আগুন ঘিরে পাঁচজন – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

আগুন ঘিরে পাঁচজন

[বহু বছর আগে, জাপানের সামুরাই যোদ্ধারা সন্ধ্যার পর আগুন ঘিরে বসে গল্প বলত। সেই থেকেই বনফায়ার ঘিরে বসে ভৌতিক গল্প বলার চল আছে পৃথিবীর বহু দেশে। বাংলায় anthology গল্পের বড়ো অভাব। অথচ আমার এই ‘একের মধ্যে অনেক’ ব্যাপারটা বেশ লাগে।]

.

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, পায়ে হাঁটা সরু রাস্তাটা যেখান থেকে জঙ্গুলে পথ বেয়ে উঠে গেছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে অভিষেক। ফোনটা বের করে আরও একবার দেখল অভিষেক। নাহ্, সিগনাল বার-এ একটাও সোজা দাগ দেখা যাচ্ছে না। একদমই টাওয়ার নেই। ফোনটা মাথার ওপর ধরে চারিদিকে ঘুরিয়ে দেখল অভিষেক। যদি টাওয়ার লাগে কোনোদিক থেকে। লাভ হল না।

হাতের ঘড়ি বলছে সন্ধে সবে সাতটা। কিন্তু, ওদের এই পাহাড়ি শহরতলিতে এটাই যথেষ্ট রাত। চারিদিক নিঝুম হয়ে ওঠে সূর্যাস্তের পরেই। রাতপোকারা যেন পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে সন্ধে থেকেই ডাকতে শুরু করে।

একটু অধৈর্য হয় অভিষেক। যদিও তার কারণ নেই। ওর বন্ধুদের সাতটাতেই আসার কথা। ও নিজেও মাত্র আট মিনিট আগেই এসেছে। কিন্তু আইনস্টাইনের আপেক্ষিক সূত্র মেনেই এই সময়টুকু ওর কাছে অনেকটা দীর্ঘ মনে হচ্ছে।

একবার জঙ্গুলে পায়ে হাঁটা পাহাড়ি পথটা দেখল অভিষেক। অস্বস্তি হল ওর। মনে মনে ভাবল, ওর বন্ধুরা কি আদৌ আসবে? সবাই তো ভীতুর ডিম। ও নিজেও আর দশ মিনিট দেখে ফিরে যাবে কেউ না এলে।

অভিষেক ক্লাস টেনের পরীক্ষা দিয়েছে সবে। রেজাল্ট বেরোতে দেরি আছে। এই পাহাড়ি শহরে ও এসেছে চার বছর আগে, ওর বাবার বদলির চাকরির সূত্রে। ও চিন্তায় ছিল যে, ওর মতো আদ্যোপাস্ত শহুরে ছেলে এই অর্ধগ্রামীণ ছোটো শহরতলিতে বন্ধু পাবে কি না। কিন্তু, সে-সমস্যা হয়নি। এখানকার সরকারি স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভরাত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে চারজনের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। পরমব্রত, সৌর, শীর্ষ আর মিতালি। ক্রমেই অভিষেক বুঝতে পারে যে, ওর শহুরে স্কুলের চেয়েও এখানে বেশি মজা। তার কারণ বন্ধুরা প্রত্যেকেই ধারে- কাছেই থাকে। অতএব, স্কুলে ছুটির পরেও ওদের সঙ্গে হজ্জতি করতে অসুবিধে হয় না। ওর আগের স্কুলের বন্ধুরা দূর থেকে আসত স্কুলবাসে। তাই স্কুল ছাড়া তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু, এখানে বেশ মজা। মাঝে মাঝেই সবাই মিলে এক-একজনের বাড়িতে রাত কাটিয়ে আড্ডা মারা যায়। পরীক্ষার আগে গ্রুপ স্টাডি করা যায়। অভিভাবকরাও ব্যাপারগুলোতে প্রশ্রয় দেয়। শহরে যেমন শৈশব আর কৈশোর শুধু মুঠোফোনে বন্দি থাকে, এখানে মোটেই তা নয়। অনেকবার এর ওর বাড়িতে রাত জেগে আড্ডা দিয়েছে ওরা। কিন্তু এইবার অভিষেক যে প্রস্তাবটা দিয়েছিল সেটার মধ্যে আলাদা একটা অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি ছিল।

ক্যাম্প-ফায়ার। অভিষেক বলে রাত জেগে ক্যাম্প-ফায়ার করতে চায় ও। এবং সেটা করতে চায় টাকলা পাহাড়ের ওপরে। ক্যাম্প-ফায়ার নিয়ে সমস্যা না থাকলেও, জায়গাটা নিয়ে প্রথমেই কিন্তু বাকি তিনজন আপত্তি তুলেছিল। কারণ টাকলা পাহাড় নিয়ে এখানে অনেক গালগল্প আছে। ওরা ছোটো থেকেই শুনে আসছে যে, টাকলা পাহাড় নাকি পবিত্র স্থান। পাহাড়ি আদিবাসীদের বিশ্বাস যে মৃত্যুর পর সমস্ত আত্মা ওখানেই যায়। যদিও এগুলো শুধুই গল্প। টাকলা পাহাড় নিয়ে অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি কেউ হয়েছে, এমন শোনা যায় না। দিনের বেলা অনেকেই ওটায় ওঠে, কাঠকুটো আনতে বা এমনি ঘুরতে। ওরা প্রত্যেকেই বহুবার গেছে। তবে, সবই দিনের বেলা।

অভিষেক বলেছিল,

‘আরে, ধুর। রাত হলে তো এখানে এমনিতেই কেউ কোথাও যায় না। শুধু টাকলা পাহাড় কেন? কিন্তু ওর মতো পারফেক্ট ক্যাম্প-ফায়ার স্পট আর নেই।’

কথাটা অভিষেক ভুল বলেনি। টাকলা পাহাড় নামটা স্থানীয় লোকেরা দিয়েছে, কারণ পাহাড়টার ঢালে বনজঙ্গল থাকলেও, ঠিক মাথাটায় কিছুটা জায়গা জুড়ে গোলাকার ফাঁক। অনেকটা যেন মাথার ওপর টাক পড়েছে। ওখানেই ক্যাম্প- ফায়ার করা হবে বলে প্ল্যান অভিষেকের। তা ছাড়া, অন্যান্য ছোটো পাহাড়গুলোর চেয়ে টাকলায় ওঠা সহজ। পথ একদমই বেশি খাড়াই নয়। তাই শেষ পর্যন্ত ওদের রাজি করাতে পেরেছিল অভিষেক বিকেলে। বলেছিল,

‘তাহলে সন্ধে সাতটায় দেখা হচ্ছে। টাকলা পাহাড়ে চড়ার রাস্তাটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে, সেখানে। বাড়িতে আমরা বলব মিতালির বাড়ি থাকছি আজ রাতে। চলে আসিস সবাই যে যার জিনিসপত্র নিয়ে।’

আবার ঘড়ি দেখল অভিষেক। রেডিয়াম ডায়াল বলছে সাতটা বেজে সাত মিনিট। অভিষেকের আর ধৈর্য নেই। ধুর! ভীতুর ডিমগুলো এল না!

মনে মনে একবার বন্ধুদের উদ্দেশে গালি দিয়ে ফেরার উদ্যোগ নিল অভিষেক। সবে পেছন ঘুরছে ফিরবে বলে, তখনই পেছন থেকে ডাকল,

‘অভিষেক!’

চমকে পেছন ঘুরল অভিষেক। দেখল টাকলা পাহাড়ে যে পায়ে হাঁটা পথটা উঠে গেছে, সেটা ধরে একটু ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে চারজন। ওর চার বন্ধু।

‘আরে? তোরা কখন এলি?’

পাহাড় থেকে নামতে নামতে উত্তরটা শীর্ষ দিল,

‘আরে, আমরাই আগে এসেছি। একটু ওপরটা দেখতে গেছিলাম। তুই সাতটার আগে আসবি না জানি তো। ফোনে সিগনাল নেই, তোকে কল করতে পারছিলাম না।’

‘চলে আয়। টর্চ, খাবার সব এনেছি। তোর যা যা আনার, এনেছিস তো?’ প্রশ্নটা মিতালি করল, অভিষেক উঠতে উঠতে উত্তর দিল,

‘হ্যাঁ রে বাবা। সব আছে। চিপস, কোক সব।’

পাঁচজন জঙ্গুলে পথটা ধরে একে একে এগোতে শুরু করল টাকলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। টর্চের আলো আর পূর্ণিমার চাঁদের আলো পথ দেখাচ্ছে ওদের।

.

অভিষেকের বন্ধুরা ভুল বলেনি। ওরা আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। মাঝে এক জায়গায় কাঠকুটো স্তূপ করা এবং সেটা ঘিরে পাঁচটা বড়ো পাথর রাখা। পকেট থেকে লাইটার বের করে শুকনো পাতা আর কাঠের গাদায় আগুন দিতেই তাতে আগুন ধরল। দেখতে দেখতে আগুনের শিখা আকাশের দিকে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী হাত বাড়িয়ে দিল।

পাঁচজন পাঁচটা পাথরের ওপর বসেছে আগুন ঘিরে। অভিষেক মাথার হুডটা চড়িয়ে নিয়ে, আরও একটু আগুনের কাছে ঘেঁষে বসল। ঠান্ডাটা বেশ আরামদায়ক লাগছে এখন আগুনের কাছে বসে। ওর বন্ধুরাও মাথায় হুড টেনে বেশ আয়েশ করে বসেছে। অভিষেক বলল,

‘এক কাপ করে গরম কফি হয়ে যাক!’

‘অবশ্যই!’

‘হ্যাঁ। খুব ভালো হয়।’

অভিষেকের দায়িত্ব ছিল আজকের ক্যাম্পফায়ারে কফি আনার। থারমোস ফ্লাস্ক থেকে এক-একটা কাগজের কাপে কফি ঢেলে এগিয়ে দিতে থাকল বন্ধুদের দিকে। হাতে হাতে সেগুলো প্রত্যেকের হাতে পৌঁছোল।

গরম কফিতে চুমুক দিয়ে অভিষেক বলল,

‘কী রে? কেমন লাগছে? আমার আজকের প্ল্যানটা কেমন লাগছে বল?’

মিতালি উত্তর দিল,

‘খুব ভালো। তবে, আমার কিন্তু এখানে আসতে ভয়ই লাগছিল প্রথমে।’

‘কেন?’

উত্তরটা পরম দিল,

‘শুধু ওর না আমাদেরও একটু আপত্তি ছিল বই কী। কারণ এই টাকলা পাহাড় ঘিরে অনেক ভয়ের গল্প শুনেছি।’

অভিষেক উঠে দাঁড়িয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

‘তাহলে বন্ধুগণ! আসুন, আমরা ক্যাম্প-ফায়ারের সেই বহু প্রাচীন প্রথার সম্মান জানিয়ে শুরু করি আজকের আসর।’

শীর্ষ প্রশ্ন করল,

‘কী প্রথা?’

‘ক্যাম্পফায়ার টেলস! আগুন ঘিরে বসে প্রত্যেকে একটা একটা করে ভৌতিক গল্প বলবে একে একে। সেটাই তো নিয়ম। আর যেহেতু এই জায়গা ঘিরে অনেক ভৌতিক গল্প অলরেডি আছেই, তাহলে তো আর কোনো সমস্যাই নেই। শুরু কর একে একে।’

মিতালি বলল,

‘না, না। আমার ভয় করবে।’

‘আরে, ধুর! তুই একটা ভীতুর ডিম! এই শৌর্য, তুই শুরু কর।’

শৌর্য আপত্তির সুরে বলল,

‘আমিই কেন?’

‘কারণ তোর নামের লিটারাল মানে হল ‘সাহস’! হে হে হে! নামের মান রাখ। শুরু কর।’

শৌর্য তাও বলল,

‘ওসব গল্প তো আমাদের সবারই জানা।’

অভিষেক বলল,

‘আমি তো জানি না। শুরু কর।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে শৌর্য বলল,

‘আচ্ছা, বেশ। শোন তবে।

অনেক বছর আগের কথা। আমাদের এই শহরতলি আর আশেপাশের এলাকা জুড়ে হঠাৎ ছেলেধরার উপদ্রব শুরু হয়েছিল। বাচ্চা ছেলেদের তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ চাইত গুন্ডারা।’

‘এক সেকেন্ড। সে তো কিডন্যাপার। ছেলেধরা নয়।’

অভিষেক কথার মাঝে ব্যাঘাত করে বলল।

‘এই অভিষেক। অকারণ ইন্টারাপ্ট করিস না তো!’

মিতালির রাগত স্বর ভেসে এল। অভিষেক মুচকি হেসে বলল,

‘না, না। টেকনিক্যাল ভুল। ছেলেধরারা বাচ্চা বিক্রি করে দেয়। অপহরণকারী আলাদা, এরা মুক্তিপণ চায়।’

কেউ উত্তর দিল না। কেউ খুশি হয়নি বা ততটা মজা পায়নি কথাটায় মনে হল অভিষেকের। তাই নিজেই বলল,

‘আচ্ছা, আচ্ছা। আর কথা কাটব না। তুই বল।’

শৌর্য আবার শুরু করল,

‘যা বলছিলাম। আমাদের আশেপাশের এলাকায় অপহরণকারীর একটা দল সেইসময়ে শুনেছি খুব দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল। বিশেষ করে বড়ো শহরের বুকে। তবে, সেই উপদ্রব আমাদের ছোটো শহরটা অবধি পৌঁছোয়নি।’

কিন্তু সেটাও একদিন হল।

শুভ আর দেব দু-জন একইসঙ্গে ক্লাস সিক্সে পড়ত। আমাদেরই স্কুলে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা মারুতি ভ্যান ওদের পাশে দাঁড়ায়। দু-জন লোক সেটা থেকে নেমে এসে ওদের ধরতে যায়। ইউনিফর্মের জামার হাতা ছিঁড়ে যাওয়ায় দেব কোনোভাবে একজন লোকের হাত ফসকে বেরিয়ে গেলেও, শুভ ধরা পড়ে যায়।

দেব ভয়ে দৌড়োতে থাকে, কিন্তু একবার পেছন ঘুরেই দেখতে পায় যে, ওর বন্ধু শুভকে ওরা মুখে কাপড় দিয়ে, পাঁজাকোলা করে মারুতি ভ্যানে তুলছে।

বাড়ি এসে দেব সব কথা বলে নিজের বাবা-মাকে। ওর বাবা-মা তৎক্ষণাৎ‍ শুভর বাবা-মাকে ঘটনাটা জানায়।

এরপর পুলিশ আসে। দেব ওর ছেঁড়া জমা দেখিয়ে পুরো ঘটনাটা জানায়। পুলিশ তদন্ত শুরু করে। মারুতিটার রং ছিল সবুজ। অতএব, সেই রঙের মারুতির খোঁজে এই এলাকা ও আশেপাশের এলাকা পুলিশ তন্নতন্ন করে খোঁজে। কিন্তু, সেইরকম কোনো গাড়ির সন্ধান পায় না। পুলিশ বুঝতে পারে যে, একজন পালিয়ে গেছে দেখে নিশ্চয়ই অপহরণকারীরা গাড়ির রং বদলে ফেলেছে। দেব গাড়ির নম্বর দেখেনি, ওই অবস্থায় এইসব মাথায় না থাকাটাই স্বাভাবিক।

পুলিশ শুভর বাবা-মাকে বলে যায় যে, গুন্ডারা নিশ্চয়ই মুক্তিপণ চেয়ে ফোন করবে। তাই ওদের ফোন ট্যাপ করে রাখছে পুলিশ। এ ছাড়া যদি অন্য কোনো উপায়ে শুভর বাবা, মা-র সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, তবে যেন তৎক্ষণাৎ তাদের জানায় ওরা।

কিন্তু এরপর তিনটে দিন কেটে গেলেও, মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোন এল না। বা, শুভর বাড়ির লোকের সঙ্গে ছেলেধরারা কোনো যোগাযোগ করারও চেষ্টা করল না।

শুভর মা-বাবা উন্মাদের মতো একবার থানা আর একবার বাড়ি করতে থাকল। কিন্তু, কেউ কোনো সন্ধান দিতে পারল না। এদিকে এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় প্রায় অঘোষিত কারফিউ শুরু হয়েছে। কোনো বাবা মা তাদের বাচ্চাকে সাহস করে স্কুল পাঠায়নি এই তিনদিন। দেব তো সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত। ভয়ে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে মাঝে মাঝেই শুভর নাম চিৎকার করে উঠছে।

হবে নাই-বা কেন? ওরা দু-জন বরাবরের খুব কাছের বন্ধু। শুভ পরীক্ষায় প্রথম হয়, তো, দেব দ্বিতীয়। দু-জনই পড়াশোনায় খুবই ভালো।

তৃতীয়দিন রাতে তখন সবে ডিনার শেষ করে দেব আর ওর বাবা, মা, দিদি শুয়েছে। দেব আর দিদি এক ঘরে ঘুমোয়, তার পাশের ঘরে ওদের মা, বাবা।

হঠাৎ বাইরের দরজায় একটা টোকা দেওয়ার আওয়াজে ওদের ঘুম ভেঙে গেল। এত রাতে কে আসতে পারে ভেবে দেবের বাবা সঙ্গেসঙ্গে দরজা না খুলে প্রথমে ওপরের জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখতে গেল কে এসেছে। ততক্ষণে দেব, দিদি আর মা-ও এসে দাঁড়িয়েছে ওর বাবার পেছনে।

বাবা হাসিমুখে ফিরে বলল,

‘আরে, শুভ এসেছে!’

সবাই অবাক হল, শুভ এসেছে? ওকে ছেড়ে দিয়েছে গুন্ডারা? দেব বলল,

‘কে এসেছে?’

‘আরে, শুভ! নীচে দাঁড়িয়ে আছে! এই, শিগগির দরজা খুলে দাও ওকে। আমি শুভর বাড়ি ফোন করি!’

‘নাহ্!’

সবাইকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে উঠল দেব। প্রত্যেকেই অবাক হয়ে তাকাল ওর দিকে।

দেবের চোখে এক অজানা ভয় দেখে ওরা চমকে গেল।

দেব আবার বলল,

‘নাহ্! শু…শুভ আসতে পারে না!’

‘মানে? আরে, স্ট্রিটলাইটের আলো কম হলেও আমি কি শুভকে চিনতে ভুল করব? ওই তো দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।’

‘না! না! না!’

ছেলের আচরণে এবার বিরক্ত হয়েই দেবের বাবা বলল,

‘হয়েছেটা কী তোর? ওই তো শুভ! নিজেই দেখ না একবার জানলা দিয়ে উঁকি মেরে। তোর বন্ধু বাইরে দাঁড়িয়ে আছে!’

দেবকে কিছুটা টেনে এনেই জানলার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল ওর বাবা। স্ট্রিটলাইটের বাদামি আলোয় কুয়াশা ঢাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মূর্তিটাকে চিনতে অসুবিধে হল না দেবের। হ্যাঁ, ওটা শুভই। ওদের বাড়ির দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে ওর প্রাণের বন্ধু। ঘাড়টা একদিকে হেলে পড়েছে। শরীরে কেমন জানি একটা আড়ষ্ট ভঙ্গি।

ছিটকে পিছিয়ে আসতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ল দেব। ওর বাবা, মা, দিদি অবাক হয়ে শুধু দেখছে ওকে। বুঝতে পারছে না কেন দেব এতটা ভয় পেয়েছে। দেবের চোখে-মুখে আতঙ্ক ঢেউ তুলে খেলে বেড়াচ্ছে সেটা স্পষ্ট দেখছে সকলেই।

দেব নিজের মনেই বিড়বিড় করে কিছু অসংলগ্ন কথা বলে চলেছে,

‘ও…ও আসতে পারে না! শুভ খুব শয়তান। এতদিন…এতদিন ওর জন্যে আমি সেকেন্ড হয়েছি। ভাবলাম আ…আপদ গেল…।’

বাবা দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে ঝাঁপিয়ে বাবার পা টেনে ধরল দেব, ‘না! না! না! দরজা খুলো না! ওকে…ওকে ঢুকতে দিয়ো না! ও আমার জন্যে এসেছে। ও…ও আমায় মেরে ফেলবে।’

কিন্তু ততক্ষণে বাবা দরজা খুলে ফেলেছে।

দরজা খুলেই ছিটকে পিছিয়ে এল দেবের বাবা। কারণ দরজা খুলতেই দেখতে পেল যে, ঠিক ওদের দরজার বাইরে পড়ে আছে শুভর মৃতদেহ। চোখ খোলা, ঘাড় ভেঙে একদিকে বিশ্রীভাবে কাত হয়ে আছে। চোখ দুটো খোলা, তাকিয়ে আছে দেবের দিকে।

আর এক হাতে, মুঠো করে ধরা আছে এক টুকরো কাপড়, যেটাকে দেবের স্কুল ইউনিফর্মের জামার ছেঁড়া হাতাটা বলে চিনতে না পারার কোনো কারণ নেই।

রাতেই পুলিশ এল। শুভর বাবা, মা-ও এসেছিল। পুলিশ জানায় যে, গত কয়েক মাস যাবৎ অপহরণ চালাতে থাকা দলটা আজকেই ধরা পড়েছে। কিন্তু, এই এলাকার কোনো ছেলেকে তারা কখনো অপহরণ করেনি বলেই জানিয়েছে। শুভর লাশটা তিনদিনের পুরোনো। রিগর মর্টিসে শক্ত হয়ে গেছে, পচন শুরু হয়েছে।

সত্যি কথাটা ঘোর লাগা অবস্থায় দেবের মুখ থেকেই জানতে পেরেছিল সবাই টুকরো টুকরোভাবে। কারণ, দেব আর কোনোদিন স্বাভাবিক হয়নি। প্রচণ্ড আতঙ্কে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

মোট কথা পুলিশ যা তাদের কেস রিপোর্টে লিখেছিল যে, শুভ আর দেবের মধ্যে এক ধরনের রেষারেষি ছিল বরাবরই। কিন্তু সেটা বড্ড বেড়ে গেছিল ইদানীং। বরাবরই শুভ এক ধাপ এগিয়ে থাকত দেবের থেকে। সেটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই মনের গভীরে ঈর্ষা জমছিল দেবের। তাই সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ভুলিয়ে ও শুভকে খেলার জন্যে টাকলা পাহাড়ে নিয়ে যায়। শুভকে টিলার ওপর থেকে নীচের খাদে ধাক্কা দেয় দেব। যদিও পড়ার সময়ে, শুভর হাতে দেবের জামার হাতা ছিঁড়ে আসে। সেখানে পড়ে, ঘাড় ভেঙে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় শুভর।

বাড়ি এসে শুভ ঠিক সিনেমার মতো একটা অপহরণের গল্প বানিয়ে বলে। আগেই ভাবা ছিল পুরোটা ওর। বড়োদের মুখে শুনেছিল যে, আশেপাশে কিডন্যাপিং চলছে। ভেবেছিল গল্পটা বললে সবাই বিশ্বাস করবে, সবাই সত্যিই তাই বিশ্বাস করেও নিয়েছিল। শুভর লাশ কেউই খুঁজতে যেত না এই টাকলা পাহাড়ের খাদে।

কেউ সম্ভবত ব্যাপারটা দেখে নিয়েছিল। তাই তিনদিন পর রাতে, লাশ তুলে এনে দেবদের বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায়।

অস্তত রিপোর্টে এই লিখে ফাইল বন্ধ করেছিল পুলিশ। কিন্তু বাস্তবে থেকে গেছিল অনেক প্রশ্ন।

কে খাদ থেকে তুলে আনল শুভর মৃতদেহ? কীভাবে তুলে আনল? আর, সেদিন তবে দেব আর ওর বাবা দু-জনেই ওদের বাড়ির দরজার বাইরে কীভাবে দেখেছিল শুভকে দাঁড়িয়ে থাকতে?

অনেকেই বলে এই পাহাড় মায়াবী। এই টাকলা পাহাড়ের মায়ায় শুভর লাশ খাদ থেকে উঠে এসেছিল সেই রাতে। নিজের খুনের প্রমাণ দিতে ও ফিরে এসেছিল দেবের বাড়ির দরজায়।

একটানে গল্প শেষ করে চুপ করল শৌর্য। গল্প শেষ হতেই এক দমকা ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এসে কাঁপিয়ে দিল অভিষেককে। দক্ষিণ থেকে আসল হাওয়াটা। সেদিকেই টাকলা পাহাড়ের খাদটা। গল্পটা অনুযায়ী ওই খাদেই পড়ে ঘাড় ভেঙে গেছিল শুভর। আর ওখান থেকেই, খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে এসেছিল…।

অভিষেক খানিকটা কেঁপে উঠল। নিজের মনকে সান্ত্বনা দিল যে, সেটা শুধুমাত্র ঠান্ডার কারণেই। অন্য কোনো কারণ নেই।

নিস্তব্ধতা ভাঙতেই অভিষেক বলল,

‘দেবের কী হয়েছিল?’

শৌর্য বলল,

‘ওকে পুলিশ ধরেনি। আসলে বাচ্চা ছিল। সাজা কিছু দেওয়াও যেত না। আর তার প্রয়োজনও ছিল না। ও পাগলা হয়ে গেছিল সেই রাতের পর থেকে। এই পাহাড়ের রাস্তার পাশের বটতলায় একটা পাগলা মাঝে মাঝে থাকে দেখেছিস?’

‘হ্যাঁ। নিজের মনেই বিড়বিড় করে। তুই কি বলতে চাস ওই লোকটাই…’

কথা মাঝখানে কেটে দিয়ে শৌর্য বলল,

‘পাগলটা বিড়বিড় করে কী বলে শুনেছিস কখনো? কান করলে শুনতে পাবি, ও বলে, ‘স্কুল থেকে আমায় জ্বালিয়ে গেলি শয়তান ছেলে! বেঁচে থাকতে বেশি মার্কস পেয়ে আমায় বিরক্ত করেছিস। ভাবলাম কেউ খুঁজে পাবে না খাদের নীচে তোকে। কিন্তু, তুই বেটা ঠিক উঠে এলি আমার বাড়ির দরজা অবধি! হাড়বজ্জাত ছেলে তুই!’

.

কিছুক্ষণ কেউই কোনো কথা বলল না। অভিষেক আরও এক কাপ কফি ঢেলে বাকিদের অফার করল। কিন্তু, কেউই নিল না।

‘তো, এরপর কে বলবে?’

অভিষেকের কথার উত্তর দিল না কেউ। অভিষেক নিজেই বলল,

‘এই মিতালি, এবার তুই বল।’

মিতালি কিছুক্ষণ ভেবে শুরু করল,

‘এই ঘটনাটা বেশিদিন আগের নয়। মাত্র কয়েক বছর আগের। আমাদের এই পাহাড়ি টাউনটা যেহেতু খুব সুন্দর, মাঝে মাঝেই টুরিস্ট চলে আসে। যদিও এটা কোনো টুরিস্ট ডেস্টিনেশন নয়, কিন্তু, কেউ কেউ অচেনা জায়গায় অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় এখানে আসে।

কয়েক বছর আগে সেরকমই একটা দল একটা মিনিবাসে করে এখানে আসে। ওই একবেলার মতো পিকনিক করে চলে যাবে আর কি। শহুরে মানুষ সব। বেশিরভাগ বাঙালিও নয়।

পিকনিক স্পট খুঁজতে গিয়ে তারা এই, এই জায়গাটাই খুঁজে পেল। ওরা এখানে উঠছে দেখে স্থানীয়রা বারণ করল। কিন্তু যথারীতি ওরা শুনল না। গ্রাম্য লোকেদের বোকা বা কুসংস্কারগ্রস্ত ভাবার অভ্যাস শহুরে লোকেদের থাকেই। সে ছোটো শহরের লোকেরা যতই শিক্ষিত হোক না কেন।

টাকলা পাহাড়ের উত্তরের জঙ্গলের মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় রান্নার সরঞ্জাম নামিয়ে দুপুর থেকেই রান্না শুরু করে দিল। ওই দলটার সঙ্গে কয়েকটা বাচ্চাও ছিল। মোট সাতটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে। তারা এই পাহাড়ের গা বেয়ে হুটোপুটি করে বেড়াতে লাগল। খেলতে খেলতে কখন যে এই চুড়োয় এসে পৌঁছে গেল তাদের খেয়াল ছিল না।

এখানে এসে ওরা ঠিক করল লুকোচুরি খেলবে। একজন ওদের খুঁজবে, বাকিরা লুকোবে।

পিঙ্কি একটা গাছের আড়ালে লুকোল। খুব উত্তেজিতভাবে হাসি চেপে লুকিয়ে আছে পিঙ্কি। তাড়াহুড়োয় কে যে ‘পুলিশ’ হয়েছে সেটাই ওর শোনা হয়নি। দরকার ও নেই। যে ‘পুলিশ’ হয়েছে সে-ই খুঁজে বের করুক সবাইকে। খালি সে নিজে প্রথমবার ধরা না পড়লেই হল। তাহলে আবার ওকে পরেরবার ‘পুলিশ’ হতে হবে।

পিঙ্কি খেয়াল করল চারপাশে কেমন জানি ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে গেছে। মেঘ নেমে এসেছে নাকি? নাকি কুয়াশা? পিঙ্কি স্কুলের বইয়ে পড়েছে যে, পাহাড়ি অঞ্চলে আবহাওয়া খুব দ্রুত বদলে যায়। এখানেও কি সেইরকম কিছু হল? আচ্ছা, যদি বৃষ্টি নেমে যায়? যদি ওরা আটকে যায় বৃষ্টিতে? তাহলে কী হবে?

‘ধাপ্পা!’

পিঙ্কি নিজের চিন্তায় এতটাই ডুবে ছিল যে, হঠাৎ কানের কাছে এটা শুনে চমকে উঠল! তাকিয়ে দেখল সানি ওর দিকে আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে আছে। মানে, ওর মনে হল এটা সানিই হবে। কারণ, কুয়াশায় শুধু অবয়বটা দেখা যাচ্ছে। এটা রাহুলও হতে পারে। সানি আর রাহুল দু-জনের একইরকম হাইট আর চেহারা।

‘ধুর! ধরা পড়ে গেলাম! ইস! টেরই পাইনি। এই সানি, আমিই কি প্রথম?’ উত্তরে হিহি হেসে সানি ওকে ওর পিছু পিছু আসতে বলে দৌড় দিল। পিঙ্কি ওর পিছু নিল। কুয়াশা থাকলেও ওর পেছনে পেছনে দৌড়োতে অসুবিধে হচ্ছে না। পিঙ্কি মনে মনে আফশোস করছে। ইসস! ফালতু দাঁড়িয়ে চিন্তা করতে গিয়ে খেয়াল করল না যে, পুলিশ এসে গেছে কাছে। পায়ের আওয়াজ কান করে শুনলেই খেয়াল করতে পারত। তখন পালিয়ে অন্য জায়গায় লুকিয়ে যেতে পারত বেশ সহজেই। এই ঘন কুয়াশায় ওকে এত সহজে মোটেই খুঁজে পাওয়া যেত না যদি ও একটু সতর্ক থাকত। ধুর ধুর! এবার ওকে পুলিশ হতে হবে আর সবাইকে খুঁজতে হবে পরেরবার

সানি দাঁড়িয়ে পড়ে আঙুল দিয়ে পিঙ্কিকে একটু এগিয়ে যেতে বলেই নিজে উলটোদিকে কুয়াশায় দৌড় দিল। বাকিদের খুঁজতে গেল।

পিঙ্কি একটু এগিয়ে যেতেই কুয়াশা পাতলা হয়ে এল। মাঝের ফাঁকা জায়গাটায় কুয়াশা নেই একদম। পিঙ্কি এগিয়ে গিয়ে দেখল সেখানে সানি দাঁড়িয়ে আছে।

‘এ কী! তুই? আমি তো ভাবলাম তুইই পুলিশ হয়েছিস।’

‘আরে, না না। আমি না। রাহুল পুলিশ হয়েছে। ওটা রাহুল নিশ্চয়ই।’

‘ওহ্, তাই হবে। যাক! আমি বেঁচে গেছি। তুই আগে ধরা পড়েছিস, মানে এরপরের রাউন্ডে তুই পুলিশ। হিহি!’

সানি মুখ ব্যাজার করে একটা ভেংচি কাটল।

‘কিন্তু আমরা কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকব? সবাইকে খুঁজতে রাহুলের অনেক সময় লাগলে?’

কিন্তু ওদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। একটু বাদেই রুমকি এল। সে পিঙ্কিকে দেখে বলল,

‘ওহ্ পিঙ্কি, তুই এখানে? আমি তো ভাবলাম তুই ‘পুলিশ’। তাহলে নিশ্চয়ই মুনিয়া পুলিশ।’

‘না, না। রাহুল পুলিশ।’

‘ধুর। কী যে বলিস। যে পুলিশ সে মেয়ে।’

এরপর একে একে এল টুনাই, তারপর রাহুল, তারপর গৌরব এবং তারপর মুনিয়া।

কুয়াশার মাঝে গোলাকার ফাঁকা সমতল জায়গাটায় এসে জড়ো হয়েছে বাচ্চারা একে একে। সবাই হাসছে। খুব মজার খেলা হয়েছে। পরেরবার সানি পুলিশ হবে খেলায়, তাই বেচারা মুখ ব্যাজার করে আছে।

হাসির মাঝেই হঠাৎ বাবাই বলল,

‘আচ্ছা, আমরা তো এখানে…এক….দুই… তিন…চার….পাঁচ… ছয়….সাত…. একী? আমরা তো সবাই এখানে আছি। তাহলে আমাদের খুঁজল কে?’

‘কে পুলিশ হয়েছিল?’

প্রত্যেকেই একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। কেউই ঠিক করে মনে করতে পারছে না।

কিন্তু…কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব? ওরা যদি সবাই এখানে থাকে…তবে…

চারিদিকে ঘিরে থাকা কুয়াশার মধ্যে থেকে বাচ্চার খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে এল। এক নয়, একাধিক। যেন কুয়াশার মাঝে লুকিয়ে একদল বাচ্চা তাদের নিয়ে হাসছে। হাসির শব্দগুলো কেমন জানি অস্বাভাবিক। শুনলে…শুনলে ঘাড়ের লোম খাড়া হয়ে যায়।

ভয় পাচ্ছে ওরা সাতজন। খুব ভয় পাচ্ছে! কুয়াশা ঘন হয়ে আসছে… মাঝের ফাঁকা বৃত্তটা ক্রমশ ছোটো হয়ে আসছে। কুয়াশা ঘনিয়ে আসছে, আর সেই অদ্ভুত অস্বাভাবিক হাসিও এগিয়ে আসছে চারিদিক থেকে। কাছে আসছে ওরা।

সাতজন এখন ঘন হয়ে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কুয়াশা ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলছে আকাশ। তখনই, ঠিক সেই মুহূর্তে, পিঙ্কি ওর কাঁধের কাছে একটা ঠান্ডা নিশ্বাস টের পেল। ওর কানের একদম কাছে, কুয়াশার মধ্যে থেকে মুখ বাড়িয়ে বলে উঠল,

‘ধাপ্পা!’

.

‘তারপর?’

কথা থামাতেই অভিষেক জানতে চাইল। এতক্ষণ একমনে মিতালির গল্প শুনছিল সবাই। মিতালি উত্তরে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

‘যতদূর জানি, বাচ্চাদের চিৎকার শুনে পিকনিক পার্টিরা সেখানে চলে আসে। সব শুনে সেই মুহূর্তে সবাই টাকলা পাহাড় ছেড়ে পালিয়ে যায়।’

অভিষেক নিঃশব্দে কফিতে চুমুক দিল। ওর গায়ের লোম এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ও নিশ্চিত বাকিদেরও একই অবস্থা। তবে বাকিরা বোধ হয় এই সব গল্পই আগে থেকে জানে। অভিষেকই প্রথমবার শুনছে। বিশেষ করে, টাকলা পাহাড়ের ওপর বসে এই পাহাড় ঘিরে গজিয়ে ওঠা কিংবদন্তির গল্প শুনতে গিয়ে ওর সত্যিই গা শিরশির করছে। ঘড়ির রেডিয়াম ডায়াল বলে দিচ্ছে সময় সাড়ে আটটা। এখনও রাতের খাবার খেতে অনেকটা দেরি।

আগুনটা নিভে আসছে দেখে আরও কিছুটা কাঠ আগুনে দিল ও। শুকনো কাঠগুলো আগুনের স্পর্শ পেতেই জ্বলে উঠল।

‘তা এরপর? পরম, নাকি, শীর্ষ?’

পরম হাত তুলে বলল,

‘পরেরটা আমি বলতে চাই। শীর্ষর যদি আপত্তি না থাকে।’

শীর্ষ একবার শুধু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল কোনো সমস্যা নেই।

পরম শুরু করল,

‘টাকলা পাহাড়ে ঠিক কী আছে, বা, কারা আছে তা কেউ জানে না। তবে, কিছু একটা আছে এটা সবাই জানে। তাই এখান থেকে একটা পাথরের টুকরোও কেউ নিয়ে যায় না বাড়ি। কিন্তু বহু বছর আগে একজন এখান থেকে একজনকে নিয়ে গেছিল। আমি সেই ঘটনাই বলব।

সামিয়া বিবি আর ওর বর আবদুল এই এখানে থাকতে এসেছিল তখন নতুন নতুন। তখন এটা একেবারেই গ্রাম। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে যেমন এইসব জায়গা ছিল আর কি। তারা কেন এসেছিল, বা, কোথা থেকে এসেছিল, জানা নেই। এ গল্পের জন্যে তা জানার কোনো প্রয়োজনও নেই।

আবদুল আর সামিয়া বিবি এখানে এসে বাসা বানিয়েছিল এই টাকলা পাহাড়ের কাছেই কোনো এক জায়গায়। আবদুল আর সামিয়া বিবির একটি মেয়ে ছিল। নাম ছিল আমিনা। বাচ্চা মেয়েটা ছিল বোবা। বড়োজোর আট কি ন-বছর হবে বয়স। গ্রামের লোকেদের বারণ শুনে আবদুল আর তার বিবি টাকলা পাহাড় থেকে দূরেই থাকত। কিন্তু আমিনা? সে নিষেধ শুনবে কেন? নিষেধের গণ্ডির প্রয়োজনীয়তা বাচ্চারা ও বোকারা বোঝে না। তাই আমিনা মাঝে মাঝে খেলতে খেলতে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে পড়ত।

এরকমই একদিন বিকেলের দিকে আমিনাকে না পেয়ে ওর মা সামিয়া বিবি ওকে খুঁজতে লাগল আশেপাশে। ‘আমিনা, এ আমিনা!’ যদিও সামিয়া ভালোই জানে যে, মেয়েকে ডেকে লাভ নেই। সে শুনতেও পায় না, আর পেলেও উত্তর দিতে পারবে না।

খুঁজতে খুঁজতে সামিয়া উঠে এল পাহাড়ে। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। তবে আলো আছে তখনও। সামিয়া এসে দেখল, আমিনা ওই মরা গাছের নীচে চুপ করে বসে আছে। গাছের খুপরির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

অভিষেক একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের গাছটা দেখে নিল। এই টাকলা পাহাড়ের ওপরে এটা একটামাত্র গাছ। মানে কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক সময়ে হয়তো এটা গাছ ছিল, এখন শুধুই একটা বড়ো কাঠের কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গাছটা যে কীসের, তা আজকে আর বলা সম্ভব নয়। কেমন যেন গাঁটগাঁট সারা গা জুড়ে যেন কাঠের ওপর খোদাই করা কোনো ব্যায়ামবীরের মাংসপেশি। আর মাঝ বরাবর একটা বড়ো ফোকর আছে। যেন কাঠ সরে গিয়ে একটা কালো গর্ত সৃষ্টি করেছে।

গাছটা দেখলেই কেমন জানি অস্বস্তি হয়। পরমের গল্পে যে এই গাছের কথাই ও বলছে তাতে সন্দেহ নেই। এখানে এরকম গাছ একটাই আছে।

পরম বলতে শুরু করল আবার,

‘আমিনা তাকিয়ে কিছু যেন দেখছে ওই গাছের দিকে। ওই ফোকরের দিকে তাকিয়ে ছিল একদৃষ্টিতে। সামিয়া বিবি গিয়ে ওর কাঁধে হাত রাখতে আমিনা ঘুরে তাকাল। ইঙ্গিতে সামিয়া রাগ প্রকাশ করে বলল,

‘তোকে বারণ করেছি না এখানে আসতে? খুব ধিঙ্গি হয়েছ! এবার আব্বুকে বলে মার খাওয়াতে হবে একদিন।’

আমিনা আবার মায়ের দিক থেকে ঘাড় ফিরিয়ে গাছের দিকে তাকাল। সামিয়া বিবি তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল গাছের ফোকরটার দিকে। কিন্তু সেখানে বহু যুগের আলো না লাগা অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না।

‘চল! চল বাড়ি। সন্ধে হয়ে এল।’

মেয়ের হাত ধরে টান দিয়ে সামিয়া বিবি পাহাড় থেকে নেমে ঘরের পথ ধরল।

সামিয়া বিবি বাড়ি ফিরে লক্ষ করেছিল যে, মেয়ের মধ্যে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। কেমন জানি জবুথবু হয়ে জানলা দিয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে রইল আমিনা। তবে সেই ব্যাপারটা পাত্তা দেয়নি।

আবদুল কাজ সেরে বেশ দেরিতে বাড়ি ফিরত। তাই সামিয়ার অভ্যাস ছিল। সন্ধেবেলা মেয়েকে দুটো মুড়ি দিয়ে, নিজে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া। সে নিজেও ঝুড়ি বানায় পাট দিয়ে। সেও সারাদিন কাজকম্ম করে ক্লান্ত থাকে। বরেরও আগে সেই ভোর তিনটেয় তাকে উঠে উনুনে আঁচ দিতে হয়। রাতের মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুম তার পক্ষে কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। তাই সন্ধ্যাবেলা বর ফেরার আগে একটু ঘুম।

আজকে কিন্তু ঘুমটা ঠিক এল না। ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম হল। একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল সামিয়া। দেখল তার মেয়ে টাকলা পাহাড়ে খেলা করছে। সে গিয়ে ডাক দিল ‘আমিনা! আমিনা’ বলে। মেয়েকে বকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এল ঘরে। ঠিক যখন দরজা দিয়ে ঢুকতে যাবে, হঠাৎ স্পষ্ট একটি মেয়ের গলায় কেউ ডেকে উঠল পেছন থেকে,

‘মা!’

সামিয়া পেছন ফিরতে দেখল খানিক দূরেই, টাকলা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমিনা।

কিন্তু…কিন্তু তা কী করে হয়? ওখানে কীভাবে আমিনা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে?

থাকলে এখন যার হাত ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে? সে কে?

সামিয়া টের পায় তার হাতের মুঠো খুলে গেলেও তার হাত ধরে আছে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সে। এবং, সে তার হাতের ওপর চাপ প্রতি মুহূর্তে ক্রমশ বাড়াচ্ছে! তীব্র আতঙ্কে তার হাত ধরা মেয়েটির দিকে তাকায় সামিয়া….!

‘আরে, ও আমিনার মা! সামিয়া বিবি, কত ঘুমোবে?’

আবদুলের ডাকে ঘুম ভেঙে যায় সামিয়া বিবির। সেকী! আজ সে এতক্ষণ ঘুমিয়ে পড়েছিল? সন্ধ্যা গড়িয়ে যে রাত হয়ে গেল। উনুন জ্বালানো হয়নি এখনও।

দ্রুত উঠে দরজা খুলে দিতে আবদুল ঢুকল। বউকে দেখে জিজ্ঞেস করল,

‘কী হয়েছে আমিনার মা? মুখটা ওরকম কেন? শরীর খারাপ নাকি?’

‘না, না। একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছিলাম।’

স্বপ্নের কথা ভাবতেই মেয়ের কথা মনে পড়ল সামিয়া বিবির। সেদিকে ফিরে দেখল মেয়ে এখনও একইভাবে শীতলপাটির ওপর বসে জানলা দিয়ে একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। অন্ধকার চারিদিকে, বাইরে আরও বেশি। আজ হ্যারিকেনটা পর্যন্ত জ্বালা হয়নি। সেই অন্ধকার ভেদ করে আমিনার দৃষ্টি কী দেখছে কে জানে।

দ্রুত হ্যারিকেনে আগুন দিয়ে মেঝেতে রাখল সামিয়া বিবি। আবদুল টিউবকল থেকে জল তুলে হাত-পা ধুতে গেছে। মেয়ের কাছে এসে দেখল পাথরের বাটিতে মুড়ি শুটো হয়ে মিইয়ে গেছে। আমিনা একটাও দাঁতে কাটেনি।

মেয়ের দিকে তাকিয়ে কেন জানি অস্বস্তি হল সামিয়ার। চোখগুলো কেমন চকচকে। জ্বর এল নাকি?

মেয়ের কপালে হাত দিতেই চমকে উঠল সামিয়া। কই জ্বর? এ যে বরফের মতো ঠান্ডা!

আরও একটা জিনিস সামিয়া বিবির মনে হল। নিশ্চয়ই তার মনের ভুল। কিন্তু তার যেন মনে হচ্ছে আমিনাকে সে একবারও চোখের পলক ফেলতে দেখেনি।

‘চুলা জ্বাললে গো আমিনার মা?’

আবদুলের কথায় আবার চিন্তার জালে ছেদ পড়ল তার। দ্রুত উঠে গিয়ে উনানের সামনে বসল আঁচ দিতে।

সেই রাতে আমিনাকে কিছু খাওয়ানো গেল না। হাত নাড়িয়ে মা-বাবা দু- জনেই তাকে অনেকবার জিজ্ঞেস করল যে, তার কী হয়েছে। কিন্তু আমিনা কোনো উত্তর দিল না।

শেষে হাল ছেড়ে তারা শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে অবধি সামিয়া বিবি দেখল তার মেয়ে চোখ খুলে, ঘাড় ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিয়া যেন মুহূর্তে বুঝতে পারল সে কীসের দিকে তাকিয়ে আছে। টাকলা পাহাড়ের দিকে। ওই জানলা দিয়ে সোজা দেখা যায় সেটা।

চোখ যায় তার নিজেরও সেদিকে। এই অন্ধকারেও কীভাবে জানি পাহাড়টা এখন দেখা যাচ্ছে। কেমন একটা অদ্ভুত লালচে আভা ঢেকে রেখেছে পাহাড়টাকে। ওটা কি চাঁদের আলো? কিন্তু চাঁদের আলো কি ওরকম লাল হয়? বা, শুধু পাহাড়টাকেই কেন আলোকিত করছে?

সেদিকে দেখতে দেখতেই কখন যে সামিয়া নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছিল তার খেয়াল নেই। আবদুল তো অনেক আগেই নাক ডাকা শুরু করেছে।

রাত তখন গভীর। হঠাৎ একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল সামিয়ার। চোখ খুলে দেখল মেয়ে সোজা হয়ে উঠে বসে আছে তার পাশে। দৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে। কেমন একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ যেন চারপাশে। তাই তো! একটাও ঝিঁঝি পোকা ডাকছে না। খোলা জানলা থেকে এই গরমে ভেসে আসা বাতাসও যেন থামিয়ে দিয়েছে নিজেদের গতি। অদ্ভুত একটা গুমোট নিস্তব্ধ চারিদিক। সামিয়া বিবির চোখ চলে গেল জানলা দিয়ে বাইরে।

‘আমিনার বাবা! ও আমিনার বাবা!  শিগগির ওঠো!’

চোখ মুছতে মুছতে আবদুল ঘুম থেকে উঠে বসল,

‘কী? কী হল?’

‘ও…ওটা কী? ওগুলো কারা?’

সামিয়া বিবির তুলে ধরা আঙুল বরাবর বাইরে তাকাতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল আবদুলের। ও কি এটা ঠিক দেখছে? এ অবিশ্বাস্য দৃশ্য কি বাস্তবেই ঘটছে?

জানলার বাইরে তাকিয়ে দু-জনেই দেখতে পাচ্ছে সেই গাছটা! হ্যাঁ, টাকলা পাহাড়ের ওপরের সেই অদ্ভূত মরা গাছটা এখন ওদের মাটির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! যেন সৃষ্টির আদিযুগ থেকে সেটা এখানেই ছিল! কিন্তু তারা জানে যে, এই গাছটা এখানকার নয়, সম্ভবত এই জগতেরই নয়! কারণ জাগতিক কোনো গাছ কি পাহাড় বেয়ে নেমে আসতে পারে?

প্রচণ্ড ভয়ে কাঠ হয়ে বসে ছিল দু-জন। এই ঘন অন্ধকারে কোন উপায়ে এই গাছটা বাইরে তারা দেখতে পাচ্ছে তা ওদের জানা নেই। একটা রক্তাভ অন্ধকার যেন শুধু ওদের দৃষ্টিতেই এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎই তারা আরও একটা জিনিস খেয়াল করল। মরা গাছটার কোটরটা থেকে এক দলা অন্ধকার যেন খসে পড়ল। পড়েই ঠিক বড়ো ইঁদুরের মতো নড়েচড়ে ছুটে গেল একদিকে। তারপর আরও একটা, তারপর আরও একটা…। একের পর এক অন্ধকার দিয়েই নির্মিত কায়াহীন জীব বেরিয়ে আসছে ওই গাছের কোটর থেকে! ঘিরে ফেলছে তাদের কুটিরটা। ভিড় জমে যাচ্ছে জীবন্ত অন্ধকার প্রাণীগুলোর ওদের ঘরের চারিদিকে।

প্রচণ্ড আতঙ্কে জানলা আটকে দিল আবদুল। বাইরের লালচে আভা ঘরে ঢোকা বন্ধ হতেই ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। আর সঙ্গেসঙ্গেই একটা অদ্ভুত অপার্থিব সুরে কেঁদে উঠল আমিনা! এরকম অদ্ভুতভাবে, অদ্ভুত আওয়াজ করে কোনোদিন কাউকে কাঁদতে শোনেনি আবদুল বা সামিয়া।

‘আলো জ্বালো।’

আবদুল বলল। সামিয়া বিবি গিয়ে হ্যারিকেন জ্বালল। আবদুল জিজ্ঞেস করল, —ও…ওই গ…গাছ এখানে কেন? ওই পাহাড়ে কি তুমি…?’

‘আমিনা খেলতে খেলতে চলে গেছিল। ওকে নিয়ে এসেছি বিকেলে।’

আমিনা একইভাবে অদ্ভুত সুরে কেঁদে চলেছে এখনও। বাইরে থেকেও দেওয়ালে ধাক্কার শব্দ হচ্ছে।

আবদুল মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। হঠাৎই সামিয়া লক্ষ করল তার স্বামীর চোখের দৃষ্টিতে ভয় ফুটে উঠল। আর পরমুহূর্তে একটা অদ্ভুত কাজ করল আবদুল।

ছুটে গিয়ে মেয়েকে ছোঁ মেরে মাটি থেকে তুলে নিল। তারপর সামিয়া কিছু বোঝার আগেই দরজা খুলে আমিনাকে বাইরে বের করে দিয়ে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল।

‘হায়, হায়’ করে ছুটে গেল সামিয়া!

‘আরে, এ কী করো তুমি? এ কী করলে তুমি? আমাদের মেয়েকে ওদের হাতে দিয়ে দিলে?’

মুখ চেপে ধরল আবদুল তার বিবির। ঠোঁটে হাত দিয়ে তাকে চুপ করতে ইশারা করে বলল,

‘এ কী করেছ, সামিয়া বিবি? মেয়ে মনে করে কাকে তুলে এনেছ?’

‘মানে?’

‘ও আমাদের মেয়ে নয়!’

‘ও আমাদের মেয়ে নয়?’

‘না, না। ও…ও ওদেরই কেউ! দেখতে আমাদের মেয়ের মতো। তার রূপ নিয়েছে। ওরা…ওই ওরা ওকেই নিয়ে যেতে এসেছে!’

‘কিন্তু…কিন্তু কীভাবে বুঝলে ও আমাদের মেয়ে নয়?’

‘কারণ…কারণ হ্যারিকেনের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম গো, সামিয়া বিবি। ও মেয়ের দুটো ছায়া পড়ছে! আমাদের দু-জনেরই হ্যারিকেনের আলোয় একটা করে ছায়া পড়ছে। ওই…ওর যে দু-দুটো ছায়া পড়েছিল গো!’

‘কিন্তু…কিন্তু, তবে আমাদের মেয়ে?’

‘জানি না! জানি না! আল্লার কাছে প্রার্থনা করো, যেন নিজেদের লোককে ফেরত পেয়ে, ওরা আমাদের মেয়েকে ফিরিয়ে দেয়।’

বাইরের দাপাদাপি বন্ধ হয়েছে। তবুও দরজা খোলার, বা, কথা বলারও সাহস ওদের হল না আরও বেশ কিছুক্ষণ।

বাইরে মোরগের ডাক শুনে বুঝতে পারল সকাল হয়েছে। দরজা খুলতে দেখল আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে। কোথায় সেই মরা গাছ? কোথায় সেই অন্ধকারের জীবদের ভিড়? যেন পুরোটাই একটা দুঃস্বপ্ন। তবে আমিনা, বা, যাকে তারা আমিনা ভেবেছিল, সে নেই। ওরা নিয়ে গেছে তাকে নিজেদের সঙ্গে।

আবদুল আর সামিয়া দৌড়োল টাকলা পাহাড়ে।

ওপরে পৌঁছে দেখতে পেল এই মরা গাছ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যেমন সারাজীবন ছিল। আর তার সামনেই ঘুমিয়ে আছে আমিনা।

ডাকাডাকি করতে ঘুম ভাঙল তার। সামিয়াকে কাঁদতে দেখে কিছু একটা বলতে মুখ খুলল। এই প্রথমবার তার মুখ থেকে আওয়াজ বেরোল,

‘মা!’

.

‘ওয়াও! নাও দ্যাট ওয়জ স্কেয়ারি।’

অভিষেক বলে ওঠে গল্প শেষ হতে। একটু থেমে আবার বলল,

‘কিন্তু এই গল্পে তো তাহলে এই পাহাড় ভালোই করেছে। মানে, বোবা মেয়েটা কথা বলতে পারছে। এক্ষেত্রে তো এই হন্টেড ইভিল পাহাড় কারুর ক্ষতি করেনি।’

উত্তরটা শীর্ষ দিল,

‘টাকলা পাহাড় কারুর ক্ষতি করে না। শৌর্যর গল্পে ছেলেটি নিজেই উন্মাদ হয়ে গেছিল নিজের পাপকে সামনে দেখে। দোষ তার নিজের ছিল।’

অভিষেক বলল,

‘কিন্তু, এখানকার অপদেবতারা মানুষদের ভয় দেখায় কেন?’

‘কারণ তারা চায় না মানুষ এসে তাদের বিরক্ত করুক। মানুষ একটা কথা কোনোদিন বুঝতে চায় না যে, এই পৃথিবী শুধুই তাদের জন্যে নয়। সব জায়গার প্রভু মানুষ নয়! যেমন গভীর জঙ্গলে পশুদের রাজত্ব, সেরকমই পৃথিবীর কিছু কিছু জায়গা মানুষের ধরাছোঁয়া ও বোধগম্যের বাইরে। সেখানে নাক না গলানোটা মানুষ কবে শিখবে? আর অপদেব-দেব, ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ এগুলো আপেক্ষিক।

‘আচ্ছা, আচ্ছা। গভীর ফিলোজফি বটে। তবে, কথাগুলো সত্যি। এইবার নিজের গল্পটা বলে ফেল দেখি।’

শীর্ষ মাথার হুডটা টেনে আরও একটু জড়োসড়ো হয়ে বসল আগুন ঘেঁষে। মুখ না তুলেই, আগুনের দিকে তাকিয়ে নিজের গল্প শুরু করল,

‘এই পাহাড় কারুর ক্ষতি করে না বলাটা অবশ্য ঠিক নয়। করেছিল। অনেক অনেক বছর আগে এক তান্ত্রিক এসেছিল এই পাহাড়ে কিছু অদ্ভুত সাধনা করতে। তার মুখ থেকেই মানুষ প্রথম জেনেছিল যে, এই পাহাড়টা আসলে দুই বা একাধিক জগতের প্রবেশপথ। প্রতিটি মৃত আত্মাকে এই পথ ধরেই অপার্থিব জগতে প্রবেশ করতে হয়। এখানে ছায়াজগৎ ও বস্তুজগতের পর্দা খুবই পাতলা।’

‘ওয়াও। তারপর? সেই তান্ত্রিকের কী হয়েছিল? এই গল্পটা বল।’

এদিকে-ওদিকে ঘাড় নেড়ে শীর্ষ বলল,

‘বলার মতো কিছুই নেই। এই লোকটি শুনেছি এই পাহাড়ের শক্তিকে বশে আনতে চেয়েছিল। এমন কিছু করেছিল যা টাকলা পাহাড় ক্ষমা করেনি।’

‘ক….কী হয়েছিল?’

‘পাহাড়ের গায়ে তার ছিন্নভিন্ন লাশ পাওয়া গেছিল। গ্রামের লোকেরা পেয়েছিল। কেউ বা কারা যেন একটা জলজ্যান্ত মানুষের শরীর নিয়ে পুতুলের মতো দুমড়ে-মুচড়ে, হাত-পা ছিঁড়ে ফেলেছে প্রবল আক্রোশে।

অভিষেক নিজের হুডিটা আরও একটু টেনে নিল। নাহ্, এই গল্পটা সে শুনতে চায় না। শীর্ষ আবার বলে উঠল,

‘এই পাহাড়ে কোনো জন্তু থাকে না। কান করে শোন, এখানে কোনো ঝিঁঝি পোকার ডাক নেই, নেই কোনো রাতজাগা পাখির ডাক। দিনের বেলাতেও পাখিরা এই পাহাড়ে এসে বসে না। উড়ে যাওয়ার সময়ে পাহাড়ের ওপর দিয়ে যায় না, পাক দিয়ে পথ বদলে নেয়। কারণ তারা টের পায়, জন্তু, পাখি, পোকামাকড়রা সবাই টের পায় যে, এই জায়গা তাদের বিচরণের জন্যে নয়। তারা যুগ যুগ ধরে নিয়ম মেনে এসেছে। তারা সৃষ্টির আদি থেকেই জানে, যেসব জায়গা পার্থিব জগতের মধ্যে থাকে না, সেখানে যাওয়া উচিত না। এটাই নিয়ম। শুধু মানুষ নিয়ম মানে না।’

খানিকটা বিরতি নিয়ে শীর্ষ এবার তার মূল কাহিনি শুরু করল,

‘ব্রিটিশ আমলে এক সাহেব ঠিক করেছিলেন তিনি এই পাহাড়ে নিজের কটেজ বানাবেন। সাহেবের নাম ছিল এডওয়ার্ড জেমস হগ। কীভাবে তিনি এই পাহাড়ের খোঁজ পেয়েছিলেন তা জানা নেই। তবে জায়গাটা দেখে তাঁর বেশ পছন্দ হয়। এবং, ঠিক করেন তিনি এখানে নিজের সামার কটেজ বানাবেন।

সেই অনুযায়ী তিনি প্রথমে লোকাল লোকদের ভাড়া করলেন কাঠ কেটে এখানে একটা কটেজ বানিয়ে দিতে। কিন্তু কোন পাহাড়ে সাহেব বাড়ি চাইছেন, সেটা শোনার পরেই তারা টাকা ফেরত দিয়ে মাফ চাইল। তাদের বেশি টাকার লোভ দেখিয়েও কোনো লাভ হল না।

এদিকে সাহেবের ততক্ষণে জেদ চেপে গেছে। তাই তিনি বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে নিয়ে এলেন এখানে। তারা টাকলা পাহাড় সম্বন্ধে কিছুই জানত না, তাই কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু এরপরেই সমস্যা শুরু হল।

রোজই কিছু-না-কিছু অঘটন ঘটে। কোনোদিন কেউ পড়ে গিয়ে পা মচকায় বলে কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিয়েছে। আবার কখনো কপিকল দিয়ে কাঠ তোলার সময় দড়ি ছিঁড়ে তা গড়িয়ে যায় বার বার। একবার তো সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড হল

সকালে এসে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে লোকজন, প্রথমজন মাটি থেকে কোদালটা তুলতে গিয়েই চমকে গেল। কোদাল প্রচণ্ড ভারী! ভারী মানে অসম্ভব ভারী, তোলা যাচ্ছে না।

বাকিরা কুড়ুল, হাতুড়ি, শাবল তুলতে গেলেও একই ব্যাপার হল। তোলা তো দূরে থাক, একচুল নাড়ানো পর্যন্ত গেল না। কীভাবে এরকম ভারী হতে পারে এই সাধারণ জিনিসপত্র তারা ভেবে কূলকিনার পেল না।

এই মজুরদের মধ্যে একজন ছিল অন্ধ। বয়স্ক মানুষ। তবুও এই দলে তাকে রাখা হয়েছিল কিছুটা দয়ার বশেই। হালকা কাজকম্ম দেওয়া হত তাকে। অন্ধ বলে লোকটির কিন্তু বিশেষ অসুবিধে হত না। তার অন্যান্য সেন্স ছিল অনেক বেশি প্রখর। আশেপাশের লোকজনকে সে সহজেই চিনতে পারত চলাফেরার শব্দ থেকে। কিন্তু টাকলা পাহাড়ে আসার পর থেকেই সেই লোকটির প্রচণ্ড সমস্যা শুরু হয়েছিল। সে আর কাউকে চিনতে পারছে না, ভুল হয়ে যাচ্ছে তার বার বার। . হঠাৎই দেখা যাচ্ছে ‘কে? কে?’ বলে চেঁচিয়ে উঠছে, অথচ হয়তো সেখানে কেউ নেই। আবার কখনো সে বলে উঠছে, ‘ও কালু, তোর পেছনে ওটা কে দাঁড়ায় আছে রে?’ অথচ কালু মিস্ত্রি ঘাড় ফিরিয়ে দেখে কেউ নেই।

তা, এই অবস্থায় যখন কেউ তাদের যন্ত্রপাতি তুলতে পারছে না, সেই অন্ধ বুড়ো এসে পড়ে সেখানে। এসেই এক বিষম আর্তনাদ করে জ্ঞান হারায়।

মুখে-চোখে জল দেওয়ায় জ্ঞান ফিরে এলে আবার সে ওই যন্ত্রপতিগুলোর দিকে তার দৃষ্টিহীন চোখ ফেরাতে তার মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে ওঠে। সেগুলোর দিকে আঙুল তুলে বুড়ো বলে,

‘ওই…ওই…ও কী?’

‘কী কাকা? কী হয়েছে?’

‘ওই মাটি থেকে ওই…ওই…হাতগুলো, চেপে ধরে রেখেছে সব জিনিস! কালো, কালো লম্বা হাতের আঙুল সব। চেপে ধরে রেখেছে আমাদের সব জিনিস! ওগুলো কী? মাটি থেকে বেরিয়ে এসেছে ওগুলো! ওগুলো মানুষের নয়! ওগুলো মানুষের নয়!

আর সেখানে থাকেনি সেই মজুরদের দল। নেমে এসেছিল জিনিস ফেলেই। গ্রামের লোকেদের কাছে এসে তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিল। গ্রামের লোকেরাও তাদের শুনিয়েছিল যুগ যুগ ধরে মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি যা প্রত্যেকেই জেনেছে এই টাকলা পাহাড় ঘিরে। তারাও আর সাহেবের সঙ্গে দেখা না করেই পালিয়ে যায় নিজেদের রাজ্যে।

তবে, এত কিছুর পরেও সাহেব কিন্তু দমলেন না। হগ সাহেবের ততদিনে জেদ চেপে গেছে। সাহেব সকলকে বলে দিলেন যে, এইসব নেটিভদের গল্পে তাঁর বিশ্বাস নেই। সাহেব একাই এই পাহাড়ে রাত কাটিয়ে সবার কাছে প্রমাণ করে দেবেন যে, এইসব কাহিনি সত্যি নয়। তাঁর স্ত্রী, গ্রামের লোক সবাই বহুবার বারণ করা সত্ত্বেও তিনি একটা তাঁবু নিয়ে এই পাহাড়ে, ঠিক এখানেই হাজির হলেন এক রাতে। এখানেই, এভাবেই আগুন জ্বালিয়ে তাঁবু খাটিয়েছিলেন।

শীর্ষ থামল। উদগ্রীব হয়ে অভিষেক জানতে চাইল,

‘তারপর? সাহেব রাত কাটাতে পেরেছিলেন?’

‘হ্যাঁ। পেরেছিলেন। তবে…’

‘তবে?’

‘সেও এরপর থেকে আর স্বাভাবিক থাকতে পারেনি। সকালে মিসেস হা একদল লোক নিয়ে পাহাড়ে এসে দেখেন সাহেব তাঁর তাঁবুর বাইরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। জ্ঞান হওয়ার পর দেখা গেল তাঁর দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক ভাব। মানসিক বিকৃতি ঘটেছে তাঁরও। কথাবার্তা কেমন যেন জড়িয়ে যেত সাহেবের।’

ঠিক কী ঘটেছিল সেটা কোনোদিনই হগ সাহেব আর বলতে পারেননি। শুধু বলতেন, তিনি নাকি একটা লাল পৃথিবীতে গেছিলেন। সেখানে আকাশ, মাটি দুইই লাল। সেখানে শুধুই কায়াহীন ছায়ামানবদের বাস। আর সেই জায়গার আকাশে নাকি দুটো লাল সূর্য আছে। কিন্তু, তার আলো আসে না সেখানে। কারণ সূর্যের পাশেই এক দানব তার বিশাল কালো মুখ হাঁ করে ক্রমাগত আলো গিলে চলে।

অভিষেক কাঁপা গলায় বলল,

‘দ…দ্যাট সাউন্ডস লাইক এ ব্ল্যাক হোল…’

ওর কথা অগ্রাহ্য করেই শীর্ষ বলল,

‘হগ সাহেবের মধ্যে আরও একটা পরিবর্তন হয়েছিল। এতদিন ধরে তিনি ডান হাতি ছিলেন, কিন্তু সেদিনের পর তিনি আশ্চর্যজনকভাবেই ন্যাটা অর্থাৎ বাঁ-হাতি হয়ে যান। লিখতে পারেননি যদিও তিনি কোনোদিন কিছু।

ডাক্তার দেখালে আরও একটা অদ্ভুত ঘটনা সামনে আসে। ডাক্তার জানায় যে, হগ সাহেবের নাকি হার্ট ডান দিকে। আরও পরীক্ষা করে দেখা গেল সাহেবের পুরো অ্যানাটমিটাই উলটো। শরীরের যে যে অঙ্গ ডান দিকে থাকা উচিত, তা বাঁ-দিকে আছে। আর বাঁ-দিকের সব অঙ্গ ডানে। এই ব্যাপারটা খুব রেয়ার হলেও আশ্চর্যের কিছু ছিল না। অনেকেরই নাকি জন্মগত এইরকম থাকে।

কিন্তু সমস্যা হল, হগ সাহেবের বউ হলপ করে জানালেন যে, তাঁর স্বামীর এই অস্বাভাবিকতা আগে ছিল না। সেটা থাকলে তিনি নিশ্চয়ই জানতেন। ইংল্যান্ডে অনেক বড়ো বড়ো ডাক্তার এর আগেও বহুবার সাহেবের চিকিৎসা করেছেন, কিন্তু এমন কথা তো কেউ কোনোদিন বলেননি।

‘ও মাই গড! এটা তো সবচেয়ে অদ্ভুত গল্প। ক্রিপি অ্যান্ড আনক্যানি!’

কেউ কোনো কথা বলল না। ঘড়ি দেখল অভিষেক, রাত সাড়ে ন-টা। বড্ড ঠান্ডা লাগছে অভিষেকের। আগুনে যেন তেজ নেই। অভিষেকের এখানে আর বসে থাকতে খুবই অস্বস্তি হচ্ছে।

সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

‘দারুণ লাগল আজকে চারজনের গল্পই। দুঃখের বিষয়, আমার জানা কোনো গল্প নেই এই টাকলা পাহাড় ঘিরে। থাকলে নিশ্চয়ই শোনাতাম।’

‘পাহাড় সবাইকে তার গল্প দেয়। সবাই শোনানোর মতো গল্প নিয়ে যায় পাহাড়ের থেকে।’

কথাটা ওর বন্ধুদের মধ্যে কে বলল, সেটা বুঝল না অভিষেক। সবারই মুখের ওপর হুড টানা।

‘টুং টুং টুং টুং টুং টুং…’

পরিচিত শব্দটা অনেকক্ষণ বাদে আবার কানে এল অভিষেকের। ওর মোবাইলে পর পর অনেকগুলো হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ঢুকছে একসঙ্গে।

ফোনটা হাতে তুলে নিল অভিষেক। এতক্ষণ সিগনাল ছিল না। এখন দুর্বল হলেও, কিছুটা সিগনাল এসেছে দেখল। হোয়াটসঅ্যাপ অন করতেই ওদের বন্ধুদের গ্রুপে দেখল ১৪৭টা মেসেজ ঢুকেছে। সঙ্গে তেরোটা মিসডকল।

মেসেজ অন করল অভিষেক।

পরম: ‘ভাই, আজকের প্ল্যান ক্যানসেল কর।’

শীর্ষ: ‘হ্যাঁ, ভাই। ওই পাহাড় ভালো নয়। অনেক কথা শুনেছি।

মিতালি: ‘আমিও। আমি যাব না বাবা।’

শৌর্য: ‘আমিও না। অভিষেক বরং আমার বাড়ি আয়।’

.

.

.

পরম: ‘এই অভিষেক, কই তুই? ফোন লাগছে না কেন?’

মিতালি: ‘আমিও পাচ্ছি না। ও কি একাই গেল নাকি? আমার না চিন্তা হচ্ছে।’

শীর্ষ: ‘আরে, গেলেও তো আমাদের না পেয়ে ফিরেই আসবে।’

.

.

.

শৌর্য: ‘অভিষেক! ইট’স নট ফানি এনিমোর! কই তুই? ফোন ঢুকছে না কেন?

পরম: ‘আমি আবার ট্রাই করছি। ওর বাড়িতে জানাল ও বেরিয়ে গেছে দু-ঘণ্টা আগেই।’

আরও অনেক মেসেজ রয়েছে যেগুলোর মানে অভিষেক বুঝতে পারছে না। সবথেকে অদ্ভুত ব্যপার, শেষ মেসেজে দেখা যাচ্ছে, সময় বলছে ন-টা দশ। এর মানে কী?

ওর বন্ধুরা যদি বাড়ি থেকে বসে মেসেজ করে থাকে, তাহলে…তাহলে….

অভিষেকের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বরফ-ঠান্ডা স্রোত নেমে যায়। ওর মাথা তুলে সামনে বসা চারটে মূর্তির দিকে তাকানোর সাহস নেই। কিন্তু তবুও ও তাকাল। ও ভেবেছিল দেখবে সামনে কেউ নেই।

কিন্তু না, এখনও চারজন বসে আছে ঠিক আগের মতোই। মুখ ঢাকা তাদের। অভিষেক তাদের দিকে তাকাতে, তারা চারজন একইসঙ্গে মুখ তুলে তাকাল অভিষেকের দিকে!

কিন্তু একী? মুখ কই? হুডের নীচে তো কোনো মুখ নেই! সেখানে শুধুই অন্ধকার! হুডের ভেতর থেকে তার দিকে চেয়ে আছে শুধুই ঘন কালো, অপার্থিব অন্ধকার।

জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে খসে পড়েছিল অভিষেক। এই অসম্ভব ভয়ের দৃশ্য তার স্নায়ু নিতে পারেনি।

এর কয়েক ঘণ্টা পরেই অভিষেকের বাবা এবং আরও কয়েক জন সাহসী মানুষ আসে পাহাড়ে তাকে উদ্ধার করতে। বন্ধুরা পুরো ঘটনাটাই তাদের বাড়িতে জানিয়েছিল রাত অবধি অভিষেকের কোনো খোঁজ না পেয়ে। সেই শুনেই লোকজন নিয়ে অভিষেকের বাবা আসে টাকলা পাহাড়ে।

অভিষেকের কোনো ক্ষতি না হলেও, এই ঘটনার রেশ কাটিয়ে উঠতে ওর কয়েক সপ্তাহ সময় লেগেছিল। ওর কথা অনেকেই বিশ্বাস করেছে, আবার অনেকে করেনি। তবে অভিষেক জানে ও কী দেখেছে বা শুনেছে।

টাকলা পাহাড় তার ক্ষতি করেনি। কিন্তু তাকে দিয়ে গেছে একটা গল্প। তার নিজের অভিজ্ঞতার গল্প। ওই পাহাড়ে কী আছে, বা, কারা আছে সে-প্রশ্নের জবাব কোনোদিন মানুষ পাবে না। কারণ, সব রহস্যের উত্তর মানুষের জানতে নেই। ঠিক যেমন সব জায়গায় মানুষের যেতে নেই। এই পৃথিবীতেই কিছু জায়গা আছে যা পার্থিব জগতের অংশ হয়েও তা পার্থিব নয়।

যদি দেখেন কোনো জায়গায় পোকারা রাতে ডাকে না, গাছ বা আগাছা জন্মায় না, পাখিরা তার ওপর দিয়ে উড়ে যায় না, জানবেন সেটা সেইরকমই কোনো স্থান। সেই জায়গার বাসিন্দাদের কাছে আপনি ও এই জগতের সব কিছুই অবাঞ্ছিত। তাঁদের বিরক্ত করবেন না। করলে আপনারই বিপদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *