকার – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

সমাধিকক্ষ অন্ধকার

[বইয়ের এটা একটামাত্র অনুবাদ গল্প। 1902 সালে John Murry থেকে প্রকাশিত ‘Moth and Rust’ সংকলনে প্রথম প্রকাশিত হওয়া Mary Cholmondeley-র লেখা ‘Let Loose’ গল্পের ভাবানুবাদ এটি।]

.

কয়েক বছর আগে আমার মাথায় ‘আর্কিটেকচার’ শেখার ভূত চেপেছিল। যদিও পরে বুঝেছিলাম যে, সুদক্ষ আর্কিটেক্ট হতে গেলে একজন দক্ষ শিল্পী হওয়া জরুরি। আর, আমার মধ্যে কোনোরকম শিল্পীসত্তা নেই সেটা বুঝতে আরও কয়েক বছর লেগেছিল। শেষপর্যন্ত স্থপতি হওয়ার আশা ছেড়ে আমি বর্তমানে অন্য চাকরি করি।

সেকথা যাক। আপনাদের যে সময়ের ঘটনা বলব সেইসময়ে সবেমাত্র আমার মাথায় স্থপতি হওয়ার শখ জেগেছে। সেইসূত্রেই ব্লেকের সঙ্গে আমার পরিচয়। সেইসময়ের উঠতি আর্কিটেক্ট ছিল সে। আমারই সমবয়সি যুবক হওয়ার কারণে তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল সহজেই।

ব্লেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে ছিল। ওর বাবা একসময়ের বিখ্যাত স্থপতি ছিল নিউ ইংল্যান্ডের। সেই কারণেই ছেলের মধ্যেও সেই গুণ, সেই শিল্প ছিল। কিন্তু, ব্লেকের সব কিছু স্বাভাবিক হলেও, একটা অদ্ভুত স্বভাব ওর মধ্যে আমি বরাবরই লক্ষ করেছিলাম।

শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সে উঁচু কলারের জামা পরে থাকত। জুলাইয়ের তীব্র গরমেও দেখেছি সে হাইকলার জামা পরে আছে। তাকে এই প্রশ্ন বহুবার করেছি, কিন্তু, উত্তর পাইনি। এক বসন্তের দিনে তীব্র রোদেও তাকে উঁচু কলারের জামা পরে থাকতে দেখে আরও একবার প্রশ্নটা করলাম,

‘ওহে বন্ধু, বারোমাস এই গলা ঢাকা জামা পরে থাকতে তোমার অস্বস্তি হয় না?’

বন্ধুটি উত্তর দিল,

‘তুমি এই প্রশ্ন আমায় আগেও বারকয়েক করেছ। কিন্তু, উত্তরটা দেয়ার সুযোগ হয়নি। কারণ, উত্তরটা এককথায় দেয়া যায় না। কেন আমি এই উঁচু কলারের জামা পরে থাকি সেটার পেছনে একটা অদ্ভুত কাহিনি আছে। তুমি কি শুনতে চাও? সময় হবে তোমার?’

‘অবশ্যই।’

‘বেশ, তবে শোনো।’

আমার বন্ধুটি এরপর আমায় একটা অবিশ্বাস্য কাহিনি শুনিয়েছিল। কাহিনিটা আমি যেভাবে শুনেছিলাম, ঠিক সেভাবেই, তারই জবানিতে আমি পাঠকদের কাছে রাখছি।

‘দশ বছর আগে তখন আমি ‘ইনস্টিটিউট অফ ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস’-এ পড়াশোনা করছি। বাবা গত হয়েছেন কয়েক বছর হল। এক সন্ধেয় বাবার পুরোনো কাজগপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটা ডিজাইন পেলাম। কিছুটা অসমাপ্ত, বাবার হাতে আঁকা একটা বেশ পুরোনো ‘ক্রিপ্ট’-এর ডিজাইন। ক্রিপ্ট কাকে বলে আশা করি জানা আছে? আগেকার দিনের সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো গির্জাসংলগ্ন সমাধিক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ সমাধিকক্ষ বানাতেন। একই বংশের সমস্ত সদস্যের মরদেহ সেখানেই আলাদা আলাদা ‘ভল্ট’ বানিয়ে রাখা হত। এটাও সেই ধরনেরই একটা পারিবারিক ভূগর্ভস্থ সমাধিগৃহ। ডিজাইনটা আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লাগল। সেটার নীচে জায়গাটার নাম পেনসিলে লেখাই ছিল— ফ্রেস্কোয়াড পূর্ব, পারিশ গির্জা, ইয়র্কশায়ার। আমি ঠিক করলাম একবার নিজে গিয়ে এই ভূগর্ভটা দেখব এবং নিজের হাতে এই প্রাচীন স্থাপত্যের ছবি এঁকে আনব।

দু-দিন পর এক গ্রীষ্মের সকালে আমি ঘোড়াগাড়ি ভাড়া নিয়ে রওনা দিলাম ফ্রেস্কোয়াডের পথে। আমার সঙ্গী আমার কুকুর ব্রায়ান। ইয়র্কশায়ার থেকেও বেশ কিছু মাইল মেঠো পথ ধরে তবেই সেই গ্রামে পৌঁছোলাম। একটা গৃহস্থবাড়িতে কয়েক দিনের জন্যে ‘পেইং-গেস্ট’ হিসেবে থাকার ব্যবস্থা করলাম। সেদিন পৌঁছোতেই সন্ধে হয়ে গেছিল। তাই সেদিন ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরের দিন সকালে উঠে প্রাতরাশ সেরে চললাম গির্জাটার খোঁজে। সঙ্গী অবশ্যই ব্রায়ান। গ্রামের ছেলেপুলে শহুরে লোক দেখে, সঙ্গে আবার পেল্লাই আকারের বড়ো কুকুরটাকে দেখে কৌতূহলী হয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে চলছে। তাদের জিজ্ঞেস করেই গির্জা অবধি পৌঁছোলাম। এক কর্মচারীর দেখা পেয়ে তাঁকে বললাম যে, আমি ফাদারের সঙ্গে দেখা করতে চাই।

কিছুক্ষণ বাদেই ডাক পড়ল। ব্রায়ানকে দরজার বাইরে অপেক্ষা করতে বসিয়ে আমি ঢুকলাম। একজন আমায় ভেতরের একটা লাইব্রেরিঘরে ফাদারের কাছে এনে উপস্থিত করল। বয়স্ক মানুষটি আমায় দেখে বললেন,

‘সুপ্রভাত মিস্টার…

‘ব্লেক। আমার নাম ব্লেক।’

‘বলুন, আপনার কী সাহায্য করতে পারি?’

আমি তাঁকে জানালাম যে, আমি একজন আর্কিটেক্ট এবং আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী। যদি তিনি আমায় এই গির্জা সংলগ্ন ‘ক্রিপ্ট’টাতে প্রবেশানুমতি দেন, তবে আমার খুব উপকার হয়। এই শুনে বৃদ্ধ বললেন,

‘সমাধিগৃহ? কিন্তু, ওই সমাধিগৃহ তো গত ত্রিশ বছর খোলাই হয়নি। শেষবার ওই…’

মাঝপথে থেমে গেলেন ফাদার। আমি বললাম,

‘ওটার চাবি যদি অনুগ্রহ করে আমায় দেন।’

‘না। ওখানে কেউ যায় না।’

‘ফাদার, শুধুমাত্র শিল্পের টানে আমি বহুদূর থেকে এসেছি। মাত্র দু-তিনদিন যদি আমায় প্রবেশানুমতি দেন দয়া করে। আমি শুধু নিজের হাতে ভেতরের স্থাপত্যের ছবি আঁকতে চাই।’

ফাদার রাজি হচ্ছিলেন না প্রথমে। আমি অনেক অনুরোধ করার পর, শেষে একটু নরম হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

‘তুমি এতদূর থেকে এসেছ। তোমাকে নিরাশ করতে ইচ্ছে করছে না। আসলে, ওই সমাধিগৃহে কেউ যায় না। লোকেদের মনে কুসংস্কার আর ভয় আছে ওটা নিয়ে।’

‘কেন? কিছু ঘটেছিল?’

‘না। সত্যি বলতে, কিছুই তেমন ঘটেনি। ওটা যে পরিবারের ছিল, তার শেষ সদস্যকে ত্রিশ বছর আগে আমি নিজেই সমাধিস্থ করেছিলাম।’

খানিক ভেবে ফাদার আবার বললেন,

‘কুসংস্কার বা ভয়কে অকারণ প্রশ্রয় দেয়া উচিত না। ঠিকই বলেছ। কথায় আছে, ভয় সেখানেই বাসা বাঁধে যেখানে ভগবানের ওপর ভক্তির অভাব আছে। দেখি, চাবিটা খুঁজে পাই কি না এই আলমারিতে।’

ভদ্রলোক বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে একটা চাবির রিং বের করে আনলেন। তাতে দুটো চাবি। তিনি সেটা আমায় দেখিয়ে বললেন,

‘প্রথম চাবিটা বাইরের লোহার গেটের। সেটা খুলে একটা সরুপথ ধরে সমাধিকক্ষর দরজা পড়বে। দ্বিতীয় চাবিটা সেই দরজার। তোমার কি ওখানে না গেলেই নয়? মানে অব্যবহৃত, পুরোনো জায়গা তো।’

‘আপনি চিন্তা করবেন না। আমি সাবধানে চলাফেরা করব।’

‘বেশ। এই নাও চাবি। মনে রেখো, ঢুকে প্রথমে গেট আটকাবে, তালা দেবে। তারপর দ্বিতীয় দরজা খুলে ঢুকে আবার আটকে দেবে তালা। বেরোনোর সময়েও দুটো দরজাই চাবি দিয়ে বন্ধ করে বেরোবে। কোনোভাবেই খোলা রেখো না। আর তোমার কাজ শেষ হলে রোজ সন্ধেবেলা চাবি আমার হাতে ফেরত দিয়ে যাবে।’

‘ফাদার, আগামী তিনদিন কি আমি নিজের কাছে ওটা রাখতে পারি? মানে, আপনাকে রোজ তাহলে আর বিরক্ত করতে হয় না।’

কিন্তু, বৃদ্ধ এই কথায় রাজি হলেন না। অগত্যা আমি তাঁর কথা মেনে নিলাম। ঢোকার অনুমতি পেয়েছি, এই যথেষ্ট। চাবি নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম। ব্রায়ান বাইরে বারান্দায় বসে ছিল গোল হয়ে। আমায় দেখে উঠে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়তে শুরু করল। আমি সঙ্গে করে আঁকার সরঞ্জাম আর গোটাকয়েক মোমবাতি নিয়েই বেরিয়েছিলাম। অতএব, আমি গির্জার পেছনের কবরখানায় এসে উপস্থিত হলাম।

জীর্ণ সমাধিগৃহটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হল না। লতাপাতা, ধুলো সরিয়ে জং ধরা গেটটা খুলে দেখলাম একটা সরু পাথুরে সিঁড়ি নেমে গেছে। সিঁড়িতে শ্যাওলা ঢাকা পড়ে পেছল হয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলে ফেলে নামলাম। সঙ্গে ব্রায়ানও নামল। এরপর গেট আটকে দ্বিতীয় চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকলাম ক্রিপ্টের ভেতর। সোঁদা গন্ধ আর বহুদিনের বদ্ধ ধুলোমাখা হাওয়া এসে নাকে ধাক্কা দিল। পেছনে এই দরজাটাও আটকাতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। এই বদ্ধ কুঠুরিতে আমি একা বন্দি থাকব ভাবলেই অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু, যেহেতু কথা দিয়েছি ফাদারকে তাই এই দরজাটাও লক করলাম ভেতর থেকে।

আর সেইসঙ্গেই বাইরের রোদের প্রবেশপথ রুদ্ধ হল। আমার চারিদিকে ঘিরে ধরল নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। পকেট থেকে দেশলাই বের করে একটা মোমবাতি জ্বালালাম। ব্রায়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেও আমারই পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে সে সঙ্গে থাকায় আমি অনেকটাই স্বস্তি বোধ করছি। নাই-বা হল সে মানুষ, সঙ্গী তো বটে।

মোমের আলোয় চারিদিকটা দেখে নিলাম। শতাব্দীপ্রাচীন নীচু ছাদটা নিরেট পাথর কেটে বানানো হয়েছে। অনেকগুলো বাদুড় ঝুলে আছে উলটো হয়ে। ক্রিপ্টের শেষ দেখা যাচ্ছে না, কারণ মোমবাতির আলো বেশিদূর অন্ধকার ভেদ করে এগোচ্ছে না। একটু এগিয়েই একটা বড়ো ধনুরাকার খিলান দেখা যাচ্ছে। সেটাও পাথর কেটেই বানানো। দু-ধারের দেওয়ালে সারিবাঁধা ভল্ট, দশফিট অবধি উঠে গেছে। তাতে কঙ্কাল আর হাড়গোড় পড়ে আছে। এগুলোর কফিনের কাঠ বহুদিন আগেই উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। শুধু দেহাবশেষ কঙ্কালগুলো রয়ে গেছে। আমার কিন্তু ভয় লাগল না। বরং কিছুটা দুঃখ হল। এই মানুষগুলো কোনো এককালে বড়ো পরিবারের সদস্য ছিল। এখন অবহেলায় এভাবে পড়ে আছে এই অন্ধকার ঘুপচিতে।

চাবিটা দরজার চাবির ফুটোতেই ঝুলিয়ে রেখে আমি এগিয়ে গেলাম। খিলানটা পার করে একটা বড়ো ঘরে এসে পড়লাম। মোমবাতি উঁচু করে ছাদ আর দেওয়ালটা দেখেই মুগ্ধ হলাম। কী অসম্ভব সূক্ষ্ম কারুকার্য করা দেওয়ালচিত্র! সেইসঙ্গে স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন এটা। মাঝে একটা উঁচু বেদিমতো জায়গা আছে। আমি সেটাকেই পরিষ্কার করে, ক-টা মোমবাতি জ্বালিয়ে ওটার ওপরেই আঁকার কাগজ পেতে বসলাম। ব্রায়ান আমার আশেপাশেই ঘুরঘুর করছিল। ওকে বসতে বললাম, কিন্তু বসল না। ঘুরঘুর করেই চলেছে। আশ্চর্য, আমি তো ভেবেছিলাম যে আশেপাশে এত হাড় দেখে সে উল্লসিত হবে। কিন্তু, তাকে মোটেই উল্লসিত দেখাচ্ছে না। বেশ কয়েক বার নির্দেশ দেওয়ার পর ব্রায়ান এককোণে গুটিসুটি মেরে বসল।

পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ধরে আমি কাজে লেগে ছিলাম। খাবার সঙ্গেই এনেছিলাম। কাজের ফাঁকেই সেগুলো খেয়েছি। মোমবাতির আলোয় চোখ ব্যথা করতে শুরু করায় কিছুক্ষণ বিরতি দিলাম। তখনই খেয়াল করলাম যে, কতটা নিস্তব্ধ চারিদিক। এতক্ষণ খেয়াল হয়নি ব্যাপারটা। ওপরের জগতের কোনো শব্দ বা কোলাহল এখানে নেই। কীট, পতঙ্গের শব্দ নেই। জীবনে প্রথমবার আমি এরকম সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা অনুভব করলাম। এ এক বিচিত্র এবং অস্বস্তিকর অনুভূতি। একেই বোধ হয় ‘কবরের নিস্তব্ধতা’ বলে। হঠাৎই বাদুড় ডেকে উঠল। সেও এক বিশ্রী ব্যাপার। চমকে দেয় হঠাৎ।

আমি আবার পেনসিল-রুলার তুলে কাজে মন দিলাম। একমনে কাজে ডুবে ছিলাম। হঠাৎ মৃদু একটা শব্দ কানে এল। না, এটা বাদুড়ের শব্দ নয়। ভারী একটা কিছু পতনের শব্দ এবং তারপরেই ধাতব কিছুর মৃদু ঝনঝনানির শব্দ। মুহূর্তে বুঝতে পারলাম কীসের শব্দ সেটা। চাবির! চাবির গোছার শব্দ! মুহূর্তে মনে পড়ল যে, ওটা তো আমি দরজার সঙ্গেই ঝুলিয়ে রেখে এসেছি! আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল! দ্রুত একটা মোমবাতি তুলে নিয়ে বেরিয়ে এলাম দরজার দিকে। গিয়ে দেখলাম চাবি জায়গামতোই আছে। দরজা থেকে ঝুলছে। তবে, দ্বিতীয় চাবিটা রিং থেকে মৃদু দুলছে! ঠিক যেন একটু আগে কেউ অন্য চাবিটা ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে দরজার গায়ে, চাবির ফুটোয়!

আমার সাহসের অভাব নেই। চাবির দোলাটা মোটেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাদুড় ধাক্কা দিয়েছে নিশ্চয়ই। কিন্তু তবুও, চাবিটা এসে স্থির দেখতে পেলেই বোধ হয় খুশি হতাম। কিন্তু পতনের শব্দটা কীসের ছিল সেটাও বুঝলাম। মেঝেতে আমার পায়ের কাছেই একটা করোটি পড়ে আছে। আলো তুলে দেখলাম একটা ‘ভল্ট’-এর থেকে সেটা পড়েছে। দেওয়ালে ওই জায়গাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে। আলো ফেলে উঁকি মেরে দেখলাম ভেতরে একটা তুলনামূলক নতুন কফিন আছে। বোধ হয় এটাই এই সমাধিগৃহর শেষ সমাধি। ত্রিশ বছর আগের।

আমি চাবি দুটো পকেটে নিয়ে ফিরে এলাম ভেতরের ঘরে। কাজে মন দিলাম আবার। আরও কয়েক ঘণ্টা পর মোমের আলো দীর্ঘ হয়ে আসছে দেখে কাজ বন্ধ করে আঁকার সরঞ্জাম ব্যাগে ভরতে শুরু করলাম। ব্রায়ান পুরো সময়টাই অস্থির ছিল আজকে। তাই কাজ শেষ করে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছি দেখে সে আমার আগে আগে এগোতে শুরু করল দরজার দিকে। আমি চাবিটা সবে বের করেছি। পকেট থেকে দরজা খুলব বলে। কিন্তু দেখলাম আমার মস্ত কুকুরটা নিজেই এক ধাক্কায় আলগা দরজা খুলে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। আমি কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দরজাটা কি তবে আমি আটকাইনি? ভেজিয়ে রেখেছিলাম শুধু তালা না দিয়ে? হ্যাঁ, হতেই পারে। তখন অন্ধকারে ঢুকে চাবি লাগিয়ে হয়তো ঘোরাতে ভুলে গেছি।

যাই হোক, আমি বেরিয়ে এলাম। এবার আর তালা লাগাতে ভুল হল না। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখলাম গেটের তালা লাগানোই আছে। সেটাও খুলে, আবার লাগিয়ে চাবি দিয়ে এলাম ফাদারের হাতে। তাঁকে বলে এলাম যে, পুরোটা এঁকে নিতে আমার আরও দু-দিন লাগবে। কালকেও আমি সকালে আসব।

সেদিন সন্ধেবেলা আমি যে বাড়িতে উঠেছি, সেই বাড়িওয়ালা একটা ছোটো পার্টি রেখেছিলেন। বেশ কিছু লোকজনের সঙ্গে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। আমি কাগজ- কলম নিয়ে একটা ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা মেয়েকে কোলে নিয়ে ছবি আঁকছিলাম। এমনি ফুল, গোরু এইসব। আমায় ঘিরে বাচ্চাদের মোটামুটি ভিড় জমে গেল। বাচ্চারা দেখেছি আমার আঁকা খুব পছন্দ করে। শুতে একটু দেরিই হল রাতে।

পরের দিন সকালে যখন বাড়িওয়ালি মহিলা চা দিতে এলেন, দেখি তাঁর চোখ লাল। কাঁদছিলেন সম্ভবত। কী হয়েছে জানতে চাওয়ায় মহিলা খুবই খারাপ একটা খবর শোনালেন। গতকাল সন্ধেবেলা যে ছোটো মেয়েটিকে কোলে নিয়ে ছবি আঁকছিলাম, সে নাকি কাল রাতে আচমকাই মারা গেছে। শুনে আমার মনটা খুবই ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। বার বার মেয়েটির মুখ মনে পড়ছিল।

কিন্তু, কাজ ফেলে রাখা যাবে না। তাই, একটু বাদেই সঙ্গে লাঞ্চ নিয়ে আবার চার্চের পথ ধরলাম। সারাদিন ক্রিপ্টের নীচে ড্রয়িং করলাম। সেদিন আর উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটল না।

পরের দিন সকালে আবার নিয়মমতো ব্যাগ গুছিয়ে চার্চে পৌঁছোলাম। সত্যি বলতে আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। আজকে কাজ শেষ হলে মনে হচ্ছিল যেন বাঁচি! কেন এরকম অনুভূতি হচ্ছিল, আমার জানা নেই। নেহাত আর একটাই বাকি আছে আঁকা। আজ শেষ হয়ে যাবে কয়েক ঘণ্টায়।

কিন্তু, ফাদারের কাছে আজকে চাবি চাইতে তিনি সরাসরি বললেন যে, তিনি আর আমায় চাবি দেবেন না। আমি অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইলাম। বললাম যে, মাত্র আর একটিবার আমার চাবির প্রয়োজন। আজকেই কাজ শেষ হবে আমার। কিন্তু, বৃদ্ধ বললেন,

‘আমি তোমায় আর ওখানে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারি না। আমি মস্ত ভুল করেছি ওই সমাধিগৃহ খুলতে দিয়ে।’

‘কিন্তু, কেন?’

‘কালকে রাতে আমাদের গ্রামের আরও একজন মারা গেছে। আব্রাহাম কেলি নামে এক কেরানি ভদ্রলোক। একটু আগে ডাক্তার এসেছিল আমার কাছে। সে যা দেখেছে সেটা অন্যদের জানায়নি, আমার কাছে এসেছিল আলোচনা করতে। মৃতদেহ পরীক্ষা করতে গিয়ে ডাক্তার দেখেছে যে আব্রাহামের গলায় পাঁচ আঙুলের ছাপ! গতকালও যে বাচ্চা মেয়েটা মারা গেছে, তার গলাতেও হালকা আঙুলের ছাপ দেখেছিল ডাক্তার। অন্যরা যদিও লক্ষ করেনি। কিন্তু আজকে মৃত লোকটির গলায় আঙুলের ছাপ স্পষ্ট! দু-জনকেই কেউ গলা টিপে মেরেছে। অথচ, দু- ক্ষেত্রেই কোনো মানুষের তাদের ঘরে প্রবেশ করা অসম্ভব ছিল।

‘কিন্তু, এর সঙ্গে আমার পুরোনো সমাধিক্ষেত্রে প্রবেশের কী সম্পর্ক?’

বৃদ্ধ বললেন,

‘তোমায় তো বলেছিলাম যে, ওই সমাধিকক্ষ ত্রিশ বছর ব্যবহার হয়নি। ওটা ছিল ডেসপার্ড পরিবারের সমাধিগৃহ। তাদের পরিবারের শেষ সদস্য রজার ডেসপার্ড ছিলেন সাক্ষাৎ শয়তান। হেন কোনো দোষ নেই যা তাঁর ছিল না। কাম, ক্রোধ, মোহ, লোভ সব দোষই ছিল তাঁর চরিত্রে। জুয়া আর মদে সব হারিয়ে রোগে ভুগে যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন আমি একদিন গেলাম তাঁকে বাইবেল পড়ে শোনাতে। লোকটা সরাসরি ঈশ্বরকে অস্বীকার করল। আমায় ফিরিয়ে দিল। জীবনের শেষ মুহূর্তে অসহ্য যন্ত্রণায় ছিল। বলছিল সে নাকি দেখতে পাচ্ছে স্বয়ং শয়তানরা ওর গলা টিপে ধরে আছে! শেষ মুহূর্তে লোকটা উন্মাদ হয়ে একটা ভয়ংকর কাজ করেছিল। একটা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের বাঁ-হাতটা কেটে ফেলেছিল কনুইয়ের নীচ থেকে। সেই দৃশ্য দেখে লোকজন এতটাই আতঙ্কিত হয়েছিল যে, তাকে আটকানোর সাহস করেনি কেউ। মৃত্যুর আগে চিৎকার করে রজার বলেছিল, ‘আমার এই হাত পৃথিবীতে ফিরে আসবে! আমি মরে নরকে গেলেও, নরক থেকে আমার হাত উঠে আসবে! যেভাবে প্রেতরা আমার গলা টিপে আমায় মারছে, সেভাবেই আমিও যতক্ষণ না নিজের হাতে লোককে গলা টিপে মারতে পারছি, আমার শাস্তি নেই! আমার এই হাত ফিরবে!’ এই বলে মারা যায় সে।

কথা থামিয়ে ঘাম মুছে বৃদ্ধ বললেন,

‘সন্ধেবেলা আমায় ডাকে লোকজন। গিয়ে দেখি এই কাণ্ড। মৃহদেহ পড়ে আছে, পাশে কাটা হাত। রক্ত ভরে আছে সারা ঘরে! বীভৎস দৃশ্য। তার শেষ শপথের কথাও শুনলাম অন্যের মুখে। আমিই নিদান দিলাম যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধিস্থ করা হোক। কফিনে মৃতদেহর সঙ্গে কাটা হাতটাও সমাধিস্থ করি আমি। তারপর থেকে ওই সমাধিগৃহ বন্ধই ছিল।’

আমি সবটা শুনে বললাম,

‘আপনি সত্যি মনে করেন যে, এই দুটো মৃত্যু অশরীরীর কাজ? আপনি একজন জ্ঞানী মানুষ ফাদার, এইসব কুসংস্কারে আপনি বিশ্বাস করেন? পুরো ব্যাপারটাই কাকতালীয়।’

‘কিন্তু…আমি ভীত হচ্ছি! কে বলতে পারে, আজকেও হয়তো কেউ একইভাবে মারা গেল?’

আমি নিজের মোক্ষম অস্ত্রটা এইবার প্রয়োগ করলাম,

‘ফাদার, আপনি নিজেই তো বলেছিলেন যে, ঈশ্বরে ভক্তির অভাবেই ভয় সৃষ্টি হয়। আজকে আপনিও যদি এই অকারণে ভয় পেয়ে আমায় সমাধিকক্ষে ঢোকার অনুমতি না দেন, তাহলে সেটা আপনার ঈশ্বর বিশ্বাসে প্রশ্নচিহ্ন দেয় না কি?’

আমি জানতাম এতে কাজ হবে। বৃদ্ধ ঘাড় নেড়ে বললেন,

‘তুমি ঠিকই বলেছ। আমার মন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অকারণ অলৌকিকের আশ্রয় নেয়া আমার সাজে না। বেশ, তোমায় চাবি দিচ্ছি।’

আজকে তৃতীয়বার ওই সমাধিকক্ষের সিঁড়ি দিয়ে আমি আর ব্রায়ান যখন নামছিলাম, আমার অকারণেই ভয় করছিল। পেছনে দরজা বন্ধ করতে, নিকষ অন্ধকারে বুক ঢিপ ঢিপ করছিল। তবুও মনে জোর এনে কাজে লেগে পড়লাম। যতটা কম সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে বেশি সময় লাগল। কারণ, বার বার আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রথমদিনের ঘটনা। খুলিটা মাটিতে পড়ে গেছিল, যেন কিছু একটা বেরিয়ে আসতে গিয়ে সেটা ঠেলে ফেলেছে। তারপর আবার সেই দরজার চাবিটা! ওটা ওভাবে দুলছিল কেন? কেউ বা কিছু কি তবে ওই ভল্ট থেকে বেরিয়ে এসে, চাবি দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেছে? তার দরজার লক খোলা ছিল? কিন্তু… বাইরের গেট তো বন্ধ! কোনো মানুষ সেই গেটের ফাঁক গলে বেরোতে পারবে না। কিন্তু…যদি কোনো মানুষ না বেরিয়ে থাকে? যদি শুধু একটা হাত….

ধুর! এ আমি কীসব ভাবছি! জোর করে ভাবনা থামালাম। আমার মতো একজন শিক্ষিত মানুষের এইসব অলীক ভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত না। এই প্রাচীন সমাধিগৃহর অন্ধকার, নিস্তব্ধতা আমার মনে প্রভাব ফেলছে বুঝতে পারলাম। তাই দ্রুত হাত চালিয়ে আঁকা শেষ করে আমি আর ব্রায়ান উঠে এলাম।

ভেবেছিলাম আজকে বিকেলের ট্রেন ধরে ফিরে যাব। কিন্তু, আজ দেরি হয়ে যাওয়ায় আজকের ট্রেন ধরা সম্ভব না। কালকে সকালে আবার পরের ট্রেন ইয়র্কশায়ার থেকে আছে। অগত্যা আজকের রাতটাও এখানে গ্রামেই থাকতে হবে। যদিও আমার কেন জানি না এক মুহূর্তও এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছিল না।

কিন্তু, উপায় নেই। অতএব, বাকি সন্ধেটা উদ্দেশ্যহীনভাবে আমি আর ব্রায়ান ঘুরে বেড়ালাম এবং রাতে ফিরে এলাম আবার আস্তানায়। গত তিনদিনের কাজ আরও একবার দেখে নিলাম। ভালোই হয়েছে। এই ধরনের স্থাপত্য নিয়ে কমই চর্চা হয়েছে আজ অবধি। আমার কাজটা যে শিক্ষিত মহলে প্রশংসিত হবে, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

কাগজ গুছিয়ে রাখলাম। কিন্তু, ঘুম আসছে না। তাই পায়ে পায়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। চার্চের ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁয়েছে। আমি একটা সিগার জ্বালিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। আজ খুব গরম, তবু একটু হলেও জানলা দিয়ে হাওয়া আসছে। আকাশে তারা মিটমিট করছে। বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল। ভূগর্ভস্থ ক্রিপ্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে যে, কী মানে এই জীবনের? এই তো ক্ষুদ্র সময়ের মনুষ্য জীবন। এত জ্ঞান, অহংকার, শক্তি, সৌন্দর্য, কী মানে এইসবের? শেষ পরিণতি তো সেই মাটির নীচে শুয়ে ধুলোয় মিশে যাওয়ার অপেক্ষা করা। মৃত্যুই এই জীবনের একমাত্র সত্য, বাকি সবই মায়া।

বুঝলাম এই গ্রাম্য নিরিবিলি পরিবেশ, এই খোলা আকাশ আমার মনে কাব্যি জন্ম দিচ্ছে। এইরকম একাকী রাতই বোধ হয় কবি ও দার্শনিকদের জন্ম দেয়। আমি সিগারটা শেষ করে বিছানায় এসে শুলাম।

বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই ঘুমে ডুবে গেছিলাম। ঘুমটা ভাঙল একটা ‘ঘড়ঘড়’ শব্দে। শব্দটা যে ব্রায়ান করছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না। কিন্তু, হঠাৎ কেন সে এরকম করছে সেটা বুঝলাম না। হাত বাড়িয়ে দেশলাই খুঁজে পেতে চাইলাম, কিন্তু, দেশলাই পেলাম না বিছানায়। সিগার জ্বালিয়ে জানলার কাছেই ওটা রেখে দিয়েছি মনে হয়। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে। তাতেই ব্রায়ানের চকচকে সাদা দাঁতগুলো ঝলসে উঠল। ও দাঁত খিঁচিয়ে আমায় দেখে ‘গরগর’ করছে! বড়োই হিংস্র সেই ভঙ্গি, যেন আমার ওপর ঝাঁপিয়ে আমায় ছিঁড়ে খেয়ে ফেলার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে ও! আমি বেশ কয়েক বার ওকে নাম ধরে ডাকলাম, কিন্তু আমার বাধ্য কুকুর আজকে আমার কোনো কথাই শুনল না।

ওর চোখ দুটো চাঁদের আলোয় জ্বলছে। সেই দুটো শূন্য কিছু একটাকে লক্ষ করে ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। যেন অদৃশ্য কোনো শত্রুকে অন্ধকারে ও লক্ষ করছে। সামনের দু-পা বেঁকিয়ে, ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত! ও কি পাগল হয়ে গেল?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্রায়ান আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! আমার গলা লক্ষ করে ধেয়ে এল ওর তীক্ষ্ণ, ধারালো দাঁতের সারি! আমিও সতর্ক ছিলাম, আমার গলার কাছে ওর মুখ আসতেই আমি ওর গলা চেপে ধরলাম! কিন্তু, ব্রায়ানও আজকে পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। সেও কিছুতেই ছাড়ল না। আমি টের পেলাম আমার গলায় চাপ বাড়ছে! ব্রায়ানের দাঁত আমার গলায় বসতে শুরু করেছে! আমি দ্রুত ব্রায়ানকে জাপটে ধরে উঠে দাঁড়ালাম। আমায় বাঁচতে হবে! যেভাবেই হোক আমার গলা থেকে কুকুরটাকে ছাড়াতে হবে! আমি বার বার দেওয়ালে ব্রায়ানকে ধাক্কা দিতে লাগলাম। কিন্তু, ব্রায়ান তবুও ছাড়ছে না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল! আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে ব্রায়ানের মাথাটা জোরে দেওয়ালে ঠুকে দিলাম! একটা হাড় ভাঙার শব্দর সঙ্গেসঙ্গেই বুঝলাম ব্রায়ানের খুলি ফাঁক হয়েছে। পরমুহূর্তে আমার গলার ওপরের চাপটা কমে এল অনুভব করলাম। আমি জ্ঞান হারালাম।

জ্ঞান ফিরতে দেখলাম তখন চারিদিকে অন্ধকার। তবে, বেশ কিছু মানুষ মোমবাতি নিয়ে ঝুঁকে আছে আমার দিকে। তাদের মধ্যে আমার বাড়িওয়ালার মুখটা পরিচিত। আমার ডান হাতে তখনও আমি ব্রায়ানের মৃতদেহের গলাটা চেপে ধরে আছি। ওর মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে আমার হাত মেখে। আলো- আঁধারিতে ঠিক দেখতে পেলাম না, কিন্তু মনে হল যেন ওর চোয়ালের মাঝে কিছু একটা কামড়ে ধরে আছে। একজনের হাতের মোমবাতির আলো সেইদিকে পড়তেই জিনিসটা দেখতে পেলাম! ওটা…ওটা একটা মানুষের হাত!

আমি আরও একবার জ্ঞান হারালাম!

পরের দিন জ্ঞান ফিরলেও সুস্থ হতে আমার আরও তিনদিন লেগেছিল। সেই কয়েক দিন চার্চের ফাদার আমার দেখাশোনা করেছিলেন। একজন অচেনা মানুষের এত সেবাযত্ন আজকাল আর মানুষ বোধ হয় করে না। আমার কথা শুনে সবাই নিশ্চিত হয় যে, আমার কুকুর ব্রায়ানের জলাতঙ্ক হয়েছিল নিঃসন্দেহে। তবে, ডাক্তার আমায় জানায় যে, আমার জলাতঙ্ক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ, আমার গলায় ব্রায়ানের দাঁত বসেনি। সেই রাতে দ্বিতীয়বারের জন্যে কী দেখে জ্ঞান হারিয়েছিলাম, সেই কথা ফাদার আর ডাক্তার বাদে আর কাউকে বলিনি কোনোদিন।’

.

এই অবধি বলে আমার বন্ধু থামল। আমি এতক্ষণ ওর এই কাহিনি বিভোর হয়ে শুনছিলাম। কিছুক্ষণ আমরা কেউই কোনো কথা বললাম না।

খানিক চুপ থেকে আমি প্রশ্ন করলাম,

‘অন্য লোকজন সেই হাতটা দেখেনি কুকুরের মুখে?’

‘না। শুধু আমার চোখে ওটা ধরা দিয়েছিল।’

‘আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে যে, তুমি রাতে ঘরের মধ্যে, আলো-আঁধারিতে ভুল দেখেছিলে?’

‘তা নয়। কারণ সেদিনের অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই দাগ আজ এত বছর পরেও রয়ে গেছে। এই দেখো।’

বলে আমার বন্ধু নিজের জামার কলার নামাল।

আমি দেখলাম তাতে যে দাগটা আছে সেটা কুকুরের দাঁতের হতেই পারে না। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, সেটা কোনো মানুষের বাঁ-হাতের পাঁচটা আঙুলের ছাপ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *