ওরা চেয়ে থাকে
[আমার সবচেয়ে প্রিয় ভয়ের গল্পের লেখক Ito Junji-র The Moving Tombstones গল্পের ছায়ায় এই গল্পটা লেখা। যদিও গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন।]
.
এই ছোটো শহরটা বেশ সুন্দর। শহর বলে ভুল করলাম। শহরতলি বলা চলে। গ্রামের দিকেই পাল্লা ভারী। তবে, আমি গ্রাম বলতে মেঠো পথ, গোরুর গাড়ি, মাটির বাড়ি, হ্যাজাকের আলো, এইসব বুঝি। সেটা বোধ হয় ছোটো থেকে বিভূতিভূষণ পড়ার দোষ। তিনি বাঙালির মনে গ্রামবাংলার যে চিত্র এঁকে দিয়েছেন সেটা সহজে বেরোনোর নয়।
তবে, এখনকার বেশিরভাগ গ্রামই আর সেইরকম নয়। হ্যাজাকের জায়গায় বিদ্যুৎবাতি এসেছে, উনুনের জায়গায় এসেছে গ্যাস। এগুলো এই জায়গায় না থাকলে হয়তো আমি বলরামপুরকে গ্রামই বলতাম।
একটা প্রোজেক্টের কাজে যখন কোম্পানি থেকে এখানে পাঠিয়েছিল, মন একেবারেই খারাপ হয়ে গেছিল। কিন্তু, কিছু বলা চলে না। প্রাইভেট কোম্পানি। গতমাসেই পাঁচজনকে ছাঁটাই করেছে। অতএব, এই বাজারে যেনতেনপ্রকারেণ টিকে থাকাটাই আসল। অতএব চলে এলাম এখানে; খানিকটা বাধ্য হয়েই।
কিন্তু, জায়গাটা আমার ভালো লাগল। ছিমছাম, নিরিবিলি জায়গা। লোকজন নিজেদের মতো করে অলস জীবন কাটায়। বাইরের বিশ্বের খবর নিয়ে তাদের কারুর মাথাব্যথা নেই। সরকার এল কি গেল তাতে কিছু এসে যায় না ওদের। মাঝে মাঝে মনে হত এরাই প্রকৃত সুখী। কী পেয়েছি আমরা বিলাসিতার বিনিময়ে?
যাক গে। এটা মোটেই তাদের গল্প নয়। এটা আমার গল্প। আমার নিজের জীবনের ঘটনা, যা এত বছর পরেও আমায় এখনও মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নে হানা দেয়। সেই কথাতেই আসি।
আমার কোম্পানি গ্রামের শেষ সীমানায় বড়ো একটা জমি নিয়ে প্ল্যান্ট বানাচ্ছে। আমি সুপারভাইজার। কোম্পানি থেকেই আমার থাকার ব্যবস্থা করেছে, সেই প্ল্যান্টের জায়গা থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে গ্রামের মধ্যে একটা দু-কামরার বাড়িতে। পাকাবাড়ি, তবে পুরোনো। এতদিন নাকি পরিত্যক্ত ছিল, কোম্পানি মেরামত করে থাকার উপযুক্ত করেছে। একজন গ্রামের মহিলা, বিন্দু মাসি এসে সকালে খাবার করে দিয়ে যায়। রাতের রুটিও করে দেয় তখনই। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে আমি তাওয়ায় রুটি একটু সেঁকে নিয়ে, তরকারি গরম করে খেয়ে নিই।
বিন্দু মাসি কিছুতেই সন্ধেবেলা বাড়িতে আসে না। না, কারণটা বাড়ির কোনো সমস্যা নয়। আসলে, বাড়ির দক্ষিণ জানলা খুললেই একটা পুরোনো কবরখানা পড়ে। আমার বাড়িটার থেকে সামান্য দূরেই সেটা। সেই কারণেই গ্রামের মহিলা এদিকে আসে না।
আমি প্রথমদিন বিন্দু মাসির কথা শুনে হেসেই উঠেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম,
‘কেন? কবরখানার সঙ্গে বাড়ির কী সম্পর্ক? বাড়িতে ভূত আছে নাকি?’
‘না গো দাদাবাবু, তা নেই। তবে, ওইপাশেই কবরখানা। ভাবলেই তো ভয় করে।’
‘ওহ্। তাতে আমার সমস্যা নেই। তুমি একবেলা এসে দু-বেলার রান্না করে দিয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই।’
‘আমি তাই করব।’
দক্ষিণের জানলাটার দিকে দেখলাম। আমি খুলে রেখেছিলাম। বিন্দু মাসি ঢুকেই প্রথম ওটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেয়। অতএব, এখন ওটা বন্ধ। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘ও কাদের কবর?’
বিন্দু মাসি ঘর ঝাড়ু লাগাতে লাগাতেই বলল,
‘তা আমরা জানি না। ও অনেক পুরোনো। আমাদের বাপ-ঠাকুরদার জন্মের আগের।’
‘আচ্ছা। এ ছাড়া আর কোনো অসুবিধে নেই তো এই বাড়িতে থাকার?’
‘নাহ্। তা নেই। তবে, দরজা-জানলা বন্ধ রেখো। চিনু পাগলা এদিকেই তো সারাদিন ঘোরাঘুরি করে।
‘চিনু পাগলা আবার কে?’
‘চিনুকে দেখনি এখনও? দেখবে কয়েক দিনের মধ্যেই। খাবার চাইতে চলে আসবে ঠিক।’
‘কিন্তু কে সেটা?’
‘পাগলা গো, পাগলা। পাগলারা যেমন হয়। ও বেটা সারাদিন কবরখানার আশেপাশেই ঘুরঘুর করে। কবরের ওপর শুয়ে থাকে। বিড়বিড় করে। আমার দেখলে ভয়ই লাগত ছোটোবেলায়।’
‘ও বাবা! এ তো আপদ! এইসব উটকো ঝামেলা!’
‘না না, ও কিছু করে না। ভীতু বুড়ো একটা। মাঝে মাঝে খাবার চাইতে এর ওর বাড়ি যায়। কারুর ক্ষতি করে না বা নোংরা করে না। ওই কবরখানাতেই থাকে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি পড়লে ওই মিত্তিরদের আস্তাবলে ঢুকে পড়ে।’
‘ওহ্।’
এরপর বেশ কয়েক মাস কাটল। প্রোজেক্ট শেষ হতে আরও এক বছর লাগবে বলে মনে হচ্ছে। আমি ভালোই ছিলাম।
তবে, একটা কথা ঠিক। এক ধরনের অস্বস্তি হত। কী অস্বস্তি, আমি সেই সময়ে বুঝিনি। কিন্তু, ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি হত।
লক্ষ করে দেখেছিলাম, অস্বস্তিটা আমার দক্ষিণের জানলাটা খোলা রাখলেই হয়। আমার মনে হয় যে, গ্রামের পরিবেশের প্রভাব পড়েছে আমার ওপর। নয়তো বা কবরখানা বা শ্মশান নিয়ে আমার কোনোদিন কোনো অস্বস্তি ছিল বলে তো মনে পড়ে না।
তবে, এটাও সত্যি যে, আগে কোনোদিন কবরখানার পাশে বসবাসও করিনি। এই প্রথমবার, তাও আবার এই পরিবেশে সম্পূর্ণ একা। অতএব, কিছুটা প্রভাব পড়তে বাধ্য। রাতের দিকে পরিবেশ খুবই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। আমরা যারা শহুরে পরিবেশে বেড়ে উঠেছি, তারা সত্যি বলতে কোনোদিন প্রকৃত নিস্তব্ধতা উপলব্ধিই করিনি। সেই পরিবেশ শান্তির আবার আশঙ্কারও
ও বলে রাখি, চিনু পাগলার দেখা আমি পেয়েছিলাম সাতদিনের মধ্যেই। এবং, সেই প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি মোটেই সুখকর নয়।
একদিন রাতে বাড়ি ফিরে, স্নান সেরে সবে একটা বই নিয়ে বসেছি। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। তাই দক্ষিণের জানলা খোলাই রয়েছে। বই পড়তে পড়তেই হঠাৎ অস্বস্তি হতে শুরু করল। আপনা থেকেই চোখ ওই খোলা জানলাটার দিকে চলে গেল।
চমকে গিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। কোলে রাখা বইটা মাটিতে পড়ল ‘ধপ’ শব্দ করে। কারণ, জানলার ঠিক বাইরে থেকে একটা মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে! একটা বিচ্ছিরি মুখ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে।
প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেছিলাম। কিন্তু, তারপরেই বুঝতে পারলাম যে, ওটা একটা মানুষের মুখ। নোংরা জট ধরা চুল-দাড়ির ঝাঁকের মধ্যে একটা মানুষেরই মুখ উঁকি দিচ্ছে বটে।
আমার হৃদগতি স্বাভাবিক হয়ে এল। এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলাম,
‘চিনু?’
