বাঁশে যখন ফুল ধরে – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

বাঁশে যখন ফুল ধরে

[কয়েক বছর আগে একটা ই-বুক সংকলনের জন্যে গল্পটা লিখেছিলাম। চ্যালেঞ্জটা ছিল যে, গল্প যা-ই হোক, গল্পের থিম হতে হবে- ‘পঞ্চতন্ত্র’। ছোটোবেলার নীতিকথার গল্পের সঙ্গে মিল রেখে কি আধুনিক ভয়ের গল্প লেখা যায়?]

১. বাঁশে ফুল ধরেছে।

দিনু বুড়ো পুকুরে ডুব দিয়ে, বাড়ি ফিরছিল ভেজা কাপড়ে। বেলা অনেকটা হয়েছে, সূর্য মাথার ওপরে উঠেছে ততক্ষণে। শ্মশানের পাশ দিয়ে বুড়োর বাড়ি ফেরার রাস্তাটা যায়। ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময়ই তার চোখে পড়ে ওইগুলো। শ্মশানের দিকে চোখ যেতেই মনটা ‘কু’ ডেকে ওঠে। আরে, রঙিন ওগুলো কী বাঁশঝাড়ে? সেই জিনিস নয় তো? না না, নিশ্চয়ই চোখে ভুল দেখছে। তার চোখে এমনিতেই ছানি পড়েছে।

দুরু দুরু বুকে দিনু বুড়ো এগিয়ে যায় শ্মশানের দিকে। পুরোনো মন্দিরে মা শ্মশানকালীর বিকট মূর্তি উত্থিত খাঁড়া হাতে, নরমুণ্ডু মালা গলায় দাঁড়িয়ে আছে। এখান দিয়ে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা স্নান সেরে ফেরে দিনু বুড়ো। গত আশি বছর ধরে সে এটা করছে। কিন্তু, আজ এই প্রথমবার শ্মশানের কালীমূর্তি দেখে ভয় লাগে তার। প্রণাম করে মায়ের উদ্দেশে। মনে মনে দিনু বলে,

‘মা, রক্ষা করিস। যা ভয় পাচ্ছি, সেটা যেন না হয়।’

বাঁশঝাড়ের সামনে পৌঁছোতেই দিনু বুড়োর মনের শেষ আশাটাও শেষ হল। নাহ্! কোনো সন্দেহ নেই। বাঁশে ফুল এসেছে! এত বছর পর, এত যুগ পর, আবার গোলাপি-লাল ফুল ধরেছে এই শ্মশানঘাটের বাঁশগাছে। এই ফুল দিনু আগে কখনো চোখে দেখেনি। কিন্তু, শুনেছে এই ফুলের গল্প, সেই কোন ছোটোবেলা থেকে। এই

বুরুডি গাঁয়ের প্রতিটা ছেলেমেয়ে শুনেছে এই ফুলের কথা। অতএব বুড়োর চিনতে কোনো অসুবিধে হল না। এই সেই…এই সেই সর্বনাশী ফুল!

চোখে-মুখে আতঙ্ক নিয়ে গাঁয়ের দিকে দৌড় দিল দিনু বুড়ো। চিৎকার করতে করতে,

‘এ কী সর্বনাশ হল গো! ওগো শোনো গো! বাঁশে ফুল ধরেছে!’

.

২. অভিশাপ

ইস্কুল থেকে বেরিয়ে আজকে রোজকার মতো বাড়ি ফিরছিল শিমুল। এই সামনের বছর মাধ্যমিক, তাই এখন একটু পড়ার চাপ। আজ বাড়ি ফেরার পথে শিমুল লক্ষ করল যে, গ্রামের পরিবেশ যেন পালটে গেছে। সকলের মুখ থমথমে। লোকজন জায়গায় জায়গায় জটলা করে গম্ভীরভাবে আলোচনা করছে।

শিমুলের বাবা চাষি আর মা তালপাতার ঝুড়ি বানায়। দু-জনের রোজগার মিলেও সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায়। শিমুল বহুবার বাড়িতে বলেছে যে, ইস্কুলে না গিয়ে বরং মায়ের সঙ্গে কাজে লেগে পড়ি। অন্তত কিছুটা হলেও সুবিধে হবে সংসারে। তা ছাড়া, ইস্কুলে বইয়ের খরচ তো আছেই সামান্য হলেও। যদিও মুকুল মাস্টার তার এবং আরও চার দুস্থ ছাত্রের স্কুলের ফি নিজেই দেন। আর বইও নিজেই আগের বছরের ছাত্রদের থেকে নিয়ে জোগাড় করে দেন। অদ্ভুত ভালোমানুষ লোকটা। সরকারি ইস্কুলের বেতন অতি সামান্য। নিজে বিয়ে- থা করেননি এইজন্যে। অথচ, তাঁর বেশিরভাগ বেতন খরচ করেন তিনি ছাত্রদের ওপর। শিমুল পড়াশোনায় ভালো। তাই জান দিয়ে পড়ান মুকুল মাস্টার। মাধ্যমিকের এক বছর আগেই প্রচুর চাপ দিয়ে রেখেছেন তাদের ওপর। এই মাস্টার তাকে ইস্কুল ছাড়তে দেননি। আর তা ছাড়া শিমুলের মা-বাবারও তাকে নিয়ে চোখ ভরা স্বপ্ন। মেয়ে একদিন পড়াশোনা করে বড়োমানুষ হবে। তাই শত অভাবেও শিমুলের ইস্কুল বন্ধ করতে দেননি তাঁরা।

বাড়ির দাওয়ায় হাত-পা ধুয়ে ঘরে ঢুকে শিমুল দেখল তার বাবা, মা-র মুখ থমথমে। শিমুল জিজ্ঞেস করল,

‘তোমাদের সবার হয়েছে কী বলো তো? গ্রামের সবাই এমনভাবে ঘুরছে যেন সর্বনাশ হয়েছে। ব্যাপারটা কী?’

শিমুলের বাবা ঘাড় নেড়ে বলল,

‘হয়নি রে, শিমুল। এইবার হবে।’

‘কী হবে?’

‘সর্বনাশ! শ্মশানের বাঁশঝাড়ে ফুল ফুটেছে।’

শিমুল অবাক হয়ে গেল বাবার মুখে এই কথা শুনে। এই গাঁয়ের প্রতিটা মানুষ গল্পটা জানে। এই গাঁয়ে এক জনশ্রুতি আছে। একটা গল্প আছে, যা সকলেই শুনেছে। কিন্তু সেটাকে নিয়ে যে তার বাবা, মা এবং সারাগ্রাম এতটা বিচলিত হবে, সেটা তার জানা ছিল না।

এই গাঁয়ের ওপর নাকি এক পিশাচের অভিশাপ আছে। প্রতি এক-শো বিশ কি এক-শো ত্রিশ বছর পর পর, এক পূর্ণিমার রাতে, এই গ্রামের ওপর নেমে আসে মৃত্যুর কালো ছায়া। গাঁয়ের যেকোনো একজন মানুষের দেহে ভর করে এক নরকের থেকে উঠে আসা দানো। যদিও কেউ কেউ বলে সেটা দানো নয়, মহা দেবীরই কোনো ভয়াল অবতার। কিন্তু, সে দেবী হোক বা দানো, তার পৈশাচিক তৃষ্ণা একমাত্র মানুষ এবং পশুপাখির তাজা রক্তে মেটে। সে যখন জাগে তখন নির্মমভাবে সে হত্যা করে তার আশেপাশের মানুষকে। এই দানো সাধারণত ভর করে কোনো এক রজঃস্বলা নারীর শরীরে। কিন্তু, কার শরীরে, তা আগে থেকে বোঝার বা জানার কোনো উপায় নেই। বা, কোন পূর্ণিমায় সে আসবে তাও বোঝার কোনো উপায় নেই। কিন্তু পিশাচের আগমনের আগে একটা ইঙ্গিত প্রকৃতি দেয়। তার আগমনের ঠিক আগে আগেই পুরোনো শ্মশানে প্রাচীন কালীমন্দিরের পাশের মস্ত বাঁশগাছে ফুল ফোটে। শ্মশানের ওই বাঁশগাছে ফুল আসা মানেই সময় হয়েছে আরও একবার সেই অপশক্তির জাগরণের।

শিমুল তার মা, বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। কী বলবে ভেবে পেল না প্রথমে। শিমুল ছোটোবেলায় এই গল্পে ভয় পেলেও বড়ো হয়ে বুঝেছিল যে, এইসব শুধুই গল্প। মুকুল মাস্টার তো এইসব কথা হেসে উড়িয়ে দেয়। বলে,

‘শোন তোরা। আসলে বাঁশগাছে ফুল ফোটাটা খুব বিরল ঘটনা। প্রতি এক-শো বিশ বা এক-শো ত্রিশ বছর বাদে বাদে একবার ফুল ধরে বাঁশগাছে। তাই লোকের মধ্যে এই নিয়ে কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে। বাংলার অনেক গ্রামে এই ধারণাও প্রচলিত আছে যে, বাঁশগাছে ফুল নাকি অনাবৃষ্টি এবং খরার বার্তা নিয়ে আসে। এগুলো সবই গল্পকথা।’

শিমুল নিজেও তাই মনে করে। কিন্তু আজ সারাগ্রামের এই অবস্থার জন্যে যে এই সামান্য ঘটনা দায়ী, সেটা ভেবে অবাক হল সে। তার চোখের ভাষার অবিশ্বাস পড়তে পেরে শিমুলের মা বলল,

‘মা, এ অভিশাপ সত্যি। আমার ঠাকুমার কাছে আমি শুনেছিলাম। তার ছোটোবেলায় একবার এই ঘটনা ঘটেছিল। সে বহু বছর আগে ইংরেজ আমলে বাঁশগাছে শেষবার ফুল ধরেছিল। তখন জমিদার চৌধুরিরা ছিল এই গ্রামের তালুকদার। ইংরেজ সরকারের থেকে তালুকদারি, রায়বাহাদুর খেতাব সবই

নিয়েছিল তাদের তোষামোদ করে। নীলকরদের সঙ্গে মিলে প্রজাদের ওপর খুব অত্যাচার করত। এক রাতে সাহেবদের সঙ্গে চৌধুরীরা বিশাল জলসা বসিয়েছিল জমিদার বাড়িতে। সেই রাতেই জমিদারের আপন পুত্রবধূর ওপর দানো ভর করেছিল। সারারাত শুধু ওই মহল থেকে মানুষের মরণ আর্তনাদ শুনে গ্রামের লোক ঠক ঠক করে কেঁপেছিল। পরের দিন সকালে জমিদার, তার লেঠেলদের এবং নীলকর সাহেবের ছিন্নভিন্ন লাশ পেয়েছিল গাঁয়ের মানুষ। শুধু ওই বউটা বেঁচে ছিল। অজ্ঞান অবস্থায় ওকে পাওয়া যায়।

শিমুল মাস্টারের মতোই যুক্তিবাদী। গল্পটা শুনে বলল,

‘এমনও তো হতে পারে যে, সেই রাতে ডাকাত পড়েছিল ওই বাড়িতে, বা, অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষরাই রাতে হামলা চালিয়েছিল।’

মা উত্তর দিল,

‘তাহলে শুধু বউটাকে অক্ষত কি ছেড়ে দেয়? দেখ শিমুল, সব কিছুতেই এঁড়ে তর্ক করবি না। যুগ যুগ ধরে যা সবাই জেনে আসছে তা কি মিথ্যে হতে পারে? কী বলবে ভেবে পেল না শিমুল। বিজ্ঞানে পড়েছে সে যে, পৃথিবীর বহু প্রচলিত ধারণাই মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। যেমন, আগে সবাই জানত যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। সেটাও তো সবাই যুগ যুগ ধরেই সত্যি বলে মেনে আসছিল। কিন্তু, এইসব কথা বলে তার আর বকা খাওয়ার ইচ্ছে নেই।

শিমুলের বাবা থমথমে মুখে হ্যারিকেনের আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলল,

‘এতগুলো বছর পর আবার ফুল ফুটেছে বাঁশগাছে। আবার দানোর জাগার সময় এসে গেছে।’

.

৩. অশনি সংকেত

গ্রামের বটতলায় আলোচনা সভা বসেছে।

‘চিন্তার কারণ, খুড়ো। বড়োই চিন্তা। এইবার যে সে কতজনের প্রাণ নিয়ে তবে বিদায় নেবে, তা কেউ জানে না। তোমার, আমার, আমাদের সকলের প্ৰাণ বিপন্ন।’

‘সে তো বটেই।’

মাধব খুড়ো গড়গড়ায় একটা টান দিয়ে বলল। কথা হচ্ছে মোড়ল নিধু গড়াই আর মাধব খুড়োর। সঙ্গে বৈঠকে আরও লোক আছে। আলোচনার বিষয় অবশ্যই আসন্ন মহা বিপদ।

নিধু মোড়ল বলল,

‘তবে, আমার কাছে একটা উপায় আছে। আমার জানা এক তারাপিঠ সিদ্ধ মহাতান্ত্রিক আছেন। শঙ্করাদেব। তোমরা বললে তাকে খবর দিই?’

‘তা, কিছু তো একটা করতেই হবে।’

‘এইসব কী কথা, খুড়োমশাই? আর নিধু দাদা, আপনি তো বিচক্ষণ মানুষ। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আপনার ব্যাবসা আছে। তবু আপনি এইসব গল্পকথায় বিশ্বাস করেন?’

কথাগুলো শুনেই সবার ঘাড় ঘুরে গেল বক্তার দিকে। বক্তা আর কেউ নয়, গ্রামের ইস্কুলের মাস্টারমশাই মুকুল চন্দ। নিধু কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থাকল। বলল,

‘ভাই রে! ভয় কি আর সাধে করি? এই অভিশাপ যে গ্রামের বহুদিনের। বহুযুগের। অশনি সংকেত তো আগেই দেখিয়ে দেন আমাদের শ্মশানের কালী মা।’

‘দানো? আপনি আজকের যুগে বসে বলতে চান এটা সত্যি? আজ আমাদের গ্রাম পিছিয়ে আছে, কিন্তু, বাকি পৃথিবী কোথায় পৌঁছে গেছে, তা তো আপনার অজানা নয়।’

‘মাস্টার, এই পৃথিবীতে অনেক কিছু আজও ঘটে যা সাধারণ বুদ্ধিতে ব্যাখ্যার বাইরে। তোমার ওই বইয়ের পাতার বিদ্যে দিয়ে সব কিছু বিচার কোরো না। এই অভিশাপের কথা তো তোমারও অজানা নয়। বাপ-দাদা যে সাবধানবাণী ছোটো থেকে শিখিয়েছে তা অস্বীকার কীভাবে করি, বলো?’

মুকুল মাস্টার নিজের চশমা নাকের ওপর আরও একটু ঠেলে নিয়ে বলল,

‘আমি মানি না। এগুলো সব গল্পকথা।’

গ্রামের বৃদ্ধরা হা হা করে উঠল,

‘একথা বলতে নেই বাবা! অভিশাপ লাগে। দানোর যে কান আছে।’

‘আমি এইসব মানতে পারছি না দাদারা। আমি চললাম। তোমরা যা ভালো বোঝো, কোরো।’

উঠে দাঁড়িয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল মুকুল মাস্টার। তার পথের দিকে চেয়ে ঘাড় নাড়ল বৃদ্ধেরা, একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল নিধু মোড়ল।

.

৪. দানো জেগেছে

দু-দিন পরের ঘটনা। আজকাল সবাই সন্ধের আগে ঘরে ঢুকে পড়ছে ভয়ে। তবে মুকুল মাস্টার সাহসী মানুষ। রাতে ছাত্র পড়িয়ে ফিরছে সাইকেলে। ছাত্রদের বাবা-মা বলেছিল এই ক-দিন পড়া বন্ধ রাখতে, মুকুল মাস্টারের কথা ভেবেই। কিন্তু, মাস্টার শোনেনি। এইবার এই ছাত্রদের একমাস পরেই মাধ্যমিক। এখন পড়া বন্ধ রাখলে তাদের ক্ষতি হবে।

রাত বেশি না। নয়ের ঘর ছুঁয়েছে সবে ঘড়ির কাঁটা। তবে গ্রামের হিসেবে বেশ রাত। আর এখন নির্জনতা যেন আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুনশান মেটে রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে চলেছে মাস্টার। আকাশে চাঁদ বেশ বড়ো। পূর্ণিমা আসতে দেরি নেই। ঝিঁঝি পোকার ডানার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই চারিদিকে। এই ঝিঁঝির অনবরত একঘেয়ে আওয়াজ নিস্তব্ধতা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

শ্মশানের কাছে এসে গেছে মুকুল মাস্টার। হঠাৎ সামনের চাকার হাওয়া গেল বেরিয়ে। নেমে দেখতে গিয়ে বুঝল রাস্তায় কাচের বোতলের ভাঙা টুকরোতে চাকা গেছে। এই রাস্তায় বোতল ভাঙা এল কীভাবে? আশ্চর্য।

অতএব সাইকেল থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এগোতে শুরু করল মাস্টার। শ্মশানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রোজকার মতো কালীমন্দিরের উদ্দেশে কপালে হাত ঠেকাতে গেল মুকুল মাস্টার।

আজ মায়ের মুখটা বড়ো করুণ লাগল। কেন কে জানে, মুকুল মাস্টারের ভয় হল আজ। মন্দিরের প্রদীপের আলোয় বাঁশ গাছের গায়ের ফুলগুলো দেখা যাচ্ছে। হাওয়ায় মৃদু দুলছে ওগুলো। দেখে বুকটা কীসের যেন আশঙ্কায় একবার ‘ছ্যাঁৎ করে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে খুব কাছেই কোথাও শেয়াল ডেকে উঠল।

এই প্রথম মাস্টারের একবার মনে হল যে, আজ পড়াতে না গেলেই বোধ হয় ভালো হত। ভুল করে ফেলেছেন তিনি। দ্রুত পা চালাতে লাগলেন। শ্মশান ছেড়ে সবে একটু এগিয়েছেন, হঠাৎ তাঁর মনে হল কেউ যেন পেছনে আসছে। বেশ দ্রুত গতিতে তাল মিলিয়ে আসছে। আরও দ্রুত পা চালাতে লাগল মুকুল মাস্টার। কিন্তু, পেছনের পায়ের শব্দ এখনও আসছে। এখন যেন মনে হচ্ছে বেশ কয়েকটা পায়ের শব্দ। এখনও মৃদু ঠান্ডা আছে এইদিকে, কিন্তু, এর মধ্যেই এইবার মুকুল মাস্টার ঘামছেন। বুক ঢিপঢিপ করছে। মন বলছে যে, তাঁর পেছনে চরম বিপদ আসছে। চলতে চলতেই পেছন ফিরে চাইলেন, কিন্তু, অন্ধকারে কিছুই দেখতে পেলেন না। তা ছাড়া চোখে ঘাম ঢুকে দৃষ্টি অনেকটা ঝাপসা করে দিয়েছে। সাইকেল ছেড়ে দৌড় দিলেন মাস্টার। কিন্তু একটু এগোতেই মেঠো, এবড়োখেবড়ো রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়লেন মুখ থুবড়ে। নাকে চোট লেগেছে, চশমা ছিটকে কই যে পড়ল আর খুঁজেই পেলেন না। নাকে হাত দিয়ে বুঝলেন নাক বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

উঠতে গেলেন মানুষটা, কিন্তু পারলেন না। কারণ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে কেউ বা কিছু একটা। নিজের গলায় ধারালো কিছুর ছোঁয়া পেলেন তিনি। কাছাকাছি আবার শেয়াল ডেকে উঠল।

.

পরের দিন সকালে শ্মশানের থেকে একটু দূরে মুকুল মাস্টারের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ আবিষ্কার করল গ্রামের লোক। তিন নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত তাঁর দেহ। মুণ্ডু আর একটা হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। জীবনে প্রথমবার এত ভয়ানক কোনো দৃশ্য দেখল এই গ্রামের মানুষ। মাধব বুড়ো কিছুক্ষণ আতঙ্ক ভরা চোখে এইদিকে তাকিয়ে থেকে, নিধু মোড়লের দিকে চেয়ে বলল,

‘নিধু, তোর জানা সেই তান্ত্রিককে খবর দে। আর সময় নেই। পূর্ণিমা আসতে দেরি নেই। খবর দে মহা তান্ত্রিককে। দানো জেগেছে!’

.

৫. পুকুর, মাছ এবং বক

শ্মশানেকালীর মন্দিরে বসে আছেন শঙ্করাদেব। পরনে লাল জোব্বা, কপালে রক্তচন্দনের তিলক আর চুল-দাড়ি তাঁর অর্ধেক মুখ ঢেকে রেখেছে। তিনি তীব্র ভ্রূকুটি ফুটিয়ে তাকিয়ে আছেন বাঁশঝাড়টার দিকে। ফুলগুলো দুলে দুলে যেন তাঁর দিকেই ছুড়ে দিচ্ছে যুদ্ধের আহ্বান। আজই এসেছেন শঙ্করাদেব। মাস্টারের ভয়াবহ মৃত্যুর পর কেটে গেছে আরও দুটো দিন। কেউ এই দু-দিন বাড়ি থেকে পারতপক্ষে বের হয়নি। তাই মানুষের প্রাণনাশ হয়নি বটে, তবে, দু-দিন জন্তু হত্যা করে দানো তার তৃষ্ণা মিটিয়েছে। হারানের একটা পোয়াতি গোরু প্রথম রাতে মরেছে। আর পরের দিন নিমায়ের দুটো মুরগি আর নিধু মোড়লের নিজের একটা ছাগল। সব ক্ষেত্রেই রক্তারক্তি কাণ্ড। তিন নখ বিশিষ্ট থাবার চিহ্ন স্পষ্ট। সকলে শেষ ভরসা হিসেবে চেয়ে আছে তান্ত্রিক শঙ্করাদেবের দিকে। লোকে ভিড় করেছে মন্দির চত্বরে। শঙ্করাদেব মাথা নেড়ে বললেন,

‘মিথ্যে আশ্বাস আমি দিই না। তাই আমি একটা সত্য স্বীকারোক্তি করছি। এই দানো বড়ো প্রাচীন এবং অতি ক্ষমতাধর। একে আমি আটকানোর চেষ্টা করতে পারি মাত্র। কিন্তু, আমি যে সফল হবই এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

গ্রামের লোকেরা প্রায় কেঁদে ফেলে। নিধু হাতজোড় করে বলে,

‘বাবা। একথা বলবেন না। আপনি যে আমাদের শেষ ভরসা। আপনার শক্তির কথা আমি জানি। আপনি না পারলে আর কেউ আটকাতে পারবে নে এই দানোকে।’

কিছুক্ষণ গভীর চিন্তায় ডুবে থাকলেন শঙ্করাদেব। তারপর বললেন,

‘একটা উপায় আছে। কিন্তু সেটা কি তোমরা করতে পারবে?’

‘কী উপায়, বাবা? আপনি বলুন। এই নিধু, গাঁয়ের মোড়ল, আমি জান দিয়ে দেব আমার গাঁয়ের জন্যে।’

‘বেশ। তবে শোনো। এই দানো শুধুমাত্র কিশোরী আর তরুণী মেয়েদের ওপর ভর করে। তাই তো? তাকে আমরা সেই সুযোগই দেব না।’

‘মানে? একটু বুঝিয়ে বলবেন, বাবা?’

‘অভিশাপ এই গাঁয়ের ওপর আছে। এই গাঁয়ের মাটিতে, বাতাসে মিশে আছে এই অভিশাপের কালো রং। এই গ্রামে পা রাখার সঙ্গেসঙ্গেই আমি তা টের পেয়েছি। অতএব, এই গ্রামের সব কিশোরী এবং তরুণীকে যদি গ্রামের বাইরে, বহুদূরে সরিয়ে ফেলা যায় পূর্ণিমার আগে, তবে এই অভিশাপ এইবারের মতো টলানো যায়।

‘কিন্তু বাবা, সে তো অনেক লোক।’

‘না না, শুধু চোদ্দো থেকে বাইশ পর্যন্ত বয়সি মেয়েদের সরিয়ে ফেললেই হবে।’

লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন শোনা গেল। কোথায় পাঠাবে তারা তাদের মেয়েবউদের? বেশিরভাগ লোক এখানে কয়েক পুরুষ ধরে রয়েছে। আত্মীয়স্বজন বলতে এই গ্রামের লোক সবাই সবার। এর বাইরে বলতে গেলে তাদের পরিচিতিই নেই কারুর সঙ্গে। সেই সমস্যার সমাধান নিধু নিজেই করল।

‘আমি সে-দায়িত্ব নেব। আমার ট্রাকে এক-একবারে অন্তত পনেরো-কুড়িজন করে এক-এক দিনে আমি শহরে নিয়ে যেতে পারি। আমি নিজের দায়িত্বে তাদের শহরে কয়েক দিনের জন্যে রাখব। আপনারা তৈরি করুন নিজের ঘরের মেয়েদের। আমাদের হাতে মাত্র তিনদিন। পরশুর পরের দিনই পূর্ণিমার রাত। তার আগে রোজ আমি জনা পনেরো-কুড়ি করে মেয়েদের আমি শহরে নিয়ে চলে যাব।’

এই কথায় সকলেই যেন বল পেল মনে। তান্ত্রিক ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘বেশ, তবে তাই হোক। আর পূর্ণিমার রাতে আমি এইখানে, মায়ের সামনে করব ‘রক্ষা মহাযজ্ঞ’। সেই রাতে যেন নিজের গৃহ থেকে কেউ না বেরোয়। কারণ সেই রাতে যে বেরোবে, তার মৃত্যু হবেই হবে। আমি একা, নিভৃতে পবিত্র আগুনে আহুতি দিয়ে সুরক্ষা দেব গৃহের ভেতরে থাকা সবাইকে। আমার কথা মেনে চললে, এই শঙ্করা তান্ত্রিক থাকতে একজন মানুষেরও প্রাণ আর যাবে না। কথা দিলাম!’

.

৬. বক

গত দু-দিন ধরে রাত নামার আগেই ট্রাক ভরে মেয়েদের গ্রাম থেকে নিয়ে গেছে নিধু। আজ শেষদিন। আজকের রাতটা ভালোয় ভালোয় কাটলে সে শাস্তি পায়। গত দু-দিন বেশিরভাগ মেয়েদেরই সরিয়ে ফেলা গেছে। আর মাত্র জনা সাত মেয়ে বাকি। আজ এদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারলেই শেষ।

নিধু এই গাঁয়ের একমাত্র বড়োলোক বলা চলে। তার মস্ত ব্যাবসা দেশের বিভিন্ন শহরে। তবে, কীসের ব্যাবসা তা এই গ্রামের লোক জানে না। জানতে চায়নি কোনোদিন। কারণ, গ্রামের ছেলে হিসেবে তাকে সবাই বিশ্বাস করে আর মোড়ল হিসেবে তাকে সম্মান করে। সরল মানুষগুলো একটু খোঁজ নিলে জানতে পারত যে, তার সব ব্যাবসাই দু-নম্বরি। নিধুর সবচেয়ে বড়ো ব্যাবসা হল নারী পাচার! সারাদেশের বিভিন্ন শহরের নিষিদ্ধ পল্লিতে সে মেয়ে সাপ্লাই দেয়। যত বয়স কম, তত বেশি টাকা পায় প্রতি মেয়ের জন্যে। অতএব নিধু হিসেব করে দেখেছে যে, এই গ্রামের মেয়েদের বিক্রি করে সে অন্তত একদাঁওতে ষাট-সত্তর লাখের ব্যাবসা করবে। টাকার ভাগ দিয়েও তার কাছে পঞ্চাশ মতো থাকবেই।

শ্মশানেকালীর মন্দিরে এসে একটা সিগারেট ধরাল নিধু মোড়ল। বাঁশগাছে ফুলের দিকে চেয়ে একটা লম্বা টান দিল সিগারেটে। মনে মনে ভাবল, একেই বলে কারুর পৌষ মাস, কারুর সর্বনাশ। কী মোক্ষম সময়েই না এই ফুল ফুটল এক-শো বছর বাদে। এই গ্রামের প্রচলিত অলৌকিক গল্প সেও জানত। ফুল দেখে লোকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে দেখেই তার কুটিল মস্তিষ্কে একটা ভয়ংকর প্ল্যান বুনে ফেলল। ভয় দেখিয়ে যদি একবার এই গ্রামের মূর্খগুলোকে রাজি করানো যায়…ব্যস! মেয়েগুলোকে একেবারে পেয়ে যাবে। এতদিন চেষ্টা করেছে ফুসলে দু-একজনকে নিয়ে যাওয়ার, চাকরির লোভ, বা, সিনেমার নায়িকা করে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে। কিন্তু গ্রামের মেয়েদের বাবা-মা এতদূর ছাড়ে না। তাই এখান থেকে নিধু কাউকে বিক্রি করতে পারেনি। আর এইবার? হে হে! বাপ-মা নিজে যেচে তাদের মেয়েকে তুলে দিচ্ছে তার কাছে। ভাবছে, নিধু তাদের কী উপকারটাই না করছে।

প্ল্যান একদম দারুণ ছিল। গ্রামের লোকগুলো নিতান্ত অশিক্ষিত, মূর্খ এক- একটা। কিন্তু, একজন তার পথের কাঁটা হতে পারত— মুকুল মাস্টার। নিধু সেদিন বটতলার আলোচনায় তার কথা শুনেই বুঝেছিল যে, এই মুকুল মাস্টার গ্রামের লোকেদের বোঝানোর চেষ্টা করবে। মুকুলকে সকলে বিরাট সম্মান করে, অতএব তার বোঝানোয় সবাই বেঁকে বসত। আর তাতে নিধুর বাড়া ভাতে ছাই পড়ত। অতএব, তাকে রাস্তা থেকে হটানো প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। নিধু নিজের গুন্ডাবাহিনী লাগিয়ে মুকুল মাস্টারকে হত্যা করল। স্টিলের বাঘনখ পরে শরীরে ক্ষত করার বুদ্ধিটাও তারই ছিল। এতে দুটো সুবিধে। কাঁটাও সরে গেল, আবার লোকের মনে আতঙ্কটাও বসল জাঁকিয়ে। উফ! নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াতে ইচ্ছে করছে নিধুর।

মাঝে দু-রাতে আতঙ্ক বজায় রাখতে কয়েকটা গোরু, ছাগল মারতে হয়েছে বটে। শালা, গ্রামের লোকগুলো এতই গান্ডু যে একবারও ভাবল না যে, গল্প অনুযায়ী তো পূর্ণিমার রাতে দানো জাগে। তবে এইবার এত আগে কীভাবে সে জেগে উঠল?

মন্দির থেকে তান্ত্রিক শঙ্করাদেব আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ বেরিয়ে এল। আশেপাশে গ্রামের কেউ নেই দেখে শঙ্করাদেব নিধুকে বলল,

‘বস! সব ঠিক তো? আজ রাতেই তবে পাততাড়ি গুটিয়ে ভোঁ-ভাঁ তো?’

‘না, বাঁ*। তুই এখানে বসে যজ্ঞ করিস।’

‘হেহে। কী যে বল না, বস।’

‘শোন, রাতে তৈরি থাকবি। কেটে পড়ব এখান থেকে আজকেই। গ্রামের লোক আমায় আর জীবনে দেখতে পাবে না। এখানকার জমি-বাড়ি তো আগেই বেচে দিয়েছি। এইবার পুরোপুরি কেটে পড়ব।’

‘বস। মেয়েগুলো কিন্তু খুব…’

বিশ্রী নোংরা মশকরায় হেসে উঠল দু-জনে।

.

৭. এবং কাঁকড়া

শিমুল আসতে চায়নি। সে এখনও মনে-প্রাণে তার মাস্টারের কথায় বিশ্বাস করে। এইসব সত্যি নয়। হতে পারে না। কিন্তু, তাকে তার বাবা-মায়ের কথায় রাজি হতে হয়েছে। বরাবরই শিমুল এই নিধু লোকটাকে পছন্দ করে না। আর এখন তারই ট্রাকে, আরও ছ-টা মেয়ের সঙ্গে বসে আছে। আর তার মাস্টার? সে মৃত। ভাবলেই কান্না পায় শিমুলের।

গাড়ির কিছু গোলমাল হওয়ায় আজ ট্রাক ছাড়তে দেরি হল। ট্রাক গ্রামের বটতলা থেকে যখন ওদের নিয়ে ছাড়ল তখন সন্ধে হয়ে এসেছে প্রায়।

কিছুক্ষণ চলেই ট্রাক আবার দাঁড়াল। শিমুল ট্রাকের পেছনের কাপড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখল শ্মশান। এখানে কেন দাঁড়াল গাড়ি? ভাবতে ভাবতেই ও দেখতে পেল একটা তান্ত্রিক মার্কা লোক আর সঙ্গে আরও দু-তিনজন মন্দির থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে ট্রাকের দিকে। তান্ত্রিক সামনের সিটে উঠে বসল আর তার দুই চ্যালা তাদের সঙ্গেই পেছনে বসল। লোক দুটো তাদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাল। একজন একটা নোংরা ইঙ্গিত করে বলল,

‘আজ তো মস্তি হবে রে।’

সামনের সিট থেকে কড়া নির্দেশ এল,

‘হাত দিবি না! দিলে তোদের ছাল গুটিয়ে দেব। এক-একটা মাল পঞ্চাশ হাজারে বিক্রি হবে। আঠেরোর নীচেরগুলো আরও বেশি দাম।’

এইসব কী শুনছে শিমুল? তার সঙ্গে বাকি যে কয়েকটি মেয়ে আছে, তারা সবাই আতঙ্কে এদিক-ওদিক দেখছে। সবচেয়ে ছোটো মেয়েটির বয়স বারো। সে কেঁদে উঠল,

‘বাড়ি যাব।’

সপাটে একটা চড় এসে পড়ল তার মুখে। বাকিরা আর কথা বলার সাহস পেল না। ট্রাক ছেড়ে দিল।

পেছনে বসা একজন বিশ্ৰী হেসে বলল,

‘দাঁড়াও মামণি, তোমাদের গান শোনাই একটু।’

একটা ছোটো রেডিয়ো ট্রানজিস্টার বের করে চালিয়ে দিল। নব ঘুরিয়ে কোনো চ্যানেল প্রথমে লাগল না। তারপর অনেকক্ষণ চেষ্টায় তাতে একটা চ্যানেল ধরল। তবে তাতে গান নয়, একটা গল্প চলেছে। বাচ্চাদের পঞ্চতন্ত্রের গল্প। লোকটা চ্যানেল পালটানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ওইটা বাদে আর কোনো চ্যানেল ধরল না। অতএব, গাড়িও চলতে লাগল, সঙ্গে গল্পটাও। আর কিছুক্ষণ বাদেই গ্রামের সীমানা পেরিয়ে যাবে গাড়ি। শিমুল আর কোনোদিন তার বাবা-মাকে দেখতে পাবে না।

রেডিয়োতে গল্প শুরু হল,

‘আজকের গল্পের নাম বক, মাছ এবং কাঁকড়া।’

‘এক গ্রামে একটা বড়ো পুকুর ছিল। তাতে সবসময়ই মাছ ভরা থাকত…।’

শিমুলের কষ্ট হচ্ছে। বুক ফেটে কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

‘… বুড়ো বক মাছদের বলল যে, তাদের ভারি বিপদ। তাদের এই পুকুর ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতে হবে। বোকা, সরল মাছরা তাই বিশ্বাস করল।…’

অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছে শিমুলের। তলপেটে ব্যথা করছে তার। মোচড় দিচ্ছে।

‘… বক বলল, রোজ কিছু মাছকে সে নিজে মুখে করে অন্য বড়ো পুকুরে নিয়ে যাবে।… ‘

শিমুল হঠাৎ বুঝতে পারল তার কাপড় ভিজে উঠেছে। হাত দিয়ে বুঝল তার দু-পায়ের ফাঁক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে কাপড়ে দাগ লেগে ভিজে উঠছে।

‘…কিন্তু ধূর্ত বকের ছিল অন্য মতলব। বক রোজ মুখে করে মাছ নিয়ে যেত আর মাঝপথেই তাদের খেয়ে ফেলত।…’

শিমুলের তীব্র অস্বস্তি হচ্ছে। সারাশরীরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। হঠাৎ সারাগায়ে ব্যথা। সঙ্গে জ্বলুনি শুরু হয়েছে। সারাশরীরের ভেতরে যেন আগুন লেগেছে ওর।

‘…বক একদিন এভাবেই মাছেদের মুখে করে নিয়ে যাচ্ছিল খাবে বলে। কিন্তু, সে জানত না যে, সেই কয়েকটা মাছের মধ্যেই এক কাঁকড়া ছিল।…’

শিমুলের শরীর যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। তার ভেতর যেন বাসা বেঁধেছে অন্য কেউ। অন্য কোনো সত্তা জেগে উঠছে তার ভেতর। তার শরীর আর ওর নিজের বশে থাকছে না!

‘…কাঁকড়া বকের আসল উদ্দেশ্য আঁচ করতে পারল মাঝপথে। তাই মাঝ- আকাশেই নিজের ভয়ংকর শক্ত ধারালো দাঁড় দিয়ে বকের গলা চেপে ধরল। বক ছটফট করতে করতে মারা গেল। নিজের পাপের উপযুক্ত শাস্তি পেল। …’

ট্রাকের মেয়েরা ভয় পাচ্ছে। না, ওরা পেছনে বসে থাকা দুটো বদ লোককে মতো বেঁকে যাচ্ছে। চামড়ার রং ঘোর কালো হয়ে উঠছে। কান আর দাঁত বড়ো ভয় পাচ্ছে না। এখন ওরা শিমুলকে দেখে ভয় পাচ্ছে। শিমুলের শরীর ধনুকের এবং সুচালো হচ্ছে। চোখের মণি দুটো ভাগে বিভক্ত হচ্ছে!

হঠাৎ ট্রাকের পেছন থেকে লোকজনের চিৎকার শুনে গাড়ি থামাল নিধু। চেঁচিয়ে পেছনের লোকেদের জিজ্ঞেস করল,

‘কী হচ্ছে?’

কোনো উত্তর পেল না। তার দু-জন লোক উত্তর দিচ্ছে না। কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে বুঝতে পেরে ড্রাইভারের দরজা খুলে নেমে পড়ল নিধু। তান্ত্রিক সাজা লোকটাকেও ইশারায় তার সঙ্গে আসতে নির্দেশ দিল। নেমে ট্রাকের পেছনদিকে এসে দরজা খুলল নিধু আর তান্ত্রিক। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় অন্ধকার একটু কাটতে দেখতে পেল মেয়েগুলো জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে ভেতরে। আর তার দুটো লোকের ছিন্নভিন্ন দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। একটা কালো, বীভৎস প্রাণী ওই দুটোর মধ্যে একটা মৃতদেহের ওপর বসে নখ দিয়ে পেট ফাটিয়ে নাড়িভুঁড়ি বের করছে। জীবটা তাদের দিকে তাকাল এবার। মুখে রক্ত লেগে আর এখনও দাঁতের ফাঁক দিয়ে কয়েকটা রক্তাক্ত মাংস-ছাল ঝুলছে। তার চোখের দৃষ্টিতে সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়ে থাকল তারা। প্রাণীটার দুটো জান্তব চোখ এবং এক-একটা দুটো করে লালচে মণি।

***

পরের দিন গ্রামের শেষ সীমানায় উদ্ধার হয়েছিল ট্রাকভরতি ছ-টা মেয়ে আর চারটে আধা খাওয়া, ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। সেগুলো কাদের, সেটা চিনতে অসুবিধে হয়নি। আশ্চর্যভাবে মেয়েরা সুরক্ষিত ছিল। রাতের ঘটনা মনে করতে পারেনি কেউই। তবে, তারা সবাইকে নিধুর আসল উদ্দেশ্য জানিয়েছিল। শিমুলকে পাওয়া গেল খানিকটা দূরে রাস্তার ওপর। শরীরে কোনো ক্ষত না থাকলেও গায়ে, হাতে, পায়ে আর মুখে রক্ত মাখামাখি, জামাকাপড় জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। সেও কিছুই মনে করতে পারল না আগের রাতের ঘটনা।

পুলিশের সাহায্যে বাকি মেয়েদের কলকাতার একটা হোটেল থেকে উদ্ধার করা গেছিল। নিধু সবাইকে একসঙ্গে সেদিন রাতেই বিহারে পাচার করত যদি প্ল্যানমাফিক সব ঠিকঠাক থাকত।

বাঁশের ফুলগুলো শুকিয়ে গেছিল। বাঁশঝাড়াটাও শুকিয়ে মরে যায় কয়েক দিনের মধ্যেই। তবে, সেই জায়গায় নতুন কচি বাঁশ গজিয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। আবার এক-শো বিশ বা ত্রিশ বছর পর এতে হয়তো ফুল ধরবে…।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *