দাফন বিধি – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

দাফন বিধি

[এই গল্পটা অনেকেই সম্ভবত ‘মিডনাইট হরর স্টেশন’-এ শুনেছেন। এটা আমার একটা ‘হঠাৎ লেখা’ গল্প। কোনো নিয়ম বা আচার ভুল হয়ে থাকলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।]

.

‘উলটো দাফন? সে আবার কী?’

বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন ইমাম সাহেব। রফিকের বাবা গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলেন,

‘আমাদের পরিবারে এটাই নিয়ম।’

ইমাম সাহেব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু, রফিকের বাবার মুখ দেখে আর কিছু বললেন না। মৃতদেহ গোসল করানো আগেই হয়ে গেছে। তিন টুকরো সাদা কাফনে মুড়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে রফিকের জ্যাঠাকে।

রফিক আর্ট কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এর আগেও পরিবারের এই অদ্ভুত নিয়ম সে দেখেছে। ছোটোবেলায় যখন ঠাকুরদা মারা গেছিল, তখন রফিকের বয়স মাত্র সাত। তাই এই বিধি নিয়ে তার মনে প্রশ্ন জাগেনি। কিন্তু, এখন সে বড়ো হয়েছে। তাই আজকে আবার এই নিয়মটা শুনে তার অদ্ভুত লাগল। মনে মনে ঠিক করল, বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করবে এই অদ্ভুত নিয়মের কারণ।

পরিবারের লোক কবর ঘিরে দাঁড়িয়ে। বাবা, রফিক আর পরিবারের অন্য কয়েক জন পুরুষ মিলে মৃতদেহ কবরে নামিয়ে দিল। মক্কার দিকে মাথা করে শোয়ানো হল। এবং, তার পরেই মৃতদেহ উলটে দেওয়া হল। মানে, কাফন মোড়া জেঠুর মুখ মাটিতে আর পিঠ ওপরের দিকে।

খুবই আশ্চর্য লাগল রফিকের। সে বেশ কয়েক বার দু-একজন পরিচিতর জানাজায় উপস্থিত থেকেছে। মক্কার দিকে ডান দিকে মুখ ফিরিয়ে দাফন দেওয়া হয় সবাইকে। তাদের পরিবারের সবাইকে মুখ মাটির দিক করে ফিরিয়ে শোয়ানো হয় কবরে।

ইমাম সাহেব ‘শালাহ’ পাঠ করলেন। প্রত্যেকে আল্লার কাছে আত্মার শান্তি কামনা করল। অতঃপর কবরে মাচা চাপা দিয়ে ওপরে মাটি দেওয়া হল। বাকি সমস্ত কিছু আর পাঁচটা ইসলামি দাফন-বিধি মেনেই হল। শুধু ওই একটা ব্যাপার বাদে।

সব মিটিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেকটাই দেরি হল ওদের। বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের ভিড় থাকল রাত অবধি। তাই রফিক মনের প্রশ্ন মা-বাবাকে করার সুযোগ পাচ্ছিল না। রাতের দিকে সবাই বিদায় নিতে বাড়ি ফাঁকা হল। খেতে বসে টেবিলে রফিক প্রশ্নটা করল,

‘বাবা, আমাদের পরিবারের এই অদ্ভুত নিয়ম কেন?’

বাবা চামচ দিয়ে প্লেট থেকে ভাত তুলে মুখে দিচ্ছিলেন। মাঝপথে থেমে গেলেন। রফিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘সব পরিবারের কিছু নিয়ম থাকে। এটাও সেইরকম।’

উত্তরটা মনঃপূত হল না রফিকের। আবার প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু, এর কোনো কারণ তো থাকবে?’

এইবার অকারণেই রেগে গেল বাবা। বলল,

‘আহ, রফিক! সবে দাদা মারা গেছে। এর মধ্যে এইসব অকারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছে করছে না।

রফিক বুঝল বাবার থেকে কথা বের করা যাবে না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নিল।

রাত্রে মাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল। মাও প্রথমে বলতে চাইল না। কিন্তু ছোটো থেকেই মাকে দিয়ে কীভাবে নিজের সব আবদার, বায়না মিটিয়ে নিতে হয় সেটা জানে রফিক। তাই বারকয়েক পীড়াপীড়ি করতেই মা ঘটনাটা জানাল। ‘তোর বাবার মুখেই শুনেছি। এই পরিবারের বড়োছেলেদের ওপর নাকি অভিশাপ আছে!’

.

‘অভিশাপ?’

‘হ্যাঁ, ভাই। মা তো তাই বলল।’

আগের দিন রাতের ঘটনা ইমনকে বলছে রফিক। রফিক আর ইমন যাকে বলে অভিন্নহৃদয় বন্ধু। অতএব এরকম অদ্ভুত গল্প যে সে ইমনকে বলবে, তা আর আশ্চর্য কী?

‘কী অভিশাপ?’

রফিক আর ইমন কলেজের বারান্দার সিঁড়িতে বসে আছে। একটা চুইংগাম মুখে দিয়ে রফিক বলল,

‘আরে, সে এক অদ্ভুত গল্প। প্রথম থেকে বলি, শোন। আমাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ, কত আগের জানি না, তবে তার নাম ছিল মকবুল। এই মকবুল মিয়ার সাতটি মেয়ে ছিল, কিন্তু একটিও ছেলে ছিল না। সে নিজের বংশরক্ষা নিয়ে চিন্তিত হয়ে শোনা যায় এক জিনের শরণাপন্ন হয়।

জিন্না রাতে তার স্বপ্নে আসে। তাকে বর দেয় যে, মকবুলের আগামী সন্তান পুত্র হবে। শুধু তাই নয়, আগামী প্রজন্মের প্রত্যেকের প্রথম সন্তান ছেলে হবে। কিন্তু, তার বদলে সেই প্রথম সন্তানদের অভিশাপ বহন করতে হবে।

অভিশাপটি বড়ো অদ্ভুত। জিন বলেছিল যে, মকবুল ও তার বংশের প্রথম সন্তানরা মৃত্যুর পর শান্তি পাবে না। ‘দোজখ’ বা ‘বেহেস্ত’ কোনোটাই তাদের প্রাপ্তি ঘটবে না। মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টা পরেই পিশাচরূপে আত্মা আবার মৃতদেহে ফিরে আসবে। মকবুলকে এই শর্তই দিয়েছিল জিন।

মকবুল পরের দিন সকালে উঠে পুরোটাই দুঃস্বপ্ন ভেবে নিয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাস পরেই মকবুলের বিবি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়।

কিন্তু, সেইরাতে জিন্না আবার দেখা দেয় মকবুলের স্বপ্নে। তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের চুক্তির কথা। এবং, এর পর থেকে মাঝে মাঝেই মকবুল দুঃস্বপ্ন দেখা শুরু করে। তার জীবন দীর্ঘ হয়েছিল, মাঝে মাঝে রাতে শুধু দুঃস্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কিছু সমস্যা ছিল না।

অনেক বয়সে গিয়ে মকবুল মারা যায়। তাকে গোর দেওয়া হয় সাধারণ নিয়ম মেনেই।

সেইদিন রাতেই মকবুলের ছেলে প্রথম দুঃস্বপ্ন দেখল। মানে, সেই একই স্বপ্ন। জিন এসে তাকে মনে করিয়ে দিয়ে যায় যে, এইবার সেই অভিশাপের ভার তার ওপর বর্তাল। আরও কী কী যেন দেখেছিল সে। তা বলতে পারি না। তবে, সে জোয়ান ছেলে। পাত্তা দেয়নি বিশেষ।

কিন্তু, ঘটনাটা ঘটল পরের দিন রাতে।

সেই রাতটা ছিল দুর্যোগের। তুফান চলছিল জোর, ঝড়ের চোটে গাছ মড়মড় করে ভেঙে পড়ছিল। ঘুম আসছিল না মকবুলের বাড়ির লোকের।

রাত তখন গভীর। হঠাৎ ঝড়ের আওয়াজ ছাপিয়ে তাদের কানে এল অন্য একটা শব্দ।

দরজায় কেউ ধাক্কা দিচ্ছে! কেউ বার বার আছড়ে ফেলছে নিজের শরীরটাকে বাইরের দরজায়। কিন্তু, এই দুর্যোগের মধ্যে, এত রাতে কে আসবে?

লন্ঠন নিয়ে বেরিয়ে এল বাড়ির লোক। দরজার কাছে এসে ডাক দিল— কে? কে এসেছে?

কোনো উত্তর এল না ওদিক থেকে। একটা চাপা, একঘেয়ে গোঙানির শব্দ করছে দরজার ওদিকে দাঁড়ানো অতিথি। আর একইভাবে দরজা দিয়ে ঢোকার অবিরাম চেষ্টা করে চলেছে।

সভয় দরজা খুলে ফেলল তারা। আর তখনই বিদ্যুতের ঝলকানিতে দেখতে পেল সেই ভয়ংকর দৃশ্য!

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মকবুল মিয়া! জীবিত? না, না! জীবিত নয়, আবার মৃতও নয়! সারাগায়ে কবরের মাটি, উলঙ্গ, পোকায় কাটা শরীর, চোখে মৃত মাছের মতো ঘোলা দৃষ্টি! দাঁড়িয়ে আছে মকবুল! সে না জীবিত, না মৃত। বোধবুদ্ধিহীন, জীবনমৃত্যুর মাঝে ঝুলে থাকা, কবর থেকে উঠে আসা একটা শরীর শুধু!

মকবুলকে আবার কবর দেওয়া হয় পরের দিন। সে কিন্তু তখনও জীবিত- মৃতদেহ অবস্থাতেই ছিল। সে আর কোনোদিন মরবে না, আবার বাঁচবেও না। কবর খুঁড়ে উঠে আসতে চাইবে প্রতিবার।

আর তাই, গ্রামের এক বুদ্ধিমান ব্যক্তি একটা উপায় বের করলেন। বললেন মকবুলকে উলটো কবর দিতে, যাতে সে যত মাটি খুঁড়তে থাকবে, ততই আরও গভীরে ঢুকে যাবে। ফিরে আসতে পারবে না কোনোদিন মাটির উপর জীবিত- মৃত হয়ে।

গল্পটা মায়ের কাছে যেভাবে শুনেছে, সেভাবেই বলা শেষ করল রফিক।

ইমন এতক্ষণ বিভোর হয়ে শুনছিল এই অদ্ভুত গল্প। রফিক থামতে সে প্রশ্ন করল,

‘তারপর?’

রফিক উত্তর দিল,

‘সেই থেকেই আমাদের বাড়ির সমস্ত বড়োছেলেদের উলটো কবর দেয়ার নিয়ম।’

‘বুঝলাম! দারুণ গল্প।’

উত্তর দিল না রফিক। সে কিন্তু গম্ভীর হয়ে আছে।

ইমন আবার বলল,

‘কী রে? কী এত ভাবছিস?’

একটা কথা বলবে, ভাবল রফিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বলল না। মুখের চুইংগামটা ফেলে দিয়ে, ঘাড় নেড়ে শুধু বলল,

‘নাহ্। কিছু না।’

.

তিন মাস কেটে গেছে।

রফিক ক্লাসে ঢুকতেই ইমন প্রশ্ন করল,

‘কী রে? এরকম ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থা কেন?’

নিজের জায়গায় বসে বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল রফিক। ইমন শুনবে না পেয়ে আবার প্রশ্ন করল,

‘রাতে ঘুম হয়নি?’

ঘাড় নেড়ে রফিক জানাল যে, হয়নি। ইমনকে চিন্তিত লাগল,

‘তুই মাঝে মাঝেই বলছিস, আজকাল রাতে ঘুম হচ্ছে না। কেন বল তো? কী সমস্যা?’

রফিক চোখ তুলে তাকাল ইমনের দিকে। নাহ্, কথাটা এইবার তার বলেই ফেলা উচিত। অন্তত ইমন ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবে না।

রফিক বলল,

‘বাইরে চল। এখানে বলা যাবে না।’

ক্লাস বাঙ্ক করে দু-জন বেরিয়ে এসে মাঠের একটা নিরিবিলি কোনায় বসল।

‘এইবার বল। কী ব্যাপার? আমার অনেকদিন থেকেই মনে হচ্ছে, তুই কিছু একটা বলবি বলবি করেও বলতে পারছিস না।’

রফিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

‘কথাটা কীভাবে বলব ভেবে পাচ্ছি না। আসলে প্রথমে আমিও ব্যাপারটা আমল দিইনি।’

‘কী ব্যাপার?’

ইমন লক্ষ করল, রফিকের হাত দুটো মৃদু কাঁপছে। রফিক বলল,

‘ভাই, আমি ওই জিনকে দেখেছি।’

‘কী? কী বললি?’

‘জেঠু মারা যাওয়ার পর তোকে আমাদের ফ্যামিলির একটা লেজেন্ড বলেছিলাম, মনে আছে?’

‘হ্যাঁ। ওই উলটো কবর দেয়ার বিধি নিয়ে।’

‘হ্যাঁ।’

‘তো? তাতে কী হয়েছে?’

‘জেঠু যেদিন মারা যায়, দাফন দিয়ে এসে সেই রাতে প্রথম দুঃস্বপ্নটা দেখি। ঠিক স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন এতটা স্পষ্ট হয় না। দেখলাম, একটা কালো ছায়া আমার ওপর ঝুঁকে আছে। ফিসফিস করে কথা বলছে! ভাষাটা চেনা হলেও, সেই রাতে বুঝতে পারিনি কী বলল।

ব্যাপারটা পাত্তা দিইনি। তোকে বলিনি সেই কারণেই। কিন্তু, তারপর থেকে মাঝে মাঝেই এই ছায়াটা রাতে আসে। একই কথা বার বার বলে। আর সেইসঙ্গে আরও একটা দৃশ্য দেখতে পাই। আজকাল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে স্বপ্নের দৃশ্যগুলো।’

‘কী দৃশ্য?’

‘জেঠুকে দেখি।’

‘তাই? হুম! মরা মানুষের স্বপ্ন দেখাটা খুব অস্বাভাবিক নয়। তবে, ভয় লাগাই স্বাভাবিক।’

ঘাড় নাড়ে রফিক। বলল,

‘তুই যেমন ভাবছিস, সেইরকম নয়। দৃশ্যটা অনেক বেশি ভয়ংকর। কারণ আমি দেখতে পাই, জেঠু কবরের নীচে শুয়ে আছে। জীবিত-মৃতদেহ হয়ে! শরীরে পোকা ভরে গেছে, দু-চোখ গলে গেছে, কিন্তু সে মাটি আঁচড়ে খুঁড়ে চলেছে সমানে! প্রতি স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে সেই দেহের পচন বাড়ছে, সেটাও দেখতে পাই। প্রচণ্ড ভয়ের সেই বীভৎস দৃশ্য! একটা পচতে থাকা, শরীরে পোকা ভরতি একটা মৃতদেহ কবরের নীচে ক্রমাগত গর্ত করে চলেছে! সেই শব্দ শুনতে পাই আমি, মাটির আর মাংস পচা গন্ধও যেন নাকে এসে লাগে ঘুমের মধ্যে! ভয়ে চিৎকার করে উঠতে যাই! কিন্তু, পারি না উঠতে। শরীর নাড়াতে পারি না সেইসময়ে। এক ধরনের স্লিপ প্যারালিসিস হয়ে যায়।

আর তখনই তাকে দেখতে পাই! সেই কালো ছায়াটা, ঝুঁকে আছে আমার ওপর! কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কয়েকটা কথা বলে। তারপরেই হঠাৎ সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু, এতটাই মানসিক চাপ পড়ে এতে যে, সেই রাতগুলোতে আর ঘুম আসে না।’

একটা সিগারেট ধরিয়ে ইমন প্রশ্ন করল,

‘ছায়াটা তোকে কী বলে সেটা বুঝতে পারিসনি?’

‘পেরেছি। প্রথমে বুঝতে না পারলেও, পরে বুঝেছি। আসলে সে যে ভাষায় কথা বলে সেটা ‘আরবি’। ছোটোবেলায় কিছুটা পড়েছিলাম, এখন ততটা মনে নেই, তাই প্রথমবার ধরতে পারিনি। তিন-চারবার এই স্বপ্ন দেখার পর কথাটা শুনতে পারি। পরে সেটার মানে খুঁজে দেখেছি ইন্টারনেটে।’

‘কী মানে?’

‘ওই ছায়াটা বার বার যেটা বলে, সেটা হল- ‘এরপর তুমি!’

‘তুই? মানে, এরপর অভিশাপ তোর ওপর আসছে? কিন্তু, কেন?’

‘কারণ, জেঠু বিয়ে করেনি। তাই তার মৃত্যুর পর পরিবারের বড়োছেলে আমি। আমি নিশ্চিত, ওটা সেই জিন। সে বার বার মনে করিয়ে দিতে আসে আমার মৃত্যুর পরের ভয়ানক পরিণতি! জীবন আর মৃত্যুর মাঝে আটকে থাকা এক চিরকালীন অভিশাপ! আমারও পরিণতি হবে ওই একই! কবর থেকে বেরিয়ে আসার বৃথা চেষ্টায় সময়ের শেষ অবধি শুধু মাটি খুঁড়ে যাব! কিন্তু, বেরিয়ে আসতে পারব না কোনোদিন, কারণ আমাকেও উলটে শুইয়ে দেয়া হবে কবরে!’

রফিক থামল। ইমন কিছু বলল না খানিকক্ষণ। রফিকের অবস্থা দেখে তার মন ভারাক্রান্ত হয়েছে। সে বুঝতে পারছে কী ঘটছে। তার বন্ধু একটা গভীর মানসিক ব্যাধি বাধিয়ে বসে আছে।

ইমন প্রশ্ন করল,

‘বাড়িতে এই দুঃস্বপ্নের কথা জানিয়েছিস?’

ঘাড় নেড়ে রফিক জানাল — ‘না।’

ইমন সিগারেট শেষ করে সেটা ফেলে দিয়ে বলল,

‘দেখ, ব্যাপারটা তুই যেরকম ভাবছিস, তা নয়। একটু শান্তভাবে ভেবে দেখ, তুই নিজেই বুঝতে পারবি।’

প্রথম তুই এই দুঃস্বপ্ন দেখেছিলি, জেঠুকে কবর দিয়ে আসার রাতে। মনে করে দেখ, সেই সন্ধেতেই তুই প্রথম তোর আম্মির কাছে তোদের এই পারিবারিক লেজেন্ডটা শুনেছিলি। গল্পটা খুবই অদ্ভুত এবং চমকপ্রদ। আমি নিজেও শুনে শিহরিত হয়েছিলাম তোর কাছে। অতএব, তোর মনে সেটার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে যেখানে তুই সদ্য সদ্য নিজের পরিবারের এক প্রিয়পাত্রের মৃত্যুতে এমনিতেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে ছিলিস আগে থেকে। ওই গল্পটা তোর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তুই সেটা ভুলতে পারছিস না, সেটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিস না।’

রফিক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

‘কিন্তু, শুধু আমিই দেখেছি স্বপ্নটা। আর তা ছাড়া আমি ‘আরবি’ ভুলে গেছি। নিজেও পুরোদস্তুর বাঙালি, আরবিতে কথা বলি না। তাহলে স্বপ্নে এত স্পষ্ট আরবি ভাষা কীভাবে শুনছি?’

‘তুই নিজেই বললি যে, আরবি ভাষা ছোটোবেলায় তুই শিখেছিলি। তুই ভুলে গেলেও, ব্রেন বড়ো অদ্ভুত জিনিস। সেটা ব্রেন ভুলে যায়নি। সেই রাতে তুই যখন প্রথম গল্পটা শুনলি যে, পরিবারের বড়োছেলের ওপর অভিশাপ লাগে, তুই হিসেব করে নিলি যে, জেঠুর পর তুইই পরিবারের বড়োছেলে। আর তাই, রাতে তুই দেখলি যে, জিন এসে তোকে বলে যাচ্ছে যে, এরপর তোমার পালা।’

চুপ করে বসে রইল রফিক। তার মন মানছে না। পুরোটাই মনের ভুল? এত স্পষ্ট কোনো দুঃস্বপ্ন হয়?

ইমন তার মনের কথা আন্দাজ করেই বলল,

‘আমার মনে হয় তোর কোনো ভালো মনোবিদের সাহায্য নেয়া উচিত। চল, এই উইকেন্ডে আমি আর তুই যাই। বাড়িতে কাউকে জানাতে হবে না।’

রফিক তাও কিছু না বলে বসে রইল। ইমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার বুঝতে বাকি রইল না যে, গত তিন মাসে তার বন্ধুর মনের অনেকটা গভীরে একটা ভয়, একটা বিশ্বাস শেকড় গজিয়ে বসেছে। সে কিছুতেই এটাকে মাত্র একটা মানসিক সমস্যা বলে মেনে নিতে পারছে না। মনোবিদের কাছে গিয়েও কোনো লাভ হবে বলে রফিক মনে করছে না।

কিন্তু, বন্ধুকে এভাবে ছাড়তে নারাজ ইমন। ব্যাপারটা অলরেডি দেরি হয়ে গেছে, আরও দেরি করলে সমস্যা বাড়বে। রফিকের মন থেকে এই ভয়টা যেন-তেন উপায়ে দূর করতেই হবে। তাই, এইবার নিজের শেষ মোক্ষম তিরটা চালাল ইমন।

‘আরও একটা উপায় আছে।’

রফিক মুখ তুলে বন্ধুর দিকে তাকাল। ইমন বলল,

‘এটা যে তোর অহেতুক ভয়, যদি সেই প্রমাণ স্বচক্ষে দেখিস তবে আমার বিশ্বাস, তোর মনের এই ভয়টা চিরকালের জন্যে দূর হবে। সেটা করার একটাই উপায়।’

‘কোন উপায়?’

‘তোর জেঠুর কবর খুঁড়ে দেখা!’

.

দু-সপ্তাহ পরের একটা রাত।

পূর্ণিমার চাঁদে এতটাই আলো করে রেখেছে যে, আলাদা করে আলোর প্রয়োজন হচ্ছে না। মাটি খুঁড়ছে দু-জন।

ইমন বরাবরই ডাকাবুকো। খুব একটা নিয়মনিষ্ঠার তোয়াক্কা করে না। কিন্তু, রফিক তা নয়। তার পরিবার সাধারণ মুসলিম, ধর্মভীরু পরিবার। তাই এই ‘হারাম’ করতে মোটেই রাজি ছিল না। কিন্তু, ইমন নাছোড়বান্দা। তার কথা হল, মৃতদেহ তুলে আনা হারাম। তারা তো আর সেটা করবে না। একবার শুধু দেখবে যে, মৃতদেহ স্বাভাবিক আছে। ব্যস, তাতেই হবে। প্রমাণ হয়ে যাবে যে, রফিকের মনের ভয় অমূলক। আবার কবর মাটি চাপা দিয়ে কেটে পড়বে। কেউ জানতেও পারবে না। রফিকের মনেও একটা অবদমিত কৌতূহল বেড়ে উঠছিল বটে। হাজার হোক, সেও পড়াশোনা শেখা এইসময়কার ছেলে। তা ছাড়া, বন্ধু ইমনের কথাগুলো খুবই যুক্তিপূর্ণ, সেটা অস্বীকার করা যায় না।

রাতে এইদিকটা খুবই শুনশান থাকে। তা ছাড়া, এদিকের কবরখানায় কোনো রক্ষী থাকে না। এই শহরে কেউই মৃতদের নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না।

তাই কয়েক ঘণ্টা আগেই, রাতে হোয়াটসঅ্যাপে ইমনের মেসেজ আসতেই পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল রফিক। বাড়ির সবাই ঘুমে ডুবে আছে। বেরিয়ে দেখল সেখানেই গলির মুখে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সিগারেট

টানছে ইমন। সকালেই কলেজে ঠিক করে রেখেছিল প্ল্যান।

‘ভাই, আমার ভয় করছে। বাদ দে। আমি বরং তোর কথামতো মনোবিদের কাছে যাব।’

রফিকের ঘাড়ে একটা হালকা চাপড় মেরে ইমন বলল,

‘থাক, হয়েছে। বেরিয়ে যখন পড়েইছি আজ রাতে, তখন আজ রাতেই সমস্যার সমাধান করে ফেলব। নে, ধর!’

ইমনের হাতে একটা কোদাল আর একটা বেলচা ছিল। কোদালটা রফিকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজে এক কাঁধে বন্দুকের মতো করে বেলচাটা ফেলে হাঁটা দিল। পেছন পেছন হাঁটা দিল রফিক।

এখন কিন্তু কবর খুঁড়তে গিয়ে রফিকের ততটা ভয় করছে না। প্রথমে একটা ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাব ছিল, কিন্তু যতই গর্ত গভীর হচ্ছে, ততই সেটা কেটে যাচ্ছে।

ইমন সত্যিই অসাধারণ। এই গভীর রাতে, অন্ধকার কবরখানায় একটা তিন মাস পুরোনো কবর খুঁড়ছে। অথচ, কোনো ভয়ডর নেই। সিগারেট টানছে আর গুনগুন করে হিন্দি গানের কলি গাইছে। রফিকের চোখে জল এল। অনেক ভাগ্য করলে আল্লা এরকম বন্ধু দেয় মানুষকে। শুধুমাত্র তার জন্যে এত বড়ো রিস্ক নিচ্ছে ইমন। সব কিছু বাদ দিলেও, ধরা পড়লে দু-জনেরই জেল হবে নিঃসন্দেহে। সেটা কি কম রিস্ক?

যতই গভীর হচ্ছে গর্তটা, ততই দোনামনা ভাব কেটে যাচ্ছে রফিকের। তার এক ধরনের নিশ্চিন্ত লাগছে। কারণ, ইমনের কথাটা সত্যি। একবার মৃতদেহটা স্বাভাবিক অবস্থায় দেখে নিলেই তার মনের সব সংশয় দূর হবে। বরাবরের মতো।

হঠাৎ ইমনের বেলচাটা অনেকটা একবারে ঢুকে গেল। একটু অবাক হল ইমন।  

‘কী হল?’

রফিক প্রশ্ন করল। উত্তর দিল না ইমন। তার ভ্রূ কুঁচকে গেছে। গানের কলি থেমে গেছে।

দ্রুত হাত চালিয়ে কিছুটা মতোই সরিয়ে ফেলল ইমন। তার দেখাদেখি একই কাজ করল রফিক।

সাদা কাফনের কাপড়টা দেখা যাচ্ছে। যদিও তিন মাস মাটির নীচে থেকে সেটা মলিন। কিন্তু…কিন্তু একী! এ কী দেখছে তারা?

প্রবল আতঙ্কে হাতের কোদাল ফেলে মাটিতে পড়ে গেল রফিক! তার মুখ থেকে একটা ভয় মেশানো ‘গোঁ গোঁ’ আওয়াজ বেরোচ্ছে। বিস্ফারিত চোখে পাথরের মতো স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ইমনও। তার চোখে তীব্র আতঙ্ক!

কারণ, তাদের চোখের সামনে এক অদ্ভুত দৃশ্য। কবরের মধ্যে পড়ে রয়েছে ছেঁড়া কাফনের কাপড়গুলো। সেগুলো কেউ ছিঁড়ে ফেলেছে। মৃতদেহ তাতে নেই।

কবরের মধ্যে এক মানুষ সমান গর্ত যা নেমে গেছে নীচে, অনেক নীচে। অন্ধকার পাতালে নেমে গেছে গভীর এক গর্ত! নীচ অবধি অন্ধকারে দেখা না গেলেও, রাতের নিস্তব্ধতায় কান পাতলে এখনও শোনা যাচ্ছে সেটা। অন্ধকার গভীর পাতালের থেকে ভেসে আসছে একটা মৃদু আঁচড়ানোর শব্দ। ঠিক যেন অনেক, অনেক নীচে কেউ বা কিছু একটা অবিরাম নখের আঁচড়ে খুঁড়ে চলেছে মাটি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *