রাহিল— The Story of Exodus – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

রাহিল— The Story of Exodus

[এটা দুটো গল্পের সমাস্তরাল একটা অলৌকিকের, অন্যটা বাস্তবের গল্প। একটা বাইবেলের পাতায় লেখা বহু প্রাচীন এক কাহিনি, অন্যটা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এক কাহিনি। এই কাহিনি অপার্থিব শক্তির, এক মহাপুরুষের গল্প, আবার এটা একজন অতি সাধারণ মানুষের গল্পও বটে। সব অন্ধকারের গল্পের শেষে একটা আলোর গল্প থাকল, কারণ অন্ধকারের শেষে আলো আসে।]

.

প্রাচীন মিশর।

শেষবারের জন্য নিজের কোলের শিশুর দিকে তাকাল হতভাগ্য মা। মায়ের চোখ থেকে গাল বেয়ে একটা অশ্রুবিন্দু পড়ল শিশুর কপালে। নাহ্, আর সময় নেই। ফারাওয়ের সৈনিকদের ঘোড়ার খুরের আওয়াজ ভেসে আসছে কাছ থেকেই। সঙ্গে সঙ্গে চারিদিক থেকে ভেসে আসছে সদ্য সন্তান হারানো মা-বাবাদের করুণ কান্নার আওয়াজে।

শেষবারের জন্যে শিশুর কপালে চুম্বন এঁকে দিল মা। ঘুমিয়ে আছে বাচ্চাটা। ঘুমন্ত শিশুকে একটা ঝুড়িতে শুইয়ে দিল মহিলা। ঝুড়িসমেত শিশুটিকে ভাসিয়ে দিল নীলনদের জলে। মা জানে না তার শিশুর ভবিতব্যে কী লেখা আছে। হয়তো মাঝনদীতে ডুবে মরবে সে, বা, হয়তো যাবে কুমিরের পেটে। বা, হয়তো যে সৈনিকদের ভয়ে তাকে ভাসিয়ে দেওয়া হল, ভেসে এসে সেইরকম কোনো সৈনিকের হাতেই পড়বে সে।

ঝুড়িটা ভেসে গেছে অনেকটা দূর। মা টের পেল যে, তার পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছে একদল সৈনিক। নদীতে বয়ে যাওয়া শিশু ততক্ষণে তাদের নাগালের বাইরে। রাগে এক সৈনিক তার তরবারি গেঁথে দিল মহিলার বুকে। মৃত্যুর অন্ধকার চোখে নেমে আসার আগে অন্তিমবার মা দেখল ঝুড়িটা দূরে নদীর বাঁক ধরে নজরের আড়ালে যেতে।

দেবতা সম ফারাওয়ের আদেশে সেই রাতে মিশর দেখল এক নির্মম হত্যালীলা। যেখানে রাজসৈনিকরা রাজ্যের সমস্ত দাস শিশুদের হত্যা করে। কিন্তু কী এমন কারণ এই নৃশংসতার? কারণ বড়োই অদ্ভুত। গতকাল ফারাওয়ের সভার রাজজ্যোতিষ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে কোনো এক দাসীর সদ্যোজাত শিশু হবে রাজবংশের ধ্বংসের কারণ।

তাই এই নিয়তি এড়াতে সম্রাট আদেশ দিলেন যে, সমস্ত দাস শিশুদের হত্যা করা হোক।

কিন্তু নিয়তিকে কি খণ্ডানো যায়? নিয়তি দেবীর মনে অন্য কিছুই ছিল।

***

দাস পল্লির থেকে অনেকটা দূরে, এই আর্তনাদ, রক্তপাত, নৃশংসতার থেকে অনেক দূরে, ফারাওয়ের রাজপ্রাসাদে নিদ্রামগ্ন রাজকুমারী। সে ন-মাস দশ দিনের অন্তঃসত্ত্বা। হঠাৎই রাজকুমারীর ঘুম ভেঙে গেল, মনে হল কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে। কই, কেউ তো নেই ঘরে।

তার কক্ষের লাগোয়া একটা বিশাল বাগান। ফুলের গন্ধে ম-ম করে আশপাশ। তার পাশ দিয়েই নিজের ছন্দে বইছে মিশরের জীবনরেখার মতো নীলনদ। নদীর কুলকুল ধ্বনি ছাড়া তার ঘুম আসে না। তাই তো তার বাবা, ফারাও নীলনদের রাস্তা কেটে, শুধুমাত্র তার জন্য নদীর মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে। নীলনদের একটা প্রশাখা বইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে রাজকুমারীর ঘরের পেছনের বাগান দিয়ে। সেখান থেকেই কেউ যেন ডাক দিল তার নাম ধরে। ঘুম থেকে উঠে এগিয়ে যায় রাজকুমারী। নদীর ধারে আসে। নাহ্, এখানেও কেউ নেই। কিন্তু আরে, ও কী? ওটা কী ভেসে আসছে নদীতে? ঝুড়ি বটে, কিন্তু ওতে কী যেন নড়ছে। এ যে একটা শিশু! ফুটফুটে একটা সদ্যোজাত শিশু!

রাজকুমারী এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিল। কী সুন্দর দেখতে শিশুটাকে। যার নিজের শরীরে একটা প্রাণ বেড়ে উঠেছে গত ন-মাস, সে কীভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে এমন এক নিষ্পাপ শিশুর থেকে? কিন্তু, বাবা জানতে পারলে? তিনি কি মেনে নেবেন কুলপরিচয়হীন এক শিশুকে?

শিশুটিকে নিয়ে ঘরে এল রাজকুমারী। আর তখনই তার নিজের প্রসববেদনা উঠল।

.

বর্তমান সময়।

আবার সেই স্বপ্নটা দেখে ঘুম ভেঙে গেল জ্যাকবের। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখল তার সারা গা ঘামে ভিজে আছে। একে তো এই মরু প্রদেশের অসহ্য গরম, তার ওপর এই দুঃস্বপ্ন। ঠিক করে ঘুম হয় না অনেকদিন হল জ্যাকবের।

এই অদ্ভুত দুঃস্বপ্নটা বহু বছর ধরেই জ্যাকব দেখে আসছে। কিন্তু যবে থেকে এই রামিলস্থানের গ্রামে এসেছে, তবে থেকে স্বপ্নটা বড্ড ঘন ঘন হানা দিচ্ছে তার ঘুমের মধ্যে।

স্বপ্নটা অদ্ভুত ধরনের। ও দেখে অনেকগুলো মানুষ যাদের মুখ অস্পষ্ট, তারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে ওকে ঘিরে। তারা ওর কথা শুনছে সবাই। তারপরেই জাকব দেখে ধু-ধু মরুভূমি ধরে ও হাঁটছে। দৃশ্য আবার পালটে যায়। ও দেখে কিছু ছায়াশরীর, যাদের ভয়ানক নীলাভ জ্বলন্ত চোখ। তারপর আলো— তীব্র চোখ ধাঁধানো আলো। কেউ যেন তাকে ডাকছে আলোর ভেতর থেকে

প্রতিবারই এই একই উদ্ভট অর্থহীন দৃশ্য। বোধ হয় মরুপ্রদেশে আসার ফলে তার মস্তিষ্কের ওপর আরও বেশি প্রভাব পড়ছে আর সেই কারণেই স্বপ্নটা আরও বেশি স্পষ্ট, আরও বেশি ঘন ঘন ও দেখছে।

গায়ে মার্কিন আর্মির ইউনিফর্মের জামাটা চাপিয়ে নিজের তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসে জ্যাকব। বেরিয়েই ডান দিকে চোখ যেতে দেখল স্টোভে আগুন জ্বেলে রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে রিফাত। জ্যাককে দেখেই একগাল হাসল ছেলেটা। কী নিষ্পাপ হাসি ছেলেটার, মনে মনে ভাবল জ্যাক। কতই-বা বয়স হবে ছোকরার? বড়োজোর দশ কি এগারো। ছেলেটা বোবা, কথা বলতে পারে না, তবে শুনতে পায় ঠিকঠাক। এই গ্রামেরই ছেলে, মা বাপ মরা এতিম সম্ভবত। মাত্র কয়েকটা টাকার জন্যে পুরো আর্মি পল্টনের রান্নার কাজ করে দিনরাত। এই ক্ষুধার দেশে অর্থই রাজা। মনে মনে ভেবে জ্যাক কিছুটা বিষণ্ণ হয়।

রিফাতের উদ্দেশে হালকা হাসি হেসে এগিয়ে যায় জ্যাকব। সামরিক সাজে ক্যাম্প জুড়ে ঘোরাঘুরি করেছে তারই বয়সি মার্কিন যুবকরা। তাদের দেখতে দেখতেই আবার চিন্তায় ডুবে যায় জ্যাকব।

ক্যালিফোর্নিয়ায় জন্ম জ্যাকব ওরফ জ্যাকের। পড়াশোনা শেষ করে সে আগের বছরই যোগ দিয়েছে মার্কিন আর্মিতে। ট্রেনিং শেষ হতেই তার পোস্টিং হয় মিডল ইস্টের এই প্রত্যন্ত গ্রামে। এই গ্রামটার নাম ‘হুযন’; আরবি ভাষায় যার মানে ‘দুঃখ’। নামটা ওর জানা নেই কে রেখেছিল, কিন্তু এই জায়গার জন্যে একদম ঠিক নাম বটে। এই নাম-না-জানা ছোট্ট গ্রামটা আর কয়েক দিনের ভেতরেই বদলে যাবে যুদ্ধক্ষেত্রে। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই জায়গাটাকেই বেছে নিয়েছে মুসলিম টেররিস্ট দল ‘জয়স-ই-থাওয়ারা’-র সঙ্গে যুদ্ধের জন্যে। এক-শো মার্কিন সেনার একটা পল্টন এখানে এসেছে যুদ্ধের আগে সব দেখাশোনা করতে, জায়গার ম্যাপ বানাতে। তাদের কাজ শেষ হলেই ওদের দেখানো পথে এখানে আসবে কয়েকশো মার্কিন সেনা, সাঁজোয়া গাড়ি এবং যুদ্ধবিমান। এখান থেকেই হামলা হবে পাশের দেশে উগ্রবাদী সংগঠনের সেনাশিবিরে।

এই হূযন গ্রামের লোকগুলো এইসব খবর কিছুই জানে না। সেনা আসায় কেউ অবাক হয়নি। যুদ্ধ আর অস্ত্র দেখে দেখে এরা সবাই অভ্যস্ত।

জ্যাকের এখানে ভালো লাগে না। এখানে আসার পরই তার চেনা মানুষগুলো কেমন যেন বদলে গেছে। সেদিন একদল মার্কিন সৈনিককে দেখল একটা বাচ্চা ছেলেকে ধরে পেটাতে। ছেলেটা কাঁদছে আর তাই দেখে ওরা হাসছে, মজা নিচ্ছে। জ্যাক গিয়ে ছেলেটাকে মারার কারণ জিজ্ঞেস করায় তারা জানাল ছেলেটা নাকি আমেরিকা নামটা ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারছে না। তাই ওরা তাকে সাজা দিচ্ছে। কী আশ্চর্য! এখানে আসার পর থেকেই সবাই নিজেদেরকে এই গ্রামের লোকেদের প্রভু ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। কারণ, তারাই এখন এই মানুষগুলোর দণ্ডমুণ্ডের বিধাতা। এইটা মার্কিনরা নিজেরাও বুঝে গেছে। তাই এখন ওদের মধ্যে একটা অদ্ভুত বেপরোয়া ভাব এসেছে। যেন এই গ্রামের মানুষগুলোর সঙ্গে ওরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।

জ্যাকের সঙ্গেই আর্মি ট্রেনিং নেওয়া আরও এক যুবক– বিল। এতদিন ভালোমানুষ হিসাবেই জানত জ্যাক তাকে অ্যাকাডেমিতে। সত্যি বলতে বিল আর জ্যাক ছিল খুবই ভালো বন্ধু। তাই গতকালের একটা ঘটনা জ্যাককে বড্ড নাড়া দিয়েছে। গতকাল রাতে জ্যাক সিগারেট ধরিয়ে একটা বালির ঢিপির ওপর বসে ছিল। কাঁধে রাইফেল নিয়ে আকাশের দিকে দেখছিল। ম্যানহ্যাটেন থেকে এত তারা আকাশে দেখা যায় না। মানুষের আকাশ ছোঁয়ার বাসনা তাদের আকাশটাই ঢেকে দিয়েছে।

জ্যাক হঠাৎই অন্ধকারে বিলের গলার আওয়াজ শুনল। কারুর সঙ্গে কথা বলছে বিল। বলির পাহাড় থেকে নেমে জ্যাক সেদিকে এগিয়ে যেতেই দেখল বিল একটি স্থানীয় মেয়ের হাত ধরে টানাটানি করছে। মেয়েটা হাত টেনে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। জ্যাক এগিয়ে গিয়ে বিলকে বলল,

‘বিল! এ কী করছ তুমি? ছাড়ো মেয়েটাকে এখুনি!’

জ্যাককে দেখে বিল মেয়েটাকে ছেড়ে দিল। মেয়েটি দ্রুত জ্যাকের উদ্দেশে সামান্য মাথা ঝুকিয়েই দৌড়ে চলে গেল গ্রামের দিকে।

বিল গজগজ করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

‘মাইন্ড ইয়োর ওন বিজনেস, জ্যাক!’

হতভম্ব জ্যাকবকে ছেড়ে শিবিরের দিকে চলে গেল বিল। ব্যাপারটাতে জ্যাক খুবই বিরক্ত হয়েছে। তাই ঘটনাটা মেজরকে জানানো উচিত বলে ভাবে জ্যাক। ও নিশ্চিত মেজর একটু বকাঝকা দিলেই বিল শুধরে যাবে, আর এরকম করবে না কোনোদিন। কিন্তু বিলকে অবাক করে দিয়ে, সব শুনে মেজর নির্বিকার চিত্তে বললেন,

গরম যুবক রক্ত। এরম তো হবেই। কিছুই তো নেই এখানে…কিছুই পাচ্ছে না ছেলেরা ফর এন্টারটেইনমেন্ট। ওইটুকু অন্তত মজা নাও তোমরা। যাই বলো, ওই হাড়হাভাতে আরবগুলোর মেয়েগুলো কিন্তু বেশ ডাগর। এই আগুনের মতো গরমে পুড়েও, শুকনো রুটি খেয়ে এই মেয়েগুলোর ওরকম বুক, পাছা হয় কীভাবে?

নিজের বিশ্রী রসিকতায় হেসে ওঠে মেজর। আর শুনতে পারে না জ্যাক। তার ‘দেশ সেবা’র মোহ কেটে গেছে। হলিউডি সব সিনেমায় মার্কিন সেনাদের বীরত্বের দৃশ্য দেখে বড়ো হওয়া জ্যাক, আর্মিতে ভরতি হয়েছিল দেশের সেবা করতে। চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। এবং, এই রুক্ষ বাস্তবের বালিমাটিতে তার মোহভঙ্গ হয়েছে। আর বিল? বিল গতকালের পর থেকে তার সঙ্গে কথা বলছে না। ওর নিজেরও ইচ্ছে হচ্ছে না আর বিলের মুখোমুখি হওয়ার। সে আর বিল অ্যাকাদেমিতে ছিল ‘ব্রাদার-ইন-আর্মস’। সেই বিল কিনা…

আর ভালো লাগছে না জ্যাকবের। ওর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে।

.

প্রাচীন মিশর।

একসঙ্গে বড়ো হতে থাকে মোজেস আর রামেসেস। সবাই তাদের দুই ভাই বলেই জানে। শুধু রানি আর তার নিজস্ব দাসী জানে যে মোজেস তার পালিত সন্তান। সেই রাতে রাজকুমারীর দুটো নয়, একটাই সন্তান হয়েছিল– রামেসেস। ফারাও এই গোপন কথা জানলে মোজেসের গর্দান নিতে দ্বিতীয়বার ভাববে না।

দুই ভাইয়ের মধ্যে খুব মিল থাকলেও তাদের চরিত্র হল সম্পূর্ণ বিপরীত। রামেসেস উচ্ছৃঙ্খল, হিব্রু দাসদের উৎপীড়ন করে মজা পায়। উলটোদিকে মোজেস শান্ত, নম্র। দাস আর সাধারণ প্রজাদের প্রতি খব দয়াশীল। সাধারণ প্রজাদের সবার প্রিয়।

কালের নিয়মে বছর পেরিয়ে রাজকুমাররা কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিল।

রাজকীয় সুখের প্রতি মোজেসের অনীহা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সে চোখের সামনে দৈনন্দিন অন্যায় হতে দেখে দাস-দাসীদের প্রতি। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গিয়ে দেখেছে তার বাবা, বর্তমান ফারাও উলটে তাকেই ভর্ৎসনা করে। দাসরা হল পশুশ্রেণির জীব। তাদের প্রতি দয়া দেখালে রাজাদের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। সৈনিকরা ইতোমধ্যেই কানাঘুসো করে ওকে নিয়ে। বলে, ও নাকি রাজার সন্তান নয়। কিন্তু, রামেসেসের ভয়ে কেউ সেকথা প্রকাশ্যে বলে না। রামেসেস তাকে নিজের ভাই বলেই জানে এবং সবাই জানে এই কথা রামেসেসের সামনে যে বলবে তাকে প্রাণে মেরে ফেলবে ও।

মোজেস কিন্তু জানে, কথাটা সত্যি। ওর মা, রানি তাকে জানিয়েছে ওকে নদীর জলে খুঁজে পাওয়ার বৃত্তান্ত মাত্র কয়েক দিন আগেই নিজের মৃত্যুশয্যায়। মারা যাওয়ার আগে মহারানি মোজেসকে একা ঘরে ডেকে সব বলেছিলেন এবং সাবধান করেছিলেন,

‘দোহাই মোজেস, এই কথা যেন অন্য কেউ না জানে। এমনকী তোমার ভাইকেও বলবে না। এমনিতেই তোমাকে নিয়ে অনেক কথা উঠছে, এরপর যদি ফারাও জানতে পারে, তবে তোমাকে মেরে ফেলবে। তুমি সাবধানে থাকবে এবং যা-ই হোক, হিব্রু দাস-দাসীদের প্রতি দয়া দেখাতে যেয়ো না।’

মোজেস তাই আজকাল চুপচাপ থাকে। মহলের বাইরে বেরোয় না, কারণ বেরোলেই মানুষের দুঃখকষ্ট দেখলে ওর মন বিচলিত হয়। তার এখন এই রাজকীয় জীবনের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা মনে জমেছে। তবুও মায়ের কথা মেনে চেষ্টা করে মুখ বুজে থাকতে, গরিব দাস-দাসীদের প্রতি অবিচার হতে দেখলেও চোখ ঘুরিয়ে নিতে।

কিন্তু একদিনের ঘটনায় সব পালটে গেল।

সেদিনটা ছিল অসম্ভব গরম। মহলে গরম লাগায় সন্ধ্যাবেলায় বেরিয়ে মোজেস বাগানে হেঁটে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎই স্ত্রীলোকের কান্নার শব্দ শুনে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে সে দেখতে পেল, তিনজন সৈনিক এক দাসী যুবতীকে মাটিতে ফেলে তার কাপড় ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে।

হঠাৎই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল মোজেসের। রাগে চোখে অন্ধকার দেখল। ঝাঁপিয়ে পড়ল সৈনিকদের ওপর।

যখন আবার ওর খেয়াল হল, ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে গেছে। মোজেসের হাতে রক্তাক্ত তরবারি, দুই সৈনিকের মৃতদেহ পড়ে আছে মাটিতে, দাসী মেয়েটি মাটিতে কাপড় দিয়ে শরীর ঢাকার চেষ্টা করছে এবং তৃতীয় সৈনিক পালাচ্ছে।

পরক্ষণেই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে মোজেস। সে একটু আগেই যা করেছে তাকে রাজদ্রোহ বলা হয় মিশরের আইনে এবং ওই তৃতীয় সৈনিকটির মুখে কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলে জেনে যাবে এই ঘটনার কথা। তার ভাই রামেসেসও এই অবস্থা থেকে ওকে বাঁচাতে পারবে না।

এখন একটাই উপায়, সব কথা জানাজানি হওয়ার আগেই ওকে পালাতে হবে এই উপত্যকা ছেড়ে! সেই রাতেই সামান্য কিছু পুঁজি সঙ্গে নিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে মিশর ছাড়ে মোজেস। এখানে এমনিতেও তার নিজের কিছু নেই এক রামেসেস ছাড়া।

.

বর্তমান সময়।

আজ একটু আগেই চোখে ঘুম নেমেছিল জ্যাকবের। কিন্তু একটু বাদেই কেউ একটা ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙাল জ্যাকের। চোখ খুলে দেখল রিফাত ওকে ধাক্কা দিচ্ছে।

‘কী? কী হয়েছে? এত রাতে তুই এখানে কী করছিস রে?’

উত্তর না দিয়ে রিফাত জ্যাকের হাত ধরে টানতে লাগল। কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে তাকে। জ্যাক উঠে দাঁড়িয়ে পায়ে বুট গলিয়ে নিল। রিফাত তাকে টেনে প্রায় দৌড় করিয়ে সেনাশিবিরের পেছনদিকে নিয়ে যাচ্ছে। একটা জায়গায় এসে রিফাত আঙুল তুলে দেখাল একদিকে। অন্ধকারে অস্পষ্টভাবে জ্যাক দেখল দুটো মানুষ দাঁড়িয়ে। এগিয়ে গিয়ে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল।

বিল দাঁড়িয়ে আর তার হাতে চুলের মুঠি ধরে আছে একটা মেয়ের। জ্যাক চিনতে পারল, সেই মেয়েটা! যার হাত ধরে টানাটানি করছিল সে কয়েক দিন আগেই। কী কুমতলবে বিল আর তার সঙ্গী এখানে মেয়েটাকে জোর করে টেনে নিয়ে এসেছে সেটা বুঝতে এক মুহূর্ত লাগল জ্যাকের। রাতের অন্ধকারে মেয়েটাকে তুলে এনে ধর্ষণ করতে চলেছে বিল আর তার সঙ্গী!

প্রচণ্ড রাগে বিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জ্যাকব। ঘুসি চালাতে থাকে তার মুখ লক্ষ করে। হঠাৎ হামলা করায় বিল আত্মরক্ষার বা বাধা দেওয়ার সুযোগ পায় না। তার সঙ্গীটিও মারমুখী জ্যাককে দেখে পিঠটান দিয়েছে। অবিরাম ঘুসি খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পরেও বিলের ওপর বসে, রক্তাক্ত মুখ লক্ষ করে ঘুসি চালাতেই থাকে জ্যাক। হয়তো প্রাণেই মেরে দিত, কিন্তু তার হাতটা ধরে আটকায় সেই মেয়েটা।

‘কাওয়াজা! স্টপ!’

বলে উঠল মেয়েটা। হুঁশ এল জ্যাকের তার কথায়। ইস, আর একটু হলেই অনর্থ ঘটে যেত। মেরেই ফেলত হয়তো ও বিলকে। বিলকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জ্যাকব মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি ঠিক আছ?’

‘হ্যাঁ। ঈশ্বর আপনাকে পাঠিয়েছে, কাওয়াজা। আপনি দু-বার আমার ইজ্জত বাঁচালেন।’

বলে কাঁদতে শুরু করল মেয়েটা। আর জ্যাকের হাত নিজের দু-হাতের মাঝে নিয়ে তাতে চুম্বন করতে থাকল। জ্যাক অপ্রস্তুত হয়ে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল,

‘তুমি ইংলিশ জানো?’

‘হ্যাঁ, কাওয়াজা। একটু। বুঝি সব। বলতে কম।’

‘আচ্ছা। তুমি যাও, জলদি ঘরে যাও। এদিকে একদম একা আসবে না। ‘হ্যাঁ। শুক্রান গিদান। অনেক ধন্যবাদ!’

মেয়েটা চলে যেতে জ্যাকব কাঁধে উঠিয়ে নিল অচৈতন্য বিলকে। তাকে নিজের তাঁবুতে নিয়ে গিয়ে ফার্স্ট এইড দিতে হবে। ধীর পায়ে ফিরে এল নিজের ক্যাম্পে। দেখল রিফাত তাঁবুর ভেতর বসে আছে মাটিতে। তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। একগাল হাসি হাসল। বিলকে শুইয়ে দিয়ে জ্যাক রিফাতের মাথায় হাত রেখে আদর করে ছেলেটার ধুলোমাখা রুক্ষ চুলগুলো একটু ঘেঁটে দিল। সত্যিই আজ এই ছেলেটা সময়মতো তাকে ডেকে না নিয়ে গেলে, ওই মেয়েটার…।

ছিঃ!

ছিঃ!

বুকের ভেতর থেকে একদলা যন্ত্রণা, লজ্জা, রাগ উঠে আসতে চাইল জ্যাকবের।

.

প্রাচীন মিশর।

ফারাওদের উপত্যকা শহর থেকে বহু দূরে একটা ছোট্ট, সুন্দর গ্রাম আছে, মিদিয়ান। তাতে আরও পঞ্চাশটার মতো পরিবারের সঙ্গে বাস করে এক সুখী দম্পতি— মোসে আর জিপ্পোরা। আজ অনেক বছর হয়ে গেছে, মোজেসের মিশর ছেড়ে আসার। রাজকীয় ঐশ্বর্য ছেড়েও সে আজ প্রকৃত সুখী। সে এখানে রাজকুমার মোজেস না; সে মেষপালক মোসে। মোসের জীবনের সবচেয়ে খুশির দিনটা ছিল গতকাল। কারণ তার স্ত্রী কালই তাকে জানিয়েছে তার মা হওয়ার কথা। শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে সে। সারাগ্রামকে ডেকে এনে কাল রাতে ভোজ করিয়েছে মোসে। একটা নধর ভেড়া কুরবানি দিয়েছে সেইজন্যে।

আজও সারাদিন খুব খুশিতে ছিল মোসে। সকালে ভেড়াগুলোকে সবুজ ঘাসের ওপর ছেড়ে দিয়ে, নিজে গাছের ছায়ায় বসে গুনগুন গান গাইছিল। ঘুমিয়ে পড়েছিল সে বেলার দিকে। মেঘের গর্জনে ঘুম ভেঙে দেখল আকাশে কালো মেঘ জমেছে। বিকেল হয়ে গেছে তাই ভেড়াগুলোকে নিয়ে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নেয় মোসে। কিন্তু, গুনতিতে একটা ভেড়া কম হচ্ছে যে। আবার গুনে দেখে। নাহ্, একটা কম। কী মুশকিল! কোথায় গেল সেটা।

তখনই পেছনদিক থেকে একটা ভেড়ার ডাক শুনতে পেল। দেখল খানিক দূরেই একটা মেষশাবক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে গেছে অর্ধেকটা।

কী সর্বনাশ! ওটা যে পবিত্র ‘সিনাঈ’ পর্বত। এখানকার গ্রামের আদিবাসিরা বিশ্বাস করে ওটা পবিত্র ভূমি। ওই পাহাড়ের চুড়োয় নাকি স্বয়ং ঈশ্বর বসবাস করেন। সাধারণ মানুষের ওখানে যাওয়া নিষেধ। কিন্তু, ওই ভেড়ার ছানাটা যে ওখানেই উঠল। ওটাকে তো আনতে হবে। আবার মেঘও করেছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে।

এইসব ভাবতে ভাবতেই মোজেস পাহাড় চড়তে শুরু করে। কিন্তু সে যতই ওপরে ওঠে সেই মেষশাবক আরও ওপরে উঠতে থাকে। একসময় একদম চুড়োয় পৌঁছে যায় মোজেস। ততক্ষণে তীব্র ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়েছে। পাহাড়ের ওপরে ভেড়াটাকে দেখতে না পেয়ে মুখ দিয়ে শিস দেয় ও, খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যায়।

আচমকা প্রচণ্ড বজ্রপাত হয় মোজেসের একদম কাছেই পাহাড়ের চূড়ায় একটা শুকনো গাছের ওপর। তার তীব্রতায় একদিকে ছিটকে পড়ে মোজেস, মাথায় চোট পেয়ে কিছুক্ষণের জন্যে চোখে অন্ধকার নেমে আসে। চোখ খুলে দেখতে পায় তার সামনে একটা গাছে আগুন জ্বলছে। দাউদাউ করে জ্বলছে গাছটার প্রতিটি ডাল। কিন্তু…কিন্তু এ কেমন আগুন? এই আগুনের রং যে ধপধপে সাদা। এরম আগুন আগে কখনো দেখেনি মোজেস। সে যা দেখছে তা কি সত্যি, নাকি মাথায় চোটের ফলে ভ্রম হচ্ছে তার?

‘মোজেস!’

একী! কেউ যে তাকে ডাকছে। কিন্তু এখানে তো সে ছাড়া আর কেউ নেই।

‘মোজেস! আমার কথা শোনো!’

এ কী করে সম্ভব? ওই অপার্থিব সাদা আগুনে জ্বলতে থাকা গাছটা থেকে আওয়াজ আসছে যে। কম্পিত কণ্ঠে মোজেস প্রশ্ন করে,

‘কে? কে কথা বলছে আমার সঙ্গে?’

‘আমি!’

‘তুমি? কিন্তু, কে তুমি?’

তীব্র ঝড়ের শনশন শব্দের মাঝেও গমগম করে উত্তর প্রতিফলিত হয় চারিদিক থেকে,

‘আমিই সে!’

.

বর্তমান সময়।

ওয়াচটাওয়ারে আজ নাইট ডিউটিতে আছে জ্যাক আর তার এক সিনিয়র অফিসার হিউ। রাতের মরুভূমির ঠান্ডা কী জিনিস তা যারা সশরীরে উপলব্ধি না করেছে তাদের বোঝানো যাবে না।

শরীর গরম রাখতে আমি পুলওভার চাপিয়েছে দু-জনেই। হিপ ফ্লাস্ক থেকে এক চুমুক হুইস্কি নিজের গলায় ঢেলে সেটা জ্যাকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে হিউ জিজ্ঞেস করল,

‘কী ব্যাপার হে? আজকাল এত চুপচাপ কেন তুমি?’

ফ্লাস্ক থেকে কিছুটা তরল নিজের গলায় ঢেলে জ্যাক উত্তর দিল,

‘কিছু না, লিউটেন্যান্ট হিউ।’

হিউ সামনের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন,

‘তোমার আর বিলের ব্যাপারটা শুনেছি।’

জ্যাক স্পষ্ট উত্তর দিল,

‘আমি যা করেছি তার জন্য আমি দুঃখিত নই, স্যার। আমার পানিশমেন্ট হয়তো হবে, কিন্তু আমি এইটুকু বলতে পারি যে, আমি প্রয়োজনে আবারও একই কাজ করব। কোনো নিরীহ মানুষকে অত্যাচার করে প্রভুত্ব ফলিয়ে আমি বীর সাজতে আসিনি।’

‘হুমম। আদর্শবাদী! এই প্রথমবার ফ্রন্টে, তাই তো?’

‘হ্যাঁ।’

‘পাঁচ বছর আগে আমি প্রথম ওয়ার ফ্রন্টে গেছিলাম। তখন আমিও তোমারই মতো সদ্য যুবক। আদর্শবাদী। পৃথিবীটাকে সাদা-কালোয় ভাবতাম। কিন্তু, যুদ্ধ আমায় কঠিন বাস্তব চেনায়। বুঝতে পারি সাদা-কালো কিছু হয় না। ভালো খারাপের মাঝের গণ্ডিটা ধূসর হয়ে যায় বাস্তবের মাটিতে। আমিও প্রথমে নিজেদেরকে ভালোর পক্ষে ভাবতাম, আর শত্রুপক্ষ খারাপ। খুব সহজ হিসেব ছিল। তারপর একদিন একটা ঘটনায় সব গুলিয়ে গেল।’

‘কী ঘটনা?’

‘একটি ছেলেকে আমাদের ক্যাম্পে ধরে আনা হয়। বয়স দশ কি এগারো। অনেকটা…অনেকটা রিফাতের মতোই দেখতে ছিল ওই ছেলেটাকেও জানো তো। শুনলাম ছেলেটা কার্বাইন নিয়ে মার্কিন সেনার ওপর হামলা চালাচ্ছিল। ভাবো, মাত্র দশ বছরের ছেলে। তাকে পাহারা দিতে আমায় রাখা হয় তিনদিন। আমি তার সঙ্গে কথা বলি এইসময়ে। প্রথম প্রথম কিছু না বললেও পরে আমার সঙ্গে কথা বলা শুরু করে ছেলেটা। তার নাম ছিল সামি। বাড়িতে সে, বাবা, মা ছাড়াও আরও দুই বোন ছিল ওর।

এরপর শুরু হল যুদ্ধ, গোলাবারি। তবুও স্কুল যেত ও আর ওর বোনেরা। একদিন অসুস্থ হওয়ায় সামি স্কুল যেতে পারে না আর সেদিনই দুপুরে খবর আসে যে মার্কিন যুদ্ধবিমানের হামলায় ওর স্কুল উড়ে গেছে। তাতেই ওর দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। কিছুদিন পর লোকাল জঙ্গিদলের এক নেতা এসে তার বাবার কাছে শেল্টার চায়। তার বাবা রাজি না হওয়ায় সে সামির মাথায় বন্দুক দেখিয়ে ভয় দেখায় আর বলে যে তার বাবা আশ্রয় না দিলে ওর মাকে ওরা রেপ করবে ওদের দু-জনের চোখের সামনে। বাধ্য হয়ে তার বাবা তাদের বাড়িতে সেই জঙ্গি নেতাকে আশ্রয় দেয়। এর কয়েক মাস পর এক রাতে একদল মার্কিন সেনা তাদের বাড়িতে ঢুকে আসে। তাদের কাছে খবর ছিল যে, সেই জঙ্গি নেতা এই বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।

সেই নেতা আত্মহত্যা করে ধরা পড়ার আগেই। আর সেনা তুলে নিয়ে যায় সামির মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। তার বাবা, মা বার বার বলে যে, তাদের জোর করা হয়েছিল কিন্তু কেউ তাদের কথা শোনে না। পরের কয়েক সপ্তাহ সামি পাগলের মতো সেনাশিবিরে ঘুরেছে তার মা-বাবার খোঁজ পেতে। কিন্তু থাপ্পড় লাথি ছাড়া কিছুই জোটেনি ওর কপালে। এর কয়েক সপ্তাহ পর তার আব্বা আর আম্মির দেহ পাওয়া যায় একটা নালার ধারে। তাদের সারাগায়ে দগদগে ক্ষত, পোড়া দাগ। টর্চার করা হয়েছে দু-জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে। এরপরেই সামি তার বাবা, মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে যোগ দিয়েছে উগ্রপন্থীদের দলে। তার বাপ-মায়ের হত্যাকারী মার্কিনিদের সে ঘৃণা করে।

জ্যাকব মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল হিউয়ের কথা। হিউ চুপ করতে জ্যাক জিজ্ঞেস করল,

‘তারপর? কী হল সামির?’

‘এর এক বছর পর সামি ধরা পড়ে সেনাদের হাতে। আমার পাহারায় বন্দি থাকার তিনদিন পর তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বোঝা যায় যে, সে কিছুই জানে না। তারপর…’

‘তারপর?’

‘পরের দিন, মার্কিন হাইকমান্ডের কাছে রিপোর্ট করা হয় যে, নাশকতার চেষ্টা করেছিল এক জঙ্গি। সে আবার অন্য এক জঙ্গি ঘনিষ্ঠর ছেলে, যার বাড়ি থেকে আগের বছর জঙ্গিনেতা ওমুককে ধরা হয়েছিল। তাকে হেডশটে মারা হয়েছে। তার কাছ থেকে একটা কার্বাইন আর অনেক রাউন্ড গুলি পাওয়া গেছে।’

একটা সিগারেট ধরিয়ে হিউ আবার শুরু করল।

‘সেইদিন বুঝেছিলাম যে, ভালো খারাপ হল আপেক্ষিক। একজনের সন্ত্রাসী সবসময়ই অন্যজনের বিপ্লবী। অল ইজ গ্রে। দেয়ার ইজ নো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। তারপর থেকেই ঠিক করি যে, এইবার থেকে শুধুই অর্ডার ফলো করব। যাই হোক, আমি মাথায় রাখব যে, আমি শুধুই অর্ডার মানছি। আই অ্যাম জাস্ট এ টুল।’

জ্যাক কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রশ্ন করল,

‘তাতে কি আমাদের পাপ কমে যায় লিউট্যানেন্ট?’

‘না। তবে পাপ বোধটা একটু কম হয়।’

.

প্রাচীন মিশর।

‘ফারাও রামেসিসের ওপর মহান হোরাসের আশীর্বাদ সদা বর্ষিত হোক।’

বিরক্ত মুখে দ্বাররক্ষীর দিকে তাকাল রামেসেস। বলল,

‘এই অসময়ে যদি যথাযথ কারণ ছাড়া আমায় বিরক্ত করতে এসে থাকো তবে তোমায় জ্যান্ত পিরামিডে ঢোকাব।’

প্রহরী লোকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। কারণ সে জানে, এটা শুধুই কথার কথা নয়। দু-বছর আগে, রামেসেস তার বাবার মৃত্যুর পর যখন মিশরের রাজসিংহাসনে বসলেন, তখন রাজ-পুরোহিতরা বললেন যে, মৃত ফারাওয়ের যাতে মৃত্যু পরবর্তী যাত্রায় কোনো কষ্ট না হয় তার ব্যবস্থা করা উচিত নতুন ফারাওয়ের।

সেই কথামতো রামেসেস বিপুল পরিমাণ স্বর্ণরাশি পিরামিডের রাজার শবাধারের পাশে সাজিয়ে দিলেন। সেইসঙ্গে সবাইকে চমকে দিয়ে নির্দেশ দিলেন যে, মৃত ফারাওয়ের মৃত্যুপথের সঙ্গী হতে এবং তাঁর ফরমায়েশ খাটতে বিশজন হিব্রু দাস-দাসীকে পিরামিডে ঢুকিয়ে পিরামিডের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হোক।

তাঁর নির্দেশমতোই বিশজন জীবিত মানুষকে চাবকাতে চাবকাতে জ্যান্ত সমাধি দেওয়া হয়েছিল পিরামিডে, যাতে তিল তিল করে, খাদ্য, পানীয়ের অভাবে মরে সেই মানুষগুলো। যদি না অবশ্য তার আগেই তাদের দম বন্ধ হয়ে যায়।

রামেসেসের এই আদেশ দেওয়ার কারণ কিন্তু পিতৃভক্তি নয় মোটেই। আসলে রামেসেস জানত মিশরের নানা জায়গায় হিব্রু দাসরা বিদ্রোহের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। হিব্রুদের মধ্যে নাকি গল্পগুজব ছড়াচ্ছে যে, তাদের ঈশ্বর নাকি তাদের মুক্তির জন্যে এক দূত শীঘ্রই পাঠাবেন। রামেসেস জানে যে, ‘আশা’ বড়োই ভয়ংকর জিনিস। সামান্য আশার আলো দেখলেই দুর্বলের হৃদয়েও সাহসের বীজ বপন হয়। তাই তাদের মনে নতুন ফারাও এমন ভয় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। যে, ভবিষ্যতে যেন হিব্রুরা কেউ মাথা তুলতে না পারে। এই নৃশংসতার পর থেকে নতুন ফারাও রামেসেসের ভয়ে সারা মিশর থরথর কাঁপে।

তাই প্রহরী রামেসেসের কথায় কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়ে নতজানু হয়ে বলল,

‘ক্ষমা করুন, হে সর্ব শক্তিমান ফারাও। আসলে মহলের দ্বাররক্ষী খবর দিল যে, একজন চাষি নাকি প্রধানফাটকে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইছে। সে দাবি করছে যে, সে নাকি আপনার ভাই রাজকুমার মোজেস। তাই ভাবলাম আপনাকে যথাশীঘ্র খবরটা দিই।’

রামেসেস এইবার সোজা হয়ে বসল। প্রশ্ন করল,

‘কী বললে? কী নাম বলেছে?’

‘মোজেস!’

‘এক্ষুনি নিয়ে এসো তাকে! এক্ষুনি!’

বারান্দায় এসে দাঁড়াল রামেসেস। মনে তার ঝড় উঠেছে। মোজেস? সত্যিই কি মোজেস ফিরে এল এতগুলো বছর পর?

কিছুক্ষণ বাদে ফারাওয়ের সামনে হাজির করা হল সেই ব্যক্তিকে। সাধারণ মেষপালকের ঢলা পোশাক, মলিন জামাকাপড়। লোকটার একমুখ দাড়ি, হাতে একটা ব্যাঁকা কাঠের লাঠি। রামেসেস কাছে এগিয়ে গেল লোকটাকে ভালোভাবে দেখতে। লোকটা তাকে দেখে মৃদু হাসল আর সঙ্গে সঙ্গেই তাকে চিনতে পারল রামেসেস। দৌড়ে গিয়ে আলিঙ্গন করল ভাইকে।

‘মোজেস! হা হোরাস, আমি কি স্বপ্ন দেখছি, নাকি, এ সত্যিই তুমি? কিন্তু এ কী চেহারা বানিয়েছ নিজের, ভাই আমার?’

মোজেস ভাইকে আলিঙ্গন করে বলল,

‘কেমন আছ, ভাই? তোমার অনুপস্থিতি আমি রোজ অনুভব করেছি, রামেসেস।’

‘মোজেস! তুমি জানো আমি তোমায় কত খুঁজছি? তুমি বরাবরই বোকা। তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে যে, একটা সামান্য সৈনিককে হত্যা করার জন্য বাবা তোমায় সাজা দেবেন? দুটো সৈনিকের জীবনের দাম তোমার সামনে কী ভাই?’

‘রামেসেস, বাবা হয়তো সেই দোষে আমায় সাজা দিতেন না। কিন্তু, যেদিন তিনি জানতে পারতেন যে, আমি আসলে তাঁর পুত্র নই, আমি কোনো এক হিব্রু দাসপুত্র, সেদিন? সেদিন আমায় ক্ষমা করতেন কি?

বজ্রাহতর মতো রামেসেস কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর প্রশ্ন করল,

‘এ কী বলছ তুমি?’

‘হ্যাঁ, রামেসেস। মা আমায় সত্যি বলেছিলেন মৃত্যুর আগের মুহূর্তে। আমি জানতাম সত্যি বেশিদিন চাপা থাকবে না আমি এখানে থাকলে।’

রামেসেস কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবল। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে বলল,

‘কিছু এসে যায় না তাতে। বাবা এখন পিরামিডের ভেতরে শুয়ে আছেন এক-শো বছর পর বেঁচে ওঠার আশায়। ফারাও যখন আমি, তখন আমি যা ইচ্ছে তাই করতে পারি। কাউকে জানাতে হবে না। তুমি আমার ভাই হয়েই এখানে থাকবে আমার সঙ্গে রাজমহলে। ব্যস!

মোজেসকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা দুই প্রহরীর দিকে চোখ পড়তেই রামেসেস বলল,

‘এই দুই প্রহরীকে আমি এখুনি হত্যা করার নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, এরা তোমার জন্মরহস্য জেনে গেছে, ওদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। এই কে আছিস, এই দুটোর মুণ্ডু আলাদা কর এখুনি ধড় থেকে!’

আতঙ্কে দুই প্রহরী কেঁপে ওঠে রামেসেসের কথা শুনে। কিন্তু রামেসেস কিছু করার আগেই মোজেস বলে ওঠে,

‘না! রামেসেস! তোমার কাছে কি মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই? আমি এখানে থাকতে আসিনি। আমি এসেছি এখানে ঈশ্বরের দূত হয়ে; তাঁর নির্দেশ পালন করতে। আমি এসেছি নিজের হিব্রু ভাইবোনদের দাসত্বের শেকল থেকে মুক্ত করে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে।’

‘কী? কী বললে? তুমি কি মরু রৌদ্রে এত বছর ঘুরে উন্মাদ হয়ে গেছ, মোজেস?’

‘না, রামেসেস। আমি ঠিকই বলছি। মুক্তি দাও এই অত্যাচারিত হিব্রু দাসদের। স্বয়ং ঈশ্বর ইয়াহ্উয়ি নির্দেশ দিয়েছেন আমাকে। হিব্রুদের আমি নিয়ে যাব মুক্তির দেশে। ‘কান্নান’ হবে তাদের নিজেদের মুক্ত ভূমি। তাদের মুক্তি দাও। ঈশ্বর তোমায় ক্ষমা করবেন।’

এইবার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে রামেসেসের। বলে ওঠে,

‘তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ। আমি ফারাও রামেসেস। আমি স্বয়ং ঈশ্বর। হিব্রুরা হল নরকের কীট! তাদের জন্মই হয়েছে আমাদের সেবা করতে, আমাদের জন্য পিরামিডের পাথর ভাঙতে। চাবুকের নীচেই তাদের ঠিক জায়গা। তাদের আমি ছেড়ে দেব? হাহা! হাসালে আমায় মোজেস।’

‘ভাই! আমার কথা শোনো…ঈশ্বর…’

‘চুপ! আর একটা কথা বলবে না। তুমি নিজের জায়গা ভুলে যেয়ো না, তাহলে আমিও ভুলে যেতে বাধ্য হব যে, তুমি আমার ভাই ছিলে। এবং আমায় ‘ভাই’ নয়, আমায় ‘ফারাও’ বলে ডাকো।’

মুখে শিথিল অভিব্যক্তি ফুটে উঠল মোজেসেরও। বলল,

‘এই তোমার শেষ কথা?’

‘হ্যাঁ! আমার কথা না শুনলে তুমিও তোমার দাস ভাইদের কাছেই জাহান্নামে যেতে পারো।’

‘বেশ। তবে তাই হোক। আমি এই দঃখী মানুষগুলোকে ছেড়ে যাব না। ঈশ্বর আমার সঙ্গে আছে।’

তাচ্ছিল্য ভরে রামেসেস বলল,

‘তাই নাকি? কই তাকে তো দেখলাম না তোমার সঙ্গে ঘরে ঢুকতে।’

মোজেস কিছুক্ষণ রামেসেসের চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। শেষে বলল,

‘বেশ। তবে এই দেখো! চাক্ষুষ কোরো ঈশ্বরের শক্তি।’

মোজেস নিজের হাতের লাঠিটা সামনে এগিয়ে ধরে। তার হাতের কাঠের লাঠিতে কম্পন শুরু হয়। রামেসেসের বিস্ফারিত চোখের সামনেই সেটা বদলে যায় একটা প্যাঁচালো, ফণাতোলা বিষধর সাপে!

.

বর্তমান সময়।

একটু আগেই যেকথা জ্যাকব শুনল তা সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে, অসুস্থ লাগছে, নিজেকে বড়ো নোংরা মনে হচ্ছে। কোনোমতে নিজের তাঁবুতে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল।

হেডকোয়ার্টার থেকে তাদের পল্টনের কাছে অর্ডার এসেছে যে, পরের সপ্তাহেই তাদের গ্রাম ছেড়ে পিছিয়ে যেতে হবে। স্যাটেলাইট আর ড্রোন ইমেজে দেখা গেছে ‘জয়স-ই-থোওয়ারা’ যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে এই গ্রামের দিকে এগিয়ে আসা শুরু করেছে। তাই আমেরিকা নতুন যুদ্ধনীতি নিয়েছে। তাদের পল্টন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাবে উত্তরের দিকে। দক্ষিণ দিয়ে শত্রুপক্ষ ঢুকবে গ্রামে। শত্রুপক্ষের আর্মি গ্রামের কাছে চলে এলেই মার্কিন যুদ্ধবিমান দিয়ে পুরো জায়গাটাকেই ‘কার্পেট বম্বিং’ করে উড়িয়ে দেওয়া হবে, শত্রুসমেত। এই অর্ডার শোনার সময়ে জ্যাক অপেক্ষা করছিল কখন হুযন গ্রামের লোকেদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তাব দেওয়া হবে। কিন্তু মেসেজ সেখানেই শেষ হয়ে যায়। জ্যাক অবাক হয়ে মেজরকে জিজ্ঞেস করে,

‘বাট, স্যার। অর্ডার তো অসম্পূর্ণ। এখানকার লোকেদের আমরা কোথায় শিফট করব?’

এই শুনে সবাই তার দিকে তাকায় অদ্ভুত তাচ্ছিল্য ভরে, মেজর বলল, ‘আর ইউ অ্যান ইডিয়ট? প্ল্যান শুনলে না? গ্রাম খালি করে দিলে জয়স-ই- থাওয়ারার জঙ্গিরা সন্দেহ করবে যে, আমরা পিছিয়ে গেছি। তারা দূর থেকে গ্রাম খালি দেখলেই আর ঢুকবে না গ্রামে। আর না ঢুকলে তাদের সবাইকে একত্রে বম্বিং ভিসিনিটিতে পাওয়া যাবে না।’

‘মানে? আমাদের বিমান এই গ্রামের মানুষদের সুদ্ধু বম্বিং করবে? কিন্তু… কিন্তু…তাতে তো উগ্রপন্থীদের সঙ্গে এই লোকগুলোও …’

‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ। ইট’স অল ফর দ্য গ্রেটার গুড।’

এরপর আর কিছু শুনতে পায়নি জ্যাকব। তার মাথা ঘুরতে থাকে। কী বলছে এরা? এতগুলো নিরীহ মানুষ শুধুমাত্র দাবার বোড়ের মতো স্যাক্রিফাইস হবে? এটা তো পাপ! হায় ঈশ্বর!

তাঁবুতে এসে প্রচণ্ড শরীর খারাপ লাগে জ্যাকের। জ্বর আসে খুব। জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন। তবে এইবার অনেক স্পষ্ট।

একদল লোক… মরুভূমি…নীল জ্বলন্ত চোখ… একটা আওয়াজ… তাকে ডাকছে। তাকে আদেশ দিচ্ছে। এই আদেশ উপেক্ষা করতে পারবে না সে। কী অদ্ভুত আবেশ একটা। পরম প্রশান্তি।

.

প্রাচীন মিশর।

‘ফারাও রামেসেসের ওপর হোরাসের কৃপা থাকুক সর্বদা!’

‘কী খবর এনেছ, পূজারি? এটা কি সত্যি যে, নীলনদের জল রক্তে বদলে গেছে?’

‘একদমই সত্য নয়, ফারাও। নীলনদের জল মোটেই রক্তে বদলে যায়নি। বরং জলেরই রং লাল হয়ে গেছে।’

‘আমার কাছে খবর আছে যে, একুশ সূর্য আগে মোজেস নাকি নীলনদে নামে। আর সেখানে সবার চোখের সামনে পুরো নীলনদের জল রক্তে বদলে দেয়। এটা সত্যি নয়?’

‘না, ফারাও। এগুলো লোকমুখের রটনা। এটা কোনো ভোজবাজি নয়, এটা কোনো দৈবঘটনাও নয়। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি যে, একুশ সূর্য আগে নীলনদের প্রবেশমুখে জাহাজডুবি হয়েছে সুদূর দেশ থেকে আসা এক সুবিশাল বাণিজ্যিক জাহাজের। সেই জাহাজে বোঝাই ছিল বিশাল পরিমাণ কাপড়ের রং করার লাল রং। সেই রং নদীর জলে মিশে গিয়ে সমস্ত নদীকে লাল করে তুলেছে।’

‘বুঝলাম। কিন্তু মোজেস সেটাকে দৈব অলৌকিক ঘটনা, ঈশ্বরের ইঙ্গিত বলে প্রচার চালাচ্ছে আমার বিরুদ্ধে।’

‘হ্যাঁ, মহান ফারাও। আপনাকে তো আগেই বলেছি। আপনি সেদিন যা দেখেছিলেন, তা অতি সাধারণ সম্মোহনের খেলা। ওই দণ্ড সাপে বদলে যাওয়ার জাদু দেখানো আমার মতো জাদুকরের কাছে ছেলেখেলা। ওর কথা ভুলে যান। ‘হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ। মোজেস নাকি দাবি করছে যে, মিশরের ওপর খুব শীঘ্রই দৈব বিপর্যয় নেমে আসবে। আমিও দেখতে চাই যে…’

কথা মাঝপথে থেমে যায়, কারণ হঠাৎই সভায় এক প্রহরী হস্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে।

‘মহান! মহান!’

‘কী চাই আবার? এত সাহস হয় কী করে তোমার এখানে প্রবেশ করার? বলেছি না আমাদের বিরক্ত করবে না!’

‘আমায়…আমায় ক্ষমা করুন, মহান ফারাও। কিন্তু, আপনি…আপনি একবার বারান্দায় যান। নিজের চোখেই দেখুন বাইরে।

রামেসেস এগিয়ে যায় তার সুবিশাল বারান্দার দিকে, যেখানে ওপর থেকে তার গোটা রাজধানী শহর দেখা যায়।

রামেসেস দেখল নীলনদ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কিছু প্রাণী উঠে আসছে প্রতিটি ঘাট থেকে।

‘এ কী! ওগুলো কী? সারানগর জুড়ে কী ওগুলো?’

সৈনিকটি উত্তর দিল,

‘ব্যাং! ওগুলো ব্যাং! কোনো এক অজানা কারণে নীলনদের সমস্ত ব্যাং ডাঙায় উঠে আসছে। সারাশহর লক্ষ লক্ষ ব্যাঙে ভরে যাচ্ছে।’

রামেসেস পুরোহিতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,

‘পুরোহিত। এইসব কী ঘটছে?’

পুরোহিতের ভ্রূ কুঁচকে গেছে। উত্তর দিতে সময় নিলেন কিছুক্ষণ। ভেবে বললেন,

‘হে মহান ফারাও, বিচলিত হবেন না। আমার মনে হচ্ছে নদীর জলে লাল রং মিশে যাওয়ায় তা জলে থাকা প্রাণীদের থাকার পক্ষে অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়েছে। মাছ সব মারা যাওয়ায়, বা, নদীর অন্য অংশে চলে যাওয়ায় সমস্ত ব্যাং উঠে এসেছে ডাঙায়।

পুরোহিতের কথায় আশ্বাস পেল রামেসেস। ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল তার।

‘এই যদি মোজেসের দৈব বিপর্যয়ের নমুনা হয়, তবে বলতেই হয়, তার ঈশ্বর বড়োই দুর্বল।’

.

১০

বর্তমান সময়।

রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে জ্যাকব। তার চোখে ঘুম নেই, মাথায় চিন্তার ঝড় চলছে।

‘না। কিছুতেই এটা হতে দিতে পারি না। এতগুলো মানুষ, এতগুলো নিরীহ পরিবার। তাদের এই যুদ্ধের বাল হতে দেব না। কী দোষ তাদের? এরা তো যুদ্ধ চায়নি। চায়নি ভিনদেশের রাজনীতিবিদদের তরফ থেকে জোর করে চাপিয়ে দেয়া সাহায্য বা শাস্তি। এরা তো হাজার অভাবের মধ্যেও শাস্তিতে ছিল। ঈশ্বরের ওপর নিজেদের অগাধ বিশ্বাস নিয়ে সুখে ছিল। জলের অভাব আছে এখানে, কিন্তু, মনে বিশ্বাসের অভাব নেই এদের। তবে, হাজার মাইল আর বারোটা টাইম জোন দূরে বসে থাকা কিছু ব্যক্তি, যারা জীবনে পাও রাখেনি এই দেশে, তারা কীভাবে ডিসাইড করে নেয় যে, এদের শাস্তি চাই? এই কি শাস্তি? এক অযাচিত যুদ্ধের কোল্যাটারাল হয়ে মৃত্যু? এই শাস্তি দিতে আমরা এসেছিলাম এই দেশে?’

মনে মনে নিজের কর্তব্য স্থির করে নিয়েছে জ্যাকব। বিছানা ছেড়ে উঠে স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে বানানো ম্যাপটা খুলে মাটিতে ছড়িয়ে দিল। সেটার পাশে মাটিতে বসে ছোটো ছোটো নুড়িপাথর দিয়ে জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে থাকল।

এই হল হূযন গ্রাম। উত্তরে মরুভূমি। পশ্চিমে জয়স-ই-থাওয়ারের জঙ্গিঘাঁটি। বাকি রইল পূর্ব আর দক্ষিণ। দক্ষিণে মার্কিন মিত্র দেশ আছে। কিন্তু সেই দেশের সরকার, বিনা মার্কিন অনুমতিতে কয়েকশো উদ্বাস্তুদের স্থান দেবে না। তাই বাকি রইল পূর্ব দিক। পূর্ব দিকে ছোট্ট এক গ্রাম আছে— কানেয়ান। এখানের শাসকগোষ্ঠী শান্তিপ্রিয়। আশেপাশের অনেক উদ্বাস্তু সর্বহারা মানুষের এখানে স্থান দিয়েছে গত কয়েক বছরে। এইখানে ঠাঁই হতে পারে হ্যুনিদের।

কিন্তু যদি ধরেও নেওয়া যায় যে, কোনো এক দৈব উপায়ে, আর্মির চোখ এড়িয়ে কয়েকশো লোককে এখান থেকে বের করা গেল, কিন্তু এরপর তাদের মুখোমুখি হতে হবে সুবিশাল, ক্ষমাহীন মরুভূমির। এই মরুভূমিকে সাধারণ মানুষেরা অপদেবতার রাজ্য বলে। এখানকার প্রাচীন লোককথার গল্প প্রচলিত আছে যে, এই মরুর বালির নীচে বসবাস করে একদল ‘জিন’। তাদের আরবি নাম ‘কারকাদান’, এরা মরুযাত্রীদের পা ধরে মাটির নীচে টেনে নিয়ে চলে যায়।

এই কাহিনি প্রচলিত হওয়ার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও মার্কিনিরা জেনেছে। আসলে, এই মরু জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে লুকোনো চোরাবালি, যে কারণে এই মরু পেরোতে গিয়ে অসংখ্য পথিক প্রাণ হারিয়েছে। সেই থেকেই উৎপত্তি এই কারকাদানের উপকথার। তাহলে ওরা কীভাবে পার হবে এই মরু? এটাও কি মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করা নয়?

হোক। তবুও চেষ্টা করতে হবে। কারণ এখানে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। এই মরুভূমিতে যদি এক শতাংশও চান্স থাকে তবে তাই নিতে হবে। এইবার প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে? কীভাবে রাজি করাবে জ্যাক এই গ্রামের মানুষদের এক অচেনা বিদেশির কথায় নিজের ভিটে ছাড়তে? আর কোন উপায়েই-বা আর্মির চোখ এড়িয়ে বেরোবে এতজন গ্রাম থেকে?

.

১১

প্রাচীন মিশর।

সোনার থালায় সাজানো খাবারগুলোর দিকে চোখ যেতেই গা ঘিনঘিন করে উঠল রামেসেসের। প্রতিটা খাবারের ওপর ভনভন করছে মাছি।

প্রচণ্ড রাগে গর্জন করে একধাক্কায় মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল সমস্ত খাবারের থালা। মাথায় আগুন জ্বলছে রামেসেসের। তার মনে হচ্ছে রাগে এখুনি মাথাটা ফেটে যাবে!

তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, ভীত সন্ত্রস্ত দাসটির দিকে তাকাতেই সমস্ত রাগ সেই দাসের ওপর গিয়ে পড়ল। দেওয়ালে টাঙানো চাবুকটা তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল দাসটির ওপর। ‘নোংরা হিব্রু কুকুরের বাচ্চা!’ চিৎকার করতে করতে ততক্ষণ ও এলোপাথাড়ি চাবুক চালিয়ে গেল যতক্ষণ না যন্ত্রণায় চিৎকার আর ছটফট করতে থাকা লোকটার খোলা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে রক্তে ভেসে গেল। একসময়ে ক্লান্ত হয়ে রামেসেস ছুড়ে ফেলল চাবুক। রক্তাক্ত আধমরা লোকটাকে অন্য দাসরা তুলে সরিয়ে নিয়ে গেল।

নাহ্। আর সহ্য হচ্ছে না তার। গত এগারো সূর্য ধরে সারা মিশর ভরে গেছে মাছিতে। যেদিকে তাকানো যাচ্ছে সেদিকেই ভনভন করছে শুধুই কুৎসিত মাছির ঝাঁক। এর আগে রাজধানীতে ব্যাঙের সমস্যা চলেছিল বেশ কয়েক মাস। আর তা শেষ হতে সবে লোকজন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল, ঠিক তখনই শুরু হল মাছির উপদ্রব।

পুরোহিতের বক্তব্য এটা হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ ব্যাঙের প্রধান খাদ্য হল মাছি। অসংখ্য ব্যাং জল ছেড়ে বেরিয়ে আসায় বেশিরভাগই ডাঙায় মারা গেছে বা লোকেরা মেরে ফেলেছে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে মাছির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুণ বেশি। তবে পুরোহিতের বক্তব্য যে, এই উপদ্রব বেশিদিন চলবে না। কিছু সময় পর আপনা থেকেই কমে যাবে।

কিন্তু এই সুযোগে যে শয়তান মোজেস সব হিব্রুদের তাতিয়ে তুলছে। ব্যাঙের পর মাছিদের সে ঈশ্বরের পাঠানো দ্বিতীয় বিপত্তি বলে প্রচার করছে। মানুষের মনের বিশ্বাস থেকে ঈশ্বর সৃষ্টি হয়, আর ঈশ্বর মানুষের মনে বিশ্বাস জোগাতে সাহায্য করে। সেই কারণেই মানুষ ঈশ্বরের নামে প্রাণ দেয়, আবার প্রাণ নেয়ও। দাসত্বকেই এতদিন নিজেদের ভবিতব্য বলে মেনে নেওয়া হিব্রুদের মনে কিছুটা হলেও বিশ্বাস দানা বাঁধতে শুরু করেছে যে, তাদের ঈশ্বর তাদের সঙ্গে আছে। যেসব দাসরা চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখাত না, তারাও এখন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছে। আর এই কাগুগুলোকে মোজেস ঈশ্বরের পাঠানো বার্তা বলে লোকেদের সাহস দিচ্ছে। এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। বিপ্লবের একটা সামান্য স্ফুলিঙ্গ দাবানল হতে বেশি সময় লাগে না।

রামেসেসের পক্ষে মোজেসকে মেরে ফেলা শক্ত কাজ না। কিন্তু, এখন এই কাজ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাকে মেরে দিলে লোকে বলবে মহান ফারাও এক হিব্রুকে ভয় পেয়েছে। হিব্রু কুকুরগুলো মোজেসকে শহিদ দেবদূত বানিয়ে দেবে, তার নামে অন্যরা বাকিদের খেপিয়ে তুলবে। রাজ্য জুড়ে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যাবে। বড্ড ভুল হয়ে গেছে তাঁর। কয়েক মাস আগে প্রথমদিন যখন মোজেস এখানে এসেছিল, তখনই ওকে হত্যা করা উচিত ছিল। সে যে রামেসেসের ভাই নয়, মোজেস একজন হিব্রু, তা জানার পরেই ওকে কারাগারে নিক্ষেপ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, মোজেসের কথাগুলোকে সেইসময়ে গুরুত্ব দেয়নি ও, আর সেই ভুলেরই মাশুল দিচ্ছে গোটা মিশর। নাহ্, এভাবে হবে না। অন্য পথ নিতে হবে এই কুকুরের জাতকে শায়েস্তা করতে।

‘প্রহরী!’

‘মহান ফারাওয়ের ওপর…’

‘চুপ করো! জিভ কেটে নেব আর কথা বললে। যেটা বলছি, সেটা শোনো। আমার এই আদেশ আজকের মধ্যে সব জায়গায় প্রচার করে দাও।’

কিছুটা থেমে রামেসেস বলতে শুরু করল,

‘আজ থেকে যে হিব্রুকে, মোজেস নামের দেশদ্রোহী ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যাবে, তাকে পনেরো ঘণ্টার জায়গায় বিশ ঘণ্টা পিরামিড নির্মাণকার্যে পাথর টানার কাজ করতে হবে। আর যে হিব্রু মোজেসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো সাহায্য করবে, তার গর্দান কেটে শহরের মোড়ে মুণ্ডু ঝুলিয়ে দেয়া হবে।’

.

১২

বর্তমান সময়।

গ্রামবাসীদের মধ্যে একজনকেই ভালোভাবে চেনে জ্যাকব- রিফাত। ওকেই জ্যাক বলল যে, তাকে গ্রামে নিয়ে যেতে। গ্রামে মোড়ল জাতীয় কেউ নিশ্চয়ই আছে। তার সঙ্গে কথা বলা দরকার। তাকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে হবে, গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে হবে। রিফাত সব শুনে কী বুঝল কে জানে, বরাবরের মতোই শুধু হেসে ঘাড় নেড়ে চলে গেল। জ্যাকের সন্দেহ হল আদৌ ছেলেটা কিছু বুঝল কি না। তবে সেদিন বিকেলে ডিউটি সেরে তাঁবুতে আসতেই দেখল রিফাত বসে আছে। তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে আবার সেই একগাল হাসি দিয়ে হাত ধরে টানতে শুরু করল।

গ্রামের মুখে এনে রিফাত দাঁড়িয়ে গেল। ইশারায় বোঝাল যে, তাকে একাই যেতে হবে কারণ, সে এখন খেলতে যাবে। জ্যাক বারে বারে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, রিফাত যেন নিজের খেলা একদিনের জন্যে মুলতুবি রেখে তার সঙ্গে গ্রামে গিয়ে অন্তত একজন মুরুব্বির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার মতো বিদেশির কথায় গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করবে কেন? কিন্তু, ছোকরা কিছুতেই ঢুকল না। দৌড়ে চলে গেল খেলতে। অগত্যা হতাশ জ্যাক একাই প্রবেশ করল গ্রামে। সঙ্গে বড়ো বন্দুক না রাখলেও একটা পিস্তল আছে। কারণ সে জানে, লোকজন রেগে আছে মার্কিন আর্মির ওপর। তার ওপর হামলা হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল গ্রামের সবাই একসঙ্গে একটা ভাঙা মাজারের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে। সবাই চুপচাপ প্রার্থনা করছে। হঠাৎই তার চোখে পড়ল মাজারে একজন মেয়ের ওপর যে একটা বেদিমতো জায়গায় দাঁড়িয়ে। হিজাবে মুখ ঢাকা মেয়েটির। মেয়েটিও ওকে দেখেছে। এতক্ষণে সবাই সেই মেয়েটির দৃষ্টি লক্ষ করে তাকে দেখতে পেয়েছে। তাদের প্রত্যেকের রোদে পোড়া লাল মুখে কঠোরতা ফুটে উঠছে। জ্যাক দু-পা পিছিয়ে গেল। নাহ্, এখানে একা আসাটা বোকামি হয়েছে জ্যাকের। লোকজন মোটেই খুশি না তাকে দেখে। রিফাতের উদ্দেশে মনে মনে গালি দিল জ্যাক।

হঠাৎই ভিড়ের মধ্যে থেকে এগিয়ে এল সেই মেয়েটা। মানে, যে এতক্ষণ ওই বেদিতে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল। এগিয়ে এসে জ্যাকের হাতটা ধরল। হিজাব সরিয়ে দিতে মেয়েটাকে চিনতে পারল জ্যাকব। এটা সেই মেয়েটা যাকে সেদিন ও বিলদের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।

আজ দিনের আলোয় জ্যাক লক্ষ করল, মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী। এই মরুদেশের রুক্ষতা যেন তার সৌন্দর্যে আলাদা একটা মাত্রা এনে দিয়েছে। মেয়েটা তাকে দেখে হাসছে। কী অপূর্ব হাসি মেয়েটির। কতক্ষণ জ্যাক মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গেছিল ওর খেয়াল নেই। চটক ভাঙল মেয়েটির ডাকে,

‘কাওয়াজা! কাওয়াজা!’

‘হুঁ…হ্যাঁ। মানে…আমি…।’

মেয়েটা আবার হেসে উঠল। প্রতিবার মেয়েটির হাসির ছন্দে ছন্দে যেন জ্যাকের হৃদয়টা লাফিয়ে উঠছিল। মেয়েটা জ্যাকের হাত ধরে সবার সামনে দাঁড় করাল। আরবি ভাষায় গ্রামবাসীদের উদ্দেশে কিছু বলল। লোকজনের চোখের কঠিন দৃষ্টি মুহূর্তে নরম হল। এক প্রৌঢ় এগিয়ে এসে জ্যাকের দু-হাত চেপে ধরল নিজের দু-হাতে। হাতে চুম্বন করে কিছু বলল আরবি ভাষায়। মেয়েটা বৃদ্ধের ভাঙা ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিল জ্যাককে,

‘আমার আব্বা। আপনাকে শুক্রিয়া বলছে। সেইদিনের জন্য।’

‘ওহ্। না, না। বরং আমি লজ্জিত আপনার কাছে। মিস…’

‘আয়সা।’

‘আয়সা আমি এখানে এসেছি গ্রামের কোনো প্রধানের সঙ্গে কিছু খুব জরুরি কথা বলতে। কিন্তু, আমি তো তোমাদের ভাষা জানি না। তুমি কি সেইরকম কারুর সঙ্গে কথা বলতে আমায় সাহায্য করবে?

‘কী নিয়ে কথা বলতে চান কাওয়াজা?’

‘আমার নাম জ্যাকব মিলার। আমায় জ্যাক বলে ডেকো। আয়সা, শোনো তোমাদের ঘোর বিপদ। আর কয়েক দিন বাদেই আকাশ থেকে যুদ্ধবিমান বোমা ফেলে উড়িয়ে দেবে গ্রাম। তোমাদের এই জায়গা ছেড়ে যেতেই হবে।’

চোখে ভয় ফুটে উঠল মেয়েটার।

‘কী বলছেন আপনি, জ্যাক? কোথায় যাব আমরা?’

‘এখান থেকে দু-দিনের হাঁটাপথ পূর্বে। কানয়ান দেশে যেতে হবে তোমাদের। তোমাদের কোনো প্রধানকে দয়া করে ডাকো আয়সা। বিশ্বাস করো, আমি এক বিন্দু মিথ্যে বলছি না।’

‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, জ্যাক। আমার নাম আয়সা আফ্রোজ। এখানকার প্রাচীন ‘ইয়াহবি’র মন্দিরের পূজারি। আমার আব্বুই এই গ্রামের প্রধান। আপনি আসুন আমাদের বাড়িতে, আব্বার সঙ্গেই কথা বলতে পারেন। আপনি আসুন, আমার ঘরে আসুন।’

গ্রামপ্রধানের বাড়িতে বসে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল জ্যাক। আয়সা তাদের মাঝে দোভাষীর কাজ করল। সব শুনে বিমর্ষ হয়ে বৃদ্ধ গ্রামপ্রধান বললেন,

‘কিন্তু কাওয়াজা, কীভাবে কানয়ান যাব আমরা? পূর্বেও তো নিশ্চিত মৃত্যু। আপনি কি জানেন ওইদিকের মরুভূমি কত ভয়ানক? ওখানে জিনরা থাকে। সেটা আমরা পার করব কীভাবে? আর তা ছাড়া, আপনার আর্মির লোকেরা আমাদের যেতে দেবে কেন?

‘আমি জানি না। কিন্তু, কিছু উপায় আমি বের করবই। কথা দিলাম। কিন্তু, আপনারা প্রস্তুতি নিতে শুরু করুন।’

.

১৩

প্রাচীন মিশর।

‘মাছি হল অতি নোংরা পোকা এবং বহু রোগ বহনকারী। ওরাই গত কয়েক মাসে আমাদের শরীরে রোগ ধরিয়ে দিয়ে গেছে। নোংরা আবর্জনা থেকে উড়ে এসে আমাদের গায়ে, খাবারে অবিরত বসত। সেই থেকেই আমাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ প্রবেশ করেছে। এই সমস্ত ঘটনাই শৃঙ্খলের মতো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। এতে অলৌকিক কিছু নেই আর রোগও কমে যাবে এই মরসুম পার হয়ে গেলেই।’

রামেসেসের রাজসভায় ভিড় জমানো লোকেদের আশ্বাসের কথা শোনাচ্ছে পুরোহিত। রাজ্যের ঘরে ঘরে জরা-ব্যাধি ভরে গেছে; এমনকী খোদ ফারাও নিজেও অসুস্থ। এইবার মিশরের উচ্চশ্রেণির লোকেরা ভয় পেতে শুরু করেছে। তাদেরও মনেও আশঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে যে, এইসব দৈব বিপর্যয় নয় তো?

একজন রাজপুরুষ বলে উঠল,

‘আপনার কথাই যদি সত্যি হবে তাহলে এটা বলুন যে, শুধু আমাদের বড়ো বংশের নাগরিক ও রাজপরিবারের লোকেরাই রোগে আক্রান্ত কেন হচ্ছে? একজনও হিব্রু দাসের ঘরের শিশু তো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। এ কীভাবে সম্ভব?’

জ্ঞানী পুরোহিত জানত যে, এই প্রশ্ন উঠবেই। উত্তর তার আগেই ভাবা ছিল, ‘এর ব্যাখ্যাও অতি সহজ। হিব্রু দাসরা এমনিতেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে, তারা ছোটো থেকেই নোংরা খাদ্য, জল ইত্যাদি খেয়ে বড়ো হয়। তাই তাদের শরীরের রোগ প্রতিষেধক ক্ষমতা আমাদের থেকে প্রাকৃতিক কারণেই বেশি। জরা-ব্যাধি ওদের নিত্যকার সঙ্গী। ওদের সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না। দয়া করে আপনারা এইসবের পেছনে অতিপ্রাকৃত খোঁজা বন্ধ করুন। সূর্যদেব মহান ‘রা’-র ওপর আস্থা রাখুন।’

এই ব্যাখ্যা কারুরই বিশেষ মনঃপূত হল বলে মনে হল না। অন্য একজন প্রশ্ন করল,

‘কিন্তু পুরোহিত, এইসব ঘটনা পর পর কীভাবে ঘটছে? এতগুলো ঘটনাকে কি কাকতালীয় বলা চলে?’

আরও একজন প্রশ্ন করল,

‘আর তা ছাড়া, এত বছরে তো কখনো এমন হয়নি। তবে এখনই কেন? আমার তো মনে হয় এগুলো ওই দুষ্ট জাদুকর মোজেসের কাজ। শুনেছি তার হাতের দণ্ড নাকি এক বিষধর সাপে বদলে যায়।’

‘আরে, সে তো ভয় দেখিয়েছে যে, এরপর আরও বড়ো বিপর্যয় নেমে আসতে চলেছে আমাদের ওপর।’

‘তার কথায় সাহস পেয়ে আমার বাড়ির কাজ করা দাসগুলো বিদ্রোহ করছে।’

‘আচ্ছা, এটা কি সত্যি যে, ওই মোজেস ফারাওয়ের হারিয়ে যাওয়া ভাই?’ এতক্ষণ চুপচাপ বসে সবার কথা শুনছিল রামেসেস। সে নিজে আর কী বলবে? সে নিজেই এখন মনে মনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, এই ঘটনাক্রম অলৌকিক। শুধুমাত্র জেদ রাখতে তিনি মুখে পুরোহিতের যুক্তিগুলোতে সায় দিয়ে চলেছেন। কিন্তু, উপস্থিত এক রাজপুরুষের মুখে এই শেষ কথাটা শুনেই তাঁর মাথায় আগুন চড়ে গেল।

‘প্রহরী! সবক-টাকে এক্ষুনি বের করে দাও। আমি হিব্রু কুকুরদের মুক্তি দেব না! এই আমার শেষ কথা। তাতে যা হয়, হয়ে যাক!’

.

১৪

বর্তমান সময়।

উপায় রিফাতই বের করল। এতদিনে রিফাত আর জ্যাকের মধ্যে যোগাযোগটা অনেক সহজ হয়ে গেছে। জ্যাক তার ইশারার ভাষা বুঝতে এখন অনেকটাই স্বচ্ছন্দ। রিফাত জানিয়েছে যে, সে চোরাবালির মাঝ দিয়ে পায়ে চলা রাস্তা চেনে। ও নাকি ওখানেই ওর কিছু বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যায়। তাই জ্যাক ও হৄযন গ্রামবাসীদের সেই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। মার্কিন আর্মি পল্টনদের ধোঁকা দেওয়ারও একটা দারুণ পরিকল্পনা জ্যাক নিজেই ভেবে বের করেছে। যদিও তাতেও এই রিফাত ছেলেটারই সাহায্য দরকার হবে ওর। পল্টনের সবার খাবার ওই রিফাতই বানায়। যে রাতে গ্রামবাসীরা বেরোবে, সেই রাতে আর্মির সবার খাবারে কড়া ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে সহজেই। এতদিন ধরে রিফাতের হাতের রান্নাই তারা খাচ্ছে, অতএব প্রথমদিকে সকলে সতর্কতা অবলম্বন করলেও ওসবের পাঠ চুকে গেছে অনেকদিন হল। রিফাত সহজেই খাবারে ওষুধ মিশিয়ে দিতে পারবে। গ্রামের বৃদ্ধ হাকিমের থেকে যথেষ্ট পরিমাণ ঘুম পাড়ানি ওষুধ জোগাড় করে এনে দিয়েছে আয়সা।

পুরো ব্যাপারটাই কেমন যেন অবাস্তব লাগছে জ্যাকের। সত্যিই কি এত সহজে হবে সব কিছু? তার মনের কোণে কেউ যেন নিঃশব্দে আশ্বাস জোগায় – হ্যাঁ হবে। বিশ্বাস রাখো।

হাতেও আর সময় নেই। দু-দিন বাদেই মার্কিন বিমান হামলা শুরু হওয়ার কথা।

আজকে যখন জ্যাক রিফাতের সঙ্গে নিজের তাঁবুতে কথা বলছিল, তখন একটি মূর্তি তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। বিল। সে যদিও রিফাতের কথা বুঝছে না, কিন্তু জ্যাকের টুকরো টুকরো কথা শুনে আন্দাজ করতে পারছে যে, জ্যাক কিছু একটা গোপন কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিলের অনেকদিন থেকেই সন্দেহ হচ্ছে জ্যাকের আর ওই বদ ছোটো রাসকেলটার ওপর। বিল খেয়াল করেছে যে, রিফাতটা বড্ড ঘন ঘন আজকাল জ্যাকবের তাঁবুতে যায়, কী যেন তাদের চোখে চোখে কথা হয়। কিন্তু, এইসব মেজরকে বলে লাভ হয়নি। মেজর ব্যাপারটাকে ‘বিল নিজের পার্সোনাল রাগের শোধ নিতে চাইছে’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। অন্য কাউকেও ও কথাগুলো জানাতে পারছে না, কারণ শেষমেষ যদি দেখা যায় ব্যাপারটা কিছুই নয়। তখন বিলকে অন্য সবার বিশেষ করে ওই জ্যাক হতচ্ছাড়ার কাছে হাসির পাত্র হতে হবে। কিন্তু বিল নিজে অন্তত আগামীকাল সতর্ক থাকবে। এই রিফাত আর জ্যাক মিলে কাল রাতে বড়ো কিছু করার পরিকল্পনা করছে বলেই ও অনুমান করতে পারছে।

.

১৫

প্রাচীন মিশর।

মাঝরাত হতে বেশি দেরি নেই। মোজেস বসে রয়েছে হিব্রু বস্তির বাইরে। তার সামনেই প্রধান নগরের বিরাট দ্বার। দু-দিকে বিরাট ইগল পাখির মূর্তি শোভা পাচ্ছে।

ঘন কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলেছে নগরটা। আকাশের চাঁদ মুখ ঢেকেছে কালো মেঘে। মৃত্যুর আঁধার নেমেছে মিশরের বুকে। শহরের ভেতর থেকে সমবেত কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে। বহু মা আজ শিশুহারা, বহু পুরুষ অভিভাবকহীন, প্রায় সমস্ত গর্ভস্থ ভ্রূণ মারা গেছে গত এক সপ্তাহে। বুক ফাটানো কান্নায়, শোকে ডুবে আছে মিশর।

রোগ ব্যাধি গত কয়েক মাসে উত্তরোত্তর বেড়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে ঘরে ঘরে। শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরে যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে সেই কারণে তারাই হয়েছে মড়কের প্রথম শিকার। হিব্রুরাও অসুস্থ, কিন্তু তারা এইসব রোগের সঙ্গে যুঝতে অভ্যস্ত। তাই তাদের বস্তিতে সেভাবে প্রভাব পড়েনি।

মোজেস অনেক চেষ্টা করেছে রাজধানীর লোকেদের সাবধান করার। বার বার আর্জি করেছে রামেসেসের কাছে। আজকের চরম বিপর্যয় এড়ানো যেত যদি মুক্তি দেওয়া হত দাসদের। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই হিব্রু দাস-দাসীরা নিজেরা বহু অংশে রোগ বহনকারী। তাদের সংস্পর্শে এসে কোমল এবং আয়েশের জীবন কাটানো বড়োলোক মিশরবাসীদের শরীরে রোগ ঢুকেছে।

এই কথা প্রাজ্ঞ রাজপুরোহিত বার বার বুঝিয়েছে ফারাওকে। সেও বারংবার বলেছে যে, দাসদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা হোক তাদেরই ভালোর জন্যে। কিন্তু, রামেসেস তার অহংকারে অন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সত্যটা দেখতে পাচ্ছে না। সে ভেবে নিয়েছে যে, এই অবস্থায় হিব্রুদের বিতাড়িত করা মানে মোজেস জিতে যাবে। তা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না!

মোজেস নিজেও আর নিশ্চিত নয় কোনটা সত্যি আর কোনটা মিথ্যে, কোনটা দৈব আর কোনটা কাকতালীয়। সেদিন সিনাঈ পাহাড়ের ওপরে সে যা প্রত্যক্ষ করেছিল আর শুনেছিল তা সত্যি নাকি মাথায় চোট লাগায় তার মনের ভ্রম সেই ভেবে ওর মনে এখনও মাঝে মাঝে দ্বিধা জাগে। হয়তো ও যা করছে তা দেব আদেশে নয়, বরং হিব্রু দাসদের সঙ্গে ঘটতে থাকা অন্যায়ের মধ্যেই তাদের ত্যাগ করে পালিয়ে আসার পাপ বোধ থেকেই তার মন তাকে এইসব দৃশ্য দেখিয়েছিল সেদিন।

সেই রাতে সিনাঈ থেকে নামার সময় পথে একটা অদ্ভুত ব্যাঁকাচোরা কাঠের টুকরো দেখে সাপ ভেবে ভুল করেছিল মোজেস। ভুল বুঝতে পেরে নামার সময়ে সঙ্গে করে সেই লাঠিটা নিয়ে নেমেছিল। ও শুনতে পেয়েছিল ওর মনের ভেতর থেকে কেউ বলছে, ‘গ্রহণ করো। আমার এই উপহার গ্রহণ করো।’ এই আদেশ কি ঈশ্বরের? নাকি মোজেস অবচেতন মনেই তখন সেটা তুলে নিয়েছিল, কারণ সে জানত যে তার ভাই রামেসেসের সাপের প্রতি প্রবল ভয় আছে ছোটো থেকেই।

মনে দ্বিধা জাগতেই মোজেস জোর করে তা ঝেড়ে ফেলে। না না, ঈশ্বরে বিশ্বাস হারানো পাপ। ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া কি এত কিছু সে করতে পারত? তার মনে এই সাহস তো ঈশ্বরই দিয়েছেন।

কিন্তু আজ মোজেসের চোখের কোনায় জল। নিজেকে এই এতগুলো নিষ্পাপ মিশরীয় শিশুর হত্যাকারী মনে হচ্ছে তার বার বার। লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মোজেস আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,

‘হে ঈশ্বর! তুমি কি সত্যিই এত নিষ্ঠুর? এদের পাপের সাজা তুমি এই নিরীহ শিশুদের কেন দিলে? যে ভূমিষ্ঠই হতে পারেনি সেই শিশুও কি তোমার চোখে অপরাধী? কেন হে সর্বশক্তিমান? কেন? কেন? কেন? এই কি তোমার ন্যায়বিচার?

কান্নায় ভেঙে পড়ল মোজেস।

.

১৬

বর্তমান সময়।

ডিনার আজ ছোঁয়নি জ্যাকব। কারণ এতে ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছে। তার স্নায়ু টান টান হয়ে আছে উত্তেজনায়। সে তৈরি। সঙ্গে তার আর্মি ব্যাকপ্যাক আর অটোমেটিক রাইফেল নিয়েছে। খাবার দেওয়ার এক ঘণ্টা পরেই তার তাঁবুর বাইরে রিফাত এসে দাঁড়াল। ইশারায় তাকে বেরিয়ে আসতে বলল।

রিফাত খালি হাতে এসেছে দেখে তাকে জিজ্ঞেস করল,

‘তুমি কিছু নেবে না সঙ্গে?’

রিফাত একগাল হাসল।

এই বোকা ধরনের সরল ছেলেটা কি সত্যিই পেরেছে পুরো আর্মি প্লাটুনকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে? একটু এগিয়েই উত্তর পেল জ্যাক। সত্যিই তাঁবুর বাইরেও অনেকে রাস্তায় বসেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এই সুযোগেই ওকে বেরোতে হবে!

কিন্তু, এগিয়ে মেইন ওয়াচ টাওয়ারের সামনে আসতেই দাঁড়িয়ে যেতে হল জ্যাককে। কারণ তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে দু-জন। বিল আর হিউ।

‘কোথায় পালাচ্ছিস, বেজন্মা?’

বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বিল জ্যাকের ওপর। কিছু করার আগেই বিলের রাইফেলের কুঁদোর একটা আঘাত এসে পড়ল জ্যাকের মাথার একদিকে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল জ্যাক। বিল জ্যাককে সামলানোর কোনো সুযোগ না দিয়ে তার বুকে চড়ে বসে গলা চেপে ধরে দু-হাতে। বিলের আঙুল আরও চেপে বসছে তার গলায়। দম আটকে আসছে জ্যাকের।

হঠাৎই ‘ঠক’ করে একটা জোর আওয়াজ আর ঢিলে হয়ে এল বিলের আঙুল জ্যাকের গলা থেকে। একদিকে ঢলে পড়ল বিলের ভারী শরীরটা। জ্যাক কোনোভাবে উঠে বসে কী ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করল। দেখল বিলের অচেতন শরীরটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে হিউ। সে-ই নিজের বন্দুকের কুঁদো দিয়ে বিলকে আঘাত করেছে।

কিন্তু, হিউ হঠাৎ তাকে কেন সাহায্য করবে? হিউ নিজেই তো জ্যাককে বলেছিল যে, সে আজকাল শুধুই নিজেকে যন্ত্র হিসেবে ভাবে। সে শুধুই অক্ষরে অক্ষরে আদেশ মেনে চলে। তবে কি আজ হিউয়ের প্রস্তর হৃদয়ে আবার মানবিকতা জেগে উঠল কোনো কারণে?

উঠে দাঁড়িয়ে জ্যাকব হিউকে ধন্যবাদ দিল। তার ধন্যবাদের কোনো উত্তর দিল না সে। কোনো প্রশ্ন না করে, জ্যাক আর রিফাতের যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল হিউ। অন্ধকারেও জ্যাক বুঝতে পারছিল যে, হিউয়ের দৃষ্টি ঘোলাটে। সে একদৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে আছে রিফাতের দিকে। আরও একবার ধন্যবাদ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় জ্যাক শুধু শুনল হিউ বিড়বিড় করছে কয়েকটা কথা।

‘সামি…সামি…ক্ষমা করো আমাদের এই পাপ!’

মনে হল যেন হিউ কাঁদছে।

.

১৭

প্রাচীন মিশর।

আজ হিব্রুদের খুশির দিন, তাদের মুক্তির দিন। বহু যুগ ধরে চলে আসা দাসত্ব আজ তাদের শেষ হয়েছে। মিশরের নাগরিকদের দাবির কাছে হার মানতেই হয়েছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ ফারাও রামেসেসকেও। যদিও সারা মিশর জুড়ে শোকের ছায়া। সন্তানহারা মায়েদের কান্না এখনও ভারী করে রেখেছে পরিবেশ। মুক্তি মিলেছে তাদের, কিন্তু তা মিলেছে বহু নিষ্পাপ শিশুর জীবনের মূল্যের বিনিময়ে।

মিশরের প্রধান ফটকের কাছে ভিড় জমিয়েছে সারা শহর। কয়েক হাজার হিব্রু তাদের সামান্য সর্বস্ব নিয়ে জড়ো হয়েছে সেখানে। দ্বার খুলে দেওয়া হলে একে একে বাইরে বেরোতে লাগল দাসরা।

শেষ হিব্রু বেরোনো অবধি মোজেস অপেক্ষা করল। সবাই বেরিয়ে গেলে মোজেস দাঁড়িয়ে থাকা মিশরবাসীদের দিকে ফিরল। বলল,

‘আমি জানি আপনারা কতটা শোকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এই মুহূর্তে। আমি আপনাদের কাছে হৃদয় থেকে ক্ষমাপ্রার্থী। নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু, বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই করতে পারতাম না। ঈশ্বরের ইচ্ছাই সব। আমি নিমিত্ত মাত্র। আমি জানি যে ছোটো শবাধারগুলোই সবচেয়ে ভারী হয়। পারলে আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। এ জয় আমার কাছে পরাজয়ের চেয়েও বেশি হৃদয়বিদারক। এ আমি কখনোই চাইনি।’

বেরিয়ে গেল মোজেস। একবারও আর পিছু ফিরে চায়নি তার ভালোবাসার দেশের দিকে। সামনে বিরাট পথ। কান্নান বহু দূর।

প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোজেসকে বেরিয়ে যেতে দেখল রামেসেস। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মন্ত্রী এতক্ষণ তার মনে চেপে রাখা প্রশ্নটা করেই ফেলল।

‘মহান। আপনি সত্যিই এদের চলে যেতে দেবেন? এটা কি আপনার পরাজয় নয়?’

‘আমি প্রত্যেকটা হিব্রু কুকুরকে খুন করব। আর ওই বেইমান মোজেসকে আমি নিজের হাতে কচুকাটা করব।’

‘কিন্তু, তারা যে চলে গেল ফারাও। তবে?’

‘যদি মিশরের ভেতর এদের খুন করতাম, তবে ভবিষ্যতে মিশরে বজ্রপাতে একজন লোক মরলেও সেটাকে দৈব অভিশাপ বলে আমার দোষ হত। আমি তাদের আজ সূর্যাস্ত থেকে কাল সূর্যাস্ত অবধি এগিয়ে যেতে দেব। আমার পুরো সৈন্য তৈরি। একদিন পর আমরা ওদের পিছু নেব। ঘোড়সওয়ার সেনা তাদের সহজেই ধরে ফেলবে। আর তারপর…।’

.

১৮

বর্তমান সময়।

মাথার চোটটা থেকে রক্ত ঝরছিল জ্যাকের। আয়সা একটা কাপড় বেঁধে দেওয়ায় রক্ত বেরোনোটা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু জ্যাকের মাথাটা ঝিমঝিম করছে। অনেক ঘণ্টা ধরে হাঁটছে তারা সবাই অন্ধকার রাতে। জ্যাকের একপাশে আয়সা আর অন্যপাশে রিফাত হাঁটছে। হালকা গ্লো স্টিকের নীল আলোয় আর চাঁদ ও মেঘের আলো-আঁধারিতে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তার চোখের সামনে মাঝে মাঝেই ভেসে উঠছে তার সেই বার বার দেখা স্বপ্নের দৃশ্য, যা এই মুহূর্তে বাস্তবের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। এ যেন এক অদ্ভুত ‘দেজা-ভ্যু’। এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেল তার সঙ্গে চলতে থাকা কয়েকশো মানুষ। জ্যাক বুঝল সেই আতঙ্কের মরুভূমির সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে তারা সবাই। সামনেই সেই চোরাবালি মরু শুরু হচ্ছে। এইবার সাহস করে তাকেই আগে এগোতে হবে রিফাতের দেখানো পথে। রিফাত আর জ্যাকব এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সবার সামনে।

কিন্তু…কিন্তু…সামনে ওগুলো কারা? কী ওগুলো?

যতদূর চোখ যাচ্ছে জ্যাক দেখতে পাচ্ছে অস্পষ্ট অন্ধকার ঢাকা বিচিত্র অবয়বগুলোকে। পথ আটকে দাঁড়িয়ে তারা। জ্বলন্ত নীল চোখ তাদের! ভয়ংকর তাদের দৃষ্টি। এগুলো হুবহু তার স্বপ্নের সেই দৃশ্য নয় কি? এগুলোই কি মরু জিন কারকাদান?

জ্যাক পেছন ঘুরে বাকিদের মুখ দেখে অবাক হল। তারা তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের দৃষ্টিতে অজানার ভয় রয়েছে বটে, কিন্তু অপার্থিবর সেই আতঙ্ক নেই যেটা জ্যাক আশা করছিল তাদের চোখে দেখবে। তার মানে সামনের ওই ছায়া শয়তানগুলো সত্যি নয়। শুধু সে একাই দেখছে এগুলো। তার দৃষ্টিভ্রম ঘটছে সম্ভবত মাথায় চোট লাগার ফলে। সে স্বপ্ন আর বাস্তব গুলিয়ে ফেলছে।

রিফাত এতক্ষণ তার পাশে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে দেখেছিল। এইবার আগে এগিয়ে গেল বালির পথ ধরে এবং পেছন ফিরে ইশারায় সকলকে তার পিছু নিতে বলে এগোতে শুরু করল। চোখ বন্ধ করে একবার দীর্ঘ শ্বাস টেনে সামনের দিকে পা বাড়ায় জ্যাক। আর পা বাড়াতে সেই ছায়া-অবয়বগুলো সরে দাঁড়াল দু-পাশে। তাদের মাঝে পথ করে দিল রিফাত আর জ্যাককে এগিয়ে যাওয়ার। আরও একবার চোখের পলক ফেলতেই জ্যাক তাদের আর দেখতে পেল না। দৃষ্টিভ্রম কেটে গেছে ওর।

জ্যাকের হাত চেপে ধরল আইসা। মৃদু চাপে বুঝিয়ে দিল, আমরা তোমায় বিশ্বাস করি। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো।

এগিয়ে চলল রিফাত। তার পেছনে জ্যাক আর আইসা। আর তাদের পিছু পিছু কয়েকশো সর্বহারা হনবাসী।

***

ঠিক সেই মুহূর্তে জ্ঞান আসে বিলের। কয়েক মুহূর্ত মনে করতে সময় লাগে কী ঘটেছে। পুরো ঘটনা মনে পড়তেই ছুটে গিয়ে এমারজেন্সি সাইরেন বাজিয়ে দিল।

ঘুম ভেঙে উঠে পড়ে সারা সেনাক্যাম্প। বিল প্রথমেই মেজরকে গিয়ে রিপোর্ট করে। মেজর পাঁচজন আর্মিম্যান গ্রামে পাঠিয়ে কনফার্ম হয় বিলের কথাই সত্যি, সারাগ্রাম ফাঁকা। মেজরের নির্দেশে কয়েক মিনিটের মধ্যে দশটা জিপগাড়ি রওনা হয় পূর্বদিকে। বালিতে এত লোকের পায়ের ছাপ দেখে এগিয়ে যাওয়াটা নেহাতই সহজ। জ্যাক আর গ্রামের লোকেরা চার ঘণ্টা এগিয়ে আছে। কিছু এসে যায় না। তারা হেঁটে যাচ্ছে, এই গাড়ির স্পিডে মাত্র এক ঘণ্টায় তাদের ধরে ফেলা যাবে। তাদের ফিরিয়ে আনতে অর্ডার দিল মেজর। দরকারে জোর করতে দু-একজনকে শুট করতেও যেন পিছপা না হয় সেটাও বলে দিল। বিল সবার সামনের গাড়িতে উঠল। প্রচণ্ড রাগে জ্বলছে সে।

এক ঘণ্টা গাড়ি চলার পরে সত্যিই একটু দূরে দেখা মিলল একটা বড়ো দলের। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্ব। দাঁত চেপে গাড়ির অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল বিল।

কিন্তু, কিছুদূর এগোতেই গাড়ির চাকা বালিতে আটকে গেল। নেমে দেখতে গেল কয়েক জন। আর তখনই বুঝল কী মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে তারা। তারা চোরাবালি অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে! যাত্রীসমেত গাড়ি দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে বালির ভেতর। আতঙ্কে নেমে পড়ল সবাই গাড়ি ছেড়ে। ভাবল কম ওজন হলে হয়তো তারা পালাতে পারবে। কিন্তু, তা হল না। তাদের পা-ও ক্রমেই ঢুকে যেতে শুরু করল বালির গভীরে। ঠিক যেন তাদের পা ধরে বালির নীচে টানছে কেউ। দ্রুত টেনে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পাতালের অন্ধকারে। আতঙ্কে যত ছটফট করে তারা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে ততই আরও দ্রুত ঢুকে যাচ্ছে।

‘রিট্রিট! সেভ অ্যাজ মেনি অ্যাজ ইউ ক্যান! নিজের প্রাণ বাঁচাও! অ্যাবর্ট মিশন! আই রিপিট— অ্যাবৰ্ট!’

চেঁচিয়ে অর্ডার দিল অফিসার।

‘না! আমি ওই বাস্টার্ডকে ছাড়ব না!’

চিৎকার করতে করতে, একাই অর্ডার উপেক্ষা করে এগিয়ে চলল বিল। রাগে সে অন্ধের মতো এগিয়ে চলেছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। প্রতিটা পদক্ষেপের সঙ্গে আরও একটু বেশি করে নাচে ঢুকতে লাগল সে। তার মনে হল পা ধরে অনেকগুলো হাত যেন টানছে। শেষ মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বিল; অন্যদের থেকে সাহায্য চাইল। কিন্তু, লাভ হয়নি। অন্যদের থেকে

অনেকটা তফাতে এগিয়ে এসেছে ও ততক্ষণে।

পরের দিন সকালের দিকে যখন বিধ্বস্ত আর্মির দলটা হুযন ফেরে ততক্ষণ তারা সবক-টা গাড়ি হারিয়েছে। অর্ধেকের বেশি সৈনিক চোরাবালিতে ডুবে প্রাণ দিয়েছে। তাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

.

১৯

প্রাচীন মিশর।

সামনে উথাল-পাথাল লোহিত সাগর। সমুদ্রের সৈকতে আজকের রাতটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তাঁবু পেতেছে মোজেস আর হাজারখানেক হিব্রু। মুক্তির আনন্দে ক্লান্তি তাদের কাছে হার মেনেছে।

কিন্তু, এই মুহূর্তে সবার কপালেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ। কারণ তাদের সামনের এই বিশাল সমুদ্র। স্বপ্নের দেশ কান্নান এই লোহিত সাগরের ওপারে। এই সাগর কীভাবে পার করবে তারা? নৌকো বানাবে? কিন্তু হাজারখানেক মানুষের জন্য অনেকগুলো বিশাল নৌকো লাগবে। কেউই জানে না কীভাবে নৌকো বানাতে হয়। আর এই সময়ে তাদের মশিহা মোজেসও কিছুই বলছে না।

আসলে, মোজেস নিজেই জানে না এরপর তার কী করণীয়। ঈশ্বরের নির্দেশ তাকে এখনও অবধি এতদূর আসার কথাই বলেছে। কিন্তু, কীভাবে ওপারে যাবে এতজনকে নিয়ে সেটা মোজেসও জানে না। মোজেস একটা পাথরের ওপর বসে একমনে ঈশ্বরকে স্মরণ করছে। কিন্তু কিছুতেই মন শান্ত হচ্ছে না, মন বলছে বিপদ কাটেনি।

তখনই তার কানে এল লোকের মাঝে হঠাৎ একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একজন হিব্রু যুবক ছুটে এসে মোজেসকে খবর দিল,

‘মোজেস! পশ্চিম থেকে ধুলোর ঝড় উঠেছে। মিশরের দিক থেকে কিছু এগিয়ে আসছে।’

‘কী এগিয়ে আসছে?’

প্রশ্নটা করলেও এর উত্তরটা মোজেস নিজের মনে জানে। রামেসেস তাদের এত সহজে নিস্তার দেবে না তা মোজেস জানত।

একটা উঁচু টিলার মাথায় চড়ে মোজেস দেখার চেষ্টা করল। এবং, যা দেখল তাতে তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। দূরে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা ধুলো ঝড় নয়। সেটা হাজার হাজার ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের দিকে ধেয়ে আসা মিশরীয় সেনা। প্রতি মুহূর্তে কমছে দুর্বল, নিরস্ত্র, ক্লান্ত হিব্রুদের আর ওই সুবিশাল সেনার মাঝের ব্যবধান।

আর একমুহূর্ত দেরি না করে সবাইকে উঠে তৈরি হতে নির্দেশ দিল মোজেস। এই মুহূর্তে তাদের এই লোহিত সাগর পার করতে হবে। মোজেসের কানে কানে কেউ বলছে, এগিয়ে যেতে। বিশ্বাস রাখতে।

সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়াল মোজেস। সমুদ্রের জল মোজেসের পা ধুয়ে দিচ্ছে বার বার। সামনে তার উত্তাল সমুদ্র। পেছনে ধেয়ে আসা রক্তপিপাসু সেনা। চোখ বন্ধ করল মোজেস। সে শুধু একটা কথা জানে, এতদূর যে এনেছে বাকি পথটাও সে-ই দেখাবে। শুধু মনে সাহস আর বিশ্বাস রাখতে হবে। বিড়বিড় করে মোজেস বলল,

‘হে ঈশ্বর! হে ইয়াহবি! পথ দেখাও।’

জ্বলন্ত সেই গাছটা আবার দেখতে পেল মোজেস। সমুদ্রের মাঝে সেটা জ্বলছে, তাকে ডাকছে। শুনতে পেল আবার সেই আওয়াজ।

‘মোজেস!… বিশ্বাস রাখো।…বিশ্বাসেই আমায় পাবে।…বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চলো।’

মোজেস চোখ খুলল। সে জানে তাকে কী করতে হবে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক হাজার মানুষকে উদ্দেশ করে চিৎকার করল,

‘ঈশ্বরে বিশ্বাস করো? বিশ্বাস করো সর্বশক্তিমানের শক্তিতে?’

‘করি। (সমবেত কণ্ঠে উত্তর এল।)

‘তবে কোনো ভয় নেই।’

সামনের সাগরের দিকে নির্ভয়ে পা বাড়ায় মোজেস। আর তার পিছু নেয় কয়েক হাজার হিব্রু।

সমুদ্রের জলে আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে। জল ফুলে উঠল আর পরমুহূর্তে সবাই দেখল লোহিত সাগরের জল ফাঁক হতে শুরু করেছে। সবার চোখের সামনে সমুদ্রের জল ফাঁক হয়ে রাস্তা করে দিল ক্লান্ত পথিকদের এগিয়ে যাওয়ার। দু- দিকের উঁচু জলের দেওয়াল আর তার মাঝের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলল কয়েক হাজার মানুষ। নাহ্, আর তাদের কোনো ভয় নেই। কারণ তারা এখন জেনেছে যে, তাদের সঙ্গে আছেন স্বয়ং সর্বশক্তিমান। যাদের পথ চালনা করছেন স্বয়ং তিনি, তাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা কি কারুর আছে?

পেছনে আসতে থাকা সৈনিকরা এসে থমকে দাঁড়াল এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে। অনেকেই ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু রামেসেস তখন রক্তের নেশায় অন্ধ। চিৎকার করে আদেশ দিল,

‘এগিয়ে চলো। এখন যে পিছু ফিরবে তাকে আমি নিজে হত্যা করব।’

বলেই নিজে ঘোড়া ছোটাল সমুদ্রের মাঝের রাস্তা ধরে। তার দেখাদেখি বাকিরাও এগোল। মিশরের সেনা যখন সমুদ্রের মাঝামাঝি, ঠিক সেই মুহূর্তে সমুদ্রের ওইপারের বালিতে পা রাখল শেষ হিব্রু। পরমুহূর্তে মিশরীয় সেনারা দেখল দু-পাশের জলের সুবিশাল দেওয়াল নেমে আসছে তাদের ওপর। কয়েক হাজার সৈনিকের শেষ মরণ আর্তনাদ চাপা পড়ল লোহিত সাগরের নোনা জলে। সলিলসমাধি ঘটল কয়েক হাজার মানুষের আর ফারাও রামেসেসের। অহংকারের ভারে তলিয়ে গেল একটা সাম্রাজ্য।

.

২০

বর্তমান সময়।

দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। আর মাত্র একদিনের রাস্তা কানেয়ান। ওই যে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট শহরটা। এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে বসেছে জ্যাক আর হূযনবাসীরা। জ্যাক একটা বড়ো পাথরে হেলান দিয়ে কিছুটা জল খেল হিপ ফ্লাস্ক থেকে। আয়সা এসে বসল তার পাশে।

‘কী ভাবছেন জ্যাক?’

হাজার পরিশ্রম আর ক্লান্তির এই পথ চলার মধ্যেও আয়সার মুখটা দেখে যেন বড়ো শাস্তি পায় জ্যাক। জ্যাক বলল,

‘ভাবছি যে আমার দেশে তো আমি এখন থেকে দেশদ্রোহী। আমি কোনোদিনই আর ফিরতে পারব না।’

‘আমি দুঃখিত, জ্যাক। আমাদের জন্য আপনি দেবদূত হয়ে এসেছেন। আপনার পরিবার? প্রিয় কেউ আছে দেশে?’

‘নাহ্। আমি একা। তাই আমার ফেরার কোনো তাড়া নেই।

কিছুক্ষণ চুপচাপ জ্যাক তাকিয়ে থাকে আয়সার দিকে। মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এই হাসির জন্য সব কিছু বাজি রাখা যায়। তার এই মুহূর্তে মনে হল যে, এই নারীর জন্যে সে সব কিছু করতে পারে।

‘কী দেখছেন জ্যাক?’

‘আচ্ছা, আরবিতে ‘আমি তোমায় ভালোবাসি। তোমার সঙ্গেই বাকি জীবনটুকু কাটিয়ে দিতে চাই’ এই কথাটা আমায় বলা শেখাবে?’

জ্যাকব মেয়েটার হাতটা শক্ত করে ধরল। আয়সা লাজুক ভঙ্গিতে হেসে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু জ্যাক তার রুক্ষ হাতে আয়সার হাতের মৃদু চাপ অনুভব করল। লজ্জা পেয়েছে খুব মেয়েটা। দ্রুত উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আয়সার হাত লেগে তার পাশেই রাখা জ্যাকবের কাঁধের ব্যাগটা পড়ে গেল মাটিতে। ব্যাগর চেন খোলা থাকায় কয়েকটা জিনিস গড়িয়ে পড়ল।

‘ওহ্। দুঃখিত জ্যাক।’

বলে আয়সা বসে জিনিসগুলো আবার ব্যাগে ভরে দিতে শুরু করল। হঠাৎই মাটিতে পড়ে থাকা একটা জিনিসের ওপর জ্যাকের দৃষ্টি আটকে গেল।

গ্রামের হাকিমের থেকে নেওয়া ঘুমের ওষুধের কৌটোটা ব্যাগ থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। এটা এখানে কীভাবে এল? রিফাতকে বলা ছিল যেন সে বিকেলে এসে ওর ব্যাগ থেকে ডাব্বাটা নিয়ে যায়। সে কি ফাঁকা কৌটোটা আবার রেখে দিয়ে গেছিল ব্যাগে?

কেমন একটা সন্দেহ হওয়ায় জ্যাক উঠে গিয়ে কৌটোটা তুলে নিল আয়সার হাত থেকে। খুলতেই চমকে উঠল জ্যাক। ডাব্বাটা এখনও পুরো ভরতি ঘুমের ওষুধে। একী! এগুলো এখানে? তাহলে রিফাত কি সেই রাতে আর্মিদের খাবারে ওষুধ দেয়নি? কিন্তু তাহলে সেই রাতে সবাই সময়মতো ওরকম গভীর ঘুমে কীভাবে ডুবে গেছিল? না না, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। রিফাত কি অন্য ওষুধ দিয়েছিল ওদের? ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

আয়সা ততক্ষণে সব গুছিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত থেকে ধুলো ঝাড়ছে। জ্যাক জিজ্ঞেস করল,

‘আয়সা। রিফাতকে দেখেছ? আমার সঙ্গেই তো ছিল।’

‘কে?’

‘রিফাত।’

‘বুঝলাম না। কার কথা বলছেন?’

‘আরে বাবা, আমি রিফাতের কথা বলছি। তোমাদের গ্রামের যে বোবা ছেলেটা। যে মরুভূমিতে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল আমাদের।’

আয়সা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জ্যাকবের দিকে। বলল,

‘জ্যাক। আমি জানি না আপনি কার কথা বলছেন। আমাদের পথ দেখিয়ে আপনি এনেছেন। তা ছাড়া, ওই নামে আমাদের গ্রামে কেউ নেই।’

‘কী বলছ তুমি আবোল-তাবোল? আরে, তুমি ছেলেটাকে সম্ভবত চেনো না। আরে, সেদিন মরুভূমিতে যে ছেলেটা সবার সামনে হাঁটছিল। যে ওই রাত্রে চোরাবালির মধ্যে পথ দেখাল।’

আয়সা আরও অবাক হয়ে উত্তর দিল,

‘জ্যাক, আমি গ্রামের সবাইকে চিনি। ওই নামে কেউ নেই। আমাদের গ্রামে কোনো বোবা ছেলে থাকে না। কী বলছেন আপনি এইসব? নিশ্চই আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমাদের সবার সামনে আপনিই ছিলেন সেই রাতে। আপনিই আমাদের চোরাবালির মাঝে পথ দেখিয়ে মরুভূমি পার করিয়েছেন। আপনার সঙ্গে বা আপনার সামনে আর কেউ ছিল না। আমার কথা আপনার বিশ্বাস না হলে আপনি অন্য যে কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।’

মাথাটা আবার ভোঁ-ভোঁ করা শুরু করেছে জ্যাকের। কী বলছে আয়সা? এর মানে কী? তবে কে, কীভাবে ঘুম পাড়াল গোটা আর্মি ক্যাম্পকে? কে এতদিন তাদের ক্যাম্পে রান্না করত? মরুভূমির নিশ্চিত মৃত্যু উপত্যকার মাঝে কে পথ দেখাল তাকে?

জ্যাক হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল রিফাতকে। কিন্তু, কেউ তার সন্ধান দিতে পারল না। সকলেই জানাল যে, ওই নামে তাদের দলে কেউ নেই।

অনেক খোঁজার পর একসময় জ্যাক দেখতে পেল রিফাতকে। একটা উঁচু পাথুরে টিলার ওপর দাঁড়িয়ে। তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। জ্যাক চড়তে শুরু করল টিলাটা। উত্তর তাকে পেতেই হবে।

টিলার ওপরে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যেন পার্থিব জগৎ থেকে অনেক দূরে বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানে এসে পৌঁছেছে জ্যাক। জ্যাক দেখল তার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে রিফাত। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে জ্যাককে দেখল ছেলেটা; দেখে মুচকি হাসল। জ্যাকের মাথায় যন্ত্রণা করছে। চারিদিকে ধুলোর ঝড় উঠেছে, অন্ধকার নেমে আসছে সূর্য ডুবে গিয়ে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না কিছুই। প্রশ্ন করল জ্যাক,

‘কে তুমি?’

ধুলোর মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছে ছেলেটার অবয়ব। এই প্রশ্নের উত্তর জ্যাক নিজেও জানে। হৃদয়ের ভেতর এর উত্তর বরাবরই জানত জ্যাক। চারিদিক থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে বহুদূর থেকে উত্তর ভেসে এল,

‘আমিই সে!’

.

Author’s Note

এটি আমার প্রিয় গল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই গল্পে এইটুকুই দেখাতে চেয়েছি যে, মসিহারা আলাদা কেউ নয়, তাঁরাও আপনার আমার মতোই মানুষ। তাঁদেরও মনে দ্বিধা থাকে, ভয় পায়। কিন্তু, যেদিন মানুষ দৃঢ়ভাবে ঠিক পথ চলা শুরু করে সেদিন ‘সে’ পথ দেখায়। মহাসাগরও সরে গিয়ে পথ করে দেয় সেইরকম মানুষদের জন্যে।

এই গল্পে বেশ কয়েকটা অন্যান্য ভাষার শব্দ ব্যবহার হয়েছে। সেগুলো পাঠকের সুবিধার্থে নীচে দিলাম:

1. রিহ-আল/ rih-al (Arabic)-যাত্রা। রাহিল (উর্দু)-পথ-প্রদর্শক।

2. EXODUS – হিব্রু বাইবেলের old testament-এর দ্বিতীয় Book of Torah একটি গল্প। শব্দের প্রচলিত মানে ‘যাত্রা/ এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়া।’

3. জয়স-ই-থাওয়ারা (Arabic) – বিপ্লবের সেনা। Jaysh – সেনা, Thawra – বিপ্লব।

4. কান্নান (Hebrew) / কানয়ান (Arabic) – মুক্তির বা স্বপ্নের দেশ। বাইবেলের Exodus-এর ক্ষেত্রে তা ইজরায়েল— ‘The Promised Land’.

5. রিফাত (Arabic)- ভাগ্যবান।

6. কাওয়াজা/Khawja (Arabic) – মহাশয় (বিদেশিদের সম্বোধনের জন্য।)

7. শুক্রান গিদান (Arabic)— অশেষ ধন্যবাদ।

8. হোরাস- প্রাচীন মিশরীয় দেবতা।

9. কারকাদান- আরব্য লোককথায় এরা মরুভূমির অপদেবতা। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী এদের গণ্ডারের মতো দেখতে। এই গল্পে অবশ্য তাদের অন্য রূপে দেখানো হয়েছে।

10. ইয়াহবি/ইয়াউয়ি/Yahweh (হিব্রু) — ঈশ্বরের হিব্রু নাম।

11. দেজা-ভ্যু/Deja-vu’ (French)— একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার অনুভূতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *