তৃতীয় ড্রয়ার
[এই গল্পের শুরুর কিছুটা অংশ আমার একটা খুব প্রিয় সিনেমা The Devil’s Advocate-এর প্রথম দৃশ্য থেকে ধার নিলাম।]
.
কোর্টরুম। নীল তাকিয়ে দেখছে তার প্রতিপক্ষ উকিল, সান্যালকে। মনে মনে ভাবছে, সান্যাল বুড়োকে কালো গাউনে ঠিক মোটা খাসির মতো লাগে। বুড়ো সান্যাল, জজসাহেবের দিকে চেয়ে উত্তেজিতভাবে বলছে,
‘এই লোকটি, যিনি নিজেকে শিক্ষক বলেন, তিনি আসলে এক ভদ্রলোকের মুখোশধারী পশু। এই মি বড়াল একজন পিডোফাইল। দিনের পর দিন স্কুলের মধ্যে এবং প্রাইভেটে পড়তে আসা ছাত্রীদের ওপর যৌন শোষণ চালিয়ে গেছে। গত ছয় জুন, সন্ধে ছ-টা নাগাদ আমার মক্কেল মি ঘোষের ক্লাস এইটে পড়া মেয়ে মিলি যায় বড়াল স্যারের কাছে প্রাইভেটে পড়তে। সেখানে তখনও অন্য ছাত্রছাত্রীরা না আসায় ঘরে একা পেয়ে তার সুযোগ নেয় বড়াল। সেদিন লজ্জায়, ঘেন্নায় মাত্র তেরো বছর বয়সি মিলি কিছুই বলতে পারেনি। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে, তার মায়ের সন্দেহ হয়। আর তখনই ঘটনাটা সামনে আসে সবার।
নীল তাকিয়ে একবার দেখল ওদিকে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মিলির দিকে। নিরীহ, শান্ত মেয়ে। সহজ শিকার। আর অপরদিকে দাঁড়িয়ে আছে আধা টাক পড়া আধবুড়ো বড়াল। চোখে তার শেয়ালের ধূর্ততা। নীলের একমুহূর্তের জন্যে মনে হয়, ফাঁসিয়ে দিই একে। বছরের পর বছর করতে থাকা নিজের কুকর্মের কথা বড়াল আগেই বলেছে রণজয়কে। অস্বীকার করেনি বা লুকিয়ে রাখেনি কিছু। বরং নীলের মনে হচ্ছিল যে, এক-একটি ঘটনা বেশ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে বড়ালের মজাই লাগছিল। রসিয়ে বিবরণ শুনিয়েছে এই লোকটা যে কীভাবে এক্সট্রা ক্লাস আর টিউশনের সুযোগ নিয়ে ছাত্রীদের সঙ্গে সে নোংরামো করত। শুনতে ঘেন্না করছিল নীলের। কিন্তু, এই বড়াল নীলের ল-ফার্মের পুরোনো মক্কেল। নীলের বস তাকে পরিষ্কার বলেছিল,
‘বড়াল আমাদের বিরাট বড়ো ক্লায়েন্ট। সেন্ট্রালের এক নেতার আত্মীয়। এর আগেও টুকটাক কেসে ফেঁসেছে বটে, তবে প্রতিবারই ভয় দেখিয়ে বা অর্থ দিয়ে শোনো নীল, বড়ালের জেল হওয়া আটকাতেই হবে। জানি কঠিন। কিন্তু, এটা মুখ বন্ধ করা গেছে ভিক্টিম পার্টির। কিন্তু, এইবার ঘুঘু বাজেভাবে ফাঁদে পড়েছে। করতেই হবে তোমাকে। মনে রেখো, এটাই তোমার সাফল্যের সিঁড়ি। এই কাজ করতে পারলে আমি নিজে তোমায় আমার ফার্মের সিনিয়র পার্টনার বানাব। ডোন্ট লুজ মাই বয়!’
শেষ কথাগুলো মনে আসতেই নীল নিজের মনে উঠতে থাকা সামান্য দ্বিধা ঝেড়ে ফেলল। নাহ্…এটাই সুযোগ। সে জানে তাকে কী করতে হবে। এতক্ষণ বুড়ো সান্যাল কীসব বলে গেছে। নীল শোনেনি। টুকরো টুকরো কয়েকটা শব্দ শুনেছে, যেমন— নোংরা, অপরাধী, সাজা, শয়তান ইত্যাদি। সান্যাল থামতে উঠে দাঁড়াল নীল।
‘ইয়োর অনার, আমি মিলিকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।’
‘প্রসিড।’
এগিয়ে গেল নীল তেরো বছর বয়সি মেয়েটির দিকে। দেখেই বোঝা যায় পুরো ব্যাপারটা অত্যন্ত চাপ সৃষ্টি করেছে মেয়েটির ওপর। নার্ভাস ব্রেকডাউনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মেয়েটি। একটু চাপ। ব্যস! মাথায় একটা কথা এল নীলের—’সহজ শিকার’।
‘মিলি, ৬ জুন, তোমার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল, একটু বলবে?’
মেয়েটি ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে একবার বড়ালের দিকে দেখে। তারপর চোখ নামিয়ে বলতে শুরু করে খুব ধীরে,
‘সেদিন আমি একা ছিলাম স্যারের বাড়িতে। আর কেউ তখনও আসেনি। স্যার আমায় বসতে বলে, বই বের করতে বলে। তারপর আমার পাশে এসে বসে। আমি…’
‘তখনই কেন উঠে যাওনি?’
‘আমি…আমি বুঝিনি।’
‘তারপর?’
‘তারপর স্যার হঠাৎ আমার হাঁটুতে হাত রাখে। আমি অবাক হয়ে যাই… তারপর…’
‘হ্যাঁ, বলো। তারপর?’
‘তারপর হঠাৎ আমার বুকে হাত রাখে…’
‘হাত রাখে? তুমি নিশ্চিত?’
মেয়েটি অবাক হয়ে দেখছে নীলের দিকে। নীল তাকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই বলে ওঠে,
‘পয়েন্ট টু বি নোটেড। তুমি বলছ তোমার বুকে হাত রাখে, অথচ লিখিত অভিযোগে লিখেছ মি বড়াল তোমার বুক চেপে ধরেন। হাত রাখা আর চেপে ধরা তো এক জিনিস না। কোনটা সত্যি, মিলি?’
‘আমি…আমি…’
‘কোন বুকটা চেপে ধরে? বাঁ, না, ডান?’
মুখ লাল হয়ে যায় মেয়েটির। নীল আবার বলে,
‘তুমি অভিযোগ করেছ যে, এরপরেই স্যার তোমায় জড়িয়ে ধরে এবং তোমার স্কার্টের ভেতর হাত দেন। আঙুল দিয়ে স্পর্শ করেন। কোন আঙুল?’
‘আমি…আমি…জানি না।’
‘সেকী? জানি না মানে? মাই লর্ড, প্লিজ নোট। মিলি, তুমি চিৎকার কেন করলে না?’
‘আমি…ভয় পেয়েছিলাম।’
‘এত ভয় যে, কোন আঙুল তোমার গোপনাঙ্গ স্পর্শ করল, সেটাও মনে নেই? চিৎকার করার কথাও মনে নেই? তুমি কি ব্যাপারটা উপভোগ করছিলে নাকি? কথা শুনে তো তাই মনে হচ্ছে।’
সান্যাল চেঁচিয়ে উঠেছে,
‘অবজেকশন!’
জজ তাকে সমর্থন করে বললেন,
‘মিস্টার বসু, আপনি অন্য প্রশ্ন করুন।’
‘বেশ। তাই হোক।’
মনে মনে নীল জানে যে, আর এই প্রশ্ন করার দরকারও নেই। সে যা চেয়েছিল, তা হয়ে গেছে। মেয়েটার নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছে। সে আর কিছুই বলতে পারবে না গুছিয়ে। শিকারকে চেপে ধরল নীল,
‘এটা কি সত্যি যে অঙ্কে তুমি আগেরবার ফেল করেছিলে? আর তোমায় ফেল করিয়েছিল বড়াল স্যার?’
‘হ…হ্যাঁ।’
‘এটাও কি সত্যি নয় যে, তুমি বলেছিলে নিজের বন্ধুদের কাছে যে, বড়াল স্যারের থেকে তুমি এই ফেল করানোর বদলা নেবেই?’
‘কিন্তু…’
‘হ্যাঁ কি না?’
‘হ্যাঁ… কিন্তু…’
‘তাহলে কি এটা সত্যি নয় যে, আগেরবারের রাগ তুমি পুষে রেখেছিলে আর এইবার মিথ্যে অভিযোগ এনে স্যারকে সেইবার তোমায় কম নম্বর দেয়ার সাজা দিতে চাইছ?’
আর বেশি বলতে হয়নি। কান্নায় ভেঙে পড়ে মিলি। আর এই মানসিক চাপ সে নিতে পারেনি। বড়ালকে প্রমাণের অভাবে বেকসুর ছাড়া হয়। পরের দিনই নীলের বস তার কথামতো নীলকে তার যোগ্য সম্মান দিয়েছে। আর এর ফলেই আজ তার এই নতুন অফিস।
কাচের জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখে নীল। পার্টিতে আজ একটু বেশিই ড্রিঙ্ক করেছে। এই বাইশতলার জানলা দিয়ে সারা শহর মনে হয় পায়ের নীচে… অতি ক্ষুদ্র। রাতের আলোগুলো নেশাচোখে ঝাপসা লাগছে। আয়েশ করে এসে বসে নীল তার নরম লেদারের চাকা লাগানো চেয়ারে। পা তুলে দেয় সামনের টেবিলে। আজ থেকে এই বড়ো অফিসঘর তার। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বসাককে সে হারিয়ে দিয়েছে দৌড়ে। আজ সে জিতেছে। বসাকের কালো মুখটা পার্টিতে দেখে নীলের মনে একটা আলাদা খুশি ফুটে উঠেছিল। ভাবছিল নীল। একবার সেই মেয়েটার মুখটাও মনে পড়ল। দুঃখ হল কি? না মনে হয়। এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডায় আর নেশায় তন্দ্রা আসে চোখে।
হঠাৎ একটা ফিসফিস আওয়াজ কানে আসে। প্রথমে মদের ঘোরেরই অংশ ভেবেছিল। কিন্তু, ফিসফিসটা আবার শুনতে পেল। এইবার চোখ খুলল নীল। না… ফিসফিসটা এখনও হচ্ছে। কই? কেউ তো নেই ঘরে। কিন্তু, আওয়াজটা আসছে ঘরের ভেতর থেকেই। হ্যাঁ…এই তো। বড়ো মেহগনি ডেস্কের তিন নম্বর ড্রয়ারটা থেকে আসছে ফিসফিসানি। সেটা খুলতে কেমন যেন ভয় করল নীলের। কিছুক্ষণ ড্রয়ারের হাতলে হাত রেখে বসে রইল। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে টেনে খুলল সেটা। ভেতরটা কেমন যেন জমাট অন্ধকার। ঘরের উজ্জ্বল বিজলিবাতিগুলোর আলো পৌঁছোতে পারছে না এই ড্রয়ারের ভেতর। কিছুক্ষণ ভালো করে তাকিয়ে থেকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখল নীল। ড্রয়ারের ভেতরে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। মনে হচ্ছে যেন একটা মানুষ। ক্ষুদ্রাকার একটি মানুষ হেঁটে বেড়াচ্ছে আর বিড়বিড় করছে। সেটাই ফিসফিস শব্দ সৃষ্টি করছে। ক্ষুদ্র লোকটার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু, নীলের মনে হল সেই ক্ষুদ্র লোকটা তাকে দেখেছে। আর দেখে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে। ভয় তো নীলও পেয়েছে। বন্ধ করে দিল ড্রয়ারটা।
.
২
পরের দিন সকালে দেরিতে ঘুম থেকে উঠে নীলের প্রথমেই মনে পড়ল কালকে রাতে অফিসের সেই তিন নাম্বার ড্রয়ারটার কথা। এখন দিনের আলোয় ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য লাগছে তার। কাল নেশাটা একটু বেশিই চড়ে গেছিল। উঠে ঝটপট রেডি হয়ে নিল নীল। শেভ করা গাল, নতুন সুটটা চড়িয়ে নিল। নিজেই ড্রাইভ করে অফিসে পৌঁছোল। লিফট নিয়ে সোজা বাইশতলায়, নিজের অফিসে। _ ড্রয়ারটা স্বচক্ষে না দেখা অবধি সে শাস্তিতে আজ কাজ করতে পারবে না। নিজের চেম্বারে পৌঁছে, জায়গায় বসে, নীল প্রথমেই টেনে খুলতে গেল ড্রয়ারটা। কিন্তু, পারল না। ওটা লক করা। ওপরের দুটো ড্রয়ার টেনে দেখল ওই দুটো খোলা যাচ্ছে। একদম নীচেরটাও খোলা যাচ্ছে। শুধু এই তিন নাম্বারটা বাদে। বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল নীল।
‘এই তিন নাম্বার ড্রয়ারের চাবি কই?’
‘কোনটা?’
‘এই তো তিন নাম্বার।’
‘চাবির গোছায় নেই?’
‘থাকলে কি তোমায় জিজ্ঞেস করতাম?’
রাগ হল নীলের। কথাটা একটু রুক্ষভাবেই বলল। উকিলদের রাগ হওয়া উচিত না। নীলের রাগ সাধারণত হয় না। আজ হল। এই সামান্য ব্যাপারে নীলের ধাতানি খেয়ে বেয়ারা লোকটা একটু বিস্মিত হয়েছে। নীলের লজ্জা হল। সকাল সকাল কী-এক সামান্য বাজে ব্যাপার নিয়ে মাথা গরম করছে। নীল মাথা ঠান্ডা করে বলল:
‘যাও, আর একটু খুঁজে দেখো যদি পাও।’
মন থেকে ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলল নীল। নেশার ঘোরে কী দেখতে কী দেখেছে। সেই নিয়ে মাথা আর ঘামাবে না। ফোকাস করবে কাজে। কারণ ওপরে ওঠা কঠিন বটে, কিন্তু, তার চেয়েও কঠিন হল ওপরে টিকে থাকা। একটু বাদেই বসের ফোন এল। তাকে একটা কাজে যেতে হবে হাইকোর্ট। বাকি সারাদিন নীলের সেখানেই কাটল। সন্ধের দিকে এসে ঢুকল আবার অফিসে। কয়েকটা কাগজ নিতে হবে। কাল সকালেই লাগবে। আজ নীলের মনে হল অফিসের এই ফ্লোরটা বড্ড শুনশান। এসি-র হাওয়া বড্ড ঠান্ডা। ঘরে ঢুকে একবার আড়চোখে দেখল টেবিলটার দিকে। না…কোনো আওয়াজ আসছে না। আলমারি থেকে দরকারি কাগজগুলো নিয়ে সবে কাচের দরজা খুলেছে, দাঁড়াতে হল নীলকে।
কারণ আবার আগের দিনের বিড়বিড় আওয়াজ আসছে তার কানে। কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকল নীল। না…আজ আর মনের ভুল নয়। আজ সে কোনোরকম নেশা করেনি।
কয়েক মুহূর্ত কী করবে ভেবে পেল না। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। টেনে খুলল তিন নাম্বার ড্রয়ারটা। আবার… আবার সেই অন্ধকার! অস্পষ্ট সেই অবয়ব। ড্রয়ারটা ঠিক যেন একটা ফাঁকা ঘর। শুধু একটা খাট আছে, আর তাতে লোকটা মাথা নীচু করে বসে ছিল। তাকে ড্রয়ারটা খুলতে শুনে মুখ তুলে তাকাল। তাকে দেখেই আরও বেশি কথা বলতে শুরু করেছে লোকটা। উত্তেজিতভাবে নীলকে কিছু বলছে। কিন্তু, নীল কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধুই বিড়বিড়, ফিসফিস অস্পষ্ট আওয়াজ। প্রচণ্ড ভয় করছে নীলের। হাত কাঁপছে। কে? কে এই লোকটা? তার ড্রয়ারের ভেতর কী করছে? এক ঝটকায় ড্রয়ারটা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল নীল। কাগজগুলো নেওয়ার কথাও তার মাথায় থাকল না।
***
পরের দিন কোর্টে নতুন কেসটা প্রায় হাতের বাইরে চলে গেল নীলের। তার কারণ, প্রথমত জরুরি কাগজগুলো সে জজের কাছে প্রস্তুত করতে পারল না। দ্বিতীয়ত, সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কালকের ঘটনায়। আরও একটা ব্যাপার ঘটেছে আজ কোর্টরুমে। আজ ভিড়ের মাঝে কোর্টে বসে ছিল মিলি। যতবারই নীলের দৃষ্টি কোর্টে বসে থাকা লোকেদের দিকে পড়েছে, ততবারই লক্ষ করেছে অদ্ভুত ঠান্ডাদৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা। এই দৃষ্টিতে অনেকটা শিকারি তার শিকারের দিকে চেয়ে থাকে। অপলক দৃষ্টি। স্থির, নিথর। কোর্টের প্রসিডিংসে ফোকাস করতে পারছিল না নীল। বার বার তার চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটার দিকে। সেশন শেষ হতে আর মেয়েটাকে দেখতে পেল না নীল।
কেসটা তো খারাপ জায়গায় গেলই, কিন্তু আরও বড়ো ধাক্কাটা নীল খেল একটু পরে। লাঞ্চটাইমে ক্যাফেটেরিয়ায় একটা টেবিলে খাবার নিয়ে বসে ছিল। মুখে খাবারের স্বাদ নেই। বার বার মনে পড়ছে ওই তিন নাম্বার ড্রয়ারটার কথা। কে ওই লোকটা? তার ড্রয়ারের ভেতর কী করছে? কী বলতে চায় সে?
হঠাৎ নিজের নাম শুনে তার চিন্তায় ছেদ পড়ল। তাকিয়ে দেখল বুড়ো সান্যাল দাঁড়িয়ে আছে তার সামনেই।
‘খুশি তো তুমি?’
‘হুঁ?’
‘খবরের কাগজে পড়েছ নিশ্চয়ই? পরশু রাতে মিলি গলায় দড়ি দিয়েছে। কী? মিলিকে মনে আছে তো? নাকি তাও নেই? যে ছোট্ট মেয়েটিকে সর্বসম্মুখে দাঁড় করিয়ে তাকে মানসিকভাবে নগ্ন করেছিলে কয়েক সপ্তাহ আগে। সেই মেয়েটা।’
‘ক….কী? কিন্তু…’
‘কনগ্র্যাচুলেশন তোমার পদোন্নতির জন্যে।’
.
৩
‘স্যার, ডাকলেন?’
‘আমি? হ্যাঁ…মানে…ড্রয়ারটা…’
‘কী স্যার?’
‘চাবি…এটার চাবি? এই তিন নাম্বারটা। আছে?’
‘না, স্যার। খুঁজে পাইনি।’
‘ও।’
‘ইয়ে….স্যার। আপনি ঠিক আছেন তো? মানে…বেয়ারা বলছিল আপনি নাকি কাল সারারাত অফিসেই ছিলেন?’
‘হ্যাঁ। আসলে রাত হলেই শুধু এটা খোলা যায়।’
‘কী? কোনটা?’
উত্তর দেয় না নীল। কী যেন চিন্তায় ডুবে যায়। একটু অপেক্ষা করে আর কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে আসে কমলেশ। কমলেশ গত ছয় মাস এখানে অ্যাসোসিয়েট হিসেবে এসেছে। নীল স্যারের নাম সে অনেক শুনেছিল। কিন্তু এখন মনে হয় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লোকটির কিছু সমস্যা হয়েছে। আজকাল নাকি কাজে মন নেই। অনেকগুলো নামিদামি ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হয়েছে। বিগ বস খেপে আছে। বেয়ারা রতনদার কাছে শুনছিল যে, আজকাল নাকি নীল স্যার রাতেও অফিসেই থাকে। চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে একটা ড্রয়ারের দিকে। কমলেশ নিজেও দেখেছে ব্যাপারটা। নীল স্যার আজকাল নিজের মনেই কীসব যেন কথা বলে। লোকে বলতে শুরু করেছে যে, কাজের চাপে নাকি নীলের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
***
নীলের আজকাল কেমন যেন নেশার মতো হয়ে গেছে এই ড্রয়ারের লোকটাকে দেখা। তার মনে হয় যেন লোকটাকে সে চেনে। কিন্তু, কিছুতেই চিনতে পারছে না। আলো পড়ে না তার মুখে। ঝাপসা। কিছু বলে তাকে। কিন্তু, সে শুধুই বিড়বিড়ানি শোনে। উদ্ধার করতে পারে না একটাও শব্দ।
তার ওপর আরও একটা ঘটনা শুরু হয়েছে। যখনই সে কোর্টরুমে কোনো কেস লড়তে যায়, সে শ্রোতাদের মাঝে মিলিকে দেখতে পাচ্ছে। তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আছে। সেই নিশ্চল, নিষ্পলক, স্থির দৃষ্টি। ভয় করে নীলের। প্রশ্ন করতে পারে না আর। সে কোর্ট যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। আজকাল মিলির সেই দৃষ্টি দেখলে নিজেকে মনে হয় ‘সহজ শিকার’।
এইসব কথা সে কাউকে বলে না। কী বলবে? সে একটি মৃত মেয়েকে রোজ কোর্টঘরে দেখতে পায়? সে রোজ রাতে তার নিজের ডেস্কের তিন নম্বর ড্রয়ারের থেকে ফিসফিসানি শোনে? তার ড্রয়ারের ভেতর একটি ক্ষুদ্র মানুষ বাস করে, যার মুখ দেখা যায় না?
একদিন বিগ বস তাকে ডাকল নিজের ঘরে। বলল:
‘নীল, আর ইউ ওকে?’
‘ই…ইয়েস স্যার।’
‘বাট আই অ্যাম নট। তুমি কি জানো আজ বটরারা তোমার নামে অভিযোগ করে আমাদের ল-ফার্ম থেকে অন্য ফার্মে শিফট করার হুমকি দিয়েছে আমায়।
নীল উত্তর দিল না। তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। বস আরও বলল:
‘তোমার নেগলিজেন্সের জন্যে আমি ক্লায়েন্ট হারাচ্ছি। দিস ইজ এনাফ, নীল। তুমি কি আমার কথা শুনছ?’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নীল বিড়বিড় করে বলল: ‘লোকটাকে আমি চিনি।’
‘কে? কোন লোক?’
‘ড্রয়ারের ভেতরের।’
‘কী? কী বললে?’
‘তিন নাম্বার ড্রয়ার।’
‘হোয়াট রাবিশ?’
‘স…সরি, স্যার।’
‘শোনো, নীল। তোমায় আমি নিজের সবচেয়ে শক্তিশালী ট্রাম্প কার্ড ভাবতাম। একদিন তুমি আমার পার্টনার হবে ভাবতাম। তাই তোমায় শেষ সুযোগ দিচ্ছি। শিশোদিয়ার কেসটা পরশু তুমি লড়বে। মনে রেখো, এ-ই শেষ সুযোগ। ত
***
গত দু-দিন তিন নম্বর ড্রয়ারটা একদম চুপচাপ। কোনো শব্দ আসেনি। নীল আজ তাই নিজেই খুলেছে সেটা। আজ ভেতরের লোকটা চুপ করে বসে আছে ঘরের এক কোনায় খাটের ওপর। মুখ তুলে নীলকে দেখল। নেমে এল খাট থেকে। পকেট থেকে কিছু একটা বের করল। কাঠিমতো কিছু। তারপরেই যেটা হল সেটার জন্যে নীল প্রস্তুত ছিল না। লোকটা সেই কাঠিমতো জিনিসটা নিজের গলার সামনে তুলে ধরল আর সমূলে বিধিয়ে দিল নিজের গলায়।
বিস্ফারিত চোখে নীল দেখে চলেছে পুরো ঘটনাটা। কাতরাচ্ছে লোকটা। রক্ত বের হচ্ছে গলগল করে লোকটার গলা থেকে। ড্রয়ারটা ভরে যাচ্ছে রক্তে। উপচে পড়ছে এইবার রক্ত! ভয় পেয়ে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিল নীল। কিন্তু, তবু রক্ত গড়িয়েই চলেছে ড্রয়ারের ফাঁক দিয়ে। নীলের ঘরের মেঝে ভরে যাচ্ছে ড্রয়ার থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তে।
চিৎকার করতে করতে নীল নিজের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসে। সারা অফিস ভরতি লোকের সামনে দিয়ে পাগলের মতো দৌড়ে বেরিয়ে যায় নীল।
***
কোর্টরুম। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে নীল। জজসাহেবের আদেশে উঠে দাঁড়াল। আজকের কেস তাকে জিততেই হবে। এগিয়ে গেল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অভিযুক্তর দিকে।
‘আপনার নাম?’
উত্তর এল না। সেদিকে তাকিয়ে দেখতেই অবাক চমকে উঠল নীল। এ কাকে দেখছে? এ তো ওই মেয়েটা দাঁড়িয়ে। মিলি! চোখ ঘোরাতেই ভয়ে কেঁপে উঠল নীল। ঘরের প্রতিটা মানুষের মুখ বদলে গেছে। জজ, উকিল, দর্শক, পুলিশ… সবার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে শুধু মিলি। দেখছে সেই নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকে। কয়েক ডজন চোখ তার দিকে। এতগুলো শিকারির দৃষ্টি নিবদ্ধ একজন শিকারের দিকে। সে তাদের সহজ শিকার।
‘না! না! আমি কিছু করিনি! আমায় ছেড়ে দাও!’
আতঙ্কে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে কোর্টরুমের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল নীল।
.
৪
মেন্টাল অ্যাসাইলামের একটা ছোটো অন্ধকার ঘর। ঘরে শুধু একটা খাট আর তার ওপর বসে আছে নীল। বিড়বিড় করছে সে। আজকাল নীল সারাদিন বিড়বিড় করে। সবসময় ভয়ে থাকে। হঠাৎ একটা আওয়াজ হল ছাদের দিকে। নীল তাকিয়ে চমকে উঠল। ঘরের ছাদটা সরে যাচ্ছে পেছন দিকে। ঘরের ছাদ থেকে একজন উঁকি দিল। যে উঁকি দিয়েছে সে নীল। মানে, আর এক নীল। দু-জন নীল একে অপরকে দেখে চমকে উঠেছে। যদিও ঘরের ভেতরের নীল জানে যে, সে বাইরের নীলের মুখ দেখতে পেলেও, অন্য নীল তার মুখ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। মুহূর্তে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় নীলের কাছে। এই মুহূর্তে সে আছে তার নিজের অফিসের তিন নাম্বার ড্রয়ারে। আর এতদিন নীল নিজের ড্রয়ারে দেখে এসেছে নিজের ভবিষ্যৎ, মানসিক হাসপাতালের এই ঘরটা।
ব্যাপারটা চিৎকার করে অন্য নীলকে বোঝানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু, অন্যজন শুধুই অস্পষ্ট বিড়বিড়ানি শুনল।
***
আজ নীলকে দেখে বেরোনোর সময় ডাক্তারের পকেট থেকে তার পেনটা পড়ে গেছে। তুলে রেখে দিয়েছে নীল সেটা। রোজ রাতে ছাদ সরিয়ে উঁকি দেয় আর এক নীল। গত দু-দিন ধরে ঘরের ভেতরের নীল আর তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছে। সে হার মেনে নিয়েছে। ডাক্তারকে সে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, সে আসলে তার অফিসের তিন নাম্বার ড্রয়ারের ভেতরে আছে। কিন্তু, বিশ্বাস করেনি কেউ। হার মেনেছে নীল। হার মেনেছে জীবন থেকে।
নিয়মমতো আবার ছাদ সরিয়ে উঁকি দিয়েছে অন্য নীল। নীল তাকে দেখে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। পকেট থেকে পেনটা বের করল। নিবের দিকটা সজোরে বসিয়ে দিল নিজের কণ্ঠনালিতে। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে।
***
গভীর রাত। বড়াল ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম ভেঙে গেল ফিসফিস শব্দে। বিছানার পাশের স্ট্যান্ড আলোটা জ্বালিয়ে তাকিয়ে দেখল ঘরের ভেতর। কই? কেউ নেই তো। তবে? ভুল শুনল?
নাহ্। এখনও আসছে হালকা শব্দটা। আওয়াজটা ঘরের ভেতর থেকেই হচ্ছে। শব্দটা লক্ষ করে এগিয়ে গেল বড়াল। আশ্চর্য। আওয়াজটা তার টেবিল ড্রয়ারের ভেতর থেকে আসছে…।
