গুম মশান
[তন্ত্র-মন্ত্র নিয়ে লিখতে/পড়তে পছন্দ করি না খুব একটা। কারণ, বেশিরভাগ লেখাতেই দেখেছি তথ্যের ভারে মূল গল্পই হারিয়ে যায়। পাঠকও গল্পকে ‘গল্প’ হিসেবে না নিয়ে সেগুলোকে তার চেয়ে বেশি কিছু ভেবে বসেন। আশা করি, এই গল্পে সেই সমস্যা হয়নি; মূল গল্প হারিয়ে যায়নি। এক বন্ধুর আবদারে বহুদিন পর ‘তন্ত্র’ ধারার কাহিনিটি লিখেছিলাম ‘থ্রিলারল্যান্ড’ অডিয়ো চ্যানেলের জন্যে।]
.
ঘুমে ডুবে আছেন রমা দেবী। আজকাল তাঁর ঘুমোনোর সমস্যা হচ্ছে। কারণ, এখন তিনি ন-মাসের গর্ভবতী। বড়ো পেটটা নিয়ে নড়াচড়া কষ্টকর।
ঘুমের মধ্যেই টের পেলেন কেউ তাঁর পেটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। স্পর্শ অনুভব করছেন তিনি। ঘুমের ঘোরেই হেসে উঠলেন। নিশ্চয়ই তাঁর স্বামী। তিনি মাঝে মাঝেই আদর করে পেটে হাত বুলিয়ে দেন সন্তানের কাছাকাছি পৌঁছোতে। কিন্তু… কিন্তু এই স্পর্শ যেন কেমন একটা। যে হাতটা স্পর্শ করছে সেটা বরফের মতো ঠান্ডা! আর হাতটাও যেন আকারে অনেকটা ছোটো। এটা তো তাঁর স্বামীর হাত নয়!
মুহূর্তে সজাগ হয়ে ওঠে রমা দেবীর সমস্ত ইন্দ্রিয়। তাঁর মাতৃত্ব সত্তা তাঁকে চিৎকার করে আসন্ন বিপদের জানান দিচ্ছে! মনের ভেতর থেকে কেউ বলছে, ‘বিপদ! ঘোর বিপদ!’
চোখ খুলে পেটের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলেন রমা দেবী। মুহূর্তে একটা কুচকুচে কালো হাত, তাঁর উঁচু পেটের ওপর থেকে যেন সরে গেল অন্ধকারে। তিনি কি ঠিক দেখলেন নাকি টিমটিমে রাতবাতির আলো তাঁকে ভুল দেখাল?
উঠে বসলেন রমা দেবী। উঠতে কষ্টই হয় আজকাল। ভয় করছে রমা দেবীর! পাশে বর ঘুমিয়ে আছে। ডাকলেন অনেকবার, কিন্তু, কিছুতেই ঘুম ভাঙল না তাঁর। আশ্চর্য! এত গভীর ঘুম তো তাঁর বরের নয়।
হঠাৎই একটা খিলখিল হাসির শব্দ গুঞ্জরিত হয়ে উঠল ঘরের মধ্যে! এক শিশুর হাসি!
‘কে? কে ওখানে?’
উত্তরে আরও একবার খিলখিল হাসি ভেসে এল শুধু।
হাত বাড়িয়ে ঘরের আলোটা জ্বালতে গেলেন। কিন্তু, বড়ো পেটের কারণে, খাটে বসে কিছুতেই হাত পৌঁছোল না সুইচ অবধি। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হঠাৎই তাঁর মনে হল ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে কেউ একটা ছুটে গেল। কোনো বাচ্চার ছায়ামূর্তি অন্ধকারে দৌড়ে বেড়াচ্ছে ঘর জুড়ে।
‘ক…কে? কে ও…ওখানে?’
রমা দেবীর গলা শুকিয়ে কাঁটা হয়ে গেছে। নিজের কথা কানে আসতে বুঝলেন তাঁর গলা কাঁপছে।
ঘরের অন্ধকার কোণটায়, আলমারির আড়ালে অনেকটা অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে আছে। কেউ একটা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।
ছোটো আকারের ছায়াটা এইবার এগিয়ে আসছে রমা দেবীর দিকে। ধীরে ধীরে ছায়াটা রাতবাতির মৃদু আলোর আওতায় এসে পড়তে সেটিকে দেখতে পেলেন রমা দেবী।
নিকষ একটা বাচ্চা ছেলে। গায়ের রং মিশমিশে কালো। সাধারণ কালো নয়, কালো। যেন নরকের অন্ধকারতম কোণের যাবতীয় অন্ধকারের প্রলেপ কেউ তার গায়ে মাখিয়ে দিয়েছে পরতে পরতে! সম্পূর্ণ কালো শরীরটার মধ্যে মাত্র দুটো সাদা বিন্দু ফুটে উঠছে অন্ধকারের মধ্যে থেকে। সাদা দুটো জ্বলজ্বলে চোখ!
মুহূর্তে রমা দেবী বুঝতে পারলেন যে, তাঁর চোখের সামনের বস্তুটি ইহজগতের কিছু নয়! হতেই পারে না! প্রবল আতঙ্কে পাথর হয়ে গেলেন, নড়তে পারলেন না। সেই কালো বাচ্চাটি এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে তার শীর্ণ দুটো হাত রাখল রমা দেবীর পেটের ওপর।
অচেতন হওয়ার আগের মুহূর্তেও তিনি টের পেলেন যে, তাঁর গর্ভে গত ন-মাস ধরে অনেক যত্নে বড়ো হয়ে ওঠা শিশুটির প্রাণশক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে।
.
২
ভাবনার বিয়েটা হঠাৎই হয়ে গেছিল বীরেন্দ্র সিং-এর সঙ্গে। বীরেন্দ্র সিং, এই রাজস্থানের রেতপুরের রাজা। যদিও রাজপাট উঠে গেছে বহুযুগ আগেই, তবুও আজও গ্রামের লোক সিংহ বংশের সন্তান হিসেবে বীরেন্দ্র সিংকে হুকুম বলেই ডাকে।
তবে, রাজস্থানের অন্য প্রদেশের রাজপরিবারের মতো নামসর্বস্ব ‘মরা হাতি’-র অবস্থা নয় সিংদের। বীরেন্দ্রর দাদাজির বড়ো ব্যাবসা এখন বীরেন্দ্র চালায়। টাকাপয়সা অঢেল করেছে গত তিন পুরুষের ব্যাবসায়। তাই, বীরেন্দ্র নিজে থেকে যখন সুখীরামের একমাত্র মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিল, সুখারাম হাতে চাঁদ পেয়েছিল।
যদিও বীরেন্দ্র আর ভাবনার বয়সের পার্থক্য বারো বছর মতো। তা ছাড়া, বীরেন্দ্রর আগে এক স্ত্রী ছিল। বিয়ের আগে বীরেন্দ্র সমস্ত ঘটনা ভাবনাকে জানিয়েছিল।
বীরেন্দ্র আর তার প্রথম স্ত্রী আরতির বিয়ে হয়েছিল দশ বছর আগে। তাদের একটি সন্তানও হয়েছিল বিয়ের এক বছর পর। কিন্তু, আরতির পরিবার একটা কথা গোপন করে বিয়ে দিয়েছিল। আরতিদের পরিবারে মেয়েদের মধ্যে পাগলামির ‘জিন’ ছিল। সন্তান জিতেন্দ্রর জন্মের কয়েক বছর পরেই পাগলামির লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে আরতির মধ্যে। জিতেন্দ্রর যখন পাঁচ বছর বয়স, সেই সময়ে তাকে গলা টিপে মেরে নিজে আত্মহত্যা করে আরতি।
পরের তিন বছর স্ত্রী ও পুত্রের শোকে কাটায় বীরেন্দ্র। আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে ঝুঁকে যায় বীরেন্দ্র এই সময়ে। এই দুঃখের ঘটনার বছর দেড়েক আগেই বারাণসীর আশিশ ঘাটে এক সাধুর সাক্ষাৎ পেয়েছিল বীরেন্দ্র। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর সেই সন্ন্যাসীর কাছেই দীক্ষা নিয়ে তাঁকে নিজের গুরু মানে। সেই গুরুই তাকে আবার কয়েকটি সুলক্ষণ দেখে মেয়ে খুঁজে বিয়ে করতে নির্দেশ দেন। গুরুর ইচ্ছেয় আবার সাংসারিক জীবন শুরু করেছে বীরেন্দ্র সিং।
সেই সুলক্ষণ দেখেই ভাবনাকে পছন্দ করে বীরেন্দ্র। সব শুনে ভাবনার মায়া হয় বীরেন্দ্রর প্রতি। সে মত দিতে বিয়ে হয়ে যায় দু-জনের।
বিয়ের পর এক বছর হয়েছে। ভাবনাকে তার স্বামী বড়ো সুখে রেখেছে। কোনো অভাব রাখেনি তার। নৌকর-চাকর, গয়না, শাড়ি আর আদরে ডুবিয়ে রেখেছে তাকে।
কয়েক মাস আগেই যখন ভাবনার শরীরে মাতৃত্বের লক্ষণ ফুটে উঠল, বীরেন্দ্র খুশি হয়ে একটা হিরের নেকলেস উপহার দিয়েছে ওকে।
সবই ঠিক ছিল, কিন্তু, ইদানীং একটা সমস্যা হচ্ছে ভাবনার। তার মাঝে মাঝেই মনে হয় কেউ একটা তার দিকে নজর রাখছে। ঘরে একা থাকলেও মনে হয় ও একা নেই। কেউ একটা আশেপাশে আছে। এই বিশাল ‘হাভেলি’-তে এত লোকজন। তবুও মাঝে মাঝে ওর কেমন যেন ভয় করে আজকাল।
সেদিন ভাবনা ওর দোতলার ঘরের জানলায় বসে পায়ে মেহেন্দি দিয়ে নকশা করছিল। ওর এই একটা শখ ছোটো থেকেই। মেহেন্দি। ঘরে একাই ছিল, হঠাৎই মনে হল, কেউ ওকে দেখছে। চোখ তুলে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখল, উলটোদিকের মহলের জানলায় এক স্ত্রী দাঁড়িয়ে ওকে দেখছে। এই মহিলাকে ও আগে কখনো দেখেনি সেটা ও নিশ্চিত, তবুও কেন জানে না পরিচিত মনে হল মুখটা। রাজমহলের কাজের লোকদের কেউ নয়। ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফ্যাকাশে মুখের মহিলা। অপলক চেয়ে আছে। ওই দু-চোখে কী যেন একটা অস্বাভাবিকতা আছে, যেটার দিকে চেয়ে থাকতে অস্বস্তি হয় ভাবনার। একমুহূর্তের জন্যে ভাবনা পলক ফেলেছিল, পরমুহূর্তে চোখ খুলতেই কাউকে দেখতে পেল না ওদিকের বারান্দায়। আশ্চর্য!
