পারফিউম – অভিজ্ঞান গাঙ্গুলী

পারফিউম

[বাড়ির টিভিতে ডিয়োডোরেন্টের একটা অদ্ভুত হাস্যকর বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম, আমি নিশ্চিত আপনারাও দেখেছেন। একটি ছেলে গায়ে ডিয়ো স্প্রে করতেই সব মেয়েরা ছুটে চলে আসছে তার দিকে। আচ্ছা, এরকম সত্যিই ঘটলে কি ভালো হত? এটা ভেবেই গল্পটা লিখে ফেলেছিলাম।]

.

‘ওজ পারফিউম। দিওয়ানা বনা দে।’

টিভির অ্যাডগুলো আজকাল এমন হয়েছে যে, ফ্যামিলির সঙ্গে বসে দেখা দায়। মা-বাবার সঙ্গেই বসে অনিমেষ একটা সিনেমা দেখছিল। সাধারণ ফ্যামিলি ড্রামা। মাঝখানে হঠাৎ অ্যাড শুরু হল ‘বডি স্প্রে’-র। অ্যাডের বিষয়বস্তু, একটি ছেলেকে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। বন্ধুর কথায় একদিন ওমুক ব্র্যান্ডের ডিয়োডোরেন্ট ব্যবহার করল। এবং, তার গন্ধে আকৃষ্ট হয়েই একদল সুন্দরী নিজেদের জামাকাপড় প্রায় খুলে ফেলে ছেলেটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাবতে অবাক লাগে যে, এইরকমের আজগুবি কনসেপ্টে আজকালকার প্রায় বেশিরভাগ প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এইরকম আজগুবি গল্পের ফাঁদে পড়ে লোকে এইসব কেনে?

বিরক্তির সঙ্গে অন্যদিকে তাকিয়ে এই কথাগুলো ভাবছিল অনিমেষ। তার বাবা-মাও নিজেদের মধ্যে নেহাতই অবান্তর কথা বলতে শুরু করেছে শুধুমাত্র তাদের নিজেদের এই অপ্রস্তুত ভাবটা কাটাতে। অনিমেষ বোঝে। এই বিজ্ঞাপনের কারণেই আজকাল সে মা-বাবার সঙ্গে টিভি দেখতে বসে না।

আহা! সত্যিই যদি মেয়েদের আকৃষ্ট করা এতটা সহজ হত। একটা আফশোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিমেষ। তার জীবনে এই একটা বড়ো আক্ষেপের জায়গা। সেই হাইস্কুল থেকে আজ কলেজ অবধি। মেয়েরা তাকে পাত্তা দেয়নি। অনিমেষকে দেখতে খারাপ না। কিন্তু, খুব ভালোও নয়। এতটা স্মার্ট বা পড়াশোনা জানাও নয় যে, চেহারার কমতিটা সেগুলো দিয়ে ঢেকে ফেলা যায়। সব কিছুতেই সে মাঝারি মানের।

অথচ মেয়েদের প্রতি, বা, বলা ভালোমেয়েদের শরীরের প্রতি তার অনেক কম বয়স থেকেই তীব্র আকর্ষণ। সাহস থাকলে এতদিনে অনিমেষ একটা হার্ডকোর ক্রিমিনাল হত। কিন্তু, আর সব কিছুর মতোই, সাহসের দিক থেকেও অনিমেষ মধ্যবিত্ত। তাই, সাধ থাকলেও সাহস নেই। মনটা নোংরা পঙ্কিল হলেও, বাইরে থেকে ভালোছেলে সেজে থাকে সকলের কাছে। ইসস! কত ভালো হত, যদি সত্যিই এরকম কোনো পারফিউম থাকত।

.

কথায় আছে— ‘যা চাইবে, ভেবে-চিন্তে।’ কারণ, মাঝে মাঝে আমাদের মনে মনে করা গোপন উইশগুলো কেউ শুনে নেয়। মাঝে মাঝে তা শোনে ভগবান। আর মাঝে মাঝে সেগুলো শুনতে পায়…।

পরের দিন সকালে কলেজ চলেছে অনিমেষ। বাস থেকে চৌমাথার মোড় স্টপেজে নেমে দশ মিনিটের হাঁটাপথ। বাসে তার ক্লাসের আদি আর নেহাও ছিল। হাত ধরাধরি করে বসে ছিল। সেটা খেয়াল করেছে অনিমেষ। হিংসায় জ্বলেছে। কিন্তু, শুধুই বরাবরের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে। তারা দু-জন বাস থেকে নামল না। তার মানে আজকেও কলেজ কেটে অন্য কোথাও যাবে দুটোয় মিলে।

রোজই বাস থেকে তার সঙ্গে কেউ-না-কেউ নামে। আজ সে ছাড়া কেউ নামেনি স্টপেজে। অনিমেষ খেয়াল করল আজ চৌমাথার মোড়টা যেন বড্ড ফাঁকা। কী ব্যাপার? কলেজ ছুটি নাকি? একটাও স্টুডেন্ট দেখা যাচ্ছে না কেন?

এই জুলাই মাসেও কেমন একটা ঠান্ডা হাওয়া এসে কাঁপিয়ে দিল তাকে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় রোদে ঝলসে যাচ্ছিল। কিন্তু, এখন সূর্যটা বড্ড যেন ফিকে রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। তেজ নেই।

দু-পা এগোতেই অনিমেষের চোখে পড়ল লোকটাকে। ঠিক চৌরাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটা কাচের শিশি। ছোটো ছোটো। তাতে কালো তরল। কিছু একটা বিক্রি করছে মনে হয়। লোকটার চুল কম, বেশ লম্বা ছিপছিপে গড়ন। এই গরমেও কালো ওভারকোটের মতো একটা পোশাক পরে আছে। তার দিকেই দেখছে লোকটা। হাসছে মিটিমিটি। এই ফাঁকা রাস্তায় এইবার তাকেই কিছু গছানোর তাল করবে।

পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল অনিমেষ। কিন্তু, তখনই একটা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা দিল অনিমেষের। গন্ধটা ঠিক বর্ণনা করা যায় না। মিষ্টি অথচ ঝাঁঝালো। তীব্র সুগন্ধ। একমুহূর্তের জন্যে আবেশে চোখ বুজে এল অনিমেষের। ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল গন্ধের উৎসর দিকে।

অদ্ভুত লোকটা এখনও একইভাবে তার দিকে চেয়ে মিট মিট করে হাসছে। তবে, এখন তার হাতের বোতলগুলোর মধ্যে একটার ছিপি খোলা। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, গন্ধটা ওই খোলা শিশিটা থেকেই আসছে। সারাভুবন জুড়ে যেন এই মুহূর্তে গন্ধটা ছড়িয়ে আছে। নিজের পায়ের ওপর আর বশ নেই অনিমেষের। এক পা, এক পা করে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। সামনাসামনি আসতেই লোকটা বলল,

‘কেমন?’

কিছু বলতে মুখ খুলল অনিমেষ, কিন্তু, কথা বেরোয় না। লোকটা বলে,

‘এর দু-ফোঁটা। ব্যস! সমস্ত মেয়ে তোমার প্রেমে পড়ে যাবে। তোমার কাছে আসতে চাইবে। যেভাবে মধুর গন্ধে মৌমাছি আসে। ঠিক সেভাবে। নাও। নিয়ে যাও। এক শিশি আতর। দাম মাত্র এক-শো টাকা।’

কখন যে অনিমেষের হাত তার জিসের হিপপকেটে চলে গেছে। আর কখন যে তার থেকে পার্স বের করে লোকটার হাতে এক-শো টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়েছে, সেটা অনিমেষ খেয়ালও করেনি।

কালো তরল ভরতি কাচের শিশিটা কাঁধের ব্যাগে ভরে কলেজের দিয়ে হাঁটা দেওয়ার সময়ে, শুধু পেছন থেকে লোকটার গলা কানে এল,

‘মনে থাকে যেন। ঠিক দু-ফোঁটা। তার বেশি নয়।’

.

পরের দিন কলেজ বেরোনোর আগে ঠিক দু-ফোঁটা পারফিউম জামার কলারে লাগিয়ে নিল অনিমেষ। আশ্চর্যের ব্যাপার যে, আজকে অনিমেষ কোনো গন্ধই পেল না। বুঝতে পারল যে, কালকে লোকটা তাকে মুরগি বানিয়ে এক-শো টাকা নিয়ে গেছে। অন্য কোনো আতরের গন্ধ শুঁকিয়ে তাকে জাল জিনিস বিক্রি করেছে।

প্রচণ্ড রাগ হল অনিমেষের। লোকটার ওপর এবং তার চেয়েও বেশি রাগ হল তার নিজের ওপর। ইসস! পরশুই না সে টিভি-তে অ্যাড দেখে এত কথা ভাবল যে, লোককে এরা বোকা বানায়। আর পরের দিনই কিনা সে নিজেই বোকা বনল এভাবে? এক-শো টাকা গচ্চা গেল। নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করল তার।

ধুর। এই কালো পারফিউম দিয়ে লাভ নেই। বুঝতে পেরে যথারীতি নিজের রোজকার ডিয়োডোরেন্টটাই চারবার ‘ফুস ফুস’ করে গায়ে মেরে বের হল রাস্তায়।

পার্থক্যটা লক্ষ করল বাসে পা রেখেই। ফাঁকা ফাঁকাই বাস। দু-একটা সিট খালিও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু, বাসে উপস্থিত প্রতিটি মেয়ের চোখ এই মুহূর্তে তার দিকে ঘুরে গেছে। প্রত্যেকেই যেন চোখ আধবোজাভাবে কিছু একটার ঘ্রাণ নিচ্ছে। মুখে তাদের রহস্যময় হাসি ফুটে উঠেছে। নেহা আর আদি আজও বাসে আছে। হাত ধরেই শেষ সিটে বসে ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে নেহার চোখেও আর সকলের মতোই মায়া মায়া ভাব। আদির হাত ছেড়ে দিয়েছে সে ইতিমধ্যেই।

বাসে বসে থাকা একজন মহিলা অনিমেষকে দেখে সরে বসল। জায়গা করে দিল তার পাশে বসার। মহিলা মধ্যবয়সি। কিন্তু, তার দু-চোখ এই মুহূর্তে অনিমেষের প্রতি শুধুই আমন্ত্রণ ছুড়ে দিচ্ছে। অপ্রস্তুতভাবে মহিলাকে পাশ কাটিয়ে পরের ফাঁকা সিটে বসল অনিমেষ।

আর পরক্ষণেই আদিকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে, নেহা উঠে এল সিট ছেড়ে। এগিয়ে এল তার দিকে। সোজা এসে বসল অনিমেষের পাশে।

নেহার চোখে চোখ রাখতেই বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল অনিমেষের। কারণ, নেহার চোখের তারাতে কামাতুর আহ্বান স্পষ্ট। বাসের বাকি মেয়ে ও মহিলাদের দৃষ্টি এখনও তার দিক থেকে সরে যায়নি।

অনিমেষ একবার তাকাল আদির দিকে। আদি বোকার মতো মুখ হাঁ করে চেয়ে আছে নেহা এবং তার দিকে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না যে কী ঘটছে।

কিন্তু, অনিমেষ বুঝতে পারছে কী ঘটছে। ওই পারফিউম! দ্যাট পারফিউম ইজ ম্যাজিক! সে গন্ধ না পেলেও মেয়েরা গন্ধ পেয়েছে। এবং, ঠিক ওই টিভিতে দেখানো অবাস্তব বিজ্ঞাপনের মতোই তার প্রতি সেই গন্ধে আকৃষ্ট হচ্ছে। যদিও বাসে উপস্থিত পুরুষদের এবং আদির বিস্ময়চকিত ভাব দেখে এটা স্পষ্ট যে, এই গন্ধ কোনো পুরুষের ওপর ইফেক্ট ফেলছে না।

আদি উঠে এসে নেহাকে প্রশ্ন করল,

‘হোয়াট ইজ দিস, নেহা?’

নেহা আদির দিকে চাইল। এবং, পরমুহূর্তে আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল অনিমেষের দিকে। আদি আবার বলল :

‘নেহা, কী করছটা কী?’

তার দিকে না তাকিয়েই নেহা উত্তর দিল,

‘ফাক অফ, লুজার। ডোন্ট ডিস্টার্ব আস।’

লজ্জায় আর রাগে লাল হয়ে উঠল আদির মুখ। কোনো কথা না বলে নিজের সিটে গিয়ে বসল।

এদিকে অনিমেষ তখন সপ্তম স্বর্গে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, এই মুহূর্তে নেহা তার হাতে হাত রেখে বসে। নেহা তার গার্লফ্রেন্ড? উফ! কী আনন্দ।

কিন্তু, পরমুহূর্তেই অনিমেষ ভাবল, না, না। শুধু নেহা কেন? নেহার চেয়েও সুন্দরী আর হট মেয়ের অভাব নাকি কলেজে? তাদেরকেও চাই এই অনিমেষের। হ্যাঁ। সবাইকে চাই তার।

মুখে একটা গর্বিত হাসি ফুটে উঠল অনিমেষের।

.

আগামী কয়েকটা দিন অনিমেষের জীবনের সেরা সময় কাটল। প্রতিটি মেয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে কলেজে। কিন্তু, অনিমেষ একটা ব্যাপার খেয়াল করল যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই সম্ভবত পারফিউমের গন্ধ কমে আসে। তাই সময়ের সঙ্গেই তার আকর্ষণ ক্ষমতা কমে যায়।

.

দু-দিন ছুটি ছিল। শনি আর রবিবার। অনিমেষ পরের দিন শুধুই ভাবল। এটা কী পারফিউম? এটা কি জাদু? নাকি, বিজ্ঞান? বিজ্ঞানের দিক থেকে ব্যাখ্যা করতে গেলে, এই আতরে নিশ্চয়ই ‘ফারমোন’ জাতীয় দ্রব্য আছে। এই কেমিক্যালের ফলেই মেয়েরা আকৃষ্ট হচ্ছে তার প্রতি।

যাক গে। এত ভেবে লাভ নেই। যতক্ষণ এই বোতলটা অনিমেষের কাছে আছে, ততক্ষণ পৃথিবী তার যেন হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীকেও সে বশ করতে পারে।

কিন্তু, হঠাৎই অনিমেষের মাথায় একটা আশঙ্কা আসে। যে লোকটা তাকে এই পারফিউম বিক্রি করেছে, তার কাছে তো আরও এরকম শিশি আছে! তবে? সেই লোকটার থেকে অন্যরাও এই আতর কিনতে পারে। তাহলে? না, না। এটা অনিমেষ হতে দেবে না। সবক-টা বোতল সে কিনে নেবে। আগামী যেদিনই দেখবে লোকটাকে, সেইদিনই কিনে নেবে সব। যদিও মাঝের কয়েক দিনে একবারও সে আর লোকটাকে দেখতে পায়নি কলেজের চৌরাস্তায়। কে জানে কবে আবার দেখা পাবে।

কিন্তু, অনিমেষকে ততদিন অপেক্ষা করতে হল না। রবিবার। বিকেলে অনিমেষ পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছে। সেখানেই দেখতে পেল লোকটাকে। হ্যাঁ। সেই লোক। একই পোশাক। হাতে একইভাবে কয়েকটা কালো পারফিউমের শিশি নিয়ে বিক্রি করছে পার্কের এককোনায় দাঁড়িয়ে।

তাড়াতাড়ি অনিমেষ এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। তাকে দেখে আগের দিনের মতোই মিট মিট করে হাসছে লোকটা। তার কাছে গিয়ে অনিমেষ সোজা বলল:

‘আমি আপনার সবক-টা শিশি কিনতে চাই।’

লোকটা দু-দিকে ঘাড় নাড়ল। অনিমেষ বিস্মিত হল। আবার প্রশ্ন করল,

‘মানে?’

লোকটা আবার ঘাড় নেড়ে বলল,

‘তোমায় আর বিক্রি করব না। অন্যদের বিক্রি করব।’

‘আমি টাকা দেব। বেশি টাকা দেব।’

‘না। তোমায় বিক্রি করব না।’

কথাটা বলেই লোকটা তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পেছন ঘুরে হাঁটা দিল। রাগে অনিমেষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত জ্বলে উঠল। তার দিকে পেছন ফিরে এগিয়ে যেতে থাকা লোকটার দিকে একবার দেখল অনিমেষ আর একবার আশেপাশে চাইল। আজ পার্ক একদম ফাঁকা। একটা কাকপক্ষীও চোখে পড়ছে না। তখনই কথাটা মাথায় এল অনিমেষের।

আচ্ছা, এখন যদি সে লোকটার থেকে সবকটা বোতল ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়? তবে? একজনও তো নেই আশেপাশে। কেউ দেখতে পাবে না।

মাটিতে পড়ে থাকা একটা বড়ো পাথরের দিকে চোখ পড়ল অনিমেষের। হাতে সেটা তুলে নিয়ে এগিয়ে গেল ধীরে ধীরে চলতে থাকা লোকটার দিকে কাছাকাছি পৌঁছে পাথর ধরা হাতটা ওপরে উঠিয়ে সজোরে নামিয়ে আনল লোকটার মাথা লক্ষ করে। একটা ভোঁতা শব্দ। আর, তারপরেই লোকটা লুটিয়ে পড়ল পার্কের ঘাসের ওপর

এইবার আতঙ্ক পেয়ে বসল অনিমেষের বুকে! শিট! শিট! শিট! এটা কী করল সে? লোকটার মাথা থেকে রক্ত বেরোচ্ছে। ঝুঁকে পড়ে নাকের কাছে আঙুল রাখতেই বুক কেঁপে উঠল অনিমেষের। নিশ্বাস পড়ছে না। মরে গেছে লোকটা!

দ্রুত আরও একবার চারিদিকে দেখে নিল অনিমেষ। নাহ্। কেউ নেই। অদ্ভুত নিস্তব্ধ চারিদিক। অনিমেষ ঝুঁকে পড়ে লোকটার কাঁধের ব্যাগটা তুলে নিল। আর কোনোদিকে না তাকিয়ে দৌড় দিল।

যখন বাড়িতে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকাল, তখনও জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল অনিমেষ। ব্যাগ খুলে দেখল। তাতে আরও কুড়িটা বোতল আছে।

.

কয়েকটা দিন আরও কাটল। অনিমেষ ভেবেছিল, পার্কের ঘটনায় শোরগোল ফেলবে। কিন্তু, সেইরকম কিছুই হয়নি। কয়েক দিন একটু ভয়ে ভয়ে ছিল অনিমেষ যে, এই বুঝি বাড়িতে পুলিশ এল। কিন্তু, ব্যাপারটা নিয়ে কেউ কোনো কথাই বলেনি। একটা সাধারণ হকারের জীবনের মূল্য বোধ হয় খুব সামান্যই।

আজকাল কলেজের ব্যাগে একটা শিশি নিয়েই ঘোরে অনিমেষ। নেশার মতো হয়ে গেছে ব্যাপারটা তার কাছে। কলেজের সবচেয়ে সুন্দরীরা তার জন্যে পাগল। জীবনের মজাই আলাদা এখন অনিমেষের।

.

সেদিন কলেজ থেকে ফিরছিল সে। বাসে বসে আছে। সকালে লাগানো পারফিউমের গন্ধ ফিকে হয়ে এলেও, এখনও বাসে থাকা মহিলারা তার দিকে চোরা চাউনি হানছে।

হঠাৎ বাসটার সামনে একজন পথচারী এসে পড়ায় বাস ড্রাইভার জোরে ব্রেক কষল। একমুহূর্তের জন্যে অনিমেষ যেন সামনে এসে পড়া লোকটাকে দেখতে পেল। কালো ওভারকোট, কালো টুপি। অনিমেষ মাথায় চোট খেত। রিফ্লেক্সে ব্যাগটা দিয়ে মাথা বাঁচাল। কিন্তু এর ফলে ব্যাগটা ধাক্কা লেগে ভেতরের কাচের শিশিটা ভেঙে গেছে। ব্যাগ থেকে কালো তরল গড়িয়ে অনিমেষের সারাগায়ে মাখামাখি। আফশোস হল অনিমেষের এতটা পারফিউম নষ্ট হল বলে। কিন্তু, তার চেয়েও বড়ো সমস্যা যে তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে সেটা পরক্ষণেই বুঝতে পারল। বাসের প্রতিটি মহিলা, বুড়ি-যুবতী নির্বিশেষে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে। বিপদ বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়িয়ে বাসের দরজার দিকে ছুটল অনিমেষ। বাস থেকে নামতে উঠে পড়ল বটে, কিন্তু এরই মধ্যে কয়েকটা আঁচড় তার শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। পথে নামতে, বাস থেকে মহিলারা নেমে আসছে। রাস্তা ধরে ছুটল অনিমেষ। কিন্তু, তাতে হিতে বিপরীত ঘটল। রাস্তায় চলতে থাকা প্রতিটি নারী দাঁড়িয়ে পড়েছে। শ্বাস টানছে তারা। দৃষ্টি ঘুরছে তাদের অনিমেষের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আছে জান্তব কামনা। অস্বাভাবিক উন্মাদ দৃষ্টি প্রতিটি চোখের তারায়। মুহূর্তে তারা হেঁকে ধরল অনিমেষকে। নির্দয় আঁচড় আর কামড়ে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।

ব্যাগটা একদিকে ফেলে দিতে কয়েক জন কিছুটা সেদিকে মনোযোগ দিল। সেই সুযোগে মেয়েদের ঠেলে দিয়ে কোনোভাবে তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে পড়ল। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে অনিমেষ। পেছনে এখনও অস্বাভাবিক আকর্ষণ তাড়িত হয়ে ছুটে আসছে মেয়েরা। আতঙ্কে, প্রাণের ভয়ে ছুটছে অনিমেষ। সে বুঝেছে যে, তাকে পেলে এই মেয়েরা তাকে ছিঁড়ে খাবে। তার শরীরের প্রতিটি মাংস তারা খুবলে নেবে। তাকে বাঁচতে হবে। দূরে যেতে হবে লোকালয় থেকে।

ছুটতে ছুটতেই বড়ো লোহার গেটটা চোখে পড়ল অনিমেষের। কবরখানা এই তো! এটাই তো চাই। এখানে লোক আসবে না। এখানেই সে সুরক্ষিত। গেট টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ে অনিমেষ। কবরখানার মাঝামাঝি এসে একটা কবরের ফলকের পেছনে লুকিয়ে ভয়ে ভয়ে গেটের দিকে চাইল অনিমেষ। নাহ। মেয়েরা এখান অবধি আসতে পারেনি। যাক! বাঁচল।

একটা কবরের ওপর বসে হাঁফাচ্ছে অনিমেষ। তাকে অনেকটা দৌড়াতে হয়েছে। তার দম শেষ। পারফিউম বিক্রেতা লোকটার সতর্কতাবাণীর কারণটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে। এই আতরের আকর্ষণ ক্ষমতা ভয়ানক। এখন তাকে শুধু কয়েক ঘণ্টা এখানেই থাকতে হবে। যতক্ষণ না এর প্রভাব কিছুটা কমে আসে।

কিন্তু, কালো পারফিউমের ক্ষমতা বড্ড কম অনুমান করেছে অনিমেষ। এর তীব্র আকর্ষণ ক্ষমতা সীমাহীন।

যে কবরটার ওপর বসে ছিল অনিমেষ, তাতে হঠাৎ যেন মৃদু কম্পন অনুভব করল সে। উঠে দাঁড়াল অনিমেষ। আওয়াজ আসছে একটা। চারিদিক থেকে আসছে। কিন্তু কীসের?

কয়েকটা কবর থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। মাটির তলা থেকে উঠে আসছে একে একে শুয়ে থাকা নারীরা। সীমাহীন আতঙ্ক নিয়ে অনিমেষ দেখছে এই নারকীয় দৃশ্য। কবরে ঘুমিয়ে থাকা আধপচা, গলা, পোকায় খাওয়া নারীদের লাশ উঠে আসছে। তারা চারিদিক থেকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে অনিমেষের দিকে। পারফিউমের গন্ধের তীব্র আকর্ষণ ক্ষমতা পার করেছে এই জগতের সীমানা। অন্ধকার মৃতদের জগৎ থেকে তার গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে উঠে আসছে নারীদেহ। তীব্র আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল অনিমেষ,

‘না! না! এ হতে পারে না।’

ছেঁকে ধরছে তাকে পচা দুর্গন্ধময় লাশগুলো। স্পর্শ করছে অনিমেষকে তাদের গলিত শরীর। ঠান্ডা ঠোঁটে চুম্বন করছে তার শরীরে। দাঁত বসাচ্ছে। ছিঁড়ে খাচ্ছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *