লাশঘর
[গল্পটার নাম রেখেছিলাম- ‘অভ্যাস’। পরে নামটা বদলে দিয়েছি। আমি সাধারণত এধরনের গল্প রাত জেগে লিখি। পাঠকদের অনুরোধ করব আপনারাও গল্পটা রাতে পড়বেন।]
.
আমি রতন বিশ্বাস। বয়স বাইশ। পড়াশোনা ক্লাস এইটের বেশি করিনি। না না, শুধুমাত্র টাকার অভাবে যে পড়তে পারিনি, তা নয়। সত্যি বলতে, অভাব থাকলেও সরকারি স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতেই পারতাম। কিন্তু, সত্যিটা হল যে, আমার নিজেরই আর পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল না।
এরপর কয়েক বছর টুকটাক কাজকম্মো করেছি। তবে সেগুলো যতটা না বাবা মাকে সাহায্য করতে, তার চেয়ে বেশি নিজের নেশার খরচ তুলতে। হ্যাঁ, ছোটো থেকেই বিড়ি ধরেছিলাম, তারপর আরও অন্য জিনিস। তবে, এখন আর ওইসব বেশি খাই না। শুধু বিড়িটা চলে।
বাবা চালায় ভ্যানরিকশা আর মা একটু সেলাইয়ের কাজ জানে। বাড়িতে ওই শাড়ির ফল্স-পাড় বসানোর কাজ করে। আর আমি এদিক-ওদিক কাজ করি। কখনো কোনো ঠোঙা বানানোর কারখানায় কাজ করেছি, তো, কখনো বাড়িতে বাড়িতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল দিয়েছি।
সব ঠিক চলছিল। অভাব থাকলেও ভাত জুটে যাচ্ছিল আমাদের। কিন্তু, গত বছর হঠাৎ ‘করোনা’ এল। সব বন্ধ হয়ে গেল মাসের পর মাস। মায়ের জমানো টাকা ফুরোল কয়েক মাসেই।
কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। জীবনে প্রথমবার পড়াশোনাটা আর একটু না এগোনোর জন্যে আফশোস হতে লাগল।
ঠিক এই সময়েই একটা হাত-বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল।
মর্গ্যান মর্গে ওয়াচম্যান নেওয়া হচ্ছে। পড়াশোনা আমার যা আছে, তাতেই চলে যাবে।
আমি বাড়িতে না জানিয়েই হাজির হলাম সেখানে। মর্গের চাকরি এমনিতেই বেশি লোক নিতে চায় না, তার ওপর কোভিডের আতঙ্ক। তাই বোধ হয় সহজেই হয়ে গেল চাকরিটা।
বাড়িতে এসে জানাতে, মর্গের চাকরি শুনে মা আপত্তি করল প্রথমেই। কিন্তু, সংসারের অবস্থার কথা ভেবে আর বেশি কথা বাড়াল না।
আমার ছোটো থেকেই মড়া নিয়ে শ্মশান-টশান যাওয়ার অভ্যাস আছে। তাই মড়া দেখে ভয় পাওয়ার বান্দা আমি না। তাই এই চাকরি নিয়ে আমার মনে কোনো ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাব নেই। তা ছাড়া, এই বাজারে আমার মতো ‘এইট পাশ’কে অন্য চাকরি দেবে কে?
প্রথম রাতে ডিউটি ছিল রাত দশটা থেকে। আমি পৌঁছে গেলাম এক ঘণ্টা আগেই। কারণ, আগের নাইট ওয়াচম্যান নাকি আমায় কিছু কাজ বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে।
দিনের বেলা ডিউটি করা ওয়াচম্যান, দিনু, আমায় চাবি দিয়ে বিদায় নিল। বলল,
‘সামু কাকা আসবে একটু পরেই। গতকালই তার চাকরির শেষ দিন ছিল। সে-ই তোমায় রাতের ডিউটি বুঝিয়ে দেবে।’
দিনু গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতেই প্রথমবার উপলব্ধিটা হল। এখন আমি একা রয়েছি মর্গে। না, একা নয়, বন্ধ দরজার ভেতর রয়েছে অনেকগুলো লাশ। ভয় লাগল কি? বোধ হয় না। আমার ভয় ব্যাপারটা ছোটো থেকেই নেই খুব একটা।
চেয়ারে বসলাম আর সামনের দ্বিতীয় চেয়ারে পা তুলে দিলাম। পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরালাম দেশলাই জ্বালিয়ে।
মাথার ওপর একটা টিউব জ্বলছে। পুরোনো টিউব। দু-দিক কালো হয়ে এসেছে। আলোটা কম। এই কম আলোয় বই পড়তে অসুবিধে হবে। তবে, আমার তাতে কী? আমি তো আর বই পড়ব না। বড়োজোর এই মোবাইলে ভিডিয়ো দেখব বা ইয়ারফোন লাগিয়ে রেডিয়ো চালাব।
মর্গ্যান মর্গ! নামটা বেশ মেলে। যেন কবিতা। ইন্টারভিউয়ের দিনই শুনছিলাম যে, এই মর্গ ব্রিটিশ আমলের থেকে ব্যবহার করা হত। সেই আমলের ডাক্তার মর্গ্যানের নামে এই মর্গ। এখন এটা প্রাইভেট মর্গ হয়েছে। সরকারি মর্গে জায়গার অভাব পড়লে এখানে বডি আসে।
‘তুমিই রতন?’
হঠাৎ ডাকটা শুনে চমকে উঠলাম! হকচকিয়ে তাকিয়ে দেখি একটা বুড়ো এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। ফোকলা দাঁতে হেসে বুড়ো বলল,
‘ভয় পেলে নাকি?’
‘না, না। একটু চমকে গেছিলাম। আপনিই সামু কাকা?’
‘হ্যাঁ।’
একে কাকা না বলে দাদু বলা উচিত। একেবারে থুড়থুড়ে বুড়ো যাকে বলে, এই লোকটা তাই। অথচ গতকাল সে রিটায়ার হয়েছে মানে বয়স ষাট বা পঁয়ষট্টির বেশি হওয়ার কথা নয়। বুড়োর বয়সে জল নয়, পুরো কেরোসিন মেশানো আছে মনে হয়! এর বয়স কম করেও আশি না হলেই নয়।
সামনের চেয়ার থেকে পা নামিয়ে সেটা বাড়িয়ে দিলাম।
‘বসুন, কাকা।’
বুড়ো এসে বসল চেয়ারে। কিছুক্ষণ আমায় দেখে বলল,
‘পড়াশোনা কতদূর?’
‘ক্লাস এইট।’
‘হে হে! আমার চেয়ে ডাবল তুমি। আমি ফোর। তা, বাড়িতে কে কে আছে?’
‘মা, বাবা আর আমি।’
বুড়ো নিজের পকেট থেকে এইবার একটা কৌটো বের করল। বুঝলাম খইনি ওটা। আমার দিকে কৌটো বাড়িয়ে দিতে আমি না করলাম। বুড়ো বোধ হয় তাতে একটু দুঃখ পেল। বলল,
‘আজকালকার ছেলেরা আবার খইনি খায় না।’
এমনভাবে বলল যেন সেটা বিশাল একটা ভুল কিছু ব্যাপার। আমার বেশ হাসি পেল।
সামু বুড়ো কিছুটা খইনি বাঁ-হাতের তালুতে নিয়ে, ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে দলাইমলাই করে নীচের ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজে দিল। দিয়ে বলল,
‘চলো, তোমায় ভেতরটা দেখিয়ে নিয়ে আসি সময় থাকতে।’
বলে উঠে দাঁড়াল বুড়ো। আমিও দাঁড়ালাম। বুড়ো আমার থেকে চাবির গোছা নিয়ে এক-একটা চাবি কীসের তা বোঝাতে লাগল। সবকটা চাবি বুঝিয়ে বুড়ো দরজা খুলল হিমঘরের।
দরজার নীচ দিয়ে এতক্ষণ হালকা যে ঠান্ডাটা আমার হাওয়াই চটি পরা পায়ে লাগছিল, সেই ঠান্ডা এবার গায়ে এসে লাগল। সঙ্গে একটা বোটকা গন্ধ।
বুড়ো সেইসব টের পেল বলে মনে হল না। তার অনেক বছরের অভ্যাস এই ঠান্ডা আর গন্ধ। ঘরে ব্যাঙ্কের লকারের মতো সারি বেঁধে তাক। মাঝে একটা টেবিল, এতেই কি ময়না হয়?
বুড়ো দরজার পাশে তেপায়ায় রাখা একটা জাবদা খাতা তুলে নিল। এতে বডি জমা বা রিলিজের এন্ট্রি করা হয়। এটাই আমার মূল কাজ। বুড়ো আমায় বোঝাতে থাকল কীভাবে খাতার কাজ করতে হবে, কী কী লিখে রাখতে হবে, কার সই কোথায় করতে হবে ইত্যাদি।
এরপর একটা ট্রে টেনে বের করে দেখাল আমায় বুড়ো। একটা লাশ আছে তাতে। এক বৃদ্ধের বডি। বুকের মাঝ বরাবর কাটা, মানে ময়না হয়েছে।
সব বুঝে নিয়ে আমি বুড়োর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম। আমি দরজায় চাবি দিয়ে বসলাম আবার নিজের জায়গায়। বুড়ো হাতে একটা থলে নিয়ে এসেছিল। দেখি সেটা থেকে একটা ছোটো ফ্লাস্ক বের করল। বলল,
‘আজকের রাতটা আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’
‘না, না! কোনো প্রয়োজন নেই। আমি ভয়-টয় পাই না।’
আমি হেসে বললাম।
বুড়ো আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, দুটো কাগজের কাপ বের করে দু-কাপ চা ঢালল। একটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘আমিও তাই ভাবতাম নিজের বিষয়ে। কিন্তু, সবসময়ে সব কিছুতে ভয় না থাকা ভালো কথা নয়। কিছু জিনিসে ভয় পাওয়াই উচিত। বিশেষ করে এই মর্গ্যান মর্গে।’
আমি কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম,
‘কেন? ভৌতিক কিছু নাকি?’
কিন্তু, উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরের লোহার গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে হর্ন দিল। তাকিয়ে দেখলাম, একটা অ্যাম্বুলেন্স।
চা ফেলে, চাবি নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বুড়োও সঙ্গে গেল। দেখলাম অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার চেনে বুড়োকে
‘সামু কাকা, এ কে?’
ড্রাইভার প্রশ্ন করতে বুড়ো উত্তর দিল,
‘আমি রিটায়ার নিয়েছি। এখন এ-ই নাইটগার্ড এই মর্গের। এর নাম রতন। তা, কার বড়ি?
একজন হেল্পার, আমি আর বুড়ো মিলে পেছন থেকে একটা মৃতদেহ ধরে নামালাম। আলো পড়তেই, দৃশ্য দেখে গা গুলিয়ে উঠল।
এক মহিলার মৃতদেহ। মাথার এক পাশ খুলে হাঁ হয়ে রয়েছে। সাদা ঘিলু দৃশ্যমান। বাজেভাবে মাথাটা থেঁতলে আছে!
হেল্পারটি বলল,
‘একটু আগেই বাইপাসে একটা লরি পিষে দিয়ে গেছে। বাজে ব্যাপার! কালকের আগে শনাক্ত হবে না।’
আমার গা গুলিয়ে উঠল। সেটা বুঝতে পেরেই ড্রাইভার বিশ্রী হেসে বলল,
‘গা গুলিয়ে উঠল নাকি? এইসব তো আমাদের রোজকার ব্যাপার। হে হে! কয়েক দিন থাকো, অভ্যাস হয়ে যাবে। কি বলো, কাকা?’
বুড়ো নিজের মনেই বলল,
‘হ্যাঁ। সব অভ্যাস হয়ে যায়।’
ধরাধরি করে আমরা মৃতদেহ একটা ট্রে-তে তুলে রাখলাম। খাতায় এন্ট্রি করলাম আমি সব। অ্যাম্বুলেন্স বিদায় নিল।
বুড়ো দেখলাম বার বার দেওয়ালের ঘড়ির দিকে দেখছে। এখন প্রায় বারোটা বাজতে চলল। বুড়ো বোধ হয় আশেপাশেই থাকে, কেটে পড়বে। আমায় এমনি বলেছিল আজ রাতে থাকবে।
ট্রে ঢুকিয়ে দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ, মৃতদেহর বাজেভাবে রক্তাক্ত, বিকৃত মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ট্রে-টা ঠেলে দিতে দিতে বুড়ো বিড়বিড় করে কী জানি বলল। স্পষ্ট শুনতে পেলাম না। তবে মনে হল যেন বলল, ‘আজ এ জ্বালাবে।’
হাত-টাত ধুয়ে, আবার বেরিয়ে এসে বসলাম। আমি ভেবেছিলাম বুড়ো কেটে পড়বে এইবার। কারণ, সব তো বুঝিয়েই দিয়েছে। হাতে হাতে নতুন লাশের এন্ট্রিও দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু, বুড়ো গেল না। বসল আবার।
আগের চা জুড়িয়ে গেছে। তাই ওটা ফেলে, দ্বিতীয়বার কাপে গরম চা ঢেলে তাতে চুমুক দিল বুড়ো। কিছুক্ষণ দু-জন চুপচাপ চা খেলাম। এরপর বুড়ো বলল,
‘তোমায় কয়েকটা কথা বলি। কথাগুলো তোমার জানা প্রয়োজন, যেহেতু এখন থেকে প্রতি রাতেই তোমাকে এখানে কাটাতে হবে, যেভাবে আমি কাটিয়েছি গত পঁয়ত্রিশটা বছর। এই মর্গ্যান মর্গের একটা সমস্যা আছে।’
‘কী সমস্যা?’
‘আগে শোনো এই মর্গ্যান সাহেব কে ছিলেন। এইসব অবশ্য আমিও অন্যের মুখেই শুনেছি। ব্রিটিশ আমলের এক ডাক্তার ছিলেন মর্গ্যান। খুবই নামি মানুষ ছিলেন। কিন্তু, আসলে তাঁর ছিল এক ভয়ংকর নেশা। তিনি মানুষের ওপর বিভিন্ন নৃশংস পরীক্ষা চালাতেন। সেইসময়ে পরীক্ষা চালানোর মতো গিনিপিগ পাওয়াটা কঠিন ছিল না। দেশি নেটিভদের ধরে এনে তাদের ওপর পরীক্ষা চলত রাতের পর রাত। আর তারা মারা গেলে, অন্য বেওয়ারিশ লাশের সঙ্গেই তাদের লাশেরও গতি হয়ে যেত।
কিন্তু, একদিন সকালে এসে কর্মচারীরা দেখল মর্গের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। কিছুতেই খুলছেন না সাহেব। অনেক ধাক্কাধাক্কি দিয়েও দরজা না খুলতে কিছু অঘটন ঘটেছে ভেবে লোকে দরজা ভেঙে ফেলে। কিন্তু, ভেতর খালি। মর্গ্যান সাহেবকে পাওয়া গেল না সেখানে। তাঁর সাইকেল বাইরে পড়ে আছে দেখে তারা বুঝল যে, সাহেব বাড়ি ফিরে যাননি।
অনেক খুঁজে শেষে সাহেবকে পাওয়া গেছিল। কোথায় জানো? মর্গেরই একটা লকারে। কেউ বা কারা যেন প্রবল আক্রোশে সাহেবের হাত, পা, ঘাড় ভেঙে দলা পাকিয়ে একটা ড্রয়ারে তাঁর মৃতদেহ ভরে রেখেছে। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয় হল, মর্গের দরজা ছিল ভেতর থেকে বন্ধ।
এর পরেই মর্গ বন্ধ করে দেয় ইংরেজ সরকার। কেন বন্ধ করে দেয় জানা ছিল। না কারুর। অনেকেই বলত ভৌতিক কোনো কারণে। কিন্তু প্রমাণ কেউ পায়নি বহু বছর। যতদিন না…’
থেমে গেল বুড়ো। হাতের চা শেষ হয়েছে। বুড়ো আরও একবার টেবিলের ওপরের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা ঘড়িটার দিকে দেখল। আমিও দেখলাম। রাত একটা বেজে পাঁচ মিনিট।
বুড়ো আবার কথা শুরু করল,
‘বহু বছর এভাবেই পড়ে ছিল এই মর্গ। স্বাধীনতার পর এটা ভারত সরকারের সম্পত্তি হয়। তার পরেও এটা এভাবেই ছিল। এরপর পঁয়ত্রিশ বছর আগে এটার লিজ নেয় একটা বেসরকারি সংস্থা। নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, মড়া রাখার লোহার নতুন লকার ইত্যাদি বসিয়ে আবার শুরু করে এই মর্গ। আর তাতেই প্রথম নাইটগার্ডের চাকরিতে বহাল হলাম আমি।
সাহস ছিল অনেক, আর তার চেয়েও বেশি ছিল টাকার দরকার। অনেকটা তোমারই মতো। ভয় কাকে বলে জানতাম না। কিন্তু, তারপর একদিন…’
কিছুটা থেমে আবার বুড়ো বলল,
‘প্রথম দু-দিন কোনো মড়া এল না। আজকের মতো এত লোক মারা যেত না সেইসময়ে। আর মারা গেলেও, ময়না এত বেশি হত না।
কিন্তু, তৃতীয় দিন একটা লাশ এল। একটা যণ্ডামার্কা লোকের লাশ। চিনতে অসুবিধে হল না। হাতকাটা আলি। একসময়ে এলাকার ত্রাস ছিল সে। রাজনৈতিক দলের হাতও ছিল মাথার ওপর।
মৃতদেহর বাঁ-হাতটা কনুইয়ের নীচ থেকে নেই। তবে, সেটা পুরোনো ক্ষত নতুন ক্ষতগুলোতে এখনও রক্ত জমাট বেঁধে আছে। দেখলাম তিনটে গুলি করা হয়েছে তাকে। দুটো বুকে আর তৃতীয়টা ডান চোখে। গুলি চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছনের খুলি ফাটিয়ে বেরিয়ে গেছে। আলির মাথার এদিক থেকে ওদিক দেখা যাচ্ছে গুলির ফুটো বরাবর।
মৃতদেহ নিয়মমতো একটা ট্রে-তে ভরে ঢুকিয়ে রাখলাম হিমঘরে। তারপর বেরিয়ে এসে বসলাম। এই এইখানেই, যেখানে তুমি এখন বসে আছ। চোখ লেগে গেছিল। প্রথম প্রথম তো, তাই রাতজাগার অভ্যেস হয়নি তখনও।
হঠাৎই একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। অনেকটা দরজা ধাক্কানোর শব্দ। চোখ খুলে প্রথমে কান পাতলাম। ভাবলাম বুঝি গেটে কেউ এসেছে। কিন্তু না, কেউ নেই। কান করে শুনে মনে হল শব্দটা আসছে ভেতর থেকে। মানে, মর্গের বন্ধ দরজার ভেতর থেকে! ভুল শুনছি? উঠে গিয়ে দরজায় কান পাতলাম। আর তাতেই এইবার স্পষ্ট শুনতে পেলাম। আওয়াজটা ভেতর থেকেই আসছে। ক্রমাগত, একভাবে কেউ একটা ধাক্কা দিচ্ছে লকারের দরজায়!
সেটা ছিল বছরের শেষের দিকের সময়। বাইরে তখন বেশ ঠান্ডা। কিন্তু বিশ্বাস করো, সেই ঠান্ডাতেও ঘেমে উঠেছিলাম আমি!
একবার ভাবলাম, থাক! খুলব না আমি দরজা! ধাক্কাতে থাক যে-ই হোক! কিন্তু, পরক্ষণেই একটা অন্য সম্ভাবনা মাথায় এল। এমন নয় তো যে, কেউ হয়তো আসলে মারা যায়নি, ভুল করে লাশঘরে এনে ফেলেছে? এখন তার জ্ঞান ফিরে এসেছে? কিন্তু, তাই-বা কী করে হয়? এক ওই হাতকাটা আলি বাদে আর কারুর মৃতদেহ তো নেই! তবে? কী করব বুঝতে পারছিলাম না, খুলে দেখব? নাকি, দেখব না?
কথা থামিয়ে বুড়ো আরও একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে দেখল। আমি ততক্ষণে একটা বিড়ি ধরিয়েছি। বুড়োকেও একটা বিড়ি দিয়ে বললাম,
‘তারপর? দরজা খুললেন? নাকি, আর খোলেননি?
বুড়ো আমার বাড়িয়ে দেওয়া জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি থেকে নিজের বিড়িটা ধরিয়ে বলল,
‘তুমি আমার জায়গায় থাকলে কী করতে ছোকরা?
আমি বললাম,
‘অবশ্যই খুলে দেখতাম। নাহলে ভয় কাটবে না। কী ঘটছে সেটা নিজে না দেখলে সেটার ভয় কাটবে না মন থেকে।’
বুড়ো বিড়ির ধোঁয়া বুকে টেনে কেশে উঠল বিশ্রীভাবে। বুড়োর হাসির মতোই কাশিটাও বিশ্রী। কাশি থামতে বলল,
কিছু কিছু সময়, ভয় কাটাতে গিয়ে আরও বেশি তাতে জড়িয়ে যেতে হয়। কিন্তু, আমি তখনও সেটা জানতাম না। তোমারই মতো আমিও ঠিক তাই করলাম। ঠিক তোমার মতো ভেবেই চাবির গোছা থেকে চাবি নিয়ে দরজা খুলে ফেললাম।
আর তখনই লণ্ঠনের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম। ঠিক যে লকারটায় একটু আগে হাতকাটা আলিকে শুইয়ে দিয়ে এসেছি, সেটার ভেতর থেকে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে! ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছে। সঙ্গে একটা অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ! ভেতর থেকেই আসছে।
মড়া রেখে সেই ড্রয়ার লক করিনি আমি! মড়াকে লক করার প্রয়োজন বোধ করিনি। আর, সেটাই ভুল করেছি। কারণ ধাক্কায় লকারের দরজা ফাঁক হয়ে গেছে অনেকটা।
আমি এই দরজার চৌকাঠে হাতে লণ্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি! নড়তে পারছি না! আতঙ্ক, ভয় এই শব্দগুলো যা এতদিন আমার অজানা ছিল, সেগুলো সেই রাতে আমি প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলাম! হলুদ টিমটিমে আলোয় দেখলাম সেই ড্রয়ারটা খুলে বেরিয়ে আসছে হাতকাটা সেই মৃতদেহটা! একটা চোখে মরামাছের মতো ঘোলাটে দৃষ্টি, অন্য চোখের জায়গায় একটা বড়ো গর্ত! তা দিয়ে মাথার পেছনের লোহার দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। দেহের ওপরের অংশ ঝুলে নেমে আসছে ওপরের তৃতীয় সারির লকার বেয়ে! মুখে একটা অদ্ভুত জান্তব গোঙানির আওয়াজ!
আমি পাগলের মতো বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিই বাইরে থেকে। তালা মারতে আরও সময় যায়, কারণ আমার হাত থরথর করে কাঁপছে তখন! সেই রাতে আমি পালিয়ে গেছিলাম এখান থেকে। মাঝরাস্তায় ফুটপাথের আলোয় বসে কেঁপেছিলাম সারারাত! ভয় কাকে বলে বুঝেছিলাম।
তারপর ভোরের আলো ফুটতে ফিরে এলাম। দেখলাম সব শান্ত। ভয়ে ভয়ে দরজা খুললাম মর্গের।’
‘আর দেখলেন যে, মড়া নিজের জায়গায় আছে। তাই তো?’
বুড়োর গল্পের মাঝেই আমি বলে উঠলাম। বুড়ো উত্তর না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি আবার বললাম,
‘আপনি বোধ হয় অল্প বয়সে শুধু খইনি নয়, বড়ো কিছুর নেশাও করতেন, কাকা। তাই না? সেরাতেও টেনেছিলেন। তাই তো?’
বুড়ো আমার চোখে চোখ রেখে বলল,
‘তোমরা কচি ছোকরারা মনে কর তোমরা সব জানো, তাই না? তবে শুনে রাখো, আমি দরজা খুলে দেখেছিলাম ঘরের মাঝখানে পড়ে রয়েছে হাতকাটা আলির লাশ। সারাঘর জুড়ে শুকনো রক্তের দাগ। বুকের ওপর ভর করে সারারাত ওই মৃতদেহ ঘুরে বেড়িয়েছে ওই মর্গে। কিন্তু এখন সে আবার নির্জীব একটা লাশ ছাড়া কিছুই নয়।
আমি জানতাম আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই আমি আবার ওই লাশ তুলে জায়গামতো ভরে দিই। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে ফেলি। কাউকে কিছু বলিনি আমি।
টানা পঁয়ত্রিশটা বছর এই ভয়ানক কথাটা গোপন রেখে কাজ করে গেছি। মর্গে যতখানি অপঘাতে মরা লাশ আসে, তারা বেঁচে ওঠে রাতে। এই মর্গে কিছু একটা আছে, কোনো একটা অভিশাপ, যার ফলে অপঘাতে মরা লাশ জেগে ওঠে! বেরিয়ে আসতে চায় ওই লোহার ঠান্ডা লকারগুলো থেকে! আমার ধারণা মর্গ্যান সাহেবকেও খুন হতে হয়েছিল তারই কোনো এক হতভাগ্য শিকারের হাতে। ঘটনাটা সেইসময়ের লোকেরা পুরোটা জানায়নি কাউকে। কিন্তু, সেই কারণেই এই মর্গ তারপর থেকে বন্ধ করে দেয় ইংরেজরা।’
‘আপনি বলতে চাইছেন এরকম আরও ঘটেছে?’
‘হ্যাঁ। আমার চাকরিজীবনের বেশিরভাগ রাতেই এটা ঘটে এসেছে। তবে, সেই রাতের পর থেকে আমি কোনোদিন আর কোনো লকার বন্ধ করতে ভুলিনি। অপঘাতে মৃত কোনো লাশ এলেই সেটা রাতের একটা বিশেষ সময়ে জেগে ওঠে। লকারের লোহার দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দেয়, বেরিয়ে আসতে চায় ঠান্ডা লোহার বাক্স থেকে!
যত ভয়ংকরভাবে মৃত্যু, ততই বেশি তাদের ছটফটানি! আমার অভ্যাস হয়ে গেছিল। প্রতি রাতে একই ঘটনা! তাই পরের দিকে সয়ে গেছিল। ছোটোবেলায় পড়েছিলাম, মানুষ অভ্যেসের দাস। কথাটা সত্যি।
কিন্তু, মাঝে মাঝে ব্যাপারটা বেশি হয়ে যেত। সেই যে সেবার, কয়েক বছর আগে ওই…ওই গ্রিনভিচ হাসপাতালে আগুন লাগল, সেবার অনেকগুলো, একুশটা আগুনে ঝলসানো লাশ এসেছিল মর্গে। সেই রাত আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না! সারারাত আমি দু-হাতে কান চেপে বসে থেকেছি! কী ভয়ংকর বীভৎস সেই লাশেদের আর্তনাদ, তীব্র যন্ত্রণামাখা চিৎকার আর ক্রমাগত ধাক্কা! সারারাত চলছিল সেগুলোর আওয়াজ! ওই রাতটা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
ত্রিশ বছর ধরে প্রায় প্রতি রাতে এই অবস্থায় আমি নাইট ডিউটি দিয়েছি। তাতেই তো, আমি বুড়িয়ে গেলাম। তবে ওই যে বললাম, অভ্যাস হয়ে গেছিল। তোমারও হয়ে যাবে!’
আমি এতক্ষণ বুড়োর গল্পে ডুবে ছিলাম। বিড়িটা ততক্ষণে শেষ হয়েছে। সেটা ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে বসলাম।
বুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে নেই। বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে। ঝিঁঝি পোকার ডাক ভেসে আসছে জঙ্গল থেকে। আকাশে মেঘ। এই কাহিনি শুনে এই গভীর রাতে যে কেউ ভয় পেয়ে যাবে।
তবে, আমি পাইনি। আমি বুঝতে পারছি কী চলছে এখানে। এই ঢ্যামনা বুড়ো আমায় পাতি ভয় দেখাতে চাইছে। আমি বললাম,
‘কাকা, ভালোই গল্প শোনালেন। এইবার ঝেড়ে কাশুন তো!’
‘মানে?’
‘আমায় এইসব গুল শুনিয়ে ভয় দেখাতে চাইছেন কেন? এই চাকরি ছেড়ে দিই যাতে সেটা চাইছেন তো? কেন? নিজের কোনো চেনা ছেলেছোকরাকে সুপারিশ করে আমার জায়গায় ঢোকাতে চান?’
বুড়ো কিছু উত্তর না দিয়ে ঘড়ির দিকে আরও একবার চোখ উঠিয়ে দেখল। আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে এইবার। একটু গলা উঁচু করেই বললাম,
‘শুনে রাখুন, এই চাকরি আমি ছাড়ছি না! হারগিজ ছাড়ব না!’
আমি পড়াশোনা কম জানতে পারি, কিন্তু, বুদ্ধি কম না আমার। তোমার এই গল্পে কাকা ইস্পেশাল এফেক্ট দিতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছ। মর্গে নিজেই বললে বিদ্যুৎ মেশিন বসিয়েছিল এয়ার কন্ডিশনের জন্যে, তাহলে নিশ্চই বিজলিবাতিও ছিল? তাহলে হঠাৎ লণ্ঠন নিয়ে কেন ঢুকতে হল বাপু তোমায় সেই রাতে? আর তা ছাড়া, তুমি বলছ সব মড়া নাকি জেগে ওঠে না। শুধুমাত্র অপঘাতের মড়া। তা, মর্গে অপঘাত বাদে আর কোন মড়া আসে কাকা? সবই তো অপঘাত কেস!
বুড়ো আমার দিকে না তাকিয়েই দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর আগে দিল। বলল,
‘অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ খুন সন্দেহ করে দেহ নিয়ে আসে, যেগুলো আসলে সাধারণ মৃত্যু, বা, রাস্তাঘাটে এমনিতে মরে যাওয়া বেনামি লাশও নিয়ে আসে। সেগুলো অপঘাত নয়, তাই তারা শান্ত থাকে। আর, কথার মাঝে মাঝে কয়েকটা জিনিস বাদ পড়েছে।
আসলে রোজ রাতে একটা বিশেষ সময়েই জেগে ওঠে এই মর্গের লাশ। ঠিক সেইসময়ে সব আলো নিভে যায় মর্গের।’
বুড়ো আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। আমিও তার দেখাদেখি তাকালাম। দুটো দশ বাজতে চলেছে।
বুড়ো বলল,
‘সময় হল।’
বুড়োর কথা শেষ হতেই মাথার ওপরের টিউব কাঁপা শুরু করল। গেটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেটার বাল্বটাও কাঁপছে। হঠাৎই দপ করে নিভে গেল আলো। গভীর অন্ধকার নেমে এল মর্গ্যান মর্গে। পরমুহূর্তে বুঝতে পারলাম, কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে পরিবেশে! ঝিঁঝির ডাক হঠাৎই থেমে গেল। আকাশের চাঁদের আলো যেন আর এই অবধি পৌঁছোতে পারছে না। আমার গায়ে কাঁটা দিল। মোবাইল জ্বালাতে পারলাম না, হাত কাঁপছে। আর ঠিক তখনই… ঠিক তখনই শুনতে পেলাম শব্দটা!
‘ধপ ধপ ধপ ধপ ধপ ধপ।’
শব্দটা মর্গের লাশঘরের ভেতর থেকে আসছে। বন্ধ দরজার ভেতর থেকে। মৃদু গোঙানির শব্দ। আর সেইসঙ্গে কেউ বা কারা যেন বার বার, ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে চলেছে লাশ রাখা লকারের ধাতব দরজায়! প্রাণপণ চেষ্টা করছে বেরিয়ে আসার।
আমি কাঁপছি নিজের জায়গায় বসে! আমার মুখ খুললাম, কিন্তু, আওয়াজ বের হচ্ছে না! আমি…আমি কি আজকে বন্ধ করেছিলাম ওই লকারের দরজাটা? লক করেছিলাম কি? মনে পড়ছে না, কিছুতেই মনে পড়ছে না!
হঠাৎ ‘ফসস’ করে একটা আওয়াজ হতেই কিছুটা হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ল। আমার সামনে বসা বুড়ো দেশলাই জ্বেলেছে। নিজের ঝোলা থেকে মোম বের করে তাতে আগুন দিল।
মোমের আলোয় ফোকলা দাঁতে বিশ্রী হাসি হেসে বলল,
‘ভয় পেয়ো না! কোনো ব্যাপার না! সব অভ্যেস হয়ে যাবে!’
