ভয়ের গল্প লিখতে হলে
[কোথাও একটা পড়েছিলাম যেন যে, লাভক্রাফ্ট গোরস্থান থেকে পাথর তুলে এনে সেটা মাথার কাছে নিয়ে ঘুমোতে যেতেন, যাতে রাতে দুঃস্বপ্নে গল্পের প্লট আসে। সত্যি নাকি?]
.
‘আপনার মশাই লেখার হাত ভালো। ভাষাও বেশ ঝরঝরে। কিন্তু…।’
আবার সেই ‘কিন্তু’! সুনির্মল জানে পরের কথাগুলো কী হবে। জানে কারণ, এই প্রথমবার নয়, এর আগেও বহুবার এই একই কথা ওকে শুনতে হয়েছে। খালি টেবিলের ওইধারে বসা বক্তার মুখটা আলাদা আলাদা প্রতিবার। কিন্তু, তাদের কথাগুলো প্রায় একই।
‘কুয়াশা’ পত্রিকার প্রকাশক এবং অঙ্কুর প্রকাশনীর কর্ণধার মিস্টার শাসমল বাকি কথাটা শেষ করলেন,
‘কিন্তু ভয়টা সেভাবে লাগল না। বুঝলেন তো, কী বলতে চাইছি? মানে “কুয়াশা”-র বিশেষ “ভয়” সংখ্যার জন্যে আমরা যেরকম গল্প চাইছি, সেইরকম হচ্ছে না এটা।’
ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই কথা এর আগে আরও দুই প্রকাশক বলেছে সুনির্মলকে। তার লেখার হাত ভালো, কিন্তু x-ফ্যাক্টর যেটাকে বলে, সেটা নেই। সুনির্মল নিজেও ব্যাপারটা বোঝে। ওর গল্পগুলো শুরু ভালোভাবে হলেও, মাঝপথ থেকে বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়।
অঙ্কুর প্রকাশনীর অফিস থেকে বেরিয়ে এসে সামনের পার্কের একটা লোহার বেঞ্চে বসল সুনির্মল। একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে বসল।
সে একটা কল সেন্টারে চাকরি করে এমনিতে। তাতে যা সামান্য আয় হয়, তাতে চলে যায় আর কি। কিন্তু, লেখাটা ওর নেশা। ছোটোবেলায় ইস্কুলের ম্যাগাজিনে লিখে প্রথম এই নেশার অস্তিত্ব নিজের অন্তরে টের পেয়েছিল। তারপর পড়াশোনা, কাজ, এইসবের চাপে লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে, পড়েছে সে নিয়মিত। একজন ভালো লেখক হওয়ার আগে একজন ভালো পাঠক হওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজন।
কয়েক বছর আগেই আবার লেখালেখি শুরু করেছে। তবে, এইবার বিশেষ একটা ধারাকেই বেছে নিয়েছে ও। ভয়! হরর! অনেক গল্পের বই পড়ে ওর এই জঁরটাই সবচেয়ে মনে ধরেছে।
কিন্তু, এই বাজারে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়াটা সহজ নয়। সেটা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছে ও।
একজন বাদাম বিক্রেতা ‘বাদাম বাদাম’ বলে হাঁক দিতে দিতে যাচ্ছিল পার্কের মধ্যে দিয়ে। তাকে ডেকে কুড়ি টাকার বাদাম কিনল সুনির্মল। এখন বেলা বারোটা। বাড়ি গিয়ে খেয়ে ঘুম দেওয়া উচিত ওর। রাতে ডিউটি আছে আজকে। কিন্তু, ওর ভালো লাগছে না। এই নিয়ে বেশ কয়েকটা পর পর রিজেকশন হল লেখা। ও নিজেও বুঝতে পারছে, ওর লেখায় কিছু একটা খামতি থেকে যাচ্ছে।
প্রথম বাদামটার খোসা ভাঙতে তাতে দুটো বাদাম বেরোল, কিন্তু, তার মধ্যে একটা পচা। ধুর ধুর! কপালটাই খারাপ ওর। নিজের মনেই ভাবে সুনির্মল। ইদানীংকালের কয়েক জন লেখকের লেখা ও পড়েছে। তারাও মোটেই বিশাল ভালো কিছু লিখছে না। ও যা লেখে, ওইরকমের গল্পই লিখছে। সেই ‘থোড় বড়ি খাড়া’ তান্ত্রিক, কাটা মুণ্ডু, মাংস পচা গন্ধ, ভূত মড়া কামড়ে খাচ্ছে। এর বাইরে কেউ কিছুই লিখছে না। অথচ, লোকজন এই ধরনের থার্ড ক্লাস গল্পই পড়ে চলেছে। খালি এরা পুরোনো লেখক, বইটই আছে তাই প্রকাশক এদের বাজে গল্পগুলো ছাপছে। ওর যেহেতু নিজের বই নেই, নাম নেই, তাই ওর লেখা স্থান পাচ্ছে না কোনো ম্যাগাজিন বা সংকলনে।
বাদাম চিবোতে চিবোতে পার্কের ফুল, কুকুর, কয়েকটা মানুষ এদের দেখছিল সুনির্মল। আর ভাবছিল।
এদের লেখা তাকে মোহিত করে না। বাজে লেখা সব। শুধু একজন, হ্যাঁ, মাত্র একজন লেখক আছেন যাঁর লেখা ওকে বিস্মিত করে। গত ত্রিশ বছর ধরে লোকটা অসাধারণ ভয়ের গল্প লিখে চলেছেন। প্রতিটি গল্পের প্লট যাকে বলে ইউনিক! যাঁর প্রতিটি গল্প পড়তে গিয়ে দিনের বেলাতেও গা ছমছম করে। তিনি প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার ভৌতিক সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। দশ বছর আগেও কেউ ভেবেছিল যে, বাংলার কোনো উপন্যাস বিশ্ববিখ্যাত ‘ব্রাম স্ট্রোকার’ পুরস্কার পেতে পারে? কিন্তু, প্রতাপবাবুর উপন্যাস ‘আঁধারের কলম’ তাই পেয়ে দেখিয়েছে। প্রতাপবাবুকে শুধুই লেখক বললে ভুল হবে। তিনি একইসঙ্গে লেখক এবং শিল্পী। নিজের বইয়ের জন্যে নিজেই ছবি আঁকেন। সেই ছবিগুলো পাঠককে রাতে দুঃস্বপ্ন দেখানোর পক্ষে যথেষ্ট। শুধু সেই ছবি দেখেই বমকে যেতে হয়! তার সঙ্গে বইয়ে যোগ হয় তার ভয়ংকর সুবিস্তারিত বর্ণনা। সব মিলে প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস মানেই এই আলাদা ভয়ের জগৎ। সুনির্মল শুধু ভাবে যে, একজন মানুষের কতটা কল্পনাশক্তি থাকলে এরকম ভয়ানক প্রেক্ষাপট ভাবা যায়। ভদ্রলোক ঠিক অর্থেই এডগার পো, লাভক্রাফ্ট, কিং বা জুনজীর উত্তরসূরি।
বাদাম শেষ করে কাগজের ঠোঙাটা গোল করে দশ হাত দূরের ডাস্টবিন লক্ষ করে ছুড়ল সুনির্মল। জলহস্তির দামড়া মুখে না ঢুকে সেটা চোখে লেগে পড়ল বাইরে। আরও একবার নিজের মনেই গালি দিয়ে উঠে দাঁড়াল সুনির্মল। তার নিজের জীবনটাও তো এভাবেই চলছে। ঠিক জায়গামতো ফসকে যাচ্ছে ও। একটুর জন্যে প্রতিবার মিস হয়ে যাচ্ছে লেখা ছাপানোর সুযোগ।
তবে, সুনির্মল এত সহজে হার মানার পাত্র নয়। সে ঠিক প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই হতে চায়। প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরেই সবাই মনে রাখবে সুনির্মল বসুর নাম।
