শেষ রাতের কল
[টেলিফোন নিয়ে প্রচুর ভয়ের গল্প পড়েছি। তাই ইচ্ছে হল আমিও একটা লিখব।]
.
ফোনটা দু-বার রিং হতে তুলে নিল সমর সেন। ওদিক থেকে পরিষ্কার মিষ্টি পুরুষকণ্ঠ এল,
‘হ্যালো, স্যার। আমি কি আপনার সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলতে পারি?’
‘আপনি কে?’
‘স্যার, আমি বিবেক বলছিলাম।’
‘বিবেক? আমি তো কোনো বিবেককে চিনি বলে মনে পড়ছে না।
ওদিক থেকে মৃদু হেসে লোকটা বলল,
‘না, স্যার। আপনি আমাকে চিনবেন না। আসলে, আজকে আমি আপনাকে একটা বিশেষ দরকারে ফোন করেছি।’
‘দেখুন, আমি এখন একটু ব্যস্ত…’
‘আহা! বিরক্ত হলেন নাকি, স্যার? আমি বেশিক্ষণ কথা বলব না, স্যার। পাঁচটা মিনিট একটু শুনে নিন।’
‘দেখুন, রাত হয়েছে। আমার ঘুমের সময়…
‘স্যার, কথাগুলো জরুরি।’
খুবই বিরক্ত বোধ করছে সমর। এই রাতের কলগুলো সাধারণত যত উজবুক লোকজন করে থাকে। এই লোকটা বলছে যে, কথাগুলো নাকি জরুরি, কিন্তু, সমর নিশ্চিত লোকটা কিছু ফালতু কথা বলবে। আচ্ছা, লোকটা কি আদৌ জানে, কাকে ফোন করেছে? রং নাম্বার নয় তো?
কথাটা মনে হতেই সমর জিজ্ঞেস করল,
‘আপনি কার সঙ্গে কথা বলতে চাইছেন বলুন তো?’
‘আপনার সঙ্গে, স্যার।’
‘আপনি আমাকে চেনেন?’
‘বিলক্ষণ চিনি, স্যার।’
‘কে বলুন তো আমি?’
‘সমর সেন। পেশায় শিক্ষক। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সায়েন্স-এর প্রফেসর।’
‘বেশ। তবে বলুন কী দরকার।’
‘স্যার, আমি আপনাকে সাবধান করে দিতে চাই।’
‘সাবধান? কীসের জন্যে?’
‘আপনার স্ত্রীর বিষয়ে, স্যার।’
চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ সমর সেন। ওপাশের লোকটাও তাকে সময় দিল। তারপর সমর বলল,
‘বলুন।’
‘স্যার, আপনার স্ত্রী আপনার ওপর খুব রেগে আছে।’
‘হোয়াট রাবিশ! আমার স্ত্রী এক বছর হল মারা গেছে।’
‘স্যার, রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ-হিংসা এগুলো সবসময়ে মৃত্যুতেই শেষ হয়ে যায় না।’
‘কী বলতে চাইছেন আপনি?’
‘স্যার, আপনার স্ত্রী আজকে আপনার কাছে আসবে। খুব রেগে আছে আপনার ওপর।’
‘শাট আপ! আমি ফোন রাখছি।’
‘রাখবেন না, স্যার। রাখলে আপনার খুব বিপদ। আপনাকে বাঁচাতে পারি একমাত্র আমি।’
‘কী বলতে চাইছেন আপনি? এই রাতবিরেতে ফাজলামি হচ্ছে এগুলো, ইউ রাসকেল!’
‘স্যার, আপনি অহেতুক রেগে যাচ্ছেন। আপনার স্ত্রী আপনার ওপর কেন রেগে আছে সেটার কারণ তো আপনি ভালো করেই জানেন। তিনি তো আসলে ফুল তুলতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যাননি…।’
চোয়াল শক্ত হল সমরের। এইবার ও কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে এই লোকটার মতলব। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে। সমর বলল,
‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
‘স্যার, আপনার স্ত্রী যে আপনাকে আপনার হাঁটুর বয়সি এক ছাত্রীর সঙ্গে অশালীন অবস্থায় দেখে ফেলেছিলেন সেটা তো আপনি জানেনই। সেই কারণেই তো তাঁকে সরিয়ে দিতে হল। নাহলে যে তিনি থানায় যাবেন বলছিলেন।’
‘হোয়াট আ লোড অফ রাবিশ!’
‘না, স্যার। আমি কিন্তু সব জানি। আপনার সেই ছাত্রীটিও তো মোটেও নিজের ইচ্ছেয় আপনার সঙ্গ দিত না। তাকেও তো জোর করে, তার ভবিষ্যৎ বরবাদ করে দেবার ভয় দেখিয়ে তার সঙ্গে দিনের পর দিন এইসব করেছেন।’
‘সব ফালতু কথা।’
‘স্যার, বেশি সময় নেই।’
‘কীসের?’
‘স্যার, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন আওয়াজটা?’
‘কীসের আওয়াজ?’
‘নীচের ঘর থেকে যে আওয়াজটা আসছে সেটা।’
শব্দটা অনেকক্ষণ থেকেই শুনতে পাচ্ছিল সমর সেন। নীচের ঘর থেকে আওয়াজ আসছে। কারুর হেঁটে বেড়ানোর মতো আওয়াজ। তিনি বাড়িতে একা আজকে। তাই নীচের ঘরে কারুর হেঁটে বেড়ানোর কথা নয়। তিনি এতক্ষণ ব্যাপারটা গুরুত্ব দেননি। কিন্তু, ফোন তোলার পর থেকেই নীচ থেকে আওয়াজটা আসছিল। এখন এই লোকটি সেই কথা উল্লেখ করায় যেন শব্দটা আরও বেশি স্পষ্ট হল।
‘স্যার, শুনতে পাচ্ছেন তো?’
‘না।’
‘পাচ্ছেন, স্যার। একজন হেঁটে বেড়াচ্ছে স্যার নীচের ঘরে। কে হেঁটে বেড়াচ্ছে আপনি সেটাও ভালোই জানেন।’
সমর উত্তর দিতে পারল না। লোকটা আবার বলল,
‘আপনার স্ত্রী মাধুরী ম্যাডামের অনিদ্রা রোগ ছিল। ইনসমনিয়া। তাই মাঝে মাঝেই তিনি রাতে এভাবে নীচের ঘরে হেঁটে বেড়াতেন।’
‘এ হতে পারে না!’
‘স্যার, আপনি তো বিজ্ঞানের শিক্ষক। আপনি নিজেও জানেন যে, বিজ্ঞান সব কিছুর উত্তর দিতে পারে না। বিজ্ঞানের জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে। স্যার, আপনি কি জানেন সেই ছাত্রীটির কী হয়েছে?’
‘কার?’
‘প্রিয়া নামের আপনার ওই ছাত্রীর কথা বলছি, যার সঙ্গে আপনি জোর করে একটা অ্যাফেয়ার গড়ে তুলেছিলেন। রীতিমতো মেয়েটিকে ইউনিভার্সিটি থেকে ফেল করিয়ে কেরিয়ার শেষ করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে। তার এখন কী হয়েছে জানেন?’
‘শুনেছি।’
‘হ্যাঁ, স্যার। মেয়েটি রীতিমতো এখনও ট্রমায় ভোগে। ডাক্তার দেখিয়েছে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ও ঠিক করেছে আপনাকে এক্সপোজ করবে সবার সামনে। আজকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে মেয়েটি আপনার নাম না করেই হুমকি দিয়েছে নিশ্চয়ই দেখেছেন?’
‘কোনো প্রমাণ নেই।
‘প্রমাণ তো কোনো কিছুরই নেই, স্যার। এই যে আপনার আর আমার কথা হচ্ছে এখন, সেটারও কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু স্যার, মেয়েটা এতদিন বাদে কিন্তু সাহস পেয়েছে।’
‘হাতি কাদায় পড়লে ইঁদুররাও লাথি মারে। প্রিয়া পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, তা বটে। আগের সপ্তাহে অনির্বাণ আপনার নামটা সুইসাইড নোটে লিখে দিয়ে না গেলে হয়তো সত্যিই প্রিয়ার সাহস হত না।’
‘ঠিক তাই।’
‘কিন্তু স্যার, অনির্বাণকে আপনি ওর পিএইচডির কাজ নিয়ে গত ছ-বছর হল অকারণ হ্যারাস করে চলেছিলেন, সেটাও তো সত্যি। গত বছর থেকে ছেলেটার স্কলারশিপও বন্ধ হয়ে গেছে। সব কাজ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আপনি ওকে আটকে রেখেছিলেন ডিগ্রি না দিয়ে। তাই তো শেষমেষ ছেলেটা ল্যাবের থেকে এক বোতল অ্যাসিড এনে নিজের গলায় ঢেলে দিল।’
‘স্টপ! এইটুকু চাপ না নিতে পারলে এরা রিসার্চে আসে কেন? ওর যথেষ্ট কাজ হয়নি, তাই ওকে পিএইচডি দিইনি।
‘আপনি মিথ্যে বলছেন, স্যার। আসলে আপনি এভাবে মানুষদের যন্ত্রণা দিয়ে মজা পান। আপনি প্রিয়াকে কেন জোর করে নিজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন জানেন তো?’
গলা সামান্য কাঁপল সমর সেনের,
‘কেন?’
‘নিজের দুর্বলতা ঢাকতে। স্ত্রীকে সুখী করতে পারেননি কোনোদিক থেকেই। তাই একটি অল্পবয়সি মেয়েকে অত্যাচার করে নিজের কাছেই নিজের দুর্বলতা অস্বীকার করতে চেয়েছেন। আমি কি ভুল বলেছি, স্যার?’
কিছু উত্তর দিল না সমর। ওপাশ থেকে লোকটা আবার বলল,
‘স্যার, আপনি কি বুঝতে পারছেন যে, আপনি আসলে একজন ভীষণ অসুস্থ প্রকৃতির একটি লোক? আপনি আসলে একজন বিকৃত মানসিকতার স্যাডিস্ট। স্যার, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন যে, আপনার স্ত্রী উঠে আসছে আপনার ঘরের দিকে?’
হ্যাঁ, সমর সেন শুনতে পাচ্ছে। সিঁড়ি ধরে একজোড়া পায়ের শব্দ উঠে আসছে ধীরে ধীরে।
ফোনের ওদিক থেকে কথা এল,
‘স্যার, স্যার, শুনছেন?’
‘এগুলো সব আমার মনের ভুল। আমি ফোন রাখছি।’
‘ফোন রাখবেন না, স্যার। রাখতে পারবেনও না। কারণ, ফোন কেটে দেয়ার হলে আপনি অনেকক্ষণ আগেই আমার ফোন কেটে দিতেন। সেটা এখনও আপনি করেননি যখন, তখন আর পারবেন বলেও মনে হয় না।’
পায়ের শব্দ ঠিক সমরের দোতলার এই বেডরুমের বন্ধ দরজার সামনে এসে থামল।
সমরের কপালে ঘামের বিন্দু জমেছে। এয়ারকন্ডিশন্ড রুমেও তার গরম লাগছে। প্রায় হাফ বোতল বিলিতি মদ সে ডিনারের পর থেকে শেষ করেছে। কিন্তু, তবুও এখন গলা শুকিয়ে গেছে।
‘স্যার, আপনি শুনছেন তো?’
ওপাশ থেকে আবার গলা ভেসে আসতেই সমর বলে উঠল,
‘কী চাও তুমি? তুমি কি আমায় ব্ল্যাকমেল করতে চাও?’
ওদিক থেকে মৃদু হাসির আওয়াজ এল। একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি। বলল,
‘না, স্যার। আমি আপনাকে বাঁচাতে চাই। কারণ, আজকে রাতে আমার কথা না শুনলে আপনি খুবই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাবেন। আপনার মৃতা স্ত্রী এই মুহূর্তে আপনার ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে।’
‘কীসের অপেক্ষা?’
‘অন্য একজনের আসার। ওই যে শুনুন, সেও এসেছে।’
সিঁড়ি দিয়ে আরও একজনের উঠে আসার শব্দ আসছে। সমরের কেন কে জানে মনে হল এটা এক পুরুষের পায়ের শব্দ। সেটাও উঠে দরজার বাইরে এসে থামল।
ফোনের লোকটাও যেন এতক্ষণ চুপ করে সেই আওয়াজ শুনছিল। শব্দটা থামতেই আবার বলল,
‘স্যার, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এবার এটা কে এল?’
গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সমর সেনের। বলল,
‘অ…অনির্বাণ।’
‘হ্যাঁ।’
‘হ্যাঁ, স্যার। ঠিক। স্যার, আপনার কি গলা শুকিয়ে গেছে?’
‘টেবিলের পাশেই তো এখনও গ্লাসে কিছুটা হুইস্কি রাখা আছে, স্যার। সেটা খান।’
সমর ফোনের লোকটির কথামতো গ্লাসের তলানিতে থাকা কিছুটা পানীয় গলায় ঢালল। সে বিছানায় বসে আছে সাইড টেবিলের সামনে। কানে ফোন। দরজার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে।
‘স্যার, এখন একটু ঠিক লাগছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘বেশ, স্যার। এবার একটু মাথা ঠান্ডা করুন। আমার কথামতো চললে আপনি আজকে একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার থেকে বেঁচে যাবেন। এরপর যা-ই হোক, দয়া করে পেছনে ফিরে তাকাবেন না।’
‘পেছনে? পেছনে কী আছে?’
যেন সমরের প্রশ্নের উত্তর দিতেই ঠিক সেই মুহূর্তে ওর ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। পেছন না ফিরেই সেটা খুলে যাওয়ার একটা মৃদু ‘ক্যাঁচচ’ জাতীয় আওয়াজ পেল।
ফোনের ওপার থেকে কথা এল,
‘স্যার, আপনি কি টের পাচ্ছেন যে, আপনি ঘরে আর একা নন?’
সমর ঠিকই টের পেল যে, সে এখন আর ঘরে একা নেই। দুটো অপার্থিব কিছু, অতি ভয়ংকর কিছু তার পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে। তাদের দৃষ্টি নিজের ঘাড়ে অনুভব করতে পারছে সমর। সেই দু-জনের দৃষ্টির সঙ্গে মিশে থাকা তীব্র ঘৃণা আর আক্রোশ অনুভব করতে পারছে সমর সেন। তার ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে গেছে।
‘স্যার।’
ফোনের লোকটা আবার কথা বলছে। সমর কথা বলতে পারছে না। লোকটা আবার বলল,
‘স্যার, আপনি কি গন্ধটা পাচ্ছেন? কীসের গন্ধ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?’
হ্যাঁ, গন্ধটা এবার পাচ্ছে সমর সেন। গন্ধটা তার চেনা। বিজ্ঞানের ভাষায় এই গন্ধকে বলা হয় ‘রেনসিড/পাঞ্জেন্ট ওডার’। অ্যাসিডের নাকে জ্বালা ধরানো গন্ধ! সঙ্গে মিশেছে চামড়া ঝলসে যাওয়ার গন্ধ। এই গন্ধটা সমর সেন গতকালই পেয়েছে তার ল্যাবে। অনির্বাণের মৃতদেহটা দেখার সময়। কনসেন্ট্রেটেড অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করেছে অনির্বাণ। মুখ, ঠোঁট, গলা, পাকস্থলী অ্যাসিডে ঝলসে এরকমই গন্ধে ভরে ছিল পুরো ল্যাব।
ছাত্রছাত্রীরা বিশাল বিক্ষোভ দেখিয়ে ইউনিভার্সিটি ঘেরাও করেছিল। পুলিশ এসে গতকাল বের করে নিয়ে যায় সমরকে।
‘স্যার, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কেন আপনাকে পেছনে তাকাতে না করছি? কারণ, ওরা ঠিক যেভাবে মারা গেছিল, সেভাবেই এসেছে। মানে, পেছন ফিরলেই আপনি অনির্বাণকে মুখ থেকে গলা ঝলসে যাওয়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন। আর, আপনার স্ত্রীর চেহারাটা মনে আছে সেই ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার পর কী হয়েছিল?’
মনে আছে সমর সেনের। ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে ঘাড় ভেঙে গেছিল মাধুরীর। পাশের বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাটের কাজ চলছিল সেই সময়ে। তাই কিছু ভাঙা কংক্রিটের সঙ্গে পুরোনো জং ধরা লোহার রডও পড়ে ছিল মাটিতে। মাধুরী সেখানেই গিয়ে পড়েছিল।
একটা লোহার রড মাধুরীর বুক ফুঁড়ে দিয়েছিল, আর একটা রড ডান চোখের মধ্যে দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মৃতদেহ দেখে আর সহ্য করতে না পেরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল সমর সেন। ও জানে যে, ফোনের এই লোকটা ঠিক কথাই বলছে। পেছন ফিরলে এখন সে মাধুরীকে সেই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবে।
‘স্যার।’
উত্তর দিল না সমর।
‘স্যার!’
‘বলো।’
‘ভয় করছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘প্রচণ্ড ভয় করছে কি?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওই কারণেই পেছন ঘুরে ওদের দেখতে বারণ করছি, স্যার। ওদের দেখলে আপনি আরও ভয় পাবেন। এখন আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন বলে তাও কিছুটা সাহস পাচ্ছেন, স্যার। তাই না? ফোন রেখে দিলে কী হবে বলুন তো?’
‘না, না! প্লিজ না! ফোন রেখো না!’
‘না, না। আমি ফোন রাখব না, স্যার। আমি তো বললামই, স্যার। আমি আপনাকে সাহায্য করতেই এসেছি। আমার কথামতো চললে আপনার এই ভয়ের রাত শেষ হবে। আর কোনোদিন আপনি ভয় পাবেন না। কী স্যার? আমার কথামতো কাজ করবেন তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘স্যার, ভয় পাবেন না। আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আপনার স্ত্রী এখুনি আপনার টেবিলে একটা জিনিস রাখবে। ওর দিকে তাকাবেন না কিন্তু। প্রয়োজনে চোখ বন্ধ রাখুন।’
সমর দেখল তার পেছন থেকেই একটি ফ্যাকাশে মেয়েলি হাত এসে টেবিলে কিছু একটা রাখল। হাতের চুড়িগুলো চিনতে অসুবিধে হল না সমরের। চোখ বন্ধ করে নিল সমর সেন।
‘স্যার, এবার চোখ খুলুন। টেবিলে যেটা আপনার স্ত্রী রেখে গেছে সেটা দেখুন।’
চোখ খুলে সমর দেখল টেবিলে রাখা আছে ঘুমের ওষুধের একটা শিশি। মাধুরীর ইনসমনিয়া হলে ও এর থেকে একটা করে খেত। খুব কড়া ডোজের ট্যাবলেট এগুলো। ডাক্তার তাই সাবধান করে দিয়েছিল যেন বেশি না খায়। গত এক বছর এই ওষুধগুলো নীচের বাথরুমের কাবার্ডে রাখা ছিল।
কাঁপা হাতে শিশিটা তুলে নিল সমর। ফোনের ওপাশ থেকে লোকটা বলল,
‘স্যার, আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনাকে কী করতে হবে এই আতঙ্কের থেকে মুক্তি পেতে?’
‘হ্যাঁ।’
‘স্যার, আপনি কি বুঝতে পারছেন আমি কে? আমি কিন্তু প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়েছি আপনাকে।
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে স্যার, আপনি নিশ্চয়ই এটাও এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন যে, আসলে যা যা ঘটছে তা আপনার মস্তিষ্কের ভেতর ঘটছে। আসলে, কোনো ফোনই আসেনি। এখনই ফোনের দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন ফোনটা অনেকক্ষণ আগেই চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে রয়েছে।’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি জানি আপনি বুঝবেন। কারণ, আমি যে আপনাকে সবথেকে ভালো চিনি। কিন্তু স্যার, ব্যাপারটা কী জানেন তো, বাস্তব আর কল্পনা ততটা ভিন্ন নয় যতটা মানুষে ভাবে। মস্তিষ্ক যাকে যেটা দেখায়, তার কাছে সেটাই বাস্তব। তাই
না?’
‘আমার আর কথা বলতে ভালো লাগছে না।
‘ সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগছে সমর সেনের।
‘হ্যাঁ, স্যার। বুঝতে পারছি। দেখুন স্যার, এটাই একমাত্র উপায়। আপনি বুঝতে পারছেন তো, বাস্তব হোক বা অবাস্তব, আপনার স্ত্রী আর অনির্বাণ রোজ রাতেই আপনার ঘরে আসবে এখন থেকে। রোজ রোজ এই ভয় কি সহ্য করা সম্ভব?’
‘না।’
‘তাই এটাই বেস্ট উপায় নয় কি? অনির্বাণ যে উপায়টা বেছে নিয়েছিল, সেটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। আসলে, ও সাহসী ছিল। আপনার সে-সাহস নেই। তাই, আপনার জন্যে এই সহজ যন্ত্রণাহীন উপায়টাই ঠিক আছে। তাই না, স্যার?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে আর দেরি করবেন না, স্যার। এই তো, ঘুমিয়ে পড়বেন। আর উঠবেন না। এই ভয়ের শেষ করুন, স্যার। আমি আছি সঙ্গে।’
সমর সেন ওষুধের বোতল থেকে বেশ কয়েকটা ট্যাবলেট মুখে দিল। তারপর বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল দিয়ে গিলে নিল সেগুলো।
কিছুক্ষণ যেতেই টের পেল স্নায়ুর উত্তেজনা কমে আসছে। চোখে শাস্তির ঘুম নেমে আসছে। মাধুরী, অনির্বাণ, প্রিয়া আরও অনেকের মুখ মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে সমরের স্মৃতি থেকে। চোখ ভারী হয়ে আসছে।
