উইশিং ওয়েল
[এটা এক ‘সিটিং’-এ লেখা গল্প। মানে একেবারেই গোটা গল্পটা লিখে ফেলেছিলাম। গল্পের শেষটা পাঠকরা নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে নিতে পারেন।]
.
১
উফ! রিকদা আজ আবার কলেজে ব্ল্যাক টি-শার্টটা পরে এসেছে। কালো রঙে রিককে দারুণ লাগে রাকার। এই টি-শার্টে ওর হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট ফুটে থাকে। তাই তো রাকা আজকে ওর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। উফ!
বইয়ের ফাঁক দিয়ে রিককে দেখছিল রাকা। ওর বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায় এই ছেলেটাকে দেখলে।
কিন্তু, রিক একা নয়। তার পাশে সবসময়েই থাকে ওর গার্লফ্রেন্ড পিয়ালী। রিকের সঙ্গে পিয়ালীকে দেখলেই বুকে যেন আগুন জ্বলে ওঠে রাকার। এখনও ও পিয়ালীকে রিকের গা ঘেঁষে থাকতে দেখছিল আর মনে মনে ভাবছিল,
‘পাশের পিয়ালীটাকে দেখো! সারাক্ষণ হাতে হাত ধরে রয়েছে রিকদার। আমার সহ্য হয় না রিকদার সঙ্গে অন্য কাউকে।’
রাকা এখন বি এ অনার্স, দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে। ওর কলেজ ক্রাশ হল এম এসসি প্রথম বর্ষের রিক বাসু। প্রথম যেদিন ওকে দেখেছিল কলেজে, জুনিয়রদের ইন্ট্রো নিচ্ছিল, সেইদিন থেকেই রাকা ওর জন্যে পাগল।
কিন্তু, রিক ওর দিকে চাইবে কেন? রিকের গত দু-বছর ধরে একজন স্টেবল গার্লফ্রেন্ড পিয়ালীদি। রাকা শুনেছে যে রিক নাকি একসময়ে পুরো প্লেবয় ছিল। কলেজের বহু মেয়ের সঙ্গে ডেটিং করেছে প্রথমে। কিন্তু, বছর দুয়েক আগে হঠাৎই নিজে থেকে পিয়ালীকে প্রোপোজ করে বসে। এটা কেউই আশা করেনি। কিন্তু, এরপর থেকে ওরা একসঙ্গেই রয়েছে।
রিক এই পিয়ালীর মধ্যে কী দেখেছে সেটা বুঝে পায় না রাকা। ওর সঙ্গে রিকের বড়োজোর দু-একবার কথা হয়েছে শুধু। ব্যস। এইটুকুই। তাকে প্রতিদিন শুধু এভাবেই লুকিয়ে রাকা দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
.
২
কলেজ থেকে পিকনিকে গেছে কলেজের সেকেন্ড ইয়ার। জায়গাটা একটা পুরোনো রাজবাড়ি। বাড়িটার অবস্থা শোচনীয় হলেও একপাশ মেরামত করে পিকনিকের জন্যে ভাড়া দেয় বাড়ির মালিক।
কয়েক জন ছাত্রছাত্রী বাড়ির বুড়ো কেয়ারটেকারকে ঘিরে ধরে এই বাড়ির ইতিহাস শুনছিল। একটা অতি প্রাচীন কুয়োর কাছে এসে বুড়ো বলছিল,
‘এটা হল ‘উইশিং ওয়েল’। লোকে বলত এই কুয়োতে এক অপদেবতা বাস করে। কুয়োতে একটা সিক্কা ফেলে নিজের মনের ইচ্ছে জানালে সেটা পূরণ হয় আগামী তেরো দিনের মধ্যে। এখানে উইশ কখনো বৃথা যায় না।’
ম্যাথের রণজয় বিদ্রূপের ভঙ্গিতে বলল,
‘তাই যদি হবে তো এই অবস্থা কেন এখানকার? আপনি আর এই বাড়ির লোকজন নিজেদের ইচ্ছে পূরণ করে নিলেন না কেন? কোটিপতি হতে পারতেন তো।
শুনেই সকলে হেসে উঠল। বুড়ো কেয়ারটেকারও শুকনো হেসে উত্তর দিল, ‘আসলে সবাই ভয় পায়।’
‘কেন?’
‘যা বোঝার বাইরে, এমন জিনিসকে এড়িয়ে চালাই উচিত গো দাদারা। অপদেবতাদের ব্যাপার সবসময়ই গোলমেলে। যা চাইতে হয় তার প্রতিটি শব্দ অনেক ভেবেচিন্তে বলতে হয়। একটু ভুল হয়ে গেলেই অপদেবতা ভয়ংকর খেলা খেলে মানুষের সঙ্গে।’
অন্য একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল,
‘এর আগে কেউ করেছে উইশ, তুমি জানো?’
বুড়ো বলল,
‘কয়েক বছর আগে তোমাদেরই কলেজের একদল এসেছিল পিকনিকে। আমি অনেক বারণ করা সত্ত্বেও একটি মেয়ে উইশ করেছিল। তার কী হয়েছিল জানা নেই।’
এরপর প্রসঙ্গ পালটে বুড়ো ওদের রাজবাড়ির পেছনদিকের নদীর ঘাট দেখাতে নিয়ে চলল। সবাই পিছু নিল বুড়োর। সবাই এগিয়ে গেলেও ওই দলের একজন ইচ্ছে করেই পিছিয়ে গেল। রাকা অপেক্ষা করল যতক্ষণ না বাকিরা চোখের আড়ালে গেল। তারপর আশপাশে দেখে নিয়ে ব্যাগ থেকে পার্স বের করে একটা এক টাকার কয়েন ছুড়ে দিল কুয়োতে। মনে মনে বলল,
‘রিক যেন আমার কাছে আসে। আমার হয় রিক।’
আশ্চর্য। কয়েনটা জলে পড়ার আওয়াজ হল না। নীচে পড়ার আগেই যেন মাঝপথে হারিয়ে গেল সেটা, বা, যেন কেউ ধরে নিল।
.
৩
পরের কয়েক দিন রাকার খুবই উৎকণ্ঠায় কাটল। বার বার প্রত্যাশা নিয়ে রিকের দিকে তাকিয়ে ছিল। একবার তো সাহস করে রিকের সঙ্গে চোখাচোখি হতে একটু হাসলও রাকা। কিন্তু, রিক খেয়ালও করল না তাকে। এরপর থেকেই আশা কমতে শুরু করে রাকার। বারো দিন পরেও যখন কিছুই হল না তখন পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিল রাকা। মনে মনে ভাবল যে, কী বোকা ও। কোথাকার এক রূপকথার গল্পে বিশ্বাস করেছিল। রাতে বিছানায় শুয়ে কান্না পেল রাকার
পরের দিন ছিল রবিবার। সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠে দেখল, ওর ফোনে বেশ কয়েকটা মিসড কল। কলেজ গ্রুপে প্রচুর মেসেজ ঢুকেছে। গ্রুপ খুলতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল রাকার।
গতকাল রাতের দিকে কোচিং থেকে ফেরার পথে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে মারা গেছে রিক বাসু। শোনা যাচ্ছে ওর শরীরটা দু-টুকরো হয়ে গেছে ট্রেনের চাকার নীচে এসে।
বজ্রাহতর মতো পাথর হয়ে বসে রইল রাকা!
.
৪
রাকা প্রচুর কেঁদেছে আজ সারাদিন। বান্ধবী কয়েক জন যারা রিকদার প্রতি ওর দুর্বলতার কথা জানত, তারা ওকে ফোনে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু, রাকার মনের এই কষ্ট ও কাউকে বোঝাতে পারবে না। এমনকী এই প্রথমবার ওর দুঃখ হল পিয়ালীদির জন্যে। ও জানে পিয়ালীও রিককে সত্যিই ভালোবাসত। এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ কোনোদিনই রাকার মনে ছিল না।
সারাদিন কিছু খেল না রাকা। গলা দিয়ে খাবার নামেনি ওর। রাতে ওর মা জোর করে সামান্য খাইয়ে দিয়ে ওকে শুইয়ে দিল। ক্লান্ত চোখে কিছুক্ষণ পর হালকা ঘুম এসেছিল। হঠাৎই মোবাইলে মেসেজ আসায় ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম জড়ানো চোখে মোবাইল নিয়ে ও দেখল পল্লবী একটা নিউজ চ্যানেলের ক্লিপ পাঠিয়েছে।
‘মর্গে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির ফলে উধাও হয়ে গেল লাশ। গতকাল রাতে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায় রিক বাসু নামে এক কলেজ ছাত্র। তার দেহটি বিকৃত হয়ে, সম্পূর্ণ দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা ও মর্গ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পোস্টমর্টেম হয়ে রিক বাসুর মরদেহ রাখা ছিল মর্গেই। আগামীকাল দেহের দুটো অংশ সেলাই জোড়া দিয়ে তার পরিবারের কাছে মৃতদেহ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু, আজ সন্ধেবেলা আচমকাই সেই লাশ গায়েব হয়ে যাওয়ায় সকলেই বিস্মিত। সন্ধেবেলা মর্গের দায়িত্বে থাকা দারোয়ান নিজের দোষ ঢাকতে আরও একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে সবার সামনে। তার বক্তব্য, সে নাকি দু-ভাগে বিভক্ত দেহের অংশ দুটোকে জঙ্গলের দিকে যেতে দেখেছে…।’
গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল রাকার। ওর কেন কে জানে অকারণেই ভয় করছে। হাত বাড়িয়ে আলো জ্বালতে গেল, কিন্তু হাত মাঝপথেই আটকে গেল।
একটা শব্দ কানে এসেছে ওর। না, একটা নয়, দুটো আলাদা শব্দ কানে এল রাকার। ওর ঘরের বন্ধ কাচের জানলার বাইরে থেকেই আসছে শব্দ। প্রথম শব্দটা ঠিক যেন জঙ্গলের শুকনো পাতার ওপর দিয়ে দুটো পায়ের হাঁটার মচমচ শব্দ। কিন্তু, দ্বিতীয় শব্দটা ভারী কিছু ঘাসের উপর ঘষটে ঘষটে এগিয়ে আসার। আওয়াজ দুটো একইসঙ্গে এগিয়ে আসছে ওর জানলার দিকে। দুটো শব্দই ঠিক ওর ঘরের জানলার বাইরে এসেই থেমে গেল।
রাকা আতঙ্কিত চোখে দেখল জানলার নীচের দিক থেকে একটা রক্তমাখা হাত উঠে জানলার কাচে টোকা দিল!
রাকার কানের কাছে কেউ যেন মনে করিয়ে দিয়ে গেল,
‘এই কুয়োয় করা উইশ কখনো বৃথা যায় না!’
.
৫
দু-বছর আগে।
কলেজ গ্রুপ পিকনিকে একটা পুরোনো রাজবাড়িতে এসেছে পিয়ালী। এখানেই একটা পুরোনো কুয়ো বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে ওর। কারণ বুড়ো কেয়ারটেকারটা বলছে এটা নাকি একটা ‘উইশিং ওয়েল’। বুড়ো বাধা দেওয়ার আগেই একটা কয়েন ছুড়ে দিল পিয়ালী কুয়োর জলে।
মনে মনে পিয়ালী উইশ করল,
‘জীবনের শেষ দিন অবধি রিক যেন শুধু আমার থাকে।
আশ্চর্য। কয়েনটা জলে পড়ার আওয়াজ হল না তো। যেন মাঝপথেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। ঠিক যেন কেউ জল ছোঁয়ার আগেই কয়েনটা ধরে ফেলেছে।