লোকটা একইভাবে হেসে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম,
‘কী চাই?’
ফ্যাসফ্যাসে গলায় এইবার লোকটা কথার উত্তর দিল,
‘খেতে দে!’
আমি একবার ভাবলাম দিই ভাগিয়ে। একটু আগেই ছোটোখাটো হার্ট অ্যাটাক দিচ্ছিল বেটা আমায়। কিন্তু, তা করলাম না। আজকেই এক প্যাকেট পাউরুটি কিনে এনেছি। আগামীকাল সকালে আমার খাওয়ার চারটে রেখে বাকি প্যাকেটটা ওকে ধরিয়ে দিলাম। সঙ্গে দুটো কলাও দিলাম। সেই পেয়েই লোকটা আবার হেসে চলে গেল কবরখানার দিকে।
এরপর থেকে মাঝে মাঝেই চিনু পাগলা এসে আমার জানলায় উঁকি দেয়। যা থাকে বাড়িতে আমি তাই দিয়ে দিই একটা কিছু। সে চলে যায়।
এভাবেই কয়েক মাস কাটল। অস্বস্তির ভাবটা ভেবেছিলাম সময়ের সঙ্গেসঙ্গে কেটে যাবে। সেটা কিন্তু, কাটল না।
একদিন একটু আগেই প্রোজেক্ট সাইট থেকে ফিরে এসেছিলাম। বিকেলের সময়। সন্ধে নামতে দেরি আছে। কী মনে হওয়ায় রাস্তা থেকে বাড়িতে না ঢুকে, তার আগেই বাঁ-দিকে বাঁক নিয়ে কবরখানাটায় ঢুকলাম।
এই কবরখানাটা অন্তত কয়েক-শো বছরের পুরোনো। একটা কাঠের বা লোহার গেট সম্ভবত ছিল এককালে। এখন আর সেটা নেই। ঢুকে একগাদা এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা সমাধিগুলোর মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছিলাম উদ্দেশ্যহীনভাবে। এই সমাধিগুলো কোন ধর্মের তা বোঝার উপায় নেই। কারণ, একটাও ক্রস নেই। সবক-টা ছোটো বড়ো শুধু সমাধিফলক। কিছু ভেঙে গেছে, আর কিছু যা রয়ে গেছে তার লেখা একটাও পড়া যায় না আর। কবরখানায় ঢুকে আমার কেন জানি না একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। যেন কিছু একটা এখানে ভুল আছে। মানে, কিছু একটা যেন যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। কিন্তু সেটা কী, বা, কীসের ঠিক অনুভূতি আমি বুঝতে পারলাম না ঠিক।
হঠাৎ একটা আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম সেদিকে। দেখলাম চিনু পাগলা।
লোকটা একটা কবরের ওপর বসে আছে। ফলকটার মুখোমুখি বসে বিড়বিড় করে কথা বলছে। যেন ওর সামনে ওটা পাথরের ফলক নয়, কোনো মানুষ। এই কাণ্ডটা একজন উন্মাদ মানুষের পক্ষে মোটেই অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, তবুও তা দেখে আমার অস্বস্তি হল।
চিনু পাগলা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘কার সঙ্গে কথা বলছ?’
চিনু মাটির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
‘এই যারা শুয়ে থাকে। ওদের সঙ্গে।’
আমার ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে উঠল হঠাৎই ওর বলার ধরনটা থেকে। কারণ, ও নিজে কথাটা বিশ্বাস করে। তাই, এই কথাটা বলার ধরনে এমন একটা সততা ছিল যে, আমার ঘাড়ের রোম দাঁড়িয়ে গেল।
চিনু পাগলা আবার বলল,
‘ওরা কথা বলে। আমার সঙ্গে কথা বলে। ওরা দেখে। ওদের কথা শোনার লোক চাই। তাই আমায় রেখেছে।’
আমি আর দাঁড়ালাম না। ফিরে চলে এলাম বাড়িতে।
আরও কয়েক মাস এভাবে কাটল। গ্রীষ্ম গিয়ে শীত এল। দক্ষিণের জানলা খোলা রাখার প্রয়োজন পড়ে না আর। তবে, পাগলা আসে মাঝে মাঝে। সন্ধ্যার দিকে বন্ধ জানলায় টোকা দেয়। আমি জানলা খুলে খাবার দিই।
এরকমই একদিন সন্ধ্যার দিকে রেডিয়োতে একটা গান চালিয়ে, গায়ে একটা মোটা আলোয়ান জড়িয়ে বসে আছি। এমন সময়ে জানলায় টোকার শব্দ হল। উঠে গিয়ে খুলে দিলাম জানলা। দেখলাম চিনু দাঁড়িয়ে আছে।
তবে, আজ যেন কেমন একটু অন্যরকম লাগছে ওকে। মুখে হাসি নেই।
ও কিছু বলল না। আমি একটা কমলালেবু, দুটো রুটি আর খানিকটা গুড় একটা কাগজে করে এনে রাখলাম জানলায়। কিন্তু, রোজকার মতো আজকে চিনু সেগুলোর প্রতি উৎসাহ দেখাল না।
আমায় চমকে দিয়ে চিনু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল,
‘তুমি চলে যাও এখান থেকে। ওঁদের নজর পড়েছে তোমার ওপর। ওরা দেখে তোমায়। আমিও তোমারই মতো একসময় এখানে থাকতাম। তারপর ওরা নজর করত। তুমি চলে যাও। আর কখনো ফিরে আসবে না।’
এইটুকু বলেই আমায় হতবুদ্ধির মতো দাঁড় করিয়ে রেখে চিনু পাগলা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কিন্তু, এইসব কী বলল ও? এ কি পাগলের কথা? এত স্বাভাবিকভাবে কি পাগলা কথা বলতে পারে?
অন্ধকারে কবরখানাটার দিকে তাকালাম। কিছুই দেখতে পেলাম না। ঠান্ডা একটা হাওয়ার দমকা এসে মুখে লাগল। মুহূর্তে আবার সেই অস্বস্তিটা ফিরে এল। আমি দ্রুত জানলা বন্ধ করে দিলাম।
পরের দিন একটু আগেই ফিরছিলাম সাইট থেকে। রাস্তায় মিত্তিরমশাইয়ের সঙ্গে দেখা হল।
‘আরে, শুনেছেন?’
‘কী?’
‘ওই যে পাগলা চিনু, যে মাঝে মাঝে আমার আস্তাবলে ঢুকে থাকত, আপনার থেকেও তো খাবার নিত দেখেছি, ও মারা গেছে। আজ সকালে ওকে ওই কবরখানাতেই খুঁজে পেয়েছে বিলুর বাবা। মরে কাঠ হয়ে ছিল।’
‘সেকী? কখন হল?’
‘ঠিক জানি না। তবে, শরীর ঠান্ডায় যা জমে ছিল সেই থেকে ডাক্তার অনুমান করেছে গতকাল দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে মারা গেছে।’
‘না, না। ভুল হচ্ছে। চিনু তো কালকে রাতেই আমার কাছে খাবার নিতে এসেছিল।’
‘সেকী? তাই নাকি? ও…তাহলে হয়তো…হ্যাঁ, নিশ্চয়ই ভুল হয়েছে ডাক্তারের।’
আমার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হল। ডাক্তারের কি সত্যিই ভুল হয়েছে? নাকি….
বাড়ি ঢুকতে গিয়েও আমি আবার বাঁ-দিকে কবরখানাতে ঢুকলাম। কেমন যেন গা ছমছম করছে। আবারও সেই একই অনুভূতি হচ্ছে। কিছু একটা যেন ভুল আছে পুরো ব্যাপারটাতে। কিন্তু, সেটা যে কী, তা বুঝতে পারছি না এখনও।
ঠান্ডা হাওয়া বইছে। বিকেলের আলো নিভে আসছে। আজকে আর বেশি এগোলাম না। কিছুটা এগিয়েই ফিরে এলাম।
ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। আপনা থেকেই চোখ চলে গেল ডান দিকের খোলা জানলার দিকে। সকালে খুলেছিলাম। না আটকেই চলে গেছি সাইটে। তাই এটা এখনও খোলাই রয়েছে।
আবার অস্বস্তি শুরু হল। এগিয়ে গেলাম ওটা বন্ধ করে দিতে। একটা পাল্লা টেনেছি, দ্বিতীয়টাও টানতে হাত বাড়িয়েছি গ্রিলের ফাঁক দিয়ে। তখনই আটকে গেলাম।
বজ্রাহতর মতো দাঁড়িয়ে রইলাম বিস্ফারিত চোখে কবরখানার দিকে তাকিয়ে।
নাহ্। আলাদা কিছু দেখিনি। রোজ জানলা খুলেই যা দেখি, এখনও তাই দেখছি। কিন্তু, তাতে যে অস্বাভাবিকতাটা এতদিন ধরা পড়েনি আজ সেটা বুঝতে পারলাম। আজ মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করতে পারলাম যে, কেন আমার এই জানলা খোলা রাখলে অস্বস্তি হয় আর কেন কবরখানায় ঢুকলে মনে হয় যেন কিছু একটা ভুল আছে।
আগেই বলেছি যে, কবরখানার কবরগুলো সব ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি সেখানে ঢুকে। কবরের ওপরের ফলকগুলোও সেভাবেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি। একটু আগেও তাই দেখেছি।
কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কবরখানার প্রতিটি ফলক আমার জানলার দিকে ফেরানো আছে! প্রতিটি পুরোনো পাথরের ফলক ঘুরে আছে আমার দিকে! এত মাস ধরে আমি যতবার জানলা খুলেছি আমি এই দৃশ্যই দেখেছি। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগেনি। কিন্তু, কবরখানায় ঢুকে আমি দেখেছিলাম যে, ফলকগুলো ছড়ানো ছেটানো। তাই আমার অনুভূতি হয়েছিল যে, কিছু একটা ভুল আছে। তখন বুঝিনি।
আমি যতবার জানলা খুলি, কবরখানার প্রতিটি ফলক আমার দিকে ঘুরে যায়! ঠিক যেন নীচে শুয়ে থাকা মৃতরা ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে দেখছে!
হ্যাঁ! ওটাই! ওটাই আমার অস্বস্তি হয়! মুহূর্তে উপলব্ধি করতে পারছি। জানলা খুললেই আমার মনে হত কেউ বা কারা আমায় দেখছে! অনেকগুলো চোখ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে!
ওই পুরোনো, অজানা, নামহীন কবরের ফলকগুলো আমায় দেখে! ঘুরে যায় আমার অজান্তেই আমার দিকে প্রতিবার!
আমি প্রবল আতঙ্কে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এসেছিলাম ওই ঘর ছেড়ে। সোজা গিয়ে মিত্তিরদের বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিয়েছিলাম।
আমার কথা ওঁরা বিশ্বাস করেছিলেন কি না জানি না। তবে, সেই রাতে তাঁদের বাড়িতে আমায় থাকতে দিয়েছিলেন। আমি আর কোনোদিন ওই ঘরে বা ওই কবরখানায় যাইনি।
পরের দিনই সোজা বাড়ি চলে আসি কলকাতায়। কোম্পানির কাছে পরে অজুহাত দিয়েছিলাম কিছু একটা। জিনিসপত্র লোক মারফত আনিয়ে নিয়েছিলাম।
এই হল আমার জীবনের একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। বিশ্বাস করুন, আজ এতগুলো বছর পরেও মাঝে মাঝে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখি যে, অনেকগুলো কবরের ফলক দাঁড়িয়ে আছে একইদিকে মুখ করে। অন্ধকারে সেগুলোর গায়ে জোড়া জোড়া অসংখ্য চোখ তাকিয়ে আছে আমার দিকে। অন্ধকারেও ওই কবরের ফলকের গায়ে ফুটে থাকা চোখগুলো আগুনের মতো জ্বলছে!