কিন্তু, কীভাবে? কীভাবে নিজের মাধ্যমমানের লেখা প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানে নিয়ে যাবে ও? সুনির্মল বুঝতে পারে যে, এই প্রশ্নের উত্তর একজনের কাছেই আছে। স্বয়ং প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিই একমাত্র সুনির্মলকে বলতে পারবেন লেখার উন্নতি করার উপায়।
আগামী রবিবারই একবার প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি যাবে বলে ঠিক করে সুনির্মল। একবার চেষ্টা করতেই হবে ওকে।
***
উত্তর কলকাতার পুরোনো, বা, বলা চলে জরাজীর্ণ একটা বাড়ির দরজায় বেল বাজাল সুনির্মল। এটা প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। মানে, এখানে ভাড়া থাকেন আর কি।
যতটা সহজ ও সেদিন পার্কে ভেবেছিল, আসলে কিন্তু ভদ্রলোকের বাড়ি খুঁজে পাওয়াটা মোটেই ততটা সহজ হয়নি। প্রায় দেড় মাস লেগে গেছে ঠিকানা খুঁজে বের করতে। তার কারণ, প্রতাপবাবু বিশ্ববিখ্যাত লেখক হলেও বরাবরই থেকেছেন প্রচারের আলোর বাইরে। কোনো বই সই অনুষ্ঠান, বইমেলা, এমনকী পুরস্কার অনুষ্ঠানে পর্যন্ত কোনোদিন তাঁকে দেখা যায়নি। মাত্র দু-একটা ছবিতে তাঁকে দেখেছে তাঁর বিশাল পাঠককুল। তাঁর ঠিকানাটা একমাত্র তাঁর প্রকাশক জানত। তার সঙ্গেই যোগাযোগ করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এবং বেশ কিছু টাকা খরচা করে ঠিকানা জেনেছে সুনির্মল।
প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ব্যাপারটাই সুনির্মলের কাছে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে। একজন লেখক কেন লেখে? অবশ্যই নাম, খ্যাতির আশায়। যাতে অনেক লোক তাঁর নাম জানে, তাঁর বই পড়ে, সুখ্যাতি করে। কিন্তু, এই ভদ্রলোক এভাবে প্রচারের থেকে দূরে থাকেন কী কারণে? লোকে যদি তাঁকে না-ই চেনে তাহলে প্রতাপবাবু কীসের আশায় লেখেন?
সুনির্মল ভেবেছিল এই লোকটা বোধ হয় ইচ্ছে করে আড়ালে থাকেন, যাতে তাঁকে ঘিরে এক ধরনের রহস্য সৃষ্টি হয়। বই বিক্রির ক্ষেত্রে এটাও একটা উপায় বটে। কিন্তু, এখন তাঁর বাড়ির সামনে এসে সে-ভুল ভাঙল সুনির্মলের। প্রতাপবাবুর রোজগার মোটেই কম নয়। কিন্তু, ও জানতে পেরেছে যে, তার সিংহভাগই তিনি নাকি দান করেন। এই জীর্ণ বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে, কথাটা বিশ্বাস করছে সুনির্মল। আশ্চর্য!
কলিং বেল বাজিয়ে অনেকক্ষণ বাদেও কেউ দরজা খুলল না দেখে সুনির্মল একবার ভাবল, ভদ্রলোক বোধ হয় দরজা খুলবেন না। যদিও সে আগে ফোন করেই এসেছে। ভদ্রলোক প্রথমে ঠিকানা দিতে চাননি। তাঁকে রিপোর্টার বা প্রকাশক জাতীয় কিছু ভেবেছিলেন। সুনির্মল নিজের উদ্দেশ্য বুঝিয়ে বলায়, কী জানি ভেবে প্রতাপবাবু বলেছিলেন,
‘বেশ। আসুন। সন্ধে ছ-টার দিকে আসুন। ঠিকানাটা দেব, না, জানেন? সুনির্মলের মনে হল, বাড়ির বেলটা খারাপ না তো? একবার কড়া নেড়ে দেখবে ও?
কড়ার দিকে হাত বাড়াতে যেতেই ভেতর থেকে দরজার খিল খোলার শব্দ এল। দরজা খুলে এক বৃদ্ধ মুখ বাড়ালেন।
সুনির্মল বইয়ের ব্যাককভারে ছাপানো, প্রতাপবাবুর তরুণ বয়সের একটামাত্র ছবিই দেখেছে। তবুও এই ভদ্রলোককে প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলে চিনতে অসুবিধে হল না। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশ-একান্নর বেশি নয়। কিন্তু, এখন দেখতে অনেকটা বেশিই বুড়োটে লাগছে। যে কেউ বলবে এই লোকের বয়স সত্তরের দোড়গোড়ায় হবেই হবে। অল্প বয়সেই এরকম বুড়িয়ে গেছেন।
ভদ্রলোক বললেন,
‘কলিং বেল বাজিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বুঝি? আসলে ওটা বেশ কয়েক মাস ধরেই খারাপ। ঠিক করা হয়নি। আসুন। ভেতরে আসুন।’
বাড়িটা পুরোনো হলেও ভেতরটা বেশ গুছোনো। একটাই ঘর, একদিকে রান্নাঘর, অন্যদিকে বাথরুম। ঘরে একটা লোহার খাট, একটা লোহার আলমারি, আলনা আর একদিকে বড়ো একটা স্টাডি ডেস্ক আর চেয়ার। ডেস্কে কাগজের স্তূপ আর হাতে-আঁকা ছবি ছড়িয়ে আছে। ভয়ংকর সব জীবের ছবি দেখা যাচ্ছে দু-একটা কাগজে। সুনির্মলের সেটা দেখে লাভক্র্যাফ্টের কথা মনে পড়ল। ডেস্কের পাশে একটা কাঠের আলমারিতে গাদা গাদা বই ঠাসা। এ ছাড়া আরও দুটো বেতের চেয়ার আর একটা টেবিল।
‘বসুন।’
একটা বেতের চেয়ারে বসল সুনির্মল। প্রতাপবাবু খাটেই বসলেন। ভদ্রলোকের চেহারা একহারা, চুল সব সাদা, চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। পরনে একটা ফতুয়া আর ঢলা পাজামা। ভদ্রলোকের কপালের ডান দিকে একটা বড়ো আঁচিল। এই আঁচিলটা প্রতাপবাবুর পুরোনো ছবিতে দেখেছিল বলেই চিনতে অসুবিধে হয়নি সুনির্মলের।
প্রতাপবাবু প্রশ্ন করলেন,
‘চা খাবেন?’
সুনির্মল বলল,
‘স্যার, আপনি ব্যস্ত হবেন না। আর প্লিজ, আমাকে তুমি করেই বলুন।’
‘বেশ। তাই বলব। তবে একটু চা খাও, তাহলে আমিও খাব আর কি।’
বলে প্রতাপবাবু উঠে গেলেন। রান্নাঘর দেখা যায় এখানে বসেই। তাই কাজ করতে করতেই প্রতাপবাবু বললেন,
‘সন্ধের দিকে ডাকলাম বলে অসুবিধে হল? আসলে সারাসকাল আমি ঘুমোই। তারপর দুপুরে কাজের লোক আসে। ঘরের কাজ, রান্না সব সে-ই করে যায়। ওই সময়ে এলে কথা বলা যেত না। তাই সন্ধের দিকেই ডাকলাম।’
‘না, না। কোনো অসুবিধে নেই।’
চা ছাঁকতে ছাঁকতে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি লেখক?’
‘এখনও নিজেকে ঠিক লেখক বলা চলে না, স্যার। সাধারণ কলমচি। নিজস্ব কোনো বই এখনও নেই।’
‘তাতে কী? নিজের বই থাকলেই লেখক, আর বই না থাকলেই সে লেখক নয়?’
‘না, না। তা বলতে চাইনি, স্যার। আসলে আমি খুব একটা ভালো লিখি না। বিশেষ করে আপনার সামনে তো নিজেকে লেখক বলাটা ধৃষ্টতা হয়ে যায়, স্যার।’
চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে প্রতাপবাবু বললেন,
‘তা, তোমার কি ধারণা যে, আমি তোমায় জাদুবলে লেখা ভালো করার উপায় বলে দেব?’
‘না না, স্যার। মানে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু যদি বলতেন। যদি কিছু পরামর্শ দিতেন আর কি।’
ভদ্রলোক খাটে বসলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন,
‘কী লিখতে চাও?’
‘আপনার মতো।’
‘মানে, আমার মতো ভয়ের গল্প?’
‘হ্যাঁ, স্যার। ভয়ের গল্প।’
‘কেন? বাজারে এটা আজকাল বেশি চলে বলে? শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, মানিক কি তোমাদের মতে ব্যাকডেটেড?’
কথা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে বুঝে সুনির্মল বলে,
‘না না, স্যার। আমি তা বলতে চাইনি। আসলে এই ধারাটাই ভালো লাগে আমার। ছোটো থেকেই আপনার বই পড়েছি, স্যার। আমি আপনার একজন অন্ধ ভক্ত। আমার এই লেখালেখির মূল অনুপ্রেরণা আপনিই।
প্রতাপবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন,
‘ভৌতিক বা ভয়ের গল্পকে আমি সাহিত্যের মধ্যে ফেলি না। আমি কোনোদিন একটাও ভৌতিক গল্প পড়িনি। শুধুই সামাজিক উপন্যাস, গল্প পড়েছি। এবং আমি মনে করি, এগুলোই আসল সাহিত্য পড়েছি। ভয়ের গল্প সাহিত্য নয়।
অবাক হল সুনির্মল। একজন লেখককে সবার আগে একজন ভালো পাঠক হতে হয় বলেই ও জেনে এসেছে। এদিকে স্বয়ং প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন তিনি নাকি কোনোদিন ভয়ের গল্পই পড়েননি?
একবার আড়চোখে বইয়ের আলমারির দিকে দেখে নিল। সত্যিই তো, একটাও ভৌতিক বই দেখা যাচ্ছে না। সবই সাধারণ বইপত্র। এমনকী প্রতাপবাবুর নিজের বইও নেই। সুনির্মল বলল,
‘আর কিছু না হোক স্যার, অন্তত নিজের লেখা বইগুলো নিশ্চয়ই পড়েছেন?’
চোখ বড়ো বড়ো করে বৃদ্ধ উত্তর দিলেন,
‘একটাও না! ওই লেখা, ওই আঁকা আমি যত তাড়াতাড়ি পারি শেষ করে বরাবরের মতো বিদায় দিই। আমি এইসব লেখাকে সাহিত্য বলে মনেই করি না! এগুলো অভিশাপ!’
‘আপনি এই কথা বলছেন, স্যার? আপনাকে পৃথিবীর বহু পাঠক পো বা লাভক্রাফটের উত্তরসূরি বলে। তাঁরা আপনার মতে সাহিত্যিক নয়?’
সুনির্মল এইবার কিছুটা বিরক্ত হয়েই প্রশ্নটা করল। প্রতাপবাবু বললেন,
‘না, নয়। আসল সাহিত্য লিখতে ইম্যাজিনেশন লাগে। কল্পনা যেখানে নেই, সেখানে সাহিত্য কোথায়? ভয়ের গল্পকে আমি ঘৃণা করি!’
‘এটা কী বলছেন, স্যার? সামাজিক লেখার চেয়ে অলৌকিক লেখায় অনেক বেশি কল্পনা লাগে। এটা তো সকলেই মেনে নেয়। সামাজিক গল্প বহু ক্ষেত্রেই চোখের সামনে যা দেখেছি, তাই সুন্দর ভাষার মোড়কে লিখে দিলেই হয়। কিন্তু ভৌতিক, অলৌকিক? সেটা তো পুরোটাই নিজের মন থেকে বানাতে হয়।’
কিছুক্ষণ প্রতাপবাবু তাকিয়ে রইলেন সুনির্মলের দিকে। চশমার কাচের পেছন থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে সুনির্মলের মনে হল যেন বিদ্রূপ ফুটে উঠছে তাঁর চোখে।
বৃদ্ধ বললেন,
‘কীভাবে জানলে এঁরা কল্পনার আশ্রয় নিয়ে লিখেছেন? এডগার অ্যালেন পো-র জীবন কতটা ট্র্যাজিক জানো? তিনি নিজের জীবনের সমস্ত বিষাদ ঢেলে দিয়েছিলেন কাগজে। আর লাভক্রাফট? তাঁর কথা তো জানোই। তিনি রাতে ঘুমোতে পারতেন না, সেটা জানো? এঁদের বই না পড়লেও, এঁদের জীবনী আমি পড়েছি। একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝেছি যে, এঁরাও আমারই মতো ছিলেন। এঁরা সবাইই বাধ্য হয়ে লিখতেন।’
‘মানে?’
‘লেখাটা তাঁদের সবার কাছেই নিজের মস্তিষ্কের একটা নিষ্ক্রমণ পথ মাত্র। না লিখলে তাঁরা উন্মাদ হয়ে যেতেন, তাই লিখতেন। বাধ্য হয়ে লিখতেন! আমিও বাধ্য হয়েই লিখি। কারণ আমার কাছে আর কোনো উপায় নেই।
‘ঠিক বুঝলাম না।’
‘আমি বাধ্য হয়ে লিখি। কারণ, দিনের পর দিন আমি যা সহ্য করে চলেছি, কাউকে তা বলতে পারি না। তাই, সেগুলো ব্যক্ত করার একমাত্র উপায় ওই লেখা আর ছবি আঁকা!’
চায়ের কাপ নামিয়ে রেখেছে সুনির্মল। প্রতাপবাবু কী বলতে চাইছেন? বৃদ্ধ কেমন একটা ঘোর লাগা কণ্ঠে বললেন,
‘রোজ রাতে, রোজ, ওরা আসে। আমাকে নিয়ে যায় ওদের জগতে! কী…কী ভয়ানক সেই জগৎ! রাতের পর রাত আমায় টেনে নিয়ে যায় ওরা! প্রথমে লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কেউ বিশ্বাস করেনি। ডাক্তার দেখিয়েছি, লাভ হয়নি। শেষে বুঝতে পারি যে, আমার মাথার ভেতর যে, অন্ধকার জগতের ছায়াগুলো জমে চলেছে, যে দৃশ্য দিনের পর দিন দেখে চলেছি, সেগুলো কোথাও একটা প্রকাশ না করলে আমি উম্মাদ হয়ে যাব! সেইদিনই প্রথম কলম আর কাগজ তুলে নিই। ঢেলে দিই তাতে নিজের দেখা, উপলব্ধি করা সেই বিষাক্ত, অন্ধকার জগৎটাকে। সাদা কাগজের ওপর কালো কালিতে ফুটিয়ে তুলি ওই অন্ধকার জগতের সমস্ত ভয়ংকরদের।’
সুনির্মল বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে সামনে বসা মানুষটার দিকে। ভদ্রলোক কি মশকরা করছেন তার সঙ্গে? ও প্রশ্ন করল,
‘কে নিয়ে যায় আপনাকে? কোথায় নিয়ে যায়? কী বলছেন আপনি?’
‘ওরা! ওরা অন্ধকারের সন্তান! অন্ধকারেই ওদের জন্ম। আমি…আমি ভয়ের গল্প লিখতে চাইতাম। সত্যিকারের ভয়ের গল্প! আর একরাতে ওরা এল! ভয়….. ভয় কাকে বলে আমি সেই রাতে বুঝতে পেরেছিলাম। আমার প্রথম উপন্যাস– ‘চক্র’, সেই অভিজ্ঞতার কথাই লেখা।’
বইটা সুনির্মল পড়েছে। বইয়ের বিষয়বস্তু ও জানে। বইয়ের মূল কাহিনি, একজন মানুষকে পিশাচরা রোজ টেনে নিয়ে যায় এক জায়গায়। তারপর বাধ্য করে নিজেকেই নিজের শরীর খেতে। বড়োই বীভৎস সেই বইটা এবং সঙ্গে প্রতাপবাবুর আঁকা ছবিগুলো। একজন মানুষকে জীবিত অবস্থাতেই তাঁর নিজের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রোজ কামড়ে খেতে বাধ্য করা হচ্ছে। রোজ এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! এই গল্প একবার পড়লে ভোলা যায় না।
প্রতাপবাবু বলে চলেছেন,
‘রোজ রাতে….আমায় নিজের হাত-পা চিবিয়ে…পেট ফেড়ে নিজের পেটের ভেতরের…! র…রোজ বাধ্য করত আমায় এটা করতে! রক্তের গন্ধ, সেই তীব্র যন্ত্রণা, মুখে নোনতা স্বাদ! আমি আর পারছিলাম না! তাই প্রথমবার সেগুলো কাগজে ফুটিয়ে তুললাম। শান্তি পেলাম। ভাবলাম, মুক্তি পাব। কিন্তু তা হল না। যেদিন লিখে ফেললাম, সেই রাতে অন্য কিছু ঘটল! ওরা আবারও আমায় নিয়ে গেল। এইবার আমায় একটা অন্ধকার গর্তে ওরা ফেলে দিল। আশেপাশে শুধুই মৃতদেহর স্তূপ! আর সেই…সেই মৃতদেহগুলো ক্রমাগত ফিসফিস করতে থাকে! অজানা কোনো ভাষায় কিছু বলতে থাকে, আমায় রাতের পর রাত তাদের ফিসফিসানি শুনতে হত! অসহ্য! অসহ্য!
সুনির্মল জানে এই প্লটে প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় উপন্যাস আছে। ‘আঁধারের ফিসফিস’। কিন্তু, এই ভদ্রলোক যা বলছেন, সেগুলোর মানে কী? ইনি নিঃসন্দেহে ‘ডেলিউশনাল’। চিকিৎসা দরকার। সুনির্মলের এখন মনে হচ্ছে, এখানে এসে সে ভুল করেছে। প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় জিনিয়াস। কিন্তু পাগল জিনিয়াস।
প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন,
‘আরও, আরও অনেক ভয়ংকরের মাঝে ওরা আমায় নিয়ে গেছে। আমি শুধুই সেগুলো লিখেছি, এঁকেছি। কোনোটাই আমার কল্পনা নয়! সব, সব আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা! এগুলো না লিখলে আমি উন্মাদ হয়ে যাব! কোথাও একটা নিজের অন্তরের এই অন্ধকার দিকটা প্রকাশ করতেই হবে! তাই আমি লিখি আর আঁকি। এই অন্ধকার অপার্থিব জগৎ যাদের নিজের গর্ভে একবার নিয়ে গেছে, তারাই একমাত্র জানে প্রকৃত ভয় কাকে বলে! আমাদের এই লেখা, আঁকা যেগুলোকে তোমরা সাহিত্য বা শিল্প বলো, ওগুলো তা নয়। ওগুলো এক-একজন অভিশপ্ত মানুষের নীরব আর্তনাদ! যা অন্যকে শোনাতে চাই, কিন্তু, কেউ শুনতে পায় না।’
সুনির্মলের এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এক মুহূর্ত এখানে ও আর থাকতে চায় না। কিন্তু, এই বৃদ্ধকে এভাবে ছেড়ে যাওয়া যায় কি? তাঁর চিকিৎসার দরকার। গত ত্রিশ বছর ধরে ভদ্রলোক লিখছেন। এর মানে দাঁড়ায় ত্রিশ বছর ধরে মানুষটা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। নিজের আশেপাশে রোজ রোজ ভয়ংকর দৃশ্য কল্পনা করছেন এবং তীব্র ভয়ের মধ্যে রাতের পর রাত কাটিয়ে চলেছেন।
সুনির্মল বলে,
‘প্রতাপবাবু, আপনার চিকিৎসা দরকার। নাহলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি নেই আপনার।’
দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়। সুনির্মলের কথায় মুখ তুলে তাকালেন তার দিকে। অস্পষ্টভাবে বললেন,
‘ম… মুক্তি?’
‘হ্যাঁ, স্যার। এই রোজকার দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় আছে। কোনো ভালো মনোরোগ চিকিৎসক….।’
কথার মাঝেই আবার একটা শব্দ উচ্চারণ করে উঠলেন বৃদ্ধ,
‘দুঃস্বপ্ন?’
এইবার হঠাৎই হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি। বললেন,
‘দুঃস্বপ্ন? মুক্তি? তুমি মনে কর এতই সহজ ওদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করা? মুক্তির মূল্য জানো তুমি? জানো?’
বৃদ্ধ উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। সুনির্মল উঠে দাঁড়াল। এখানে আর থাকা ঠিক হবে না। প্রতাপবাবু চিৎকার করে চলেছেন,
‘এতই সহজ? সব কিছু সহজ ভাবো না? ওরা আমায় মরতেও দেয় না! বহুবার চেষ্টা করেছি এই জীবন শেষ করে নিজেকে মুক্তি দিতে! কিন্তু, প্রতিবার ওরা ফিরিয়ে আনে! ওরা চায় কেউ ওদের অন্ধকার জগতের বিভীষিকার কথা লিখুক। তাই, ওরা ঠিক কাউকে-না-কাউকে খুঁজে বের করে, যে ওদের কথা লিখবে! ওদের জগৎটাকে ফুটিয়ে তুলবে মানুষের মনের ভেতর। ওরা মানুষের মনের ভয়ের থেকেই শক্তি সঞ্চয় করে। আর তাই…তাই কাউকে-না-কাউকে লিখতেই হয় সেই অন্ধকার জগতের গল্প! ভয়ংকরের গল্প! ওরা তবেই আমায় মুক্তি দেবে যদি আমার বদলে অন্য কাউকে ওদের হাতে তুলে দিই! নিজের অভিশাপ অন্যের কাঁধে দিলে তবেই মুক্তি! কাউকে-না-কাউকে যে লিখতেই হবে ওদের কাহিনি!
সুনির্মল আর অপেক্ষা করল না। চায়ের কাপ পড়েই রইল। ও সোজা দরজা খুলে বেরিয়ে এল সরু খোলা বারান্দায়। সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করল।
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায় তখনও চিৎকার করে চলেছেন, ‘তুমি আমার মতো হতে চাও, তাই না? আমার মতো লিখতে চাও? ভয়ের গল্প লিখতে চাও? ওদের ওই অন্ধকার জগতের গল্প লিখতে চাও? বেশ! তাই হোক! তাই হোক!
একবারও পিছন ফিরল না ও। সুনির্মল দ্রুত পায়ে পুরোনো বাড়িটা ছেড়ে বেরিয়ে এল।
***
(পূজাবার্ষিকী ‘কুয়াশা’ পত্রিকায় এই বছর এক নতুন লেখকের উপন্যাস ছেপেছে। নাম সুনির্মল বসু। ভদ্রলোকের আগে টুকটাক কিছু লেখা ছোটো লিটল ম্যাগাজিনে বেরোলেও ‘কুয়াশা’র মতো বড়ো ম্যাগাজিনে এই প্রথম। তাঁর লেখা গল্পটির নাম— আঁধারের সন্তান। গল্পের প্লট বড়োই অভিনব এবং ততোধিক ভয়ংকর। উপন্যাসের মূল চরিত্রটি রোজ রাতে একটি অন্ধকার, অচেনা জগতে বন্দি হয়ে পড়ে। সেখানে লক্ষ লক্ষ চোখ অন্ধকারে তার দিকে চেয়ে থাকে সর্বক্ষণ। শুধুই চেয়ে থাকে আক্রোশ ভরা, নিষ্পলক দৃষ্টিতে! সারারাত সেই চোখের দৃষ্টির থেকে পালিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করে কথক। কিন্তু, সে যেখানেই যায়, পেছনে সেই লক্ষ লক্ষ চোখ তাড়া করে বেড়ায়!
গল্পটা পাঠকদের মধ্যে প্রচণ্ড হিট হয়েছে। প্রকাশক জানিয়েছেন, শিগগিরই নতুন উপন্যাস আসছে সুনির্মল বসুর কলমে। তাঁরা এইবার খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন পুজোসংখ্যা নিয়ে। কারণ, প্রতিবার মূল আকর্ষণ থাকত প্রতাপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন হরর গল্প। কয়েক মাস আগেই লেখক আত্মহত্যা করায় এইবার পুজোসংখ্যায় কে ভয়ের গল্প লিখবে তাই নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন প্রকাশক।
সুনির্মল বসুর এই উপন্যাসটি পড়ে তিনি ঠিক করেন এইটাই ছাপবেন। নতুন লেখককে নিয়ে রিস্ক নেবেন। আর, তাতেই ফল হয়েছে। রোজ অফিসে ফোন আসছে অভিভূত পাঠকদের। সুনির্মল বসুর ঠিকানা চেয়ে। কিন্তু, এই বসুবাবুর কড়া নির্দেশ, যেন কাউকে তাঁর ফোন নম্বর বা ঠিকানা না জানানো হয়।
অঙ্কুর প্রকাশনীর মিস্টার শাসমল লেখা চেনেন। এই সুনির্মল বসুকে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে এই লেখক নিঃসন্দেহে হরর লেজেন্ড প্রতাপ বন্দোপাধ্যায়ের জায়গা নেবেন।)
