আমার একটুকরো নরকে
[আমার আজব ধরনের গল্প লিখতে খুব ভালো লাগে। এটা সেরকমই একটা গল্প।]
.
‘হ্যালো, ডাক্তারবাবু?’
‘বলছি।’
‘আমি পিয়ালী। রমেন সান্যালের মেয়ে। চিনতে পারছেন তো?’
চিনতে পারলেন ডাক্তার বসু। বললেন,
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলো। বাবা ঠিক আছেন? শরীর খারাপ করল নাকি?’
ওদিক থেকে একটু যেন ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাব করে পিয়ালী বলল,
‘বাবার শরীর ঠিক আছে, ডাক্তারবাবু। কিন্তু…কিন্তু, বাবা ঠিক নেই।’
‘কেন? কী হয়েছে?’
‘সেইজন্যেই ফোন করেছি, ডাক্তারবাবু। বাবা আজকাল পাগলামি শুরু করেছে। একবার যদি আসেন, তবে খুব ভালো হয়। ফোনে ব্যাপারটা বোঝানো মুশকিল।’
একটু ভেবে ডাক্তার বসু বললেন,
‘কিন্তু, আমার তো এখানে কাজ আছে, পিয়ালী। কলকাতা ছেড়ে যেতে পারব না।’
‘ডাক্তারবাবু, আপনি প্লিজ একদিনের জন্যে সময় করে আসুন। আপনি আমাদের পরিবারের পুরোনো ফ্যামিলি ডাক্তার। দাদাইও আপনার পেশেন্ট ছিল। আপনি ছাড়া কার সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলা যায় ভেবে পাচ্ছি না।’
‘আচ্ছা, আমি দেখছি।’
***
দু-দিন পর রবিবার রমেন সান্যালদের বাড়ির সামনে যখন ডক্টর বসু গাড়ি থেকে নামলেন, সূর্য তখন মধ্যগগনে। নিজেই গাড়ি চালিয়ে কাঁচড়াপাড়ায় চলে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ডাক্তার বসু। এখানেই সান্যালদের পৈতৃক বাড়ি।
বাড়ি না বলে একটা ছোটোখাটো পুরোনো প্রাসাদ বললেই বরং ঠিক বলা হয়। বিপত্নীক, মধ্য চল্লিশের রমেন সান্যাল তার মেয়েকে নিয়ে থাকে। একমাস আগেই বড়ো সান্যাল, মানে রমেনের বাবা রাজেশ সান্যাল মারা গেছেন। তিনিও বরাবরই ডাক্তার বসুর রুগি ছিলেন।
একজন চাকর দরজা খুলে দিল। চাকরটাকে আগেও দেখেছেন বসু। যদিও নাম মনে নেই। সে-ই বৈঠক ঘরে নিয়ে এসে বসাল ডাক্তার বসুকে। একটু বাদেই পিয়ালী নেমে এল দোতলা থেকে। ডাক্তার বসু যে আজকে আসবেন সেটা আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন ফোনে।
পিয়ালীর বয়স কুড়ি-একুশ হবে। কিন্তু, মা না থাকায় বরাবরই খুব প্র্যাকটিক্যাল, মাথা ঠান্ডা এবং ম্যাচিয়োরড মেয়ে। ডাক্তার বসুকে দেখে বলল,
‘ডাক্তারবাবু, অনেক ধন্যবাদ আসার জন্যে।
‘সে তো এলাম। কিন্তু, কী সমস্যা হয়েছে রমেনের, সেটা বলো তো।’
‘এখানে না। ভেতরের ঘরে আসুন।’
ডাক্তারের জন্যে খাবার বানাতে বলে পিয়ালী তাঁকে নিয়ে একটা ঘরে এল। বসু বুঝলেন যে, ও চায় না ওদের কথা বাড়ির কাজের লোকরা শুনুক। মুখোমুখি বসে পিয়ালী বলল,
‘ডাক্তারবাবু, বাবা পাগল হয়ে গেছে! দাদাই মারা যাওয়ার পর থেকেই বাবা অদ্ভুত কথাবার্তা বলছে।’
‘কী বলছে?’
‘অদ্ভুত সব কথা। মৃত মানুষ, নরক, এইসব আজগুবি কথা বলে আমায়। আর সারারাত দাদাইয়ের মতোই বাবারও ইনসমনিয়া দেখা দিয়েছে। সারারাত দাদাইয়ের ঘরে জেগে কীসব করে।’
‘কী করে?’
‘চিমনিতে আগুন জ্বালায়।’
‘অ্যাঁ? মানে?’
‘ঠিকই বলছি। দাদাইয়ের ঘরটা তো আপনি দেখেছেন অনেকবার। ওই ঘরে ইংরেজ আমলের একটা ফায়ারপ্লেস আর তার সঙ্গে ইটের একটা চিমনি আছে নিশ্চয়ই দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘বাবা সারারাত ওটার সামনে বসে থাকে আগুন জ্বেলে।’
‘এই গরমে আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকে?’
‘হ্যাঁ। সারারাত। আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই, দাদাইও তাই করত?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু সেই সমস্যা রমেনের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বলতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি জানতে চাওনি কেন এমন করে?’
‘অনেকবার। উত্তরে কীসব বলে, আমি বুঝি না। বাবার মাথায় সমস্যা দেখা
দিচ্ছে। আপনি কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করুন।
‘কিন্তু তোমার দাদাই, মানে, রমেশবাবুর মধ্যে তো কোনোদিন পাগলামির লক্ষণ দেখিনি। ডায়াবিটিস আর লিভারে সমস্যা ছিল বটে, কিন্তু, কথাবার্তা তো স্বাভাবিক লাগত।’
‘সেভাবে দেখতে গেলে বাবাও স্বাভাবিক। শুধু দাদাইয়ের ওই অদ্ভুত স্বভাবটা বাবার মধ্যে দেখা দিয়েছে।’
‘হুম। মনে হয় বাবার মৃত্যুর শোকটা ইফেক্ট ফেলেছে রমেনের মধ্যে।
‘কী জানি। ওইজন্যেই আপনাকে আসতে বললাম। আপনার কথা বাবা বরাবরই শোনে। আপনাকে বাবা নিজের দাদার মতোই মনে করে। তাই, দেখুন আপনি কথা বলে।’
‘বেশ।’
‘তবে, বাবাকে বলবেন না যে, আমি আপনাকে ডেকেছি। বলবেন, আপনিই এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাই দেখা করতে এসেছেন।’
***
‘রমেন, কেমন আছ?’
‘আরে, ডাক্তারবাবু যে!’
বেশ হাসিমুখে এগিয়ে এল রমেন সান্যাল। ডাক্তার বসু একবার ভালোভাবে জরিপ করলেন সান্যালকে। নাহ্, পাগলামির সেরকম কোনো লক্ষণ চোখে পড়ল না। ‘এইদিকে এসেছিলাম। ভাবলাম একটু দেখা করে যাই তোমার সঙ্গে।’
‘খুব ভালো করেছেন, ডাক্তারবাবু।’
খাটে সান্যাল বসল আর ডাক্তার বসলেন একটা পুরোনো আমলের আরামকেদারা টেনে। বললেন,
‘কেমন আছ, রমেন?’
‘মোটামুটি। বাবার মৃত্যুর পর একটু সমস্যায় পড়েছিলাম বটে। তবে, এখন সামলে নিয়েছি।’
‘বেশ, বেশ। তা, রাতে ঘুম-টুম ভালো হচ্ছে তো?’
ইচ্ছে করে এই প্রশ্নটা করলেন তিনি। উত্তরটা সঙ্গেসঙ্গে দিল না সান্যাল। কিছুটা ভেবে বলল,
‘নাহ্। সারারাত ঘুম হয় না। শেষরাতের দিকে ঘুমোই। সকাল এগারোটার দিকে উঠি।’
‘সেকী? কেন?’
‘ও সেইরকম কিছু না।’
‘সেইরকম কিছু নয় বললে কি হয় নাকি? আরে, সমস্যা কী? আমাকেই বলো না।’
‘ইয়ে…মানে, আসলে বাবার একটা দায়িত্ব আমার ঘাড়ে এসে পড়েছে। তাই, সেই কাজটাই আমাকে করতে হয়।’
‘কী কাজ?’
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল রমেন সান্যাল, যেন ভাবছে কথাটা ডাক্তারকে বলা ঠিক হবে কি না। ডাক্তার বসু আবার প্রশ্ন করলেন,
‘বলো না, কী সমস্যা? ঘুমের ওষুধ লাগবে নাকি?’
‘আজ্ঞে, না না।’
‘তবে?’
‘রাতে কাজ থাকে।’
‘কী কাজ সেটাই তো জানতে চাইছি। কী এমন কাজ যা রাত ছাড়া করা যায় না।’
আবারও একটু থেমে উত্তর দিল সান্যাল,
‘আসলে, রাতে আমায় আত্মা পোড়াতে হয়।’
কথাটা কানে ঢুকলেও ভুল শুনেছেন মনে হল ডাক্তার বসুর। প্রশ্ন করলেন,
‘কী? কী বললে? কী পোড়াতে হয়?’
‘আজ্ঞে, আত্মা।’
‘মানে?’
‘চা দিতে বলি?’
‘না, না। ওসব পরে হবে। কথা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা কোরো না। কী বললে আগে সেটা বোঝাও! আত্মা পোড়াও মানে?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে রমেন সান্যাল বললেন,
‘কী আর বলি, ডাক্তারবাবু। পারিবারিক একটা দায়িত্ব আমার কাঁধে এসে পড়েছে। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনিই রাতে কাজটা করতেন। কিন্তু, চুক্তি অনুযায়ী বাবার মৃত্যুর পর আমার ওপর সেই দায়িত্ব এসেছে।’
‘কীসের দায়িত্ব?’
‘স্বর্গ-নরক এইসবে বিশ্বাস করেন ডাক্তারবাবু?’
‘নাহ্। কেন?’
‘সব আছে, ডাক্তারবাবু। সব সত্যি। আমিও কি ছাই এইসব বিশ্বাস করতাম? আমিও ভাবতাম মরে গেল মানেই সব শেষ। কিন্তু, মোটেই তা নয়। কর্মফল অনুযায়ী আত্মাকে স্বর্গ বা নরকে যেতেই হয়।’
ডাক্তার বসুকে চিস্তিত লাগল। এইবার তাঁরও সন্দেহ হচ্ছে সান্যালের কিছু সমস্যা হয়েছে। পিয়ালী ভুল বলেনি।
রমেন সান্যাল খাটে পা তুলে বসল। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল,
‘আপনি পরিবারের বন্ধু। আমার দাদার মতো। আপনার থেকে লুকোনো উচিত হবে না। সত্যিটা বলেই দিই তবে। ব্যাপারটা বোঝানো কঠিন। তবে চেষ্টা করছি।’
সিগারেটে দুটো টান দিয়ে রমেন সান্যাল বলল,
‘সত্য, দ্বাপর, ত্রেতা না কীসব যুগ ছিল, জানেন নিশ্চয়ই। তা, সেইসময়ে মানুষ ভালো ছিল, আবার খারাপও ছিল। সমান সমান সংখ্যায় ভালো আর খারাপ ছিল আগের যুগ অবধিও। কিন্তু, তারপর এল কলিযুগ। খারাপ মানুষের সংখ্যা শুরু করল বাড়তে। এক্কেরে এক্সপোনেনশিয়ালভাবে বাড়তে থাকল খারাপ মানুষের সংখ্যা। এই যে দেখুন না, আজকের দিনে কীরকম চারিদিকে দুর্নীতি, ঠগ, জোচ্চোর। এর ফলে কী হল, নরকে যাওয়া আত্মার সংখ্যা বিশাল বেড়ে গেল। এতটাই বেড়ে গেল যে, শয়তানও হিমশিম খেতে শুরু করল তাদের সামাল দিতে।’
আরও দুটো টান মেরে ধোঁয়ার রিং ছেড়ে সান্যাল বলল,
‘নরকে এইসব পাপী আত্মাদের আগুনে ঝলসানো হয় যুগ যুগ ধরে। এটাই তাদের শাস্তি। কিন্তু, একা শয়তান আর কত আত্মাকে সামলাবে বলুন? তাই শয়তান কী করল, কর্মচারী নিযুক্ত করতে শুরু করল। মানে, সে কিছু কিছু মানুষের কাছে গিয়ে একটা অফার দিল। তাদের গিয়ে সে বলল পাপী আত্মাদের আগুনে ঝলসাতে যদি তারা সাহায্য করে, তবে তার বদলে মৃত্যুর পর তাদের আত্মাকে স্বর্গে পাঠানো হবে। তা, এই যে যাদের কাছে শয়তান এই চুক্তি নিয়ে গেছিল, তার মধ্যে একজন ছিল আমার এক পূর্বপুরুষ। কত পুরুষ আগের মানুষ, তা আমারও জানা নেই। সে রাজি হয় এবং বংশানুক্রমে সেই দায়িত্ব একজনের
মৃত্যুর পর তার উত্তর বংশধরের ওপর বর্তায়।’
ডাক্তার বসু ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছেন সান্যালের দিকে। সান্যাল আবার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
‘না, না। জোরজার নেই, বুঝলেন কিনা? এটা একটা ‘অফার’। ব্যাপারটা বাবা মারা যাওয়ার আগে বলেছিল আমায়। আমি তো ভেবেছিলাম ভুল বকছে বাবা। কিন্তু, বাবা যেদিন মারা গেল, সেদিন রাতে সে এল আমার স্বপ্নে। সেই একই চুক্তি। আত্মাদের সাজা দিতে তাকে সাহায্য করতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। হব নাই-বা কেন? এরকম সুযোগ কেউ ছাড়ে? মরার পর সোজা স্বর্গে! খালি সমস্যা হচ্ছে যে, রাতে কাজটা করতে হয়। বাবার তো ছোটো থেকেই দেখে আসছি ইনসমনিয়া। রাতে জেগে থাকত। কিন্তু, আমার পক্ষে রাত জাগা বেশ কষ্টকর। তবে, অভ্যেস হয়ে গেল। এখন খুব একটা অসুবিধে হয় না। বরং, সারারাতের খাটনির পর ভোরের দিকে গভীর ঘুম আসে।
ডাক্তার বসু ঠিক বুঝতে পারছে না রমেন তার সঙ্গে রসিকতা করছে, না, কথাগুলো সিরিয়াসলি বলছে। মুখের ভাব দেখে তো মনে হচ্ছে না রসিকতা।
রমেন সান্যাল বলল,
‘আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন যে, আমার কাজটা কী? কীভাবে করি? তাই না?’
ডাক্তার বসু মোটেই সেইসব ভাবছিলেন না। তিনি একবার ঘড়ি দেখলেন। সন্ধে হয়েছে ইতিমধ্যে। এইবার তাঁকে ফিরতে হবে। অনেকটা পথ ড্রাইভ করতে হবে। রসিকতা বা পাগলামি, কোনোটাই শুনে নষ্ট করার মতো সময় তাঁর নেই। তিনি বিখ্যাত ডাক্তার। বড়ো একটা নার্সিং হোমের সঙ্গে যুক্ত। নেহাত রমেনের বাবা সান্যালমশাই তাঁর পুরোনো রোগী। তাই এসেছেন।
রমেন বলে চলেছে,
‘কাজটা কীভাবে করি, সেটা আপনাকে বলি। বাবার ঘরে পুরোনো আমলের ফায়ারপ্লেসটা মনে আছে তো? ওটাতেই কাজটা করি। সন্ধের পর ওতে আগুন জ্বালতে হয়। ব্যস! তারপরেই সেখানে বিভিন্ন আত্মারা আসে। তাদের ছোট্ট ছোট্ট মুখের আকার ফুটে ওঠে আগুনের মাঝে। চিৎকার করে ওরা। আগুনে গরম লাগে তো! আমার কাজ সহজ, একটা লোহার শিক দিয়ে তাদের উলটে পালটে আগুনে সেঁকা! মাঝে মাঝে শিকের সুঁচালো দিকটা দিয়ে খোঁচানো। তাতে আরও চিৎকার জোড়ে ওরা। যদিও সেই চিৎকার শুধু আমিই শুনতে পাই।’
সিগারেট শেষ হয়েছে। ফিল্টারে আগুন লেগেছে এতক্ষণে। তাই সেটাকে ছাইদানে নিক্ষেপ করে আবার কথা শুরু করল সান্যাল,
‘প্রথম প্রথম খুব অসুবিধে হয়েছে, জানেন ডাক্তারবাবু। প্রথমত, রাত জাগার অভ্যাস একদমই ছিল না। তার ওপর ওই তীব্র আগুনে ঝলসাতে থাকা লোকগুলোর মরণ আর্তনাদে মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ভেবেছিলাম এই কাজ আমার দ্বারা হবে না! কিন্তু ওই যে বলে, মানুষ অভ্যেসের দাস। আমারও তাই হয়েছে। আজকাল কাজটা করে বেশ মজা পাই। অস্বীকার করব না আপনার কাছে, তবে ওই লোকগুলোকে যখন চিৎকার করতে শুনি, ওদের চামড়া আগুনে পোড়া গন্ধ নাকে আসে, ফোসকা ফাটার ‘ফট ফট’ শব্দ কানে আসে; আমি এক ধরনের মজা পাই।’
ডাক্তার বসু এইবার নিশ্চিত যে রমেনের মাথাটাই গেছে। বাবা মারা যাওয়ার শোকটা নিতে পারেনি বোধ হয়।
রমেন বলল,
‘আপনি বোধ হয় ভাবছেন যে, আমি খুব নিষ্ঠুর? আসলে, এই কাজের জন্যে নিষ্ঠুর হতেই হয়, বুঝলেন তো। Part of the job description. হা হা হা। সেইজন্যেই তো আমাদের কয়েক জনকেই বেছে নেয়া হয়। প্রথম প্রথম খুব অসুবিধে হয়েছিল। কিন্তু নিজের মনকে বোঝালাম যে, এরা তো আর জীবিত নয়। সবাই মৃত আর সবাই অপরাধী। কেউ খুনি, কেউ ধর্ষক, সব ঘৃণ্য কাজ করেছে। যদিও কয়েক জন তুলনামূলক কম দোষীও থাকে। তবে, ওই আর কি….সবাই কম-বেশি পাপী তো বটেই।’
একটা বড়োঘড়িতে রাত আটটা বাজার ঘণ্টা বাজল। সান্যাল উঠে দাঁড়িয়ে বল,
‘আসুন ডাক্তারবাবু, আজ আপনার জন্যে একটু আগেই শুরু করি।’
ডাক্তার বসু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘না, থাক। অনেক হয়েছে। আমি বেরোব। তোমার মেয়েকে ডেকে দাও, কথা আছে।’
‘ওকে এইসব বলবেন না যেন। আপনাকে বিশ্বাস করে বললাম, ডাক্তারবাবু। ওকেও আমি জানাব, তবে আরও অনেক বছর বাদে। আমার বাবা যেমন মরার আগে আমায় বলেছিল, আমিও তাই করব। আসুন, আসুন। নিজেই দেখে যান।’
ডাক্তার বসুও কিছুটা কৌতূহলী যে হচ্ছেন না, তা নয়। এরকম অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি কখনো হননি। তাই এইবার আর আপত্তি না করে সান্যালের পিছু পিছু তার বাবার ঘরে এসে ঢুকলেন। দরজা আটকে রমেন দ্রুত হাতে ইটের ফায়ারপ্লেসে কাঠকয়লা সাজাতে শুরু করল। যেন খুব মজার একটা কাণ্ড দেখাতে চলেছে সে।
কয়লা সাজাতে সাজাতে বলছে,
‘অস্বীকার করব না, ওই আত্মারা যখন যন্ত্রণায় ছটফট করে, বার বার ক্ষমা চায়, দয়া ভিক্ষা করে; নিজেকে আমার বেশ ক্ষমতাবান মনে হয়। মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি কিন্তু অন্যকে যন্ত্রণা দেয়া। কি বলেন?’
কাঠকয়লা সাজিয়ে তাতে আগুন দিল সান্যাল। বলল,
‘এই হল আমার নিজস্ব একটুকরো নরক! শয়তান সাধারণত বড়ো বড়ো অপরাধীদের নিজের জন্যে রাখে। আমরা ‘মিনিয়ন’-রা ছোটোখাটো অপরাধী পাই। তবে, মাঝে মাঝে কয়েকটা বড়োমাছ আসে। এই যে আগের বছরের ওই রেপ কেসটা মনে আছে? ওই ক্লাস সেভেনের মেয়েটাকে মেরে ফেলল স্কুল থেকে ফেরার পথে? ও, মনে নেই? তা আপনার আর দোষ কী, এ তো রোজই প্রায় হচ্ছে। যাই হোক, সেই লোকটা মরেছে কয়েক দিন আগেই। ওই লোকটাকে আমি পেয়েছিলাম আগের সপ্তাহে। লোহার শিকটা দিয়ে ওকে যখন আগুনের ওপর রেখে ঝলসাচ্ছিলাম…আহা!’
ডাক্তার বসুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল এক মুহূর্তের জন্যে। ঘোর লাগা মানুষের মতো একটা লোহার শিক দিয়ে চিমনির আগুনটা উসকে দিচ্ছে রমেন। বলল,
‘একটু বাদেই ওরা আসবে। সময় হল। ওই…ওই…দেখুন, দেখুন ডাক্তারবাবু।’
ডাক্তার বসু তাকালেন জ্বলন্ত ফায়ারপ্লেসটার দিকে। একী? এ কী দেখছেন তিনি?
একগাদা খুদে খুদে মুখ আগুনের মধ্যে থেকে ফুটে আছে! প্রতিটা মুখ যন্ত্রণাক্লিষ্ট! যেন চিৎকার করছে ওগুলো।
না, না! এ অসম্ভব! তিনি ভুল দেখছেন।
চোখ বন্ধ করলেন ডাক্তার বসু। দক্ষ ডাক্তার হিসেবে তাঁর নার্ভ খুবই স্ট্রং। তিনি নিজের মনেই নিজেকে বোঝালেন। তিনি যেটা দেখেছেন ওটা ‘ইন্ডিউসড হ্যালুসিনেশন’। সান্যালের কথা দুপুর থেকে টানা শুনে চলায় তাঁর মনে প্রভাব ফেলছে। সান্যাল উন্মাদ হয়ে গেছে। কিন্তু, ডাক্তার বসু পাগল নন। তিনি দুর্বল হবেন না।
চোখ খুললেন ডাক্তার বসু। তাকালেন আগুনটার দিকে। এইবার নিজের মনেই হেসে উঠলেন।
এতক্ষণ যে জিনিসগুলোকে মানুষের মুখ মনে হচ্ছিল সেগুলো আসলে কয়লা। এবড়োখেবড়ো টুকরোগুলোকে চোখ, নাক, মুখ মনে হচ্ছিল। ভালো করে দেখলেই ভুলটা বোঝা যায়। সম্ভবত এই একই ইলিউশন থেকে রমেনের মনেও এই উদ্ভট কল্পনার জন্ম হয়েছে।
উঠে দাঁড়ালেন ডাক্তার বসু। সান্যাল একমনে আগুনটা দেখে চলেছে। বসু বললেন,
‘ইউ নিড হেল্প, রমেন। তবে, আমার কাজ নয় এই চিকিৎসা করা। আমি ব্যবস্থা করব। আজকে চললাম।’
‘যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘আচ্ছা।’
আবার আগুনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল সান্যাল।
ডাক্তার বসু বেরিয়ে আসতে দেখতে পেলেন পিয়ালী তাঁরই অপেক্ষা করছে সামনের ঘরে বসে। ডাক্তারকে দেখে এগিয়ে এল উদ্বিগ্ন মুখে। বসু বললেন,
‘অবস্থা ভালো না। অদ্ভুত পাগলামি ঢুকেছে ওর মধ্যে। আমায় ডেকে ঠিকই করেছ। তবে, এর চিকিৎসা তো আমি করতে পারব না। কারণ সমস্যা শরীরের নয়, মনের। আমার পরিচিত এক মনোবিদের নাম্বার দিয়ে দেব বাড়ি গিয়ে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ কোরো আমার রেফারেন্স দিয়ে। ঠিক আছে?’
দু-এক কথায় ব্যাপারটা বুঝিয়ে সান্যালদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার বসু।
***
কল্যাণী হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ফিরছেন ডাক্তার বসু। প্রায় দু-ঘণ্টা লাগবে কলকাতা ঢুকতে। মানে, সাড়ে দশটা বাজবে।
মনে মনে রমেন সান্যালের কথা ভাবছেন বসু। কী হল তার? বাবার মৃত্যুর শক? কিন্তু, বাবার খুব বেশি ক্লোজ রমেন ছিল বলে তো ডাক্তার বসুর জানা নেই। তাহলে, কী এমন ঘটল এই কয়েক মাসে?
তা ছাড়া এরকম একটা উদ্ভট, আজগুবি অথচ ইল্যাবোরেট একটা গল্প ওর মাথায় ঢুকেছে। সেটা কি কোনো বই বা সিনেমা দেখে? রমেন একবার নিজেকে ‘মিনিয়ন’ বলেছে। বিদেশি সাহিত্যে শয়তানের সহকারী বা স্যাঙাতদের মিনিয়ন বলা হয় বটে। ওইসব থেকেই এরকম একটা আজগুবি ব্যাপারে ঢুকেছে।
স্বর্গ নরক। হুস! আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এইসব কথা কোনো সুস্থ মানুষ বলে? মাথাটাই গেছে সান্যালের।
আচ্ছা, যদি সত্যি এইসব থেকে থাকে, তাহলে তিনি নিজে কোথায় যাবেন? মানে…তিনি নিজেও তো খুব একটা সুবিধের লোক নন। নার্সিং হোমে মরা মানুষকে ভেন্টিলেশনে রেখে পেশেন্ট পার্টির থেকে টাকা নেওয়া, বিশেষ বিদেশি কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করা, এইসব তো আকছার করছেন। তাঁরই গাফিলতিতে দু-বার রুগি মারাও গেছে।
হঠাৎই চোখ ঝলসে উঠল ডাক্তার বসুর। উলটোদিক থেকে আসা বড়ো গাড়িটা ‘ডিপার’ না দিয়ে সোজাসুজি হেডলাইটের আলো ফেলেছে তাঁর চোখে। চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ায় গাড়ি হঠাৎই নিয়ন্ত্রণ হারাল। পাকারাস্তা থেকে নেমে সোজা ধাক্কা দিল একটা গাছে।
***
জ্ঞান ফিরতে ডাক্তার বসু টের পেলেন মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ খুলে একমুহূর্ত কিছুই দেখতে পেল না। পরমুহূর্তে সারাশরীরে প্রচণ্ড তাপ অনুভব করলেন বসু। নাকে পোড়া মাংস, চামড়া আর চুলের একটা বিশ্রী গন্ধ এল।
একী? চারিদিকে যে আগুন জ্বলছে! তাঁর চারিদিকে আগুন কে লাগাল? তিনি একা নন, আরও অনেকগুলো কালো, পোড়া মুখ তার আশেপাশে দেখা যাচ্ছে। চিৎকার করছে সবাই। নিজের শরীর দেখতে বা নাড়তে পারলেন না ডাক্তার বসু। হঠাৎ অনুভূতি ফিরে আসতেই অসম্ভব যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন। সারাশরীরে আগুনের ছ্যাঁকা লাগছে।
কেউ একটা এগিয়ে আসছে। ওপরের খোলা জায়গাটা থেকে একটা দানবাকৃতি লোক উঁকি দিচ্ছে। পরিচিত মুখ।
মুহূর্তে ডাক্তার বসু উপলব্ধি করতে পারলেন তিনি কোথায় আছেন। কালো কালিমাখা ইটের দেয়াল থেকেই বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে তিনি মুখ বের করে আছেন সান্যালের ফায়ারপ্লেসের ভেতরে।
সান্যাল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে লোহার শিকটা! আগুনে সেঁকে ওটার সুচালো মাথাটা লাল হয়ে আছে!
রমেন সান্যাল তাকে বলল,
‘ডাক্তারবাবু, দেখলেন তো? সব সত্যি! সব! আমার এই ছোট্ট একটুকরো নরকে আপনাকে স্বাগত!’
প্রচুর মানুষের যন্ত্রণার আর্তনাদ ছাপিয়ে অট্টহাসি হেসে উঠল রমেন সান্যাল।
