ছোপ
[বহু কোটি বছরের বিবর্তনে মানুষের মস্তিস্ক ‘প্যাটার্ন’ খুঁজতে অভ্যস্ত। তাই মাঝে মাঝেই দেখা যায় মানুষ আকাশের মেঘে জীবজন্তুর আকার খুঁজে নেয়, কাপড়ের দাগে ঈশ্বরের মুখ খুজে নেয়, বা, দেয়ালের ছোপে শয়তানের মুখ দেখতে পায়।]
.
ক্লাস সিক্স, সেকশন বি।
অঙ্ক স্যার সবেই বেশ বেয়াড়া একটা ইকুয়েশনের সমাধান করে ‘x’-এর মানটা বোর্ডে লিখতে যাবেন। এমন সময়ে একটি ছেলে এসে দাঁড়াল ক্লাসের দরজার সামনে। স্কুল ইউনিফর্ম পরে আছে দেখে বোঝা যায় স্কুলেরই ছাত্র। অঙ্কে বাধা পেয়ে স্যার কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতেই লেখা থামিয়ে দরজার দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন,
‘কী?’
ছেলেটা উত্তর না দিয়ে তার হাতে ধরা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল স্যারের দিকে। অতএব, এইবার বাধ্য হয়েই চক নামিয়ে রাখতে হল স্যারকে। তাতে তিনি খুবই বিরক্ত হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ দিনে অর্জুনকে গাণ্ডিব নামিয়ে রাখতে বললে তিনিও এরকমই বিরক্ত হতেন বলেই মনে হয়। কথাটা মনে হতেই আমি ‘ফিক’ করে নিজেই হেসে দিলাম।
স্যার এগিয়ে গিয়ে ছেলেটার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর আরও একবার ছেলেটিকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ক্লাসে বসা আমাদের দিকে ফিরে বললে,
‘এর নাম সুমন সেনগুপ্ত। আজ থেকে তোমাদের ক্লাসে জয়েন করছে।’
তাঁর দায়িত্ব শেষ এমন ভঙ্গিতে কাগজটা ছেলেটির হাতে দিয়ে তিনি আবার চক তুলে বোর্ডের দিকে হাঁটা দিয়েছেন। ছেলেটা কী করবে বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। এদিকে স্যার অঙ্কে ডুবে গেছেন। ফাঁকা সিটের আশায় এদিক-ওদিক চাইছে সুমন ছেলেটা। আমি আমার ডান দিকের ফাঁকা ডেস্কটার দিকে ইঙ্গিত করলাম। কিন্তু, ছেলেটা সেটা খেয়াল করল না। এগিয়ে গেল একদম পেছনের কোনার ডেস্কের দিকে। সেখানে গিয়ে কাঁধ থেকে ব্যাগ খুলে বসে পড়ল ওতে।
আমারই মতো বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে নতুন ছেলেটির কার্যকলাপ দেখছিল। অঙ্ক স্যারের ধমকে আবার সবাই সামনে তাকালাম। তবে, নতুন ছেলেটাকে ওই শেষের কোনার ডেস্কে বসতে দেখে আমার একটু অস্বস্তি হল। বোধ হয় অন্য সকলেরও হয়েছে। কারণ, ওটায় আমরা কেউ বসি না। কারণটা শুনলে এখন হয়তো তোমরা হাসবে। আসলে ওই ডেস্কটা এমন একটা কোনায় যে দু-দুটো বড়ো জানলার আলো ওই অবধি পৌঁছোতে পারে না। যবে থেকে এই স্কুল বিল্ডিং তৈরি হয়েছে, তবে থেকেই ওই জায়গাটা রোদ থেকে বঞ্চিত। যে কারণে ওই জায়গাটা স্যাঁৎসেঁতে, ঠান্ডা। ড্যাম্পের দাগ রয়েছে কোনার দেওয়ালে জায়গায় জায়গায়। বিশেষ করে একটা দাগ। ওই দাগটা আমাদের সব ছাত্রর মনেই এক ধরনের ভয়ের অনুভূতি জাগায়।
ওই ডেস্কের পেছনের লাগোয়া দেওয়ালটার গায়ে একটা ছোপ আছে। সেটার আকৃতিটা অনেকটা একটা মুখের মতন। ঠিক মানুষের মুখ না, তবে, মুখের মতন। কালো ড্যাম্পের দাগে একটা বিকৃত মুখের আদল। তাতে দুটো শূন্য চোখের মতো পাশাপাশি গোলাকার ফাঁক, আর সেই দুটোর নীচে একটু ডান দিক ঘেঁষে আরও একটা গোলাকার ফাঁক। দেখলে মনে হয় যেন দুটো শূন্য গোলাকার চোখ আর একটা হাঁ-করা মুখের সিলুয়েট দেওয়াল থেকে তাকিয়ে আছে। ওই দাগটা যায় না কিছুতেই। আগের বছরেও এই ক্লাসরুমেই আমাদের ক্লাস ফাইভের ক্লাস ছিল। তখন থেকেই ওই ছোপটা নিয়ে আমাদের মনে একপ্রকার ভীতি ছিল। এই বছর নতুন ক্লাস শুরু হওয়ার আগে স্কুলের দেওয়ালে নতুন করে চুনকাম করানো হয়েছিল। কিন্তু, একদিন বাদেই আমরা দেখলাম যে, দেওয়ালের কোনায় ওই দাগটা আবার ফুটে উঠেছে। কতবার ক্লাস চলতে চলতে মনে হয়েছে যে, পেছন থেকে ওই মুখটা আমাদের ওপর নজর রাখছে, তার হিসেব নেই। পেছনে ঘাড় ঘুরিয়েই ওই কালো ছোপটা দেখে দিনের আলোতেও কেন জানি না গা শিরশির করে ওঠে।
তবে, আমাদের মধ্যে ওই দাগটা নিয়ে এরকম অকারণ ভয়ের সৃষ্টি হওয়ার পেছনে আমাদের গোপালের কিছুটা হাত আছে বটে। গোপাল আমাদেরই ক্লাসে পড়ে। গোপালই আগের বছর আমাদের এসে বলেছিল যে, ওই দাগটা নাকি কুনী ভূত! গোপাল গ্রামের ছেলে। ও নাকি ওর ঠাকুমার থেকে কুনা ভূতের গল্প শুনেছে। এরা নাকি বাড়ির সেইসব অন্ধকার কোনায় থাকে যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছোয় না। আমরা সবাই মুখে গোপালকে বোকা, গেঁয়ো ভূত বললেও, মনে মনে কিন্তু সকলেই সেই থেকে ওই কোনার ডেস্কটা এড়িয়ে চলি।
টিফিনের সময়ে আমরা কয়েক জন গিয়ে নতুন ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করলাম। সুমন ছেলেটা দেখলাম এমনিতে খুব চুপচাপ। একদমই বেশি কথা বলে না। সেই কারণে ছেলেটার সঙ্গে কথাবার্তা কারুরই ঠিক জমল না। দু-এককথায় সব প্রশ্নের উত্তর দিল ছেলেটা। খেলতে ডাকলাম ওকে আমাদের সঙ্গে। কিন্তু, ও এল না। বলল ওর নাকি শরীর খারাপ। খেলাধুলা বারণ আছে।
কথাটা আমরা অবিশ্বাস করলাম না। কারণ সত্যি বলতে সুমন ছেলেটার শরীর দেখলে তাই মনে হয় বটে। ছেলেটার চেহারা রোগাটে ধরনের। তাই আমরা খেলতে চলে গেলাম। মেয়েরাও টিফিনের ফাঁকে এক্কাদোক্কা, রিংগা রিংগা খেলতে
মাঠেই বেরিয়ে আসে। এই সময়টুকুই স্কুলে আমাদের সবারই সবচেয়ে আনন্দের সময়। সবাই তাড়াহুড়ো করে কোনোভাবে নাকে-মুখে টিফিন খুঁজে বেরিয়ে পড়ি খেলতে। চল্লিশ-পঞ্চাশ মিনিট ঘাসের ওপর হুটোপুটি করে আবার ফিরে আসি পরের তিনটে ক্লাস করতে।
আজকে খেলায় হেরে আমি আর আশিস সবার আগে ক্লাসে ফিরছিলাম। কথা বলতে বলতেই হাঁটছিলাম। ক্লাসের দরজার সামনে এসে কানে এল ভেতরে একজন চাপা খিলখিল হাসি হাসছে। কথাও বলছে যেন। সুমনের গলা। তার মানে ওর সঙ্গে কেউ গল্প করছে। যাক, ভালোই। ছেলেটা একা একা বসে বোর হয়নি তাহলে।
কিন্তু, ক্লাসে ঢুকতেই অবাক হলাম। কারণ, সুমন একা বসে আছে ক্লাসে নিজের জায়গায়। অন্য কেউ ঘরে নেই। আমাদের দেখেই কথা থামিয়ে দিল সুমন। আমি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলাম,
‘কার সঙ্গে কথা বলছিলে?’
সুমন উত্তর দিল,
‘কই না তো!’
‘শুনলাম যেন তুমি হাসছ, কথা বলছ।’
‘না। ভুল শুনেছ।’
সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে সামনে খোলা বইয়ে মাথা গুঁজে দিল সুমন। আমি আর আশিস একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। আমি আর আশিস পাশাপাশি বসি। নিজেদের জায়গায় বসে আমি চাপা গলায় আশিসকে বললাম,
‘তুইও তো শুনেছিস ওকে কথা বলতে। শুনিসনি?’
মাথা চুলকে আশিস বলল,
‘কী জানি, মনে তো হল শুনলাম।’
‘ছেলেটা মিথ্যে বলছে।’
‘মিথ্যে কেন বলবে? দেখছিস তো ঘরে কেউ নেই।’
‘আমার কিন্তু অন্য একটা সন্দেহ হচ্ছে।’
‘কী সন্দেহ?’
‘সুমন ব্যাগে লুকিয়ে মোবাইল ফোন এনেছে! ওতেই কথা বলছিল।’
‘কিন্তু, আমরা যখন ঢুকলাম, তখন তো ওর হাতে মোবাইল ফোন দেখলাম না। ‘আরে, ও না নিশ্চয়ই আমাদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে লুকিয়ে ফেলেছে। আমি নিশ্চিত ও মোবাইলে কথা বলছিল। ওইজন্যেই তো অন্য কারুর গলা পাইনি। শুধু ওর গলা শুনলাম। তুই শুনিসনি?’
‘ইয়ে…মানে…’
মাথা চুলকোল আশিস। আশিসের এই এক দোষ। ও খুব সহজেই কনফিউজড হয়ে যায়। পড়া জিনিসও ওকে স্যার বা ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলে ও বলতে পারে না। মাথা চুলকে আমতা আমতা করে। কোনো কিছু নিয়েই ও নিশ্চিত নয়! ও আমার পাশে পাশেই হেঁটে আসছিল। আমি নিশ্চিত যে ও-ও শুনেছে সুমনের কথা বলার আর হাসির আওয়াজ। কিন্তু, এখন ও নিশ্চিত নয়! এখন জিজ্ঞেস করলে বলবে— ‘বোধ হয় ভুল শুনেছি।’
তবে, এই নিয়ে আর কথা হল না। কারণ, একে একে ক্লাসের অন্যেরা আসতে শুরু করেছে। ক্লাস শুরু হয়ে গেল। তবে, আমার মনে সুমন ছেলেটার প্রতি একটা সন্দেহ ঢুকে গেল। যদিও, দেখতে গেলে ওর কোনো দোষ নেই। স্কুলে ফোন আনা নিষেধ। দেখতে পেলেই প্রিন্সিপাল স্যার তলব করে। ফোন নিয়ে নেয় আর সেটা গার্জেন কল করে ফেরত দেয়। অতএব, ধরা পড়লে হ্যাপা। সুমন নতুন ছেলে। আমায় বিশ্বাস করবে কেন? ওর কাছে ফোন আছে সেটা যদি আমরা স্যারকে বলে দিই? তাই, আমাদের সত্যি না বলাটাই ওর পক্ষে স্বাভাবিক।
তবে, আমি মাঝে মাঝে পেছন ফিরে আড়চোখে নজর করছিলাম ওকে। যদি হঠাৎ ফোনটা দেখতে পাই ওর হাতে। কিন্তু, বার বারই ওকে দেখতে গিয়ে চোখ চলে যাচ্ছিল ওর ঠিক পেছনের দেয়ালেই, মাথার ওপর ওই বিচ্ছিরি মুখটার দিকে! আর, ততবার অস্বস্তিতে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিলাম। এভাবেই বাকি সময়টা কাটল। ছুটির পর আর ব্যাপারটা মনে ছিল না।
.
২
আগামী এক-দেড়মাস স্কুল চলল নিজের ছন্দে। সুমনের সঙ্গে আমাদের কারুরই সখ্যতা গড়ে উঠল না। সুমন নিজের মতোই থাকত। কারুর সঙ্গেই কথাবার্তা বলত না। স্যার বা ম্যাডামরা কোনো প্রশ্ন করলেও কিছুই উত্তর দিত না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত।
কিন্তু, আমি লক্ষ করেছিলাম যে, ওর মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা আছে। শারীরিক কিছু সমস্যা তো ওর আছেই। কারণ, ও দিন দিন যেন আরও রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছে। ওকে মাঝে মাঝেই নিজের মনে বিড়বিড় করতে দেখেছি আমি। আমাদের সকলের আগে সুমন ক্লাসে চলে আসে। আমরা ক্লাসে ঢুকে দেখি সুমন ঠিক নিজের জায়গায় বসে আছে। আবার ছুটি হলে যেমন আমরা সকলেই হুড়োহুড়ি করে ক্লাস থেকে বেরিয়ে দৌড় লাগাই মুক্তির আনন্দে, সুমন কিন্তু সবার শেষে বেরোয়। সারাদিন কী করে ও ওই কোণে বসে?
একদিন হল কী, ইংরেজি ক্লাস চলছে তখন। ম্যাডাম ‘প্রোনাউন’ শেখাচ্ছেন বোর্ডে। হঠাৎ ক্লাসের পেছন থেকে খিলখিল হাসির শব্দ এল। আমাদের সকলের মাথা সেই হাসির উৎপত্তিস্থল লক্ষ করে ঘুরে গেল। সুমন হেসেছে।
ইংরেজি ম্যাডাম এমনিতেই রাগী। দেখলাম তাঁর কপালের রগ ফুলতে শুরু করেছে। কড়া গলায় বললেন,
‘হাসছ কেন?’
সুমন হাসি থামানোর চেষ্টা করে উঠে দাঁড়াতে গেল। কিন্তু, ওর হাসি থামল না। যেন ও বাধ্য হচ্ছে হাসতে। অনেকটা কাউকে কাতুকুতু দিলে লোকে যেভাবে হাসে, সেভাবে।
ম্যাডামের রাগ এমনিতেই পঞ্চমের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। এতক্ষণে সেটা সপ্তমে পৌঁছেছে। হুংকার দিয়ে বললেন,
‘বেরিয়ে যাও!’
কিন্তু, সুমন নড়ল না। ম্যাডাম আবারও বললেন,
‘কী হল? শুনতে পাচ্ছ না? এখুনি বেরিয়ে যাও ক্লাস থেকে!’
সুমন তাও নড়ে না।
ম্যাডাম এইবার রাগে ফুঁসতে থাকা ষাঁড়ের মতো এগিয়ে গেলেন সুমনের দিকে। সুমনের হাত ধরে ওকে ডেস্ক থেকে বের করে আনতে চাইলেন। আশ্চর্যভাবে সুমন এক চুলও নড়ল না। দেড়মনি ষাঁড়ের মতো ইংলিশ ম্যাডাম অনেক টানাটানি করেও সুমনকে নাড়াতে পারলেন না।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে এই ঘটনা দেখে চলেছি নিজেদের চোখে। সুমনকে বের করে আনতে না পেরে ম্যাডাম এইবার রাগের মাথায় একটা মোক্ষম চড় বসিয়ে দিলেন সুমনের ডান গালে! সুমন সেই চড়ের ধাক্কায় নিজের সিটে বসে পড়ল। কিন্তু, পরের ঘটনাটা ঘটল একেবারে আচমকা।
হঠাৎই ইংরেজি ম্যাডাম ছিটকে পড়লেন মাটিতে। যেন, কেউ তাঁকে প্রবল জোরে ধাক্কা দিয়েছে। ম্যাডামের মুখের হতভম্ব ভাবটা কাটার আগেই তাঁর মুখের ভাব পালটে গেল। তাঁর মুখে-চোখে ফুটে উঠেছে ভয়! প্রবল আতঙ্ক! তাঁর দৃষ্টি সুমনের দিকে। না না, ভুল বললাম। সুমনের দিকে না, ম্যাডামের দৃষ্টি সুমনের পেছনের দিকে। দেওয়ালের দিকে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে আছে! এবং, তিনি যা দেখছেন তা ওঁর মধ্যে প্রবল ভয় সঞ্চার করেছে!
‘ও মা গো!’ জাতীয় একটা আর্তনাদ করে ম্যাডাম জ্ঞান হারালেন। আমরা চেঁচামেচি জুড়ে দিতে লোকজন এল, অন্য স্যার ম্যাডামরা এল। সবাই ধরাধরি করে ম্যাডামকে একটা চেয়ারে বসাল। জলের ঝাপটা দিয়েও জ্ঞান ফিরল না দেখে তাঁকে হাসপাতাল বা কোথাও একটা নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন প্রিন্সিপাল স্যার।
ম্যাডামকে নিয়ে যাওয়া হলে স্যার আমাদের জিজ্ঞেস করলেন যে, কী ঘটেছিল। আমরা এর-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। কারণ কী যে ঠিক ঘটেছে, সেটা আমরাও জানি না। আমরা টুকরো টুকরো করে যা বললাম, সেই শুনে প্রিন্সিপাল স্যার জানতে চাইলেন,
‘তবে কি সুমন ম্যাডামকে ধাক্কা দিয়েছে? সুমন তুমি কি ধাক্কা দিয়েছ?’
সুমনের দিকে তাকিয়ে স্যার দেখলেন রোগা ছেলেটা দুর্বলভাবে এক কোনায় বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। তার পক্ষে কোনোভাবেই এত জোর ধাক্কা দেওয়া সম্ভব নয় সেটা বোঝার মতো সাধারণ বুদ্ধি ওঁর আছে। তিনি ধরেই নিলেন নিশ্চয়ই পা হড়কে পড়ে গিয়েই এই বিপত্তি।
তবে, এরপর ইংলিশ ম্যাডাম আর স্কুলে আসেননি। শুনলাম তিনি সুস্থ হয়েই নাকি চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছেন। কারণটা তিনি স্পষ্ট করেননি। আমাদের সকলেরই ধারণা যে, ওইদিন ম্যাডাম কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন। দ্বিতীয়বার যেটার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়াই ভালো মনে করেছেন।
তবে, সেইদিনের পর থেকে আমাদের মনে ভয়ের ভাবটা আরও চেপে বসল। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার আমি লক্ষ করেছিলাম। সেটা ভেবেছিলাম আমারই মনের ভুল। কিন্তু, এর দু-দিন পর যখন আশিস নিজেই কথাটা আমায় বলল, সেইদিন আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছিল।
‘তুই একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?’
আশিসের প্রশ্নে আমি জানতে চাইলাম,
‘কী?’
‘দেয়ালের ওই দাগটা…মানে…ওটা নীচে নেমে এসেছে না?’
কথাটা শুনে সহজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী আমার একবার পেছন ফিরে কোণের দেওয়ালটা দেখা উচিত ছিল। কিন্তু, আমি তা করলাম না। কারণ, তার প্রয়োজন ছিল না। আমিও ব্যাপারটা কয়েক দিন আগেই লক্ষ করেছি। বোধ হয় অন্য সকলেও দেখেছে। কিন্তু, কথাটা কেউ মুখ ফুটে বলেনি। কারণ, প্রত্যেকের মনেই একটা চাপা আতঙ্ক কাজ করছে।
কথাটা সত্যি। ওই অদ্ভুত মুখের মতো দেওয়ালের দাগটা এতদিন দেওয়ালের ওপরদিকে ছিল। সিলিং যেখানে শেষ হয়ে আড়াআড়ি দেওয়ালটা যেখান থেকে শুরু হয়েছে, সেখানে। কিন্তু, এখন দাগটা যেন অনেকটাই নীচে নেমে এসেছে। প্রায় দেওয়ালের মাঝামাঝি এখন ওই মুখটা দেখা যায়। আমি হলফ করে বলতে পারি, এটা এতটা নীচে ছিল না! এখন ওটা সুমনের মাথার একটু উপরেই দৃশ্যমান। আগে সুমন দাঁড়ালেও ওটা মাথার ওপর থাকত বলেই মনে পড়ছে। এখন ও দাঁড়ালে ওটা ওর মাথা ছুঁয়ে থাকে।
আশিসও ব্যাপারটা খেয়াল করেছে বটে। আমি বললাম,
‘আমিও দেখেছি। জানিস তো, আমি ব্যাপারটা বাবাকে বলেছিলাম।’
‘সেকী? শুনে কী বলল কাকু?’
‘বাবা তো হেসেই উড়িয়ে দিল। বলল যে, আসলে এর একটা খুব সহজ ব্যাখ্যা আছে। আমার মাথায় বুদ্ধি নেই, তাই সেটা বুঝিনি।’
‘কী ব্যাখ্যা?’
‘বলছে, আসলে সুমন লম্বা হচ্ছে। রোজ দেখি বলে সেটা আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু, আসলে ও লম্বা হচ্ছে, তাই ওকে বসা বা দাঁড়ানো অবস্থায় দেখে আমাদের মনে হচ্ছে যে, দাগটা ওর কাছে চলে এসেছে, বা, নেমে এসেছে।’
আশিস যথারীতি আবার দোটানায় পড়ল। মাথা চুলকোতে শুরু করল। শেষে বলল,
‘তাই কি? তোর কী মনে হয়?’
আমি উত্তর না দিয়ে শুধু ঘাড় ফিরিয়ে আড়চোখে দেখলাম পেছনের কোনার ডেস্কে বসা সুমনকে। ছেলেটার ঠোঁট এখনও যেন নড়ছে। বিড়বিড় করে যেন কথা বলছে। খুব হালকা ঠোঁট নড়ছে বলে মনে হচ্ছে যেন। নিশ্চিত করে বলা যায় না। চোখ গেল ওই দেওয়ালটার দিকে। ছোপটা রয়েছে ওর মাথার কিছুটা ওপরেই। একইভাবে শূন্য চোখে, খোলা মুখে কালো দাগটা রয়েছে হলদে সাদা দেওয়ালের গায়ে। আচ্ছা, এটা কি আগে এতটা স্পষ্ট ছিল? কালো ছোপটা যেন এই কয়েক মাস সময়ে অনেকটা গভীরভাবে দেওয়ালে ফুটে উঠেছে।
এতটা স্পষ্ট কি ওটা বরাবরই ছিল?
.
৩
শীতের ছুটির সময় এসে গেল দেখতে দেখতে। আমার নিজের এই শীতের ছুটিটা গরমের ছুটির চেয়েও ভালো লাগে। যদিও গরমের ছুটির তুলনায় শীতের ছুটিটা নেহাতই কমদিনের জন্যে। তবুও, এই ঠান্ডার দুপুরে, রোদে শুয়ে লেপের নীচে ঢুকে গল্পের বই পড়ার মজাই আলাদা। তার ওপর রাতে বেগুনভাজা দিয়ে রুটি, তার সঙ্গে নলেন গুড়ের সন্দেশ! উফফ! তা ছাড়া বড়োদিন আর নিউ ইয়ারের আলাদা একটা মজা তো আছেই।
ইতিমধ্যে বলে রাখি, সুমনের শরীর আরও খারাপের দিকে গেছে। ওর চোখ- মুখ বসা, আরও রোগা হয়েছে। ওর চোখের দৃষ্টি কেমন যেন উজ্জ্বল। দেখলে ভয় লাগে। ক্লাসে একা একা বসে বিড়বিড় করে কথা বলে। সকালে সবার আগে চলে আসে, প্রায় এক ঘণ্টা আগে। আর, বেরোয় নাকি ছুটি হয়ে যাওয়ার আধ ঘণ্টা পর। দারোয়ান রোজই নাকি স্কুল ছুটির পর ক্লাস চেক করতে এসে ওকে ওই কোণের বেঞ্চে বসে থাকতে দেখতে পায়। দারোয়ান এসে তাড়া দিলে তবে ও জায়গা ছেড়ে বাড়ি যায়।
সুমনের সম্বন্ধে আরও একটা ব্যাপার আমরা জানতে পেরেছি। আমাদের ক্লাসের আলোকের বাবা চোখের ডাক্তার। সরকারি হাসপাতালে চাকরি করে। একদিন বাবার সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে গিয়ে ও সুমনকে দেখতে পেয়েছিল। বাবা-মায়ের সঙ্গে সুমন অন্য এক ডাক্তারের কাছে এসেছে। আলোকের কথায় ওর বাবা খোঁজ নিয়ে জেনেছে যে, সুমন সেনগুপ্ত ছেলেটির নাকি মাথার সমস্যা আছে। মানে, ও নাকি এমন অনেক কিছু দেখতে পায় বা শুনতে পায় যা আসলে নেই। রোগটার কী যেন একটা খটোমটো ইংরেজি নাম আছে। ওর বাবা বলেছে, তবে, আলোক সেটা বলতে পারেনি আমাদের। আলোকের বাবা তাই বলে দিয়েছিল যেন আমরা ওকে উত্ত্যক্ত না করি। ওর বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করি।
উত্ত্যক্ত করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু, বন্ধু হওয়ার ব্যাপারটাতে আমরা বিশেষ উৎসাহিত হলাম না। প্রথমত, সুমন নিজেই একটুও উৎসাহ দেখায়নি সেই প্রথম থেকেই। দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ম্যাডামের কাণ্ডটা হওয়ার পর থেকে আমরা একটু ভয়ে ভয়েই থাকি ওকে নিয়ে।
এমনিতেও কাল্পনিক জিনিস দেখা বা তাদের সঙ্গে কথা বলাটাও মোটেই সুবিধের নয়। তাও যদি ধরেও নিই যে, সুমনের মাথায় কিছু সমস্যা আছে, তাতে ওর অদ্ভুত আচরণের কিছু ব্যাখ্যা মিললেও, সব উত্তর কিন্তু মিলছে না।
যেমন, ওই ইংরেজি ম্যাডামের ব্যাপারটা। কী দেখেছিল ম্যাডাম যে, এত ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছিল সেদিন? আমরা তো কিছুই দেখতে পাইনি। তা ছাড়া, ওই দেওয়ালের ছোপটার ব্যাপারটাই-বা কী? আমার বাবা যতই বলুক যে, ওটা সুমন লম্বা হচ্ছে বলে আমার মনের ভুল, আমি মনে মনে মোটেই সেটা বিশ্বাস করি না। কারণ, দাগটা ক্রমেই ছাদের থেকে নীচের দিকে নেমে আসছে দেওয়াল বেয়ে! আর তা ছাড়া, ওটা এত স্পষ্টও ছিল না! হলদেটে সাদা দেওয়ালের গায়ে কালো মুখের অবয়বটা যেন দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এখন ওই মুখটা খুবই স্পষ্ট এবং এখন ওটা ঠিক সুমনের পেছনেই থাকে। পেছন ঘুরে দাগটা প্রায় দেখাই যায় না আর সুমন বসে থাকলে। সুমন যতই শুকিয়ে যাচ্ছে, দেওয়ালের মুখটা ততই স্পষ্ট হয়ে আসছে আর ওর আরও কাছাকাছি চলে আসছে। সুমনকে ওই জায়গাটা ছেড়ে বসতে বলেও লাভ হয়নি। ক্লাস-টিচার বলেছিলেন। কিন্তু, তাতে সুমন কেমন একটা হিংস্র ভঙ্গিতে তাকিয়েছিল ক্লাস- টিচারের দিকে। যেন, ওর থেকে খুব দামি কোনো খেলনা কেড়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। স্যারও আর এরপর ওকে ঘাঁটাননি।
কিন্তু, আমার দৃঢ় বিশ্বাস দেওয়ালের ওই দাগটা জীবন্ত! ওটা খুব অশুভ একটা কিছু! হয়তো গোপালের দিদিমার কথাটাই ঠিক। ওটা ভয়ংকর কিছু একটা। এবং, ওটা দিন দিন সুমন ছেলেটার শরীর থেকে প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে! কিন্তু, কেন? কেন ওটা কাছাকাছি আসতে চাইছে সুমনের? কী উদ্দেশ্য ওটার? সে-উত্তর আমার জানা নেই।
.
স্কুলে শীতের ছুটি শুরু হয়েছে সবে দু-দিন হল। শীতের দিনে বেলা করেই ঘুম থেকে ওঠা আমার অভ্যেস। উঠে দেখি, বেশ কয়েক বার স্কুলের অনেক বন্ধুর ফোন এসেছিল। মিসড কল হয়ে আছে অনেকগুলো।
আশিসকে ফোন করলাম উঠেই। যা বলল তা হল,
‘সুমন ছেলেটা কাল রাত থেকে নিখোঁজ! গভীর রাতে ওর বাবা, মা ঘুমিয়ে পড়লে ও দরজা খুলে বাড়ি থেকে পালিয়েছে! কোথায় গেছে এখনও খোঁজ চলছে।’
আমি চমকে গেলাম কথাটা শুনে। এ কী কথা? রাতে একা একা কোথায় যাবে? উত্তরটা কিন্তু আমি অনুমান করতে পারছিলাম। কী করব আমি? বলব কাউকে আমার ধারণাটা? কিন্তু, কেউ যদি বলে যে, আমি কীভাবে জানলাম? তখন কী বলব? কেউ বিশ্বাস করবে এই কথা যে, সুমন ওই দেওয়ালের মুখটার সঙ্গে কথা বলে, ওটাই ওর একমাত্র বন্ধু? কিন্তু, না বললে যদি সুমনের কোনো ক্ষতি হয়ে যায়?
অনেক ভেবে কথাটা বাবাকে বললাম। বাবা গম্ভীর মুখে উঠে গিয়ে কয়েকটা ফোন করল। তার মধ্যে একটা অবশ্য আমাদের ক্লাস টিচারকে, সেটা বুঝতে পারলাম।
এক ঘণ্টা বাদে বাবাই খবরটা দিল। সুমনকে পাওয়া গেছে। আমার অনুমানই ঠিক ছিল। ও রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা স্কুল বিল্ডিং-এর কাছে চলে এসেছিল। ওর বাড়ি থেকে স্কুল অন্তত চার কিলোমিটার তো হবেই। ও ওই ঠান্ডার মধ্যে, খালি পায়ে, গায়ে গরম জামা ছাড়াই অতটা রাস্তা হেঁটে স্কুলে গেছে কাল রাতে! তারপর পাঁচিল টপকে দালানে ঢুকে, সোজা গেছে আমাদের একতলার ক্লাস সিক্স বি-র ঘরটায়। ওকে সকালে ওই কোণের বেঞ্চেই পাওয়া গেছে অচেতন অবস্থায়। ওখান থেকে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আমি সবটা শুনে হতভম্ব হয়ে শুধু বসে থাকলাম।
.
৪
পরের দিন খবর পেলাম যে, তখনও সুমনের জ্ঞান ফেরেনি। ডাক্তার বলছে, অবস্থা ভালো নয়।
আমার নিজের স্কুলে একটা কাজ ছিল। একটা কাগজ জমা করার ছিল অফিসে। তাই, দুপুরের দিকে একবার স্কুলে গেছিলাম। কাজ সারতে আধ ঘণ্টা লেগে গেল। তারপর বেরিয়েই আসছিলাম, তখন আমাদের ক্লাসরুমটার সামনে দিয়ে হাঁটার সময় কী মনে হওয়ায় দাঁড়িয়ে গেলাম।
দরজা ভেজানো ছিল। হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। ঢুকলাম ভেতরে। ফাঁকা ক্লাসরুমটা দেখে আবারও আমার গা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। এমনিতে ছেলেমেয়েদের আওয়াজ সবসময়েই শোনা যায় স্কুলে। কিন্তু, আজ স্কুলেও লোকজন নেই। তাই, পরিবেশ যেন আরও নিস্তব্ধ। চোখ গেল ঘরের কোণের দেওয়ালটার দিকে। ছোপটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ, ওটা এতদিনে অনেকটাই নেমে এসেছে। ডেস্কের আড়ালে চলে গেছে, তাই কাছে না গেলে দেখা যায় না। আমি এগিয়ে গেলাম সেদিকে। কাছে গিয়ে উঁকি দিলাম বেঞ্চের গায়ে ঘেঁষা দেওয়ালটার দিকে।
কী দেখব আশা করেছিলাম, জানি না। কিন্তু, যা দেখলাম সেটা অন্তত আশা করিনি, তা বলতে পারি। কারণ, সেখানে ছোপটা নেই! ফাঁকা হলদেটে সাদা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। দেওয়ালে কিচ্ছু নেই! কোনো কালো ছোপ নেই, কোনো মুখের অবয়ব নেই।
কিছুক্ষণ আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে। আশেপাশের দেওয়ালেও চোখ বোলালাম। যদি অন্য কোথাও ওই ভূতুড়ে মুখটা দেখা যায়। কিন্তু নেই।
ব্যাপারটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম হয়তো ছোপটা আরও গভীর হয়েছে দেখতে পাব। কিন্তু, সেটা একেবারেই নেই ভেবে দিনের বেলাতেও আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমাদের এতদিনের ভয়ের উৎস, ওই ছোপটা না থাকলে আমার মনের ভয় কমার কথা। কিন্তু, আশ্চর্যভাবে মুখের মতো ওই ছোপটা দেওয়ালে দেখতে পাওয়ার চেয়ে, সেটা না দেখতে পাওয়ায় আমার মনের অস্বস্তিটা উলটে বেড়ে গেল। আমি দ্রুত স্কুল থেকে বেরিয়ে চলে এলাম।
তিনদিন পর খবর পেলাম সুমনের অবস্থা নাকি ভালো নয়। সেদিন সারারাত ঠান্ডায় বাড়ির বাইরে থাকায় ওর বুকে ঠান্ডা বসে নিমুনিয়া না কী- একটা হয়েছে। গত কয়েক দিনে শারীরিক অবস্থা আরও খারাপের দিকে গেছে। ধুম জ্বরে সারাদিন সারারাত ভুল বকছে ছেলেটা। বাইরে থেকে স্পেশালিস্ট আনিয়েও লাভ হয়নি। এমনিতেই দুর্বল স্বাস্থ্য ছিল ওর। ঠান্ডায় ওর ফুসফুসে সংক্রমণ হয়েছে। খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডাক্তার নাকি জবাব দিয়ে দিয়েছে। ওর আজকের রাত কাটবে না।
শুনে মনটা প্রচণ্ড খারাপ হল। ছেলেটার সঙ্গে হয়তো সেভাবে বন্ধুত্ব আমাদের কারুরই ছিল না। কিন্তু, আমাদেরই বয়সি, আমারই ক্লাসের ছেলে তো। সে মারা যাবে, এটা যেন ভাবতেই পারছি না।
স্কুলের প্রিন্সিপাল স্যারও খবরটা পেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, স্কুল থেকে আমরা সুমনকে দেখতে যাব। যে যে ছাত্র যেতে ইচ্ছুক তারা যেন বিকেল পাঁচটা নাগাদ নির্দিষ্ট স্থানে আসে। আমিও যাব বলেই ঠিক করলাম। আশিস ফোন করে জানাল সেও আসবে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা স্কুলের বাসে করেই হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হলাম। দেখলাম, আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই এসেছে। বাসে কেউই কথা বিশেষ বলল না। সবারই মন খারাপ। সবাই চুপচাপ বসে থাকল পুরো রাস্তাটা।
.
হাসপাতালের আইসিইউ-তে রাখা হয়েছে সুমনকে। কাচের ঘরে মুখে অক্সিজেন লাগিয়ে অচেতন অবস্থায় জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সুমন। শরীরটা হাড় হয়ে প্রায় বিছানার সঙ্গে মিশে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর, বোঝা যাচ্ছে। কাচের জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে আমার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল। দেখলাম ছাত্রছাত্রী বাদে, অনেক স্যার ম্যাডামদেরও চোখে জল।
বেশিক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল না। চলে আসছিলাম। তখনই একজন ডাক্তার আমাদের থামালেন। বললেন,
‘তোমরা ওর ক্লাসেই পড়ো, তাই তো? তোমরা একটু দাঁড়াও তো। একটা জিনিস আমার জিজ্ঞেস করার আছে তোমাদেরকে।’
আমরা অপেক্ষা করলাম। ডাক্তার আইসিইউ-র ভেতর ঢুকে গেলেন এবং দু- জন নার্সকে কিছু একটা বললেন। আমরা বাইরে থেকে শুনতে পেলাম না যদিও। তারপর ডাক্তারবাবু ও দু-জন নার্স মিলে সুমনকে ধরে বসালেন। ওকে আমাদের দিকে পিঠ করে বসিয়ে, ওর পিঠের থেকে কাপড় সরিয়ে আমাদের দেখাল।
আর, সেই মুহূর্তে আমাদের রক্ত হিম হয়ে গেল! কারণ, কাচের জানলা দিয়ে আমরা সবাই স্পষ্ট দেখলাম যে, সুমনের হাড়-বের-করা পিঠ জুড়ে কালো একটা ছোপ! অবিকল দেওয়ালের সেই ছোপটার মতো একটা মুখ ফুটে রয়েছে সুমিতের পিঠ জুড়ে! সেই শূন্যদৃষ্টির গোল গোল চোখ, হাঁ করে গোলাকার মুখ! এই মুখ আমাদের পরিচিত! দিনের পর দিন এই মুখ আমাদের সবাইকে ভয় পাইয়েছে! তবে, একটা পার্থক্য আছে। এই মুখটা, দেওয়ালের ছোপটার মিরর ইমেজ। ঠিক যেন দেওয়াল থেকে ওই মুখটা জলছবির মতো উঠে এসেছে সুমিতের পিঠে!
আমাদের মধ্যে অনেকেই সেই মুহূর্তে ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল। ডাক্তার আমাদের কাছে জানতে চেয়েছিল যে, এই দাগটা কীভাবে ওর পিঠে এল আমরা জানি কি না। আমরা ঠিক কী বলেছিলাম আমার আজকে, এত বছর বাদে আর সেটা মনে নেই। তবে ওই মুখ, ওই দেওয়ালের ছোপটা আর সুমিতের পিঠে উঠে আসা সেই মুখটা আমার আজীবনের দুঃস্বপ্নের রসদ হয়ে থেকে গেছে মনের কোনায়
সুমন সেই রাতেই মারা গেছিল।
.
৫
ঘটনার আরও একটা অংশ বাকি আছে। এই অদ্ভুত ব্যাখ্যাতীত ঘটনার যবনিকা পড়তে আরও কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল। তবে, সেটাকে ঠিক যবনিকাপাত বলা চলে কি না, সে-বিচারের ভার আপনাদের। তবে, সেদিনের পর থেকে আমাদের স্কুলের ওই ঘরটা আজও তালা মারা পড়ে আছে। ওটা আর ব্যবহার হয়নি।
কয়েক সপ্তাহ পর নতুন বছর এল। শীতের ছুটি শেষ হল। জানুয়ারি মাসের এক সকালে ছুটির পর প্রথমবার ক্লাসে ঢুকতেই দেখলাম ঘরের ওই কোণে, মানে ওই সুমনের ডেস্কের সামনে সবাই জটলা করে আছে। শুধু ছাত্রছাত্রী নয়, কয়েক জন স্যার-ম্যাডামও আছেন তাদের মধ্যে। সবারই চোখের ভাষায় চোরা ভয়ের একটা আভাস ধরা পড়ছে। ব্যাপারটা কী সেটা বুঝতে আমিও এগিয়ে গেলাম সেদিকে।
সবাই দেখলাম দেওয়ালের ওপরদিকে এক জায়গায় তাকিয়ে আছে। আমিও তাদের দৃষ্টি লক্ষ করে চাইলাম দেওয়ালের দিকে। দেখতে পেলাম ছাদের ঠিক নীচে, কোণের ওই দেওয়ালটার গায়ে ছোপ পড়েছে। তবে, একটা নয়, দুটো। একটা বড়ো আমাদের পরিচিত ছোপটা, অন্যটা নতুন এবং তুলনামূলক ছোটো। ঠিক যেন দুটো কালো অশুভ মুখ ফুটে উঠেছে দেওয়ালের গায়ে। তাদের শূন্য চোখ চেয়ে আছে আমাদেরই দিকে!
