বেড়াল প্রহরী
[বহু পাঠকের অভিযোগ যে, আমি নাকি বেড়ালদের সবসময়ে নেগেটিভভাবে দেখাই আমার গল্পে। এই গল্পটা তাদের জন্যে রইল।]
একটা বিশেষ কবরের বেদির কাছে এসে আমরা সকলেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। কারণ, ব্যাপারটা শুধু অদ্ভুত নয়, হাস্যকরও। এই কবরের সমাধির ওপর বেশ একটা নাদুস বেড়ালের মূর্তি। মূর্তিটা কালো পাথরের, কবরের ফলকের ওপর বসে আছে। তার পাথুরে দৃষ্টি নীচের কবরের দিকে। এক ঝলক দেখলে মনে হয়, ঠিক যেন বেড়ালটা ফলকের ওপর বসে নীচে শুয়ে থাকা মানুষটার ওপর নজর রাখছে।
শিলং ঘুরতে এসেছি চারদিন হল। আরও দু-দিন এখানে থাকব। গত চারদিন বড়ো টুরিস্ট স্পটগুলো ঘুরে ফেলেছি, আর কিছু বাকি নেই। তাই আজ আমরা ভেবেছি আশেপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখব। আমরা মানে, আমি, নিখিলেশ, শুভম আর তার স্ত্রী বাণী। আমরা সবাই একই জায়গায় চাকরি করি গত তিন বছর যাবৎ। এখানে আসার উদ্দেশ্য কয়েক দিন ঘোরাঘুরি, রেস্ট আর আড্ডা। তাই এক সপ্তাহ ব্রেক নিয়ে আমরা শিলং ঘুরতে চলে এলাম। শিলং জায়গাটার সৌন্দর্য অপূর্ব। আজ সকালে, আমাদের গেস্ট হাউসের একটু দূরেই উদ্দেশ্যহীনভাবে পথ চলতে চলতেই নজরে পড়ে পুরোনো খ্রিস্টান কবরস্থান। সুন্দর পরিবেশ। প্রাচীন সমাধির সঙ্গে কিছু নতুন সমাধিও নজরে পড়ছে। তবে এই ভেতরের দিকটায় শুধুই প্রাচীন কবর। ঝাপসা হয়ে আসা ফলকের ডেট দেখেই বোঝা যাচ্ছে এগুলো ব্রিটিশ যুগের।
কবরের ওপর সেই সময় বিভিন্ন মূর্তি স্থাপন করার রেওয়াজ থাকলেও, বেড়ালের মূর্তি বসানোর কথা কোনোদিন শুনিনি। এখানেও বিভিন্ন কবরের ওপর বেশ কিছু ভাঙা, আধভাঙা মূর্তি আছে। বেশিরভাগই দেবদূত মূর্তি। মার্জার মূর্তি শুধু এটায়।
‘এই দ্যাখ। কবরের ওপর বেড়ালের মূর্তি। নিশ্চয়ই লোকটা বেড়ালপ্রেমী ছিল।’
‘ডেট দ্যাখ।’
‘জঙ্গলে ঢেকে আছে। এই কবরের আশপাশটা দেখেছি পরিষ্কার করা হয় না। অথচ, বাকি কবরগুলো কিন্তু বেশ পরিষ্কার।’
‘দাঁড়া। আমি দেখছি।’
নিখিলেশ এগোতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাণী আটকাল।
‘না না, যেয়ো না। এই কবরের জায়গাটা আমার ভালো লাগছে না বাপু। অন্য কবরগুলোর মতো এটা নয়। দ্যাখো, এটা একদম আলাদাভাবে, আলাদা জায়গায় বানানো। বাকি সমাধিগুলোর থেকে দূরে।’
‘আরে, ধুর। এই কবরটার আশেপাশে আগাছা জঙ্গল ভরে আছে বলে তোমার ওরম লাগছে।’
আমিও নিখিলেশকে বাধা দিতে যাই,
‘সে যাই হোক। জঙ্গলে যাস না। সাপ থাকতে পারে।’
কিন্তু ততক্ষণে নিখিলেশ কবরের বেদির ওপর চড়ে গেছে। কিন্তু, এগোতে গিয়েই ঘটল বিপত্তি! সমাধির ওপর হাঁটতে গিয়ে লতায় পা জড়িয়ে নিখিলেশ খেল হোঁচট। মুখ থুবড়ে পড়া থেকে বাঁচতে বেড়ালের মূর্তিটা ধরে সামলাতে গেল। আর তাতেই বেড়ালের মূর্তিটা গোড়া থেকে আলগা হয়ে সোজা নীচে পড়ল। পুরোনো সিমেন্টের গাঁথনি দুর্বল হয়েই ছিল এত বছরে। মূর্তিটা ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেল।
‘এই, এই! সাবধান!’
‘লাগেনি তো?’
নিখিলেশ উঠে দাঁড়িয়ে পা থেকে লতা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল:
‘না, না। আমি ঠিক আছি। তবে মূর্তিটা গেল।’
‘শিগির নাম। অনেক হয়েছে বাহাদুরি!
‘তখনই বললাম উঠিস না।’
আমরা বকা দিয়ে তাকে নামলাম। শুভম বলল:
‘চল, কেটে পড়ি। মূর্তি ভেঙেছি দেখলে সমস্যা হতে পারে।’
আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। ফেরার পথ ধরলাম। অন্য কারুর চোখে না পড়লেও, একটা জিনিস আমার নজরে পড়েছে। মূর্তিটা পড়ার সময় ফলকের ওপর থেকে কিছুটা লতা-জঙ্গল সরে গেছে। তাতে লেখার একটু অংশ চোখে পড়ছে।
‘….May he Never Wake.’ (সে যেন কখনো না জাগে
কেন জানি না, লেখাটা পড়ে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। জায়গাটা আমার আর ভালো লাগছে না। দিনের বেলা, রোদের মধ্যেও কেমন যেন ঠান্ডা লাগল হঠাৎ। বাকিদেরকেও জামা, জ্যাকেট টেনে নিতে দেখে বুঝলাম অস্বস্তিটা আমার একার হচ্ছে না। ফিরে আসার সময় একবার মনে হল পেছন থেকে কেউ আমাদের দেখছে। আমি পেছন ফিরলাম। চোখের কোণ দিয়ে মনে হল কিছু একটা যেন চকিত সরে গেল। কিন্তু কিছুই নজরে পড়ল না। আমরা দ্রুত পা চালালাম। আশপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। আসার সময়েও কি এতটা নিস্তব্ধ ছিল? একটাও পাখির ডাক নেই। বেরোনোর সময় দেখলাম বৃদ্ধ দারোয়ান আগের মতোই রোদে বসে আছে। তার কোলে একটা কালো বেড়াল বসে। বেড়ালটার একটা কান আবার কাটা। বুড়ো সেটার গায়ে আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বেড়ালটা ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু, আমরা বেরোনোর সময় মাথা তুলে আমাদের দিকে কড়া দৃষ্টিতে দেখছে, যেন আর কেউ না জানলেও সে জানে আমরা একটা অন্যায় করেছি।
ঘরে ফিরেও অস্বস্তি গেল না। এবং অস্বস্তিটা শুধু আমার না, প্রত্যেকেরই হচ্ছিল।
দুপুরে খেতে বসেও বিশেষ কথা হল না। আড্ডা জমছিল না ঠিক। তাই খাওয়া শেষ করে আমরা যে যার ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম। ঘুমটা খুব বাজে হল। বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আবার ওই কবরটা, ভাঙা বেড়ালের মূর্তির টুকরোগুলো তখনও পড়ে আছে। কবরের বেদি কাঁপছে। হঠাৎই একটা কালো হাত বেরিয়ে এল বেদি ভেদ করে। পরিষ্কার দেখতে পারছি না। অন্ধকার। তারপর, বিকৃত ভঙ্গিতে একটা ছায়াশরীর বেরিয়ে আসতে শুরু করল কবর থেকে। বিচিত্র ভঙ্গিতে, বেঁকে বেঁকে একটা ছায়ামূর্তি সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধীরে ধীরে।
ইন্টারকমের ফোনের রিঙে ঘুম ভাঙল। ফোন তুলে ওইপাশ থেকে শুভমের গলা পেলাম।
‘ভাই, একটু এদিকে আয়। ওই কবরখানার বুড়োটা আমাদের খুঁজতে খুঁজতে এখানে এসেছে।’
‘কী? কেন?’
‘বোধ হয় টাকা চাইবে।’
আমি বেরিয়ে গিয়ে দেখি করিডোরে বাকি তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। আর তাদের মাঝখানে কবরখানার সেই দারোয়ান বুড়ো। লোকটা এদিকের লোকাল মানুষ, দেখেই বোঝা যায়। তবে লোকটাকে চিনতে পারতাম না, যদি না তার কোলে ওই কালো, এক কান কাটা বেড়ালটাকে দেখতাম।
নিশ্চয়ই আমরা বেরিয়ে আসার পর ভাঙা মূর্তিটা খেয়াল করেছে। আর এখন এসেছে ক্ষতিপুরণ নিতে। এটা সমস্যার কথা! বুড়ো লোকাল লোক, আর আমরা নিতান্তই বাইরের লোক। লোকাল আদিবাসী লোক ডেকে এনে যা খুশি করতে পারে। মনে মনে ঠিক করেই নিলাম, যে বুড়োকে কিছু টাকা দিয়েই বিদায় করব। ঝামেলা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
কাছে গিয়ে বুঝলাম বুড়ো হাত নাড়িয়ে, বড়ো বড়ো চোখে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু, তার ভাঙা হিন্দিতে বিশেষ সুবিধে করতে পারছে না।
নিখিলেশ দেখলাম এক-শো টাকার নোট বের করে দিতে চাইছে। কিন্তু বুড়ো ঘাড় নেড়ে না করছে, নিচ্ছে না। আমি আরও একটা দু-শো টাকার নোট বের করে দিতে গেলাম। কিন্তু, বুড়ো তাও নিতে অস্বীকার করল। আরও টাকা চাইছে নাকি? এদিকে তার কথাও বুঝতে পারছি না। মহা সমস্যা হল তো!
বাধ্য হয়ে গেস্ট হাউসের একজন লোকাল কর্মচারীকে ডেকে আনলাম। তাকেই বুড়ো অনেক কিছু বলে গেল। সব শুনে গেস্ট হাউসের লোকটা আমাদের কাছে এসে আমাদের অদ্ভুত এক কাহিনি শোনাল।
উক্ত কবরটি বর্গিস সাহেবের। ব্রিটিশ আমলে এই জন বর্গিস ছিল এক মারাত্মক অত্যাচারী সাহেব। মদ্যপ, প্রবল নারী আসক্তি, সবরকমের দোষ ছিল লোকটার। ভারতীয় নারীদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে তাদের হত্যা করে সাহেব বিশেষ সুখ পেতেন। তাঁর দ্বারা করা আরও অনেক ভয়ংকর অত্যাচারের কাহিনি শুনে গা গুলিয়ে উঠছিল আমাদের। সেগুলো এখানে বিস্তারিতভাবে নাই-বা বললাম। এককথায় লোকটা ছিল একজন স্যাডিস্ট। তার ওপর সাহেব ছিল একজন স্যাটানিস্ট। শয়তানের উপাসনা করত লোকটা। নারীরক্তে ব্লাড স্যাবাথ করত।
কিন্তু এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ শয়তানও একটা জিনিসে প্রচণ্ড ভয় পেত— বেড়াল! সাহেব নাকি একবার এই শহরের সমস্ত বেড়াল মেরে ফেলার একটা অসম্ভব নির্দেশও দিয়েছিল। অনেক বছর এভাবে চলার পর একসময়ে লোকজন তার ওপর খেপে উঠল। একদিন আদিবাসীরা তার অত্যাচার আর সহ্য করতে না পেরে তাকে রাস্তায় একা পেয়ে হামলা করে। তার গুলিতে দু-জন মানুষ প্রাণও দেয়। শোনা যায়, তাকে কাবু করা হয় বেড়াল দিয়েই। আদিবাসীরা সাহেবের দুর্বলতা জানত। তাই অনেকেই সঙ্গে বেড়াল নিয়ে এসেছিল সাহেবকে ভয় দেখাতে। তাকে খুন করে তিন আদিবাসী।
ব্যাপারটা কোম্পানি সহজে যেতে দিত না। কিন্তু এই হামলার পেছনে খ্রিস্টান চার্চের পরোক্ষ মদত ছিল বলে ব্যাপারটা চাপা দেওয়া হয়। সাহেবের শয়তান উপাসনার কথা চার্চের কানেও গেছিল। তাই এই শয়তানকে সরিয়ে ফেলাই শ্রেয় মনে করেছিল তারাও। নিয়মমতো সাহেবকে এখানেই কবরস্থ করা হয়, কারণ তার পরিবার বলতে কেউ ছিল না।
কিন্তু, তাকে কবর দেওয়ার রাত থেকেই অলৌকিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এলাকার কয়েকটা বাড়িতে ভৌতিক উৎপাত শুরু হয়। প্রথম রাতে, সাহেবকে যে তিনজন হত্যা করেছিল তাদের ভয়াবহভাবে কেউ হত্যা করে। প্রচণ্ড অমানুষিক শক্তিতে কেউ তাদের শরীর পিষে কুণ্ডলী পাকিয়ে দিয়ে যায়। আর তার পরের রাতেই দুটো বাড়ির মহিলাদের মৃত পাওয়া যায়। কেউ তাদের সারাশরীর ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করেছে। কারুর বুঝতে বাকি থাকে না যে, সাহেবের পৈশাচিক কামনাকে মৃত্যুও কাবু করতে পারেনি! সবাই গিয়ে চার্চের দ্বারস্থ হয়। পাদরি তখন সাহেবের কবরের কাছে গিয়ে আবার বাইবেল পাঠ করেন। কিছু পবিত্র আচার করেন।
কিন্তু তারপরেই সমাধির ওপর পবিত্র জল ছুড়তেই তা যেন প্রচণ্ড উত্তাপে বাষ্প হয়ে উড়ে যায় সবার চোখের সামনে। ফাদার বুঝতে পারেন যে শয়তান বর্গিস তার শয়তান সাধনার ফলে, মরে গিয়েও শান্তি পায়নি। সে প্রেতযোনি লাভ করেছে। শুভ আচার ও বাইবেল পাঠ করে অতৃপ্ত আত্মার শান্তি দেওয়া যায়। কিন্তু, যে শয়তান স্বেচ্ছায় অশুভ আত্মার রূপ নিয়েছে তাকে? তাকে তো আটকানো যায় না। পাদরি ঠিক করেন যে, যাকে শাস্তি দেওয়া সম্ভব নয়, তাকে বন্দি রাখতে হবে। সেই সময়ে কবরখানার সংলগ্ন একটা চার্চ ছিল। পাদরি সেখান থেকে কীভাবে কে জানে একটা বেড়াল মূর্তি নিয়ে এসে ঈশ্বরের নাম করে স্থাপন করেন সমাধির ওপর। এই বেড়াল প্রহরী হয়ে পাহারা দেবে অত্যাচারী সাহেবের প্রেতকে।
এরপর বহুযুগ কেটে গেছে। এই কাহিনি প্রায় বিস্মৃত। কিন্তু, বৃদ্ধ সেটা জানে। তাদের পরিবার বহুযুগ ধরে সেই সমাধিস্থল পাহারা দেয়। আর সেই থেকেই তাদের পরিবারে বেড়াল পোষার চল। আজ সকালে নাকি তার এই বেড়ালটা ছটফট করছিল। তাদের উপজাতিরা বিশ্বাস করে বেড়ালরা অশুভ আত্মার উপস্থিতি টের পায়। বেড়ালের এমন আচরণে সন্দেহ হওয়ায় বৃদ্ধ খুঁজতে যায় কবরখানার ভেতরে। তখনই আবিষ্কার করে ভাঙা মূর্তিটা! এত যুগ ধরে শয়তান আত্মাকে আটকে রেখেছিল যে একমাত্র প্রহরী, সে এখন আর নেই। শয়তান প্রেতাত্মা জাগবেই আজ রাতে! আর প্রথম শিকার হবে যে নারীর প্রতি তার প্রথম লোভী দৃষ্টি পড়েছে।
আমাদের সঙ্গে সকালে নারী বলতে একজনই ছিল— বাণী! আমি কেন জানি না গল্পটা উড়িয়ে দিতে পারলাম না। বাণীর চোখেও দেখলাম আতঙ্ক স্পষ্ট। কিন্তু, নিখিলেশ আর শুভম ব্যাপারটা আমল দিল না। নিখিলেশ বলল,
‘এটা শুধুমাত্র ভয় দেখিয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অজুহাত।’
নিখিলেশ পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে বুড়োকে দিয়ে বলল:
‘রাখো। এর বেশি একটা টাকাও দেব না। ভয় দেখিয়ো না অযথা গল্প শুনিয়ে।’
বৃদ্ধ আবার ঘাড় নাড়াল। নিখিলেশকে ছেড়ে এগিয়ে গেল বাণীর দিকে। কোলের কালো বেড়ালটা বাড়িয়ে দিল বাণীর দিকে। যা বুঝলাম, সে চাইছে আমরা যেন বেড়ালটাকে রাখি। অন্তত আজকের রাতের জন্যে। শুভমের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও বাণী বেড়ালটাকে নিল। বুড়ো আর একটাও কথা না বলে চলে গেল। বেড়ালটা দেখলাম বেশ নিশ্চিন্তে বাণীর কোলে রইল।
একটাই ঘরে ঢুকে আমরা সবাই বসলাম। বেড়ালটাকে ভালো করে এই সুযোগে নজর করলাম। কালো বেড়াল, তবে বুকের কাছে সাদা দাগ আছে একটা। বাঁ- দিকের কানটা কোনো দুর্ঘটনায়, বা, কোনো কারণে কাটা গেছে। সবুজ জ্বলজ্বলে চোখে সে চুপচাপ খাটের ওপর বসে আমাদের দেখতে লাগল।
রাতের খাবার ঘরেই আনিয়ে নিলাম আমরা। বেরোতে ইচ্ছে করল না কারুরই। বেড়ালটাকেও বাণী আদর করে খাওয়াল। সে দিব্যি চুপচাপ খেয়ে নিল। খাবার খেয়ে আমি আর নিখিলেশ নিজের ঘরে যেতে উঠলাম। বাণী বাধা দিল,
‘তোমাদের পায়ে পড়ি। আজ রাতটা তোমরা এই ঘরেই থাকো।’
আমি আর নিখিলেশ আপত্তি জানালাম। কিন্তু, বাণী মানল না।
‘আমার এই অনুরোধ তোমরা রাখো। তোমাদের ভয় না লাগুক। অন্তত মনে করো, আমার ভয় কম হবে সবাই থাকলে।’
শুভমও দেখলাম আমাদের থেকে যেতেই বলল। সেটা বউয়ের কথা ভেবে, নাকি সে নিজেও মনে মনে ভয় পেয়েছে, তা জানি না। অবশেষে আমরা সারারাত আড্ডা মেরে কাটাব বলে ঠিক করলাম। আপত্তি আমরাও বিশেষ জানালাম না। কারণ, সত্যি বলছি, আজ সকালের ঘটনার পর থেকেই আমার মন দুর্বল।
আমরা অনেকক্ষণ আড্ডা মারার চেষ্টা করলাম। কিন্তু, আড্ডা না জমায় চারজনে তাস খেলতে বসলাম। ঘুম আমাদের কারুর চোখেই নেই। রাত আড়াইটে হবে। খাটের ওপর একটা ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ পেয়ে তাস ছেড়ে সেদিকে চোখ ঘোরালাম। দেখলাম বেড়ালটা উঠে দাঁড়িয়েছে। লোম ফুলিয়ে, সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দরজার দিকে। সেই সন্ধে থেকে এই প্রথম বেড়ালটার কোনো আওয়াজ পেলাম। এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। ওটা দরজার ওপাশে কিছু একটা দেখে যেন এরকম করছে। সবুজ চোখের মণির দৃষ্টি নিবদ্ধ বন্ধ দরজার দিকে।
ঘরের আলোগুলো আশ্চর্যভাবে দুর্বল হয়ে আসছে। দপদপ করছে, ঔজ্জ্বল্য কমছে। আমরাও সতর্ক হয়ে দৃষ্টি দিলাম দরজার দিকে। দরজার নীচ দিয়ে, বাইরে ছায়া দেখা যাচ্ছে। কিছু একটা দরজার বাইরেই চলাফেরা করছে। একটা একটা করে আলো নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কিন্তু, এটা কীভাবে হয়? লোডশেডিং হলে তো সব আলো একসঙ্গে নেভার কথা। তবে? শেষ আলোটাও নিভে গেল কমতে কমতে। ঠিক যেমন তেল শেষ হলে প্রদীপের আগুন কমে গিয়ে নিভে যায়, সেইভাবে। পরক্ষণেই ঘর ডুবে গেল অন্ধকারে!
চারিদিক অদ্ভুত নিস্তব্ধ। এতক্ষণ কি চারিদিকে এরকম নিস্তব্ধতা ছিল? নাকি কোনো এক অশুভ উপস্থিত, আলোর মতোই, সমস্ত শব্দও শুষে নিয়েছে? সারাঘরে শুধু একজোড়া ছোটো চোখ জ্বলছে অন্ধকারে। আমার মাথা কাজ করছিল না। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে কেউ দরজায় ফেলল। আর তাতেই দেখলাম দরজার লকের হাতলটা ঘুরছে! কেউ সেটা বাইরে থেকে ঘুরিয়ে খুলতে চাইছে। কিন্তু, পারল না। ভেতর থেকে লক করা চাবি দিয়ে। তাই খুলল না। সবে কিছুটা নিশ্চি হয়েছিলাম…তখনই, কেউ প্রচণ্ড জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করল।
দুম!…দুম!…দুম!…দুম!…. দুম!… দুম!…
একইভাবে কেউ ধাক্কা দিয়েই চলেছে ক্রমাগত।
নিখিলেশ কাঁপা গলায় একবার বলল,
‘ক…কে?’
দরজায় ধাক্কা দেওয়া থামল। কিছুক্ষণ। আমরা দম আটকে বসে। দরজার ঠিক ওপাশ থেকে আওয়াজটা পেলাম। একটা অদ্ভুত আওয়াজ… কোনো মানুষ বা এই জগতের কোনো পার্থিব প্রাণীর পক্ষে ওই আওয়াজ করা সম্ভব না। অনেকটা গলা ঠেলে জোর করে, অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসা একটা ভাঙা ভাঙা, আটকে আসা গোঙানি।
‘অ…অ…অ…আ…আ…আ…আ…আ…আ…।’
আমাদের সারাশরীর জুড়ে আতঙ্কের স্রোত বয়ে গেল। এখন আমরা নিশ্চিত যে, দরজার ওপাশে দাঁড়ানো জিনিসটা কোনো রক্তমাংসের প্রাণী নয়। সেটা একটা অপার্থিব, অশুভ কিছু! আমরা দেওয়ালের সঙ্গে সিটিয়ে বসে। মোবাইলের আলোও নিভে গেছে একইভাবে। আতঙ্কের রেশ কাটতে-না-কাটতেই এইবার শুরু হল দরজা জুড়ে ঝাঁকুনি! প্রচণ্ড শক্তিতে কেউ দরজাটা ঝাঁকাচ্ছে! দেওয়াল থেকে খুলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। ঘরের ভেতর থরথর একটা আওয়াজ পেলাম। অন্ধকারে দেখতে না পেলেও আন্দাজ করলাম টেবিলের ওপর রাখা কাচের গ্লাসটা কাঁপছে। কাঁপতে শুরু করল সারাঘর। খাটটা আমাদের চারজন মানুষসহ থরথর কাঁপছে। চিৎকার বেরিয়ে আসতে চাইছে আমাদের বুক ফেটে তীব্র আতঙ্কে চিৎকারটা গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। দরজার লকটা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবে না দরজা আর দেয়ালকে একসঙ্গে। সেটা কিছুক্ষণ বাদেই জবাব দেবে। খুলে যাবে আমাদের আর ওই ভয়ংকর অশুভ বস্তুটার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বাধাটা। বেশিক্ষণ নেই…আর মাত্র কিছুক্ষণ…এক….দুই…
হাঁ করে খুলে গেল দরজাটা। একটা ড্যাম্প, মাটি আর পচা মাংস মেশানো দুর্গন্ধ এসে ধাক্কা দিল আমাদের নাকে। ঠিক যেন বহু বছর ধরে অন্ধকারে মাটির নীচে পচতে থাকা কিছু একটা আমাদের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্ধকারেও স্পষ্ট বুঝলাম, একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। বিকৃত, অপার্থিব একটা ছায়ামূর্তি। অদ্ভুত আড়ষ্ট ভঙ্গিতে পদক্ষেপ ফেলে অবয়বটা এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। আমরা পাথরের মতো বসে আছি। একটা আঙুল নাড়ানোরও ক্ষমতা আমরা হারিয়েছি তীব্র আতঙ্কে।
পরের ঘটনাগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল চকিতে। আমাদের খাট থেকে কিছু একটা ঝাঁপিয়ে পড়ল মাটিতে। ওই ভয়ানক ছায়ামূর্তির মুখোমুখি! ফ্যাসফ্যাস শব্দের সঙ্গে একটা ‘মিয়াও’ ডাক শুনলাম। আর পরক্ষণেই আবার সেই অদ্ভুত গোঙানির মতো ‘অ…অ…অ…অ…’ আওয়াজ। তবে এইবার সেই আওয়াজটা আলাদা। তাতে যেন ভয় মেশানো আছে। ওই শয়তানটা কিছু একটা দেখে ভয় পেয়েছে।
মেঝেতে ঘষটানোর আওয়াজ থেকে বুঝলাম কিছু একটা দরজা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে! অন্ধকারে জ্বলতে থাকা দুটো ছোট্ট সবজে চোখ একবার আমাদের দিকে ঘুরল। একটা ছোট্ট ‘মিয়াও’ শব্দ করল। তারপর সেও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কিছুক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকলাম। এতক্ষণ হাতে ধরে রাখা মোবাইলের আলোগুলো হঠাৎ আপনা থেকেই জ্বলে উঠল কিছুটা মৃদু হালকা আলোয়। তাতেই দেখলাম বেড়ালটা এগিয়ে যাচ্ছে কিছু একটা লক্ষ করে। আর একটা অন্ধকার অবয়ব ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে বেড়ালটার থেকে
কিছুক্ষণ বাদেই ঘরের সব আলো একে একে জ্বলে উঠল। দেখলাম দরজাটা দেওয়ালের একদিক থেকে ভেঙে খুলে গেছে। দরজার ঠিক সামনে মাটিতে কাদার দাগ! আর তার ওপর ছোটো ছোটো বেড়ালের পায়ের ছাপ। সাহস ফিরে পেতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। এগিয়ে গিয়ে মাটির দাগ ফলো করে দেখলাম সেটা ভোজভাজির মতোই মাঝখানে উদয় হয়েছে। আবার আচমকা গায়েব হয়েছে মাঝখানেই। ঠিক যেন কিছু একটা হাওয়ায় প্রকট হয়েছিল, আবার মাঝখানে হাওয়াতেই মিলিয়ে গেছে। বেড়ালের পায়ের দাগও ওই অবধিই আছে। সেটাও যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে অন্য অবয়বটার সঙ্গেই।
বুড়োর কালো বেড়ালটাকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। বাকি রাতটা আমরা সবাই আমার ঘরে কাটালাম আতঙ্কে। ঈশ্বরকে স্মরণ করে। বুড়োর কালো বেড়াল বাঁচিয়ে দিল একবার। কিন্তু, যদি আবার ফিরে আসে ওই… ওই… শয়তান? তাহলে? বেড়ালটাও যে নেই!
কিন্তু, রাতে আর কিছুই হল না। সূর্যের আলো ঘরে এসে পড়তেই আমরা চারজন একটু স্বস্তির নিশ্বাস নিলাম প্রথমবার।
আর এখানে থাকব না। ব্যাগ গুছিয়ে আমরা সকাল হতেই গেস্ট হাউস থেকে চেক আউট করলাম। দরজা ভাঙার জন্য টাকা দিলাম আলাদা। আমাদের দোষে সেটা ভাঙা না হয়ে থাকলেও আমরা টাকাটা দিলাম। কারণ আমরা জানি যে, কিছুতেই আমরা সত্যিটা কাউকে বলে বিশ্বাস করাতে পারব না। তার চেয়ে টাকা দিয়ে ঝামেলা মেটানো অনেক সহজ।
আমাদের আর এক মুহূর্ত এই জায়গায় থাকার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু, বাণী একবার গোরস্থান থেকে ঘুরে যেতে চাইল। সেই বৃদ্ধকে ধন্যবাদ দিতে চায় বাণী। বুড়ো কাল তার পোষা বেড়ালটা আমাদের না দিলে কাল রাতে যে কী হত আমাদের। উফ! ভাবতে পারছি না আর! কবরস্থানে পৌঁছে বৃদ্ধের দেখা পেলাম। তাকে সব বললাম রাতের ঘটনা। ক্ষমাও চাইলাম তার কাছে। সে হাজারবার ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল আমাদের রক্ষা করার জন্য। আর হাবেভাবে বোঝাল যে বিপদ কেটে গেছে। আর কিছু হবে না। কিন্তু, আমাদের রক্ষাকর্তা কালো বেড়ালটাকে দেখলাম না কোথাও। সেটার কথা জিজ্ঞেস করতে বৃদ্ধ চোখ ছলছল করে কী বলল জানি না, কিন্তু বুঝলাম সে আমাদের আরও একবার ওই কবরটা থেকে ঘুরে যেতে অনুরোধ করছে। কেন অনুরোধ করল জানি না।
ভয় ভয় করছিল। তবু গেলাম। দেখলাম কবর আগের মতোই আছে। শুধু সেটার বেদির ওপর একটা আড়াআড়ি ফাটল চোখে পড়ল। আমি নিশ্চিত এই ফাটলটা গতকাল ছিল না। তবে, আজ ফলকটা পুরোটা দেখা যাচ্ছে। তাতে লেখা:
‘He who sleeps here, may he never wake. ‘
কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় হল সেই ফলকের ওপর বসে আছে একটা কালো কষ্টিপাথরের বেড়ালের মূর্তি। ঠিক আগের মতোই ঘাড় নীচু করে পাথুরে চোখের দৃষ্টিতে নজর রেখে প্রহরা দিচ্ছে নীচে শুয়ে থাকা পিশাচকে। দেখলে ঠিক আগের মূর্তিটা বলেই মনে হবে; কিন্তু তা নয়। একটু নজর করলেই একটা পার্থক্য দেখা যায়। এই বেড়ালের মূর্তিটার বাঁ-কানটা ভাঙা।