ব্যাপারটা সেদিন পাত্তা দেয়নি ভাবনা। কিন্তু, এরপরেই সমস্যা শুরু হল। ভাবনা মাঝে মাঝেই এই মহিলাকে দেখে হাভেলির আনাচেকানাচে। হঠাৎ একমুহূর্তের জন্যে দেখা দিয়েই কোথায় যেন চলে যায় এই মহিলা। লাল শাড়ি, লম্বা কালো চুল আর ওই ফ্যাকাশে মুখের মহিলা কে তা জানার চেষ্টা অনেকবার করেছে ভাবনা। কিন্তু, লাভ হয়নি। ঠাকুর-চাকর কেউই সেরকম দেখতে কোনো মহিলার খোঁজ দিতে পারেনি। আশ্চর্য! এক মহিলা এই হাভেলিতেই থাকে অথচ কেউ তার নাম-ধাম বলতে পারছে না কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর ভাবনা কয়েক দিন বাদেই পেয়েছিল।
ভাবনা এখন ছ-মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বীরেন্দ্র ওর হাতে হাতে কাজ করে দেওয়ার জন্যে আলাদা একটি মেয়েকেই রেখে দিয়েছে। ফুলি মেয়েটা ওর খুব যত্ন নেয়। ভাবনার পেটটা এখন বেশ বড়ো হয়েছে। তাই স্বচ্ছন্দে নড়াচড়া করতে অসুবিধে হয়। হাতে হাতে ফুলি এটা-সেটা এগিয়ে দেওয়ায় ওর খুব সুবিধে হয়।
সেদিন দুপুর বেলা ছাদে বসে ছিল ভাবনা। ফুলি বসে পায়ে, হাতে তেল মালিশ করে দিচ্ছিল। সঙ্গে এটা-ওটা গল্প করছিল। ফুলিই বেশি কথা বলছিল যদিও, আর ভাবনা ‘হুঁ হাঁ’ করছিল।
‘জানো তো ভাবি ওই গ্রামের বিন্দু, ওর বর রুলদুকে ছেড়ে ভেগেছে। রুলদু গেছে থানায়। থানার দারোগা দিলাওয়ার খাঁ রিপোর্টই নেয়নি …।’
কে বিন্দু, কে দিলাওয়ার কাউকেই চেনে না ভাবনা। ফুলি মেয়েটার এই এক দোষ। অজানা, অচেনা লোকজনের গল্প এসে ওকে শোনাতে থাকে রোজ। ও শুনে যায় শুধু। মাথায় ঢোকায় না। চোখ বন্ধ করে তেল মালিশের আরাম নিচ্ছিল আর হুঁ, হাঁ করছিল ভাবনা। হঠাৎই এই কড়া রোদের মধ্যেও একঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে এল কোথা থেকে। হালকা কাঁপুনি লাগায় চোখ খুলল ভাবনা। আর দেখতে পেল সেই মহিলাকে।
ছাদের অন্য মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। সেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে।
‘ফুলি!’
‘কী, নয়া ভাবি?’
‘ওই মহিলা কে রে?’
‘কোন মহিলা?’
আঙুল তুলে ওই মহিলার দিকে দেখাল ভাবনা।
‘ওই যে। ওখানে যে দাঁড়িয়ে।’
ফুলি তার আঙুল বরাবর তাকিয়ে উত্তর দিল,
‘কে ভাবি? কেউ নেই তো।’
‘কেউ নেই মানে? আরে, ওই যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। দেখতে পাচ্ছিস না তুই?’
‘না, নয়া ভাবি। কেউ নেই ওখানে। আপনি কাকে দেখছেন?’
‘ওই যে, ওই মহিলা…’
কথাটা বলতে গিয়ে থেমে গেল ভাবনা। কারণ, এখন আর সেখানে কেউ নেই। ফুলি সন্দেহের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
ভাবনা চুপ করে গেল। ফুলিকে কিছু বলা ঠিক হবে না। এই রেতপুরে আগের রানির পাগলা হয়ে যাওয়ার খবর এমনিতেই সবাই জানে। এরপর ফুলি তাকেও পাগল ভাবলে মুশকিল। এমনিতেই ফুলি যা বকবক করে, কোথাকার কথা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ঠিক নেই। তাই ভাবনা বলল,
‘কেউ না। নে, মালিশ কর।’
ফুলি আবার তেল ঘষতে ঘষতে বকবক শুরু করল। এইবার ওর মহল্লার কোনো এক মিস্ত্রির গল্প বলছে। তবে, ভাবনার কানে ওর কথা আর ঢুকছে না। ও শুধু ভাবছে,
কে এই মহিলা? ফুলি কেন তাকে দেখল না? তবে, কি শুধু ওকেই দেখা দেয় সে? নাকি ও ভুল দেখল? দিনেদুপুরে ভুল দেখবে?
.
৩
বীরেন্দ্র অর্ধেক মাস বাড়ির বাইরেই থাকে। ওর ব্যাবসার কাজে কখনো মুম্বই তো কখনো চেন্নাই যেতে হয়। গত দশদিন বীরেন্দ্র ছিল না। যদিও রোজ ফোনে কথা হয়েছে। নিয়মিত খবর নিত ভাবনার।
আজ বীরেন্দ্র ফিরেছে। ঘরে ঢুকতেই ভাবনা দেখল বীরেন্দ্রর হাতে একটি মিষ্টির বাক্স। হাসিমুখে বউয়ের কাছে এসে বলল,
‘ছোটোরানি, আমার কোম্পানি এইবার একটা বড়ো কনট্রাক্ট পেয়েছে। এক-শো কোটির কাজ! মুখ খোলো দেখি।’
এত কিছু ভাবনা বোঝে না। কিন্তু, বীরেন্দ্র সাহেবের খুশি দেখে সেও খুশি হল। বীরেন্দ্র বাক্স থেকে বের করে একটা লাড্ডু খাইয়ে দিল। ভাবনা বলল,
‘এতে আপনার কাজের খুব লাভ হবে বুঝি?’
‘ইয়েস, রানি! অনেক টাকার ব্যাপার। তবে তার চেয়েও বড়ো কথা কী জানো? এই কনট্রাক্টের জন্যে গৌরব আহুজার টেন্ডার জমা দেওয়ার কথা ছিল। ব্যাটা দিতে পারেনি! ও গত কয়েকটা বড়ো কাজ পর পর আমার থেকে নিয়ে নিয়েছিল। এইবার আর পারল না! হু হু, হুকুম বীরেন্দ্র সিংকে টক্কর দেয়া সহজ না!’
‘কেন? এই গৌরবের কী হল? কেন টেন্ডার জমা দিল না?’
‘আসতেই পারেনি। কী-একটা সমস্যা হয়েছে ওর বউয়ের। বাদ দাও। তুমি বলো, কেমন আছো?’
‘ভালো আছি।’
‘আর আমাদের ছোটো রাজকুমারি?’
‘সেও ভালো আছে। কিন্তু আপনি বার বার রাজকুমারি বলেন কেন? যদি ছেলে হয়?’
‘উঁহ হুঁ। তোমার পেটে মেয়েই আছে। গুরুদেব বলেছেন।’
এই গুরুদেব লোকটিকে এখনও চোখে দেখেনি ভাবনা। কিন্তু কথায় কথায় ঘুরে-ফিরে গুরুদেব কালীনাথের কথা বার বার শুনেছে বীরেন্দ্রর মুখে। বীরেন্দ্র সব কাজই তাঁর কথাতে করে।
‘আপনার গুরুজির এত ক্ষমতা?’
‘গুরু কালীনাথের অনেক ক্ষমতা, রানি। তুমি জানো না, কিন্তু আমি জানি। গুরুজির জন্যেই আমার গত কয়েক বছরের এই ব্যাবসায় সাফল্য। তুমি তো জানোই সব।’
হ্যাঁ, ভাবনা জানে। মানে বীরেন্দ্রর কাছেই শুনেছে। ওর বাবা, মানে ভাবনার শ্বশুর মারা যাওয়ার পর ব্যাবসা সামলাতে পারছিল না বীরেন্দ্র। পার্টনাররা ধোঁকা দিল, ব্যাবসা মার খেল। এই পারিবারিক হাভেলিটাও বন্ধক রাখতে হয়েছিল ব্যাঙ্কে। তারপর এই গুরুজি কালীনাথের সঙ্গে দেখা হয় বীরেন্দ্রর। তিনি এখানে এসে কিছু পুজোপাঠ করেন যার ফলে আবার লাভের মুখ দেখতে শুরু করে বীরেন্দ্রর বিজনেস। গত তিন বছরে ফুলেফেঁপে উঠেছে আগের মতোই। তাই গুরুর ওপর অগাধ বিশ্বাস বীরেন্দ্র সিংহের।
বীরেন্দ্র বলল,
‘পরের মাসে গুরুজি আসবেন। তোমার পেটের সন্তানের সাত মাস হলেই একটা পুজো করার কথা বলেছেন।’
ভাবনা একবার ভাবল যে, ওর সমস্যাটার কথা বলবে বীরেন্দ্র সাহেবকে। ও যে একটি মহিলাকে দেখতে পাচ্ছে আশেপাশে সেটা বলবে। কিন্তু বর ভালো মেজাজে আছে দেখে কিছু বলল না।
.
৪
সেই রাতের ঘটনা। গভীর রাতের দিকে হঠাৎই ঘুম ভেঙে গেল ভাবনার। বাথরুম যেতে হবে। আজকাল বড়ো ঘন ঘন তাকে বাথরুমে যেতে হয়।
দেখল ওর পাশে বীরেন্দ্র শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে কাদা। তাকে ডেকে তুলল না ভাবনা। এক বছর বিয়ে হলেও, বেশিরভাগ সময়টাই বীরেন্দ্র বাড়ির বাইরে কাটানোয় এখনও ভাবনা পুরোপুরি স্বচ্ছন্দ হয়নি স্বামীর সঙ্গে। তাই রাতে বাথরুমে যাবে বলে তাকে ডাকতে লজ্জাই করল ভাবনার। অন্যান্য দিন ওর ঘরে তোশক পেতে ফুলি ঘুমোয়। কিন্তু, আজ বীরেন্দ্র থাকায় সে এই ঘরে শোয়নি। অগত্যা নিজেই উঠল ভাবনা।
বাথরুম ঘরের লাগোয়া বটে, তবে, ঘরটা অসম্ভব রকমের বড়ো। ভাবনার নিজের বাপের বাড়ির প্রায় অর্ধেকটা এই ঘরে ঢুকে যায়। অতএব, তার খাট থেকে বাথরুম অনেকটাই দূরত্ব।
মেঝেতে পা ফেলে টুক টুক করে হেঁটে বাথরুম অবধি গেল ভাবনা। আলোর সুইচটা বাথরুমের ভেতর। ভেতরটা ঘরের চেয়ে অন্ধকার, কারণ নাইট ল্যাম্পের আলো ভেতর অবধি পৌঁছোতে পারছে না। অন্ধকার হাতড়েই সুইচ অন করতে গেল ভাবনা, আর তাতেই চমকে উঠল। কারণ, সুইচের ওপর ওর আঙুল অন্য কারুর আঙুল স্পর্শ করেছে! অন্য একটা বরফের মতো ঠান্ডা হাত সুইচের ওপর রয়েছে।
মুহূর্তে আঁতকে উঠে হাত সরিয়ে নিল ও। কে আছে ওর বাথরুমে? বীরেন্দ্র সাহেব তো শুয়ে আছে, আর ফুলি আজ ঘরে নেই! তবে? না না, নিশ্চয়ই ওর মনের ভুল। ডাক্তার বলছিল যে, এই গর্ভবতী অবস্থায় অনেক রকমের ভুলভ্রান্তি হয়। এটাও নিশ্চয়ই তাই।
ভাবনা বরাবরই খুব সাহসী মেয়ে। তাই নিজের মনকে প্রবোধ দিয়ে সাহস করে আরও একবার হাত বাড়াল সুইচের দিকে। নাহ্, এইবার আর কোনো দ্বিতীয় হাতের স্পর্শ ও অনুভব করল না। সুইচ অন করতেই আলো জ্বলে উঠল বাথরুমের। কেউ নেই, ফাঁকা বাথরুম।
বাথরুম সেরে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানার দিকে এগোতে গেল ভাবনা। আর ঠিক তখনই দৃশ্যটা দেখতে পেল ও। ওর বিছানার ওপর, যেখানে বীরেন্দ্র এখনও ঘুমিয়ে আছে, সেই দেওয়ালে পা দিয়ে শূন্যে সটান ঝুলে আছে সেই মেয়েটি! কালো লম্বা চুলগুলো সাপের ফণার মতো উড়ছে। এতদিন শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে ভাবনা। কিন্তু, এইরকম বীভৎস মূর্তি আগে কখনো দেখেনি ও। শূন্যে ভেসে, দেওয়ালে পা আটকে বীরেন্দ্রর ঠিক ওপরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিটা! চোখের দৃষ্টিতে নেচে বেড়াচ্ছে মৃত্যু, অতৃপ্ত জিঘাংসা!
চিৎকার করে উঠল ভাবনা! তারপর আর কিছু ওর মনে নেই। সেখানেই জ্ঞান হারায় ও।
.
৫
জ্ঞান ফিরতে ভাবনা দেখল দিনের আলো ঝলমল করছে ঘরে। ও নিজের খাটে শুয়ে এবং ওকে ঘিরে অনেকগুলো উদ্বিগ্ন মুখ দাঁড়িয়ে রয়েছে। বীরেন্দ্র আর ফুলি তো আছেই, সঙ্গে ডাক্তার সাহেবের মুখও চিনতে পারল।
‘কেমন বোধ করছেন, নতুন রানি?’
ঘাড় নেড়ে ভাবনা জানাল যে ‘ভালো’। পরের প্রশ্ন বীরেন্দ্র করল,
‘কী হয়েছিল বলো তো? চিৎকার শুনে উঠে দেখি বাথরুমের দরজার সামনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছো মাটিতে।’
ডাক্তার আর ফুলির উপস্থিতিতে ব্যপারটা খুলে বলা উচিত হবে না ভেবেই চুপ করে রইল ভাবনা। বীরেন্দ্র স্ত্রীর চোখের চাউনি দেখে ব্যপারটা অনুমান করতে পারল যে, বউ কথা বলতে চাইছে না সবার সামনে। তাই দ্বিতীয়বার জানতে চাইল না।
ডাক্তার বিদায় নেওয়ার পর ফুলিকেও বাইরে যেতে বলল বীরেন্দ্র। তারপর ভাবনার পাশে বসে তার মাথায় হাত রেখে প্রশ্ন করল,
‘এইবার বলো তো ছোটোবউ? কী হয়েছিল কাল রাতে?’
নিজেকে সামলাতে না পেরে এইবার সেই প্রথম মহিলাকে হাভেলিতে দেখতে পাওয়া থেকে শুরু করে, কালকে রাতের ঘটনা অবধি বলে গেল একনিশ্বাসে। ভাবনার আশঙ্কা ছিল যে, বর তার কথা অবিশ্বাস করবে, ওর মনের ভুল বলে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু, তা হল না। বরং, সব শুনে বীরেন্দ্রর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
‘এক মিনিট বোসো।’
বলে বীরেন্দ্র উঠে বেরিয়ে গেল ভাবনাকে রেখে। এক মিনিটের আগেই আবার জিনিসটা দেখে সেটাকে নিজের বিয়ের অ্যালবাম বলে চিনতে পারল ভাবনা। ঘরে ঢুকল বীরেন্দ্র। ওর হাতে একটা মস্ত বড়ো লাল বই। ভেলভেট মোড়া কিন্তু, ওর সামনে নামিয়ে রাখতে ওর ভুল ভাঙল। এটা বিয়ের ফটো অ্যালবাম বটে, তবে এটা তার বিয়ের নয়। অ্যালবামের ওপর বড়ো বড়ো করে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে—’Virendra weds Aarti’। অর্থাৎ, এটা বীরেন্দ্রর আগের পক্ষের বিয়ের অ্যালবাম।
অ্যালবাম খুলেই নববধূর সাজে থাকা হাসিমুখো মেয়েটির ছবি দেখিয়ে বীরেন্দ্র প্রশ্ন করল,
‘দেখো তো, এই কি সে?’
ছবিটা দেখেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল ভাবনার। কারণ, এইবার ও চিনতে পেরেছে সেই রহস্যময়ী নারীটিকে! মুখের এখন আকাশ-পাতাল পরিবর্তন হয়েছে। মুখের হাসিমাখা ঠোঁটের জায়গায় এখন শুকনো ঠোঁট, খুশিতে উজ্জ্বল চোখের জায়গায় এখন মৃত ধোঁয়াটে দৃষ্টি আর ফ্যাকাশে তোবড়ানো গাল হলেও সেই অশরীরী নারীকে চিনতে অসুবিধে হয় না! এ বীরেন্দ্রর প্রথমা স্ত্রী আরতি! তিন বছর আগে নিজের সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করে মৃত আরতি। তার ছবি বিয়ের পরে পরেই একবার দেখেছিল ভাবনা। সেই কারণেই চেনা মনে হয়েছিল ওর এই প্রেতকে প্রথমদিন দেখেই!
ভাবনার মুখে ফুটে ওঠা ভয় আর বিস্ময়ের অভিব্যক্তি দেখেই বীরেন্দ্রর বুঝতে বাকি রইল না কী উত্তর দিতে চলেছে তার স্ত্রী। অ্যালবাম বন্ধ করে জড়িয়ে ধরল ভাবনাকে। বলল,
‘বুঝেছি! নিজের ছেলেকে মেরেছে ও। এইবার তোমার আর আমাদের মেয়ের ক্ষতি করতে চাইছে।
বরের বুকে মাথা গুঁজে কেঁদে চলেছে ভাবনা। খানিকক্ষণ চুপ থেকে বীরেন্দ্র বলল,
‘চিন্তা নেই। আমি আজই গুরুজির সঙ্গে যোগাযোগ করব। তিনি এমনিতেই পরের মাসে আসতেন। অনুরোধ করব যেন উনি এখনই চলে আসেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তিনি এসে, নিজের তন্ত্রশক্তি দিয়ে ওই শয়তান প্রেতিনিকে শায়েস্তা করবেন।’
.
৬
এক সপ্তাহের মধ্যেই গুরুজি রেতপুর আসবেন বলে আশ্বাস দিলেন। এই একটা সপ্তাহ বীরেন্দ্র নিজের ব্যাবসার কাজ বন্ধ রেখে স্ত্রীর সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে একা থাকতে দেয়নি একমুহূর্তের জন্যেও। বীরেন্দ্রর থেকেই জানতে পেরেছে ভাবনা যে, প্রথম স্ত্রী আরতি মারা যাওয়ার পর বীরেন্দ্রও নিজের আশেপাশে তাকে দেখতে পেত। যথেষ্ট ভয়ের মধ্যে দিন কাটত ওর। কিন্তু, গুরু কালীনাথ এসে ওঁকে রক্ষা করেছিলেন সেই সময়ে।
নির্দিষ্ট দিনেই হাভেলিতে পা রাখলেন কালীনাথ। তাঁর জন্যে নীচেরতলার একটা বড়ো অংশ জুড়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটু বেলার দিকে ফুলি এসে ভাবনাকে বলল,
‘ছোটোরানিকে হুকুম নীচে ডাকছে। গুরুজি অপেক্ষা করছেন।’
একটা বই পড়ছিল ভাবনা। উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ঘোমটা টেনে নীচের পথ ধরল ফুলির সঙ্গে।
বীরেন্দ্রর গুরু কালীনাথকে দেখেই চমকে উঠল ভাবনা। সে যেমনটা অনুমান করেছিল এ লোক মোটেই সেইরকম নয়। গুরু বা সাধু শুনলে মনে যে শান্ত, সৌম্য, গৈরিক বস্ত্রধারী সন্ন্যাসীর রূপ ভেসে ওঠে, কালীনাথ মোটেই তা নয়। কালো জোব্বা ধরনের একটা পোশাক পরা, মাথায় লাল তিলক আঁকা যে রুক্ষ, স্থূল লোকটির সামনে আনা হল, তার লালচে চোখের দিকে তাকালে ভয় করে রীতিমতো। ভাবনার বুঝতে বাকি থাকে না যে, বীরেন্দ্রর গুরুজি কোনো সাধু-যোগী নয়, বরং তিনি একজন তান্ত্রিক বা কাপালিক গোছের সাধক!
একটি সিংহাসন তুল্য মস্ত চেয়ারে বসে আছে সে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে বীরেন্দ্র। ফুলি দরজা থেকেই বিদায় নিল। বোঝা গেল তার এখানে ঢোকা বারণ। ঘরে ঢুকল ভাবনা।
ভাবনা কাঠ হয়ে কালীনাথের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বীরেন্দ্র বলল,
‘প্রণাম করো গুরুজিকে।’
ভাবনা অনেক কষ্টে পেট নিয়ে মাটিতে বসে পা ছুঁলো গুরুজির। তিনি মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন,
‘জয় ভৈরব!’
লাল চোখের স্থির দৃষ্টিতে বেশ কিছুক্ষণ জরিপ করলেন কালীনাথ ভাবনাকে। না, ঠিক ভাবনাকে নয়, ওর মনে হল যেন গুরুজি ওর পেটের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাবনার অস্বস্তি হচ্ছিল। এই দৃষ্টি তার ভালো লাগছে না। এ যেন এক অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে ওর গর্ভের ভেতরের সন্তানকেও দেখে ফেলছেন এই মানুষটা।
‘আরতি দেখা দিচ্ছে তোকে?’
প্রশ্নটা ভাবনাকেই করলেন তিনি। ভাবনা ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানাল। কালীনাথ কোমরের কাছের কাপড় থেকে একটা কালো সুতোয় বাঁধা তাবিজ বের করে আনল। সেটা বাড়িয়ে দিল ভাবনার দিকে। দু-হাত পেতে সেটা গ্রহণ করল ভাবনা। সেটা হাতে নিয়ে ভালো করে দেখতেই বুঝল যে, এই একই তাবিজ একটা তার স্বামী বীরেন্দ্রর গলাতেও দেখেছে ও। গুরুজির গলায় অসংখ্য মালা, মাদুলির মধ্যেও এইরকম তাবিজটা ওর নজর এড়াল না। কালীনাথ বলল,
‘এটা আজই স্নান সেরে গলায় ধারণ কর। ওই প্রেত তোকে ছোঁয়া বা তোর ক্ষতি করা তো দূরস্ত, তোকে দেখাও দিতে পারবে না।’
সেটা নিয়ে ভাবনা উঠে দাঁড়াল। তার এই ঘরে থাকতে ভালো লাগছে না। কেমন একটা বোটকা, পোড়া গন্ধ ভরে আছে ঘরে। ওর এমনিতেই বমি ভাব আছে, এখন সেটা চাগাড় দিয়ে উঠছে।
‘আমি তবে এখন আসি, গুরুজি?’
প্রশ্ন করল ভাবনা।
‘হ্যাঁ। যা!’
বেরোনোর আগে ভাবনা একবার বীরেন্দ্রর দিকে চাইল। বীরেন্দ্র তার দিকে তাকিয়ে নেই। সে চেয়ে আছে গুরু কালীনাথের দিকে।
ঘর ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে এল ভাবনা। ফুলি দূরে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষা করছিল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময়ও ভাবনার মনে হল যেন দূরে এখনও কালীনাথ গুরুজি দেওয়াল ভেদ করে ওর ওপর নজর রাখছেন।
.
৭
পরবর্তী কয়েকটা দিন ভাবনা ওর বরকে প্রায় দেখতে পেল না বললেই চলে। যদিও বীরেন্দ্র বাড়িতেই ছিল। কিন্তু, রাতে শোয়ার সময়টুকু বাদে বাকি সারাদিন গুরুজির সঙ্গেই থেকেছে।
তবে, এই তান্ত্রিক বাবার ক্ষমতা আছে, এটা সত্যিই। গলায় ওই তাবিজ ধারণ করার পর থেকে দশ দিন হয়ে গেল ভাবনা সেই প্রেতমূর্তি দেখেনি।
ভাবনা এই ক-দিন গুরুজির ধারে-কাছে ঘেঁষেনি। কিন্তু, ফুলির বয়স কম, তাই কৌতূহল বেশি। একদিন এসে বলল,
‘ছোটো ভাবি, হুকুম সাহেবের গুরুজি কি তান্ত্রিক?’
‘কেন রে?’
‘কীসব কথা বলছিল কালকে।’
‘তুই কীভাবে শুনলি?’
ফুলি জবাব দেয় না। ভাবনা আবার বলে,
‘দরজার বাইরে আড়ি পাতছিলি?’
‘আরে না না, কী যে বলেন! ওই আর কি, কানে এল।’
‘তা, কী শুনলি?’
‘সব তো বুঝিনি। কয়েকটা শব্দ শুনেছি। ‘সাধনা’, ‘তন্ত্র’ আর…’
‘আর?’
‘ঝংরুটিয়া!’
‘কী? ঝরুটিয়া? সে আবার কী?’
‘না, না। ঝরুটিয়া না, ঝংরুটিয়া! ঝংরুটিয়া জানেন না আপনি? আমি ছোটো থেকে শুনে আসছি। ও এক ধরনের ভূত।’
‘কী ধরনের ভূত?’
‘ভূত যেমন হয়। ভূতের আবার ধরন হয় নাকি?’
ভাবনা বুঝল, ফুলির নিজের জ্ঞানের দৌড়ও এই অবধিই সীমিত। অত্যধিক কল্পনাপ্রবণ বরাবরই মেয়েটা। তাই কড়া গলায় ভাবনা বলল,
‘একদম উলটোপালটা কথা বলবি না! কী শুনতে কী শুনেছিস। এইসব ভুলভাল কথা পাঁচকান হলে কিন্তু হুকুম সাহেব তোকে চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেবে। আর ফের যদি শুনি অন্যের দরজায় আড়ি পেতেছিস, তবে আমিই তোকে থাপ্পড় মারব মেয়ে!’
ফুলি মুখ ফুলিয়ে বসে রইল। চোখ কান্না কান্না। তাকে দেখে আবার মায়া হল ভাবনার। হাতে পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে বলল,
‘যা। একটা নারকেল তেল কিনে আন আমার জন্যে, আর যা টাকা বাঁচবে সেটা দিয়ে লাড্ডু খাস। আর, যাওয়ার আগে টিভিটা অন করে দিয়ে যা, নাহলে আবার আমায় উঠে অন করতে হবে।’
হাসিমুখে লাফাতে লাফাতে চলে গেল ফুলি। ভাবনার সিরিয়াল শুরু হতে এখনও দশ মিনিট দেরি আছে। তাই অন্য নিউজ চ্যানেল খুলে বসল।
‘বিখ্যাত ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, ‘আহুজা’স প্রাইভেট লিমিটেড-এর কর্ণধার গৌরব আহুজার স্ত্রী রমা আহুজাকে, আজ দিল্লির নার্সিং হোম থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আপনারা জানেন কয়েক দিন আগেই তাঁকে প্রেগনেন্সি রিলেটেড সমস্যায় ভরতি করা হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয় যে, ডাক্তাররা জানিয়েছেন যে তাঁকে বাঁচানো গেলেও, তাঁর গর্ভের সন্তানকে বাঁচানো যায়নি। এই অবস্থায় গৌরব মানসিকভাবে…
দ্রুত চ্যানেল পালটে দিল ভাবনা। গর্ভবতী অবস্থায় এইসব খবর দেখলেই ওর ভয় করে। চ্যানেল পালটে সিরিয়ালে মন দিল। শাশুড়ি-বউমা কূটকচালি। এই বরং ভালো।
কিন্তু, কিছুতেই মন বসছে না ভাবনার। গৌরব আহুজা নামটা কোথায় যেন শুনেছে ও। আজকাল এইরকম খুব হয়, মনেই পড়তে চায় না কিছু।
তখনই বাইরে থেকে একজন কাজের লোক ডাক দিল।
‘নতুন রানি, হুকুম আপনাকে নীচে ডাকছে।’
‘বলো যাচ্ছি।’
আবার উঠতেই হল ভাবনাকে। টিভি বন্ধ করে নীচে নামতে শুরু করল ধীর পায়ে।
আগের দিনের মতোই, নিজের ঘরে বড়ো চেয়ারে বসে আছেন গুরু কালীনাথ পাশে দাঁড়িয়ে বীরেন্দ্র। বীরেন্দ্রকে বরাবরই রাজকীয় মেজাজে দেখতে অভ্যস্ত ভাবনা এই তান্ত্রিক বাবার সামনে তাঁর এই ভক্তের রূপে দেখতে অবাকই লাগে ওর।
বীরেন্দ্র আজকেও ইশারা করল প্রণাম করতে। নীচু হয়ে প্রণাম করতে গেলে কালীনাথ বাধা দিলেন।
কালীনাথ তান্ত্রিক কয়েক মুহূর্ত একদৃষ্টিতে ভাবনার গর্ভের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
‘হয়েছে। উপযুক্ত সময় আসন্ন।’
কথাগুলো বীরেন্দ্রকে উদ্দেশ করে বলা। বীরেন্দ্র ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল শুধু। এরপর কালীনাথ ভাবনার উদ্দেশে বললেন,
‘শোন। জরুরি কথা। ওই প্রেতিনি এখনও তোর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। আমি ওকে তোর আশেপাশে দেখতে পাচ্ছি নিজের দিব্যচক্ষু দিয়ে। তোর পেটের সন্তানের প্রতি ওর লোভ আছে। সেই কারণে আগামী শনিবার, অমাবস্যার রাত্রে এই হাভেলিতে পুজোর আয়োজন করব। তাতে তোকেও থাকতে হবে। চিন্তা নেই, তেমন কঠিন কিছু নয়। যা এইবার। ঘরে যা।’
ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বীরেন্দ্র দরজা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে। আর তাতেই ভাবনার মাথায় কৌতূহল চেপে বসল। ও-ও দরজায় কান লাগিয়ে ফুলির মতো কথা শোনার চেষ্টা করল। অস্পষ্ট চাপা কথার মাঝে দুটো অচেনা নতুন শব্দ কানে এল।
‘গুম মশান’, ‘কচ্চা কলুয়া’।
.
৮
কথা দুটো মনে মনে বার কয়েক আউড়ে নিল ভাবনা। একবার ওর গ্রামের তাউজিকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলে হয়। তাউজি কিশোর বয়সে সাধুসঙ্গ করত। তবে পরে ঠাকুমার দাদা, মানে তাউজির মা, বাবা ঘাড় ধরে বিয়ে দিয়ে দেয় ছেলেকে বিবাগি হওয়া থেকে বাঁচাতে। তিনি কিছু আলোকপাত করতে পারেন এইগুলো নিয়ে।
কিন্তু, ঘরে এসে আর ফোন করতে ইচ্ছে করল না ওর। কী দরকার ওর এইসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে? এখন ও সিংহ রাজপরিবারের বউ। কিশোরীর মতো এইসব কাজ না করাই ভালো।
সব দোষ এই ফুলির! মেয়েটা ওর মাথায় আজেবাজে কথা ঢুকিয়েছে। এরপর আর ভাবল না এইসব নিয়ে সারাদিন।
সেদিন রাতের ঘটনা। প্রতি রাতের মতোই আজও বাথরুম যেতে হল ভাবনাকে।
ফেরার সময় হঠাৎই কানে একটা মৃদু আওয়াজ এল ওর। খুব মৃদু একটা খিলখিল হাসির। প্রথমে ভাবল মনের ভুল, কিন্তু কান করে শুনে বুঝতে পারল হাসির শব্দটা আসছে পেছনের বাগান থেকে। জানলা-দরজা বন্ধ, তাই শব্দটা হালকা আসছে। বাগানের দিকের বন্ধ জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কাচের পাল্লা দিয়ে নীচে বাগানের দিকে উঁকি দিল।
মেঘহীন আকাশের থেকে চাঁদের আলো এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে বাগানটা। প্রথমে ফাঁকা বাগানে হওয়ায় দুলতে থাকা ছোটো ছোটো ফুলগাছগুলো বাদে কিছুই চোখে পড়ল না। কিন্তু, ভালো করে লক্ষ করতে ভাবনা দেখতে পেল একদলা অন্ধকার যেন একটা জায়গায় জমাট বেঁধে আছে। অন্ধকারটা একটা অবয়ব নিয়েছে। আকারে ছোটো একটি মানুষের অবয়ব। কিন্তু…কিন্তু, আকারে মানুষ হলেও ঠিক মানুষ নয় যেন! কুচকুচে কালো একটি ছেলে উবু হয়ে বসে আছে বাগানের একটা ফুলগাছের আড়ালে। মাথা থেকে পায়ের নখ অবধি ঘন কালো বর্ণ। কোনো মানুষের বা প্রাণীর প্রাকৃতিক বর্ণ এরকম কালো হয় না এই জগতে। ছেলেটি অদ্ভুতভাবে অর্ধেক উঠে দাঁড়াল। কোমর বেঁকে, দীর্ঘ সরু হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে অনেকটা বাঁদরের মতো দু-পায়ে ভর করে দাঁড়াল। ফুলের দোলা দেখে বাচ্চার মতোই খিলখিল হাসছে। সেই হাসি গায়ের রক্ত জল করে দেয়।
হঠাৎই হাসি থামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল সেই আকৃতিটা। ঘাড় ঘুরিয়ে সোজাসুজি তাকাল ওপরের জানলার দিকে, যেখানে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে ভাবনা। ভাবনা যে তাকে দেখছে, সেটা সে কেমনভাবে যেন টের পেয়েছে। সাদা দুটো আলোকবিন্দুর মতো খুদে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে আছে ভাবনার দিকে। পরমুহূর্তে সেই কৃষ্ণকায় ছেলেটি যে কাজটা করল সেটার জন্যে একদমই প্রস্তুত ছিল না ভাবনা। একলাফে দুটো তলা ডিঙিয়ে ওটা ভাবনার ঘরের জানলায় এসে পড়ল। দু-হাতে গ্রিল ধরে কালো বাচ্চার অবয়বটা ঝুলে আছে জানলার কাচের ওপারে! সাদা দুটো বিন্দু দিয়ে লক্ষ করছে ভাবনাকে!
ঘটনার আকস্মিকতায় মুহূর্তে দু-পা পিছিয়ে মাটিতে বসে পড়েছে ভাবনা! গলা শুকিয়ে কাঁটা! চিৎকার বুক পেরিয়ে গলা দিয়ে বেরোচ্ছে না!
পরক্ষণেই নীচ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। পরিচিত কণ্ঠস্বর। গুরুজি, মানে তান্ত্রিক কালীনাথ অদ্ভুত সুরে কিছু বলছে। নিস্তব্ধ পরিবেশে কিছুটা শুনতে পেল ভাবনা।
‘কালা কলুয়া চৌসঠ বীর,
তাল ভাগী তোর,
যাহা ভেজু ওয়াহা কো যায়,
মাস-মজ্জা ছুবন ন যায়,
অপনা মারা আপ হী খায়…।’
জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করতে থাকা মূর্তিটা যেন জাদুবলে মুহূর্তে থেমে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে নীচে তাকাল। তাকে ডাকছে…! এই অদ্ভুত ডাক যেন সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারে না। পরমুহূর্তে জানলা ছেড়ে লাফ দিল নীচে। সম্বিত ফিরে পেয়ে ভাবনা উঠে দাঁড়াল। তার সাহস যে বরাবরই বেশি সেটা আরও একবার প্রমাণ করে ও আবার জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেই কালো জিনিসটা কোথায় যায় তা দেখার উদ্দেশ্যে। কিন্তু, দেখতে পেল না। শুধু কালো আলখাল্লার এক অংশ দ্রুত নীচের মহলে ঢুকে যেতে দেখল।
.
৯
‘হ্যালো, তাউজি।’
‘কে বলছ?’
‘তাউজি, আমি ভাবনা। প্রণাম নেবেন।’
‘আরে, ভাবনা মা। বল, বল। তাউকে তো ভুলেই গেলি।’
পরবর্তী পনেরো মিনিট পুরোনো কথা বলে গেল তাউজি। গতরাত থেকে ঘুমোয়নি ভাবনা। বীরেন্দ্রকেও বলেনি কিছু। তান্ত্রিক কালীনাথের বিষয়ে কিছু নিশ্চিত না হয়ে তাকে বলে লাভ নেই। তাউজিকে আসল প্রশ্নটা করার জন্যে ভাবনাকে অনেকটা অপেক্ষা করতে হল। একসময় সুযোগ বুঝে বলল,
‘তাউজি, তুমি তো তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে অনেক কিছু জানো। আচ্ছা, “ঝংরুটিয়া” কী জিনিস জানো?’
কয়েক মুহূর্ত ওপাশ থেকে উত্তর এল না। তারপর বৃদ্ধ বললেন,
‘তন্ত্রের এক ধরনের পিশাচ সাধনা আছে— ‘কালীয়া মশান’। রাজস্থানে তাকেই ঝংরুটিয়া বলা হয়। কিন্তু, হঠাৎ এইসব কেন জানতে চাইছিস?’
‘বলোই না। এমনি একটা বইতে পড়ছিলাম। ‘কচ্চা কলুয়া’ কী জিনিস?’
‘কালীয়া মশান’ ক্রিয়ায় তান্ত্রিক এমন কোনো অপমৃত্যুতে মরা বাচ্চার আত্মাকে নিজের বশে আনে যার মৃতদেহর সৎকার ঠিক নিয়মে হয়নি। সেই বাচ্চার আত্মাকে বন্দি করে তান্ত্রিক নিজের মন্ত্রবলে। ওই আত্মা কুচকুচে কালো শরীরের একটা বাচ্চার রূপ নেয়। সেই কারণেই ওই প্রেতকে ‘কালীয়া মশান’ বা ‘কচ্চা কলুয়া’ বলে। কচি বা কাঁচা বয়সে অপূর্ণ সাধ নিয়ে প্রেত হয় বলে ‘কচ্চা’ বলা হয় কলুয়াকে।’
ভাবনার গায়ে কাঁটা দেয়। তার বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, গতকাল রাতে সে একটা ‘কচ্চা কলুয়া’ বা ‘ঝংরুটিয়া’-কে জানলার বাইরে দেখেছে। ভাবনা প্রশ্ন করে,
‘এরা কী করে তাউজি? তান্ত্রিক কী করে এই মশানদের নিয়ে?’
‘অনেক কিছু! সব কিছু! এরা বাচ্চার আত্মা, তাই অনেকাংশে নিষ্পাপ হয়। অতএব ‘কচ্চা কলুয়া’ হয়ে এরা খুবই শক্তিশালী হয়! তান্ত্রিক এদের দিয়ে নিজের কাজ করায়। এরা বদমাশ বাচ্চার মতো দুষ্টও হয়। তোর এইসব না শোনাই ভালো। এখন তো তোর পেটে বাচ্চা আছে শুনেছি।’
‘কেন? বলো আমায়। না বললে ছাড়ব না।’
‘কী আর বলি…! বড়ো জেদ করিস তুই। আরে বাবা, শুনেছি এই কলুয়ারা গর্ভবতী মায়ের পেটের বাচ্চা নষ্ট করে দেয়। তাই বলছিলাম….।’
আরও একবার গা শিরশির করে ওঠে ভাবনার। প্রশ্ন করে
‘আর ‘গুম মশান’ কী?’
‘সে আমারও জানা নেই। কালীয়া মশানের শুনেছি অনেক ভাগ আছে, ধরন, আছে। তারই কিছু একটা হবে। কিন্তু বেটি, তুই এইসব কী বই পড়েছিস? এই মা হওয়ার সময়ে এইসব অশুভ জিনিসের নামও শুনতে নেই। তুই এইসব পড়িস না।’
আর কথা শোনার দরকার ছিল না ভাবনার। ফোন রেখে দিল ও।
ওর মনে একটা সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে। আচ্ছা, এমন নয় তো যে, তান্ত্রিক তার শিশুর ক্ষতি করতে চাইছে? কিন্তু, কেন? আর তাই যদি হবে, তাহলে আরতির প্রেতের থেকে ওকে এই গলার রক্ষাকবচ দেবেন কেন কালীনাথ?
আরও একটা ভয়ংকর সম্ভাবনা উঁকি দিল ওর মনে। তিন বছর আগে বীরেন্দ্রর যে ছেলেটা মারা গেছিল, এমন নয় তো যে, এই গুণিন সেই ছেলের আত্মাকেই ‘কলুয়া’ বানিয়েছে? বীরেন্দ্র যে গুরুকে এত বিশ্বাস করে, সে-ই তার এত বড়ো ক্ষতি করেছে হয়তো!
‘ও ছোটোরানি!
কানের কাছে ফুলির জোর আওয়াজে চিন্তার ঘোর কাটল ভাবনার। কখন যেন ঘরে ফুলি ঢুকে এসেছে। বলল,
‘এত কী ভাবছেন গো ছোটোরানি? এদিকে হুকুম সাহেব যে কালকে বিকেলের পর আমাদের সবাইকে ছুটি দিয়েছেন।’
‘কী? ছুটি? কেন?’
‘গুরুজি কাল হাভেলিতে পুজোপাঠ করবেন। তাই নাকি বাড়ি খালি থাকতে হবে। পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ থাকবে না।’
চকিত মনে পড়ল ভাবনার। তাই তো, আগামীকালই তো শনিবার। কালকে রাতেই তো পুজো। মন কু ডেকে উঠল ভাবনার।
তার মনে যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে, সেটা বীরেন্দ্রকে জানাতে হবে। হয়তো অবিশ্বাস করবে। কিন্তু তবু, তাকে জানাতেই হবে।
ভাবনা ঠিক করল আজকে রাতে স্বামী ঘরে এলেই কালকে রাতের ঘটনা আর ওর সন্দেহর কথা বলবে বীরেন্দ্রকে।
.
১০
সেই রাতে বীরেন্দ্র সময়মতো ঘরে এল। তাঁকে দেখেই জড়িয়ে ধরল ভাবনা।
‘কী হয়েছে রানি? তোমার চোখ-মুখ এরকম লাগছে কেন?’
ভাবনা সমস্ত ঘটনা, যাবতীয় আশঙ্কার কথা খুলে বলল বীরেন্দ্রকে। ভাবনা ভয়ে ভয়ে ছিল যে, হয়তো বীরেন্দ্র তার কথা বিশ্বাস করবে না। গুরুজির সম্বন্ধে এইসব কথা বলার কারণে রেগেও যেতে পারে। বীরেন্দ্র তার ওপর কখনো রাগ দেখায়নি এই এক বছরে, তবে, তাদের পরিবারের পুরুষদের রাগের কথা সারা রেতপুর জানে।
কিন্তু, আরও একবার সব কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনল বীরেন্দ্র। অবিশ্বাসও করল না বা রেগেও গেল না। তান্ত্রিক কালীনাথের ‘মশান’ সম্পর্কে ভাবনার সন্দেহের কথা শুনে চিন্তিত হল বীরেন্দ্র। বলল,
‘আমার মনে হয় না তোমার এই অনুমানটা সত্যি। গুরুজি আমার বা তোমার কোনো ক্ষতি করতেই পারেন না। তবে, রাতে যা দেখেছ, সেটাকে ভুল বলে উড়িয়ে দিতে পারছি না। সত্যি বলতে, গুরুজি আসার পর আমিও মাঝে মাঝে নীচের তলা থেকে রাতে বাচ্চার হাসির শব্দ পেয়েছি। অথচ, মহলের এদিকে এখন গুরুজি ছাড়া আর কেউ থাকছে না অনেকদিন হল। এই ‘মশান’-এর কথা আমায় উনি মাঝে মাঝে বলেন বটে, কিন্তু, তাঁর নিজের যে সেইরকম কিছু আছে, তা আমার জানা নেই। কিন্তু, গুরুজিকে প্রমাণ ছাড়া এইসব কথা বলা যাবে না।’
‘তাহলে উপায়?’
‘উপায় আছে। কালকে রাতে গুরুজি গোপনে পুজো করবেন। সেখানে আমারও প্রবেশ অনুমতি নেই। কিন্তু, কাল আমি আর তুমি লুকিয়ে যাব ওঁর ঘরে পুজোর সময়। আমার ধারণা এমন কিছু আমরা নিশ্চিত দেখতে পাব যা থেকে গুরুজির উদ্দেশ্য আমরা বুঝতে পারব। তুমি পারবে তো আমার সঙ্গে যেতে?’
‘হ্যাঁ, পারব।’
.
১১
পরের দিন বীরেন্দ্র সকালে একবার মাত্র তান্ত্রিক কালীনাথের ঘরে গেল। ফিরে এল কিছুক্ষণ বাদেই। বাকি দিনটা স্ত্রীর সঙ্গেই থাকল আর তাদের নৈশ অভিযানের প্ল্যান করল। ভাবনা এটা ভেবে মনে ভরসা পেল যে, ওর কালকের কথাগুলো স্বামীর মনে দাগ কেটেছে। কারণ, তা না হলে ও সারাদিন ওই তান্ত্রিকের ঘরেই কাটাত। আজ ও তা করেনি।
বিকেল হতেই এক এক করে বিদায় নিতে শুরু করল বাড়ির সমস্ত কাজের লোক। ফুলি যাওয়ার আগে একবার ভাবনার কাছে এল। ঘরে তখন বীরেন্দ্রও বসে টিভি দেখছিল। ফুলি বলল,
‘ছোটোরানি, যাই। কাল দেখা হবে।’
‘দাঁড়া।’
ভাবনা আলমারি খুলে কিছু বের করে এনে ফুলির হাতে দিয়ে বলল,
‘এই টাকাটা রাখ। কাল একটা নারকেল তেল কিনে আনবি।’
‘তেল? কয়েক দিন আগেই তো…’
‘বড্ড মুখে মুখে কথা বলিস। যা! দূর হ! কাল সকালে সময়মতো আসবি! ভাগ এখন!’
ফুলি চলে গেল। হাভেলিতে সন্ধে নামল। এমনিতেই প্রাসাদপ্রমাণ এই পুরোনো বাড়ি নিস্তব্ধ থাকে, আজকে লোকজন না থাকায় প্রায় শ্মশানের নীরবতা। পুরো হাভেলিতে মানুষ এখন মাত্র তিনজন।
রাত তখন দশটা হবে। বীরেন্দ্র বলল,
‘চলো। এইবার সময় হয়েছে। কিন্তু সাবধানে, আওয়াজ করবে না। গুরুজির অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রমাণ আমি অনেকবার পেয়েছি। উনি যদি জানতে পারেন যে, আমরা লুকিয়ে ওঁর তন্ত্রক্রিয়া দেখেছি, সর্বনাশ হবে। অতএব, সাবধানে!’
নীচের তলায় কয়েকটা মৃতপ্রদীপ বাদে কোনো আলো নেই। কালীনাথের ঘরটার মূল বড়ো দরজাটা বাদেও, আরও একটা ছোটো দরজা আছে। বীরেন্দ্র আর ভাবনা ওই ছোটো দরজার দিক দিয়েই ঘরের সামনে পৌঁছোল। ভেতর থেকে অজানা মন্ত্র উচ্চারণের শব্দে চারপাশ গমগম করছে।
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বীরেন্দ্র আরও একবার স্ত্রীকে চুপ থাকার ইশারা করে, পকেট থেকে একগোছা চাবি বের করে একটা চাবি দরজায় ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দিল যতটা কম শব্দ করে করা সম্ভব। তারপর সন্তর্পণে দরজা কিছুটা ফাঁক করল বীরেন্দ্র।
দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে ভাবনা প্রদীপের হলদে আলোয় দেখতে পেল কালীনাথকে। পরনে একটা কালো কাপড়ের কৌপিন মাত্র। উদোম শরীরে সাদা ভস্ম মাখা। কপালে লাল তিলক। মেঝেতে বসে একটা নরকরোটি দু-হাতে ধরে মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেছে ঘোর লাগা অবস্থায়।
বেশ কিছুক্ষণ একইভাবে মন্ত্র পড়ার পর হঠাৎ চুপ করে গেল তান্ত্রিক। মুহূর্তে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল ভাবনার। তবে কি লোকটা ওদের দেখতে পেয়ে গেল? পরক্ষণেই সুর করে কবিতার মতো সেই মন্ত্রটা পাঠ করে উঠল গুরুজি।
কালা কলুয়া চৌসঠ বীর,
তাল ভাগী তোর,
যাহা ভেজু ওয়হা যায়,
মাঁস-মজ্জা ছুবন ন যায়,
অপনা মারা আপ হী খায়,
চলত বাণ মারূ, উলট মুঠ মারূ,
মার-মার কলুবা তেরি আশ চার,
চৌমুখা দীয়া মার বাদী কী ছাতী,
ইতনা কাম মেরা ন করে,
তো তু-কো মা কা দুধ হরাম!
মেঝেতে এক জায়গায় একটা অদ্ভুত নকশা আঁকা রয়েছে। পাঁচ কোনায় পাঁচটা মড়ার খুলি রাখা। কয়েক মুহূর্তর মধ্যে মনে হল যেন ঘরের সমস্ত অন্ধকার ঠিক সেই চিহ্নের মাঝে জমা হচ্ছে! ঘরের মধ্যের উষ্ণতা কয়েক পারদ নেমে গেল মুহূর্তে। ঘরের ভেতরের হাওয়া ভারী হয়ে এল। দরজার ফাঁক দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এসে বীরেন্দ্র আর ভাবনার মুখে ধাক্কা দিল।
ওই নকশার মাঝে, মেঝেতে এখন কিছু একটা বসে আছে। একটি কয়লা কালো বাচ্চা ছেলে উবু হয়ে বসে আছে সেখানে। ওটার শরীরটাও যেন অন্ধকার দিয়েই বানানো।
দুই কাঁধের মাঝে মাথা ঝুলিয়ে বসে ছিল ওটা। হঠাৎ সেটা মাথা তুলে তাকাল! জ্বলজ্বলে দুটো সাদা চোখের দৃষ্টি সরাসরি দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে ভাবনার চোখের দিকে।
ভাবনা টের পেল ওর দম বন্ধ হয়ে আসছে। একটা অদ্ভুত গন্ধ নাক দিয়ে ঢুকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে ওর শরীর। শরীর শিথিল হয়ে আসছে। অন্ধকার নেমে আসছে দুই চোখে।
সম্পূর্ণ জ্ঞান হারানোর আগে ভাবনা টের পেল ওর নাকের ওপর ভেজা রুমাল চেপে ধরে আছে একটা বলিষ্ঠ হাত! তার অতি পরিচিত হাত!
.
১২
জ্ঞান ফিরতে প্রথমে ভাবনার মনে হল যেন এতক্ষণ গভীর ঘুমে ডুবে ছিল একবারে চোখ খুলতে পারল না, মাথাটা এখনও ভারী। কানে মন্ত্রপাঠ আসছে, আর নাকে ধুনোর গন্ধ। চোখ খুলে ও কোথায় আছে মনে করতে একটু সময় লাগল ভাবনার। নড়তে গিয়ে টের পেল হাত আর পা বাঁধা আছে। বুঝল ওকে টেবিলের মতো শক্ত কিছুর ওপর সোজা করে শুইয়ে রাখা হয়েছে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে।
ঘাড় ঘুরিয়ে যেদিক থেকে মন্ত্র আসছে সেদিকে তাকাল। এখনও তান্ত্রিক কালীনাথ একইভাবে বসে মন্ত্র আউড়ে চলেছেন। তাঁর পাশেই সেই ভয়ংকর কালো বাচ্চাটা স্থির হয়ে বসে আছে! দৃষ্টি ওঁরই দিকে। তবে, আরও একজন বসে আছে কালীনাথের মুখোমুখি। স্বয়ং বীরেন্দ্র সিংহ।
খুব একটা অবাক হল না ভাবনা। তার মুখের ওপর অজ্ঞান করার ওষুধ ভেজা রুমালটা, কে চেপে ধরেছিল সেটা ও জ্ঞান হারাবার আগেই বুঝেছে। এখন বীরেন্দ্রর পরনেও কালো একটা কাপড় মাত্র, কপালে লাল তিলক।
পরবর্তী কিছুক্ষণ মন্ত্র পাঠ চলল। তারপর বীরেন্দ্র ঘাড় ঘুরিয়ে ভাবনাকে দেখল।
‘আরে, রানি। ঘুম ভেঙে গেল? বেশ, বেশ!’
‘আমায় বেঁধে রেখেছ কেন? কী করছেন আপনি এখানে? জবাব দিন বীরেন্দ্র সাহেব!’
‘দেব, দেব। সব উত্তর দেব। এখানে কী করছি জানতে চাও? এখানে আমরা অস্ত্র বানাচ্ছি! আমার শত্রু নিধন অস্ত্র!’
‘ওই…ওই ঝংরুটিয়া তবে…?’
ওর কথা মাঝপথেই থামিয়ে বীরেন্দ্র বলল,
‘সব সাফল্যের জন্যেই বলিদান দিতে হয়! রাজপুতরা নিজের রক্তের বলি দিয়েও জয় পায়! আমার ব্যাবসা, বাণিজ্য সব শেষ করে দিয়েছিল আমার শত্রুরা আর বিশ্বাসঘাতকরা। আমি হেরে গেছিলাম সম্পূর্ণ। তখনই গুরুজির সাক্ষাৎ পাই আমি বারাণসীর অশি ঘাটে। তিনি আমার দুর্দশার কথা দৈবদৃষ্টিতে দেখেছিলেন। আমায় তিনি উপায় বলেন যাতে আমি নিজের শত্রুদের শেষ করতে পারব। আমি নিজের ছেলে জিতেন্দ্রকে গুরুজির চরণে সঁপে দিয়েছিলাম! গুরুজি ওর মানবজীবন শেষ করে, ‘কালিয়া মশান’ সাধনা দ্বারা ওকে ‘কচ্চা কলুয়া’ বানান। ওই… ওই দেখো! ওই আমার ছেলে! আমার সবথেকে বড়ো অস্ত্র!’
আঙুল তুলে উবু হয়ে বসে থাকা প্রেতমূর্তির দিকে দেখায় বীরেন্দ্র। বলল,
‘কলুয়া আমার সমস্ত শত্রুদের একে একে শেষ করেছে গুরুজির আদেশে! আমার সাফল্যের পথে যে-ই কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে, তাকে আমার জিতেন্দ্র শেষ করে দেবে!’
‘তুমি উন্মাদ! তুমি মানুষ নও! নিজের ছেলেকে হত্যা করে তুমি ওকে এই অভিশপ্ত পিশাচ বানিয়েছ! তুমি বাবার নামে কলঙ্ক! তুমিই নিশ্চয়ই বড়োবউ আরতিকেও হত্যা করেছ?’
দু-দিকে কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঠান্ডা গলায় বীরেন্দ্র বলল,
‘আমার উপায় ছিল না। ও কিছুতেই ছেলেকে অর্পণ করতে রাজি হল না। তাই ওকেও আগে মারতে হয়েছিল আমায়। ওর আত্মা এখনও ছেলের টানে এখানেই ঘুরে বেড়ায়। তবে, ওই কমজোর প্রেত গুরুজির শক্তির সামনে কিছুই নয়। কিছুই করতে পারে না।’
‘কিন্তু কেন? নিজের সন্তানকে কেন?’
উত্তরটা এইবার তান্ত্রিক কালীনাথ দিলেন,
‘কারণ ‘কলুয়া’দের বশে রাখা খুব কঠিন। এরা ঠিক বাচ্চার মতোই ছটফটে আর দুষ্টু হয়। অনেক তান্ত্রিক চেষ্টা করেও এদের বশে রাখতে পারে না। তাই আমি, মহা তান্ত্রিক কালীনাথ, কলুয়াকে সম্পূর্ণ বশে রাখার একটা অভিনব উপায় বের করেছি! যদি ঝংরুটিয়া বানানোর সময়ে, কালিয়া মশানে সেই শিশুরই পিতা বা মাতার রক্ত ব্যবহার করা যায়, তবে ঝংরুটিয়াকে বশ করা সম্ভব। কারণ, বাচ্চা যেভাবে শুধু পিতা আর মাতার বাধ্য হয়, সেভাবেই কলুয়াও পিতার আদেশ অমান্য করতে পারবে না।’
বীরেন্দ্র বলল,
‘এই কলুয়াকে আমি আদেশ দিয়েছি যে, সে যেন কখনো গুরুজির অমান্য না করে। আমার এই আদেশে ও গুরুজির বশে থাকতে বাধ্য! ‘
‘তোমরা শয়তান! তোমরা খুনি! কী করতে চাও আমার সঙ্গে? আমার তো সন্তানের জন্মও হয়নি! তোমার তো ওই কলুয়া আছেই। তবে, আমার থেকে কী চাও?’
হো হো করে হেসে উঠল কালীনাথ। বলল,
‘তুই কী শুনেছিস তা বীরেন্দ্র আমায় বলেছে। তুই ভাবিস তন্ত্রের সব গূঢ় রহস্য তুই জেনে গেছিস? আরে মূর্খ, কালিয়া মশানের ক্ষমতা কতটা তোর আন্দাজও নেই! শোন তবে তাকে বলি। কালিয়া মশান অনেক ধরনের হয়। বয়সের ওপর নির্ভর করে ‘কচ্চা কলুয়া’, ‘পিতর’, ‘উত’ নামে আলাদা করা হয়। কিন্তু, এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মশান হয় ‘গুম মশান’! যে শিশুর গর্ভপাতে মৃত্যু হয়, সেই ভ্রূণের শব থেকে নির্মাণ করা ‘কলুয়া’ হল ‘গুম মশান’! গর্ভে থাকা শিশুর সঙ্গে মায়ের যে নাড়ির যোগ থাকে, শাস্ত্র বলে সেই জীবনদায়ী নাভিরজ্জুতে স্বয়ং নারায়ণ অবস্থান করেন! জন্মমুহূর্তে সেই নাড়ি ছিন্ন করে সেই মহাশক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিন্ন করা হয়। কিন্তু, যদি শিশুর মৃত্যু গর্ভেই ঘটে, গর্ভনালী সমেত মৃত্যু হয় শিশুর, তবে সেই শিশুর মধ্যে নারায়ণের অসীম শক্তির অংশ থেকে যায়। মৃত ভ্রূণের সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলে নির্মাণ করা হয় মহাশক্তিশালী ‘কচ্চা কলুয়া’! এরা প্রবল, বিকট, ভয়ংকর, অপ্রতিরোধ্য! সাধারণ কলুয়ার থেকে বহু গুণ বেশি শক্তিশালী! মন্দির, মসজিদ, গির্জা পর্যন্ত এই পিশাচের অবাধ গতিবিধি। তুই দিবি আমায় সেই শক্তি! তোর পেটের ওই কন্যাসন্তান হবে আমার সেই মহা শক্তিধর গুম মশান!’
‘না! না! আমার এই সর্বনাশ কোরো না! বীরেন্দ্র! বীরেন্দ্র! আমার পেটের সন্তান তো তোমারও! তুমি নিজে এতদিন তার যত্ন নিয়েছ! তবে আজ কেন এই কাজ করবে?’
বীরেন্দ্র নির্লিপ্তভাবে বলল,
‘তোমার পেটে মেয়ে আছে। ওর প্রয়োজন আমার নেই। নিজের ছেলেকেই বলি দিয়েছি। কষ্ট হয়েছিল। তবুও করেছি। তোমার তো মেয়ে মাত্র।’
কথাটা শুনে বজ্রাহতর মতো কেঁপে উঠল ভাবনা! কে পিশাচ এই ঘরে? ওই অভিশপ্ত কালো বাচ্চাটা নাকি এই মানুষগুলো?
গুরুজি বললেন,
‘তোকে এতদিন যত্নে রাখার কারণ আছে। ‘গর্ভ উপনিষদ’ বলে সপ্তম মাসে ভ্রূণে প্রাণ সঞ্চার হয়। তাই সপ্তম মাসের আগে ওটাকে ঠিক অর্থে ‘হত্যা’ করা সম্ভব নয়। আজ এই সপ্তম মাসের অমাবস্যা হল ভ্রূণকে গর্ভেই হত্যা করার উপযুক্ত সময়! বীরেন্দ্র! সময় আসন্ন!’
গুরুকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল বীরেন্দ্র। তার হাতে একটা ধারালো ছুরি। উঠে এগিয়ে এল ভাবনার দিকে। বলল,
‘তোমারই দোষ ছোটোরানি। তোমরা মেয়েরা বড়ো বোকা আর জেদি। এই জেদ করেই বড়োরানিও মরল। তোমাকেও মারার কোনো ইচ্ছে ছিল না, রানি। তোমায় অজ্ঞান করে, তোমার পেটের বাচ্চাকে মেরে ফেলে বের করে আনতাম। পরে সকালে বলে দিতাম যে, কিছু একটা কারণে তোমার বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি বিশ্বাস করে নিতে আমার কথা। এরপর আবার আমাদের ছেলে হলে, সুখে আমরা সংসার করতাম। কিন্তু, তোমার অতি উৎসাহ, তোমার কাল হল! কেন নাক গলাতে গেলে আমাদের ব্যাপারে? এখন তো তোমায় মারা ছাড়া উপায় নেই।’
হঠাৎই জোর হল্লার শব্দ ভেসে এল বাইরে থেকে। প্রধান ফটকের বাইরে লোকজন গেটে আঘাত করছে। বীরেন্দ্র আর কালীনাথ চমকে উঠে একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
এইবার ভাবনা বলে উঠল,
তুমি মেয়েদের খুব বোকা ভাবো, তাই না বীরেন্দ্র? তবে জেনে রাখো, তুমি আমায় ঠকাতে পারোনি। দু-দিন আগে টিভিতে গৌরব আহুজার স্ত্রীর সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়ার খবর দেখেছিলাম। তখন নামটা কোথায় শুনেছি মনে করতে পারিনি। কিন্তু, আজকে সকালে মনে পড়েছিল। তোমারই মুখে শুনেছি! আহুজা এই কারণে টেন্ডার জমা দিতে না পারায় তুমি সেটা পেয়ে, আমায় এসে বলেছিলে ওর নাম। ‘কালিয়া মশান’ যে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে তা শুনেছিলাম আগেই। তাই দুয়ে দুয়ে চার করতে পেরেছিলাম আমি। বুঝেছিলাম তুমিও এর সঙ্গে জড়িত!’
‘ইউ বিচ! কী করেছিস তুই? কারা বাইরে হল্লা করছে?’
‘গ্রামের লোক! তুমি কাল রাত থেকেই আমায় নজরে রেখেছিলে। তাই তেল কেনার টাকার মাঝে তোমায় লুকিয়ে আজ বিকেলে ফুলির হাতে একটা চিরকুট দিয়ে দিয়েছিলাম, যাতে সব কথা লেখা ছিল। লিখে দিয়েছিলাম, রাতে যেন লোকজন হাভেলিতে আমায় সাহায্য করতে আসে, তোমাদের হাতেনাতে ধরতে পারে। দেখো, ফুলি বুদ্ধিমান মেয়ে। ঠিক নিজের কাজ করেছে! গ্রামের লোক দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে আসবে, বীরেন্দ্র!’
রাগে জ্বলে উঠেছে বীরেন্দ্র আর কালীনাথের চোখ। কালীনাথ বললেন,
‘বীরেন্দ্র! দ্রুত হত্যা করো ওকে! ভ্রূণ এনে দাও! একবার ‘গুম মশান’ জেগে উঠলে হাজার লোকও আমাদের কিছু করতে পারবে না!
ছুরি তুলে ভাবনার সামনে এসে দাঁড়াল বীরেন্দ্র। ভয়ে চোখ বন্ধ করে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিল ভাবনা। তখনই ওর চোখে পড়ল, বীরেন্দ্রর ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আরতি।
ভাবনা এতক্ষণে খেয়াল করল ওর গলা থেকে কখন যেন সেই তাবিজটা খুলে গেছে। সম্ভবত বীরেন্দ্র ওকে অজ্ঞান করার সময়েই ছিঁড়ে গেছে। তাই আরতির প্রেতকে বীরেন্দ্র দেখতে পাচ্ছে না, শুধু ও পাচ্ছে। আরতি বীরেন্দ্রর দিকে আঙুল তুলে ভাবনাকে কিছু একটা ইশারা করছে। কয়েক মুহূর্ত লাগল ভাবনার সেই ইঙ্গিত বুঝতে।
বীরেন্দ্রর হাতের ছুরি ততক্ষণে স্পর্শ করেছে ভাবনার তলপেট। হাত বাঁধা অবস্থাতেই ভাবনা কোনোভাবে, সর্বশক্তি লাগিয়ে মাথা তুলে বীরেন্দ্রর গলা লক্ষ করে ঝাঁপ দিল।
বীরেন্দ্র সতর্ক হয়ে পিছিয়ে গেছে। কী হল ও বুঝল না। পরক্ষণেই দেখল ভাবনার মুখে, দাঁতের ফাঁকে ঝুলছে বীরেন্দ্রর গলার তাবিজটা! দাঁত দিয়ে সেটা ছিঁড়ে দিয়েছে ভাবনা!
কী ঘটছে তা ভালোভাবে বোঝার আগেই বীরেন্দ্র টের পেল তার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একমুহূর্ত আগেও সেখানে কেউ ছিল না, কিন্তু, এখন ও টের পাচ্ছে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে পাশে। সেদিকে চোখ ঘোরাতেই বীরেন্দ্র দেখতে পেল তার মৃত প্রথমা স্ত্রীকে! চোখে তীব্র জিঘাংসা হেনে তাকিয়ে আছে তারই দিকে।
টু শব্দটি করার সুযোগ পেল না বীরেন্দ্র। তার আগেই একহাতে আরতি তার শরীরটা শূন্যে তুলে ফেলল গলা টিপে ধরে। হাড় ভাঙার একটা ছোট্ট শব্দ আর সঙ্গেসঙ্গেই শুকনো পাতার মতো মাটিতে খসে পড়ল বীরেন্দ্রর ভারী শরীরটা। প্রাণহীন দেহটার চোখ দুটো এখনও বিস্ফারিত হয়ে চেয়ে আছে ছাদের দিকে। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তের তীব্র ভয় এখনও তার রেশ রেখে গেছে সেই দু-চোখে।
‘নাহ্!’
চিৎকার করে উঠলেন তান্ত্রিক কালীনাথ। তাঁর কণ্ঠে রাগ এবং হতাশা দুইই স্পষ্ট। দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন,
‘আমার এত বছরের অপেক্ষা বৃথা করে দিলি তুই! তোকে আমি নিজের হাতে মারব! তোর ওই প্রেত আরতি আমায় ছুঁতে পারবে না!’
বীরেন্দ্রর হাত থেকে খসে পড়া ছুরিটা তুলে নিলেন কালীনাথ। ততক্ষণে গেট ভেঙে লোকজন ঘরের দরজায় পৌঁছে গেছে। আর মাত্র কয়েক মুহূর্ত…! কিন্তু, ভাবনা জানে সেটুকু সময়ও ওর হাতে নেই! কারণ, বীরেন্দ্রর গলা থেকে রক্ষাকবচটা ছিঁড়ে ফেলেছিল বলে আরতির আত্মা ওকে আটকাতে পেরেছে। কিন্তু, তান্ত্রিকের গলায় এখনও সেই তাবিজ রয়েছে। তাঁকে ছোঁয়ার সাধ্য নেই আরতির।
কালীনাথের চোখে নিজের মৃত্যু খেলা করতে দেখল ভাবনা। তার দিকে এক পা এগোলেন তান্ত্রিক। কিন্তু, তাঁকে থামতে হল। কারণ কেউ তাঁর পা টেনে ধরেছে।
অবাক হয়ে পেছনে ফিরে দেখলেন এতক্ষণ তন্ত্রবৃত্তের মধ্যে বসে থাকা কলুয়া নিজের একটা হাত বাড়িয়ে তাঁর পা চেপে ধরেছে নিজের বজ্রমুষ্টিতে। একদিকে মাথা হেলিয়ে, তাঁর দিকে তাকিয়ে, সাদা সুচালো সারি বাঁধা দাঁত বের করে হাসছে ওটা! খুদে অগ্নিবিন্দুর মতো চোখ দুটো তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।
কী ঘটছে সেটা বুঝতে একমুহূর্ত সময় লাগল তান্ত্রিকের। কলুয়া তাঁর বাবার আদেশে ওর বশীভূত ছিলেন। বীরেন্দ্রর মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গেই সেই রক্তবন্ধন থেকে মুক্ত হয়েছে কলুয়া! পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরতির আত্মা কালীনাথের কোনো ক্ষতি করতে সক্ষম না হলেও, কলুয়ার কোনো বাধা নেই! এখন তান্ত্রিকের চেয়েও বড়ো একটা শক্তির আজ্ঞা মেনে চলছেন কলুয়া! তাঁর মায়ের! বাবা মারা যেতে এখন কলুয়া তাঁর মা আরতির কথা শুনবেন শৈশবের নিয়ম মেনে! মায়ের উপস্থিতিতে কোনো মন্ত্রতন্ত্রের জোর তাঁর ওপর খাটবে না!
পায়ে এক হ্যাঁচকা টানে কালীনাথকে মাটিতে ফেলে দিলেন কলুয়া!
তান্ত্রিক চিৎকার করে উঠলেন,
‘না! না! ছাড় আমায় কলুয়া! আমি তোকে জাগিয়েছি! আমার কথা শোন!’
বাচ্চা ছেলের খিলখিল হাড়-হিম-করা হাসির গুঞ্জনে ভরে উঠছে ঘর। কালো শরীরটা ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে চড়ে বসছে তান্ত্রিক কালীনাথের শরীরের ওপর। বুকের ওপর বসল ওটা। মুখে বিকট পৈশাচিক হাসি! মৃত্যুকে সামনে দেখে প্রাণপণ আর্তনাদ করছেন কালীনাথ।
এক ঝটকায় পিশাচ মুখটা নামিয়ে আনল কালীনাথের গলার নলি লক্ষ করে। সুচালো দাঁত বসিয়ে দিল গলার নরম জায়গায়
এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আবার জ্ঞান হারায় ভাবনা। জ্ঞান হারানোর আগে দরজা ভাঙার আওয়াজ পেয়েছিল।
***
ভাবনা চোখ খুলে প্রথমেই দেখে ফুলি ওর মাথার কাছে বসে উদগ্রীব দৃষ্টিতে চেয়ে আছে তার দিকে।
‘ছোটোভাবি! আপনি ঠিক আছেন তো?’
ফুলিকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে ভাবনা।
ভাবনাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায় গ্রামের লোক। সেই রাতে দরজা ভেঙে তারা ঠিক কী দেখেছিল তা কেউ উচ্চারণ করে না আজও।
ভাবনার কন্যাসন্তান সুস্থভাবে জন্ম নেয় তিনমাস পরেই। এই ঘটনার পর হাভেলি ছেড়ে বরাবরের মতো বেরিয়ে আসার সময়ে শেষবারের জন্যে আরতি আর জিতেন্দ্রকে দেখতে পেয়েছিল ভাবনা। হাভেলির জানলায় দাঁড়িয়ে ছিল ওরা। তবে আরতিকে ফ্যাকাশে প্রেতের মতো দেখতে লাগছিল না। ঠিক বিয়ের ছবির মতোই লাগল। আর জিতেন্দ্রর শরীর থেকেও সেই অভিশপ্ত কালো রং বিদায় নিয়েছে। তাকে ঠিক সাধারণ পাঁচ বছরের ফুটফুটে বাচ্চা ছেলের মতোই লাগছে। দু-জন পাশাপাশি হাত ধরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল ভাবনার দিকে। মাত্র একমুহূর্ত। তারপরেই দুটো অবয়ব মিলিয়ে যায় ভাবনার চোখের সামনে।
চোখের কোণ ভিজে ওঠে ভাবনার।
মানুষের লোভ আর হিংসার এই পৃথিবী বড়ো ভয়ংকর। কিন্তু, ঈশ্বরের সৃষ্টি এই পৃথিবী বড়ো সুন্দর।
.
References :
1. https://kala-kalwa-vashikaran-specialist.blogspot.com/… 2. http://www.vedarahasya.net/garbha.htm
3. https://en.wikipedia.org/wiki/Hinduism-and-abortion 4. https://sachhiprerna.com/kachha-kalwa-Sadhna-nuksan-hindi/
